ভারতকোষ (পঞ্চম খণ্ড)/বাউল সম্প্রদায়
(পৃ. ৪৭-৪৮)
বাউল সম্প্রদায় বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে হিন্দু ও মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের মধ্যে গৃহস্থ এবং সন্ন্যাসী ফকির রূপে বাউলদের দেখা যায়। মালাধর বসুর ‘শ্রীকৃষ্ণ বিষয়’, বৃন্দাবন দাসের ‘চৈতন্যভাগবত’ এবং কৃষ্ণদাস কবিরাজের ‘চৈতন্যচরিতামৃত’-এ বাউল শব্দটি পাওয়া যায়।
ধর্মবিশ্বাস ও সাধনরীতিঃ বাউলদের ধর্মবিশ্বাস এবং সাধনরীতির কয়েকটি বৈশিষ্ট্য আছে। বাউলেরা উল্টা সাধনের পক্ষপাতী। তাহারা বেদবিধি, কোরান-পুরাণ নির্দিষ্ট ধর্ম সাধনের বিরোধী। স্পষ্ট এবং তীক্ষ্ণ ভাষায় মোল্লা-পুরোহিত, মন্দির মসজিদ, পূজো নামাজকে তাহারা নিন্দা করিয়াছে। প্রচলিত ভোগ ও বাসনাবদ্ধ জীবন তাহাদের নয়। তাহা ছাড়া যোগসাধনার ক্ষেত্রে নিঃশ্বাস-প্রশ্বাস বায়ু নিয়ন্ত্রণ করিয়া উল্টা পথে প্রেরণ তাহাদের অবশ্য আচরণীয়।
বাউল সাধকদের একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য হইল গান। স্বরচিত যা গুরু-পরম্পরায় প্রাপ্ত বা গোষ্ঠীর গীতভাণ্ডার হইতে সংগৃহীত গান তাহারা গাহিয়া থাকে। এই গান তাহাদের সাধনার অঙ্গরূপে বিবেচিত হয়।
অন্যান্য গুহ্যসাধন পদ্ধতির ন্যায় বাউল গোষ্ঠীতেও গুরু বা মুর্শিদের একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রহিয়াছে। গুরুর নির্দেশ শিষ্য প্রত্যক্ষভাবে লাভ করে। গুরুর সাহায্য ছাড়া প্রকৃত সাধন ব্যাপারটি বুঝা সম্ভব নয়। গুরুকেই অনেক সময়ে বাউলেরা ভগবানের সহিত তুলনা করিয়াছেন।
বাউলদের সাধ্যবস্তু হইল ‘মনের মানুষ’। মনের মানষ অনন্ত, পরম সত্য, আবার ব্যক্তিগত প্রেমের আধার। অসীমকে সীমার মধ্যে অনুভব করিবার প্রয়াস এবং সীমাবদ্ধ জীবনে অসীমের ক্ষণে ক্ষণে স্পর্শ লাভের ফলে বিস্ময়—বাউলদের গানে এই ভাবটি বারবার প্রকাশ পাইয়াছে। বাউলদের মনের মানুষ আছেন দেহসীমার মধ্যে। সহিত সমন্বিত হইতে হইবে প্রেমের দ্বারা। এই কারণে প্রেমব্যাকুলতায় বাউলেরা উন্মত্ত। নিজেদের ‘পাগল’ বলিয়া পরিচয় দিতে তাহারা আগ্রহী।অন্যান্য তান্ত্রিক সহজিয়া সাধকগোষ্ঠীর ন্যায় বাউলেরাও ‘ভাণ্ডে ব্রহ্মাণ্ড’ তত্ত্বে বিশ্বাস করে। মানুষের দেহভাণ্ডেই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের ক্ষুদ্র প্রতীক। মনের মানুষ এই দেহের খাঁচায়ই বাস করেন। বাহিরে তাঁহার সন্ধান না করিয়া দেহের অভ্যন্তরেই খুঁজিতে হইবে। বাউলেরা তাই দেহকেন্দ্রিক কায়া সাধনাকে দেহ-অভ্যন্তরস্থ সত্য স্বরূপকে পাইবার একমাত্র পথা বলিয়া মনে করে। মানবদেহ তাহাদের নিকট মন্দির-মসজিদ অপেক্ষা উচ্চতর উপাসনাগ্রহ বলিয়া বিবেচিত হয়।
বাউল সাধনা মিথুনাত্মক। ইহা নরনারীর চঞ্চল ক্ষণস্থায়ী কামক্রীড়া মাত্র নয়। বাউলদের মিলন প্রেমলীলা, উহা ‘অটল, অচঞ্চল, স্থির’। উহার ফলশ্রুতি মিথুনানন্দ। কিন্তু কামক্রীড়াকে ত্যাগ করিয়া ঐ প্রেমলীলায় পৌঁছানো যায় না। কারণ কাম ও প্রেম মিশ্রিত অবস্থায় থাকে।
ইতিহাস: গত হাজার বৎসরের বাংলাদেশের কর্মসাধনার যে পরিচয় নানা সূত্রে জানা গিয়াছে তাহাদের সহিত তুলনামূলক আলোচনা করিলে বাউলদের উদ্ভব ও বিকাশের একটি সম্ভাব্য সূত্রে অননুমান করা যায়। খ্রীষ্টীয় দশম শতাব্দী নাগাদ বাংলাদেশে তান্ত্রিক বৌদ্ধধর্মের ব্যাপক প্রসার ঘটিয়াছিল। ইহার অন্যতম শাখা সহজযান। সহজযানের একটি শাখা মিথুনাত্মক যোগসাধনা। চর্যাকরেরা এই সাধন পদ্ধতির অনুসারী ছিলেন। বৈষ্ণব সহজিয়াদের উদ্ভবের পিছনে ইহাদের প্রভাব অনুমিত হয়। (‘সহজিয়া’ দ্র)।
দ্বাদশ শতাব্দী হইতে বৈষ্ণব সহজিয়াদের সঙ্গে সূফীদের যোগাযোগ হইতে থাকে। মিথুনাত্মক সাধন ধারাটির সহিত হৃদয়াবেগমূলক ব্যাকুলতার সংযোগ ঘটে সূফীদের আদর্শে। চৈতন্যপ্রভাবে বাংলাদেশ জুড়িয়া প্রেমধর্মের যে জোয়ার আসে, তাহা সহজিয়া এবং ফকির সাধকদের অনুপ্রাণিত করিয়াছিল। ইহাদের সাধনপদ্ধতির সহিত প্রেমতত্ত্ব, পরকীয়াবাদ, ‘কৃষ্ণসাক্ষাৎ শৃঙ্গার’ প্রভৃতি বৈষ্ণব ধারণার সাদৃশ্য ছিল। অনেক গবেষকের ধারণা, ইহারাই সপ্তদশ শতাব্দীতে বাউল নামক একটি স্বতন্ত্র সম্প্রদায়রূপে পরিচিতি লাভ করে।
বাউলগান: বাউল সাধনার সঙ্গে গানের সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ। বাউলদের অনেক গান সংকলিত হইয়াছে। এই সূত্রে এই সাধক সম্প্রদায়ের সঙ্গে বাংলাসাহিত্যের একটি সম্পর্ক সৃষ্টি হইয়াছে। প্রাপ্ত বাউল গানগুলির রচয়িতাদের মধ্যে প্রথমেই লালন শাহ ফকিরের নাম করিতে হয়। সম্ভবতঃ ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধের মধ্যে তাঁহার গানগুলি রচিত। পূর্ববর্তী কোনও বাউলগানের নিদর্শন সংকলিত হয় নাই। অন্যান্য বাউল কবিদের মধ্যে পদ্মলোচন গোঁসাই, যাদুবিন্দ, ফকির পাঞ্ছশাহ, হাউড়ে গোঁসাই, গোঁসাই গোপাল, এরফান্-শাহ্, পাগলা কানাই প্রভৃতির নাম উল্লেখযোগ্য। অনেকেই ঊনবিংশ শতাব্দীতে গানগুলি লিখিয়াছেন, কিন্তু বাংলাসাহিত্যের অষ্টাদশ শতকের প্রাচীনতর কাব্য-ঐতিহ্যের সঙ্গেই বাউল গানের সম্বন্ধ। ‘সাধন সংগীত’ নামে এই অনাধুনিক কাব্যসংগীতের ধারাটিকে চিহ্নিত করা চলে। রচয়িতারা আপনাদের সাধনভজনের নানা গঢ়তত্ত্ব বিবিধ রূপকের সাহায্যে ইহাদের মধ্য দিয়া প্রকাশ করেন। কখনও কখনও বাউলগানে ব্যক্তিগত ভক্তি-প্রেমের ভাবব্যাকুলতা বিশেষ আন্তরিকতার সঙ্গে প্রকাশিত হইয়া উহাদের সাহিত্য-মূল্য বাড়াইয়াছে।
রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে বাউল গানের একটি উল্লেখ্য সম্বধ আছে। আধুনিককালে তিনিই প্রথম বাউল গান সংগ্রহ করেন। বাউল ধর্মোপলব্ধি (গুহ্য-সাধনার দিকটি নহে, আধ্যাত্মিক অনুভূতির দিক) রবীন্দ্র-জীবন-দর্শনের উপরে গুরুতর প্রভাব বিস্তার করিয়াছিল বলিয়া অনেক গবেষক মনে করেন।
দ্র ক্ষিতিমোহন সেন, বাউল পরিচয়, বিশ্বভারতী পত্রিকা, ১৩৬২, ১৩৬৩ বঙ্গাব্দ; উপেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য, বাংলার বাউল ও বাউল গান, কলিকাতা, ১৩৬৪ বঙ্গাব্দ; ময্হারুল ইসলাম, কবি পাগলা কানাই, রাজশাহী, ১৩৬৬ বঙ্গাব্দ; আশুতোষ ভট্টাচার্য, রবীন্দ্রনাথ ও বাউল সাধনা, রবীন্দ্রভারতী পত্রিকা, ১৩৭৭ বঙ্গাব্দ; Sashibhusan Dasgupta, Obscure Religious Cults as hackground of Bengali Literature, Calcutta, 1948.