বিষয়বস্তুতে চলুন

ভারতকোষ (দ্বিতীয় খণ্ড)/কৃষ্ণমোহন বন্দ্যোপাধ্যায়, রেভারেণ্ড

উইকিসংকলন থেকে

কৃষ্ণমোহন বন্দ্যোপাধ্যায়, রেভারেণ্ড (১৮১৩-৮৫ খ্রী) শিক্ষাবিদ, খ্রীষ্টধর্ম প্রচারক, কোষগ্রন্থকার ও ইয়ং বেঙ্গল দলের অন্যতম নেতা। ১৮১৩ খ্রীষ্টাব্দের ২৪ মে কলিকাতায় জন্ম। পিতা জীবনকৃষ্ণ বন্দ্যোপাধ্যায়, মাতা শ্রীমতী দেবী। ১৮২৩ খ্রীষ্টাব্দে কলিকাতা স্কুল সোসাইটি কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত পটলডাঙার ইংরেজী স্কুলে (পরে ‘হেয়ার স্কুল’ নামে পরিচিত) ভর্তি হন। ১৮২৪ খ্রীষ্টাব্দে স্কুল সোসাইটির বৃত্তিভোগী ছাত্র হিসাবে তিনি হিন্দু কলেজে প্রবেশ করেন। ১৮২৯ খ্রীষ্টাব্দ পর্যন্ত এই কলেজে পাঠকালে তিনি বিশেষ ক্বতিত্ব প্রদর্শন করেন।

 প্রত্যক্ষ ছাত্র না হইলেও ডিরোজিওর দ্বারা কৃষ্ণমোহন বিশেষভাবে অনুপ্রাণিত হন। অ্যাকাডেমিক অ্যাসোসিয়েশনের (‘ইয়ং বেঙ্গল’ দ্র) তিনি একজন প্রধান সভ্য ছিলেন। নব্যদলের কয়েকজন উৎসাহী যুবক একদিন কৃষ্ণমোহনের অনুপস্থিতিতে তাঁহার প্রতিবেশীর গৃহে গোরুর হাড় নিক্ষেপ করার ফলে তিনি গৃহ হইতে বিতাড়িত হন। এই ঘটনার পর তিনি ইংরেজীতে ‘দি পার্‌সিকিউটেড’ (নিপীড়িত, ১৮৩১ খ্রী) নাটক রচনা করেন। প্রচলিত হিন্দু ধর্মের প্রতি বীতরাগ হইয়া ১৮৩১ খ্রীষ্টাব্দে তিনি আলেকজাণ্ডার ডাফ্-এর নিকট খ্রীষ্ট ধর্মে দীক্ষিত হন। কিন্তু কিছুদিন পরে কৃষ্ণমোহন স্কটল্যাণ্ডের প্রেসবাইটেরিয়ান চার্চের পরিবর্তে এপিসকোপাল চার্চ অফ ইংল্যাণ্ড-এর অনুবর্তী হন। কৃষ্ণমোহন ১৮২৯ খ্রীষ্টাব্দ হইতে পূর্বোক্ত পটলডাঙার স্কুলে দ্বিতীয় শিক্ষকের পদে কার্য করিতেছিলেন, কিন্তু ধর্মান্তর গ্রহণের দরুন রক্ষণশীল সমাজের আপত্তিতে তাঁহাকে ও রসিককৃষ্ণ মল্লিককে পদত্যাগ করিতে হয়। অতঃপর তিনি চার্চ মিশনারি সোসাইটির কলিকাতা কমিটি কর্তৃক মির্জাপুর স্কুলের সুপারিণ্টেণ্ডেণ্টের পদে নিযুক্ত হন। এই স্থানে খ্রীষ্ট ধর্ম বিষয়ক শিক্ষা আবশ্যিক হওয়ায় তিনি মহোৎসাহে ধর্মপ্রচার আরম্ভ করেন। ১৮৩৩ খ্রীষ্টাব্দে ব্রজনাথ ঘোষ নামক একজন বালককে খ্রীষ্ট ধর্মে দীক্ষিত করায় তিনি সুপ্রিম কোর্টে অভিযুক্ত হইয়া দোষী সাব্যস্ত হন। তথাপি কয়েক বৎসরের মধ্যে তিনি স্ত্রী বিন্দুবাসিনী দেবী, ভ্রাতা কালীমোহন, জ্ঞানেন্দ্রমোহন ঠাকুর প্রমুখকে খ্রীষ্ট ধর্মে দীক্ষিত করেন। মধুসুদনের ধর্মান্তর গ্রহণের ব্যাপারে তাঁহার সহায়তা ছিল।  ১৮৩৯ খ্রীষ্টাব্দে ক্রাইস্ট চার্চ প্রতিষ্ঠিত হইলে কৃষ্ণমোহন তাহার আচার্য পদে বৃত হন। দীর্ঘ তের বৎসর কাল তিনি এই পদে নিযুক্ত ছিলেন। তিনি বাংলায় উপাসনা করিতেন। তাহার কিছু ‘উপদেশ কথা’ (১৮৪০ খ্রী) পুস্তকে সংকলিত হইয়াছে। ক্রাইস্ট চার্চ হইতে অবসর গ্রহণ করিয়া (১৮৫২ খ্রী) তিনি বিশপ্‌স কলেজে প্রথমে তৃতীয়, পরে দ্বিতীয় অধ্যাপকের পদে নিযুক্ত হন এবং উক্ত কলেজে বাংলায় খ্রীষ্ট ধর্ম চর্চা ও দরিদ্র ছাত্রদের বৃত্তির জন্য আট হাজার টাকা দান করেন।

 কেবল ধর্ম প্রচার নহে, শিক্ষা সাহিত্য সমাজ রাজনীতি-বিষয়ক সমস্ত ব্যাপারেই তাঁহার ঘনিষ্ঠ যোগ ছিল। নব্যদলের অন্যতম মুখপত্র ‘দি এন্‌কোয়ারার’ (১৮৩১ খ্রী) ছাড়াও তিনি ’হিন্দু ইউথ’ (১৮৩১ খ্রী), ‘গভর্নমেণ্ট গেজেট’ (১৮৪০ খ্রী), ‘সংবাদ সুধাংশু’ (১৮৫০ খ্রী) প্রভৃতি পত্র সম্পাদনা করেন। তৎকালে শিক্ষার বাহন সম্পর্কে শিক্ষা-কমিটির সদস্যগণের সহিত তাঁহার বাদানুবাদ পাঠে জানা যায়, ইংরেজী সমর্থন করিলেও কৃষ্ণমোহনের দৃঢ় বিশ্বাস ছিল যে, বাংলা ক্রমে শিক্ষার বাহন হইবে।

 সাধারণ জ্ঞানোপার্জিকা সভায় পঠিত (১৮৩৮ খ্রী) তাঁহার দুইটি প্রবন্ধ: ১. ‘অন দি নেচার অ্যাণ্ড ইম্পর্ট্যান্স অফ হিস্টরিক্যাল স্টাডিজ়’ এবং ২. ‘রিফর্ম সিভিল অ্যাণ্ড সোশাল অ্যামং দি এডুকেটেড নেটিভ্‌স’ বিশেষ প্রশংসিত হয়। ইহা ছাড়া এশিয়াটিক সোসাইটি (১৭৮৪ খ্রী), বেথুন সোসাইটি (১৮৫১ খ্রী), ফ্যামিলি লিটারারি ক্লাব (১৮৫৭ খ্রী), বঙ্গীয় সমাজ-বিজ্ঞান সভা (১৮৬৬ খ্রী), ভারত-সংস্কার সভা (১৮৭০ খ্রী) প্রভৃতি প্রতিষ্ঠানের সহিতও তাঁহার ঘনিষ্ঠ সংযোগ ছিল। কৃষ্ণমোহন দশটি ভাষায় ব্যুৎপন্ন ছিলেন।

 ১৮৭৬ খ্রীষ্টাব্দে প্রধানতঃ ইণ্ডিয়া লীগের আন্দোলনের ফলে কলিকাতা পৌর সভায় নির্বাচনপ্রথা প্রবর্তিত হইলে কৃষ্ণমোহন উহার সদস্য নির্বাচিত হন। ইণ্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন বা ভারত-সভারও (১৮৭৬ খ্রী) তিনি সভাপতি হইয়াছিলেন (১৮৭৮ খ্রী)। মুদ্রাযন্ত্র আইনের প্রতিবাদে আহূত সভায় (১৮৭৭ খ্রী) তিনি সভাপতিত্ব করেন। কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেনেটের ফেলো রূপে স্ত্রী-শিক্ষা বিস্তারেও কৃষ্ণমোহন বিশেষ উদ্যোগী ছিলেন।

 বাংলায় বিশ্বকোষ রচনার অন্যতম পথিকৃৎ কৃষ্ণমোহনের ‘বিদ্যাকল্পদ্রুম’ (এন্‌সাইক্লোপিডিয়া বেঙ্গলিন্‌সিজ়)—ইংরেজী-বাংলায় সংকলিত এই কোষগ্রন্থটি (১৮৪৬-৫১ খ্রী) মোট ১৩ খণ্ডে প্রকাশিত হয়। তাঁহার শাস্ত্রচর্চার নিদর্শন রূপে ‘ষড়্‌দর্শন সংবাদ’ (১৮৬৭ খ্রী), ‘ডায়ালগ্‌স অন দি হিন্দু ফিলসফি’ (১৮৬১ খ্রী), ‘দি এরিয়ান উইটনেস’ (১৮৭৫ খ্রী), ‘টু এসেজ় অ্যাজ় সাপ্লিমেণ্ট্‌স টু দি এরিয়ান উইটনেস’ (১৮৮০ খ্রী) প্রভৃতি গ্রন্থগুলি উল্লেখযোগ্য। এতদ্ব্যতীত তিনি কয়েকটি সংস্কৃত পাঠ্য পুস্তক সম্পাদনা করিয়াছিলেন।

 কৃষ্ণদাস পাল কথিত এই ‘হোরিহেডেড পাদ্রে’ (পক্ককেশ পাদরি) একজন আত্মমর্যাদাপূর্ণ উদার স্বদেশপ্রেমিক। ১৮৪৭ খ্রীষ্টাব্দে কলিকাতার বিশপ তাঁহাকে সহকর্মীদের মধ্যে প্রথম স্থান দিলেও তাঁহার অধস্তন শ্বেতাঙ্গ সহকারীর সঙ্গে বেতনে তারতম্য করিলে তিনি ঐ পদ গ্রহণে অসম্মত হন। শেষ জীবনে রাজনৈতিক কার্য পরিচালনেও তিনি অনুরূপ দৃঢ়তার পরিচয় দিয়াছিলেন। কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় তাঁহাকে ‘ডক্টর অফ ল’ ও ব্রিটিশ সরকার ‘সি. আই. ই.’ উপাধিতে ভূষিত করেন। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘বডেন অধ্যাপক’ পদ গ্রহণের আহ্বানও তাঁহার নিকট আসে। ১৮৬৪ খ্রীষ্টাব্দে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের সঙ্গে তিনিও বিলাতের রয়্যাল এশিয়াটিক সোসাইটির সভ্য নির্বাচিত হইয়াছিলেন। ১৮৮৫ খ্রীষ্টাব্দের ১১ মে তাঁহার মৃত্যু হয়।

দ্র দুর্গাদাস লাহিড়ী, আদর্শ-চরিত: কৃষ্ণমোহন, কলিকাতা, ১২৯২ বঙ্গাব্দ; যোগেশচন্দ্র বাগল, ‘কৃষ্ণমোহন বন্দ্যোপাধ্যায় (প্রথম জীবন)’, সাহিত্য-পরিষৎ-পত্রিকা, ৪৭ বর্ষ, ১ সংখ্যা; যোগেশচন্দ্র বাগল, কৃষ্ণমোহন বন্দ্যোপাধ্যায়, সাহিত্য-সাধক-চরিতমালা ৭২, কলিকাতা, ১৩৬২ বঙ্গাব্দ; সুশীলকুমার দে, ‘কৃষ্ণমোহন বন্দ্যোপাধ্যায়’, শারদীয়া আনন্দবাজার পত্রিকা, ১৩৬২ বঙ্গাব্দ; সুশীলকুমার দে, ‘দুইটি দুষ্প্রাপ্য গ্রন্থ’, শনিবারের চিঠি, কার্তিক, ১৩৬২ বঙ্গাব্দ; Ram Chandra Ghosh, Rev. K. M. Banerjee, Calcutta, 1893; H. Das, ‘The Rev. Krishna Mohan Banerjea’, Bengal Past & Present, April-June, July- September, October-December, 1929.

যোগেশচন্দ্র বাগল