ভারতবর্ষের ইতিহাস (হেমলতা দেবী)/নবম পরিচ্ছেদ
নবম পরিচ্ছেদ।
আওরঙ্গজেবের মৃত্যুর পর যে কয়জন দিল্লীর সম্রাট হন, তাঁহারা নামমাত্র সম্রাট্ ছিলেন। তাঁহাদের ইতিহাস বিশেষ কিছু বলিবার নাই। তবে মোগল রাজ্যের পতনের সময় যে যে প্রধান ঘটনা ঘটিয়াছিল, তাহার সংক্ষিপ্ত বিবরণ তোমাদিগকে বলিব।
ফরুখ সের—গাজি খাঁ নামে আওরঙ্গজেবের একজন প্রিয় সেনাপতি ছিলেন। সেই সময়ে দাক্ষিণাত্যে যে সকল যুদ্ধ হয়, তাহাতে ইনিই নেতা ছিলেন। ফরুখ সেরের রাজত্ব সময়ে গাজি খাঁর পুত্র চীনক্লীচ খাঁ দাক্ষিণাত্যে হায়দারাবাদে স্বাধীন মুসলমান রাজ্য স্থাপন করেন (১৭২১ খ্রীঃ)। সেই চীনক্লীচ খাঁর বংশধরগণ আজ পর্যন্ত নিজাম নামে খ্যাত। সম্রাটের নিকট হইতে ইনি ‘নিজামূল মূলক’ উপাধি প্রাপ্ত হন।
মহম্মদ শাহ—মহম্মদ শাহ সাদাৎ আলী নামক একজন মন্ত্রীকে এলাহাবাদ ও অযোধ্যার সুবাদার করিয়া পাঠান। ইনি পরে সম্রাটের উপর বিরক্ত হইয়া অযোধ্যায় স্বাধীনভাবে রাজত্ব করিতে থাকেন। সাদাৎআলী অযোধ্যার নবাবদিগের আদিপুরুষ। লর্ড ডালহৌসী অযোধ্যার শেষ নবাব ওয়াজিদআলীকে পদচ্যুত করিয়া অযোধ্যা ইংরাজরাজ্য ভুক্ত করিয়া লন (১৮৫৬ খৃঃ অঃ)।
মহম্মদ শাহের রাজত্ত্ব সময়ে বিখ্যাত নাদীর শাহ ভারতবর্ষে আইসেন। ইনি পূর্ব্বে এক জন সামান্য লোক ছিলেন; কিন্তু পরে পারস্য। দেশ জয় করিয়া, সেখানকার সম্রাট হন এবং ক্রমে কাবুল পর্যন্ত জয় করেন (কাবুল বাবরের সময় হইতে দিল্লীর সম্রাটের অধীন ছিল)। অবশেষে ভারতবর্ষের দিকে তাঁহার চক্ষু পড়িল এবং ১৭৩৯ খৃষ্টাব্দে ভারতবর্ষে প্রবেশ করিলেন। অযোধ্যার সাদাৎআলী এবং হায়দারাবাদের নিজাম তাঁহার গতিরোধ করিতে আসেন। দিল্লীর নিকটেই এক যুদ্ধ হয়, তাহাতে নাদীরশাহ জয়লাভ করিয়া দিল্লীতে প্রবেশ করেন। মহম্মদ শাহ তাঁহার সহিত সাক্ষাৎ করিতে আসেন।
![]()
নাদীর শাহ।
বাদসার মস্তকে কোহিনুর দেখিরা নাদীর শাহের বড় লোভ হইল। তিনি বলিলেন যে,—“আমাদের দেশে বন্ধুতা হইলে পরস্পর পাগড়ি বদল করিবার নিয়ম আছে; আসুন আমরা মুকুট বদল করি।” মহম্মদ শাহ তৎক্ষণাৎ কোহিনুরশোভিত মুকুট নাদীর শাহের মস্তকে পরাইয়া দিলেন। সেই দিন হইতে কোহিনুর দিল্লীর সম্রাটের মুকুট হইতে স্থানচ্যুত হইল। নাদীর শাহ কোহিনুর পাইয়া মহা সন্তুষ্ট হইলেন এবং দিন কয়েক মহম্মদ শাহের সহিত বন্ধুভাবে কাটাইলেন। কিন্তু শীঘ্রই তাঁহার সৈন্যদিগের সহিত দিল্লীবাসিদিগের বিবাদ হয়; এমন কি তাহারা নাদীর শাহকে পর্য্যন্ত অবজ্ঞার ভাব দেখাইয়াছিল। দিল্লীবাসীদের এই ব্যবহারে নাদীর শাহ ক্রোধে উন্মত্ত হইলেন এবং সৈন্যদিগকে দিল্লীবাসিদিগকে হত্যা করিতে আজ্ঞা দিলেন। সারাদিন হত্যাকাণ্ড চলিল। মহম্মদ শাহ প্রজাদিগের রক্তপাত দেখিয়া আর স্থির থাকিতে পারিলেন না। অব্যাহতি দিবার জন্য নাদীর শাহকে করযোড়ে অনুরোধ করিলেন। নাদীর শাহের আজ্ঞায় তখন হত্যাকাণ্ড স্থগিত হইল। নাদীর শাহ দিল্লীর বড় লোকদিগের বাটীতে, সম্রাটের প্রাসাদে, রাজভাণ্ডারে যত কিছু টাকা, মণিমাণিক্য দেখিলেন, সর্ব্বস্ব লইয়া গেলেন। সাজাহানের এত সাধের ময়ূর-সিংহাসন পর্যন্ত নিজ রাজ্যে লইয়া যান।
মহম্মদ শাহের রাজ্যের দুর্গতি এখানেই শেষ হইল না। কাবুলের আমীর আহমদ শাহ দুরাণী এইবার ভারতবর্ষে (১৭৪৮ খৃঃ অঃ) আসেন। কিন্তু সম্রাটের পুত্র তাঁহাকে প্রথম বারে তাড়াইয়া দেন। আহমদ শাহ কিন্তু তাহার পর তিনবার ভারতবর্ষে আসেন। দ্বিতীয় বার আসিয়া লাহোর অধিকার করিয়া চলিয়া যান। তৃতীয় বারে দিল্লীতে প্রবেশ করিয়া, নাদীর শাহের মত দিল্লীবাসীদের সর্ব্বনাশ করেন। রক্তস্রোতে দিল্লীর পথ ঘাট ভাসিয়া যায়। তারপর মথুরায় গিয়া এক বড় পর্ব্বের দিনে অগণ্য হিন্দুকে হত্যা করেন। শেষবারে পাণিপথে মারাঠাদিগের (১৭৫৯ খৃঃ অঃ) সহিত যুদ্ধ হয়! এই সময়ে মারাঠারা ভারতে প্রবল শক্তি হইয়া উঠিয়াছিল, কি দাক্ষিণাত্যে, কি উত্তরে সর্ব্বত্রই মারাঠারা সর্ব্বেসর্ব্বা ছিল। আহম্মদ শাহ দুরাণী দিল্লীশ্বরের নিকট হইতে পঞ্জাব কাড়িয়া লইয়াছিলেন। এখন মারাঠা অধিপতি রাঘোবা, আহমদ শাহের লোকদিগকে তাড়াইয়া পঞ্জাব অধিকার করেন। এই সংবাদ শুনিয়া আহমদ শাহ মারাঠাদিগের দর্প চূর্ণ করিবার জন্য চতুর্থ বার ভারতবর্ষে আসেন। মারাঠা সেনাপতি সদাশিব রাও বিস্তর সৈন্য লইয়া যুদ্ধে অগ্রসর হন। হোলকার তাঁহাকে হঠাৎ যুদ্ধ করিতে নিষেধ করেন। অযোধ্যার নবাব এবং রোহিলারা দুরাণীর সহিত যোগ দেন। সদাশিবের সৈন্যরা কিছুদিন যুদ্ধ না করিয়া গড়খায়ের ভিতর রহিল। পরে খাদ্যদ্রব্যের অনাটন হওয়াতে যুদ্ধ করিতে বাহির হইল। যুদ্ধের প্রথমেই মারাঠারা এমন বিক্রমের সহিত আক্রমণ করিল যে রোহিলারা তাহাদের আক্রমণ সহ্য করিতে না পারিয়া হটিয়া গেল। তখন দুরাণী আফগান সৈন্য লইয়া সম্মুখে আসিলেন। এইবারে আফগানদিগের হস্তে মারঠারা পরাজিত হইল। সদাশিব রাও যুদ্ধক্ষেত্রে পড়িলেন। পাণিপথের যুদ্ধে হারিয়া মারাঠারা কিছুদিনের জন্য নিষ্প্রভ হইয়া রহিল। ইতিহাসে ইহা পাণিপথের তৃতীয় যুদ্ধ নামে খ্যাত। পাণিপথের প্রথম যুদ্ধে বাবর ইব্রাহিম লোদীর নিকট হইতে দিল্লী-সাম্রাজ্য কাড়িয়া লন (১৫২৭ খ্রীষ্টাব্দে)। দ্বিতীয় পাণিপথের যুদ্ধে হুমায়ুন দিল্লী-সাম্রাজ্য ফিরিয়া পান (১৫৫৬ খ্রীষ্টাব্দে)।
সিপাহী-বিদ্রোহের সময় দিল্লীর শেষ সম্রাট বাহাদুর শাহ বিদ্রোহে যোগদান করাতে, ইংরেজ বাহাদুর তাঁহাকে রেঙ্গুনে বন্দী করিয়া পাঠান। সেখানে ১৮৬২ খ্রীষ্টাব্দে তাঁহার মৃত্যু হয়। সেই সঙ্গে এত দিনের দিল্লীর রাজবংশের নাম লোপ পাইল।
মুসলমানদিগের অধীনে ভারতবাসীদিগের অবস্থা ও বঙ্গদেশ—সুকুমারমতি পাঠক পাঠিকাগণ এতক্ষণ ত তোমরা দিল্লীর সম্রাটদিগের কথা শুনিলে। এখন বল দেখি, মুসলমানদিগের সময়ে এ দেশের অবস্থা কেমন ছিল? সম্রাটদের কথা শুনিয়া তোমরা সে বিষয়ে ঠিক কিছু বুঝিতে পারিবে না, তাই সেই সম্বন্ধে তোমাদের কিছু বলিতেছি।
পাঠানদিগের রাজত্ব সময়ে প্রায় সমুদায় আর্য্যাবর্ত্ত মুসলমানদিগের অধীন হইয়াছিল, কেবল পশ্চিমে রাজপুতগণ কখনই প্রকৃত পক্ষে মূসলমানদিগের অধীন হন নাই। মুসলমানদিগের সহিত যুদ্ধে অনেক সময় তাঁহারা হারিয়া যাইতেন বটে, কিন্তু অধীনতা স্বীকার করেন নাই। বাবর এ দেশে আসিয়া রাজপুত-রাজ সংগ্রাম সিংহের সহিত যুদ্ধ করেন। কেবল আকবরই মুসলমান সম্রাটদিগের ভিতর প্রথমে রাজপুতদিগকে অনেকটা বশ করেন, কিন্তু সে নামমাত্র অধীনতা, প্রকৃতপক্ষে তাঁহারা স্বাধীনই ছিলেন। জাহাঙ্গীর ও সাজাহান রাজপুতদিগের সহিত সদ্ভাবে কাটান; কিন্তু আওরঙ্গজেবের সময় তাহারা আবার বিদ্রোহী হইয়া উঠেন। ফলতঃ রাজপুতগণ কোন দিনই মুসলমানের প্রজা হন নাই। মারাঠারাই কেবল তাঁহাদিগকে শাসন করিতে পারিয়াছিলেন। রাজপুত ছাড়া আর্য্যাবর্ত্তের আর সমুদায় লোক মুসলমানদিগের অধীন ছিল। কি পাঠান, কি মোগল উভয় রাজত্বের সময়েই এক এক দেশে এক এক জন শাসনকর্ত্তা থাকিতেন। সেই সকল দেশের শাসন বিষয়ে তাঁহারাই হর্ত্তা কর্ত্তা বিধাতা ছিলেন; কেবল মাত্র রাজকোষে কর পাঠাইতেন; আর যুদ্ধের সময় সম্রাটকে সৈন্য দিয়া সাহায্য করিতেন। প্রজারা অনেক সময়ে নিরুপদ্রবে, শান্তিতে আপন আপন কাজ লইয়। থাকিত। সাধারণ লোকের বিশেষ কোন কষ্ট ছিল না, তবে যিনি যত বড় তাঁর বিপদ তত অধিক ছিল। রাজায় রাজার যুদ্ধ হইত, কৃষকেরা নিরুপদ্রবে বাস করিত। হিন্দুরা পরাধীন হইলেও কি পাঠান কি মোগল উভয় রাজাদের সময়েই রাজ্যে বড় বড় কাজ পাইতেন। এ সম্বন্ধে রাজারা প্রায় হিন্দু মুসলমান ভেদ করিতেন না।
দাক্ষিণাত্য—মুসলমানদিগের এ দেশে আগমনের পূর্ব্বে দাক্ষিণাত্যে দ্রাবিড়, কর্ণাট, ত্রৈলঙ্গ ও মহারাষ্ট্র এই চারিটি বড় বড় স্বাধীন রাজ্য ছিল। মুসলমানদিগের মধ্যে আলাউদ্দীন খিলজি সর্ব্বপ্রথম দাক্ষিণাত্য পদার্পণ করেন। সেই সময়ে মুসলমানেরা প্রথমে দাক্ষিণাত্য আক্রমণ করিলেন। হিন্দুরাজারা অনেকবার যুদ্ধে হারিয়া গেলেও দাক্ষিণাত্য একেবারে মুসলমানদিগের অধীন হয় নাই। ত্রৈলঙ্গের হিন্দুরাজ্য অনেক দিন যুদ্ধের পর স্বাধীন হয়। কর্ণাট ও দ্রাবিড়-রাজ্যর নাম কালে লোপ হইল বটে, কিন্তু সেইখানে বিজয়নগর নামে এক হিন্দুরাজ্য স্থাপিত হইল।
মহম্মদ টগলকের সময় মহারাষ্ট্রদেশে বাহমণী রাজ্য নামে এক নূতন মুসলমান রাজা হইল। তখন হইতেই মহারাষ্ট্রদেশ অনেক দিন পর্য্যন্ত মুসলমানদিগের অধীন রহিল। বাহমণী রাজ্যের ক্ষমতা দিন। দিন বাড়িয়া উঠিল। বিজয় নগর ও ত্রৈলঙ্গের হিন্দুরাজাদিগের সহিত ইহাদিগের সর্ব্বদাই বিবাদ হইত। বাহমণীরাজগণ ক্রমে ত্রৈলঙ্গ রাজ্য গ্রাস করিলেন এবং বিজয়নগরেরও অনেক অংশ কাড়িয়া লইলেন। কিন্তু কালক্রমে এই বাহমণী রাজ্যও দুর্ব্বল হইয়া পড়িল। বাবর যখন ভারতবর্ষে আসেন, তখন বাহমণী রাজ্য ভাঙ্গিয়া দক্ষিণাপথে বিজয়পুর, আহমদনগর ও গোলকুণ্ডা এই তিনটি স্বাধীন মুসলমান রাজ্য হইয়াছিল। কিন্তু বিজয়নগরে হিন্দুরাজারা তখনও স্বাধীন ছিলেন। মোগল সম্রাটদিগের মধ্যে আকবরই প্রথম দক্ষিণাপথ জয় করিবার চেষ্টা করেন; কিন্তু এই সময়ের মধ্যেই বিজয়নগরের হিন্দুরাজ্য প্রতিবেশী মুসলমান রাজাদিগের হস্তে স্বাধীনতা হারায়। আকবর আহমদনগর জয় করিবার চেষ্টা করেন বটে, কিন্তু সাজাহানই তাহা জয় করেন। আওরঙ্গজেব অনেক বৎসর ধরিয়া যুদ্ধ করিয়া, বিজয়পুর ও গোলকুণ্ডা জয় করিয়াছিলেন। কিন্তু এই সময়েই দাক্ষিণাত্যে আর এক নূতন শক্তি মাথা তুলিয়া উঠিল। দাক্ষিণাত্যের সমুদায় পুরাতন মুসলমানরাজ্য লোপ করিয়া, মহারাষ্ট্রীয়েরা দুর্জয় শক্তি হইয়া দাঁড়াইলেন। ক্রমে ইহাদের প্রভাব আর্য্যবর্ত্তে পর্য্যন্ত প্রবেশ করিল। ইঁহারাই দিল্লীর সাম্রাজ্যের ধ্বংস সাধন করেন। দাক্ষিণাত্যে মহারাষ্ট্র-রাজ্যের পাশাপাশি হায়দারাবাদে স্বাধীন মুসলমান-রাজ্য দেখা দিল। উত্তরে দিল্লীর পতনের সঙ্গে সঙ্গে পঞ্জাবে নূতন শিখশক্তি ও অযোধ্যায় স্বাধীন মূসলমান-রাজ্য স্থাপিত হইল। রোহিলখণ্ডে রোহিলারা ও ভরতপুরে জাঠেরা এই সময়ে শক্তিশালী হইয়া উঠিয়াছিলেন।
বঙ্গদেশ—মুসলমান আমলে বঙ্গদেশের অবস্থা একটু জানা দরকার। কি পাঠান, কি মোগল উভয় রাজত্ব কালেই বাঙ্গালা দেশের জমিদারগণ অত্যন্ত পরাক্রান্ত ছিলেন। মোগল রাজত্বের প্রারম্ভে এবং শেষে বাঙ্গালাদেশে ঘোর অরাজকতা ছিল। পটুর্গীজ দস্যু এবং মগেরা পূর্ব্ববঙ্গ ও চট্টগ্রামে অত্যন্ত উৎপাত করিত। আকবর মানসিংহকে বঙ্গদেশের সুবন্দোবস্তের জন্য পাঠাইয়াছিলেন। মোগলদিগের সময় বাঙ্গালার মুসলমান শাসনকর্তাদিগের মধ্যে মুরশিদকুলি খাঁ অত্যন্ত প্রসিদ্ধ। তিনি অতি উপযুক্ত নরপতি ছিলেন। বাঙ্গালার শেষ মুসলমান রাজা সিরাজুদ্দৌলার মাতামহ আলিবর্দ্দি খাঁর সময়ে বাঙ্গালা দেশে বড় বর্গির উৎপাত হয়। ইহাদের বিষয় পরে বর্ণিত হইবে।