বিষয়বস্তুতে চলুন

ভারতবর্ষের ইতিহাস (হেমলতা দেবী)/ত্রয়োদশ পরিচ্ছেদ

উইকিসংকলন থেকে

ত্রয়োদশ পরিচ্ছেদ।

ইউরোপীয়দিগের ভারতে আগমন।

 আর্য্যেরা ভারতের উত্তর-পশ্চিম দিক্ হইতে আসিয়া, এদেশ অধিকার করিয়াছিলেন। মুসলমানেরাও সেই পথে আসিয়া ভারত জয় করেন। কিন্তু আমাদের এখনকার রাজারা সমুদ্র-পথে, দক্ষিণ হইতে আসিয়া এদেশ অধিকার করেন। ইংরেজেরা এখন ভারতের রাজা, তাহা তোমরা সকলেই জান কিন্তু তাঁহারা এদেশ জয় করিবার জন্য ভারতবর্ষে আসেন নাই। বাণিজ্য করিবার জন্য ইংরেজেরা প্রথমে এদেশে আসিয়াছিলেন। তাঁহাদের আগমনের অনেক পূর্ব্বে পর্টুগীজেরা বাণিজ্য করিবার জন্য ভারতবর্ষে আসেন। অনেক দিন হইতে ইউরোপীয়দিগের এই বিশ্বাস ছিল যে, ভারতবর্ষের মত ধনরত্নে পূর্ণ দেশ পৃথিবীতে আর নাই। ভারতবর্ষ টাকার খনি, সে দেশে একবার যাইতে পারিলে, অনেক ধনরত্ন পাওয়া যাইবে। পর্টুগীজেরাই প্রথমে ভারতবর্ষে আসিবার জন্য চেষ্টা করেন। ১৪৯৮ খৃষ্টাব্দে লিস্‌বন হইতে ভাস্‌কোডিগামা ভারতবর্ষে আসেন। মালবর উপকূলে কালিকট সহরে প্রথমে তাঁহারা পদার্পণ করেন এবং সেখানকার হিন্দুরাজার সহিত বন্ধুতা করেন। তখন দাক্ষিণাত্যে আহমদনগর, বিজয়পুর, ও গোলকুণ্ডায় মুসলমান রাজারা ছিলেন; এবং বিজয় নগরের হিন্দুরাজার পরাক্রম সকলের অধিক ছিল। এই সময় হইতে একশত বৎসর পর্য্যন্ত পৰ্টুগীজেরা ভারতে অনেক প্রভুত্ব করেন। শুনা যায় তাঁহারা এদেশীয়দিগের প্রতি অনেক নিষ্ঠুর ব্যবহার করিয়াছিলেন। কেবল তাঁহাদের মধ্যে এলবুকার্ক নামে এক ব্যক্তি এদেশীয়দিগের সহিত সদ্ব্যবহার করিতেন। যাহা হউক পর্ট গীজদিগের প্রতাপ বেশী দিন স্থায়ী হইল না। ওলন্দাজেরা এদেশে দেখা দিলেন। এখন পর্টুগীজদিগের নামও এদেশে কেহ জানে না। তবে
ভাসকোডিগামা।
আজ পর্য্যন্ত পশ্চিম উপকূলে গোয়া, দিউ, দমায়ু এই তিন স্থান পর্টুগীজদিগের অধিকার আছে। পর্টুগীজদিগের সহিত মিলনে বম্বে অঞ্চলে প্রায় ৩০,০০০ আর ঢাকা, চট্টগ্রাম অঞ্চলে প্রায় ২০,০০০ ফিরিঙ্গির সৃষ্টি হইয়াছে। ইহাদিগের পদবী পর্টুগীজ এবং ধর্ম্মে ইহারা রোমান কাথলিক। কিন্তু আচার ব্যবহার ও চেহারায় এদেশীয়দিগের সহিত বিশেষ কোন তফাৎ নাই। এখন ভারতবর্ষে পর্ট গীজদিগের এই চিহ্নমাত্র আছে।

 অন্যান্য ইউরোপায়দিগের আগমন—পর্টুগীজদিগের একশত বৎসর পরে ওলন্দাজগণ এদেশে আসেন। তাহার কিছু দিন পরে দিনেমারগণ তাঁহাদিগের পদানুসরণ করেন। ওলন্দাজদিগের চুঁচুড়া এবং দিনেমারদিগের শ্রীরামপুর প্রধান সহর ছিল। পরে ইংরেজেরা এই দুই সহরই তাঁহাদিগের নিকট হইতে লয়েন।

 ইংরেজদিগের আগমন—১৬০০ খৃষ্টাব্দে একদল ইংরেজ-বণিক রাণী এলিজাবেথের নিকট হইতে ভারতবর্ষে একচেটিয়া বাণিজ্য করিবার অনুমতি গ্রহণ করেন। কিন্তু প্রথমবারেই তাঁহারা ভারতবর্ষে আসিতে পারেন নাই। সুমাত্রা দ্বীপে আসিয়া সেখান হইতে মরিচ কিনিয়া, জাহাজ বোঝাই করিয়া দেশে ফিরিয়া যান। পরে তাঁহারা ভারতবর্ষের সন্ধান পান। সেই সময়ে পর্টুগীজেরা এদেশে বাণিজ্য ব্যবসায়ে সর্ব্বেসর্ব্বা ছিলেন। কাজেই ইংরেজদিগের সহিত তাঁহাদের বিবাদ বাধিয়া যায় এবং অবশেষে পর্টুগীজেরাই যুদ্ধে হারিয়া যান। সেই সময় হইতেই ইংরেজদিগের প্রভুত্বের সূত্রপাত হয়।

 মাদ্রাজ সহর—১৬৪০ খৃষ্টাব্দে ইংরেজ কোম্পানি চন্দ্রগিরির রাজার নিকট হইতে একটু জায়গা কিনিয়া লন। এই জমিটুকুই ইংরেজদিগের ভারতবর্ষে প্রথম অধিকার। এখানে তাঁহাদিগের কুঠী ও এক কেল্লা হয়। কেল্লার নাম ফোর্ট সেণ্ট জর্জ্জ এবং সেই জমিটুকুই এখনকার মাদ্রাজ সহর।

 বোম্বাই সহর—ইংলণ্ডের রাজা দ্বিতীয় চার্লস পর্টুগালের রাজকন্যাকে বিবাহ করিয়া বম্বে সহর যৌতুক পান এবং তিনি উহা ইংরেজ কোম্পানিকে দান করেন। ইংরেজ বণিক্ সেখানেও কেল্লা করিলেন। এইরূপে বম্বে ইংরেজ কোম্পানির দ্বিতীয় সহর হইল।

 কলিকাতা সহর—১৬০০ খৃষ্টাব্দে ইষ্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির সূত্রপাত হয়; আর ১৬৯০ খৃষ্টাব্দে কলিকাতা সহর স্থাপিত হয়। গভর্ণর চার্ণক সাহেব ইহার প্রতিষ্ঠাতা। তিনি বাঙ্গালার নবাবের নিকট হইতে ১১৯৪ টাকায় কালীঘাট, সূতানুটি ও গোবিন্দপুর নামে তিন খানি গ্রাম জমা লন; সেই তিন খানি গ্রামই এখনকার কলিকাতা সহর। রহিম খাঁ নামে একজন মুসলমান বিদ্রোহী হইলে, ইংরাজেরা ফোর্ট উইলিয়ম নামে কলিকাতায় যে কেল্লা আছে, তাহা নির্ম্মাণ করিবার অনুমতি পাইলেন। গভর্ণর চার্ণকের নাম আজ পর্য্যন্ত এ দেশের লোক ভুলিতে পারে নাই। তাঁহার নামে বারাক্‌পুরের নিকট চাণক গ্রাম হইয়াছে।

 ফরাসীদিগের আগমন—ইংরেজদিগের চারি বৎসর পরে ফরাসীরা এদেশে বাণিজ্য করিতে আসেন। সুরতে ও পণ্ডিচেরীতে তাঁহারা কুঠী করেন। মান্দ্রাজের ৫০ ক্রোশ দক্ষিণে পণ্ডিচেরী সহর শীঘ্রই ফরাসীদিগের প্রধান সহর হইল এবং আজ পর্যন্ত উহাই ভারতে ফরাসীদিগের রাজধানী।

 ক্লাইব—অতি অল্প বয়সে ইষ্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির সামান্য একজন কেরাণীরূপে ক্লাইব এদেশে আসেন। ক্লাইবের পিতার অবস্থা ভাল ছিল। না, সন্তান সন্ততি অনেকগুলি ছিল। ক্লাইবের জন্য দেশে কোন উপায় করিতে না পারিয়া, ক্লাইবের পিতা তাঁহাকে ইষ্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানীর অধীনে কেরাণী করিয়া পাঠান। তাঁহারা পুত্রের আশা ভরসা এক প্রকার ত্যাগ করিয়াই পাঠাইয়াছিলেন। সেই সময়ে এদেশে আসিলে, ইংরেজদিগের শরীর একেবারে নষ্ট হইয়া যাইত। প্রথম প্রথম ক্লাইব এদেশে আসিয়া বড়ই কষ্ট পাইতেন। দুইবার আত্মহত্যা করিবার জন্য নিজের মস্তকে নিজে গুলি করিয়াছিলেন। কিন্তু কি আশ্চর্য্য! বন্দুকের ভিতরে গুলি থাকা সত্ত্বেও দুইবার গুলি লাগিল না। তখন তিনি অবাক হইয়া বলিলেন—“জানি না ঈশ্বর আমাকে কোন্ কার্য্যের জন্য রক্ষা করিলেন, হয়ত আমার কিছু করিবার আছে।” বাস্তবিক ভারত-ইতিহাস সে কথার জ্বলন্ত সাক্ষ্য দিতেছে, যদি সেই দিনে ক্লাইবের শেষ হইত, তাহা হইলে আজ হয়ত ভারত-ইতিহাস আর এক ছবি দেখাইত। শুনিলে অবাক্ হইবে, আত্মহত্যা করিয়াই ক্লাইব জীবন শেষ করিয়াছিলেন।
লর্ড ক্লাইব
আকটের যুদ্ধে প্রথমে ক্লাইব আপনার ভাবা মহত্ত্বের আভাস দিয়াছিলেন। তিনি যে সামান্য ব্যক্তি নন, তাহার আভাস সেই সময়েই প্রথম পাওয়া যায়। যুদ্ধের পর ইংরেজ ও ফরাসীতে সন্ধি হইলে, তিনি ছুটী লইয়া দেশে গমন করেন এবং বিলাত হইতে আসিয়া, মালবর উপকূলে আঙ্গ্রিয়া নামে একজন দুরন্ত জলদস্যুকে জব্দ করেন ও তাহার পর সেণ্ট্ ডেবিড দুর্গের সেনাপতি হইয়া তিনি কর্ণাটে আসেন।

 বঙ্গে ক্লাইব ও সিরাজউদ্দৌলা—দাক্ষিণাত্যে যখন এই সকল ব্যাপার হইতেছিল, তখন বাঙ্গালায় আলিবর্দ্দি খাঁ নামে একজন উপযুক্ত নবাব রাজত্ব করিতেছিলেন। তিনি নামমাত্র-দিল্লীর সাম্রাটের অধীন ছিলেন। তাঁহার রাজত্বকালে মারাঠারা বার বার বাঙ্গালা আক্রমণ করে এবং তিনি বার বার তাহাদিগকে তাড়াইয়া দেন। শেষে আর না পারিয়া বাঙ্গালার চৌথ আর উড়িষ্যা মারাঠাদিগকে দান করেন। এইরূপে অনেক কষ্টে আলিবর্দ্দি খাঁ মারাঠার দৌরাত্ম্য বন্ধ করেন। তখনকার লোকেরা মারাঠাদিগকে বর্গি বলিত। বাঙ্গালার লোকেরা বর্গির নামে কাপিত।

 আলিবর্দ্দির মৃত্যু হইলে, তাঁহার দৌহিত্র সিরাজউদ্দৌলা বাঙ্গালার নবাব হইলেন। আলিবর্দ্দির পুত্র ছিল না, তিনি সিরাজকে প্রাণের অধিক ভালবাসিতেন; এবং সিরাজ ভূমিষ্ঠ হইবামাত্র তাঁহাকে বাঙ্গালার ভাবী নবাব বলিয়া কোলে তুলিয়া লইয়াছিলেন। আলিবর্দ্দির আদরে সিরাজ শৈশবাবধি বড়ই প্রভুত্বপরায়ণ ও স্বেচ্ছাচারী হইয়া উঠিয়া ছিলেন। শুনিতে পাওয়া যায়, তিনি নাকি ইংরেজ বণিক্‌দিগকে দুটি চক্ষে দেখিতে পারিতেন না। সিরাজ যখন বাঙ্গালার নবাব হন, তখন তিনি বয়সে বালক ছিলেন বলিলেও হয়, কিন্তু আচরণে বালক ছিলেন না। তাহার বিলক্ষণ বুদ্ধি ছিল; কিন্তু বয়সের অভিজ্ঞতা কোথায় পাইবেন? সেই সময়ে নবাবের বড় বড় কর্ম্মচারীদিগের ক্ষমতা অত্যন্ত অধিক ছিল; তাঁহারা প্রত্যেকেই যেন এক একটি নবাব। নবাবী আমলে হিন্দু বাঙ্গালিগণ খুব বড় বড় রাজকার্য্য করিতেন। নবাবগণ এই সকল কর্ম্মচারীদিগকে নানা প্রকারে বশে রাখিতে চেষ্টা করিতেন। ইহাদের সহায়তা বিনা সিংহাসন রক্ষা করা বড়ই কঠিন ছিল। বৃদ্ধ আলিবর্দ্দি এ সকল বুঝিতেন এবং কৌশলপূর্ব্বক চারিদিক্ রক্ষা করিতে পারিয়াছিলেন। সেই সময়ে রাজা রাজবল্লভ, জগৎশেঠ, মাণিকচাঁদ, মোহনলাল, নন্দকুমার প্রভৃতি হিন্দুরা নবাবের বড় বড় কর্মচারী ছিলেন। দেশ মধ্যে ইহাদের অত্যন্ত ক্ষমতা এবং প্রতিপত্তি ছিল। ইহাদের মধ্যে অনেকেই সিরাজের উপর বিরক্ত ছিলেন। ফরাসীদিগের আক্রমণের ভয়ে ইংরেজেরা সে সময়ে কলিকাতার দুর্গ সংস্কার করিতেছিলেন। সিরাজ তাহা করিতে নিষেধ করেন, ইংরেজেরা শুনিলেন না। রাজবল্লভের সহিত সিরাজউদ্দৌলার অসদ্ভাব হইবার সূচনা হইবামাত্র তাঁহার পুত্র কৃষ্ণদাস সমস্ত সম্পত্তি লইয়া, কলিকাতায় ইংরেজদিগের শরণাপন্ন হইলেন। এ কথা শুনিয়াই সিরাজ কৃষ্ণদাসকে তাঁহার হস্তে দিবার জন্য ইংরেজদিগকে অনুরোধ করিলেন। ইংরেজেরা তাহাও শুনিলেন না। এ জন্য ৫০,০০০০ সৈন্য লইয়া সিরাজ কলিকাতা আক্রমণ করিলেন। তখন ড্রেক সাহেব কলিকাতার গভর্ণর ছিলেন। তিনি এবং অন্যান্য ইংরেজেরা জাহাজে করিয়া দক্ষিণে পলাইয়া গেলেন। কেল্লায় অল্পই সৈন্য রহিল; তাহারা আর কতক্ষণ যুদ্ধ করিবে? সিরাজ অক্লেশে কেল্লা দখল করিলেন এবং ১৪৬ জন ইংরেজকে তাঁহার সৈন্যেরা একটি ছোট ঘরে বন্দী করিল। তখন দারুণ গ্রীষ্মকাল। গ্রীষ্মে, তৃষ্ণার, ঠেসাঠেসিতে অভাগা দিগের প্রাণ ওষ্ঠাগত হইল। প্রাতে দ্বার খুলিয়া ভয়ানক দৃশ্য দেখা গেল! স্তূপাকার মৃতদেহ পড়িয়া আছে! দ্বার খোলা যায় না। এক রাত্রের কষ্টে সকলেই মারা পড়িয়াছে। কেবল ২৩ জন মাত্র মৃতপ্রায় পড়িয়া আছে। ইতিহাসে এই ঘটনাকে অন্ধকূপহত্যা বলে (১৭৫৬ খৃষ্টাব্দে)। এই নিদারুণ সংবাদ যখন মাদ্রাজে পৌছিল তখন ইংরেজেরা একেবারে ক্ষেপিয়া উঠিলেন। ক্লাইব এবং ওয়াট্‌সন সাহেবের অধীনে কোম্পানি বাহাদুর বাঙ্গালায় সৈন্য পাঠাইলেন। তাঁহারা আসিয়াই কলিকাতা কাড়িয়া লইলেন। হুগলি আক্রমণ করিলেন। ইউরোপে এই সময় ইংরেজ ফরাসীতে যুদ্ধ চলিতেছিল। অতএব ক্লাইব ভাবিলেন, চন্দননগর আগেই দখল করা ভাল। তাই চন্দননগর আক্রমণ করিলেন। অতুল বীরত্বের সহিত ফরাসীরা নগর রক্ষা করিতে চেষ্টা করিল; কিন্তু পারিল না। ক্লাইব গোপনে সিরাজের সেনাপতি মীরজাফরের সহিত বড়যন্ত্র করিতে লাগিলেন। মীরজাফর যদি সিরাজের পক্ষ হইয়া যুদ্ধ না করেন, তবে ইংরেজেরা তাঁহাকে বাঙ্গালার নবাব করিবেন, এই স্থির হইল। ইংরেজদিগের দলে কেবল তিন হাজার সৈন্য ছিল এবং নবাবের ৩৮ হাজার সৈন্য ছিল। ইংরেজেরা যুদ্ধের পূর্ব্বে মন্ত্রণা করিলেন যে, এত অল্প সৈন্য লইয়া, হঠাৎ যুদ্ধ করা উচিত নয়। ক্লাইবও তখন সেই মতে মত দিলেন। কিন্তু সভা ভঙ্গ হইলে, রাত্রে তিনি নির্জ্জনে ভাবিতে লাগিলেন; এবং অবিলম্বে যুদ্ধ করাই উচিত বুঝিলেন। রাত্রি প্রভাত হইবামাত্র তিনি নবাবের সহিত যুদ্ধ করিবার জন্য চলিলেন। পলাসীর মাঠে আমবাগানের ভিতর তাঁহার সৈন্যগণ উপস্থিত হইল। নবাব নিকটে ছিলেন। যুদ্ধ আরম্ভ হইল। মীরজাফর, রায় দুর্লভ প্রভৃতি সিরাজের সেনাপতিগণ ইংরেজদিগের সহিত পূর্ব্বের পরামর্শমত যুদ্ধ না করিরা কেবলমাত্র দাঁড়াইয়া ছিলেন। কেবল মীরমদন এবং মোহনলাল নবাবের হইয়া যুদ্ধ করিতে লাগিলেন। মীরমদন যুদ্ধক্ষেত্রে পড়িলেন। মীরজাফরের চক্রান্তে নবাবের বিপুল আয়োজন বিফল হইল। তখন নামমাত্র যুদ্ধ করিয়া, যে যেমনে পারিল পলাইল। নবাবও পলায়ন করিলেন। এই প্রকারে বলিতে গেলে, বিনা যুদ্ধে ক্লাইব পলাসীর ক্ষেত্রে জয়ী হইলেন (১৭৫৭ খৃঃ অঃ)। পলাসীর যুদ্ধের পর ফলতঃ ইংরেজেরাই বাঙ্গালার রাজা হইলেন। কিন্তু হঠাৎ তাঁহারা রাজসিংহাসন অধিকার না করিয়।, সমুদায় ক্ষমতা আপনাদিগের হস্তে রাখিয়া পূর্ব্বের পরামর্শ মত মীরজাফরকে বাঙ্গালার “সাক্ষী গোপাল” নবাব করিলেন। মীরজাফর নবাবের গদীতে বসিলেন। ওদিকে সিরাজউদ্দৌলা প্রাণ লইয়া পলাইলেন। কিন্তু প্রাণ বাঁচাইতে পারিলেন না। পথে একজন ফকিরের গৃহে অতিথি হইলেন; সে সিরাজকে বন্দী করিয়া, মুর্শিদাবাদে সংবাদ পাঠাইল। নূতন নবাবের লোকেরা আসিয়া সিরাজকে বন্দী করিয়া লইয়া গেল। মীরজাফরের পুত্র মীরণ অতি নিষ্ঠুরভাবে সিরাজকে হত্যা করিলেন। যাহা হউক মীরজাফরের অদৃষ্টে রাজত্ব-ভোগ বেশী দিন হইল না। শীঘ্রই ইংরেজেরা তাঁহার মুকুট কাড়িয়া লইয়া তাঁহার জামাতা মীরকাশিমের মস্তকে পরাইলেন।

 মীরকাশিম—মীরজাফর বৃদ্ধ এবং অতিশয় অকর্ম্মণ্য ছিলেন। সুতরাং ইংরেজেরা সহজেই তাঁহাকে হাতের পুতুল করিতে পারিয়াছিলেন এবং অবাধে তাঁহার মস্তক হইতে মুকুট কাড়িয়া লইতে পারিয়াছিলেন। কিন্তু মীরকাশিম সে প্রকৃতির লোক ছিলেন না; সুতরাং ইংরেজদিগের সহিত শীঘ্রই তাঁহার বিবাদ বাধিয়া গেল।

 গিরিয়। আর উধুয়ানালা নামক স্থানদ্বয়ে মিরকাশিমের সহিত ইংরেজ কোম্পানির দুইটী যুদ্ধ হয়, তাহাতে মীরকাশিম পরাজিত হইয়া অযোধ্যায় পলায়ন করেন (১৭৬৩ খৃঃ অঃ)। মীরকাশিমের হইয়া অযোধ্যার নবাব ইংরেজদিগের সহিত যুদ্ধ করিতে আসিলেন, কিন্তু বক্‌সারে যুদ্ধে পরাজিত হইয়া ৫০ লক্ষ টাকা দিয়া ইংরেজদিগের সহিত সন্ধি করেন।

 মীরকাশিমের পর ইংরেজেরা আবার মীরজাফরকে নবাব করিসেন এবং তাঁহার মৃত্যুর পর তাঁহার নাবালক পুত্র নামমাত্র নবাব হইলেন। লর্ড ক্লাইব দিল্লীর বাদসাহের নিকট হইতে বাঙ্গালা, বিহার ও উড়িষ্যার দেওয়ানী অর্থাৎ রাজস্ব আদায়ের অধিকার লইলেন এবং তাহার পরিবর্ত্তে সম্রাটকে কোরা ও এলাহাবাদ দিলেন এবং বৎসরে ২৬ লক্ষ টাকা রাজকর দিতে স্বীকৃত হইলেন। নবাবকে বৎসরে ৫০ লক্ষ টাকা দিয়া, বাকী সমস্তই ইংরেজ কোম্পানি পাইবেন, এইরূপ স্থির হইল (১৬৬৫ খৃঃ অঃ)।
হায়দর আলী।


 মহীসুরের হায়দর আলী—বহুকাল হইতে মহীসুর হিন্দুরাজার অধীন ছিল। আমরা যে সময়ের কথা বলিতেছি, তখন হায়দর আলী নামে একজন মুসলমান তথাকার নাবালক হিন্দু রাজাকে নানা কৌশলে বঞ্চিত করিয়া, স্বয়ং মহীশুরের রাজা হইয়াছিলেন। হায়দর আলী পূর্ব্বে ফরাসীদিগের অধীনে সামান্য একজন সৈনিক ছিলেন। সেই সময়ে তিনি ইউরোপীরদিগের মত যুদ্ধ করিতে শিক্ষা করেন। হায়দর অতিশয় চতুর ছিলেন। প্রথমে তিনি মহীসুরের হিন্দু রাজার অধীনে সেনাপতির কার্য্যে নিযুক্ত হন; তখন মহীসুরের সিংহাসনে নাবালক রাজা ছিলেন। সেই নাবালককে বঞ্চিত করিয়া, তাঁহার পিতৃব্য স্বয়ং রাজা হইবার চেষ্টা করেন। সেই সময় হায়দর সেই বালকের পক্ষ হইয়া, তাহার পিতৃব্যের সহিত যুদ্ধ করিয়া, তাঁহাকে পরাজিত করেন। কিন্তু কিছুদিন পরে সেই বালককে বঞ্চিত করিয়া হায়দর স্বয়ং মহীসুরের রাজা হইলেন (১৭৬০ খৃঃ অঃ)।

 সেই সময়ে ভারতবর্ষের চারিদিকেই ঘোর অরাজকতা চলিতেছিল। “জোর যার মুল্লুক তার” এই কথাই যেন ভারতময় প্রতিধ্বনিত হইতেছিল। চারিদিকে ডাকাতি, চারিদিকে অত্যাচার! এমন কোন শক্তি ছিল না যে, এ সকল অরাজকতা দমন করিতে পারে। হায়দর রাজা হইলে, তাঁহার ক্ষমতা দোর্দ্দণ্ড হইল। তিনি ফরাসীদিগের অধানে এক সময়ে সৈনিক ছিলেন, তাই রাজা হইয়াও তাহাদিগের সহিত বন্ধুতা করিতে লাগিলেন। কাজেই ইংরেজদিগের বিষ নয়নে পড়িলেন।

 নিজাম এবং ইংরেজ উভয়ে মিলিয়া, হায়দরের সহিত যুদ্ধ করিতে আরম্ভ করিলেন। যুদ্ধে হায়দর পরাজিত হন (১৭৬৭ খৃঃ অঃ)। কিন্তু নিজাম অন্তরে ইংরেজদিগের বন্ধু ছিলেন না, বরং শত্রুই ছিলেন; তাই বন্ধুতা-সূত্রে আবদ্ধ থাকিলেও ইংরেজদিগকে আক্রমণ করিলেন। ইংরেজেরাও নিজামের সহিত যুদ্ধে প্রবৃত্ত হইলেন। যুদ্ধে নিজাম একেবারে পরাজিত হইলেন। হায়দরও ওদিকে পরাজিত হইয়া দেশে ফিরিয়া গেলেন এবং লুকাইয়া বিস্তর সৈন্য সামন্ত সংগ্রহ করিয়া মাদ্রাজ আক্রমণ করিতে গেলেন। ইংরেজেরা যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত ছিলেন না, ত্রস্ত হইয়া অগত্যা হায়দরের মনোমত সন্ধির প্রস্তাবে সম্মত হইলেন। সন্ধি-সূত্রে যে যাহার অধিকার ফিরিয়া পাইলেন। ভবিষ্যতে হায়দর ও ইংরেজ পরস্পরের সহায় হইবেন, এইরূপ স্থির হইল (১৭৬৯ খৃঃ অঃ)।

 সুকুমারমতি পাঠক পাঠিকাগণ, ভারতবর্ষের এই সময়কার ইতিহাস বড় জটিল। তখন কেবল পরিবর্ত্তন। পুরাতন গিয়া নূতন রাজ্য সকল ভারতের চারিদিকে হইতেছিল। ভারতর্ষের পশ্চিম উপকূলে মারাঠারা প্রবল শক্তি হইয়া উঠিয়াছিলেন। পূর্ব্বকূলে ইংরেজেরা মস্তক তুলিয়া উঠিতেছিলেন। মধ্যে নিজাম ও হায়দর আলী। দেখ এ সকল নূতন শক্তি। উত্তর-ভারতবর্ষের দিকে চাহিয়া দেখ, পঞ্জাবে শিখদিগের তখন দোর্দণ্ড প্রতাপ। গুজরাটে, মধ্য-ভারতবর্ষে মারাঠারা সর্ব্বেসর্বা। দিল্লীর সম্রাট্ তখন কেবল নাম মাত্র ছিলেন, তা তিনিও মারাঠাদিগের হস্তে। অযোধ্যায় নূতন মুসলমান রাজ্য। রোহিলখণ্ডে রোহিলারাও এক নূতন শক্তি। বাঙ্গালা বিহারের পুরাতন মুসলমান রাজ্য অস্ত প্রায়; সেখানে ইংরেজদিগের বিজয়-রবি দিক্ উজ্জ্বল করিয়া উঠিতেছিল। কিরূপে ইংরেজেরা অল্পকালের মধ্যে এই সকল শক্তিকে পরাজিত করিয়া, সমুদায় ভারতের একমাত্র রাজাধিরাজ অধীশ্বর হইলেন তাহার বিবরণ শ্রবণ কর।