ভারতবর্ষের ইতিহাস (হেমলতা দেবী)/চতুর্থ পরিচ্ছেদ
চতুর্থ পরিচ্ছেদ।
বৌদ্ধ যুগ।
বুদ্ধের জীবন—৫৫৭ খৃঃ পূঃ অব্দের একদিন ভারতের পক্ষে, ভারতের কেন, সমুদার জগতের পক্ষে এক বিশেষ দিন গিয়াছে। ২৫এ ডিসেম্বরকে লোকে বড় দিন বলে, কেন না সে দিনে যীশুখৃষ্ট পৃথিবীতে আসিয়াছিলেন, সেইরূপ বুদ্ধ যে দিনে পৃথিবীতে আসিয়াছিলেন, সে দিনও এক বড় দিন। সেই দিন কপিলবাস্তু নগরের অদূরে লুম্বিনীর স্নিগ্ধ শ্যামল নিকুঞ্জে কপিলবাস্তুর রাজার অনেক তপস্যার ধন পুত্ত্র সিদ্ধার্থ ভূমিষ্ট হইলেন।[১] মহারাজ শুদ্ধোদন ও মায়াদেবী পুত্ত্র-লাভের জন্য অনেক তপস্যা, অনেক দান ধ্যান করিয়াছিলেন, তথাপি বহুকাল পর্য্যন্ত তাঁহাদের ঘর শূন্য ছিল। রাজা ও রাণী বড়ই মনের কষ্টে ধর্ম্ম কর্ম্ম লইয়া দিন কাটাইতেন। এমন সময়ে তাঁহাদের নিরানন্দ মনে আশার সঞ্চার হইল। মায়াদেবী পিতৃগৃহে যাইতেছিলেন, পথে লুম্বিনীর নিকুঞ্জে তাঁহার একটা সুন্দর শিশু ভুমিষ্ঠ হইল। রাজা শুদ্ধোদনের নিকট সংবাদ গেল। তিনি স্ত্রী ও পুত্ত্রকে মহা সমারোহে কপিলবাস্তুতে লইয়া গেলেন। প্রজাদের নৃত্য, গীত, বাদ্য ও আনন্দ-কোলাহলে রাজধানী কাপিয়া উঠিল। শুদ্ধোদন ভাবিলেন তাঁহার বংশধর জন্মিয়াছে। কিন্তু তাঁহার বংশধর জন্মে নাই। দেবতাদের বংশধর তাঁহার তপস্যার ফলে তাঁহাদের ঘরে জন্মিয়া তাঁহার বংশকে পবিত্র করিয়াছে। যাহা হউক পুত্ত্রের মুখ দেখিয়া রাজা সকল দুঃখ ভুলিলেন, কিন্তু সাত দিনের মধ্যেই শিশু মাতৃহীন হইল। এত আনন্দের মধ্যে শোকের ছায়া পড়িল। শুদ্ধোদন অতি যত্নে শিশুটীকে পালন করিতে লাগিলেন ও তাহার নাম সিদ্ধার্থ রাখিলেন। যখন তাঁহার ১৮ বৎসর বয়স, তখন যশোধরা নাম্নী একটী সুন্দরী রাজ-দুহিতার সহিত তাঁহার বিবাহ দিলেন। কথিত আছে নানাপ্রকার বিষয়-সুখের মধ্যে নিরন্তর মগ্ন থাকিলেও সিদ্ধার্থের মন কিছুতেই আরাম পাইত না। আহারবিহারে, পোষাক পরিচ্ছদে তিনি কোন সুখ পাইতেন না। চারিদিকে মানুষের দুঃখ কষ্ট দেখিয়া, এই সকল আমোদের প্রতি তাঁহার ঘৃণা জন্মিল। তিনি নির্জ্জনে বসিয়া ভাবিতেন, যখন পৃথিবীর অধিকাংশ লোক রোগ শোক ও পাপতাপে নিমগ্ন, তখন এ সকল আমোদ আহ্লাদে সুখ কি? রাজা শুদ্ধোদন পুত্রের এই বিষণ্ণভাব দেখিয়া বড়ই চিন্তিত ছিলেন এবং কুমারের মন ভুলাইয়া রাখিবার জন্য নানাপ্রকার আমোদ প্রমোদের আয়োজন করিয়াছিলেন। কিন্তু সিদ্ধার্থের মন কিছুতেই শান্তি বা সুখ পাইত না। তিনি মনে মনে স্থির করিলেন, সংসার ছাড়িয়া সন্ন্যাসী হইবেন। একবার দেখিবেন, মানুষের দুঃখ দূর করিবার কোন উপায় ঠিক্ করিতে পারেন কি না। যদি তাহা নাও পারেন, তথাপি সেই সন্ধানে চিরজীবন কাটাইবেন। অবশেষে মানুষের দুঃখ কষ্ট দেখিয়া, তিনি কিছুতেই স্থির থাকিতে পারিলেন না। সুখে আহার নিদ্রা তাঁহার ভার বোধ হইল। তিনি সুখের রাজ্য, পিতা ও পত্নীর সহবাস পরিত্যাগ করিবেন, মনে মনে এই সঙ্কল্প করিলেন। এমন সময় তাঁহার একটী পুত্ত্র জন্মিল। এক দিন নদীর তীরে চিত্তাকুল হইয়া বেড়াইতেছেন, এমন সময়ে সংবাদ আসিল যে, তাঁহার একটী পুত্ত্র হইয়াছে; সিদ্ধার্থ বিষণ্ণভাবে বলিলেন, তাই ত, এ যে আবার নূতন বন্ধন! আনন্দের রোলে পুরী কাঁপিয়া উঠিল; কিন্তু সিদ্ধার্থের কাণে জগতের দুঃখী লোকের আর্ত্তনাদ বাজিতে লাগিল। আর তাঁহাকে কিছুতেই ভুলাইয়া রাখিতে পারা গেল না। যে জগতে এত দুঃখকষ্ট, সে জগতে থাকিয়া আনন্দ করা তাঁহার পক্ষে অসাধ্য হইয়া উঠিল। সে দিনই গভীর রাত্রে যখন পুরীর সকল লোক ঘুমাইতেছে, তখন তিনি অতি ধীরে ধীরে তাঁহার স্ত্রীর ঘরের দ্বারে গিয়া দাড়াইলেন। দেখিলেন, পুত্ত্র-কোলে যশোধরা ঘুমাইতেছেন। কি সুন্দর শিশু! সিদ্ধার্থের ইচ্ছা হইল, ছেলেটাকে চিরদিনের মত কোলে করিয়া তাহাকে একটী চুম্বন করেন; কিন্তু পাছে যশোধরার ঘুম ভাঙ্গে এই ভয়ে, উদ্দেশ্যে ছেলেকে আদর করিয়া, মনে মনে স্ত্রীর নিকট বিদায় লইলেন। ধন সম্পদ, আত্মীয় স্বজন সকলকে তিনি সেইখানে বিসর্জ্জন দিলেন। উদ্দেশ্যে পিতার চরণে প্রণাম করিয়া, সিদ্ধার্থ চিরদিনের মত পিতার গৃহ, সংসারের সুখ, স্ত্রী, পুত্র, রাজ্য, সকলই ছাড়িয়া চলিলেন।
সিদ্ধার্থ প্রথমে বৈশালী দেশে গিয়া একজন মহাপণ্ডিত ব্রাহ্মণের শিষ্য হইলেন। তাঁহার নিকট হিন্দুশাস্ত্রের কথা অনেক শিখিলেন। পরে সেখান হইতে মগধের রাজধানী রাজগৃহে আর একজন ব্রাহ্মণের শিষ্য হইলেন। কিছুতেই তাঁহার তৃপ্তি হইল না। দেখিলেন, অনেক শাস্ত্র পড়িলে, অনেক জ্ঞানলাভ করিলেও প্রকৃত সুখ হয় না। বুঝিলেন, ঐরূপ জ্ঞানলাভ, মানুষের দুঃখ দূর করিবার ঠিক উপায় নহে। কাজেই পণ্ডিতদিগের সঙ্গ ছাড়িলেন। ভাবিলেন, দেখি কঠোর তপস্যা করিলে মনে সুখ পাই কি না। এই ভাবিয়া বর্ত্তমান গয়া নগরীর নিকটস্থ উরুবিল্ব গ্রামের নিকটে এক নির্জ্জন বনে ভয়ানক কঠোর তপস্যা আরম্ভ করিলেন। অনাহারে, অনিদ্রায় শরীর ক্ষীণ হইতে লাগিল। গ্রীষ্মের প্রখর রৌদ্রে অগ্নি জ্বালিয়া, তন্মধ্যে বসিয়া জপ করিতেন, শীতের রাত্রে নিরঞ্জন নদীর জলে আকণ্ঠ মগ্ন হইয়া ধ্যান করিতেন। ক্রমে শরীর ভাঙ্গিয়া যাইতে লাগিল। এইরূপে ছয় বৎসর কাটিয়া গেল। অবশেষে একদিন অচেতন হইয়া পড়িলেন। এই সময়ে তাঁহার সঙ্গে যে পাঁচজন শিষ্য ছিল, তাহারা ভাবিল তাঁহার মৃত্যু হইয়াছে। চেতনা পাইয়া তিনি মনে করিলেন, ছয় বৎসর ধরিয়া কত যে তপস্য়া করিলাম, তবুও প্রাণে আরাম পাইলাম না কেন? এইরূপ কথিত আছে যে, তিনি এই সময় হইতে কঠোর তপস্যাকে বৃথা জানিয়া তাহা পরিত্যাগ করিলেন। তাহাতে তাঁহার পাঁচজন শিষ্য তাঁহাকে পরিত্যাগ করিয়া গেল। তিনি পুনরায় একাকী সেই অরণ্যমধ্যে ঘোর সাধনাতে প্রবৃত্ত হইলেন। ভাবিলেন, প্রাণ যাক্ আর থাক্, একবার দেখি, মানবের মুক্তির কোন উপায় আছে কি না? এইবার যে বসিব, জ্ঞানালোক না পাইলে উঠিব না। আমার অঙ্গ সকল শরীর হইতে খসিয়া পড়ুক, কীটে আমার শরীরকে মাটী করিয়া ফেলুক, তথাপি জ্ঞানলোক না পাইলে উঠিব না। এই প্রতিজ্ঞা করিয়া বৃক্ষতলে ধ্যানে বসিলেন। জগতে সেই বৃক্ষ বোধিবৃক্ষ নামে বিখ্যাত হইয়াছে। এই বৃক্ষতলে তিনি সিদ্ধিলাভ করিলেন। যাহার অনুসন্ধান করিতেছিলেন, তাহা পাইলেন। সেই দিব্যজ্ঞান পাইয়া, আপনাকে বুদ্ধ অর্থাৎ জ্ঞানী বলিয়া ঘোষণা করিলেন। জগদ্বাসীকে শান্তির পথ দেখাইবার জন্য মহানন্দে লোকের নিকট ছুটিলেন। বুদ্ধদেব যখন বৌদ্ধধর্ম্ম প্রচার করিলেন, তখন মগধ রাজ্য ভারতের প্রধান রাজ্য ছিল। মহারাজ বিম্বিসার সেই রাজ্যের রাজা ছিলেন। তিনি বুদ্ধদেবকে আপনার রাজধানী, রাজ![]()
বুদ্ধদেব।
গৃহে ডাকিলেন; এবং বুদ্ধ সেখানে গিয়া আপনার ধর্ম্ম প্রচার করিলেন। বুদ্ধ দেশে দেশে ফিরিয়া ধনী দরিদ্র, ব্রাহ্মণ শূদ্র, পণ্ডিত ও মূর্খ সকলের নিকট নূতন ধর্ম্ম ঘোষণা করিলেন। অচিরে তাঁহার অনেক শিষ্য জুটিল। যে তাঁহার কথা শুনিল, সেই মোহিত হইল। বৌদ্ধধর্ম্ম প্রচার করিবার বার বৎসর পরে তিনি একবার স্বদেশে গেলেন; এবং স্বীয় পিতা, পুত্ত্র ও প্রজাদের নিকট নূতন ধর্ম্মের কথা বলিলেন। তাঁহার পুত্ত্র রাহুল ও তাঁহার স্ত্রী যশোধরা সর্ব্বত্যাগী হইয়া তাঁহার শিষ্য হইলেন। এইরূপে দেশে দেশে বৌদ্ধধর্ম্ম প্রচার করিয়া, প্রায় আশী বৎসর বয়সে কুশীনগরের নিকট এক বনে তাঁহার মৃত্যু হয়।
বৌদ্ধধর্ম্ম কি?—বুদ্ধের প্রধান উপদেশ দুইটী;—বাসনাবিলয় ও সর্ব্বভূতে মৈত্রী। পবিত্র জীবন লাভ করা এবং বাসনাশূন্য হওয়া এই ধর্ম্মের উদ্দেশ্য। মানুষ এক জন্মে না হউক, জন্মে জন্মে ক্রমশঃ নির্ম্মল হইয়া, অবশেষে মুক্তি বা নির্ব্বাণ পাইতে পারে, তখন আর জন্ম হয় না। বৌদ্ধধর্ম্মের আর এক মূলমন্ত্র সর্ব্বজীবে দয়া। সকল জীবের সেবা করা বৌদ্ধধর্ম্মের মহৎ উপদেশ। এমন কি বৌদ্ধগণ পশুদিগের জন্ম চিকিৎসালয় স্থাপিত করিয়াছিলেন। জগতের স্রষ্টা ও বিধাতা পুরুষ যে একজন আছেন, বুদ্ধ সে সম্বন্ধে বিশেষ কিছু বলেন নাই। বৌদ্ধধর্ম্মের জন্ম যে হিন্দুধর্ম্ম হইতে, তাহাতে সন্দেহ নাই। কিন্তু বুদ্ধদেব যেরূপ ভাবে এই ধর্ম্ম প্রচার করিয়া গিয়াছেন তাহা এদেশের পক্ষে কিছু নূতন; বিশেষতঃ বিহার স্থাপন, এবং দেশে বিদেশে ধর্ম্ম-প্রচারের ভাব আমাদের দেশে ছিল না। ইহা বৌদ্ধধর্ম্মের এক নূতনত্ব। বৌদ্ধ-প্রচারকদিগকে ভিক্ষু আর স্ত্রীলোকদিগকে ভিক্ষুণী বলিত। ভিক্ষু ও ভিক্ষুণীগণ চিরজীবন মঠে বাস করিরা বৈরাগ্য-ব্রত পালন করিতেন।
অশোকের জীবন—বুদ্ধদেব বৌদ্ধধর্ম্ম প্রচার করিয়াছিলেন বটে, কিন্তু মগধরাজ অশোকের চেষ্টাতেই তাহা ভারতে এবং দেশ দেশান্তরে বিশেষ ভাবে প্রচারিত হইয়াছিল। এই অশোকের মত প্রতাপশালী রাজা আর কেহ ভারতে রাজত্ব করিয়াছিলেন কি না সন্দেহ। ইহার জীবনের কাহিনী বড়ই সুন্দর।
আমরা পূর্ব্বে যে মগধরাজ চন্দ্রগুপ্তের কথা বলিয়াছি, অশোক তাঁহারই পৌত্ত্র। অশোকের পিতা বিন্দুসারের অনেকগুলি পুত্ত্র ছিল তন্মধ্যে অশোক অত্যন্ত কুৎসিত ছিলেন। সেই জন্য তাঁহার, পিতা তাঁহাকে ভালবাসিতেন না। এক দিন মহারাজ বিন্দুসার পুত্ত্রদের শিক্ষক পিঙ্গলকে বলিলেন, “আমি জানিতে চাই পুত্ত্রদের মধ্যে কে আমার সিংহাসন পাইবার উপযুক্ত।” সেই কথা অনুসারে পিঙ্গল একদিন রাজকুমারদিগকে ডাকিলেন; সকলে নানা বেশ-ভূষা করিয়া বড় বড় গাড়ীতে চড়িয়া আসিল ও ভাল ভাল আসনে আসিয়া বসিল। কুৎসিত অশোককে কেহ দেখিতে পারে না, যে সামান্য পোষাক পরিয়া পিতার বৃদ্ধ হাতীতে চড়িয়া আসিয়া, মাটীতে বসিল। রাজপুত্ত্রেরা কত কি আহার করিল; অশোক মাতৃদত্ত চিড়া আর সামান্য জল পান করিল। বিন্দুসার যখন পুত্ত্রদিগকে দেখিতে আসিলেন, তখন পিঙ্গল বলিলেন, “মহারাজ! ইহাদের মধ্যে যাহার ভাল আসন, ভাল বাহন ও ভাল পানীয় সেই রাজা হইবে।” সকল রাজপুত্ত্রই ভাবিল সেই রাজা হইবে। অশোক[২] আসিয়া মাকে বলিল, “মা, আমিই রাজা হইব। আমি পিতার বৃদ্ধ হাতীতে চড়িয়া গিয়াছি, তাহার অপেক্ষা ভাল বাহন আর কাহার? আমি পৃথিবীর উপর বসিয়াছিলাম, তার অপেক্ষা ভাল আসন আর কাহার? আমি নির্ম্মল জল পান করিয়াছি, তার চেয়ে ভাল পানীয় আর কাহার?” যাহা হউক পরে অশোকের কথাই ঠিক্ হইল। অশোক দেখিতে যে শুদ্ধ কদাকার ছিলেন তাহা নহে, তাঁহার প্রকৃতিও অতি ভয়ানক ছিল। রাজা হইবার পর তাঁহার দৌরাত্ম্যে প্রজারা অস্থির হইয়া উঠিল; তাঁহার অত্যাচার ও নিষ্ঠুরতার সীমা পরিসীমা ছিল না। একবার ভাবিলেন, তিনি স্বয়ং ইন্দ্র আর তাঁহার রাজধানী স্বর্গ। এই ভাবিয়া একটা দুর্গন্ধময় স্থান করিয়া তাহার নাম ‘নরক’ দিলেন। সেখানে একজন ভয়ঙ্কর যমদূতের মত লোককে রাখিয়া বলিলেন, এখানে যে আসিবে তাহাকে অশেষ কষ্ট দিয়া মারিবে। একদিন একজন বৌদ্ধভিক্ষু সেখানে ভিক্ষা করিতে আসিল; তাহার আশ্চর্য্য ভাব দেখিয়া যমদূত মহারাজকে গিয়া জানাইল। তাহার মুখে বুদ্ধ বৌদ্ধধর্ম্মের কথা শুনিয়া অশোক মুগ্ধ হইলেন। অশোক বৌদ্ধধর্ম্মের জন্য যাহা করিয়াছেন, তাহার দৃষ্টান্ত পৃথিবীতে অতি বিরল। বৌদ্ধধর্ম্ম গ্রহণ করিয়াই অশোক তাঁহার রাজধানীতে বৌদ্ধ দিগের এক মহাসভা ডাকিলেন; তাহার পর দেশদেশান্তরে প্রচারক পাঠাইতে লাগিলেন। কোথায় গ্রীস্, কোথায় চীন, কোথায় জাপান, কোথায় সিংহল, চারিদিকে প্রচারক পাঠাইলেন। তিনি সমগ্র আর্য্যাবর্তের অদ্বিতীয় অধীশ্বর ছিলেন; তাঁহার বিরুদ্ধে কথা বলে, এমন সাহস ভারতের কোনও রাজার ছিল না। তিনি ভারতের সহরে সহরে ৮০,০০০ স্তূপ অর্থাৎ পাষাণ ও মৃত্তিকাময় ক্ষুদ্র গিরি করিয়া বুদ্ধের দেহভস্ম রাখিলেন। ভারতের এক প্রান্ত হইতে অপর প্রান্ত পর্য্যন্ত, পর্ব্বতে, পর্ব্বতে, ধর্ম্মের আদেশ সকল লিখিয়া রাখিলেন। ইহা ছাড়া কত পান্থশালা, কত চিকিৎসালয়, কত বিহার, কত মঠ করিয়াছিলেন, তাহার সংখ্যা নাই। অশোকের অনুশাসন সকল পড়িলে বুঝা যায়, কি মহৎ ভাবে তাঁহার হৃদয় পূর্ণ ছিল। তাঁহার রাজ্যে কেহ জীবহত্যা করিতে পারিত না। বৌদ্ধভিক্ষু ও ব্রাহ্মণদিগকে অশোক দুই হস্তে দান করিতেন। তাঁহার অসীম রাজ-শক্তি ও প্রভূত ঐশ্বর্য্য কেবল বৌদ্ধধর্ম্ম প্রচার, বৌদ্ধভিক্ষু ও ভিক্ষুণীদের পালনের জন্য অকাতরে ব্যয় করিয়াছেন। এত দান করিয়াও তিনি তৃপ্ত হন নাই। শেষে রাজ্য পর্য্যন্ত দান করিয়া স্বয়ং ভিক্ষু হইয়াছিলেন। অশোক একস্থানে লিখিয়াছিলেন যে, যতদিন চন্দ্র সূর্য্য ![]()
বৌদ্ধ স্তূপ।
থাকিবে ও যতদিন পৃথিবী থাকিবে, ততদিন তাঁহার ধর্ম্ম ও তাঁহার নাম এ জগতে থাকিবে। হায়! ভারতের কয়জনে এখন অশোকের নাম জানে! কোথায় গেল অশোকের অগণ্য কীর্ত্তি কোথায় গেল বৌদ্ধবিহার সকল, কোথায় বা ভারতে বৌদ্ধধর্ম্ম! যে ধর্ম্ম হাজার বৎসর ধরিয়া এদেশে আধিপত্য করিল, আজ তাহা ভারতের কোথাও খুঁজিয়া পাওয়া যায় না। বৌদ্ধধর্ম্ম ভারত হইতে একেবারে নির্ব্বাসিত; তাহার সকল কীর্তিকলাপ একেবারে লুপ্ত। ইতিহাসে ইহা এক আশ্চর্য্য কথা।
ভারতে বৌদ্ধধর্ম্মের বিস্তৃতি ও লয়—বুদ্ধ বৌদ্ধধর্ম্ম সম্বন্ধে যত কিছু উপদেশ দিয়াছিলেন, সকলি মুখে মুখে; লিখিত কোন শাস্ত্র ছিল না। বুদ্ধের মৃত্যুর পরেই তাঁহার পাঁচ শত শিষ্য রাজগৃহের সপ্তপর্ণীর গুহায় মিলিত হন। সেই সভায় তাঁহার উপদেশ সকল আবৃত্তি করা হয়। তাহার একশত বৎসরের ভিতর বৌদ্ধভিক্ষুদিগের মধ্যে মতভেদ হওয়াতে বৈশালী নগরে দ্বিতীয় সভা হয়। মহারাজ অশোকের সময়ে তাঁহার রাজধানীতে তৃতীয় সভা হয়। তাহাতে এক সহস্র বৌদ্ধভিক্ষু একত্র হইয়া, বৌদ্ধশাস্ত্র লিপিবদ্ধ করেন। বৌদ্ধশাস্ত্রকে ত্রিপিটক বলে। অশোকের সময় ত্রিপিটক যে আকারে লেখা হয়, আজও তাহা সেই আকারেই আছে। বৌদ্ধদিগের ভিতর আবার দুইটী দল আছে। উত্তরদেশীয় এবং দক্ষিণদেশীয়। তিব্বত, চীন, জাপান প্রভৃতি দেশের বৌদ্ধদিগকে উত্তরদেশীয়, এবং ব্রহ্মদেশ, সিংহল প্রভৃতি দেশের বৌদ্ধদিগকে দক্ষিণদেশীয় বৌদ্ধ বলে। দক্ষিণের বৌদ্ধেরা অশোকের ত্রিপিটক মতে চলে; আর উত্তরের বৌদ্ধেরা খ্রীষ্টের এক শত বৎসরের মধ্যে কাশ্মীরের রাজা কণিষ্কের সময় চতুর্থ সভায় ত্রিপিটকের যে ব্যাখ্যা হয়, তাহারই অনুসরণ করে। অশোকের রাজত্ব সময় ভারতে বৌদ্ধধর্ম্মের গৌরবের চরমসীমা বলিলেও হয়। তাহার পরও অনেক যুগ ধরিয়া এদেশে বৌদ্ধধর্ম্মের খুব আদর ছিল। কিন্তু বৌদ্ধধর্ম্ম কোন দিনই হিন্দুধর্ম্মকে সম্পূর্ণ পরাভব করিতে পারে নাই। দুই ধর্ম্মের প্রভাব সমান ভাবে ছিল। হিন্দু রাজারা বৌদ্ধদিগকে শ্রদ্ধা ভক্তি করিতেন এবং সাহায্য করিতে ত্রুটি করিতেন না। আবার বৌদ্ধ রাজারাও ব্রাহ্মণপণ্ডিতদিগকে যথেষ্ট সম্মান করিতেন। পরস্পরের ভিতর কোনও বিদ্বেষের ভাব ছিল না। ৪০০ খৃষ্টাব্দে চীন ভ্রমণকারী হিয়ান্ যখন এদেশে আসেন তখন দুই ধর্ম্মেরই সমান আদর দেখেন; কিন্তু ৬২৯ খৃঃ অব্দে হোয়েনসাং আসিয়া দেখেন, হিন্দুধর্ম্ম জাঁকিয়া উঠিতেছে, আর বৌদ্ধধর্ম্ম ম্লান হইয়া আসিতেছে।[৩] রাজা বিক্রমাদিত্যের সময় হিন্দুধর্ম্ম আবার নূতন তেজে জাগিয়া উঠিল। তাহার পর কুমারিল ভট্ট, শঙ্করাচার্য্য প্রভৃতি পণ্ডিতগণ নাস্তিক বৌদ্ধধর্ম্মকে ভয়ঙ্কররূপে আক্রমণ করিলেন। রাজপুতবীরগণও ভীম গর্জ্জনে বৌদ্ধগণকে আক্রমণ করিলেন; এবং তাঁহাদের হস্তে বৌদ্ধধর্ম্মের যেটুকু লাঞ্ছনা বাকী ছিল, মুসলমানেরা সেটুকু সাধিল। বৌদ্ধবিহার ভাঙ্গিয়া হিন্দুরা মন্দির করিলেন; যেখানে যেখানে বৌদ্ধধর্ম্মের প্রধান তীর্থ ছিল, তৎতৎস্থলেই বৌদ্ধধর্ম্মকে পরাজয় করিয়া হিন্দুতীর্থ স্থাপিত হইল। বৌদ্ধধর্ম্মের বাহিরের চিহ্ন সকল এই প্রকারে লয় পাইল বটে, কিন্তু একভাবে বৌদ্ধধর্ম্ম লয় পাইল না, তাহার অনেক ভাব হিন্দুধর্ম্মের অস্থিমজ্জাগত হইয়া রহিল। হিন্দুধর্ম্ম বৌদ্ধধর্ম্মকে এদেশ হইতে একবারে নির্ব্বাসিত করিয়া দিল না বলিয়া, হিন্দুধর্ম্ম বৌদ্ধধর্ম্মকে গ্রাস করিল বলাই ভাল।
মহাবীর ও জৈনধর্ম্ম—জৈনধর্ম্ম বলিয়া আজ কাল এদেশে যে ধর্ম্মের নাম শুনিতে পাওয়া যায়, বৌদ্ধধর্ম্মের সহিত তাহার অনেক সাদৃশ্য আছে। বিশেষতঃ জৈনেরাও বৌদ্ধদিগের ন্যায় অহিংসা পরমধর্ম্ম এই কথা প্রচার করে। এই হেতু জৈনধর্ম্ম যে বৌদ্ধধর্ম্মের শাখা এইরূপ ভ্রান্তি হওয়া কিছু বিচিত্র নহে। কিন্তু বস্তুতঃ তাহা নহে। জৈনধর্ম্ম বৌদ্ধধর্ম্মের পূর্ব্বে প্রচারিত হইয়াছিল এমন কথাও কেহ কেহ বলিয়া থাকেন। জৈনধর্ম্ম প্রবর্ত্তক মহাবীর, বুদ্ধদেবের সমসাময়িক ছিলেন। তিনি বৈশালীনগরে কোন এক সম্ভ্রান্ত ক্ষত্রিয় পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। মহাবীর গৃহত্যাগী সন্ন্যাসী ছিলেন। তাঁহার শিষ্যগণ জৈন বলিয়া পরিচিত। জৈনদিগের ভিতর জাতিভেদ প্রথা প্রচলিত আছে। তাঁহারা জৈন সাধু বা জীনদিগের উপাসক। জৈনদিগের ভিতর জীবে দয়া অত্যন্ত প্রবল। তাহারা পশুদিগের জন্য হাসপাতাল, পিঞ্জরাপোল প্রভৃতি স্থাপন করিয়া জীবের প্রতি দয়ার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত দেখাইতেছেন। জৈনগণ প্রায় ব্যবসায়ী এবং ধনী। তাহাদিগের ভিতর শ্বেতাম্বর এবং দিগাম্বর নামে দুই সম্প্রদায় আছে।
সিংহলে উপনিবেশ স্থাপন; বিজয় সিংহের বিবরণ—আমরা রামায়ণে প্রথমে সিংহলদ্বীপের উল্লেখ দেখিতে পাই। তখন সিংহলদ্বীপের নাম ছিল লঙ্কা। ভারতবর্ষের লোকেরা জানিত লঙ্কা রাক্ষসের বাস। কিন্তু বুদ্ধদেব যখন বিহারের গ্রামে গ্রামে সহরে সহরে বৌদ্ধধর্ম্ম-প্রচার করিয়া বেড়াইতেছিলেন তখন বঙ্গদেশে সিংহবাহু নামে এক পরমধার্ম্মিক রাজা রাজত্ব করিতেন। সিংহবাহুর জ্যেষ্ঠপুত্ত্র বিজয়সিংহ পিতার ঠিক বিপরীত প্রকৃতির ছিলেন। তাঁহার অত্যাচারে প্রজাগণ অস্থির হইয়া পড়িয়াছিলেন। সিংহবাহু পুত্ত্রকে দমন করিয়া সুপথে আনিবার জন্য অনেক চেষ্টা করেন, কিন্তু তাঁহার কোন চেষ্টাই সফল হইল না। তখন তিনি অগত্যা পুত্ত্রকে রাজ্য হইতে নির্ব্বাসিত করিয়া দিলেন। বিজয়সিংহ যেমন দুর্দান্ত তেমনি সাহসী ছিলেন। তিনি বিস্তর নৌকার অনেক সৈন্য সামন্ত বন্ধুবান্ধব লইয়া দক্ষিণে সমুদ্রপথে যাত্রা করিলেন এবং অবশেষে লঙ্কাদ্বীপে আসিয়া উপস্থিত হইলেন। ৫৩৪ খৃঃ পুঃ লঙ্কাদ্বীপ জয় করিয়া তথায় সিংহ বংশের রাজ্য প্রতিষ্ঠা করিলেন। তখন হইতে লঙ্কাদ্বীপের নাম হইল সিংহল অথবা সিংহ বংশের রাজ্য। বিজয় সিংহের মৃত্যুর পর তাঁহার ভ্রাতুষ্পুত্র পাণ্ডুবাস সিংহলের রাজা হন। এই সিংহবংশ বহুদিন সিংহলে রাজত্ব করিয়াছিলেন এবং এই রাজবংশের দ্বারা সিংহলে হিন্দু সভ্যতা বিস্তৃত হয়। ইহার প্রায় দুই শত বৎসর পরে সম্রাট অশোকের পুত্ত্র মহেন্দ্র এবং তাঁহার কন্যা সংঘমিত্রা বৌদ্ধধর্ম্ম প্রচার করিবার জন্য সিংহলে গিয়াছিলেন। তখন হইতে সিংহলদ্বীপে বৌদ্ধধর্ম্ম প্রচারিত হইয়াছে। এখনও সিংহলের তিন ভাগের দুই ভাগ লোক বৌদ্ধ। সিংহলের বর্ত্তমান চলিত ভাষাও মগধের পালিভাষার অপভ্রংশ। দ্বীপবংশ ও মহাবংশ নামে সিংহলের দুই খানি প্রাচীন ইতিহাস আছে। তাহা হইতে সিংহলের বিষয় অনেক জানিতে পারা যায়।
- ↑ ভারতবর্ষের মানচিত্রে এখন যেখানে গোরক্ষপুর নামক নগর দেখা যায়, তাহার ৫০ মাইল উত্তরে কপিলবাস্তু নামক এক নগর ছিল। খৃষ্টের সাড়ে পাঁচশত বৎসর পূর্ব্বে শুদ্ধোদন নামে এক রাজা তথায় রাজত্ব করিতেন। তাহার রাণীর নাম মায়াদেবী।
- ↑ ২৭২ খৃঃ পূঃ অশোক রাজা হন। ২৩১ খৃঃ পুঃ তাঁহার মৃত্যু হয়।
- ↑ কিন্তু তখন তিনি গয়ার সন্নিকটে নলন্দা নামক স্থানে বৌদ্ধ-বিহার, বৌদ্ধ পাঠশালা ও বৌদ্ধমঠ দেখিয়াছিলেন। ঐ পাঠশালাতে সহস্র সহস্র ছাত্র বাস করিত। হোয়েনসাং কিছুদিন সেখানে বাস করিয়া বৌদ্ধধর্ম্ম শিক্ষা করিয়াছিলেন।