বিষয়বস্তুতে চলুন

ভারতবর্ষের ইতিহাস (হেমলতা দেবী)/অষ্টম পরিচ্ছেদ

উইকিসংকলন থেকে

মোগল রাজত্ব।

অষ্টম পরিচ্ছেদ।

 বাবর—বাবর যে বংশের আদি পুরুষ, তাহাকে মোগল বংশ বলে বটে, কিন্তু তাঁহার মাতাই কেবল চেঙ্গিস খাঁ মোগলের বংশে জন্মিয়াছিলেন। বাবরের মাতৃকুল মোগল হইলেও তিনি মোগলদিগকে অতিশয় ঘৃণা করিতেন। বাবর অতিশয় বীর ও বুদ্ধিমান্ পুরুষ ছিলেন। তিনি বার বৎসর বয়সে পিতৃহীন হইয়া, নানা প্রতিকূল ঘটনার ভিতরেও আপনার অবস্থার উন্নতি করিতে পারিয়াছিলেন। তাঁহার অসাধারণ ক্ষমতা ছিল। সামান্য কষ্টে তাঁহাকে ভারতবর্ষে রাজ্য স্থাপন করিতে হয় নাই। একদিকে মুসলমান, অপর দিকে রাজপুত। এই দুই প্রবল শত্রুর সহিত তাঁহাকে যুঝিতে হইয়াছিল। মিবাররাজ সংগ্রামসিংহের প্রতাপে গুজরাট্ হইতে যমুনা পর্য্যন্ত সমস্ত দেশ তখন কাঁপিতেছিল। তিনি বিস্তর সৈন্য সামন্ত সংগ্রহ করিয়া বাবরের সহিত যুদ্ধে প্রবৃত্ত হইলেন। আগরার নিকট ফতেপুর সিক্রিতে দুই দলের সাক্ষাৎ হইল। প্রথম যুদ্ধে বাবর হারিয়া যান; তাহাতে তাঁহার সেনাগণ একেবারে হতাশ হইয়া পড়ে। এই সময় একজন গণক অসিয়া বলিল, বাবরের অদৃষ্টে মন্দ সময় উপস্থিত, তিনি যুদ্ধে জয়লাভ করিতে পারিবেন না। সেনাপতিরা পর্য্যন্ত এই সকল কথা শুনিয়া হতাশ্বাস হইল এবং অনেকে বাবরের দল ছাড়িয়া পলাইতে আরম্ভ করিল। বাবর বীর, জীবনে অনেক দুঃখ কষ্ট, অনেক বিপদের মুখ দেখিয়াছেন, তাঁহার প্রাণ কিছুতেই দমিল না। তিনি প্রতিজ্ঞা করিলেন, যদি যুদ্ধে জয়লাভ করেন, তাহা হইলে সুরা স্পর্শ করিবেন না এবং সেই দিন হইতে তাঁহার মস্তকের চুল ও দাড়ি আর কাটিবেন না; ধার্ম্মিকের ন্যায় জীবন কাটাইবেন এবং দরিদ্রদিগকে অনেক দান করিবেন। এই প্রতিজ্ঞা করিয়া বড় বড় সেনাপতিদিগকে ডাকিয়া বলিলেন,—“এতদিন বীরের মত যুদ্ধ করিয়া, কি বলিয়া আজ রণে ভঙ্গ দিবে? হয় জন্মলাভ না হয় রণক্ষেত্রে শয়ন; ইহা ভিন্ন আর অন্য উপায় নাই।” তাঁহার কথা সৈন্যগণ আবার উৎসাহিত হইয়া উঠিল। এইবারে যে যুদ্ধ হয়, তাহাতে সংগ্রামসিংহ একেবারে পরাজিত ও বাবর জয়যুক্ত হন। ইহার কিছুদিন পরেই সংগ্রামসিংহের মৃত্যু হয়। বাবর মোটে ৪ বৎসর ভারতবর্ষে রাজত্ব করেন; কিন্তু এই সময়ের মধ্যে বাঙ্গালাদেশের সীমা পর্যন্ত জয় করেন।

 হুমায়ুন—বাবরের মৃত্যুর পর হুমায়ুন দিল্লীর সম্রাট হন। কিন্তু হুমায়ুনের ভাগ্যে দিল্লীর সিংহাসন ভোগ করা অধিক দিন ঘটে নাই। সের খাঁ নামে চুনারের একজন আফগান বীর সমস্ত বিহার জয় করিয়া, বাঙ্গালা দেশ জয় করিবার উদ্যোগ করেন। হুমায়ুন তাড়াতাড়ি চুনারের দুর্গ আক্রমণ করিলেন, এবং অনেক কষ্টে তাহা অধিকার করিয়া বাঙ্গালার সের খাঁকে আক্রমণ করিতে গেলেন। সেখানে গিয়া দেখেন, সের খাঁ বাঙ্গালার রাজধানী গৌড় অধিকার করিয়া চুনারের দিকে ফিরিয়াছেন। হুমায়ুন গৌড় জয় করিয়া চুনারের কেল্লায় ফিরিবার পূর্ব্বেই মুঙ্গেরে সের খাঁর সহিত সাক্ষাৎ হয়। সে যুদ্ধে জয়লাভ করা দূরে থাক, আনক কষ্টে হুমায়ুন প্রাণ লইয়া পলাইলেন। তিনি আগরায় গিয়া সৈন্য সামন্ত সংগ্রহ করিয়া, কান্যকুব্জের নিকট সের খাঁর সহিত আবার যুদ্ধ করিতে আসিলেন। এবারেও হুমায়ুন হারিয়া গেলেন (১৫৪০ খ্রীঃ অঃ)। পাণে বাঁচিলেন বটে, কিন্তু ভারত সাম্রাজ্য হারাইলেন। ভাইদের নিকট আশ্রয় চাহিলেন, তাহাও পাইলেন না; অগত্যা সিন্ধুদেশে প্রস্থান করিলেন। পথে সিন্ধুদেশের মরুভূমি পার হইবার সময়, তাঁহার কষ্টের একশেষ হইয়াছিল। হুমায়ুনের যে কয়জন সঙ্গী ছিল, তাঁহাদের মধ্যে অনেকে পথে ক্ষুধা তৃষ্ণায় দারুণ যন্ত্রণায় প্রাণত্যাগ করে। তিনি রাজপুতদিগের নিকট সাহায্য চাহিয়াছিলেন, তাহাও পান নাই। অবশেষে অনেক কষ্টে অমরকোটের দুর্গে উপস্থিত হইয়া, এক হিন্দুরাজার আশ্রয় পাইলেন। এখানে তাঁহার ভুবনবিখ্যাত পুত্র আকবর ভূমিষ্ঠ হন। (১৫৪২ খৃঃ অঃ) হুমায়ুন কত কষ্টে যে আকবরের মাতা হামিদাকে লইয়া মরুভূমি পার হইয়াছিলেন, তাহার বর্ণনা হয় না। সেই ঘোর দুর্দ্দিনে পুত্ররত্নের মুখ দেখিয়া হুমায়ুন ঈশ্বরকে ধন্যবাদ করিলেন। দিল্লীর সম্রাট্ তখন এত দরিদ্র যে, সহচরদিগকে কিছু পুরস্কার দেন এমন সামর্থ্যও ছিল না। কাছে একটি মৃগনাভি ছিল, সেইটিকে ভাঙ্গিয়া বন্ধুদিগকে ভাগ করিয়া দিলেন, আর বলিলেন যে,—“ঈশ্বর করুন ইহার সুগন্ধের ন্যায় আমার পুত্রের যশঃসৌরভ পৃথিবীকে আচ্ছন্ন করুক।” ইতিহাস সাক্ষী, ঈশ্বর তাঁহার এই দুর্দ্দিনের প্রার্থনা পূর্ণ করিয়াছিলেন। হুমায়ুন সেখান হইতে পারস্যে যান। পথে তাঁহার ভ্রাতারা তাঁহার প্রতি অত্যন্ত শত্রুতা করে। পারস্যরাজের সহায়তায় সৈন্য-সামন্ত সংগ্রহ করিয়া, তিনি ভাইদিগকে পরাজিত করিয়া কাবুলের রাজা হন; এবং ১৫ বৎসর পরে আবার যুদ্ধ বিগ্রহ করিয়া দিল্লীর সিংহাসন ফিরিয়া পান (১৫৫৬ খৃঃ অঃ)। কিন্তু অচিরে সিঁড়ি হইতে পড়িয়া গিয়া, তাঁহার মৃত্যু হইল। হুমায়ুনের মৃত্যুতে চৌদ্দ বৎসরের বালক আকবর দিল্লীর সম্রাট্ হইলেন।

 সেরসা—হুমায়ুন যে পনর বৎসর নির্বাসিত হইয়াছিলেন, সেই কয় বৎসরে সূর্য্যবংশীয় পাঁচজন সম্রাট দিল্লীর সিংহাসনে বসেন। তাঁহাদের মধ্যে সের খাঁ অতি উপযুক্ত সম্রাট্ ছিলেন। তিনি প্রজাদের হিতার্থে অনেক ভাল কাজ করিয়াছিলেন।
আকবর।

 আকবর—হুমায়ুনের মৃত্যুর পর তাঁহার প্রধান সেনাপতি বৈরম খাঁ, বালক আকবরের রক্ষকরূপে সমুদায় রাজকার্য্য দেখিতেন। তাঁহাকে “খাঁ বাবা” বা সম্রাটের পিতা এই উপাধি দেওয়া হইয়াছিল। আকবরের রাজত্বের প্রথমে ইনিই সর্ব্বেসর্ব্বা ছিলেন। ইনি যথার্থ ই অতি ক্ষমতাশালী পুরুষ ছিলেন। হুমায়ূনের মৃত্যুর পর এইরূপ সুযোগ্য পুরুষের হাতে রাজকার্য্যের ভার না পড়িলে, আকবরের যে কি বিপদ ঘটিত, তাহা বলা যায় না। যদিও সেই অল্প বয়সে আকবর তাঁহার তেজস্বিতা ও সুবুদ্ধির যথেষ্ট পরিচয় দিয়াছিলেন, কিন্তু বৈরম খাঁ না থাকিলে, শত্রুপুরী মধ্যে সেই বালক কি করিয়া প্রাণ ও রাজ্য রক্ষা করিত? যথার্থই বৈরম খাঁ হুমায়ুনের নিঃস্বার্থ বন্ধু ছিলেন। তিনি আকবরকে প্রাণের মত ভালবাসিতেন ও পিতার মত রক্ষা করিতেন। আকবরও তাঁহাকে খুব ভক্তি করিতেন। বৈরমের দোর্দ্দণ্ড প্রতাপে রাজ্যের সকলে কাঁপিত। কেহ অপরাধ করিলে, তাহার আর নিস্তার ছিল না। তিনি আকবরের অতিশর হিতকারী হইলেও তাঁহার প্রকৃতি ও ব্যবহার এরূপ নিষ্ঠুর ও কর্কশ ছিল যে, তাহা সহ্য করা আকবরের পক্ষে ক্রমে অসম্ভব হইয়া উঠিল। হুমায়ুনের মৃত্যুর পরে পাঠান সেনাপতি হিমু আহত ও বন্দী হইয়া, যখন সন্মুখে আসিলেন, তখন বৈরম খাঁ মহা উৎসাহে বালক আকবরের হাতে তরবার দিয়া বলিলেন,—“এই বারে শত্রুর মুণ্ডপাত করিয়া, তোমার পদের গৌরব রক্ষা কর।” আকবর উত্তর করিলেন,—“বন্দী ও আহত শত্রুকে আঘাত করা আমার পক্ষে অগৌরব।” বৈরম অমনি মহা ক্রুদ্ধ হইয়া আকবরের সাক্ষাতেই এক আঘাতে তাহার মুণ্ডচ্ছেদ করিলেন। এই সকল ব্যবহার আকবরের নিকটে অসহ্য বোধ হইল। এই প্রকারে যখন যাহা ইচ্ছা হইত, বৈরম খাঁ তখন তাহাই করিতেন। ক্রমে আকবর যখন ১৮ বৎসরের হইলেন, তখন স্থির করিলেন, খাঁ বাবার অত্যাচার দমন করিতে হইবে; তাঁহার ক্ষমতা রোধ করিতে হইবে। এই ভাবিয়া খাঁ বাবার অনুপস্থিতিতে একদিন ঘোষণা করিলেন যে, তিনি স্বয়ং রাজকার্য্যের সকল ভার লইবেন, রাজ্যে তিনি ভিন্ন আর কাহারও আজ্ঞা গ্রাহ্য হইবে না। হঠাৎ আকবরের এই ভাব দেখিয়া বৈরম খাঁ স্তম্ভিত হইলেন; এবং আকবরের সন্তোষ লাভ করিবার জন্য বিশেষ চেষ্টা করিতে লাগিলেন। কিন্তু সে বিষয়ে কৃতকার্য্য না হইয়া, পরে বিদ্রোহী হইলেন; তখন আকবর তাঁহাকে পরাজিত করিলেন। অবশেষে আর অন্য কোন উপায় না দেখিয়া, বৈরম খাঁ আকবরের শরণাপন্ন হইলেন। বাল্যকাল হইতেই আকবরের হৃদয় অতি মহৎ ছিল। যখন বৈরম খাঁ চরণে ধরিয়া অপরাধ স্বীকার করিলেন, তখন তিনি তাঁহাকে তুলিয়া নিজের পার্শ্বে বসাইয়া অনেক সমাদর করিলেন; এবং বিস্তর অর্থ দিয়া তাঁহাকে মক্কা যাইতে পরামর্শ দিলেন। বৈরম খাঁ মক্কায় যাইবার পথে গুজরাটে শত্রু-হস্তে প্রাণ হারাইলেন। বৈরম খাঁর মৃত্যুতে আকবর রাজ্যমধ্যে সর্ব্বেসর্ব্বা হইলেন। কিন্তু তখনও তাঁহার রাজ্য ঘোর সঙ্কটে পূর্ণ। তিনি একে একে ভারতের এক প্রান্ত হইতে অপর প্রান্ত পর্যন্ত সমুদয় দেশ নিজের অধিকারে আনিলেন। গুজরাট, কাশ্মীর, বাঙ্গালা, বেহার ও উড়িষ্যা সমুদয় আকবরের অধীন হইল। তিনি প্রেম এবং শাসন উভয় উপায়ে শত্রু বশ করিতেন। তাঁহার প্রকৃতিতে বীরত্ব ও কোমলতা দুই সমান ভাবে ছিল। তিনি শত্রুদিগের প্রতি কখনও নিষ্ঠুরতা করেন নাই; শত্রুদিগকে দমন করিয়া ছাড়িয়া দিতেন। সমুদায় প্রজাদিগকে তিনি এক. চক্ষে দেখিতেন; হিন্দু মুসলমান ভেদ করিতেন না। যে রাজপুতদিগকে কেহ বশ করিতে পারে নাই, তিনি সেই রাজপুতদিগকে বন্ধুতার শৃঙ্খলে বাঁধিয়া শত্রুদিগকে পরম মিত্র করিয়া লইলেন। স্বয়ং দুইজন রাজপুত রমণীকে বিবাহ করেন এবং নিজ পুত্রকে রাজপুত কন্যার সহিত বিবাহ দেন। তোদারমল্ল, মানসিংহ প্রভৃতি রাজপুতগণ তাঁহার রাজ্যের স্তম্ভরূপ ছিলেন। ইহাদের শক্তিতে তাঁহার রাজ্যের শক্তি প্রচণ্ড হইয়া উঠিয়াছিল। তিনি জয়পুরের, যোধপুরের এবং প্রায় সকল রাজপুত রাজাকে বশ করিতে পারিয়াছিলেন; কেবল মেবারের রাণা প্রতাপসিংহকে বশ করিতে পারেন নাই। প্রতাপসিংহের পিতা উদয়সিংহ যখন মিবারের রাজা, তখন আকবর চিতোর ধ্বংশ করেন (১৫৬৮ অঃ)। কথিত আছে, উদয় সিংহ বড় কাপুরুষ ছিলেন। আকবর চিতোর আক্রমণ করিলেই তিনি দুর্গ ছাড়িয়া পলাইলেন; কিন্তু তথাপি চিতোরের বীরগণ নগর ছাড়িলেন না। জয়মল্ল নামে একজন মহাবীর চিতোর রক্ষা করিতে লাগিলেন। আকবর সহজে চিতোর অধিকার করিতে পারেন নাই। একদিন রাত্রে মশাল হস্তে জয়মল দুর্গের ভগ্ন স্থানগুলি মেরামত করাইতেছেন, এমন সময় অন্ধকারে দূর হইতে আকবর তাঁহাকে লক্ষ্য করিয়া গুলি করিলেন। জয়মল্ল তখনি পড়িলেন। চিতোরবাসিগণ নায়কবিহীন হইল। স্ত্রীলোকেরা চিতায় দেহ ভগ্ন করিল; পুরুষেরা শত্রুহস্তে প্রাণ দিল। তখন হইতে চিতোর জনহীন শ্মশান হইয়াছে। আকবরের নির্ম্মল যশে অন্যায়রূপে জয়মল্লকে হত্যা করা এক কলঙ্ক। চিতোর ধ্বংশ হইল বটে, কিন্তু মিবারের রাণা বশ হইলেন না। প্রতাপসিংহ ২৫ বৎসর ধরিয়া আকবরের সহিত যুদ্ধ করিলেন, তথাপি বশ্যতা স্বীকার করিলেন না। আকবর তাঁহার বীরত্ব দেখিয়া মোহিত হইয়া যুদ্ধ করিতে ক্ষান্ত হন।

 দাক্ষিণাত্য—সমুদায় আর্য্যাবর্ত্ত আকবরের বশ্যতা স্বীকার করিলে, আকবর দাক্ষিণাত্য জয়ের দিকে মন দিলেন; এবং এক সুযোগ উপস্থিত হইল। আহমদনগরের রাজাদিগের ঘরে ঘরে বিদ্বেষের আগুন জ্বলিয়া উঠিল। সুলতানের মৃত্যু হওয়াতে তিন চারি জন মিলিয়া সুলতান হইবার চেষ্টা করেন। তাঁহাদের মধ্যে একজন আকবরের সাহায্য ভিক্ষা করে। আকবর ত্বরায় স্বীয় পুত্র মোরাদকে আহমদনগরে যুদ্ধের জন্য পাঠাইলেন। আহমদনগরে বালক-সুলতানের পিতৃব্য-পত্নী চাঁদ বিবী নগর রক্ষা করিতেছিলেন। ভারত ইতিহাসে এই এক অসাধারণ রমণীর কথা আমরা পড়িয়াছি। ইহার দেশের প্রতি ভালবাসা, তেজস্বিতা ও অসাধারণ বুদ্ধির কথা শুনিলে অবাক্ হইতে হয়। আকবরের শত্রুদিগের মধ্যে এক মহাবীর ছিলেন প্রতাপসিংহ আর এই এক বীর-নারী চাঁদ বিবী। তিনি মোগলেরা আসিতেছে শুনিয়াই, বিজয়পুরের রাজা ও সকল বিরোধীদলকে ‘সাধারণ শত্রু দমনের জন্য মিলিত হইতে একান্ত অনুরোধ করেন। এক্ষণে তাঁহারা কিছু দিনের জন্য মিলিত হইলেন। মোগলেরা নগর জয়ের জন্য অশেষ চেষ্টা করিয়াও পারিল না। এক এক সময়ে আহমদনগরের সৈন্যেরা রণে ভঙ্গ দিয়া পলাইবার চেষ্টা করিত, তখন চাঁদ বিবি পুরুষের বেশে সম্মুখে আসিয়া তাহাদিগকে উৎসাহিত করিতেন; তাঁহার দৃঢ়তা ও সাহস দেখিয়া সৈন্যগণ বিপুল উৎসাহের সহিত যুদ্ধ করিতে থাকে। মোগলেরা অকৃতকার্য্য হইয়া কিছুদিনের জন্য রণে ক্ষান্ত দিল। কিন্তু চাঁদ বিবীর এত চেষ্টা বিফল হইল। বিদ্বেষ ও বিবাদের আগুন আবার জ্বলিয়া উঠিল। কাপুরুষেরা চাঁদ বিবীকে অন্তঃপুরে রাখিয়া হত্যা করিল। এবার আকবরের সৈন্যদিগের হস্তে আহমদনগর পরাজিত হইল। আকবর রাজধানী জয় করিলেন বটে, কিন্তু সমুদায় রাজ্য তাঁহার বশ্যতা স্বীকার করিল না। আকবর কেবল খান্দেস ও বেরার পাইলেন এবং পুত্র দানিয়ালকে সেই প্রদেশের শাসনকর্ত্তা নিযুক্ত করিলেন। আকবরের দাক্ষিণাত্য বিজয় এইখানে শেষ হইল।

 আকবরের শেষ দশায় তাঁহার জ্যেষ্ঠ পুত্র সেলিম বিদ্রোহী হইয়া তাঁহাকে অত্যন্ত কষ্ট দিয়াছিল। আকবর যখন দাক্ষিণাত্যে, তখন শুনিলেন সেলিম বিদ্রোহী হইয়া আপনাকে সম্রাট্ বলিয়া ঘোষণা। করিয়াছেন। এই সংবাদ শুনিয়া আকবর তাঁহাকে কত বুঝাইয়া মিষ্ট ভাষায় পত্র লিখিলেন; এবং তাঁহাকে বাঙ্গালা ও উড়িষ্যার সুবাদার নিযুক্ত করিলেন। আকবর আগরায় ফিরিলে, সেলিম তাঁহার সহিত সাক্ষাৎ করিতে আইসেন। আকবর মহা আদরে তাঁহাকে গ্রহণ করিলেন। আকবর পুত্রদিগকে অতিশয় ভাল বাসিতেন। সেলিম বার বার তাঁহার সহিত মন্দ ব্যবহার করিয়াছেন,তথাপি আকবর বার বার তাঁহাকে ক্ষমা করেন। সেলিম অতিরিক্ত সুরাপানে স্বাস্থ্য একেবারে নষ্ট করেন; আকবর মহা চিন্তিত হইয়া, দুইজন প্রধান চিকিৎসকের হস্তে তাঁহার তত্ত্বাবধানের ভার দেন। কিন্তু কিছুতেই তাঁহার মন্দ অভ্যাস ছাড়াইতে পারিলেন না। পুত্রদিগকে লইয়া আকবর সুখী হইতে পারেন নাই। কনিষ্ঠ পুত্র দানিয়াল ঐ কুঅভ্যাসেই ৩০ বৎসর বয়সের মধ্যে মারা যান। বৃদ্ধ বয়সে পুত্রশোক আকবরের বুকে শেলের মত বিধিল। তিনিও অচিরে মৃত্যু শয্যায় শুইলেন। পারিবারিক অশান্তিতে তাঁহার অন্তিম জীবন বিষময় হইয়া উঠিয়াছিল। সেলিম নিজের জ্যেষ্ঠ পুত্র খুরমের সহিত এমন বিবাদ করেন যে, তাহাতে আকবর পর্যন্ত ব্যতিব্যস্ত হইয়া পড়েন। আকবর মৃত্যুশয্যায় শয়ান, তখন পর্যন্ত সেলিম পুত্রের ভয়ে পিতার সহিত সাক্ষাৎ করিতে যাইতেন না। আকবর সেলিমকে ডাকিয়া বলিলেন যে, তিনি ভিন্ন আর কেহ তাঁহার উত্তরাধিকারী হইবে না। আকবর শেষ মুহূর্ত্তে আমীরদিগকে নিকটে ডাকিয়া সেলিমের প্রতি বিশ্বস্ত হইতে অনুরোধ করিলেন এবং সকলের নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করিলেন। অপরাধী সেলিম তখন পিতার চরণে পড়িয়া হাহাকার করিয়া কাঁদিতে লাগিলেন। আকবর তাঁহাকে নিজের তরবারি দেখাইয়া তাহা লইতে আদেশ করিলেন ও বলিলেন,—“তুমি সম্রাট্ হইয়া পুরাতন ভৃত্যদিগকে ভুলিও না, এবং অন্তঃপুরবাসিনী রমণীদিগের প্রতি যথাসাধ্য সদ্ব্যবহার করিও।” তার পর ঈশ্বরের নাম স্মরণ করিয়া চিরদিনের মত চক্ষু মুদ্রিত করিলেন (১৬০৫ খৃঃ অঃ)।

আকবরের মত মহৎ লোক আর কেহ কখন ভারতবর্ষে রাজত্ব করেন নাই। তিনি ক্ষণজন্মা পুরুষ ছিলেন। কোমলতা ও বীরত্বেরএমন অপূর্ব্ব মিলন মানুষের চরিত্রে বড়ই কম দেখিতে পাওয়া যায়। তাঁহার প্রকৃতি এমন মধুর ছিল যে, যে তাঁহার নিকটে আসিত, সেই মোহিত হইত। তাঁহার আকৃতিও তেমনি সুগঠিত ও সুন্দর ছিল। আকবরের শরীরে আশ্চর্য্য বল ছিল। তিনি অসাধারণ পরিশ্রম করিতে পারিতেন। পণ্ডিত ও সাধুদিগকে আকবর বড়ই ভাল বাসিতেন। তিনি হিন্দুদিগকে যেমন ভাল বাসিতেন, তাঁহাদের ভাষাও তাঁহার তেমনি আদরের জিনিস ছিল। মহাভারত, রামায়ণ প্রভৃতি অনেক সংস্কৃত গ্রন্থ তিনি পারসী ভাষায় অনুবাদ করান। ধর্ম্ম সম্বন্ধে তাঁহার আশ্চর্য্য উদারতা ছিল। তিনি নিজে এক নূতন ধর্ম্মের প্রতিষ্ঠা করে; কিন্তু সে ধর্ম্ম তাঁহার মৃত্যুর পরেই উঠিরা যায়। হিন্দুদিগের অনেক কুসংস্কার দূর করিতে তিনি বিশেষ চেষ্টা করেন। সহমরণ নিষেধ করেন; বিধবাবিবাহ প্রচলিত করিবার চেষ্টা করেন; এবং বালিকাবিবাহ প্রতিরোধ করেন। আকবরের সভায় হিন্দু, মুসলমান, জৈন, খৃষ্টান প্রভৃতি ধর্ম্মাবলম্বীদিগের ধর্ম্ম সম্বন্ধে তর্ক বিতর্ক হইত; তাহা আকবর মহা কৌতুকের সহিত শুনিতেন। তিনি অনেক সময়ে সমস্ত রাত্রি জাগিয়া নানা শাস্ত্রের আলোচনা করিতেন। গীত বাদ্যেও আকবরের বড় অনুরাগ ছিল। তাঁহার সভায় তানসেন নামক বিখ্যাত গায়ক ছিলেন; আকবর তাঁহাকে অতিশয় সমাদর করিতেন। পারসী কবি আবুল ফজল ও তাঁহার ভাই আকবরের অতি প্রিয়পাত্র ছিলেন। ইহাদের দুজনের যদিও মুসলমান-ধর্ম্মের প্রতি বিশেষ অনুরাগ ছিল না, কিন্তু ইহারা অতি সৎলোক ছিলেন। সেলিম চক্রান্ত করিয়া আবুল ফজলকে হত্যা করেন। আবুল ফজলের মৃত্যু সংবাদ শুনিয়া আকবর শোকে আকুল হন; এবং দুইদিন দুই রাত্রি আহার নিদ্রা পরিত্যাগ করিয়া অবিশ্রান্ত রোদন করেন। আবুল ফজলের ভ্রাতা ফরজীর মৃত্যু সময়ে গভীর রাত্রে শুনিলেন যে, তাঁহার শেষ সময় উপস্থিত। তৎক্ষণাং চিকিৎসক লইয়া তাঁহাকে দেখিতে ছুটিলেন; গিয়া দেখেন, তাঁহার জ্ঞান নাই, চক্ষু মুদ্রিত করিয়া আছেন। সে দৃশ্য দেখিরা আকবরের চক্ষে জল আসিল; তিনি শোকে গদগদকণ্ঠে বলিলেন,—“সেখজি, চাহিয়া দেখ, চিকিৎসক আনিয়াছি; সেখজি, একবার আনার সঙ্গে কথা কও।” কিন্তু সেখজী আর চক্ষু মেলিলেন না। তখন আকবর মুকুট মাটিতে ছুড়িয়া ফেলিলেন ও “হায় কি হইল!” বলিয়া কাঁদিয়া উঠিলেন। আকবর এমনি সদাশর পুরুষ ছিলেন।


জাহাঙ্গীর।
 জাহাঙ্গীর—আকবরের মৃত্যুর পর তাঁহার পুত্র সেলিম জাহাঙ্গীর উপাধি লইয়া দিল্লীর সম্রাট হইলেন। জাহাঙ্গীর সম্রাট হইবার পরেই, তাঁহার পুত্র খুসরু বিদ্রোহী হইয়া লাহোর আক্রমণ করেন। জাহাঙ্গীর শীঘ্রই তাঁহাকে বন্দী করিলেন, এবং তাঁহার সঙ্গী ৭০০ জনকে তাঁহার সন্মুখে অতি নিষ্ঠুর ভাবে হত্যা করিলেন। তখন হইতে খুসরু
নুরজাহান।
আজীবন বন্দী ভাবে দিন কাটান। আকবরের ন্যায় পিতার সঙ্গে জাহাঙ্গীর কিরূপ আচরণ করিয়াছিলেন, তাহা পূর্ব্বেই বলিয়াছি; কিন্তু নিজের বিদ্রোহী পুত্ত্রের প্রতি তিনি অতি নিষ্ঠুর আচরণ করেন। জাহাঙ্গীরের রাজত্বে তাঁহার সম্রাজ্ঞী নুরজাহানই সর্ব্বময়ী কর্ত্রী ছিলেন। ইহার জীবনের কাহিনী অতি আশ্চর্য্য।

 নুরজাহান পার দেশীয় কোন কর্মচারীর পৌত্রী ছিলেন। দুর্দৈব বশতঃ তাঁহার পিতা অতিশয় দুরবস্থায় পড়িয়া, দেশ ছাড়িয়া ভারতবর্ষে আইসেন। সঙ্গে তাঁহার স্ত্রী ও দুই পুত্র ছিল। পারস্য হইতে আসিতে পথে স্ত্রী পুত্র লইয়া অর্থাভাবে অত্যন্ত কষ্টে পড়েন। সেই অবস্থায় কান্দাহারে তাঁহার একটি কন্যা হইল। তখন তাঁহাদের এমন দুরবস্থা ও তাঁহার স্ত্রীর শরীর এত দুর্ব্বল যে, কন্যাটিকে লইয়া তাঁহারা আর চলিতে পারিলেন না; অগত্যা সেই সম্মোজাতা কন্যাটিকে পথে ফেলিয়া যান। পরদিন একজন বণিক্‌ সেই পথে যাইতেছিলেন, তিনি বৃক্ষতলে অসহায় অবস্থায় সেই শিশুটিকে দেখিয়া অত্যন্ত কৃপাপরবশ হইলেন। বিশেষতঃ মেয়েটির সুন্দর রূপ দেখিয়া, তাহার প্রতি তাঁহার মন বড় আক্বষ্ট হইল। মেয়েটিকে পালন করিবার জন্য তিনি একটি ধাত্রী খুঁজিতে লাগিলেন, এবং কিছু দূর যাইতে না যাইতে, সেই কন্যার মাতাকে ধাত্রীরূপে পাইলেন। এই কন্যাই জগদ্বিখ্যাত নুরজাহান। তখন হইতেই নুরজাহানের মাতা, পিতা ও ভ্রাতা সকলেই সেই বণিকের আশ্রয় পাইলেন এবং ইহারই সাহায্যে আকবরের রাজসভায় নুরজাহানের পিতা ও ভ্রাতা কাজ পাইলেন। সেই সময়ে নুরজাহান সর্ব্বদা মাতার সঙ্গে আকবরের অন্তঃপুরে যাইতেন। সেখানে সেলিম তাঁহাকে দেখিয়া মোহিত হন। নুরজাহানের মা সেলিমের কথা আকবরকে বলিলেন। আকবর শুনিয়া পুত্রকে তিরস্কার করেন এবং নুরজাহানকে সের আফগান নামক একজন যুবা পুরুষের সহিত বিবাহ দিয়া, বাঙ্গালায় পাঠাইয়া দেন। সেলিম কিন্তু কিছুতেই নুরজাহানকে ভুলিতে পারিলেন না। সম্রাট্ হইয়াই বাঙ্গালার নবাবকে বলিলেন, যে কোন প্রকারেই হউক নুরজাহানকে চাই। সের আফগানের নিকট সম্রাটের ইচ্ছা বলিবামাত্র তিনি সিংহের মত লাফাইয়া উঠিলেন ও যে ব্যক্তি এমন কথা মুখে আনিয়াছিল, তাহার বুকে তৎক্ষণাৎ ছোরা বসাইয়া দিলেন এবং নিজেও সেইখানে আহত হন। নুরজাহানের একটি কন্যা ছিল, তাহাকে লইয়া তিনি দিল্লীতে বন্দী হইয়া আসেন এবং কিছুদিন পরে তিনি জাহাঙ্গীরের সম্রাজ্ঞী হইলেন। নুরজাহান যেমন সুন্দরী, তেমনি অসাধারণ বুদ্ধিমতী ছিলেন। সম্রাটকে একেবারে নিজের হাতের পুতুল করিয়া লইলেন। জাহাঙ্গীরের রাজত্ব নুরজাহানের রাজত্ব বলিলেই হয়। নুরজাহানের হাতে পড়িয়া জাহাঙ্গীরের কিছু কিছু মঙ্গল হইয়াছিল সত্য, কিন্তু নুরজাহানের চক্রান্তে রাজ্যে ঘোর অশান্তির আগুন জ্বলিয়া উঠিল। নুরজাহানের কন্যার সহিত জাহাঙ্গীরের পুত্র সহরিয়ারের বিবাহ হয়, সেই অবধি নুরজাহান তাঁহাকে সিংহাসনে বসাইবার চেষ্টা করেন। ইহাতে জাহাঙ্গীরের অন্য পুত্র খুরম বিদ্রোহী হন। নুরজাহানের চক্রান্তে রাজ্যের প্রধান আমীর মহাবত খাঁ পর্য্যন্ত বিদ্রোহী হইয়া সম্রাটকে বন্দী করেন। তখন নুরজাহান মহা বিপদে পড়িলেন। প্রথমে যুদ্ধ করিয়া সম্রাটকে উদ্ধার করিবার চেষ্টা করেন, তাহা না পারিয়া নানা ছলে ও কৌশলে সম্রাট্‌কে উদ্ধার করিলেন। নুরজাহানের বুদ্ধির কাছে সকলের চাতুরী হার মানিল।

 জাহাঙ্গীরের রাজত্ব সময়ে ইংলণ্ডের রাজার নিকট হইতে স্যার টমাস রো নামে একজন দূত ভারতবর্ষে আইসেন। তিনি সম্রাটের সভার জাঁকজমক দেখিয়া অবাক্ হন; কিন্তু রাজ্যে তেমন শৃঙ্খলা ও সুবন্দোবস্ত দেখিতে পান নাই। জাহাঙ্গীর ঘোর সুরাপায়ী ও অতি নিষ্ঠুর প্রকৃতির লোক ছিলেন। তিনি সাধ্যমত রাজকার্য্য দেখিবার চেষ্টা করিতেন বটে, কিন্তু ক্ষমতার অভাবে পারিয়া উঠিতেন না।

 সাজাহান—জাহাঙ্গীরের জীবদ্দশাতেই তাঁহার প্রথম দুই পুত্রের মৃত্যু হয়, সেই জন্য তাঁহার মৃত্যুর পর খুরম সাজাহান উপাধি গ্রহণ করিয়া দিল্লীর সম্রাট্ হন। সাজাহান সম্রাট্ হইয়াই সহরিয়রকে হত্যা করিলেন। সাজাহানের রাজত্ব বেশ শান্তিময় ছিল, তবে প্রথম প্রথম দাক্ষিণাত্যে কিছু যুদ্ধ বিগ্রহ হয়। তাঁহার প্রধান সেনাপতি খাঁ জাহান লোদী বিদ্রোহী হইয়া, আহমদনগরের শত্রুদের সহিত মিলিত হন। প্রায় দশ বৎসরের যুদ্ধের পর আহমদনগরের বিদ্রোহের শান্তি হয়। তখন হইতে আহমদনগর দিল্লীর অধীন হয় (১৬৩৬ খৃষ্টাব্দে)। বিজয়পুর ও গোলকুণ্ডা রাজ্য জয় করিবার জন্য সাজাহান আওরঙ্গজেবকে দাক্ষিণাত্যে পাঠান। কিন্তু আওরঙ্গজেব পিতার অসুখের কথা শুনিয়া যুদ্ধ না করিয়াই উত্তরে ফিরিয়া আসেন। সাজাহান কান্দাহারের দিকে পৈতৃক রাজ্য ফিরিয়া পাইবার জন্য অনেক চেষ্টা করেন, কিন্তু কিছুতেই না পারিয়া ছাড়িয়া দেন।
সাজাহান।

 সাজাহানের চারিটি পুত্র ছিল—দারা, সুজা, আওরঙ্গজেব ও মোরাদ। দারার প্রকৃতি সকলের অপেক্ষা ভাল ছিল। তিনি আকবরের প্রচারিত ধর্ম্মে বিশ্বাস করিতেন এবং অনেক বিষয়ে আকবরের মত ছিলেন। সাজাহান দারাকে বড় ভালবাসিতেন এবং সকল কাজেই দারা পিতার সহায় ছিলেন। সাজাহান বিলাসী এবং কিছু অলস ছিলেন, কাজেই দারার হস্তে সকল কাজের ভার ছিল। সাজাহানের হঠাৎ একবার কঠিন পীড়া হয়, তাঁহার বাঁচিবার আশা ছিল না, সেই সময়ে দারাই কাছে ছিলেন। পুত্রেরা যখন শুনিল, পিতার বাঁচিবার আশা নাই, তখন সকলে সিংহাসন লইবার জন্য ছুটিয়া আসিল। আওরঙ্গজেব অতিশয় ধূর্ত্ত ও কপট ছিলেন। তিনি মোরাদকে লিখিয়া পাঠাইলেন,— “ভাই, আমার একান্ত ইচ্ছা তুমি বাদসাহ হও; দারা বিধর্ম্মী, তিনি সম্রাট্ হইলে মুসলমান ধর্ম্ম এদেশ হইতে উঠিয়া যাইবে; আমার সংসারে মন নাই; আমি ফকির হইয়া মক্কায় যাইব।” মূর্খ মোরাদ আওরঙ্গজেবের কপটতা বুঝিল না; সৈন্য সামন্ত লইয়া আওরঙ্গজেবের সহিত যোগ দিল। ওদিকে বাঙ্গালাদেশ হইতে সুজাও দারার সহিত যুদ্ধ করিবার জন্য আসিলেন। দারা, মোরাদ ও আওরঙ্গজেবের নিকট হারিয়া প্রথমে লাহোরে ও পরে গুজরাটে পলায়ন করেন। সেখান হইতে সৈন্য সংগ্রহ করিয়া আবার আওরঙ্গজেবের সহিত যুদ্ধ করেন বটে, কিন্তু আবার পরাজিত হন। সিন্ধুদেশে পলায়ন কালে এক ব্যক্তি তাঁহাকে আওরঙ্গজেবের হাতে ধরাইয়া দেন। আওরঙ্গজেব দারাকে বিধর্ম্মী বলিয়া হত্যা করেন। সুজাও আওরঙ্গজেবের সহিত যুদ্ধে পরাজিত হইয়া পলায়ন করেন। নির্ব্বোধ মোরাদ অচিরে আওরঙ্গজেবের হস্তে প্রাণ হারান। আওরঙ্গজেব এই প্রকারে ভ্রাতাদিগকে হত্যা করিয়া পিতাকে বন্দী করেন। বন্দী হইয়া সাজাহান সাত বৎসর জীবিত ছিলেন।

 সাজাহানের সময়ে দিল্লীর সাম্রাজ্যের ঐশ্বর্য্যের সীমা পরিসীমা ছিল না। রাজ্যের চারিদিকে শান্তি, শৃঙ্খলা ও সুবন্দোবস্ত ছিল। সাজাহান দিল্লীতে বিখ্যাত জুম্মা মস্‌জীদ, দেওয়ান খাস, মতি মস্‌জীদ, আগরায়
তাজমহল।
তাজমহল, লাহোরে সালেমার বাগান, ময়ূর-সিংহাসন প্রভৃতি করিয়া কারুকার্য্যে সুরুচির পরিচয় দিয়াছিলেন। তাজমহলের নাম সকলেই শুনিয়াছ, তাহা সাজাহানের মহিষী মমতাজের সমাধি; ইহা নির্ম্মাণ করিতে সাজাহান দেশ দেশান্তর হইতে বিখ্যাত শিল্পীগণকে আনিয়াছিলেন। তাজমহল পৃথিবীতে অদ্বিতীয়। এই সকল করিতে সাজাহানের অগাধ টাকা ব্যয় হইয়াছে, অথচ ভাণ্ডার ধনে পূর্ণ ছিল; এবং প্রজারাও করভাবে নিপীড়িত হয় নাই। সাজাহানের সুবন্দোবস্তের গুণে এরূপ হইয়াছিল।

 আওরঙ্গজেব—আওরঙ্গজেবের সময় হইতে মোগল সাম্রাজ্যের পতন আরম্ভ হইল। আওরঙ্গজেবের মত পরিশ্রমী, মিতাচারী ও শক্তিশালী ব্যক্তির হাতে কি করিয়া রাজ্যের অবনতি হইতে পারে, শুনিতে আশ্চর্য্য বটে; কিন্তু তাঁহার খল প্রকৃতি ও বিবেচনার অভাবে রাজ্যের মহা অনিষ্ট হইরাছিল। আগেই বলিয়াছি, আওরঙ্গজেব বড় কপট ছিলেন; শুধু যে কপট ছিলেন তাহা নহে, তিনি নিজের মত সকলকেই ভাবিতেন, কাহাকেও বিশ্বাস করিতেন না। মিরজুমলা নামে তাঁহার একজন পরাক্রান্ত সেনাপতি ছিলেন, তাঁহার ভয়ে আওরঙ্গজেবের প্রাণে শান্তি ছিল না। সম্রাট্ তাঁহাকে বাঙ্গালার সুবাদার করিয়া পাঠান। মিরজুমলাই প্রথমে আসাম জয় করেন; কিন্তু তাহা রাখিতে পারেন নাই। আসামে থাকিতে থাকিতে ওলাউঠা রোগে তাঁহার প্রায় সমুদায় সৈন্য মরিয়া গেল; তখন আসামের রাজা তাঁহার প্রতি ঘোর অত্যাচার আরম্ভ করিলেন। তিনি কোন প্রকারে ঢাকার পলাইয়া আসেন এবং সেখানে আসিয়াই তাঁহার মৃত্যু হয়। মিরজুমলার মৃত্যুতে আওরঙ্গজেব হাঁপ ছাড়িয়া বাঁচিলেন। আওরঙ্গজেবের আর এক দুর্ব্বদ্ধি জোটে। তিনি গোঁড়া মুসলমান ছিলেন, কাজেই হিন্দুদিগের উপর অত্যাচার করিতে আরম্ভ করেন, এবং ইহাই তাঁহার সর্ব্বনাশের মূল হইল। হিন্দুদিগের উপর আগে যে জিজিয়া কর ছিল, আকবর তাহা উঠাইয়া দেন; কিন্তু আওরঙ্গজেব আবার তাহা প্রচলিত করেন। ইহাতে রাজ্যের একদিক্ হইতে আর একদিক্ পর্য্যন্ত হিন্দু প্রজারা মহা বিরক্ত হইয়া উঠিল। রাজপুতেরাও বিদ্রোহী হইল; যে রাজপুতেরা আকবর ও তাঁহার পুত্র পৌত্রের রাজ্যের প্রধান বল ছিল, তাহারা এখন আওরঙ্গজেবের শত্রু হইয়া দাড়াইল; ওদিকে দাক্ষিণাত্যে মহারাষ্ট্রীয়েরা শিবাজীর অধীনে নূতন তেজে মাথা তুলিয়া উঠিল। মহারাষ্ট্র দেশে শিবাজী স্বাধীন রাজ্য স্থাপন করেন। আওরঙ্গজেব তাঁহার সহিত সন্ধি করিতে বাধ্য হন। সন্ধি হইলে শিবাজী দিল্লীতে আওরঙ্গজেবের সহিত সাক্ষাৎ করিতে আসেন। সেখানে আওরঙ্গজেব শিবাজীকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য ও এত অনাদর করেন যে, তিনি বিরক্ত হইয়া রাজসভা হইতে চলিয়া যান। তখন আওরঙ্গজেব তাঁহাকে এমন পাহারা দিতে আরম্ভ করেন যে, শিবাজী দিল্লীতে একপ্রকার বন্দী হইয়া রহিলেন। কি বা ধূর্ত্ত আওরঙ্গজেব, ততোধিক ধূর্ত্ত শিবাজী। একদিন পূর্ণিমায় শিবাজী ব্রাহ্মণদিগকে ভারে ভারে মিষ্টান্ন বিলাইতে আরম্ভ করিলেন এবং সেই সুযোগে এক ঝাঁকায় মিষ্টান্নের নীচে, লুকাইয়া দিল্লী হইতে পলায়ন করিলেন; সেই দিন হইতে শিবাজী আওরঙ্গজেবের ঘোর শত্রু হইলেন। যদি কেহ ভবিষ্যৎ দেখিতে পাইত, তাহা হইলে দেখিত, আওরঙ্গজেব কিরূপে সে দিন নিজের হস্তে রাজ্য ধ্বংসের বীজ রোপণ করিলেন।

 আওরঙ্গজেব অনেক বৎসর ধরিয়া যুদ্ধ করিয়া, গোলকুণ্ডা ও বিজয়পুর জয় করিলেন বটে, কিন্তু মহারাষ্ট্রীয়েরা তাঁহাকে ব্যতিব্যস্ত করিয়া তুলিল। তাহার। সুবিধা পাইলেই মুসলমান সৈন্যদিগকে যৎপরোনাস্তি কষ্ট দিত। অনেক দিন যুদ্ধ করিয়া আওরঙ্গজেবের সৈন্যেরাও বড় ক্লান্ত হইয়া পড়িয়াছিল। এই সময় সুযোগ বশতঃ আওরঙ্গজেব শিবাজীর পুত্র সান্তাজীকে বন্দী করেন। আওরঙ্গজেব সান্তাজীকে মুসলমান হইতে বলায়, তিনি এমন ঘৃণা ও তাচ্ছিল্যের ভাবে উত্তর দেন যে, আওরঙ্গজেব তৎক্ষণাৎ তাঁহাকে হত্যা করেন। দাক্ষিণাত্যে থাকিতে থাকিতেই আওরঙ্গজেবের মৃত্যু হয়।

 ইতিহাসে আওরঙ্গজেবের সময় হইতে মোগল সাম্রাজ্যের পতনের সময় বলা হইয়াছে; কিন্তু তাহা বলিয়া পাঠক পাঠিকাগণ ভাবিও না যে, আওরঙ্গজেব কাপুরুষ বা দুর্ব্বল ব্যক্তি ছিলেন। তাঁহার খুব সাহস, খুব দৃঢ়তা ছিল; ঘোর বিপদেও তিনি ভয় পাইতেন না। এ সম্বন্ধে তিনি পিতা ও পিতামহ অপেক্ষা উচ্চ ছিলেন। আওরঙ্গজেবের এত যোগ্যতা ও এত বুদ্ধি থাকিয়াই বা কি হইল। তাঁহার কপটতা, ধূর্ত্ততা ও নিষ্ঠুরতা তাঁহার সর্ব্বনাশ করিল, মিত্রকেও শত্রু করিল। আর আকবরের উদারতা, সরলতা, সততা, সৌজন্য ও দয়া ঘোর শত্রুকেও পরম মিত্র করিয়া লইয়াছিল। ভাব দেখি, স্বার্থসাধন করিতে হইলেও কোন্ উপায় শ্রেষ্ঠ।