বিষয়বস্তুতে চলুন

ভারতবর্ষের ইতিহাস (হেমলতা দেবী)/তৃতীয় পরিচ্ছেদ

উইকিসংকলন থেকে

তৃতীয় পরিচ্ছেদ।

 আর্য্যগণের রাজ্য বিস্তার—আর্য্যগণ পশ্চিম হইতে পূর্ব্বে আসিতে লাগিলেন, এবং ক্রমে বিন্ধ্যাচল পার হইয়া দক্ষিণাপথেও যাইতে লাগিলেন। তখন ভারতবর্ষের সর্ব্বত্রই অসভ্যজাতির বাস ছিল। অসভ্যজাতিদিগকে তাড়াইয়া, বন কাটিয়া, তাঁহারা গ্রাম ও সহর করিয়াছিলেন। আর অসভ্যদিগের মধ্যে যে সকল লোক তাঁহাদের অধীন হইল, তাহাদিগকে তাঁহারা শূদ্র, এই নাম দিলেন। শূদ্রেরা ক্রীতদাসের মত হইল। এইরূপে ভারতবর্ষে এক রাজ্যের পর অপর রাজ্য ও কত নূতন নূতন রাজ্য স্থাপিত হইতে লাগিল। সে সময়ে কোনও রাজ্যের রাজা খুব প্রতাপশালী হইলে অন্য সকল রাজাকে পরাজয় করিয়া তিনি আপনাকে সকলের সম্রাট্ বলিয়া ঘোষণা করিতেন। এইরূপে কখনও বা কুরু রাজ্য, কখনও বা কোশল রাজ্য, কখনও বা মগধ রাজ্য, এক এক সময়ে এক এক রাজ্য সর্ব্বপ্রধান হইয়া উঠিত। এইরূপে ভারতবর্ষে ছোট বড় অসংখ্য রাজ্য স্থাপিত হইতে লাগিল। যখন বুদ্ধদেব জন্মগ্রহণ করিয়া বৌদ্ধধর্ম্ম প্রচার করেন, তখন মগধ রাজ্যই সর্ব্বপ্রধান ছিল। বুদ্ধদেবের সময়ে বিম্বিসার নামক মহাপরাক্রান্ত এক রাজা মগধে রাজত্ব করিতেছিলেন। তাঁহার পুত্র অজাতশত্রু প্রায় সমুদায় আর্য্যাবর্তকে একছত্র করিয়াছিলেন। অজাতশত্রুর মৃত্যুর পর কয়েকজন রাজা হন; তাহার পর ৩৭০–৩২০ পূঃ খৃঃ পর্য্যন্ত নন্দবংশীয় নয় জন রাজা মগধে রাজত্ব করেন।

 আলেক্‌জাণ্ডারের আক্রমণ—শেষ নন্দের সময় ভুবনবিজয়ী গ্রীক বীর আলেক্‌জাণ্ডার ভারতবর্ষে আসেন এবং পরে দেশে ফিরিয়া যান। তিনি শতদ্রু পর্য্যন্ত জয় করিয়াছিলেন; আলেকজাণ্ডার দুই বৎসর ভারতবর্ষে ছিলেন; পাঞ্জাবের তখনকার রাজা পুরুর সহিত তাঁহার যুদ্ধ হয়। সেই যুদ্ধে পুরু পরাজিত হইয়া বন্দী অবস্থায় আলেক্‌জাণ্ডারের সন্মুখে নীত হন। আলেকজাণ্ডার পুরুকে জিজ্ঞাসা করিলেন “তুমি আমার নিকট কিরূপ ব্যবহারের প্রত্যাশা কর”; তাহাতে পুরু সগৌরবে উত্তর করিলেন “রাজার ন্যায়”—তাহাতে আলেকজাণ্ডার অত্যন্ত সন্তুষ্ট হইয়া তাঁহাকে মুক্তি দিয়া স্বরাজ্যে প্রতিষ্ঠিত করেন। ইহা ভিন্ন অন্যান্য ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাজার সহিত আলেক্‌জাণ্ডারের যুদ্ধ হইয়াছিল। কিন্তু আলেক্‌জাণ্ডারের সহিত যুদ্ধে সকলকেই পরাজয় স্বীকার করিতে হইয়াছিল।

 চন্দ্রগুপ্ত—কথিত আছে আলেক্‌জাণ্ডার যখন এ দেশে আসেন, তখন মগধ রাজ্য হইতে চন্দ্রগুপ্ত নামে একজন অতিশয় বুদ্ধিমান্ লোক পলাইয়া তাঁহার নিকট যান; আলেক্‌জাণ্ডার চলিয়া গেলে, চন্দ্রগুপ্ত পাঞ্জাব হইতে অনেক সৈন্য সামন্ত সংগ্রহ করিয়া চাণক্য পণ্ডিত নামক একজন অতিশয় বুদ্ধিমান্ ব্রাহ্মণের সাহায্যে শেষ, নন্দকে হারাইয়া মগধের রাজা হন। চন্দ্রগুপ্ত জাতিতে নীচ ছিলেন। বলিয়া, সকলে তাঁহাকে ঘৃণা করিত; কিন্তু তাঁহার ন্যায় প্রতাপশালী রাজা পূর্ব্বে আর কেহই মগধের সিংহাসনে বসেন নাই। চন্দ্রগুপ্তের রাজধানীতে সেই সময়ে মেগাস্থিনিশ নামক একজন গ্রীক, দূতের কার্য্যে নিযুক্ত হইয়া বাস করিতেন; তাঁহার রচিত গ্রন্থ হইতে আমরা মগধের সেই সময়ের সভ্যতা ও পরাক্রমের কথা জানিতে পারি। চন্দ্রগুপ্ত গ্রীকরাজা সেলিউকসের কন্যাকে বিবাহ করিয়াছিলেন। তিনি অতিশয় প্রতাপশালী রাজা ছিলেন; তাঁহার নামে সমগ্র আর্য্যাবর্ত্ত কাঁপিত।

 গ্রীক-লিখিত ভারতবর্ষের বিবরণ—গ্রীকেরা ভারতবর্ষ সম্বন্ধে যে সকল কথা বলিয়া গিয়াছেন, ইতিহাসে তাহার বড় মূল্য। কারণ ভারতবর্ষের আদিম ইতিহাস জানা বড়ই কঠিন, তাহা ছাড়া যাহা জানা যায়, তাহার ভিতর কতটুকু সত্য, কতটুকু মিথ্যা, ভেদ করা যায় না। গ্রীকেরা বিদেশীয়, তাঁহারা আমাদের সম্বন্ধে যাহা বলিয়া গিয়াছেন তাহা বোধ হয়, অনেকটা ঠিক্‌। গ্রীকেরা ভারতবর্ষে সাত রকম জাতি দেখিয়াছিলেন, তাহা বোধ হয় এই চারি জাতির রূপান্তর; গ্রীকেরা যখন ভারতবর্ষে আসেন, তখন বৌদ্ধধর্ম্ম এদেশে প্রচারিত হইয়াছে; তাই বৌদ্ধ পুরোহিতদিগকে একটী ভিন্ন জাতি বলিয়া মনে করিয়াছিলেন। গ্রীকেরা ব্রাহ্মণদের যেরূপ বর্ণনা করিয়াছেন, তাহা পড়িয়া আমরা বুঝিতে পারি ব্রাহ্মণেরা এক সময় বড়ই উচ্চ ছিলেন। গ্রীকেরা বলেন যে ব্রাহ্মণেরা কেবল পড়াশুনা এবং ধর্ম্মকর্ম্ম করিতেন। তাঁহারা অর্থ উপার্জ্জন করিতেন না। রাজারা এবং দেশের ধনীরা তাঁহাদিগকে প্রতিপালন করিতেন। ব্রাহ্মণদিগকে সকলে অত্যন্ত সম্ভ্রম করিত, তাঁহাদিগের উপর রাজকর ছিল না। ব্রাহ্মণদিগের কঠোর তপস্যা দেখিয়া গ্রীকগণ মোহিত হইয়া গিয়াছিলেন। ব্রাহ্মণেরা যেখানে যাইতেন, লোকেরা তাঁহাদিগকে পূজা করিত। গ্রীকেরা হিন্দুদিগের বীরত্বের বড়ই প্রশংসা করিয়াছেন। তাঁহারা আসিয়ার যত জাতির সঙ্গে যুদ্ধ করিয়াছিলেন, হিন্দুদিগের মত বীর কোথাও দেখেন নাই। তাঁহারা ভারতবর্ষের লোকদিগকে সরল, সাহসী, সত্যবাদী, পরোপকারী ও আতিথেয় বলিয়া অনেক প্রশংসা করিয়াছেন। সে অবস্থার সহিত বর্ত্তমান অবস্থার তুলনা করিলে, কি পরিবর্ত্তনই দেখিতে পাওয়া যায়।