ভারতবর্ষের ইতিহাস (হেমলতা দেবী)/একাদশ পরিচ্ছেদ
একাদশ পরিচ্ছেদ।
পেশওয়া।
| বালাজী বিশ্বনাথ ভট্ট | |||||||||||||||||||||||||||||||||||||
| · | |||||||||||||||||||||||||||||||||||||
| · | |||||||||||||||||||||||||||||||||||||
| বাজীরাও | |||||||||||||||||||||||||||||||||||||
| · | |||||||||||||||||||||||||||||||||||||
| · | |||||||||||||||||||||||||||||||||||||
| বালাজী বাজীরাও | রঘুনাথ রাও বা রাঘোবা | ||||||||||||||||||||||||||||||||||||
| · | |||||||||||||||||||||||||||||||||||||
| · | |||||||||||||||||||||||||||||||||||||
| মাধবরাও | নারায়ণ রাও | অমৃতরাও (পোষ্যপুত্ত্র) | ২য় বাজীরাও | ||||||||||||||||||||||||||||||||||
| · | |||||||||||||||||||||||||||||||||||||
| · | |||||||||||||||||||||||||||||||||||||
| মাধবরাও নারায়ণ | নানাসাহেব রাও (পোষ্যপুত্ত্র) | ||||||||||||||||||||||||||||||||||||
| · | |||||||||||||||||||||||||||||||||||||
বাজীরাও—(১৭২০—১৭৪০ খৃঃ অঃ) বালাজী বিশ্বনাথ ভট্ট পেশওয়াদিগের আদি পুরুষ। ইনি জাতিতে ব্রাহ্মণ এবং রাজকার্য্য চালনা বিষয়ে বেশ পটু ছিলেন। কিন্তু মারাঠাদিগের মধ্যে তাঁহার পুত্র বাজীরাও ইতিহাসে বিশেষ প্রসিদ্ধ। শিবাজী মারাঠাজাতিকে নবশক্তি দান করেন এবং ইনি সেই শক্তিকে ভারতের চারিদিকে প্রধান শক্তি করিয়া তুলেন। বাজীরাও একজন অসাধারণ পুরুষ ছিলেন, তাহাতে সন্দেহ নাই। তাঁহার আকৃতি যেমন সুন্দর ব্যবহারও সেইরূপ মধুর ছিল। তাঁহার বিনীত আচরণ ও মিষ্ট কথায় সকলেই মুগ্ধ হইত। বাজীরাও যেমন বুদ্ধিমান্ তেমনই বীর ও যুদ্ধপটু ছিলেন। রাজকার্য্য চালনা বিষয়েও তাঁহার বিশেষ ক্ষমতা ছিল। স্বদেশে বিদেশে তাঁহার অনেক শত্রু ছিল। কিন্তু শক্তিতে কেহ তাঁহার সমকক্ষ ছিল না। হায়দারাবাদের নিজাম তাঁহার ঘোর শত্রু ছিলেন এবং রাজা শাহু যে তাঁহার প্রতি সকল সমর প্রসন্ন ছিলেন, তাহা নহে। কিন্তু বাজীরাও আশ্চর্য্য কার্য্যকরী শক্তি ও অদ্ভূত বীরত্ব দেখিয়া, রাজা পর্য্যন্ত তাঁহার বিরুদ্ধে মুখ ফুটিতে পারিতেন না। নিজাম পদে পদে বাজীরাওকে পরাজিত করিতে চেষ্টা করিয়াও নিজেই বার বার পরাজিত হন; অবশেষে বাজীরাওর প্রাধান্য স্বীকার করিতে বাধ্য হন। বাজীরাওর সময় ভারতবর্ষের ইতিহাস বড়ই জটিল। সিন্ধিয়া, হোলকার প্রভৃতি যে সকল রাজবংশের নাম পরে শুনিতে পাওয়া যায়, তাঁহাদিগের উৎপত্তি এই বাজীরাওর সময়েই। ইহারা সকলেই প্রায় বাজীরাওর অধীনে বড় বড় সেনাপতি ছিলেন।
বরোদার গাইকোয়াড়—গুজরাটের গাইকোয়াড় বংশের আদিপুরুষ পিলাজী গাইকোয়াড় গুজরাটের মারাঠা অধিপতি দাভাড়ের শিশুপুত্রের রক্ষক ও তত্ত্বাবধায়ক ছিলেন। দাভাড়ের সহিত বাজীরাওর অতিশয় শত্রুতা ছিল। উভয়ে যুদ্ধ হয়, তাহাতে দাভাড়ের মৃত্যু হয়। তাঁহার মৃত্যুর পর বাজীরাও পিলাজী গাইকোয়াড়ের উপর রাজকার্য্যের ভার দিলেন এবং দাভাড়ের পুত্রকে গুজরাটের অধিপতি করিলেন। কিন্তু পিলাজীর পুত্র দামাজী সমুদায় গুজরাটে আপনার অধিকার বিস্তার করিলেন। ইঁহার বংশধরই বর্ত্তমান গাইকোয়াড়।
নাগপুরের ভোঁসলে—শাহ রঘুজী ভোঁসলেকে বেরারের শাসনকর্তা নিযুক্ত করিয়াছিলেন, এবং ইনিই নাগপুরের ভোঁসলেবংশের আদিপুরুষ। ইঁহারাই আলিবর্দ্দির সময়ে বার বার বাঙ্গালাদেশ আক্রমণ করেন।
হোলকার ও সিন্ধিয়া—বাজীরাও নিজামের নিকট হইতে মালব রাজ্য লাভ করেন, এবং নিজের দুইজন প্রধান সেনাপতি রাণোজী সিন্ধিয়া ও মহ্লার রাও হোলকারকে সেই রাজ্য ভাগ করিয়া দেন। আজ পর্য্যন্ত এই দুইরাজ্য ইংরেজদিগের মিত্ররাজ্যরূপে পরিগণিত।
বালাজী বাজীরাও—(১৭৪০—১৭৬১ খ্রীঃ) বাজীরাওর মৃত্যুর পর বালাজী বাজীরাও পেশওয়া হইলেন। ইঁহার সময় মারাঠাদিগের প্রভূত্ব যারপরনাই বাড়িয়া উঠে। ইনি অতিশয় বুদ্ধিমান মিষ্টভাষী ও কার্যদক্ষ লোক ছিলেন। নাগপুরের রঘুজী ভোঁসলে ও গুজরাটের দামোজী গাইকোয়াড় এই দুইজনে বালাজী বাজীরাওর প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন। প্রত্যেকেই মারাঠাদিগের ভিতর প্রধান হইবার জন্য চেষ্টা করিতেন, কিন্তু ফলে বালাজীর সহিত কেহই পারিয়া উঠিতেন না। রঘুজী বাঙ্গালা দেশ লুট করিবার জন্য ভাস্কর পণ্ডিতকে পাঠান। ভাস্কর পণ্ডিত বাঙ্গালার সুবাদার আলিবর্দীকে হারাইয়া বাঙ্গালার বিখ্যাত ধনী জগৎশেঠের বাড়ী লুট করিয়া আড়াই ক্রোর টাকা লইয়া আসেন। দিল্লীর বাদসাহ বালাজীকে রঘুজীর হস্ত হইতে বাঙ্গালাদেশ রক্ষা করিবার জন্য অনুরোধ করেন। বালাজী তৎক্ষণাৎ বাদসাহের অনুরোধ রক্ষা করেন। বালাজীরাওর আর এক শত্রু ছিলেন হায়দরাবাদের নিজাম। বালাজীর সহিত যুদ্ধে পরাজিত হইয়া, নিজাম তাঁহার প্রাধান্য স্বীকার করিতে বাধ্য হন। বালাজীর সময় রাঘোবা একদল সৈন্য লইয়া পঞ্জাব অধিকার করেন, এবং আহমদ শাহ দুরাণীর নিযুক্ত শাসনকর্তাকে তাড়াইয়া, কিরূপে পাণিপথের যুদ্ধ ঘটান, পূর্ব্বেই তাহা বলিয়াছি। বালাজী অনেক সৈন্য সামন্ত লইয়া আসিতেছিলেন, পথে যুদ্ধের পরাজয় সংবাদ শুনিয়া ফিরিয়া যান। এই ঘটনায় বালাজীর মনে অত্যন্ত আঘাত লাগে, তিনি এত ম্রিয়মাণ হইয়া পড়েন যে, ছয়মাসের মধ্যেই তাঁহার মৃত্যু হয়।
মাধব রাও—(১৭৬১—১৭৭১) বালাজীর মৃত্যুর পর তাঁহার ১৭ বৎসরের পুত্র মাধব রাও, পেশওয়া হইলেন এবং তাঁহার পিতৃব্য রাঘোবা অভিভাবক হইলেন। কিন্তু উভয়ে অধিক দিন সদ্ভাবে কাটাইতে পারেন নাই। রঘুজী ভোঁসলে নিজামের সহিত মিলিত হইয়া ইহাদের শত্রুতা সাধন করেন। কিন্তু রাঘোবা যুদ্ধে উভয়কে পরাজিত করেন। ওদিকে মাধব রাও মহীশুরের হায়দর আলীকে আক্রমণ করিয়া তাঁহার নিকট হইতে ৩২ লক্ষ টাকা আদায় করেন। এইরূপে দাক্ষিণাত্যে প্রাধান্য লাভ করিয়া মাধব রাও শিবাজী কৃষ্ণ নামে এক জন সেনাপতিকে উত্তরে রাজ্য বিস্তারের জন্য পাঠান। শিবাজী হোলকার ও সিন্ধিয়ার সহিত মিলিত হইয়া, রাজপুত, রোহিলা ও জাঠদিগকে আক্রমণ করেন; এবং দিল্লীর বাদসাহকে ইংরেজদিগের আনুগত্য ত্যাগ করিয়া, এলাহবাদ হইতে দিল্লীতে আসিয়া বাস করিতে বলেন। মাধব রাও পেশওয়ার যক্ষ্মা রোগে অসময়ে মৃত্যু হয়। মাধব রাও যদি আরও কিছুদিন ভাল থাকিতেন, তাহা হইলে মারাঠাদিগের পক্ষে ভাল হইত। তিনি যেমন বীর, সাহসী, তেমনি সরল ও ন্যায়-পরায়ণ ছিলেন। তাঁহার দুইজন অতি উচ্চদরের কর্মচারী ছিল—রাম শাস্ত্রী, ও নানা ফড়নবিশ। রাম শাস্ত্রী অতি তেজস্বী ও সৎলোক ছিলেন। যাহার অন্যায় দেখিতেন, তাহারই প্রতিবাদ করিতেন, কাহাকেও ভয় করিতেন না। তাঁহার সময়ে রাজসভায় ঘুষ লওয়া বা প্রবঞ্চনা করা এক প্রকার বন্ধ হইয়া যায়। যত বড় লোকই হউক না কেন, রাম শাস্ত্রীর ভয়ে কোন অন্যায় করিতে কাহারও সাহস হইত না। স্বয়ং পেশওয়া পর্য্যন্ত তাঁহাকে ভয় করিতেন। একবার মাধব রাও কোন ধর্ম্মকার্য্যের অনুষ্ঠানে ব্যস্ত ছিলেন বলিয়া, রাজকার্য্য দেখিতে পারেন নাই। তাহাতে রাম শাস্ত্রী মহা বিরক্ত হন। মাধব রাও বলেন, “আমি ব্রাহ্মণ, ধর্ম্ম কর্ম্ম আগে করিব, না রাজকার্য্য দেখিব?—রাম শাস্ত্রী উত্তর দিলেন, “ব্রাহ্মণের ধর্ম্মই বড় তাহাতে সন্দেহ নাই, তবে ব্রাহ্মণ হইয়া রাজকার্য্যে যিনি হাত দেন, তাঁহার রাজকার্য্যই আগে দেখা উচিত; নতুবা আপনি পেশওয়ার গদী হইতে নামিয়া আসুন।” সেই দিন হইতে মাধব রাও আর কখনও রাজকার্য্যে অবহেলা করেন নাই।
![]()
নানা ফড়নবিশ।
মাধব রাওর মৃত্যুর পর তাঁহার কনিষ্ঠ নারায়ণ রাও পেশওয়া হইলেন; আর রাঘোবা তাঁহার রক্ষক হইলেন। কিন্তু অল্পদিনের মধ্যেই অতি গোপনে রাঘোবা নারায়ণকে হত্যা করেন। রাম শাস্ত্রী রাঘোবাকে সন্দেহ করিয়া বলেন যে, “আপনি দোষী কি নির্দোষী তাহার বিধিমতে বিচার হউক। যদি দোষী বলিয়া প্রমাণিত হন, আপনার জীবন দিয়া এ পাপের প্রায়শ্চিত্ত করিতে হইবে; নতুবা আপনার বংশের ভাল হইবে না।” কিন্তু রাঘোবা কিছুতেই রাম শাস্ত্রীর কথায় সম্মত হইলেন না; তখন শাস্ত্রীজী ক্রোধে ও ঘৃণায় অধীর হইয়া বলিলেন, “আমি আজই আপনার রাজ্য ত্যাগ করিয়া যাইতেছি। আপনার মত লোকের অধীনে কখনও কার্য্য করিব না। আর যতদিন আপনি এই গদীতে বসিবেন, ততদিন পুণায় প্রবেশ করিব না।”
রাঘোবা যে আশা করিয়া নারায়ণ রাওকে হত্যা করিলেন, তাহা পূর্ণ হইল না। নানা ফড়নবিশ প্রভৃতি পুরাতন কর্ম্মচারীরা নারায়ণ রাওএর মৃত্যুর পর তাঁহার যে পুত্র জন্মিল, তাহাকে মাধব রাও নারায়ণ নাম দিয়া পেশওয়া করিলেন। রাঘোবা অনন্যোপায় হইয়া বম্বের ইংরেজদিগের সাহায্য চাহিলেন, তাঁহারাও সাহায্য করিতে স্বীকৃত হইলেন এবং এই কারণেই প্রথম মারাঠা যুদ্ধ হয় (১৭৭৫ খৃষ্টাব্দে) ইহার ফলাফল পরে বলা হইবে।
এই যুদ্ধের পর পুণায় আবার দুইটি দল হয়। নানা ফড়নবিশ এক দলের নেতা, আর তাঁহার পিতৃব্য অপর দলের নেতা। নানার পিতৃব্য, রাঘোবাকে পেশওয়া করিতে বিধিমতে চেষ্টা করেন এবং হোলকার ও তাঁহার সহিত যোগ দেন। এই দল বম্বে গবর্ণমেণ্টের সাহায্য ভিক্ষা করেন, তাঁহারাও সাহায্য করিতে সম্মত হন। এইবারে যে যুদ্ধ হয়, তাহাতে প্রথমে নানা ফড়নবিশ ইংরেজদিগকে হারাইয়া দেন। পরে ইংরাজেরা জয়ী হইলেও শিশু পেশওয়াকেই পেশওয়া বলিয়া মানিয়া লইলেন এবং রাঘোবার তিন লক্ষ টাকা বাৎসরিক বৃত্তি নির্দিষ্ট হইল। এইরূপে ছয় বৎসর পরে প্রথম মারাঠা যুদ্ধের শেষ হইল (১৭৮২ খৃষ্টাব্দ)। অল্প বয়স্ক মাধব রাও নারায়ণকে পেশওয়া করিয়া নানা ফড়নবিশ সকল কর্ত্তৃত্ব করিতেন। সেই সময়ে দাক্ষিণাত্যে নানার মত শক্তিশালী ব্যক্তি আর কেহ ছিল না। উত্তরে মাধাজী সিন্ধিয়ার ক্ষমতা অত্যন্ত বাড়িয়া উঠিয়াছিল। তিনি দিল্লীর বাদশাহকে হস্তগত করিয়া, মহা আস্ফালন করিয়া বেড়াইতেছিলেন। তিনি একবার পুণাতে আসিয়া বালক পেশওয়াকে হাত করিতে চেষ্টা করেন, তাহাতে নানা বড় ক্ষুণ্ণ হন। নানা ফড়নবিশ সর্ব্বদাই মাধব রাও নারায়ণকে চক্ষে চক্ষে রাখিতেন। স্বাধীনভাবে কিছুই করিতে দিতেন না। ইহাতে বালকের এতদূর কষ্ট বোধ হইত যে, একদিন তিনি সিঁড়ির উপর হইতে লম্ফ দিয়া পড়িরা প্রাণত্যাগ করিলেন। এই ঘটনায় নানার প্রাণে বড় লাগিল।
মাধব রাও নারায়ণের মৃত্যুর পর রাঘোবার পুত্র বাজীরাও পেশওয়া হইলেন। নানা ফড়নবিশ তাঁহার পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। সেই সময়ে মারাঠাদলপতিদিগের মধ্যে নানা ফড়নবিশের মত ক্ষমতা কাহারও ছিল না। মাধাজী সিন্ধিয়া শক্তি ও প্রতিপত্তিতে নানার দ্বিতীয় ছিলেন, এবং এই উভয়ে বেশ সদ্ভাব ছিল। হোলকার প্রভৃতি অন্য অন্য মারাঠা-দলপতিরা ইহাদিগের বিরুদ্ধে মাথা তুলিতে পারিতেন না। নানা ফড়নবিশ ইংরেজদিগের বোর শত্রু ছিলেন এবং তাঁহাদিগকে এ দেশ হইতে তাড়াইবার চক্রান্ত করিতে ছিলেন। এমন সময়ে ১৮০০ খৃষ্টাব্দে তাঁহার মৃত্যু হয়। নানার মৃত্যুতে মাধাজী সিন্ধিয়াই মারাঠাদিগের নেতা হইলেন এবং পেশওয়া বাজীরাও এর সকল ক্ষমতা লোপ করিয়া, তাঁহাকে একপ্রকার নিজের হাতের পুতুল করিয়া ফেলিলেন। এই সময়ে মাধাজী সিন্ধিয়াতে আর যশোবন্তরাও হোলকারে মহা বিবাদ উপস্থিত হয়। যশোবন্তরাও হোলকার বাজীরাও এর পরিবর্ত্তে অমৃতরাও বলিয়া রাঘোবার এক পোষ্যপুত্রকে পেশওয়া করিলেন। মাধাজী সিন্ধিয়া এই বিষয়ের মীমাংসার জন্য ইংরেজ গবর্ণমেণ্টকে মধ্যস্থ মানেন। তাঁহারা বাজীরাওকেই পেশওয়া রাখিয়া, অমৃতরাওকে বার্ষিক আট লক্ষ টাকা দিয়া কাশীতে পাঠাইয়া দেন। এই উপলক্ষে মারাঠা সর্দ্দারদিগের সহিত ইংরেজদিগের যে যুদ্ধ হয়, তাহা দ্বিতীয় মারাঠা যুদ্ধ নামে ইতিহাসে প্রসিদ্ধ। কিন্তু বাজীরাও ভিতরে ভিতরে ইংরেজদিগের শত্রুতা সাধন করিতে থাকেন। তাঁহার এই ব্যবহারে ইংরেজ গবর্ণমেণ্ট অত্যন্ত বিরক্ত হইয়া, পেশওয়ার ক্ষমতা খর্ব্ব করিতে চেষ্টা করেন। ইহাতে বাজীরাও বিরক্ত হইয়া ইংরেজদিগের সহিত যুদ্ধে রত হন। সিন্ধিয়া, হোলকার, নাগপুরের আপ্পা সাহেব প্রভৃতি পেশওয়ার সহিত যুদ্ধে যোগ দেন। ইহাই ইতিহাসে তৃতীয় মারাঠা যুদ্ধ বলিয়া উল্লিখিত হইয়াছে (১৮২৬ খৃষ্টাব্দ)। এই যুদ্ধে ইংরেজদিগের জয় হইল এবং মারাঠারাই পরাজিত হইলেন।
যুদ্ধের ফল—এই হইল যে, বাজীরাওএর রাজ্য ইংরেজেরা কাড়িয়া লইলেন। কেবল সেতারায় প্রতাপসিংহ নামে শিবাজীর বংশের একজনকে রাজা করিলেন; বাজীরাওকে ৮ লক্ষ টাকা বার্ষিক বৃত্তি দিয়া, কাণপুরের নিকট বিঠুর নামক স্থানে পাঠাইয়া দিলেন। এই বাজীরাওএর পোষপুত্র নানা সাহেব সিপাহী বিদ্রোহে যোগ দিয়া, কাণপুরে যে ভয়ানক হত্যাকাণ্ড করিয়াছিলেন, তাহা পরে বলা হইবে।
ভোঁসলে, সিন্ধিয়া, হোলকার ও গাইকোয়াড়ের রাজ্য বজায় রহিল। কিন্তু এই যুদ্ধের পর তাঁহাদের ক্ষমতা অনেকটা খর্ব্ব হইয়া গেল।
১৮৫৩ খৃষ্টাব্দে নাগপুরের রাজার অপুত্রক অবস্থায় মৃত্যু হইলে, ইংরেজগবর্ণমেণ্ট তাঁহার রাজ্য আত্মসাৎ করেন। গাইকোয়াড়, হোলকার, সিন্ধিয়া আজ পর্যন্ত ইংরেজদিগের আশ্রিত হইয়া, নিরাপদে রাজ্য ভোগ করিতেছেন।
মহারাজ শিবাজী ভারতবর্ষে যে প্রবল মারাঠা শক্তিকে জাগ্রত করেন, তাহার পরিণাম এই হইল। মারাঠা শক্তির অভ্যুদয় ভারতবাসীর পক্ষে গৌরবের বিষয় হইত, যদি মহারাষ্ট্রীয়জাতি এই শক্তি লাভ করিয়া তাহার উপযুক্ত সদ্ব্যবহার করিতেন। তাহা না করিয়া তাঁহারা গ্রাম নগর ধ্বংস ও ধনরত্ন লুটপাট্ করিয়া ভারতবাসিদিগের হৃৎকম্প উপস্থিত করেন। এই কারণেই সেই সময় ইংরেজশক্তির আশ্রয় পাইয়া, ভারতবাসিগণ মারাঠাদিগের অত্যাচার হইতে উদ্ধার পাইয়। শান্তিলাভ করিল।