ভারতকোষ (দ্বিতীয় খণ্ড)/কৃষ্ণধন বন্দ্যোপাধ্যায়
(পৃ. ৪০২)
কৃষ্ণধন বন্দ্যোপাধ্যায় (১৮৪৬-১৯০৪ খ্রী) প্রখ্যাত সংগীততত্ত্ববিদ্। ১৮৪৬ খ্রীষ্টাব্দের মার্চ মাসে কলিকাতায় জন্ম। শিক্ষা হেয়ার সাহেবের স্কুলে ও হিন্দু কলেজে। ১৮৬২ খ্রীষ্টাব্দে এন্ট্রান্স পরীক্ষা দিয়া বৃত্তি লাভ করেন। বৎসর বয়ঃক্রমকালে তিনি বেলগাছিয়ার নাট্যমঞ্চে মধুসুদনরচিত ‘শর্মিষ্ঠা’ নাটকের নাম ভূমিকায় অভিনয় করিয়া (৩ সেপ্টেম্বর ১৮৫৯ খ্রী) সুমিষ্ট কণ্ঠস্বরের জন্য সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। এই অভিনয়ের সূত্রেই তিনি সংগীতাচার্য ক্ষেত্রমোহন গোস্বামীর সহিত পরিচিত হন এবং তাঁহার শিক্ষায় কৃষ্ণধনের সংগীত-জীবনের সূচনা হয়। সতীর্থ ছিলেন শৌরীন্দ্রমোহন ঠাকুর। গোস্বামী মহাশয়ের নিকট কয়েক বৎসর শিক্ষালাভ করিবার পর কৃষ্ণধন পাথুরিয়াঘাটার প্রসিদ্ধ ধ্রুপদি ও বীণাবাদক হরপ্রসাদ বন্দ্যোপাধ্যায়ের নিকট ধ্রুপদ ও রাগবিদ্যা শিক্ষা করেন। জনৈক ইওরোপীয়ের নিকট তিনি পিয়ানো যন্ত্রেও শিক্ষা গ্রহণ করিয়াছিলেন। তাঁহার গ্রন্থাবলী ও তাঁহার অসুস্থত রেখমাত্রিক স্বরলিপি (স্টাফ নোটেশন) পাশ্চাত্য সংগীতে তাঁহার অভিজ্ঞতার পরিচয় বহন করিতেছে।
১৮৬৫ খ্রীষ্টাব্দে তিনি রাজস্কুলের শিক্ষক রূপে গোয়ালিয়র যান। এই সময়ে তিনি আহ্মদ খাঁর নিকট সেতার শিক্ষা করেন। ১৮৬৬ খ্রীষ্টাব্দে তাঁহার প্রথম গ্রন্থ ‘চীনের ইতিহাস’ প্রকাশিত হয়। তিন বৎসর গোয়ালিয়র বাসের পর তিনি স্ট্যাম্প অফিসারের চাকুরি লইয়া কুচবিহার গমন করেন। ঐকতান-বাদন বিষয়ে বাংলা ভাষার প্রথম গ্রন্থ কৃষ্ণধন রচিত ‘বঙ্গৈকতান’ প্রকাশিত হয় ১৮৬৭ খ্রীষ্টাব্দে। পর বৎসর প্রকাশিত হয় ‘হিন্দুস্থানী এয়ার অ্যারেন্জড ফর দি পিয়ানোফর্টে’। ভারতীয় সংগীতে পাশ্চাত্য স্বরসংগতির (হারমনি) প্রয়োগ বিষয়ে ইহাই প্রথম আলোচনা। একই বছরে প্রকাশিত হয় ‘সংগীত-শিক্ষা’। ১৮৭২ খ্রীষ্টাব্দে ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট পদ লাভ করিয়া তিনি উত্তর বঙ্গে যান। ‘সেতার শিক্ষা’ নামক গ্রন্থটি প্রকাশিত হয় ১৮৭৩ খ্রীষ্টাব্দে।
সংগীতচর্চার পক্ষে বিঘ্নস্বরূপ হওয়ায় কৃষ্ণধন সেকালের বহু আকাঙ্ক্ষিত ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেটের পদে ইস্তফা দিয়া কলিকাতায় ফিরিয়া আসেন। কলিকাতায় আসিয়া তিনি একটি সংগীত বিদ্যালয় স্থাপন করিয়াছিলেন। কিন্তু অল্পকাল পরেই ইহা উঠিয়া যায়। ভাগ্য পুনরুদ্ধারের জন্য তিনি ‘গ্রেট ন্যাশন্যাল থিয়েটার’ (বর্তমানে ‘মিনার্ভা থিয়েটার’) রঙ্গমঞ্চটি ইজারা লন। তাঁহার এই প্রয়াসটিও সফল হয় নাই, ঋণগ্রস্ত হইয়া কয়েক মাসের মধ্যেই রঙ্গমঞ্চ ছাড়িয়া দিতে বাধ্য হন। অবশেষে তিনি চাকুরি লইয়া পুনর্বার কুচবিহার রাজ্যেই গমন করেন। এই চাকুরিতে থাকাকালে নূতন উদ্যমে সংগীতচর্চা ও গবেষণার কার্যে মনোনিবেশ করিয়াছিলেন। সংগীত বিষয়ে তাঁহার গবেষণার শ্রেষ্ঠ অবদান ‘গীতসূত্রমার’ (২ খণ্ড) এইখানেই রচিত হয় এবং কুচবিহার রাজের ছাপাখানায় মুদ্রিত হইয়া যথাক্রমে ১৮৮৫ ও ১৮৮৬ খ্রীষ্টাব্দে প্রকাশিত হয়। ঔপপত্তিক ও ব্যাবহারিক উভয় দিক হইতেই সংগীত-সাহিত্যে ‘গীতসূত্রমার’ একটি বিশিষ্ট স্থানের অধিকারী। এই প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য যে পরবর্তী কালের প্রখ্যাত মহারাষ্ট্রীয় সংগীতশাস্ত্রী পণ্ডিত বিষ্ণুনারায়ণ ভাতখণ্ডে (১৮৬০-১৯৩৬ খ্রী) বাংলা ভাষা শিক্ষা করিয়া এই গ্রন্থটি পাঠ করিয়াছিলেন। কৃষ্ণধনের সর্বশেষ পুস্তক ‘হারমোনিয়ম শিক্ষা’ও কুচবিহার হইতে প্রকাশিত হয় (১৮৯৯ খ্রী)।
কুচবিহারের চাকুরি হইতে অবসর গ্রহণ করিবার পর তিনি রাজা প্রতাপচন্দ্র বড়ুয়ার সংগীত শিক্ষক রূপে আসামের গৌরীপুর রাজ্যে আশ্রয় গ্রহণ করেন।
১৯০৪ খ্রীষ্টাব্দের ২০ ফেব্রুয়ারি গৌরীপুরেই তাঁহার মৃত্যু হয়।
দ্র কৃষ্ণধন বন্দ্যোপাধ্যায়, ‘স্বরলিপি -সমস্যা’, গীতবিতান বার্ষিকী, ১৩৫০ বঙ্গাব্দ; দিলীপকুমার মুখোপাধ্যায়, ‘কৃষ্ণধন বন্দোপাধ্যায়ের সংগীত-জীবন’, দেশ, ২৩ অগ্রহায়ণ, ১৩৬৮ বঙ্গাব্দ; দিলীপকুমার মুখোপাধ্যায়, সংগীতের আসরে, কলিকাতা, ১৯৬৫।