ভারতবর্ষের ইতিহাস (হেমলতা দেবী)/দশম পরিচ্ছেদ
দশম পরিচ্ছেদ।
মহারাষ্ট্রীয়জাতির উত্থান।
প্রিয় পাঠক পাঠিকাগণ,—পূর্ব্বেই বলিয়াছি, আওরঙ্গজেবের সময় হইতেই দিল্লীর সাম্রাজ্যের পতন আরম্ভ হয়। ঠিক্ সেই সময়েই দাক্ষিণাত্যে মহারাষ্ট্রীয়জাতি নূতন তেজে মাথা তুলিয়া উঠিল। এবং প্রায় দেড়শত বৎসর ধরিয়া ভারতের একদিক্ হইতে আর একদিক্ পর্য্যন্ত তাঁহাদের প্রতাপে কাঁপিতে লাগিল। এই মহারাষ্ট্রীয়জাতির নাম এই সময়ের ইতিহাসে বিশেষ প্রসিদ্ধি লাভ করে। ইহারা আমাদিগেরই ন্যায় হিন্দুসন্তান ব্রাহ্মণাদি চারি বর্ণে বিভক্ত। উত্তরে সুরট হইতে দক্ষিণে গোয়া পর্য্যন্ত এবং পূর্ব্বদিকে নাগপুর ও হায়দারাবাদ হইতে পশ্চিমে আরব সাগরের উপকূল পর্য্যন্ত বিস্তৃত যে ভূমি-ভাগ তাহাই ইহাদের বাসস্থান। ইহাদিগের নামানুসারে ঐ প্রদেশ মহারাষ্ট্রদেশ নামে বিখ্যাত। আওরঙ্গজেইের সময়ে এই জাতির মধ্যে ক্ষত্রিয় বংশে শিবাজী নামে একজন অসাধারণ শক্তিশালী পুরুষ জন্মগ্রহণ করেন। ইনিই ভারতের ইতিহাসে মারাঠাজাতির নাম চিরস্মরণীয় করিয়া গিয়াছেন। ইহারা কলহপ্রিয় ও প্রাধান্যাভিলাষী হইলেও তাঁহার পূর্ব্বে এ জাতির সংবাদ কেহ রাখিত না। মুসলমান শাসনকর্তারা তাঁহাদিগের মধ্যে বিবিধ কৌশলে বিবাদাগ্নি প্রজ্জ্বলিত রাখিয়া, তাঁহাদিগের উপর আপনাদিগের প্রভুত্ব অক্ষুণ্ণ রাখিয়াছিলেন। শিবাজীর হস্তে পড়িয়া ইহারা দুর্জয় যোদ্ধা হইয়া দাঁড়াইলেন এবং আত্মকলহ ভুলিয়া গিয়া একতাসূত্রে বদ্ধ হইলেন। এই শিবাজীর বিষয় প্রথমে কিছু বলিব।
আকবরের সময় হইতে তোমরা দাক্ষিণাত্যে আহমদনগর, বিজয়পুর গোলকুণ্ডা প্রভৃতি স্বাধীন মুসলমান-রাজ্যের কথা শুনিয়াছ। আওরঙ্গজেব অনেক কষ্টে বিজয়পুর ও গোলকুণ্ডা রাজ্য বশ করেন। তাহার পূর্ব্বে এই দুই রাজ্য স্বাধীন ছিল। শিবাজীর পিতা শাহজী আহমদনগরের অধীনে একজন জায়গীরদার ছিলেন। এই সকল মুসলমান-রাজ্যের অধীনে আরও অনেক হিন্দু জায়গীরদার ছিলেন। ইহাদের মধ্যে কেহ বা বিজয়পুরের অধীন কেহ বা আহমদনগরের অধীন ছিলেন। এই সকল রাজ্যের মধ্যে পরস্পর শত্রুতা থাকাতে মারাঠা জায়গীরদারদিগের ভিতরেও পরস্পরের সহিত শত্রুতা ছিল। আহমদনগরের অধীনে দুই জন প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী জায়গীরদার ছিলেন। তাহার মধ্যে শিবাজীর পিতা শাহজী একজন ও মাতুল লুখজী যাদব রাও আর একজন। লুখজী যে যদুবংশে জন্মগ্রহণ করিয়াছিলেন তাহা তখন মারাঠাদিগের ভিতর উচ্চতম বংশ ছিল এবং ক্ষমতাতেও ইহারা সকলের প্রধান ছিলেন। শিবাজীর পিতামহ মালোজীর বহুকাল পর্য্যন্ত কোন সন্তান হয় নাই। কথিত আছে, শাহসরিফ নামে একজন মুসলমান পীরের প্রার্থনা বলে মালোজীর দুই পুত্র জন্মে, বড়টির নাম শাহজী ও ছোটটির নাম সরিফজী। মালোজী ভোঁসলে বুদ্ধিমান্ ও কর্ম্মঠ পুরুষ ছিলেন, এইজন্য শীঘ্র তাঁহার বেশ উন্নতি হইয়াছিল। যাদব রাও তাঁহাকে বড় ভালবাসিতেন। একদিন কোন পর্ব্ব উপলক্ষে মালোজী যাদব রাওর বাড়ীতে নিমন্ত্রণে যান। সেই সময় পাঁচ বৎসরের বালক শাহজীকে সঙ্গে লইয়া গিয়াছিলেন। শাহজী নাকি ছোটবেলায় দেখিতে বেশ সুশ্রী ছিলেন। ছেলেটিকে দেখিয়া যাদব রাওর বড় ভাল লাগিল, তিনি কাছে ডাকিয়া তাহাকে কোলে লইলেন। কোলে তাঁহার তিন বৎসরের কন্যা জীজীবাই বসিয়াছিল। তিনি হাসিয়া বলিলেন “দেখ দুটিকে কি সুন্দর দেখাচ্চে! এদের বিবাহ দিলে বেশ সাজে।” এই সুযোগে মালোজী বলিয়া উঠিলেন, “বন্ধুগণ, তোমরা সাক্ষী, যাদব রাও আমার পুত্রের সহিত কন্যার বিবাহ দিবেন বলিলেন।” যাদব রাও এই কথা শুনিয়া একেবারে চটিয়া উঠিলেন। বলিলেন, “কি! আমি ঠাট্টা করিয়া বলিয়াছি মাত্র! উন্নত যদুবংশের সহিত কি ভোঁসলেবংশের কখনও মিলন হইতে পারে?” কিন্তু মালোজী ছাড়িলেন না এবং নানা উপায়ে নিজের ক্ষমতা এত বৃদ্ধি করিলেন যে, যাদব রাও তাঁহার পুত্রের সহিত নিজের কন্যার বিবাহ দিতে বাধ্য হইলেন। শাহজীর সহিত যাদব রাওর কন্যা জীজীবাইএর বিবাহ হইল। শিবাজী ইহাদের সন্তান। শিবাজীর পিতা শাহজী পূর্ব্বে আহমদনগরের অধীন জায়গীরদার ছিলেন এবং সে রাজ্য দিল্লীর অধীন হইলে, তিনি বিজয়পুরের অধীনে কার্য্য গ্রহণ করেন। পুণা সহরই তাঁহার জায়গীরের প্রধান স্থান ছিল। বিজয়পুরের সুলতান তাঁহাকে কর্ণাটকের বিদ্রোহ দমনে প্রেরণ করিলে, তিনি তদ্বিষয়ে কৃতকার্য্য হওয়ায় মাদ্রাজ প্রদেশের তাঞ্জোর অঞ্চলে নূতন জায়গীর প্রাপ্ত হইয়াছিলেন। পুণার জায়গীরের ও বালক শিবাজীর ভার দাদাজী কোণ্ডদেব নামে একজন উপযুক্ত কর্মচারীর হাতে দিয়া, তিনি তাঞ্জোরে বাস করিতে গেলেন। দাদাজী অতি যত্নপূর্ব্বক শিবাজীকে হিন্দুধর্ম্ম শিক্ষা দিয়াছিলেন। বাল্যকালেই শিবাজী ঘোড়ায় চড়িতে ও অস্ত্র চালাইতে শিক্ষা করেন। শিবাজী অতিশয় সাহসী ও নির্ভীক ছিলেন। পুণার নিকটে পর্ব্বতে মাওলী নামে যে অসভ্য জাতি ছিল, তাহাদিগকে নিজ সেনাদলভুক্ত করিয়া লইলেন এবং ইহাদের সাহায্যে চারিদিকে লুটপাট্ আরম্ভ করিলেন। যতদিন দাদাজী বাঁচিয়াছিলেন, তাঁহার হাতেই পুণার জায়গীরের ভার ছিল। দাদাজীর মৃত্যুর পর শিবাজী স্বাধীনভাবে জায়গীর ভোগ করিতে লাগিলেন, পিতাকে কিছুই দিতেন না। জায়গীরদার হইয়া শিবাজীর বল আরও বাড়িয়া গেল। তিনি বিস্তর সৈন্য ও অস্ত্রশস্ত্র যোগাড় করিতে লাগিলেন এবং একটি একটি করিয়া বিজয়পুর রাজ্যের দুর্গ সকল কাড়িয়া লইতে লাগিলেন। প্রথমে তোরণ, শেষে সিংহগড় ও পুরন্দর দুর্গ কাড়িয়া লইলেন। রায়গড়ে নিজে এক কেল্লা করিলেন। বিজয়পুর-রাজ্যের ধনরত্ন পথে যাইতেজিল, তাহা লুট করিলেন। ইহাতে বিজয়পুরের রাজা মহা ক্রুদ্ধ হইলেন এবং তাঞ্জোর হইতে শাহজীকে ধরিয়া আনিয়া বন্দী করিলেন; এবং বলিলেন, যতক্ষণ না শিবাজী বশীভূত হন, ততক্ষণ শাহজীকে ছাড়িবেন না, এমন কি তাঁহার প্রাণহত্যা পর্য্যন্ত করিবেন। শাহজী বার বার বলিলেন যে, তাঁহার কিছু দোষ নাই, শিবাজী তাঁহার অবাধ্য পুত্র, কিন্তু রাজা কিছুতেই শুনিলেন না। পিতার দুর্গতি শুনিয়া শিবাজী প্রথমে ভয় পাইলেন বটে, কিন্তু শেষে এক চাতুরী খেলিলেন। সাজাহানকে বলিয়া পাঠাইলেন যে—“আমি আপনার অনুগত ভৃত্য এবং বিজয়পুরের পরম শত্রু। অতএব আমাকে আপনার চাকরিতে গ্রহণ করুন।” দিল্লীশ্বর তাঁহার প্রার্থনা গ্রাহ্য করিয়া তাঁহাকে ৫ হাজার অশ্বারোহী সৈন্যের মনসবদার নিযুক্ত করিলেন। বিজয়পুর-রাজ এই কথা জানিতে পারিয়া ভয় পাইলেন এবং শাহজীকে ছাড়িয়া দিলেন। এখন আর শিবাজীকে পায় কে? তিনি মোগল রাজ্যেও লুটপাট্ আরম্ভ করিলেন। একদিন পথে দিল্লীশ্বরের তিনি লক্ষ টাকা ও তিন শত ঘোড়া লুট করিলেন। শিবাজী মারাঠা সেনাদিগকে লুট্পাট্ করিতে শিক্ষা দেন। মারাঠা ঘোড়সোয়ারকে বর্গি বলিত। শিবাজীর পরে দেড়শত বৎসর ধরিয়া এই বর্গির জ্বালায় ভারতবাসীরা অস্থির হইয়া পড়িয়াছিল। আমাদের দেশে আজও ছেলেদের ঘুম পাড়াইবার সময় লোকে বলে:—
“যাদু ঘুমালো পাড়া জুড়ালো বর্গি এলে দেশে,
টুনটুনিতে ধান খেয়েছে খাজনা দিব কিসে।”
এই বর্গির দৌরাত্ম্যেই বাঙ্গালার লোকে ঐ গান বাঁধিয়াছিল।
শিবাজী অচিরে বম্বে, গোয়া ও জিঞ্জিরা ছাড়া সমস্ত কঙ্কণদেশ অধিকার করিলেন। কঙ্কণ বিজয়পুর-রাজের রাজ্য ছিল। শিবাজী তাহা কাড়িয়া লওয়াতে বিজয়পুর-পতি আফজল খাঁ নামে একজন সাহসী সেনাপতিকে শিবাজীর সহিত যুদ্ধ করিতে পাঠান। শিবাজী যাহা বলে না পারিতেন, ছলে তাহা করিতেন। তিনি আফজল খাঁর সহিত যুদ্ধ করিবেন না স্থির করিলেন। তাই বলিয়া পাঠাইলেন যে, “আপনার নাম শুনিয়া আমি বড় ভীত হইয়াছি; যুদ্ধ করিব না, সন্ধি প্রার্থনা করি।” আফজল খাঁ এই কথা শুনিয়া শিবাজীর নিকট একজন বিশ্বাসী ব্রাহ্মণকে পাঠাইলেন। শিবাজী স্বধর্ম্ম রক্ষার জন্য মুসলমানদিগের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করিতেছেন, কথা বলিয়া এই ব্রাহ্মণটিকে হাত করিলেন; এবং আফজল খাঁর সহিত সাক্ষাৎ করিবেন এরূপ বন্দোবস্ত হইল। শিবাজী আফজল খাঁকে বলিয়া পাঠাইলেন যে তিনি তাঁহার সঙ্গে সাক্ষাৎ করিতে প্রস্তুত, তবে আফজল খাঁর নামে তাঁহার এত ভয় যে সৈন্য সামন্ত সঙ্গে থাকিলে, সেনাপতির সহিত সাক্ষাৎ করিতে সাহস হয় না; অতএব তিনি যেন একাকী আসেন। আফজল খাঁ সেই কথায় বিশ্বাস করিয়া, সৈন্যদিগকে দূরে রাখিয়া, কেবল-মাত্র একজন দেহ-রক্ষক লইয়া, শিবাজীর শিবিরে দেখা করিতে আসিলেন; এবং শিবাজীর অনুরোধে সেই দেহ-রক্ষকটিকে পর্য্যন্ত দ্বারদেশে রাখিয়া আসিলেন। আফজল খাঁ যোদ্ধার বেশে আসেন নাই; হস্তে কেবল একখানি ভোঁতা তরবার ছিল; কিন্তু শিবাজীর অভিসন্ধি অন্য প্রকার। তিনি আফজল খাঁকে হত্যা করিবার জন্য বিশেষ ভাবে প্রস্তুত হইয়া আসেন। ভিতরে বর্ম্ম পরিয়া উপরে সূতার জামা পরিয়াছিলেন; বামহস্তে বাঘনখ নামে এক প্রকার অস্ত্র লুকাইয়া রাখেন; জামার ভিতরেও
![]()
শিবাজী।
বিষমাখা অস্ত্র লুকান ছিল। এইরূপে সজ্জিত হইয়া একজন দেহরক্ষককে সঙ্গে লইয়া শিবাজী আফজল খাঁর নিকটে উপস্থিত হইলেন। শিবাজী আসিতে আসিতে পথে কতবার থকিয়া দাঁড়াইলেন। আফজল খাঁ এইরূপ করিবার কারণ জিজ্ঞাসা করাতে বলা হইল যে, তাঁহার ভয়ে শিবাজী হঠাৎ তাঁহার নিকটে আসিতে সাহস করিতেছেন না। শিবাজী উপস্থিত হইলে আফজল খাঁ তাঁহাকে অভিবাদন করিবার জন্য অগ্রসর হইলেন। অমনি শিবাজী তাঁহার উদরে বাঘনখ ফুটাইয়া দিলেন। শিবাজীর এই বিশ্বাসঘাতকতা দেখিয়া আফজল খাঁ হস্তস্থিত তরবারি দ্বারা তাঁহাকে আঘাত করিলেন; কিন্তু শিবাজীর বর্ম্মে ঠেকিয়া উহা বিফল হইল; তৎক্ষণাৎ শিবাজী তাঁহাকে অস্ত্রাঘাত করিলেন। ইতিমধ্যে শিবাজীর দেহরক্ষকও শিবাজীর সহিত যোগ দিল। গোলমাল শুনিয়া আফজল খাঁর দেহরক্ষক ছুটিয়া আসিয়া শিবাজীকে আক্রমণ করিল; কিন্তু প্রভুকে রক্ষা করিতে পারিল না নিজেও শিবাজীর হাতে প্রাণ হারাইল।
শিবাজীর বল ক্রমে এই প্রকারে বাড়িতে লাগিল। অবশেষে রায়গড়ে রাজা হইয়া নিজের নামে টাকা চালাইতে লাগিলেন (১৬৬৪)। দিল্লীর সম্রাট্ পর্য্যন্ত তাঁহার শাসনের জন্য সৈন্য প্রেরণ করেন। কিন্তু শিবাজী সন্ধি করিয়া যুদ্ধ স্থগিত করেন; সম্রাটের সহিত সাক্ষাৎ করিবার জন্য দিল্লীতে যান। সেখানে আওরঙ্গজেব তাঁহাকে কিরূপ ভাবে গ্রহণ করিয়াছিলেন ও শিবাজী কিরূপে পলাইয়া আসেন, তাহা পূর্ব্বেই বলা হইয়াছে। শিবাজী দিল্লী হইতে পলাইয়া আসিয়া নিজের রাজ্যের উন্নতি ও সেনাদলের সুবন্দোবস্তের দিকে মন দিলেন। এই বিষয়ে তিনি যথেষ্ট সুবিবেচনা ও বুদ্ধির পরিচয় দেন। পূর্ব্বে সকলে শিবাজীকে অগ্রাহ করিত; কিন্তু এখন তাঁহার ভয়ে দিল্লীর বাদশাহের পর্য্যন্ত আতঙ্ক উপস্থিত হইল। শিবাজী যতদিন বাঁচিয়াছিলেন, আওরঙ্গজেব ততদিন দাক্ষিণাত্যে আসেন নাই। শিবাজীর সৈন্যগণ যখন যেখানে পড়িত, সেইখানেই লুটপাট্ করিত; কিন্তু সে সকল ধন রাজকোষে দিতে হইত। স্ত্রীলোক, ব্রাহ্মণ ও কৃষককে আক্রমণ করা, শিবাজীর বিশেষ নিষেধ ছিল। শিবাজীর অসাধারণ বুদ্ধি এবং শক্তির কথা ভাবিলে অবাক্ হইতে হয়। পূর্ব্বে যে মারাঠাজাতি আত্মকলহে লিপ্ত ছিল, তিনি তাহাদিগকে একতা শিক্ষা দিয়া প্রাণে এমন এক নূতন উৎসাহ ও এমন এক নূতন শক্তির সঞ্চার করিয়া দিলেন যে, মারাঠাদিগের সাহস ও প্রতাপে সমস্ত ভারতবর্ষ কাঁপিয়া উঠিল ৷ ![]()
রায়গড় দুর্গ।
মুসলমান অধীনতায় হিন্দুজাতি নিৰ্জ্জীব হইয়া পড়িয়াছিল; এমন যে বীর রাজপুতগণ তাহারাও নিস্তেজ হইয়া পড়িয়াছিল; সেই সময়ে শিবাজী যেন কি এক মন্ত্রবলে মারাঠাজাতিকে জাগাইয়া তুলিলেন।
শিবাজীর মৃত্যুর পর সাম্ভাজী রাজা হন। কিন্তু ইনি শিবাজীর বড়ই অনুপযুক্ত পুত্র ছিলেন। দিবারাত্র আমোদ প্রমোদে মত্ত থাকিতেন, রাজকার্য্য কিছুই দেখিতেন না। অবশেষে আওরঙ্গজেবের হস্তে বন্দী হইয়া মৃত্যুমুখে পতিত হন। সাম্ভাজীর মৃত্যুর পর তাঁহার পুত্রকে রাজা করা হয় এবং সাম্ভাজীর ভাই রাজারামের হস্তে রাজ্যের এবং রাজার রক্ষার ভার পড়ে। আওরঙ্গজেব কিছুদিন পরেই সাম্ভাজীর শিশুপুত্র ও তাঁহার স্ত্রীকে বন্দী করিয়া লইয়া যান এবং তাঁহারা বহুকাল পর্যন্ত আওরঙ্গজেবের নিকট বন্দী ভাবে থাকেন। শিশুরাজা যখন বন্দী হইলেন, রাজারামই তখন রাজা হইলেন। রাজারামের সময় সেতারা রাজধানী হইল। তিনি খণ্ডেরাও দাভাড়েকে গুজরাটের ও পারসজী ভোঁসলেকে বিরারে চৌথ[১] আদায় করিবার জন্য পাঠান। বরোদার গাইকোয়াড় ও নাগপুরের ভোঁসলা রাজাদিগের আদি পুরুষ এই দুই জন। রাজারামের মৃত্যুর পর তাঁহার পুত্র তৃতীয় শিবাজী রাজা হন। সেই সময়ে দিল্লীর সম্রাট্ ঝগড়া বাধাইবার জন্য সাম্ভাজীর পুত্র শাহুকে ছাড়িয়া দিলেন; শাহু সেতারায় আসিয়া রাজা হইলেন এবং অনেকে তাঁহার দলে যোগ দিল। গৃহযুদ্ধ বাধিয়া গেল। অবশেষে রাজ্য ভাগ হইয়া গেল এবং তৃতীয় শিবাজী কোহ্লাপুরে নূতন রাজধানী করিলেন (১৭০৮ খৃঃ অঃ)। শাহু কোহ্লাপুর রাজ্যের স্বাধীনতা স্বীকার করিলে যুদ্ধ থামিয়া গেল। তখন হইতে সেতারা ও কোহ্লাপুরে শিবাজীর বংশের দুই শাখা রাজত্ব করিতে লাগিল।
শিবাজীর মৃত্যুর পরে তাঁহার বংশধরেরা তাঁহার গৌরব হারাইল। কিন্তু সমুদায় মারাঠাজাতি চারিদিকে রাজ্য বাড়াইতে লাগিল। শাহু রাজা হইয়া বালাজী বিশ্বনাথ নামে বিচক্ষণ ও বুদ্ধিমান্ একজন ব্রাহ্মণকে পেশওয়া বা মন্ত্রী করিলেন। শিবাজীর বংশধরেরা হীনবল হইয়া পড়িলেন বটে, কিন্তু এই পেশওয়া এবং তাঁহার বংশধরেরা মারাঠা শক্তিকে ভারতবর্ষের চারিদিকে বিস্তৃত করিলেন।
- ↑ রাজস্বের চারিভাগের একভাগ।