বিষয়বস্তুতে চলুন

ভারতবর্ষের ইতিহাস (হেমলতা দেবী)/উপসংহার

উইকিসংকলন থেকে

উপসংহার।

 সুকুমারমতি পাঠক পাঠিকাগণ! ভারতবর্ষের ইতিহাস শেষ হইল। আমাদের এই দেশের উপর দিয়া কত ঘটনার স্রোত বহিয়া গিয়াছে, তোমরা তাহার বিবরণ কিছু কিছু শুনিলে।

 মুসলমান অধীনতায় ভারতবাসীরা অনেক অত্যাচার, অনেক নির্য্যাতন সহ্য করিতেন সত্য; কিন্তু রাজারা হিন্দুদিগকে অবজ্ঞার চক্ষে কখনই দেখিতেন না। মুসলমান অধীনতার ভারতবাসীদিগের বিশেষ কোন উন্নতি হয় নাই। বরং জাতীয় জীবন ম্লান হইয়া পড়িয়াছিল। সেই ঘোর অবসন্নতার দিনে মারাঠা এবং শিখগণ নূতন শক্তিতে জাগিয়া উঠিলেও, তাহাতে এ দেশের কল্যাণ হয় নাই। তাহার পর কিরূপে বাণিজ্য করিতে আসিয়া ইংরেজেরা ক্রমে আমাদের দেশের রাজা হইলেন, তাহাও তোমরা শুনিয়াছ। আজ প্রায় তিন শত বৎসর হইতে চলিল, ইংরেজেরা বাণিজ্যের জন্য এ দেশে পদার্পণ করেন, এবং প্রায় দেড় শত বৎসর পর্যন্ত তাহারা রাজ্য বিস্তারের চেষ্টা না করিয়া, বাণিজ্যের উন্নতির চেষ্টা করিয়াছিলেন। তখন ভারতে শক্তি-সংগ্রাম চলিতেছিল। মারাঠা, শিখ, নূতন মুসলমান রাজারা, প্রত্যেকেই জয়যুক্ত হইবার জন্য প্রাণপণে চেষ্টা করিতেছিলেন। ইংরেজ এবং ফরাসীরা প্রথমে কেবল আত্মরক্ষা করিবার চেষ্টা, করিয়া, শেষে এই প্রতিদ্বন্দীতায় যোগ দিয়াছিলেন। কিন্তু যে সর্ব্বাপেক্ষা উপযুক্ত হয়, জয় তাহারই। ভারতে ইংরেজেরা সে কথার জীবন্ত সাক্ষ্য দিতেছেন। বর্ত্তমান সময় পৃথিবীতে ইংরেজদিগের মত শ্রেষ্ঠ জাতি বোধ হয় আর নাই। ভারতের ঘোর দুর্দ্দিনে ভারতবাসীরা এই উন্নত শক্তিশালী জাতির আশ্রয় লাভ করিয়া রক্ষা পাইয়াছে। বহুদিনের পরাধীনতার ভারতবাসীরা এতই দুর্ব্বল হইয়া পড়িয়াছে যে, অন্য কোন প্রবল শক্তির আশ্রয় ভিন্ন আর গতি নাই। তাই বলিতেছি, শুভক্ষণেই ইংরেজেরা এদেশে আসিয়াছিলেন। ভারত ব্যাপিয়া যে অরাজকতা, যে অত্যাচার ছিল, আজ তাহার পরিবর্ত্তে দেখ, ভারতময় কেমন শান্তি, কেমন শৃঙ্খলা, কেমন সৌন্দর্য্য বিরাজ করিতেছে। মধ্য ভারতে যেখানে ঘোর অরণ্য ছিল, আজ দেখ, সেখানে সুন্দর শ্যামল শস্যক্ষেত্র; জনহীন পল্লীগ্রাম সকল দেখ, এখন ধনে জনে পূর্ণ সহর হইয়াছে; পূর্ব্বে লোকে জীবনের আশা ত্যাগ করিয়া বিদেশ যাত্রা করিত, পথে কত দস্যু, কত বিপদ্; আজ রেলগাড়ীতে উঠিয়া নিরাপদে, আনন্দে, আরামে, ছয় মাসের পথ লোকে ছয়দিনে যাইতেছে! বিপদে পড়িলে দূরদেশে প্রিয়জনদিগের নিকট এক দণ্ডের মধ্যেই সংবাদ পাঠাইতেছে। দুএক পয়সা দিলেই ভারতের অপর প্রান্তে তোমার পত্রাদি যাইতেছে। দেখ, গ্রামে গ্রামে, পল্লীতে পল্লীতে কত বিদ্যালয়, কত পাঠশালা! ভারতবাসীগণ বিজ্ঞানের আলোক পাইয়া ধন্য হইয়াছে। পূর্ব্বে লোকেরা ধন প্রাণ লইয়া, নিরাপদে বাস করিতে পারিত না; সবলেরা নিয়ত দুর্ব্বলের উপর অত্যাচার করিত; আমাদিগের বর্ত্তমান রাজাদিগের কৃপায় সর্ব্বত্রই দুষ্টের শাসন ও আত্যাচারের প্রতীকার হইতেছে। ইংরেজ রাজত্বে ভারতবাসীরা আরও কত উপকার লাভ করিয়াছে। এ সকলের জন্য আমরা ঈশ্বরকে ধন্যবাদ করিয়া গ্রন্থের উপসংহার করি।