বিষয়বস্তুতে চলুন

ভারতবর্ষের ইতিহাস (হেমলতা দেবী)

উইকিসংকলন থেকে

ভারতবর্ষের ইতিহাস


তোমাদের বর্ত্তমান সম্রাট ও সম্রাজ্ঞী।

ভারতবর্ষের ইতিহাস।


(বালকবালিকাদের জন্য)


শ্রীহেমলতা দেবী কর্ত্তৃক রচিত।





অষ্টম সংস্করণ





Calcutta
S. K. LAHIRI & CO.
56, COLLEGE STREET
1913

মূল্য ৷৷৹ আট আনা। 

COTTON PRESS
Printed by Jyotish Chandra Ghosh
57, Harrison Road, Calcutta.

ভূমিকা।

 প্রায় এক বৎসর হইল আমার পূজনীয় পিতৃদেব শ্রীযুক্ত পণ্ডিত শিবনাথ শাস্ত্রী মহাশয় আমাকে বালকবালিকাদিগের জন্য একখানি ভারতবর্ষের ইতিহাস লিখিতে আদেশ করেন। আমি তদবধি এই ইতিহাসখানি লিখিতে আরম্ভ করি। এক্ষণে বালকবালিকাদিগের পাঠ্য পুস্তক হইবার আশায় পুস্তকখানি মুদ্রিত করিলাম।

 বাল্যকালে এত যে ইতিহাস কণ্টস্থ করিয়াছিলাম, কিন্তু এখন দেখিতেছি, ইতিহাস ত কিছুই শিখি নাই। অধিকাংশ ইতিহাসের ভাষা এত দুরূহ যে ইতিহাস বুঝিব কি, ভাষা বুঝিতেই মস্তক ঘুরিয়া যাইত। মনে করিতাম, রাজাদিগের নাম, যুদ্ধের শাল এবং কোন্ পক্ষ জয়ী হইল, জানাই বুঝি ইতিহাস পড়িবার ফল। বুদ্ধদেবের মাতার নাম মায়াদেবী না মহামায়া ছিল, সেই মীমাংসা লইয়া ব্যস্ত হইতাম;—ভারতবর্ষে বৌদ্ধধর্ম্মের প্রভাব কিরূপ ছিল, তাহা শিখি নাই। মুসলমান রাজাদিগের নাম ও রাজ্যকাল প্রাণপণে কণ্ঠস্থ করিয়াছিলাম; মুসলমানদিগের সময়ে এদেশের অবস্থা কিরূপ ছিল, তাহা ত বুঝি নাই। প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয় মারাঠা যুদ্ধ, তাহার কারণ এবং ফলাফলের কথা যত্ন পূর্ব্বক শিখিয়াছিলাম;—কিন্তু মহারাষ্ট্রীয় জাতির প্রতাপের কথা তত বুঝি নাই। এখন দেখিতেছি, রাজাদিগের নাম, শাল. যুদ্ধ ইত্যাদি কণ্টস্থ করিয়া কেবল স্মৃতিশক্তির অপব্যবহার করিয়াছি, ইতিহাস পাঠের সুফল লাভ করিতে পারি নাই। সরল ভাষায়, সরল ভাবে প্রকৃত ইতিহাসখানি লিখিয়াছি। ভাষা আরও সরল হইলে ভাল ছিল, কিন্তু সাধারণের মনোমত হইবে না এই ভয়ে আরও সরল করিতে পারি নাই।

 গ্রন্থখানি যদি টেক্‌ষ্ট-বুক-কমিটি পাঠ্য-পুস্তক শ্রেণীভুক্ত করেন তাহা হইলে ইতিহাস খানি সচিত্র করিবার ইচ্ছা আছে।

১৯এ মার্চ্চ,
৮১৯৮
গ্রন্থকর্ত্রী।

দ্বিতীয় সংস্করণের বিজ্ঞাপন।

 আমার প্রথম প্রকাশিত পুস্তকখানি কিঞ্চিৎ পরিবর্ত্তিত ও সংশোধিত করিয়া টেক‍্ষ্ট বুক্‌ কমিটি পাঠ্য শ্রেণীভুক্ত করিয়াছেন। তাঁহাদের মনোনীত পুস্তকখানিই পুনর্মুদ্রিত হইল। পণ্ডিতপ্রবর শ্রীযুক্ত রাজেন্দ্রচন্দ্র শাস্ত্রী মহাশয় এই পুস্তকের হিন্দু-রাজত্বকাল, এবং মৌলবী আব্দুল করিম বি,এ, মহাশয় ইহার মুসলমান ও ইংরেজ রাজত্বকাল বিশেষ যত্ন সহকারে দেখিয়া দিয়াছেন। মৌলবী মহাশয়ের উপদেশানুসারে এই পুস্তকের মুসলমান নামগুলি যথাসাধ্য শুদ্ধ করিয়া লেখা হইয়াছে। সুবিখ্যাত লেখক শ্রীযুক্ত সখারাম গণেশ দেউস্কর মহাশয় মহারাষ্ট্রীয় জাতির উত্থান নামক অধ্যায়টী বিশেষভাবে দেখিয়া দিয়াছেন এবং মহারাষ্ট্রীয় নামগুলির উচ্চারণ তিনি সংশোধন করিয়া দিয়াছেন। ইহাদিগের নিকট আমি চিরকৃতজ্ঞতা-পাশে আবদ্ধ রহিলাম।

 এই বারে গ্রন্থখানি যাহাতে নির্ভুল হয় তাহার জন্য বিশেষ চেষ্টা করিয়াছি, আশা করি, এই চেষ্টায় অনেক পরিমাণে সফল হইয়াছি।

 আমার পূর্ব্ব প্রতিশ্রুতি অনুসারে পুস্তকখানিতে অনেকগুনি সুন্দর সুন্দর ছবি সন্নিবেশিত হইল।

৫ই আগাষ্ট,
১৮৯৯।
গ্রন্থকর্ত্রী।

তৃতীয় সংস্করণের বিজ্ঞাপন।

 ভারতবর্ষের ইতিহাসের তৃতীয় সংস্করণ প্রকাশিত হইল। দ্বিতীয় সংস্করণের সহিত ইহার পাঠগত কোন বৈষম্য নাই। কেবল লর্ড কার্জনের শাসন সময়ের ঘটনাগুলি বর্ত্তমান সময় পর্যন্ত ইহাতে লিপিবন্ধ হইল।

 বিলাতের সুবিখ্যাত প্রকাশক লংম্যান্ গ্রীন এণ্ড কোম্পানি এই ইতিহাসের ইংরাজি অনুবাদ প্রকাশ করিতেছেন। শ্রীমতী নাইট তাহা ইংরাজিতে অনুবাদ করিয়াছেন। এই পুস্তকখানিকে যে কোন ভাষার অনুবাদ করিবার স্বত্ব উক্ত কোম্পানি আমার নিকট হইতে ক্রয় করিয়াছেন। ভবিষ্যতে আর কেহ মৎপ্রণীত ভারতবর্ষের ইতিহাসের অনুবাদ প্রকাশ করিতে পারিবেন না।

২৮ এ জানুয়ারি,
১৯০১।
গ্রন্থকর্ত্রী।

সপ্তম সংস্করণের বিজ্ঞাপন।

 বর্ত্তমান সংস্করণে আমার ভারতবর্ষের ইতিহাস খানি আদ্যোপান্ত পরিবর্ত্তিত, পরিবর্দ্ধিত এবং অপ্রয়োজনীয় অনেকাংশ পরিবর্জ্জিত হইয়াছে। রায় বাহাদুর শ্রীযুক্ত পণ্ডিত রাজেন্দ্রনাথ শাস্ত্রী মহাশয়ের নির্দেশানুসারে হিন্দুরাজত্বের অনেক স্থান সংশোধিত হইয়াছে। স্কুল ইন্সপেক্টর শ্রীযুক্ত ফণী ভূষণ বসু এম্, এ, মহাশয় পুস্তকের অনেক ভ্রম সংশোধন করিয়া দিয়াছেন। এবং শ্রীযুক্ত ভিনসেণ্ট স্মিথের নব প্রকাশিত ইতিহাসের নূতন তত্ত্ব সকল পাঠে হিন্দুধর্ম্মের পুনরুত্থান নামক অধ্যায়টা নবভাবে লিখিত হইল। এইবারে বিস্তর নূতন ছবি সন্নিবেশিত হইল। সর্ব্বতোভাবে ইতিহাস খানিকে সর্ব্বাঙ্গ সুন্দর করিতে ত্রুটি করি নাই।

দারজিলিং,
মার্চ্চ, ১৯০৯।
গ্রন্থকর্ত্রী।

অষ্টম সংস্করণের ভূমিকা।

 বর্ত্তমান সংস্করণে আমার ভারতবর্ষের ইতিহাস খানিতে বঙ্গীয় গবর্ণমেণ্টের নির্দ্দিষ্ট পাঠ্য তালিকার অন্তর্ভূক্ত সংক্ষিপ্ত বিষয়গুলি সন্নিবিষ্ট হইল এবং অপ্রয়োজনীয় অংশ সকল পরিত্যক্ত হইয়াছে। ইতিহাসের ধারাবাহিকতা রক্ষা করিবার জন্য যাহা কিছু লিখিত হইয়াছে তাহাতে পাঠার্থীদিগের বিশেষ সুবিধা হইবে আশা করা যায়।

কলিকাতা,
৭ই জানুয়ারি, ১৯১৩।
গ্রন্থকর্ত্রী।

উপক্রমণিকা।

 ভারতবর্ষ,—এশিয়ার মানচিত্র দেখিলে ভারতবর্ষকে দৃষ্টিমাত্রেই চিনিতে পারা যায়। আমাদের ভারতবর্ষ যেন এশিয়ার দক্ষিণ উপকূলের মধ্যমণি। এশিয়ার দক্ষিণে তিনটা উপদ্বীপ আছে, তন্মধ্যে মধ্যটী ভারতবর্ষ। পৃথিবীর মধ্যে সর্বোচ্চ পর্ব্বত হিমালয় ভারতের শিরোভূষণ। পূর্ব্বে বঙ্গোপসাগর, পশ্চিমে আরব সাগর, দক্ষিণে ভারত মহাসাগর। প্রকৃতি ভারতবর্ষকে অতি সুন্দর প্রাকার এবং পরিখায় বেষ্টন করিয়া দিয়াছেন। উত্তরে হিমালয় এত উচ্চ যে সহজে কেহ পার হইতে পারে না। কেবল উত্তর পশ্চিমে এবং উত্তর পূর্ব্বে অতি সঙ্কীর্ণ গিরিপথ আছে, সেই দ্বার দিয়া অতি প্রাচীন কাল হইতে ভারতবর্ষে নানা জাতীয় লোক প্রবেশ লাভ করিয়াছে। কিন্তু এতাবৎ কাল সমুদ্রপথে কেহ আর ভারতবর্ষে আসে নাই। কিন্তু জলদেবতার ন্যায় জলচর ইউরোপীয় জাতি সকল অকূল সমুদ্রে পাড়ি দিয়া ভারতে আসিতে সক্ষম হইয়াছেন। সমুদ্র তাঁহাদের অন্তরায় নয়,—তাঁহাদের নিকট সুগম পথ। জলের রাজা ইংরেজ আমাদের ভারতবর্ষের বর্তমান রাজা।

 ভারতবর্ষের প্রাকৃতিক দৃশ্য,—মানচিত্রে ভারতবর্ষের ত্রিকোণ আকৃতি—দক্ষিণাংশ ক্রমশঃ সংকীর্ণ হইয়া যেন সাগরে প্রবেশ করিয়াছে তাহার নিকটেই ডিম্বাকৃতি সিংহল দ্বীপ। পৃথিবীর মানচিত্রে দেখিতে পাই—ভারতবর্ষের কিঞ্চিং নিম্ন দিয়া বিষুবরেখা গিয়াছে। বিষুবরেখার উভয় পার্শ্বস্থ দেশ সকল অত্যন্ত গরম। সুতরাং আমাদের ভারতবর্ষকে গ্রীষ্মপ্রধান দেশ বলিতে হয়। কিন্তু ভারতবর্ষত আর একটী ক্ষুদ্র দেশ নয়। রুশিয়াকে বাদ দিলে সমুদায় ইউরোপ যত বড়, ভারতবর্ষ প্রায় তত বড়। একটা বড় আশ্চর্য্য কথা—পৃথিবীতে যেখানে যাহা কিছু আছে, ভারতবর্ষে তাহার সকলই আছে। বিষুবরেখার এত নিকট হইলেও, এখানে এমন সকল দেশ আছে, যেখানে ইউরোপের ন্যায় শীত, আবার ভারতবর্ষের পশ্চিমাংশে সিন্ধুদেশে মরুভূমিও আছে। ওদিকে আবার বঙ্গদেশের ন্যায় এমন সকল উর্ব্বরা প্রদেশ আছে, যে পৃথিবীতে তেমন আর কোথাও দেখা যায় না। বলিতে কি সর্ব্ব ঋতু, সর্ব্বপ্রকার জলবায়ু, সকল প্রকার ফল শস্য, সকল প্রকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য ভারতবর্ষে বিদ্যমান। এমন পর্ব্বতমালা, এমন নদনদী পৃথিবীর আর কোন দেশে নাই। ভারতবর্ষের মধ্য দিয়া বিন্ধ্যপর্বত যেন ভারতবর্ষকে দুই অংশে বিভক্ত করিরাছে। উত্তরাংশকে আর্য্যাবর্ত্ত দক্ষিণাংশকে দাক্ষিণাত্য বা দক্ষিনাপথ বলে। পণ্ডিতেরা বলিয়া থাকেন দেশের প্রাকৃতিক অবস্থা যেরূপ হয়, সেই সেই দেশের অধিবাসীদের স্বভাবও সেরূপ হয়। অর্থাৎ যারা শীতপ্রধান, অনুর্ব্বর দেশে থাকে, সেখানকার লোকেরা শ্রম সহিষ্ণু, এবং বলবান হয়—আর গ্রীষ্ম প্রধান দেশে যাহারা বাস করে তাহারা দুর্ব্বল এবং শ্রমকাতর হয়। যেমন পিতামাতা আদর দিলে সন্তান নষ্ট হইয়া যায়, সেইরূপ জননীরূপিণী প্রকৃতিদেবীর আদর পাইলে মানবজাতির অনিষ্ট হয়। মানব স্বভাবতঃই সুখপ্রিয় সুতরাং সুখের দেশে সকলেরই থাকিতে ইচ্ছা করে। আমাদের ভারতভূমির প্রতি প্রকৃতিমাতার বড়ই কৃপা, সেই জন্য এই দেশের লোকেরা ক্রমে সুখপ্রিয় এবং দুর্ব্বল হইয়া পড়িয়াছে—এবং সেই জন্যই যুগে যুগে ভারতবর্ষে নানা জাতীয় লোক প্রবেশ করিয়াছে। ভারতবর্ষে আসিয়া কেহ আর এ দেশ ত্যাগ করিয়া যাইতে চাহে নাই। অতি পুরাকাল হইতেই ভারতের ধনধান্য এবং ঐশ্বর্য্যের কথা জগৎ বিখ্যাত হইয়াছে। এ খ্যাতি অমূলক নহে।

 ভারতবর্ষের অধিবাসীগণ,—ভারতবর্ষে যেমন পৃথিবীর সর্ব্বঋতুর সমন্বয়, সেইরূপ এখানে নানাজাতি, নানা আকৃতি, নানা ভাষা, নানা ধর্মবিশিষ্ট লোকের বাস। অতি সুসভ্য সুরূপ মানবজাতি হইতে, অসভ্য কৃষ্ণকায় বর্ব্বরও ভারতের প্রজা। এদেশে হিন্দু, মুসলমান, পার্শি ও ইউরোপীয় জাতি সকল বাস করেন। ভারতবর্ষের অপর নাম হিন্দুস্থান, এ দেশের অধিকাংশ অধিবাসী হিন্দু হইলেও তাহাদের ভাষা, আকৃতি, আচার ব্যবহার বিভিন্ন। আর্য্যাবর্ত্তের পূর্ব্বাংশে বঙ্গদেশ, বাঙ্গালা ভাষাই এ অঞ্চলের প্রধান ভাষা। দাক্ষিণাত্যের লোকেরা তামিল, তেলুগু, কাণাড়ী প্রভৃতি ভাষায় কথা বলে। ভারতের উত্তরাংশের লোকেরা তাহা বুঝিতেও পারে না। তবে গাছের যেমন গুড়ি এক কিন্তু শাখা প্রশাখা অনেক থাকে তেমনি ভারতবর্ষে প্রধান একটী জাতির বাসস্থান ছিল—তাঁহাদের ভাষা সংস্কৃতই এখনকার অধিকাংশ চলিত ভাষার জননী। আমাদের বর্তমান রাজাদিগের ভাষা ইংরাজিই ভারতের প্রধান ভাষা হইয়া উঠিতেছে। পাঞ্জাবীই হউন, বাঙ্গালীই হউন, মান্দ্রাজীই হউন, পার্শিই হউন, ইংরাজি ভাষা সকলেরই রাজভাষা, সকলেই এ ভাষার কথাবার্তা কহিয়া থাকেন।

বঙ্গদেশের স্বাভাবিক এবং সাধারণ দৃশ্য।

 আর্য্যাবর্ত্তের পূর্ব্বাংশে আমাদের বঙ্গদেশ, ইহার উত্তরে সিকিম রাজ্য, দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর, পশ্চিমে বিহার ও ছোট নাগপুর, পূর্ব্বে আসাম। এই সুবিশাল দেশটী সমগ্র বাঙ্গালী জাতির বাসস্থান। বর্ত্তমান সময়ে মান্দ্রাজ এবং বোম্বাই প্রেসিডেন্সির ন্যায় সমুদায় বঙ্গদেশ একজন গবর্ণরের অধীন হইয়াছে। রাজসাহী, ঢাকা, চট্টগ্রাম, বর্দ্ধমান, প্রেসিডেন্সি প্রভৃতি বিভাগে বঙ্গদেশ সম্প্রতি বিভক্ত হইয়াছে। বঙ্গদেশে প্রায় ৮ কোটী লোকের বাস, তন্মধ্যে দুই ভাগ হিন্দু এক ভাগ মুসলমান বঙ্গদেশের পশ্চিমাংশে হিন্দুই অধিক মুসলমান অল্প, ভাগিরথীর পূর্ব্ব পারে কোথাও কোথাও হিন্দু মুসলমান প্রায় সমান। পূর্ব্বাংশে মুসলমানের সংখ্যা প্রায় হিন্দুর দ্বিগুণ। বাঙ্গালাই বঙ্গদেশের চলিত ভাষা। সমুদায় ভারতবর্ষের মধ্যে বঙ্গদেশ উর্ব্বরা এবং শস্যশালিনী। বঙ্গদেশের পশ্চিমাংশ দিয়া ভাগীরথী এবং তাহার শাখা প্রশাখা এবং পূর্বাংশ দিয়া পদ্মানদী এবং ব্রহ্মপুত্র প্রবাহিত। বঙ্গদেশে বিস্তর নদী। পর্ব্বত হইতে বৎসরে বৎসরে বিস্তর মৃত্তিকা আসিয়া নদী সকলের মোহানায় জমা হইয়া দক্ষিণে বঙ্গদেশের পরিসর বৃদ্ধি করিতেছে। অধিক কি পণ্ডিতেরা বলেন যে বঙ্গদেশের দক্ষিণাংশ সাগর জলেই নিমগ্ন ছিল ক্রমে নদীর মাটি আসিয়া ইহাকে উচ্চ করিয়া তুলিতেছে। বঙ্গদেশ পলি মাটিতে নির্ম্মিত বলিয়া এত উর্বরা, এখানে প্রচুর ফল শস্য জন্মে—ধান, গম, মুগ, মটর, তিসি, সরিষা প্রভৃতি শস্য—আম, কাঁটাল, নীচু, নারিকেল প্রভৃতি বিবিধ ফল—বনে শাল, সেগুন প্রভৃতি কাষ্ঠ, নদী সকলে এবং পুস্করিণীতে রোহিত, ইলিশ প্রভৃতি অপর্যাপ্ত মৎস্য। সমুদায় ভারতবর্ষের মধ্যে বাঙ্গালী কৃষক সুখী এবং সঙ্গতিপন্ন। পাট কেবল এদেশে জন্মে, তাহা বিক্রয় করিয়া প্রজার বিস্তর অর্থ লাভ হয়। বঙ্গদেশ গ্রীষ্ম প্রধান হইলেও সমুদ্রের নিকটে এবং বিস্তর নদী আছে বলিয়া এখানকার গ্রীষ্ম সেরূপ অসহ্য নয়। বঙ্গদেশের পূর্ব্বাংশে অপর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত হয় সেই জন্য বর্ষাকালে কোন কোন প্রদেশ একেবারে জলমগ্ন হয়। বঙ্গদেশ লক্ষ্মীর ভাণ্ডার বটে কিন্তু এ দেশের জল বায়ু তেমন স্বাস্থ্যকর নহে। সেই হেতু বাঙ্গালী জাতি অতিশয় বুদ্ধিমান হইলেও শারীরিক বলে পশ্চিমের জাতি সকল অপেক্ষা হীন। সমুদায় ভারতবর্ষের মধ্যে বঙ্গ দেশ নানা কারণে প্রাধান্য লাভ করিতে সক্ষম হইয়াছে। এই বঙ্গ দেশেই ইংরাজ রাজ্যের সূত্রপাত হয়। বঙ্গ দেশের প্রধান নগরী কলিকাতা ইংরাজের হস্ত নির্ম্মিত অপূর্ব্ব সহর। এতদিন কলিকাতাই সমগ্র ভারতের রাজধানী ছিল সম্প্রতি প্রাচীন দিল্লীই পূর্ব্ব গৌরব ফিরিয়া পাইয়াছে। কলিকাতা ভারতের রাজধানী না হইলেও ব্যবসার জন্য ইহা অগ্রগণ্য। ঢাকা অতি পুরাতন সহর, মুসলমানদিগের সময়েই ঢাকা প্রাধান্য লাভ করে। ঢাকা অনেক শিল্প বাণিজ্যের কেন্দ্রস্থল। অতি প্রাচীনকাল হইতে ঢাকা সূক্ষ্ম বস্ত্রের জন্য প্রসিদ্ধ। এক্ষণে উৎকৃষ্ট বন্দর বলিয়া চট্টগ্রামও বিশেষ শ্রীবৃদ্ধি লাভ করিতেছে।


সূচীপত্র।

উপক্রমণিকা, ভারতবর্ষ। পৃথিবীর মানচিত্রে ইহার অবস্থান।

ভারতবর্ষের ও বঙ্গ দেশের স্বাভাবিক দৃশ্য।

প্রথম পরিচ্ছেদ

হিন্দু রাজত্ব।

 বিষয়।
পৃষ্ঠা।
আদিম আর্য্যজাতি
...
ভারতবর্ষে তাঁহাদিগের উপনিবেশ স্থাপন
...
অনার্য্যগণ
...
বৈদিক ধর্ম্ম
...
ঋগ্বেদের সময় পঞ্জাববাসী আর্য্যগণের আচার ব্যবহার
...
মহাভারত
...
রামায়ণ
...
১০
মগধ রাজ্য
...
১৪
চন্দ্রগুপ্ত
...
১৫
আলেক্‌জাণ্ডার
...
১৫
গ্রীক লিখিত ভারতবর্ষের বিবরণ
...
১৬

চতুর্থ পরিচ্ছেদ

বৌদ্ধযুগ।

 বিষয়।
পৃষ্ঠা।
বুদ্ধের জীবন
...
১৭
বৌদ্ধ ধর্ম্ম
...
২২
অশোক
...
২২
ভারতে বৌদ্ধ ধর্ম্মের বিস্তৃতি ও লয়
...
২৫
মহাবীর ও জৈন ধর্ম্ম
...
২৭
সিংহলে উপনিবেশ স্থাপন—বিজয় সিংহের বিবরণ
...
২৮

পঞ্চম পরিচ্ছেদ

হিন্দু ধর্ম্মের পুণরুত্থান।

বিক্রমাদিত্য
...
৩০
শকজাতির আক্রমণ কণিষ্ক
...
৩০
কালিদাস, হর্ষবর্দ্ধন
...
৩২
বঙ্গদেশ—আদিশূর, বল্লান, লক্ষণ সেন
...
৩৩
দাক্ষিণাত্য
...
৩৪
উড়িষ্যা
...
৩৫
হিন্দুদিগের সভ্যতা ও পাণ্ডিত্য
...
৩৬
মুসলমান বিজয়ের অব্যবহিত পূর্ব্বে ভারতের অবস্থা
...
৩৮

ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ

মুসলমান বিজয়।

মহাল্যিব
...
৪৪
মহম্মদ বিনকাসিম
...
৪৪
মহমুদ
...
৪৬

সপ্তম পরিচ্ছেদ

পাঠান রাজত্ব।

 বিষয়।
পৃষ্ঠা
কুতবুদ্দীন
...
৫১
নাসিরুদ্দীন
...
৫৩
আলাউদ্দীন খালজি
...
৫৬
মহম্মদ টগ্‌লক
...
৫৮
তৈমুরলঙ্গ
...
৬০
পাঠানগণের রাজত্বকালে বঙ্গদেশ
...
৬২
রামানন্দ, কবীর ও চৈতন্য
...
৬৩৬৪

অষ্টম পরিচ্ছেদ

মোগল রাজত্ব।

বাবর
...
৬৫
হুমায়ুন
...
৬৬
আকবর
...
৬৮
জাহাঙ্গীর
...
৭৬
সাজাহান
...
৭৯
আওরঙ্গজেব
...
৮২
মুসলমানদিগের অধীনে ভারতবাসীদিগের অবস্থা
...
৮৮
দাক্ষিণাত্য
...
৯০
শিবাজী
...
৯২
বঙ্গদেশ
...
৯১
 বিষয়।
পৃষ্ঠা
পেশওয়া ও মহারাষ্ট্রীয়গণ
...
১০৯
শিখজাতির বিবরণ—নানক, রণজিৎ সিংহ
...
১১০
ইউরোপীয়দিগের ভারতে আগমন
...
১১৫
মান্দ্রাজ, বোম্বাই, কলিকাতা সহর স্থাপন
...
১১৭
ক্লাইব—সিরাজউদ্দৌলা, অন্ধকুপ হত্যা, পলাসি, ক্লাইবের দেওয়ানি লাভ
...
১১৮১২০
হায়দার আলি
...
১২৪

চতুর্দ্দশ পরিচ্ছেদ

কোম্পানির রাজত্ব।

হেষ্টিংস
...
১২৭
লর্ড কর্ণওয়ালিস্ ও অন্যান্য গবর্ণরগণ
...
১৩২
সাম্রাজ্ঞী ভিক্টোরিয়ার—অধীনে ভারতবর্ষ
...
১৪৫
সিপাহি বিদ্রোহ
...
১৪৬
ইংরাজ শাসনাধীনে ভারতের অশেষ সুফল লাভ
...
১৫২

এই লেখাটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পাবলিক ডোমেইনে অন্তর্গত কারণ এটি ১৯৩১ খ্রিষ্টাব্দের ১লা জানুয়ারির পূর্বে প্রকাশিত।


লেখক ১৯৪৩ সালে মারা গেছেন, তাই এই লেখাটি সেই সমস্ত দেশে পাবলিক ডোমেইনে অন্তর্গত যেখানে কপিরাইট লেখকের মৃত্যুর ৮০ বছর পর্যন্ত বলবৎ থাকে। এই রচনাটি সেই সমস্ত দেশেও পাবলিক ডোমেইনে অন্তর্গত হতে পারে যেখানে নিজ দেশে প্রকাশনার ক্ষেত্রে প্রলম্বিত কপিরাইট থাকলেও বিদেশী রচনার জন্য স্বল্প সময়ের নিয়ম প্রযোজ্য হয়।