ভারতবর্ষের ইতিহাস (হেমলতা দেবী)/পঞ্চদশ পরিচ্ছেদ
মহারাণীর রাজত্ব।
পঞ্চদশ পরিচ্ছেদ।
লর্ড ক্যানিং—(১৮৫৬–৬২ খৃঃ অঃ) লর্ড ডালহৌসির পরে
![]()
ক্যানিং।
লর্ড ক্যানিং গভর্ণর জেনারেল হইয়া এদেশে আসেন। তিনি যখন আসিলেন তখন দেশের চারিদিকে শান্তি বিরাজ করিতেছিল। “সিপাহী-বিদ্রোহ” নামক তুমুল ঝড় যে শীঘ্রই আসিতেছে, তাহা কেহ ভাবে নাই। লর্ড ক্যানিং অনেক সৎকার্য্য করিবেন ভবিয়াছিলেন। কিন্তু এই ঘোর বিপ্লবে তিনি এত অস্থির হইয়াছিলেন যে, আর কোন দিকে মন দিতে পারেন নাই।
সিপাহী-বিদ্রোহ—(১৮৫৭ খৃঃ অঃ) সিপাহী বিদ্রোহের ঠিক্ একশত বৎসর পূর্ব্বে ক্লাইব পলাশীর যুদ্ধে জয়লাভ করিয়া ভারতে ইংরেজ রাজ্যের ভিত্তি স্থাপন করেন। একশত বৎসর পরে সিপাহী বিদ্রোহ নামক ঝড়ে ইংরেজ কোম্পানির ভারত সাম্রাজ্য টলমল্ করিয়া উঠিল। লর্ড ডালহৌসির শাসন সময়ে এদেশে মহাপরিবর্ত্তন উপস্থিত হয়। পুরাতন দেশীয় রাজ্য সকলের পরিবর্তে চারিদিকেই ইংরেজ রাজ্য বিস্তৃত হয়। আবার রেলগাড়ী, পোষ্ট আফিস, টেলিগ্রাফ আফিস প্রভৃতির সৃষ্টি হইয়া এ দেশের লোকদিগের মনে এক প্রকার বিস্ময়ের উদয় করে। চারিদিকেই পরিবর্ত্তন! পুরাতন যাহা কিছু ছিল, তাহার পরিবর্তে নূতন আসিয়া উপস্থিত হইল; হঠাৎ এত পরিবর্ত্তনের স্রোত সম্বরণ করা দেশের লোকের পক্ষে কিঞ্চিৎ কঠিন হইল। যত রাজ্যচ্যুত দেশীয় রাজারা এবং শেষ পেশওয়ার পোষ্যপুত্র নানা সাহেব লুকাইয়া লুকাইয়া চারিদিকে ইংরেজ জাতির বিরুদ্ধে লোকের মনে বিদ্বেষের আগুন জালাইয়া দিতেছিলেন।
ওদিকে আবার বাঙ্গালার সিপাহীদিগের ভিতর একটা অসন্তোষের ভাব পূর্ব্ব হইতেই দেখা দিয়াছিল। সিন্ধুদেশের যুদ্ধের সময় বাঙ্গালার সৈন্যগণ যুদ্ধ করিতে অস্বীকার করে এবং ব্রহ্মদেশের যুদ্ধের সময়ও সমুদ্র পার হইতে চাহে নাই। এইরূপে বাঙ্গালার সিপাহীরা যখন তখন আপনাদের ইচ্ছামত চলিতে চেষ্টা করিত।
বহরমপুরের সিপাহীরা প্রকাশ্যভাবে উচ্চ কর্ম্মচারীদিগের আজ্ঞা পালন করিতে অস্বীকার করায়, তাহাদিগের অস্ত্র শস্ত্র কাড়িয়া বিদায় করা হয়। এই সময়ে আবার সিপাহীদিগের ভিতর নূতন বন্দুক প্রচলিত
![]()
সিপাহী বিদ্রোহ কানপুরের কূপ।
হওয়াতে সৈন্যগণের ভিতর হুলস্থূল পড়িয়া যায়। সকলে বলিতে লাগিল নূতন বন্দুকের টোটায় শূকর এবং গরুর চব্বি আছে। সুতরাং হিন্দু ও মুসলমান সৈন্যেরা সেই টোটা ব্যবহার করিতে অস্বীকার করিল। তাহাদিগকে কত বুঝাইয়া বলা হইল যে, বন্দুকের টোটায় চর্ব্বি আদৌ নাই, কিন্তু তাহারা কোন মতেই বুঝিল না। মিরাটের সিপাহীরা প্রথমে প্রকাশ্যভাবে বিদ্রোহী হইল। সেখানে এক দল সিপাহী টোটা ব্যবহার করিতে অস্বীকার করায় ৮৫ জন সিপাহীর প্রাণদণ্ড হয়। তাহাতে সমুদয় সিপাহী ক্ষেপিয়া উপরের কর্মচারিদিগকে মারিয়া, জেল ভাঙ্গিয়া, সদলে দিল্লীতে উপস্থিত হইল। সেখানে গিয়া “পুরাতন মোগলরাজ্য প্রতিষ্ঠিত হইল” এই কথা ঘোষণা করিল। মুসলমানেরা আসিয়া বিদ্রোহীদিগের সহিত যোগ দিল। দিল্লী তখন বিদ্রোহীদিয়ে মিলনের ক্ষেত্র হইল। চারিদিক হইতে দলে দলে বিদ্রোহী সিপাহীগণ দিল্লীর দিকে আসিতে লাগিল এবং প্রায় একই সময় ২৪টি সহরে বিদ্রোহের অগ্নি জ্বলিয়া উঠিল। দলে দলে সিপাহীরা উন্মত্ত হইয়া দুই চক্ষে যত ইংরেজ দেখিল, সকলকে হত্যা করিতে লাগিল। বিদ্রোহের সূচনা দেখিয়া কর্ত্তৃপক্ষেরা শিখসৈন্যদিগকে নিরস্ত্র করিয়াছিলেন। ফিরোজপুর, মুরদাবাদ, বরেলি, সাহারহণপুর, ফতেপুর প্রভৃতি স্থানে সিপাহীরা বিদ্রোহী হইয়া, ধনাগার লুণ্ঠন ও ইংরেজদিগকে হত্যা করে। লক্ষ্ণৌ এবং কানপুরে সিপাহীরা যাহা করিয়াছিল তাহা স্মরণ হইলে হৃৎকম্প উপস্থিত হয়। নানাসাহেব কানপুরের নিকট বিঠুর নামক স্থানে বাস করিতেন। তিনি কানপুরের বিদ্রোহী সিপাহাদিগের নেতা হইলেন। কানপুরে যত ইংরেজ ছিল তাহাদিগকে ১৯ দিন ধরিয়া সিপাহীরা অবরোধ করিরা রাখিল; তাহারা আশ্চর্য্য সাহস ও বীরত্বের সহিত আত্মরক্ষা করিতে লাগিল। অবশেষে আহারাভাবে নিতান্ত কষ্ট উপস্থিত হইলে, তাহারা নানার নিকট এলাহাবাদে যাইবার অনুমতি প্রার্থনা করিল। নানার আদেশ পাইয়া দলে দলে বালক বালিকা, পুরুষ রমণী নৌকায় করিয়া যাত্রা করিল। কিন্তু তাহাদের নৌকা ছাড়িতে না ছাড়িতে, বিশ্বাসঘাতক পাষণ্ডেরা সকলকে গুলি করিয়া মারিতে লাগিল। শিশু সন্তান ও ইংরেজ রমণীদিগকে অতি নিষ্ঠুর ভাবে হত্যা করিয়া, তাহাদিগের দেহ এক কূপে ফেলিয়া দিল। কানপুরের সেই কূপটির চারিদিকে এখন এক সুন্দর বাগান হইয়াছে, আর মৃত ব্যক্তিদিগের স্মরণার্থ কূপের উপর সুন্দর স্মৃতিচিহ্ন স্থাপিত হইয়াছে। পঞ্জাবের চিফ কমিশনার সার্ জন লরেন্স সৈন্যদিগকে নিরস্ত্র করায় বিদ্রোহ অনেক পরিমাণে শান্ত হইয়া গিয়াছিল।
দিল্লীতে প্রায় ৩০,০০০ বিদ্রোহী মিলিত হইয়াছিল। তিন মাস অবরোধের পরে, তবে ইংরেংজসৈন্য দিল্লীতে প্রবেশ করিতে পারে। সহরে প্রবেশ করার পরে ছয় দিন অনবরত যুদ্ধ চলিয়াছিল। বিদ্রোহীরা প্রত্যেক বাড়ীর ছাতের উপর হইতে গুলি ছুড়িতে লাগিল। ছয় দিন যুদ্ধের পর তবে ইংরেজেরা সহর অধিকার করিতে পারিলেন। তখন জেনারেল্ উইলসন আজ্ঞা দিলেন, যাহার হস্তে অস্ত্র দেখিবে, তাহাকেই হত্যা করিবে। সহর খুঁজিয়া বৃদ্ধ বাদসাহকে হুমায়ুনের সমাধি-মন্দির হইতে বাহির করিয়া বন্দী করা হইল। আর তাঁহার দুই পুত্রকে গুলি করিয়া মারা হইল।
এইরূপে সর্ব্বত্রই বিদ্রোহীদিগকে দমন করা হইল। সকল দেশীয় সিপাহী যে বিদ্রোহে যোগ দিয়াছিল তাহা নহে। মাদ্রাজ, বম্বে ও হায়দারাবাদের সিপাহীরা কিছু করে নাই। অয্যোধ্যার অনেক তালুকদার, লক্ষ্ণৌ এবং অযোধ্যাবাসীরা অনেকেই বিদ্রোহে যোগ দিয়াছিল। ঝান্সীর রাণী, তাঁতিয়া টোপী ও নানা সাহেব এই তিনজন প্রধান ব্যক্তি বিশেষভাবে বিদ্রোহে যোগ দিয়াছিলেন। ঝান্সীর রাণী বীর-রমণীর মত যুদ্ধক্ষেত্রে প্রাণত্যাগ করেন। তাঁতিয়া নানা সাহেবের সহিত মিলিত হইয়া, অনেক অত্যাচার করিয়া গোয়ালিয়রের যুদ্ধে পরাজিত হইয়া পলায়ন করেন। তাঁতিয়া অবশেষে ধরা পড়িয়াছিলেন, কিন্তু নানার সন্ধান পাওয়া যায় নাই। বিদ্রোহ দমন হইতে প্রায় দুই বৎসর সময় লাগিয়া ছিল। যে সকল ব্যক্তি সাক্ষাৎভাবে বিদ্রোহে যোগ দিয়াছিল, তাহাদের প্রাণদণ্ড হইল। যাহারা সাহায্য করিয়াছিল, তাহাদিগকে দ্বীপান্তরিত করা হইল। বিদ্রোহ দমন করিবার সময় যাহাতে নিরপরাধেরা শাস্তি না পায়, সেই জন্য ক্যানিং বিশেষ আগ্রহ দেখাইয়াছিলেন, তাই লোকে তাঁহাকে “দয়ার-সাগর ক্যানিং” বলিত।
সিপাহী বিদ্রোহের ফল এই হইল যে, কোম্পানির রাজত্ব শেষ হইল। ইংলণ্ডের মহারাণী সেই সময় হইতে ভারতের সম্রাজ্ঞী হইলেন। ১৮৫৮ খৃঃ অব্দের ১লা নবেম্বর মহারাণী ভিক্টোরিয়ার নামে ভারতের সর্ব্বত্র এক ঘোষণাপত্র প্রচারিত হইল। তাহাতে রাজা এ দেশের প্রজাদিগের ধর্ম্ম এবং জাতিভেদের উপর হস্ত দিবেন না, এইরূপ বলা হইয়াছে।
লর্ড মেয়ো—(১৮৬৯-৮২ খৃঃ অঃ) ইহার শাসনসময়ে বিশেষ কোন ঘটনা ঘটে নাই। মহারাণীর দ্বিতীয় পুত্র ডিউক অ্ব এডিনবরা ইহার সময়ে এ দেশে আসেন। প্রথম রাজদর্শন পাইয়। ভারতবাসীরা অতিশয় সন্তুষ্ট হইয়াছিল। লর্ড মেয়ো আন্দামান দ্বীপ দেখিয়া জাহাজে উঠিবার সময় শের আলি নামে এক ব্যক্তি তাঁহার বুকে ছোরা বসাইয়া দেয়। এ ব্যক্তি হত্যা অপরাধে যাবজ্জীবন দ্বীপান্তরিত হইয়াছিল।
লর্ড নর্থব্রুক—(১৮৭২-৭৬ খৃঃ অঃ) ইঁহার শাসনসময়ে বাঙ্গালা দেশে দুর্ভিক্ষ হয়। লর্ড নর্থব্রুক দুর্ভিক্ষ নিবারণের জন্য প্রাণপণে যত্ন করেন এবং রাজকোষ হইতে বিস্তর অর্থ সাহায্য করিয়াছিলেন। ১৮৭৫ খৃঃ অব্দে মহারাণীর জেষ্ঠ্য পুত্র প্রিন্স অব্ ওয়েল্স্ এ দেশে আগমন করেন। ভাবী রাজার দর্শন পাইরা প্রজারা যার পর নাই আনন্দিত হইয়াছিল। তাঁহার সমাদরের জন্য সর্ব্বত্রই বিপুল আয়োজন হইয়াছিল।
লর্ড লিটন্—(১৮৭৬—১৮৮০ খৃঃ অঃ) ইনি গভর্ণর জেনারেল হইয়া আসিবার কিছু দিন পরে, দিল্লীতে সমারোহের সহিত এক দরবার হয়। তাহাতে মহারাণী ভিক্টোরিয়া “ভারতেশ্বরী” এই উপাধি গ্রহণ করিয়াছিলেন।
লর্ড রিপন—(১৮৮০—৯৪ খৃঃ অব্দে) এইবার যাঁহার নাম করিতেছি তাহার মত প্রজাপ্রিয়, প্রজাহিতৈষী গভর্ণর এ দেশে অতি অল্পই আসিয়াছেন। তিনি ভারতবাসীদিগের জন্য যাহা করিয়াছেন, তাহার জন্য চিরদিন এ দেশের লোক তাঁহাকে স্মরণ করিবে।
১৮৮৭ খৃঃ অব্দে মহারাণীর পঞ্চাশ বৎসর রাজত্ব পূর্ণ হওয়াতে অতি সমারোহের সহিত জুবিলি উৎসব হয়।
১৯০১ খ্রীষ্টাব্দের ২২ শে জানুয়ারী ভারতেশ্বরী সম্রাজ্ঞী ভিক্টোরিয়া পরলোকগমন করেন। ইহারই রাজত্ব সময়ে ভারতবর্ষ সুখ সমৃদ্ধিতে পূর্ণ হইয়াছিল। ইহারই উদার শাসনগুণে ভারতের চারিদিকে শান্তি স্থাপিত হইয়াছিল। ভারতেশ্বরীর মৃত্যুতে কোটি কোটি প্রজা মাতৃহীনের ন্যায় শোক করিরাছে। মহারাণীর মৃত্যুর পর তাঁহার জ্যেষ্ঠ পুত্র সপ্তম এডওয়ার্ড ভারত সম্রাজ্যের অধীশ্বর হইয়াছিলেন।
১৯১০ সালে তিনিও পরলোকগমন করিয়াছেন। এক্ষণে তাঁহার পুত্র পঞ্চম জর্জই আমাদের সম্রাট্। পঞ্চম জর্জের ন্যায় প্রজাহিতৈষী সম্রাট বড় দুর্লভ। বিগত শীত ঋতুতে তিনি ও সাম্রাজ্ঞী এই ভারতভূমিতে পদার্পণ করিয়াছিলেন। ভারতের প্রজাদিগের বহুকাল রাজ দর্শন ঘটে নাই। সুতরাং রাজ দর্শনে প্রজাগণ আনন্দ সাগরে মগ্ন হইয়াছে। বর্ত্তমান রাজ প্রতিনিধি লর্ড হার্ডিঞ্জ নানা উপায়ে প্রজাদিগের হিতসাধনে নিযুক্ত আছেন। ইহার শাসন সময়ের অন্যান্য ঘটনার মধ্যে কলিকাতাহইতে দিল্লীতে রাজধানী স্থানান্তরিত হইয়াছে। ভারতের ভাগ্য-বিধাতা সর্ব্বতোভাবে ভারতের মঙ্গল সাধনে নিযুক্ত আছেন।