ভারতবর্ষের ইতিহাস (হেমলতা দেবী)/দ্বাদশ পরিচ্ছেদ
দ্বাদশ পরিচ্ছেদ।
শিখজাতির বিবরণ।
১৪৬৮ খৃষ্টাব্দে লাহোরের নিকট তালবন্তী বা নানকাণা গ্রামে শিখজাতির আদিগুরু নানকের জন্ম হয়। নানক জাতিতে ক্ষত্রিয় ছিলেন। তাঁহার পিতার নাম কালু ও মাতার নাম ত্রিপতা ছিল। নানকের পিতা সামান্য বণিক্ ছিলেন। কথিত আছে বাল্যকাল হইতেই নানক বড় শান্ত
![]()
বাবা নানক।
ও গম্ভীর প্রকৃতির লোক ছিলেন। একটু বড় হইলে পথ দিয়া কোন সন্ন্যাসী বা ফকিরকে যাইতে দেখিলেই, নানক তাঁহাদিগকে ডাকিয়া আনিতেন। পাঁচ বৎসর বয়সে হাতে খড়ি দিয়া, তাঁহাকে পাঠশালায় দেওয়া হয়। সেখানে শিক্ষকেরা তাঁহার আশ্চর্য্য বুদ্ধি দেখিয়া অবাক্ হন, এবং পঠদ্দশাতেই তাঁহার ঈশ্বরের প্রতি বিশ্বাস ও ভক্তি জাগ্রত হয়। তিনি সর্ব্বদাই চুপ করিয়া থাকিতেন, সর্ব্বদাই কি যেন ভাবিতেন। তাঁহার পিতা, পুত্রের এইরূপ ভাব দেখিরা তাঁহাকে অন্যমনা কবিরার জন্য গো মেষ চরাইবার ভার দিলেন; কিন্তু তাঁহার দ্বারা সে কাজ হইল না। তিনি পশুদিগকে ছাড়িয়া দিয়া গাছের তলায় ঈশ্বর-চিন্তায় মগ্ন থাকিতেন। এইরূপে কালু নানা প্রকারে চেষ্টা দেখিলেন, নানকের দ্বারা ব্যবসায়, বাণিজ্য বা বিষয় কার্য্য কিছুই হয় না। নানক ক্রমে আপনার প্রকৃত কাজ খুঁজিয়া পাইলেন। তিনি হিন্দু মুসলমান সকলের নিকট এক ঈশ্বরের পূজার কথা প্রচার করিতে লাগিলেন। নানকের আর এক মহৎ উদ্দেশ্য ছিল, ধর্ম্মসূত্রে হিন্দু মুসলমান দুই বিরোধীজাতিকে একত্র বন্ধন করা। অচিরে হিন্দু মুসলমান উভয়েই দলে দলে তাঁহার শিষ্য হইতে লাগিল। ইহারা শিখ বা শিষ্য সম্প্রদায় নামে পরিচিত। তাঁহার মৃত্যুর পর শিখদের আরও নয় জন গুরু হইয়াছিলেন। শিখেরা পূর্ব্বে অতি নিরীহ ভাবাপন্ন ছিল। গোঁড়া মুসলমানেরা তাহাদের প্রতি অশেষ অত্যাচার করিত। তাহারা নীরবে সে সকল সহ্য করিত। সম্রাট্ জাহাঙ্গীরের পুত্র খুসরু যখন বিদ্রোহী হন, তখন অনেক শিখ তাঁহার সহায় ছিল। এই অপরাধে সম্রাট প্রায় ৭০০ শিখকে অতি নিষ্ঠুর ভাবে হত্যা করেন এবং লাহোর হইতে সমুদায় শিখদিগকে তাড়াইয়া দেন। এইরূপে তাড়িত হইয়া তাহারা শতদ্রুর নিকট পাহাড়ে আশ্রয় গ্রহণ করে। সম্রাট আওরঙ্গজেব অত্যন্ত গোঁড়া মুসলমান ছিলেন। তিনি নবম গুরু তেগবাহাদুরকে বন্দী করিয়া লইয়া যান এবং মুসলান হইবার জন্য অশেষ যন্ত্রণা প্রদান করেন; কিন্তু কিছুতেই তাঁহার মত ফিরাইতে পারিলেন না। তখন একদিন সভার তেগবাহাদুরকে আনিয়া সম্রাট, বলিলেন, “যদি কোন আশ্চর্য্য ব্যাপার দেখাইতে পার, তাহা হইলে তোমার ধর্ম্ম সত্য বলিব।” তেগবাহাদুর বলিলেন, “আমি আশ্চর্য্য ব্যাপার কিছুই করিতে জানি না। তবে আমার গলায় এমন এক মন্ত্র বাঁধিয়া মরিব, যাহা হইতে আশ্চর্য্য ফল ফলিবে।” এই বলিয়া এক খণ্ড কাগজে একটি মন্ত্র লিখিয়া গলায় বাঁধিয়া, তরবারি আঘাতের জন্য গলা পাতিরা দিলেন। সম্রাটের লোকেরা তাঁহার গলায় তরবারির আঘাত করিল, মস্তক ধূলায় গড়াইয়া পড়িল। তখন সভার লোকে আগ্রহের সহিত সেই মন্ত্র পড়িয়া দেখিল;—তাহাতে লেখা ছিল, “শির দিয়া সের নাহি দিয়া”—অর্থাৎ প্রাণ দিলাম কিন্তু বিশ্বাস ছাড়িলাম না। যথার্থই সেই মন্ত্রের আশ্চর্য্য ফল ফলিল। শিখেরা গুরুর হত্যাতে ক্রোধে ও বিদ্বেষে আগুন হইয়া উঠিল, এবং দ্বিগুণ উৎসাহের সহিত দলে দলে মিলিতে লাগিল। তেগবাহাদুরের পুত্র দশম গুরু গোবিন্দ পিতার মৃত্যুতে মুসলমানদিগের প্রতি জাতক্রোধ হইলেন। মুসলমানদিগের অত্যাচারের প্রতিশোধ লইবার জন্য তিনি শিখদিগকে এক নবমন্ত্রে দীক্ষিত করিয়া, রীতিমত যোদ্ধা করিয়া তুলিলেন (১৬৭৫ খৃঃ অঃ)। পঞ্জাবের নানা স্থানে শিখদিগের আশ্রয়ের জন্য কেল্লা নির্মাণ করাইলেন। মুসলমানেরা শিখদিগের প্রতি ঘোরতর অত্যাচার করিতে আরম্ভ করিল। শিখদিগের কেল্লা দখল করিয়া, গুরু গোবিন্দের পরিবার পরিজন সকলকে হত্যা করিল। গুরু গোবিন্দ দাক্ষিণাত্যে পলাইয়া গেলেন। সেখানে শত্রুর হস্তে তিনি প্রাণ হারাইলেন। গুরু গোবিন্দ শিখদিগকে সিং উপাধি দিয়া প্রকৃত পক্ষে সিংহ করিয়া তুলিয়াছিলেন। গুরু গোবিন্দের মৃত্যু হইল বটে, কিন্তু শিখদিগের হুঙ্কারে পঞ্জাব কাঁপিয়া উঠিল।
বাবা নানক শিখ-ধর্ম্ম প্রচার করিয়া যান। কিন্তু গুরু গোবিন্দই শিখজাতিরূপ মহা শক্তিশালী বীরজাতির জন্মদাতা। গুরু গোবিন্দের পরে বান্দা নামে একজন নেতার অধীনে শিখেরা পূর্ব্ব-পঞ্জাবে মুসলমানদিগের কত মসজিদ্ চূর্ণ করিল, মোল্লাদিগকে হত্যা করিল এবং গ্রামে গ্রামে পড়িয়া গ্রামবাসীদিগকে উৎসন্ন করিল। দিল্লীর সম্রাট; তাহাদিগের বিরুদ্ধে সৈন্য পাঠাইলেন। তখন তাহারা পলাইয়া পর্ব্বতে আশ্রয় লইল। অনেক চেষ্টার পর মুসলমানেরা বান্দাকে ধরিয়া সম্রাটের নিকট আনিল। সম্রাট্ বান্দা এবং তাহার সঙ্গীদিগকে ভয়ানক নিষ্ঠুররূপে হত্যা করিলেন। তখন হইতে মুসমলানগণ শিখদিগকে একেবারে নির্মূল করিতে বিশেষ চেষ্টা করিতে লাগিল। কিন্তু নির্মূল করা দূরে থাকুক, শিখদিগের শক্তি দিন
![]()
রণজিৎ সিংহ।
দিনই বাড়িতে লাগিল। তাহারা এক এক মিছিল অর্থাৎ দল বাঁধিয়া পঞ্জাবের চারিদিকে আক্রমণ করিল। এইরূপে নাকি তাহাদের ১১টি দল হয়। দলের নেতারা কেল্লা নির্ম্মাণ করিয়া তাহার ভিতর সৈন্য সামন্ত ধন সম্পত্তি রাখিতেন। এক এক মিছিলে দশ বার হাজার করিয়া যোদ্ধা থাকিত। এই সকল মিছিলের সর্দারগণ বড় সামান্য ব্যক্তি ছিলেন না।
এখন যে পাতিয়ালা, ঝিন্দ, কর্পূরতলার রাজাদিগের নাম শুনিতে পাওয়া যায়, তাঁহারা এইরূপ এক এক মিছিলের সর্দারের বংশ। পঞ্জাবের রাজা রণজিৎ সিংহের পিতামহ ছত্র সিংত শূকরচকিয়া নামে এক মিছিলের সর্দার ছিলেন। রণজিৎ সিংহ আর সকল মিছিলকে আয়ত্ত করিয়া স্বয়ং পঞ্জাবের রাজা হন। মহারাজ রণজিৎ সিংহ অতি ক্ষমতাবান্ নরপতি ছিলেন। তিনি আফগানদিগকে পঞ্জাব হইতে তাড়াইয়া দেন এবং কাশ্মীর, মুলতান প্রভৃতি স্থান সকল জয় করেন। ইউরোপীয় সেনাপতিদিগের অধীনে সুশিক্ষিত একদল সৈন্য রচনা করেন মহারাজ রণজিৎ সিংহের অধীনে শিখেরা প্রচণ্ড শক্তিশালী হইয়া উঠিল। কিন্তু মহারাজ রণজিতের মৃত্যুর পর, তাহারা উপযুক্ত চালকবিহীন হইল। শিখ সৈন্যদিগের দোর্দ্দণ্ড প্রতাপ রোধ করা কাহারও সাধ্য ছিল না। তাহারা অকারণ ইংরেজ রাজ্যে পড়িয়া যুদ্ধ করিয়া, অবশেষে যুদ্ধে পরাজিত হইয়া চিরদিনের মত স্বাধীনতা হারাইয়াছে।