ভারতকোষ (দ্বিতীয় খণ্ড)/কলি
(পৃ. ২০৮)
কলি চারি যুগের শেষ যুগ কলি। বর্তমানে কলিযুগ চলিতেছে। ৪৩২০০০ বৎসর এই যুগের অধিকার। এই যুগের প্রবর্তক দেবতার নাম কলি এবং তাহার নামানুসারেই এই যুগের নাম কলি হইয়াছে। এই যুগের অবসানে ভগবান বিষ্ণু কল্কিরূপে অবতীর্ণ হইয়া কলিকে ধ্বংস করিবেন। কলিতে ধর্মের স্থান মাত্র একপাদ।
কলিযুগে মিথ্যা হিংসা শোক ইত্যাদির প্রাধান্য। মানবগণ এই সময়ে কামী ও কটুভাষী, জনপদ দস্যুপীড়িত ও বেদসকল পাষণ্ডদূষিত হইবে। স্ত্রীগণ অল্পভাগ্যা—অধিক সন্তানবতী ও সংসতির অবজ্ঞাকারিণী হইবে (গরুড়পুরাণ, ২২৭)।
দ্বাপর যুগের শেষে ব্রহ্মার পৃষ্ঠদেশ হইতে অধর্ম আবির্ভূত হন। অধর্মের স্ত্রী মিথ্যা। তাঁহাদের পুত্র দম্ভ। দম্ভ নিজ ভগিনী মায়াকে বিবাহ করেন। তাঁহাদের পুত্র লোভ। লোভও নিজ ভগিনীকে বিবাহ করেন। তাঁহাদের ক্রোধ নামে পুত্র এবং হিংসা নামে কন্যা জন্মগ্রহণ করে। ক্রোধ হিংসাকে বিবাহ করেন। তাঁহাদের পুত্র কলি।
কলিদেবতার বামহস্তে পুংচিহ্ন, তাঁহার বর্ণ তৈলাক্ত কজ্জলের ন্যায় উজ্জ্বল। তিনি বিকটবদন, লোলজিহ্ব, পূতিগন্ধযুক্ত। মদ্যালয়, বেশ্বালয়, দ্যূতক্রীড়াস্থল প্রভৃতি কুৎসিত স্থলে তাঁহার আবাস। তিনি নিজ ভগিনী দুরুক্তিকে বিবাহ করেন (কল্কিপুরাণ, ১.১)।
বিদর্ভরাজকন্যা দময়ন্তী নিষধরাজ নলকে স্বয়ংবরে পতিত্বে বরণ করেন। দময়ন্তীর প্রতি আকৃষ্ট কলিদেবতা এই সংবাদে ক্রুদ্ধ হন এবং নলের শরীরে প্রবেশ করিয়া তাঁহাকে রাজ্যচ্যূত করিতে প্রতিজ্ঞা করেন। দ্বাদশ বৎসর সুযোগ সন্ধানের পর একদিন অশুচি অবস্থায় সন্ধ্যা করিতেছেন দেখিয়া সেই অবসরে নলের দেহে প্রবেশ করেন। কলির কুপরামর্শে নলের ভ্রাতা পুষ্কর দ্যূতক্রীড়ার নলকে পরাস্ত করিলেন। সর্বহারা নল দময়ন্তীসহ বনবাসী হন এবং নিদ্রিতা দময়ন্তীকে একাকী ফেলিয়া রাখিয়া পলায়ন করেন। মহর্ষি নারদের অভিশাপে দাবাগ্নিবেষ্টিত কর্কোটক নাগকে কলি উদ্ধার করেন। কর্কোটক নাগের দংশনে নলের রূপ বিকৃত হয় এবং তাঁহার দেহাভ্যন্তরস্থ কলি বিষের জ্বালায় জর্জরিত হন। নল ইক্ষ্বাকুবংশীয় রাজা ঋতুপর্ণের সারথ্য স্বীকার করিয়া তাঁহার নিকট হইতে ‘অক্ষহৃদয়’ বিদ্যা লাভ করেন। নল অক্ষবিদ্যা জানিবামাত্র কর্কোটক নাগের তীক্ষ্ণ বিষ উদ্গার করিতে করিতে কলি তাহার শরীর হইতে বাহির হইয়া গেলেন। কলিপ্রভাবমুক্ত নল অতঃপর স্ত্রী ও পুত্র-কন্যাদের সহিত মিলিত হন এবং স্বরাজ্যে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হন (মহাভারত, বনপর্ব, ৫২-৭৯)।
বলা হয় যে―নল, দময়ন্তী, ঋতুপর্ণ ও কর্কোটক নাগের নাম স্মরণে কলিনাশ হয়; তাই প্রাতঃকালে ইহাদের নাম স্মরণ করিবার প্রথা আছে। ‘অব্দ’ ও ‘কল্কি’ দ্র।