বিষয়বস্তুতে চলুন

ভারতবর্ষের ইতিহাস (হেমলতা দেবী)/চতুর্দ্দশ পরিচ্ছেদ

উইকিসংকলন থেকে

কোম্পানীর রাজত্ব।

চতুর্দ্দশ পরিচ্ছেদ।

 ওয়ারেন হেষ্টিংস্—(১৭৭২-৮৫ খৃঃ অঃ) ওয়ারেন হেষ্টিংস্ গভর্ণর হইবার ঠিক্ পূর্ব্বে (১৭৭১ খৃঃ অঃ) বাঙ্গালা দেশে ভয়ানক দুর্ভিক্ষ হয়। আজ পর্য্যন্ত আমাদের দেশের লোকে সে দুর্ভিক্ষের কথা ভুলিতে পারে নাই। “ছিয়াত্তরে মন্বন্তর” বলিয়া সেই বিষম সময়ের কথা স্মরণ করে। সেই ভয়ানক দুর্ভিক্ষের পরই হেষ্টিংস্ গভর্ণর হইয়া আসিলেন। ক্লাইবের মত হেষ্টিংসের নামও ইতিহাসে চিরস্মরণীয়। হেষ্টিংস্ এদেশের লোকের নিকট কিরূপ পরিচিত ছিলেন, তাহা এই হিন্দি প্রবাদটি শুনিলেই বুঝিতে পারিবে।

হাতী পর হাওদা ঘোড়া পর জিন
জল্‌দি আও জল্‌দি আও সাহেব হেষ্টিংস্।

সাহেব হেষ্টিংস বড় সামান্য লোক ছিলেন না। অনেক বিষয়ে তিনি ক্লাইবের সমান ছিলেন। দুই জনেই অল্প বয়সে কোম্পানির কাজে এদেশে আসেন। দুই জনেই কার্য্যদক্ষ এবং বুদ্ধিমান্ ছিলেন। অনেক দিন এদেশে বাস করাতে, দুই জনেরই এদেশ সম্বন্ধে বিশেষ অভিজ্ঞতা জন্মিয়াছিল। হেষ্টিংস্ এদেশের ভাষা পর্যন্ত শিখিয়াছিলেন। তিনি হিন্দি ও পার্সী জানিতেন। ক্লাইব বাঙ্গালায় ইংরেজ রাজ্যের ভিত্তি স্থাপন করেন। হেষ্টিংস্ এদেশে ইংরেজ শাসনের ভিত্তি স্থাপন করেন। সে সময়ে এদেশে চারিদিকে বিশৃঙ্খলা, চারিদিকে অরাজকতা ছিল।

 বাঙ্গালার সাক্ষীগোপাল মুসলমান নবাব তখন পর্য্যন্ত রাজত্ব করিতেছিলেন। ক্লাইব মুসলমান নবাবের হস্তে বাঙ্গালাদেশের শাসনের
ওয়ারেন হেষ্টিংস্।
ভার অর্থাৎ আদালত রাখিয়াছিলেন এবং ইংরেজ কোম্পানির উপর এদেশের কর আদারের ভার ছিল। হেষ্টিংস্ দেখিলেন, নবাবের হস্তে আদালতের ভার দেওয়া বৃথা, সুবিচার কিছুই হয় না, কাজেই তিনি মুর্শিদাবাদ হইতে আদালত উঠাইয়া কলিকাতায় আনিলেন। যাহাতে সুবিচার হয়, সেই জন্য ফৌজদারী এবং দেওয়ানী আদালত প্রতিষ্ঠা করিলেন। আপিল শুনিবার জন্য কলিকাতায় সদর দেওয়ানী এবং সদর নিজামত নামে দুইটি আদালত হয়। তখন হইতে কলিকাতা বাঙ্গালা বিহারের রাজধানী হইল। ক্লাইব নবাবের যে বৃত্তি নির্দ্দিষ্ট করিয়াছিলেন হেষ্টিংস্ তাহা কমাইয়া দিলেন। ক্লাইব দিল্লীর বাদসাহকে এলাহাবাদ এবং কোরা প্রদেশ ও বৎসরে ২৬ লক্ষ টাকা দিতে স্বীকার করিয়াছিলেন, হেষ্টিংস্ তাহা একেবারে বন্ধ করিয়া দিলেন এবং ৪০ লক্ষ টাকায় এলাহাবাদ ও কোরা অযোধ্যার উজীরকে বিক্রয় করিলেন। দিল্লীর সম্রাট্ সাহ আলম্ সেই সময়ে মারাঠাদিগের হস্তে আত্মসমর্পণ করাতে ইংরেজ কোম্পানি তাঁহাকে কিছুই দিতে চাহিলেন না। অযোধ্যার উজীরের সহিত এই সময় রোহিলাদিগের বিবাদ উপস্থিত হয়। বিবাদের কারণ এই যে, মারাঠারা রোহিলখও আক্রমণ করিলে রোহিলা সর্দ্দার ৪০ লক্ষ টাকা অঙ্গীকার করিয়া, অযোধ্যার নবাবের সাহায্য প্রার্থনা করেন। নবাব উজীর ইহাতে সম্মত হন। কিন্তু যুদ্ধ উপস্থিত না হইতেই মারাঠারা আপন হইতে রোহিলখণ্ড ত্যাগ করিয়া চলিয়া যায়। সুতরাং রোহিলা সর্দ্দার অযোধ্যার নবাবকে কিছু দিতে চাহিলেন না। নবাব উজীর তাহা শুনিলেন না। তিনি রোহিলাদিগের সহিত যুদ্ধ করিবার জন্য হেষ্টিংসের সাহায্য ভিক্ষা করিলেন। কোম্পানির অর্থাগমের আশায় হেষ্টিংস সাহায্যদানে সন্মত হইলেন।

 কাশীর নবাব চৈৎসিংহ পূর্ব্বে অযোধ্যার নবাবের করদ ছিলেন। কিন্তু নবাব সুজাউদ্দৌলার মৃত্যুর পর ইংরেজদিগের করদ হন। তিনি বৎসরে ২০ লক্ষ টাকা কর দিতেন। হেষ্টিংস্ আরও কর বাড়াইলেন। চৈৎসিংহ বলিলেন, তিনি আর কর দিতে কোন প্রকারেই পারেন না। হেষ্টিংস্‌ শুনিলেন না। তাহার উপর আবার ২৫ লক্ষ টাকা জরিমানা করিলেন। চৈৎসিংহ বিদ্রোহী হইলেন। হেষ্টিংস্ কাশীতেই ছিলেন, তিনি এই দুর্য্যোগ দেখিয়া চুনারে পলায়ন করিলেন। হেষ্টিংস্ চৈৎসিংহের বিরুদ্ধে সৈন্য পাঠাইলেন। যুদ্ধে পরাজিত হইয়া চৈৎসিংহ মালবে পলাইলেন। হেষ্টিংস্ তাঁহার সর্ব্বস্ব অধিকার করিলেন এবং কর দ্বিগুণ বাড়াইয়া চৈৎ সিংহের এক জন ভাগিনেয়কে রাজা করিলেন।

 অযোধ্যার নবাব সুজাউদ্দৌলার মৃত্যুর পর আসফউদ্দৌলা অযোধ্যায় নবাব হইলেন। অযোধ্যার নবাব ইংরেজদিগকে রোহিলা যুদ্ধের সাহায্যের জন্য যে অর্থ দিতে চাহিয়াছিলেন, তাহা এত দিন দিতে পারেন নাই; এবং আসফউদ্দৌলার সময় সেই ঋণ আরও বৃদ্ধি পাইয়াছিল। হেষ্টিংস্ তাঁহাকে ঋণ শোধ করিবার জন্য বার বার বলেন।আসফ বলিলেন, তাঁহার হস্তে আর অর্থ নাই, তবে পূর্ব্বের নবাবের বেগমদিগের নিকট বিস্তর ধন আছে, হেষ্টিংস্ যদি তাহা আদায় করিয়া দেন, তাহা হইলে ঋণ তৎক্ষণাৎ পরিশোধ হয়। হেষ্টিংস্ নবাবকে বেগমদিগের সম্পত্তি অধিকার করিতে অনুমতি দিলেন। ইংরেজ সৈন্যের সহায়তায় নবাব বেগমদিগের সর্ব্বস্ব কাড়িয়া লইলেন। হেষ্টিংস্ বিলাতে ফিরিলে, এই সকল কার্য্যের জন্য সাত বৎসর ধরিয়া পার্লিয়ামেণ্ট মহাসভায় তাঁহার বিচার হয়। তাহাতে তিনি ধন, মান সর্ব্বস্ব হারাইলেন। অবশেষে তিনি নির্দ্দোষ ইহা প্রমাণ হইল বটে, কিন্তু সাত বৎসর মকদ্দমা চালাইয়া সর্ব্বস্বান্ত হইয়া পড়িয়াছিলেন। হেষ্টিংস্ যতদিন বাঁচিয়াছিলেন, কোম্পানির কর্তৃপক্ষগণ তাঁহাকে যথাসাধ্য অর্থ সাহায্য করিয়াছিলেন।

 হেষ্টিংসের সময় কলিকাতায় আর এক ঘটনা ঘটে, তাহাতে কলিকাতার হিন্দু সমাজে মহা হুলস্থুল পড়িয়া যায়। হেষ্টিংসের সময় গভর্ণর জেনারেলের এক কৌন্সিল অর্থাৎ সভ। ছিল, বিলাত হইতে ইহার মেম্বর নিযুক্ত হইয়া আসিতেন। যদিও গভর্ণর সভাপতি ছিলেন, তথাপি এই মেম্বরদিগের বিস্তর ক্ষমতা ছিল। হেষ্টিংসের সময় ফিলিপ ফ্রান্‌সিস্ নামে এই সভার একজন প্রধান মেম্বর ছিলেন। তিনি হেষ্টিংসের অত্যন্ত বিরোধী ছিলেন এবং প্রত্যেক কাজেই তাঁহাকে বাধা দিতেন। এই কারণে পরস্পরের মধ্যে ঘোর শত্রুতা জন্মে, এমন কি এক সময়ে তাঁহাদিগের ভিতর দ্বন্দ্বযুদ্ধ পর্য্যন্ত হইয়াছিল। কৌন্সিলের সহিত হেষ্টিংসের এই শত্রুতার সুযোগ লইয়া, কলিকাতার একজন ধনী বাঙ্গালী মহারাজা নন্দকুমার হেষ্টিংসের নামে এই অভিযোগ করেন যে, তিনি ঘুষ লইয়া, তাঁহার পুত্র গুরুদাসকে নবাবের অধীনে চাকরি করিয়া দিয়াছেন। কৌন্সিলের মেম্বরগণ এ কথার সত্যাসত্য প্রমাণ করিতে হেষ্টিংসকে অনুরোধ করিলে, তিনি ঘৃণাপূর্ব্বক তাহা অস্বীকার করিলেন। ও দিকে মোহনপ্রসাদ নামে একব্যক্তি নন্দকুমারের নামে সুপ্রিমকোর্টে জালের মোকদ্দমা উপস্থিত করেন। বিচারে নন্দকুমার দোষী সাব্যস্ত হন এবং তাঁহার ফাঁসি হয়।

 বাঙ্গালাদেশে হেষ্টিংস্ যখন এই সকল ব্যাপার করিয়াছিলেন, তখন বম্বে ও মাদ্রাজ অঞ্চলে মহাকাণ্ড উপস্থিত হইতেছিল। পুণার মারাঠাগণ বিবাদ করিয়া বম্বের ইংরেজদিগের সাহায্য ভিক্ষা করেন। বম্বের গভর্ণমেণ্ট সাহায্য করিতে গিয়া প্রথম মারাঠা যুদ্ধে লিপ্ত হন। সন্ধি হইলে বম্বে গভর্ণমেণ্ট সালসিটি ও এলিফেণ্টা লাভ করিলেন।

 ওদিকে মাদ্রাজ অঞ্চলে ইংরেজদিগের ঘোর বিপদ উপস্থিত হইল। মান্দ্রাজের কর্তৃপক্ষদিগের বিসদৃশ ব্যবহারে মহীসুরের হায়দর আলী ও হায়দরাবাদের নিজাম ইংরেজদিগের ঘোরতর শত্রু হইয়া উঠিলেন এবং মারাঠাদিগের সহিত মিলিত হইয়া ইংরেজদিগকে সমূলে উৎপাটন করিবার জন্য ষড়যন্ত্র করিতে লাগিলেন। সেই সময়ে হেষ্টিংসের মত বিচক্ষণ লোক গভর্ণর না থাকিলে, ইংরেজদিগের পরিণাম যে কি হইত, তাহার ঠিক নাই। হেষ্টিংস্ কৌশল করিয়া নিজাম আর নাগপুরের মারাঠারাজকে বশীভূত করিলেন; কিন্তু হায়দার আলী তাঁহাদিগকে যারপর নাই ব্যতিব্যস্ত করিয়া তুলিলেন। হায়দর আলী এমন তেজের সহিত যুদ্ধ করিতে লাগিলেন যে, ইংরেজ সৈন্যেরা অস্থির হইয়া উঠিল। প্রথমে ইংরেজেরা পালিনোরের যুদ্ধে পরাজিত হন, কিন্তু শেষে ইংরেজদিগের ভাগ্য ফিরিল, এবং পোর্টনভো ও সেলিমগড়ের যুদ্ধে হায়দর পরাজিত হইলেন। হায়দরের মৃত্যুতে তাঁহার পুত্র টিপুর সহিত সন্ধি হইল (১৭৮৪ খৃষ্টাব্দে)। বম্বে এবং মান্দ্রাজে ইংরেজদিগকে এই সকল বিপদ হইতে উদ্ধার করিয়া হেষ্টিংস্ দেশে ফিরিলেন।

 লর্ড কর্ণওয়ালিস—(১৭৮৬–৯৩ খৃষ্টাব্দে) লর্ড কর্ণওয়ালিস একজন উপযুক্ত শাসনকর্তা ছিলেন। তিনি বাঙ্গালার জমিদারী সম্বন্ধে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত করিয়া চিরস্মরণীয় হইয়া আছেন। চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত এই যে, জমিদারগণ নির্দিষ্ট বার্ষিক কর দিবেন এবং ভবিষ্যতে ভূমির কর আর বাড়িবে না। ইহাতে বাঙ্গালাদেশের বড়ই মঙ্গল হইয়াছে।

 লর্ড কর্ণওয়ালিসের সময় টিপু সুলতানের সহিত আবার ইংরেজদিগের যুদ্ধ হয়। ত্রিবাঙ্কুরের রাজা ইংরেজদিগের করদ ছিলেন। টিপু তাঁহার রাজ্য আক্রমণ করাতে, তৃতীয় মহীসুর যুদ্ধ আরম্ভ হয়। এই যুদ্ধে নিজাম ও মারাঠারা ইংরেজদিগের সহিত যোগ দিয়াছিলেন। যুদ্ধে টিপু পরাজিত হন এবং অর্দ্ধেক রাজ্য ও তিন লক্ষ টাকা দিয়া সন্ধি করেন (১৭৯২ খৃষ্টাব্দে)। রাজ্য এবং টাকা নিজাম, মারাঠা ও ইংরেজ কোম্পানি সমান ভাগ করিয়া লইলেন।

 মারকুইস অব ওয়েলেস্‌লী—(১৭৯৮–১৮০৫ খৃষ্টাব্দে) ইহার শাসন সময়ে চতুর্থবার মহীশুরে যুদ্ধ হয়। ফরাসীদিগের সহিত টিপুর বন্ধুতাই এই যুদ্ধের কারণ। এই সময় ফরাসী বীর নেপোলিয়ানের সহিত ইংরাজদিগের তুমুল যুদ্ধ চলিতেছিল। নেপোলিয়ান মিসরে ছিলেন, পাছে তিনি ভারতবর্ষ আক্রমণ করেন, এই ভয়ে ইংরেজ কোম্পানি তখন শঙ্কিত ছিলেন। এরূপ অবস্থায় টিপুর ফরসীদিগের সহিত বন্ধুতা ইংরেজ গভর্ণমেণ্টের বড় ভয়ের কারণ হইল। ওয়েলেস্‌লি টিপুকে নিজামের ন্যায় ইংরেজ কোম্পানির সহিত পরস্পরের সহায়তা করিবার জন্য প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হইতে বলিলেন। তাহাতে টিপু অস্বীকার করেন। তখন টিপুর সহিত যুদ্ধ করাই স্থির হইল। টিপু বীরের মত যুদ্ধক্ষেত্রে প্রাণত্যাগ করিলেন। সেই সঙ্গে মহীসুরের মুসলমান রাজবংশ লোপ পাইল।

 ওয়েলেস্‌লী পুরাতন হিন্দু-রাজবংশের একজনকে রাজা করিলেন। টিপুর পুত্রেরা ইংরেজ কোম্পানির বৃত্তিভোগী হইয়া প্রথমে বিলোরে শেষে কলিকাতায় আসিয়া বাস করিতে লাগিলেন। যুদ্ধের পর মহীশুর রাজ্যের অধিকাংশ নিজাম, ইংরেজ ও মারাঠারা ভাগ করিয়া লইলেন। এখন মান্দ্রাজ প্রেসিডেন্সির সীমা যতদূর, তখন মান্দ্রাজ অঞ্চলে ইংরেজ রাজ্য ততদূর বিস্তৃত হইল। ওয়েলেস্‌লী টিপুকে বিনাশ করিলেন। নিজামকে বশীভূত করিলেন, এখন যাহাতে দুর্দান্ত মারাঠাদিগকে জব্দ করিতে পারেন, সেই চেষ্টায় রহিলেন এবং শীঘ্রই তিনি সে সুযোগ পাইলেন।

 তোমাদের হয় ত পাঁচটি মারাঠা রাজ্যের কথা মনে আছে:―(১) পুণার পেশওয়া (২) গুজরাটের গাইকোয়াড় (৩) সিন্ধিয়া (৪) হোলকার (৫) নাগপুরের ভোঁসলে। ওয়েলেস্‌লীর সময় দ্বিতীয় মারাঠা যুদ্ধ হয়। এই যুদ্ধে ইংরেজ কোম্পানি পেশওয়ার হইয়া যুদ্ধক্ষেত্রে অবতীর্ণ হন। অন্য সকল মারাঠা রাজারা ইহাদের বিরোধী পক্ষ ছিলেন। স্বয়ং গভর্ণর জেনারেল এবং তাঁহার ভ্রাতা এই যুদ্ধের নেতা ছিলেন। আসাই, আর্গাম, আলিগড়, লাসোয়ারি প্রভৃতি স্থানে মারাঠারা পরাজিত হইল। গাইকোয়াড়, ভোঁসলে ও সিন্ধিয়া ইংরেজদিগের সহিত সন্ধি করিলেন। কেবল হোলকার বশীভূত হইলেন না। পরে সিন্ধিয়াও আবার হোলকারের সহিত যোগ দিলেন।

 ওয়েলেস্‌লী এই সকল যুদ্ধ করিয়া, ইংরেজ কোম্পানির রাজ্যের সীমা অনেক বাড়াইলেন বটে, কিন্তু বিলাতের কর্তৃপক্ষেরা এইরূপ রাজ্য-বৃদ্ধির একান্ত বিরোধী ছিলেন; তাঁহারা ওয়েলেস্‌লীর ব্যবহারে বিরক্ত হইয়া তাঁহাকে ডাকিয়া লহলেন।

 লর্ড ময়রা বা মারকুইস্‌ অব হেষ্টিংস্‌—(১৮১৩—২৩ খৃঃ অঃ) লর্ড ময়রা ৯ বৎসর গভর্ণর জেনারেল ছিলেন তাঁহার সময়ে ইংরেজ কোম্পানির বিস্তর রাজ্য বৃদ্ধি হইয়াছিল। তাঁহার শাসনকালে দুইটি প্রধান যুদ্ধ হয়। (১) নেপালের গুর্খাদিগের সহিত যুদ্ধ। (২) মারাঠাদিগের সহিত শেষ যুদ্ধ।

 নেপাল যুদ্ধ—গুর্খারা নেপালের বীর পার্ব্বত্যজাতি। ইহাদিগের অত্যাচারে চারিদিকের লোকেরা সর্ব্বদাই ভয়ে ভয়ে বাস করিত। ক্রমে তাহারা পর্ব্বত হইতে নামিয়া গঙ্গা নদীর উপকূলে উপদ্রব আরম্ভ করিল। ইংরেজ রাজ্য আক্রমণ করাতে পূর্ব্বের গভর্ণরেরা তাহাদিগকে বার বার সাবধান করিয়া দিয়াছিলেন; কিন্তু তাহারা পূর্ব্ববৎ ইংরেজ রাজ্যে উপদ্রব করিতে লাগিল। তখন অগত্যা গুর্খাদিগের সহিত যুদ্ধ করাই স্থির হইল। ১৮১৫ খৃষ্টাব্দে জেনারেল অক্টারলনি তাহাদিগের পার্ব্বত্য দুর্গ সকল একে একে জয় করিলেন। তখন নেপাল-রাজ সন্ধি করিতে বাধ্য হইলেন এবং নৈনিতাল, মসুরি ও সিমলা ইংরেজদিগকে ছাড়িয়া দিলেন। তখন হইতে এই সকল স্থান ইংরেজদিগের আরামের বাসস্থান হইয়াছে।

 পিণ্ডারী যুদ্ধ—উত্তরে হিমালয়ে যখন গুর্খাদিগের সহিত যুদ্ধ চলিতেছিল, তখন মধ্য ভারতবর্ষে পিণ্ডারী নামে একদল ডাকাত ইংরেজ অধিকারে মহা উৎপাত করিতেছিল। এই ভয়ানক দস্যুরা দলে দলে, এমন কি শত সহস্র জন মিলিত হইয়া গ্রামে গ্রামে পড়িয়া লোকদিগকে ধনে প্রাণে সারা করিত। পিণ্ডারী সর্দারগণের সহিত মারাঠারাজাদিগের ভিতরে ভিতরে সদ্ভাব ছিল। সেই জন্য ইংরেজ কোম্পানি এত দিন পিণ্ডারীদিগকে বিনাশ করিতে পারেন নাই। এক্ষণে ইহাদের দৌরাত্ম্য অসহ্য হওয়াতে লর্ড ময়রা ইহাদিগকে সমূলে বিনাশ করিতে সঙ্কল্প করিলেন। তিনি প্রকাণ্ড দুই দল সৈন্য প্রস্তুত করিয়া, উত্তর এবং দক্ষিণদিক্‌ হইতে ক্রমশঃ আসিয়া, মধ্যভারতে পিণ্ডারীদিগের আবাসস্থান বেষ্টন করিয়া দুর্দান্ত দস্যুদিগকে দলে দলে বিনাশ করিতে লাগিলেন (১৮১৭ খৃষ্টাব্দে)। তখন অসহায় হইয়া করীম, আমীর খাঁ প্রভৃতি সর্দারগণ ইংরেজদিগের পদানত হইল। পিণ্ডারীদিগের বিনাশের সঙ্গে সঙ্গে মধ্যভারতবর্ষ ইংরেজদিগের হস্তে পড়িল। পিণ্ডারী দস্যুগণের বিনাশে দেশের লোকেরা শান্তিলাভ করিল।

 শেষ মারাঠা যুদ্ধ—শেষ মারাঠা যুদ্ধের পর পুণায় এক জন ইংরেজ রেসিডেণ্ট অবস্থিতি করিতেছিলেন। পেশওয়া বিদ্রোহী হইয়া হঠাৎ তাঁহাকে হত্যা করেন। এই কারণে শেষ মারাঠা যুদ্ধ আরম্ভ হয়। এই সময়ে একে একে সকল মারাঠারাজগণই ইংরেজদিগের বিদ্রোহী হইলেন। ইংরেজ সৈন্য একে একে সকলকেই পরাজিত করিল। পেশওয়াকে পরাস্ত করিয়া ইংরেজ কোম্পানি তাঁহার রাজ্য কাড়িয়া লইলেন। তখন হইতে পেশওয়া পদ উঠিয়া গেল। পেশওয়া বাজীরাও ৮ লক্ষ টাকা বার্ষিক বৃত্তি পাইয়া, কাণপুরের নিকট বিঠুর নামক স্থানে বাস করিতে লাগিলেন। পেশওয়ার রাজ্য লইয়াই এখনকার বম্বে প্রেসিডেন্সী হইয়াছে। সেতারায় শিবাজীর বংশের এক জনকে ইংরেজেরা নামমাত্র পেশওয়া করিলেন।

 নাগপুরেও একজন বালককে ইংরেজেরা রাজপদ দিলেন, এবং একজন ইংরেজ রেসিডেণ্ট সেখানে থাকিয়া, সকল রাজকার্য্য চালাইতে লাগিলেন। হোলকারের রাজপদেও একজন বালক প্রতিষ্ঠিত হইল; সেখানেও ইংরেজেরা সকল প্রকার কর্ত্তৃত্ব করিতে লাগিলেন। মারাঠাদিগের সহিত ইংরেজদিগের এই শেষ যুদ্ধ; এই যুদ্ধের পর মারাঠাদিগের প্রতাপ চিরদিনের মত লয় পাইয়াছে। রাজপুতানার যত রাজা এই যুদ্ধের পর ইংরেজ কোম্পানির আশ্রিত হইলেন।

 লর্ড আমহার্ষ্ট—(১৮২৩—২৮ খৃঃ অঃ) ইহার শাসন সময়ে মগদিগের সহিত ইংরেজদিগের প্রথম যুদ্ধ হয়। মগরাজ আরাকানবাসীদিগের উপর ঘোরতর অত্যাচার করেন। যদিও তাহারা তাহার প্রজা ছিল, কিন্তু অত্যাচার সহ্য করিতে না পারিয়া, ইংরেজ রাজ্যে আসিয়া আশ্রয় লইল। মগরাজ এই সকল পলাতকদিগকে তাঁহার হস্তে দিবার জন্য ইংরেজ গভর্ণরকে অনুরোধ করিলেন। কিন্তু ইংরেজেরা শরণাগতদিগকে পরিত্যাগ করিতে চাহিলেন না। ইহাতে যুদ্ধ উপস্তিত হয়। মগ-সেনাপতি কাছাড় ও আসাম জয় করিয়া ব্রিটীশ অধিকারে প্রবেশ করিল। ইংরেজেরা ওদিকে সমুদ্র পার হইয়া রেঙ্গুণ আক্রমণ করিলেন। যুদ্ধে ইংরেজেরা জয়ী হইলেন। সন্ধি হইলে মগরাজ ইংরেজ কোম্পানিকে যুদ্ধের ব্যয় এক কোটী টাকা দিলেন এবং আসাম, আরাকান ও টেনাসিরিম ইংরেজদিগকে ছাড়িয়া দিলেন। তখন হইতে এই সকল স্থান ইংরেজ রাজ্যভুক্ত হইয়াছে (১৮২৬ খৃঃ অঃ)।

 ভরতপুর অধিকার—জাঠরাজ বলবন্ত সিংহকে হত্যা করিয়া তাঁহার পিতৃব্যপুত্র দুর্জ্জনশাল ভরতপুরের রাজা হইলেন। ইংরেজ কোম্পানি পূর্ব্বের জাঠরাজের সহিত মিত্রতার অনুরোধে দুর্জ্জনশালের সহিত যুদ্ধে প্রবৃত্ত হন এবং দুর্জ্জয় ভারতপুরের কেল্লা ইংরেজেরা দখল করেন (১৮২৭ খৃষ্টাব্দে) এবং তখন হইতে ভরতপুরের রাজা ইংরেজদিগের অধীন হইলেন।

 লর্ড উইলিয়ম বেণ্টিঙ্ক—ইহার ন্যায় মহামনা গভর্ণর জেনারেল এদেশে অতি অল্পই আসিয়াছেন।

 এখন দেশে কত বড় বড় বাঙ্গালী ডাক্তার দেখিতেছ। বেণ্টিঙ্কই ইহাদিগের উন্নতির পথ খুলিয়া দিয়াছিলেন। তিনিই কলিকাতার মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন। বেণ্টিঙ্ক কেবল যে মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠা করিয়াছিলেন, তাহা নয়; ইংরেজী শিক্ষা প্রচলন ও উচ্চ শিক্ষা বিস্তার করিয়া, তিনি আমাদিগের দেশের লোকের জ্ঞানচক্ষু খুলিয়া দিয়াছেন। এই যে আজ বি, এ,; এম, এ,; উপাধিধারী বিদ্বান্ যুবা দিগকে দেখিতেছ—যাহারা জ্ঞানলাভ করিয়া কত সুখী—বেণ্টিঙ্কই ইহাদিগের উন্নতির পথ খুলিয়া দিয়াছেন। বেণ্টিঙ্ক যে কেবল এদেশের লোকের মধ্যে শিক্ষা বিস্তারের জন্য ব্যস্ত ছিলেন, তাহা নয়। সকল প্রকার কুরীতি কুনীতি ও অন্যায় দেশাচার যাহাতে রহিত হয়, প্রাণপণে সেই চেষ্টাও করিয়াছিলেন। তোমরা হয় ত শুনিয়াছ, পূর্ব্বে আমাদের দেশের অনেক স্ত্রীলোক স্বামীর মৃত্যু হইলে, স্বামীর সহিত চিতায় পুড়িয়া মরিতেন। বহুকাল হইতে এই প্রথা আমাদের দেশে চলিয়া আসিতেছিল। অনেক সতী যথার্থ ই অম্লানবদনে ও অকাতরে স্বামীর সহিত পুড়িয়া মরিতেন, এবং দেশের লোকেরা তাঁহাদিগকে সতীলক্ষ্মী বলিয়া দেবতার মত পূজা করিত। অনেক স্ত্রীলোক এইরূপে আদর ও সম্মান পাইবার ইচ্ছায় বা অন্য কোন কারণে স্বামীর সহিত পুড়িয়া মরিতে চাহিতেন। কিন্তু শেষে আগুনের জ্বালা সহ্য করিতে না পারিয়া উঠিয়া পলাইতে চেষ্টা করিলে লোকেরা শুনিত না, বাঁশ দিয়া চাপিয়া ধরিয়া রাখিত। এইরূপে এক প্রকার জোর করিয়া অনেক বিধবাকে হত্যা করা হইত। বেণ্টিঙ্কের এই দেশাচার ভয়ানক বলিয়া বোধ হইল। তিনি বিধবাদিগের স্বামীর চিতানলে পুড়িয়া মরিবার রীতি রহিত করিলেন।

 এই সকল সৎকার্য্য করিয়া, বেণ্টিঙ্ক আমাদের সকলেরই প্রাতঃস্মরণীয় হইয়াছেন। এই সকল সাধু কার্য্যে বেণ্টিঙ্কের সহিত আর একজন দেশীয় মহাপুরুষের নাম জড়িত। তিনি কে জান? মহাত্মা রাজা রামমোহন রায়। সতীদাহ নিবারণ ও ইংরেজী শিক্ষা প্রচলনের জন্য তিনি প্রাণপণে চেষ্টা করিয়াছিলেন এবং লর্ড বেণ্টিঙ্ককে বিস্তর সাহায্য করিয়াছিলেন।

 সেকালে বাঙ্গালাদেশে ডাকাতদিগের বড় অত্যাচার ছিল। তোমরা হয় ত ডাকাতদিগের গল্প কত শুনিয়াছ। “ঠগী” বলিয়া একদল ডাকাত ছিল। তাহারা ছদ্মবেশে পথিকদিগের সহিত জুটিয়া পথে যাইতে যাইতে হঠাৎ তাহাদিগের গলায় ফাঁসি দিয়া মারিয়া ফেলিত, এবং তাহাদিগের যথাসর্ব্বস্ব লইয়া পলাইত। লর্ড বেণ্টিঙ্ক প্রজাদিগকে ঠগীর অত্যাচার হইতে রক্ষা করিতে সঙ্কল্প করিলেন। কাপ্তেন শ্লিমানের চেষ্টায় কয়েক বৎসরের মধ্যে ১৫৬২ জন ঠগ ধরা যায়। ঠগেরা নিজের প্রাণ বাঁচাইবার জন্য সঙ্গীদিগকে ধরাইয়া দিত, এই প্রকারে ঠগেরা অনেকেই ধরা পড়ে।

 বেণ্টিঙ্কের সময় রাজ্য বিস্তারের মধ্যে কেবল হিন্দুরাজ্য “কুর্গ” ইংরেজ অধিকারে আইসে। তাহাও বেণ্টিঙ্ক ইচ্ছাপূর্ব্বক গ্রহণ করেন নাই। কুর্গের রাজা বীররাজ প্রজাদিগের উপর ভয়ানক অত্যাচার করেন। তাহাতে প্রজারা ইচ্ছাপূর্ব্বক ব্রিটীশরাজের নিকট আত্মসমর্পণ করে।

 লর্ড অক্‌ল্যাণ্ড—(১৮৩৬—৪২ খৃষ্টাব্দে) ইহার সময়ে কাবুলে প্রথম যুদ্ধ হয়। এ যুদ্ধের ফল অতি শোচনীয় এবং সেই সময় হইতে ভারত সীমান্তে যে যুদ্ধের বীজ রোপণ করা হইয়াছে, তাহার ফল আজও ফলিতেছে।

 লর্ড হার্ডিঞ্জ—(১৮৪৪—৪৮ খৃষ্টাব্দ) লর্ড এলেনবরার পর লর্ড হার্ডিঞ্জ গভর্ণর হইয়া আসিলেন। ইহার সময়ে প্রথম শিখ যুদ্ধ হয়।— মহারাজ রণজিৎসিংহ অতিশয় সুযোগ্য ও শক্তিশালী ব্যক্তি ছিলেন। তাঁহার অধীনে শিখসৈন্য এক প্রবল শক্তি হইয়া উঠে। তাঁহার মৃত্যুর পর রাজ্যে ঘোর বিশৃঙ্খলা ও অরাজকতা উপস্থিত হইল। রণজিৎ সিংহের যে কয়জন সুযোগ্য সেনাপতি ছিল, তাঁহার মৃত্যুর পর একে একে তাঁহাদিগের সকলের মৃত্যু হয়। রণজিৎ সিংহের মৃত্যুর পর তাঁহার পুৎত্র খড়্গ সিংহ পঞ্জাবের রাজা হইলেন। খড়্গ সিংহ ও তাঁহার পুত্র নিওনিহাল সিংহের মৃত্যু হইলে, রণজিৎ সিংহের দ্বিতীয় পুত্র শের সিংহ রাজা হন এবং দান সিংহ তাঁহার উজীর নিযুক্ত হইলেন। কিন্তু অচিরে দান সিংহের সহিত শের সিংহের বিবাদ উপস্থিত হইল। কারণ দান ইংরেজদিগের ঘোর শত্রু ছিলেন। কিন্তু শের সিংহের সে ভাব ছিল না। দান বিদ্রোহী হইয়া শের সিংহকে হত্যা করেন এবং নিজেও ত্বরায় নিহত হইলেন। তখন দান সিংহের ভ্রাতা হীরা সিংহ রণজিৎ সিংহের কনিষ্ঠ পুত্র দলীপ সিংহকে পঞ্জাবের রাজা বলিয়া ঘোষণা করিলেন।

 তখন দলীপ দশ বৎসরের বালক। হীরা সিংহ স্বয়ং তাঁহার উজীর হইলেন। শিখসৈন্যদিগকে খালসা বলিত। এই খালসাগণ এমন দুর্দ্ধর্ষ, এমন তেজস্বী ও এমন যথেচ্ছাচারী ছিল যে, বলিতে গেলে রাজ্যমধ্যে তাহারাই প্রবল শক্তি ছিল। ইহাদিগের উপদ্রবে দলীপের জননী রাণী ঝিন্দন ও উজীর সর্ব্বদাই শশব্যস্ত থাকিতেন। হীরা সিংহ সাধ্যমতে খালসাদিগের ক্ষমতা খর্ব্ব করিতে চেষ্টা করিলেন। কিন্তু তাহার ফল এই হইল যে, খালসাদিগের হস্তে তিনি প্রাণ হারাইলেন। তখন রাণী লাল সিংহ নামে একজন ব্রাহ্মণকে উজীর করিলেন। কাবুলে ইংরেজদিগের লাঞ্ছনার পর হইতেই শিখ সৈন্যগণ ইংরেজ সৈন্যদিগের সহিত বাহুবল পরীক্ষা করিবার জন্য একান্ত উৎসুক হইয়া উঠে। লাল সিংহ তাহাদিগকে নানা প্রকারে নিবৃত্ত করিবার চেষ্টা করেন, কিন্তু তাহাদিগের দুর্দমনীয় রণপিপাসা কিছুতেই শান্ত হইল না। সৈন্যগণ রাজ্যের ঘোর অশান্তির কারণ হইয়া উঠিল। তখন রাণী ও উজীর মহাশয় আর অন্য উপায় না দেখিয়া, খালাসাদিগকে ইংরেজরাজ্য আক্রমণ করিবার অনুমতি দিলেন। তাহারাও ঘোর রবে ইংরেজ অধিকারে প্রবেশ করিল। এইরূপে খালসাদিগের অত্যাচারে প্রথম শিখযুদ্ধ আরম্ভ হয় (১৮৪৫ খৃঃ অঃ)। মুদকি, ফিরোজ সহর, আলিওয়াল ও সোব্রাও নামক স্থানে যুদ্ধ হয়। যুদ্ধে যদিও অবশেষে শিখসৈন্য পরাস্ত হয়, কিন্তু ইংরেজ পক্ষ সহজে যুদ্ধে জয়ী হইতে পারেন নাই। যুদ্ধে বিস্তর ইংরেজ সৈন্য নষ্ট হয়। ভারতবর্ষে ইংরেজেরা
শিখসৈন্য—খালসা।
অনেক যুদ্ধ করিয়াছেন, কিন্তু এমন ভয়ঙ্কর যুদ্ধ কখন করেন নাই। ইংরেজেরা শতদ্রু পার হইয়। লাহোরের অদূরে মিয়ানমির নামক স্থানে গিয়া উপস্থিত হইলেন। সেখানে গোলাপ সিংহ ইংরেজদিগের নিকট সন্ধির প্রস্তাব লইয়া উপস্থিত হইলেন। সন্ধির ফল এই হইল যে, পঞ্জাবরাজ শতদ্রু ও বিপাশার মধ্যবর্তী দেশ ইংরেজদিগকে ছাড়িয়া দিলেন; এবং যুদ্ধের ব্যয়স্বরূপ কোম্পানিকে দেড় কোটি টাকা দিতে চাহিলেন। কিন্তু রাজকোষে তত টাকা না থাকাতে গোলাপ সিংহকে এক কোটি টাকায় কাশ্মীর বিক্রয় করিলেন। এখন পর্যন্ত এই গোলাপ সিংহের বংশধরেরা কাশ্মীরে রাজত্ব করিতেছেন।

 লর্ড ডালহৌসি—(১৮৪৭-৫৯ খৃঃ অঃ) লর্ড ডালহৌসি “গভর্ণর হইয়া আসিবার ছয় মাস পরে দ্বিতীয় শিখযুদ্ধ আরম্ভ হয়। মুলতানের শাসনকর্তা মূলরাজ পঞ্জাবরাজের অধীন ছিলেন। তিনি যখন ঐ পদ প্রাপ্ত হন, তখন পঞ্জাবরাজকে ১,৮০,০০০ টাকা দিতে প্রতিশ্রুত হন। কিন্তু তাহা পরিশোধ না করায়, ইংরেজ গভর্ণমেণ্ট ঋণ শোধ করিবার জন্য মুলরাজকে বার বার অনুরোধ করেন। তাহাতে মূলরাজ পদত্যাগ করেন। ইংরেজেরা তখন ঐ পদে আর এক ব্যক্তিকে প্রতিষ্ঠিত করেন, এবং এই নূতন শাসনকর্ত্তাকে লইয়া একদল ইংরেজ সৈন্য মুলতানে যাত্রা করে। মূলরাজ প্রকাশ্যে ইহাদিগের হস্তে সহরের চাবি দিলেন বটে, কিন্তু সেই রাত্রেই বিদ্রোহী হইয়া ইংরেজ সৈন্যদিগকে আক্রমণ করিলেন। ওদিকে লাহোর হইতে ইংরেজদিগের সাহায্যার্থ শের সিংহের অধীনে একদল সৈন্য আসিতেছিল, তাহারাও বিদ্রোহী হইল।

 শের সিংহ এবং তাঁহার পিতা ছত্র সিংহ উভয়েই ইংরেজদিগের ঘোর শত্রু হইয়া দাড়াইলেন। এমন কি ছত্র সিংহ পেশওয়ার ছাড়িয়া দিবার প্রস্তাব করিয়া, দোস্ত মহম্মদকে পর্য্যন্ত আপনাদিগের সহায় করিয়া লইলেন। আবার শিখদিগের সহিত ইংরেজ সৈন্যের রীতিমত যুদ্ধ আরম্ভ হয়। চিলিওয়ানআলা গ্রামে প্রথম · শিখ যুদ্ধ (১৮৪৯ খৃঃ অঃ) হয়। তাহাতে শিখসৈন্যই জয়যুক্ত হয়। কিন্তু তাহার পরে গুজরাটে আর এক যুদ্ধ হইল, তাহাতে শিখেরা একেবার পরাজিত হয়। শের সিংহ এবং তাঁহার শিখ সেনাপতিগণ ১৬,০০০ অতি উৎকৃষ্ট খালসা সৈন্য লইয়া ইংরেজ সেনাপতির হস্তে আত্ম-সমর্পণ করেন। যুদ্ধের ফল হইল যে, পঞ্জাব ইংরেজ রাজ্যভুক্ত হইল। পঞ্জাব অধিকার করিয়াই ইংরেজ গভর্ণণ্টে সমুদায় শিখদিগকে নিরস্ত্র করিলেন। মহারাজ দলীপ সিংহ ইংরেজ গভর্ণমেণ্টের বৃত্তিভোগী হইয়া বিলাতে গমন করিলেন।

 পঞ্জাব অধিকৃত হইল, তাহার সুশাসন ও সুবন্দোবস্তের ভার সার্ হেন্‌রি লরেন্সের উপর ন্যস্ত হয়। ইনি অতি সুযোগ্য ব্যক্তি ছিলেন। রাস্তা নির্ম্মাণ, স্কুল স্থাপন প্রভৃতি সৎকার্য্যের দ্বারা এই অল্প সময়ের মধ্যেই পঞ্জাবের শ্রী একেবারে ফিরিয়া গিয়াছে। রণজিৎ সিংহের যে প্রমত্ত রণপিপাসু সৈন্যগণ আপনাদিগের এবং অপরের রাজ্যের ভীতি স্বরূপ ছিল, তাহারা এখন ব্রিটীশ রাজ্যের প্রধান বল হইয়া দাড়াইয়াছে।

 দ্বিতীয় ব্রহ্ময দ্ধশিখযুদ্ধ শেষ হইতে না হইতেই আবার ব্রহ্মযুদ্ধ আরম্ভ হয়। ব্রহ্মদেশে যে ইংরেজ রেসিডেণ্ট ছিলেন, তাঁহার প্রতি ব্রহ্মরাজ এমন ব্যবহার করেন যে, তিনি সে স্থান পরিত্যাগ করিতে বাধ্য হন। রেঙ্গুণের ইংরেজ বণিক্‌দিগের প্রতি মগ শাসনকর্তা অত্যন্ত মন্দ ব্যবহার করেন। গভর্ণর জেনারল মগরাজকে তাহার প্রতিবিধান করিতে বলিলে, তিনি তাহাতে কর্ণপাতও করেন নাই; এই কারণেই দ্বিতীয় ব্রহ্মযুদ্ধ আরম্ভ হইল। যুদ্ধে মগরাজ পরাজিত হইলেন, এবং মার্টাবান, রেঙ্গুণ, বেসিন, প্রোম, পেগু ইংরেজদিগের হস্তগত হইল। ব্রহ্মবাসিগণ ইংরেজ গভর্ণমেণ্টের অধীন হইয়া স্বচ্ছন্দে আছে, এবং তখন হইতে ব্রহ্মদেশের শ্রী ফিরিয়া গিয়াছে।

 লর্ড ডালহৌসির সময় শুধু পঞ্জাব এবং ব্রহ্মদেশ ইংরেজ রাজ্যভুক্ত হয়, তাহা নহে। সেতারা, ঝান্সী, নাগপুর, বিরার এবং অযোধ্যা ইংরেজ রাজ্যের অন্তর্গত হইল। বিরার, সেতারা, ঝান্সী, এবং নাগপুরের রাজাদিগের অপুত্রক অবস্থায় মৃত্যু হওয়াতে, ডালহৌসি এ সকল দেশ ইংরেজ রাজ্যভুক্ত করিয়া লইলেন।

 অযোধ্যার নবাব ওয়াজিদ আলি শাহ অনেক দিন হইতে অতি আযোগ্যতার সহিত রাজ্য শাসন করিতেছিলেন। পূর্ব্বের গভর্ণরগণ তাঁহাকে বার বার সাবধান করিয়া দেন, কিন্তু তাহাতে কোন ফল হয় নাই। অবশেষে লর্ড ডালহৌসি অযোধ্যার নবাবকে পদচ্যুত করিয়া অযোধ্যা ইংরেজ-রাজ্যভুক্ত করিতে সঙ্কল্প করিলেন। সে অনুসারে ১৮৫৬ খৃঃ অব্দে অযোধ্যার ইংরেজ রেসিডেণ্ট জেনারল আউটরামকে অযোধ্যার শাসনভার গ্রহণ করিতে বলিলেন। ওয়াজিদ আলি অশ্রুপূর্ণলোচনে বিনীতভাবে রাজ্য হইতে বিদায় গ্রহণ করিলেন। শিবপুর বাগানের পরপারে গঙ্গার ধারে মেটীয়াবুরুজের যে নবাবের বাড়ী দেখ, তাহাই ওয়াজিদ আলি সার বাসভবন। ইংরেজ গভর্ণমেণ্ট বৎসরে লক্ষ টাকা ওয়াজিদ আলি শার বৃত্তি নির্দ্দিষ্ট করেন।

 লর্ড ডালহৌসি অতিশয় কর্ম্মঠ পুরুষ ছিলেন। তাঁহার শাসন সময়ে শুদ্ধ যে ইংরেজ-রাজ্য চারিদিকে বিস্তৃত হয়, তাহা নহে। তিনি রাজ্যের চতুর্দ্দিকে টেলিগ্রাফের তার ও রেলপথ বিস্তার এবং ডাকের সৃষ্টি করিয়া, প্রজাদিগের বিশেষ উপকার করেন। গ্রাণ্ড ট্রাঙ্ক রোড এবং অনেক সহর তাঁহার সময় নির্ম্মিত হয়। কিন্তু অযোধ্যার নবাবকে সিংহাসনচ্যূত করাতে এবং সেতারা, ঝান্সী ও নাগপুর প্রভৃতি রাজপদ উঠাইয়া দেওয়াতে এ দেশের লোকেরা তাঁহার সৎকার্য্যের কথা ভুলিয়া যায়। লর্ড ডালহৌসি ত রাজ্য বৃদ্ধি করিয়া গেলেন, কিন্তু তাঁহার পরের গভর্ণর জেনারলকে কিরূপে সে রাজ্যবৃদ্ধির ধাক্কা সামলাইতে হইয়াছিল, তাহা পরে বলা যাইবে।