বিষয়বস্তুতে চলুন

ভারতবর্ষের ইতিহাস (হেমলতা দেবী)/পঞ্চম পরিচ্ছেদ

উইকিসংকলন থেকে

পঞ্চম পরিচ্ছেদ।

 শকজাতির আক্রমণ ও কণিষ্ক—ভারতের হিন্দু সম্রাটদিগের মধ্যে অশোক অদ্বিতীয়। কিন্তু কি আশ্চর্য্যের বিষয় অশোকের মৃত্যুর পর ৫০ বৎসর গত হইতে না হইতেই মৌর্য্যবংশের পতন হইল। তখন সেই মগধ রাজ্যই আর এক প্রতাপশালী রাজবংশের লীলাভূমি হইল। ইতিহাসে ইহারা অন্ধ্র বংশ নামে বিখ্যাত। মৌর্য্যদিগের ন্যায় ইহারাও বৌদ্ধ ছিলেন। অন্ধ্র গণ প্রথমে দাক্ষিণাত্যে রাজ্য বিস্তার করিয়া ক্রমে উত্তরাভিমুখী হইয়া মগধ পর্যন্ত তাঁহাদের রাজ্য বিস্তৃত করিয়াছিলেন। অন্ধ্র গণ যখন মগধে প্রবল তখন ভারতের পশ্চিমদিকে কুশাণবংশীয় শকগণ প্রবল হইয়া উঠিয়াছিলেন। পারস্য হইতে পাঞ্জাব ও কাশ্মীর পর্য্যন্ত ইহাদের রাজ্য বিস্তৃত হয়। শকগণ খ্রীষ্টীয় প্রথম শতাব্দীতে ভারতের উত্তর পশ্চিম দিক হইতে আসিয়া পাঞ্জাবে ও কাশ্মীরে নূতনরাজ্য স্থাপন করেন। শক নৃপতিদিগের মধ্যে কনিষ্ক সর্ব্বাপেক্ষা প্রসিদ্ধ। তিনি বৌদ্ধধর্ম্ম গ্রহণ করেন এবং তাঁহার সময়ে বৌদ্ধদিগের চতুর্থ সভা আহূত হয়। ৭৮ খৃষ্টাব্দে কনিষ্ক সিংহাসনে আরোহণ করেন; তখন হইতে আমাদের দেশে প্রচলিত শকাব্দের গণনা হইয়া আসিতেছে। শকদিগের সময়ে হুন পারসী প্রভৃতি অনেক বিদেশীয়, জাতি ভারতবর্ষের পশ্চিম দিক আচ্ছন্ন করিয়া ফেলেন। অন্ধ্র গণ প্রায় দেড়শত বৎসর মগধে রাজ্য করিয়া ছিলেন। তৎপরে তাঁহাদিগের পতন হয়। অনন্তর খ্রীষ্টীয় তৃতীয় শতাব্দীতে মগধে গুপ্তনামধেয় এক প্রবল পরাক্রান্ত হিন্দুরাজবংশ প্রতিষ্ঠিত হন।

 গুপ্তরাজবংশ ও বিক্রমাদিত্য—ভারতের ইতিহাসে এই গুপ্তরাজগণ অত্যন্ত প্রসিদ্ধ ইহাদের সময়ে হিন্দুধর্ম্মের পুনরুত্থান হয়। বৌদ্ধপ্রভাব পরিহার করিয়া, নূতন ভাবে এবং নূতন তেজে হিন্দুধর্ম্ম আবার দেশমধ্যে প্রবল হইল। গুপ্তরাজাদিগের সময় জাতীয় জীবনের সকল বিভাগেই নূতন উদ্দীপনা দেখা ছিল। সাহিত্য ললিতকলা সকলেরই শ্রীবৃদ্ধি সাধিত হইল। গুপ্তদিগের প্রথম রাজা চন্দ্রগুপ্ত। তাঁহার পুত্র সমুদ্রগুপ্ত একজন প্রতাপশালী রাজা ছিলেন। তিনি বীর যোদ্ধা সুকবি, সুগায়ক ছিলেন। সমুদ্রগুপ্তের সময়ের কয়েকটা মুদ্রা পাওয়া গিয়াছে তাহাতে তিনি বীণা হন্তে বসিয়া আছেন এইরূপ চিত্রিত আছে। সমুদ্রগুপ্ত দিগ্বিজয় করিয়া অশ্বমেধ যজ্ঞ করিয়াছিলেন। অহিংসাবাদী বৌদ্ধদিগের সময় এ সকল যাগযজ্ঞ একেবারে বন্ধ হইয়া গিয়াছিল। গুপ্তরাজদিগের সময় আবার সকলই নবভাবে দেখা ছিল। সমুদ্রগুপ্তের পুত্র দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত “বিক্রমাদিত্য” উপাধি গ্রহণ করেন এই সময় হইতে শকদিগের সহিত গুপ্তদিগের যুদ্ধ আরম্ভ হয়। ইতিহাসে যে বিখ্যাত বিক্রমাদিত্যের নাম শুনিতে পাওয়া যায়, অনেকে বলেন এই বিক্রমাদিত্য কিম্বা তাঁহার পুত্রই সেই বিক্রমাদিত্য। বিক্রমাদিত্য কোন ব্যক্তিবিশেষের নাম নয়। ইহা এক গৌরবজনক উপাধি; এই সময় হইতে আরম্ভ করিয়া অনেকে বিক্রমাদিত্য উপাধি ধারণ করিয়াছিলেন। গুপ্তরাজা বিক্রমাদিতের সময় সংস্কৃতভাষার অত্যন্ত শ্রীবৃদ্ধি হয় এবং ভবভূতি কালিদাস প্রভৃতি যে নবরত্নের নাম শ্রবণ করা যায় তাঁহারাও এই সময় উদিত হন। পশ্চিম ভারতে শকগণ এরূপ প্রবল হইয়া উঠিয়াছিলেন যে গুপ্তরাজগণ বারম্বার চেষ্টা করিয়াও তাঁহাদিগকে দূরীভূত করিতে পারেন নাই। অবশেষে ৫৩৩ খ্রীষ্টাব্দে যশোধর্ম্মণ, নামে গুপ্তরাজাদিগের এক প্রধান সেনাপতি কোরারের যুদ্ধে শকদিগকে একেবারে বিধ্বস্ত করেন। কথিত আছে, যশোধর্ম্মণ শেষে স্বাধীনভাবে রাজ্য স্থাপন করেন। ইতিহাসে ইহার অতি উচ্চ স্থান। অনেকে ইহাকেই শক-বিজয়ী উজ্জয়িনীরাজ বিক্রমাদিত্য কহেন।

 কালিদাস—গুপ্তরাজাদিগের সময়ে যদি কালিদাস ভবভূতি প্রভৃতি সংস্কৃত লেখক, আর্যভট্ট বরাহমিহির প্রভৃতি পণ্ডিতগণ আবির্ভূত না হইতেন, তাহা হইলে “উজ্জয়িনীরাজ বিক্রমাদিত্যের” নাম আজ পর্যন্ত অমর হইয়া থাকিত না। কত রাজবংশের এই ভারত ভূমিতে উত্থান পতন হইয়াছে কয় জনের নামই বা লোকে স্মরণ করিয়া রাখিয়াছে; কিন্তু কালিদাসের ন্যায় কবি অমর। এমন কবি যে দেশে জন্ম গ্রহণ করে সে দেশ ধন্য! কালিদাস যে বিক্রমাদিত্যের সভা উজ্জ্বল করিয়াছিলেন তাহার ব্যক্তিত্ত্ব সম্বন্ধে মত ভেদ থাকিতে পারে কিন্তু কালিদাসের কীর্ত্তি অক্ষয়। যতদিন পৃথিবীতে মনুষ্যজাতি বাস করিবে ততদিন কালিদাসের মেঘদূত ও শকুন্তলার সৌন্দর্য্যে মুগ্ধ হইয়া থাকিবে। কালিদাসের ন্যায় আর দুই এক জন কবি এই পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ করিয়াছেন কিনা সন্দেহ। কালিদাসের জীবনের কথা বিশেষ কিছু জানা যায় না তবে তিনি বোধহয় উজ্জয়িনীবাসী ছিলেন। তাঁহার গ্রন্থই তাঁহার জীবনের অপূর্ব্ব ইতিহাস ৷

 হর্ষবর্দ্ধন—থানেশ্বরের নিকটবর্ত্তী স্থানে ষষ্ঠ শতাব্দীর শেষ ভাগে প্রভাকর বর্দ্ধন নামে জনৈক রাজা বিশেষ ক্ষমতাশালী হন। ইতিহাস প্রসিদ্ধ মহারাজ হর্ষ বা শিলাদিত্য ইহারই পুত্র। প্রভাকর বর্দ্ধনের রাজ্যবর্দ্ধন ও হর্ষবৰ্দ্ধন নামে দুই পুত্র এবং রাজ্যশ্রী নাম্নী একটা বিদূষী কন্যা ছিলেন। কান্যকুব্জের রাজার সহিত রাজ্যশ্রীর বিবাহ হইয়াছিল। কর্ণ সুবর্ণের রাজা শশাঙ্ক কান্যকুব্জের রাজাকে নিহত করেন, তখন রাজ্যবর্দ্ধন পাঞ্জাবে হুনদিগের সহিত যুদ্ধে লিপ্ত ছিলেন। দেশে ফিরিয়া দেখেন রাজ্যশ্রী শত্রুর হস্ত হইতে নিষ্কৃতি পাইবার জন্য কোথায় পলাইয়া গিয়াছেন। অনেক অনুসন্ধান করিয়া ভগ্নীকে উদ্ধার করিলেন বটে, কিন্তু শশাঙ্ক তাঁহাকে ছলনা পূর্ব্বক হত্যা করে। রাজ্যবর্দ্ধনের মৃত্যুর পর হর্ষবর্দ্ধন রাজা হন ৷ তিনিই ভারতের শেষ হিন্দু-সম্রাট। মহারাজ হর্ষ সমুদায় আর্য্যাবর্ত্ত জয় করিয়া দক্ষিণে নর্ম্মদা নদী পর্য্যন্ত রাজ্য বিস্তার করেন। হর্ষ বৌদ্ধধর্ম্ম গ্রহণ করিয়াছিলেন। তিনি একজন সুলেখক ছিলেন। কাদম্বরী রচয়িতা বাণভট্ট তাঁহারই সভায় ছিলেন। হর্ষবর্দ্ধনের সময় প্রসিদ্ধ চীনভ্রমণকারী হোয়েয়াংসাং ভারতবর্ষে আসেন। তাঁহার লিখিত বিবরণ হইতে সেই সময়কার ভারতবর্ষের বিবরণ অনেক জানিতে পারা যায়। ৬৪৮ খৃষ্টাব্দে হর্ষবর্দ্ধনের মৃত্যু হয়।

বঙ্গদেশ, আদিশূর, বল্লাল ও লক্ষ্মণসেন।

 মহারাজ হর্ষের সহিত কর্ণ সুবর্ণের (অর্থাৎ বাঙ্গলার) রাজা শশাঙ্ক অতিশয় শত্রুতাচরণ করিয়াছিলেন। ইনি বৌদ্ধধর্ম্মের ঘোর বিদ্বেষী ও হিন্দুধর্ম্মের পরিপোষক ছিলেন। এই সময় হইতেই বঙ্গদেশে হিন্দুধর্ম্মের প্রভাব দেখা যায়। বৌদ্ধযুগে বঙ্গদেশে পালবংশীয় রাজারা রাজত্ব করিতেন। তাঁহারা বৌদ্ধ ছিলেন বটে, কিন্তু হিন্দুদিগের প্রতি কোন অত্যাচার করিতেন না। বঙ্গদেশে গৌড়ে ইহাদের রাজধানী ছিল। পালরাজারা প্রজাদিগের পরম হিতৈষী ছিলেন। তাঁহাদের অনেক কীর্ত্তি এখনও দেখা যায়। পাল রাজারা বিক্রমশিলায় এক মহাবিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান নামে বিক্রমশিলার একজন বৌদ্ধ ছাত্র তীব্বতে বৌদ্ধধর্ম্ম প্রচার করিয়া চিরস্মরণীয় হইয়াছেন ৷

 শশাঙ্কের পর বাঙ্গালার ইতিহাসে আদিশূর নামে একজন বিখ্যাত হিন্দু রাজার নাম শুনিতে পাওয়া যায়। আদিশূর পরম হিন্দু ছিলেন। ঢাকা জেলার অন্তঃপাতী রামপালে তাঁহার রাজধানী ছিল। আদিশূর পুত্রেষ্ঠিযজ্ঞ করিবার জন্য কাণ্যকুব্জ হইতে পাঁচজন বেদজ্ঞ ব্রাহ্মণ আনিয়াছিলেন। কারণ বৌদ্ধধর্ম্মের প্রভাবে বাঙ্গালার ব্রাহ্মণেরা যাগযজ্ঞ করিতে ভুলিয়া গিয়াছিল। এই পাঁচজন ব্রাহ্মণের সঙ্গে পাঁচজন কায়স্থও আসিয়াছিলেন। বঙ্গদেশের সমুদায় কুলীন ব্রাহ্মণ এবং কায়স্থ ইহাদেরই বংশধর। আদিশূরের পরবর্ত্তী বল্লাল সেন বাঙ্গালা দেশের ব্রাহ্মণ ও কায়স্থদিগের ভিতর কৌলীন্য প্রথার সৃষ্টি করেন। আদিশূরের আনীত ব্রাহ্মণ কায়স্থদিগের তখন অনেক বংশাবলী হইয়াছিল, তাহাদের ভিতর গুণী ও বিদ্বান দেখিয়া বল্লালসেন কুলীন করেন। কিন্তু কুলীনের পুত্রও কুলীন হইবে এই নিয়ম করাতে বঙ্গদেশের বড়ই অনিষ্ট হইল। বল্লালসেনের এই কৌলিন্য প্রথার অত্যন্ত কুফল দাঁড়াইল। বল্লালসেনের রাজধানীও রামপালেই ছিল—কিন্তু তিনি গৌড় এবং নবদ্বীপে বাস করিতেন। বল্লালসেনের পুত্র লক্ষ্মণসেন বঙ্গদেশের শেষ হিন্দু রাজা। নিতান্ত বৃদ্ধ বয়সে ইনি গৌড় এবং নবদ্বীপেই বাস করিতেন—তখন সহসা মহম্মদই বকতিয়ার খিলিজি নামক একজন মুসলমান সেনাপতি লক্ষ্মণ সেনকে আক্রমণ করিলেন। (১২৯৮ খৃঃ অঃ) কথিত আছে মহম্মদই বকতিয়ার খিলিজি সতের জনমাত্র অশ্বারোহী লইয়া রাজবাটী আক্রমণ করিয়াছিলেন। পথে কেহ তাঁহার গতিরোধ করে নাই। লক্ষ্মণ সেন সপরিবারে পূর্ব্ববঙ্গে পলাইয়া যান এবং তাঁহার বংশধরেরা তথায় আরও কিছু দিন সামান্যভাবে রাজত্ব করিয়াছিল। তখন হইতে বঙ্গদেশে হিন্দু রাজা আর কেহ হয় নাই।

 দাক্ষিণাত্য—বিন্ধ্যাচলের দক্ষিণে ভারতবর্ষের যে অংশ, তাহাকে দাক্ষিণাত্য বা দক্ষিণাপথ বলে। দক্ষিণাপথেও অসভ্যজাতিরা বাস করিত। রামায়ণে প্রথমে দাক্ষিণাত্যের কথা শুনিতে পাই। রামায়ণে যে বানর ও রাক্ষসের কথা শুনি, তাহারই দাক্ষিণাত্য ও সিংহলের অসভ্যজাতি; এবং বোধ হয়, সেই সময় হইতেই দাক্ষিণাত্য হিন্দুদিগের পরিচিত হয়।

 অতি প্রাচীন সময়ে আমরা ভারতবর্ষের অতি দক্ষিণে পাণ্ড্য, চোল ও চের রাজ্যের কথা শুনিতে পাই; তাহাতে বোধ হয়, অতি দক্ষিণে হিন্দুরা প্রথমে রাজ্য স্থাপন করিয়াছিলেন। এখন যেখানে মাদুরা ও ত্রিনেল্লুবলি জেলা দেখা যায়, আগে সেখানেই পাণ্ড্য রাজ্য ছিল। পাণ্ড্য রাজ্যের রাজধানী মাদুরা এখনও আছে। এখন যে সকল দেশে তামিলভাষা প্রচলিত আছে সেই সকল দেশে চোল রাজ্য ছিল। চোল রাজ্যের রাজধানী কাঞ্চী, এখন কাঞ্চীবরম হইয়াছে। ইহা কাঞ্চীপুরম্ এই শব্দের অপভ্রংশ মাত্র। বিক্রমাদিত্যের সময়ে এ সকল রাজ্যও খুব প্রতাপশালী ছিল।

 চেররাজ্য—পাণ্ড্যরাজ্যের পশ্চিমে ও আরবসাগরের উপকূলে চের রাজ্য ছিল, এখন সেখানে কোয়েম্বাটুর, ত্রিবাঙ্কুর ও মালবার দেশ। উত্তরে নর্মদা নদী ও দক্ষিণে কৃষ্ণা নদী, ইহার মধ্যে দুইটী রাজ্য ছিল। একটী পূর্ব্বে, তাহার রাজধানীর নাম ওয়ারঙ্গল; আর একটী পশ্চিমে ছিল, যাহাকে এখন আমরা মহারাষ্ট্র ও কঙ্কণ দেশ বলি। নর্মদা নদীর তীর হইতে কৃষ্ণা নদীর তীর পর্যন্ত অন্ধ্র বংশীয় রাজগণ আর একটী রাজ্য স্থাপন করেন; এক সময়ে সে রাজ্যের ক্ষমতা এত অধিক হইয়াছিল যে, তাহার সমকক্ষ রাজ্য তখন ভারতবর্ষে আর ছিল না, মগধেও তাঁহারা রাজ্য বিস্তার করিয়াছিলেন।

 উড়িষ্যা—উড়িষ্যাদেশেও অতি প্রাচীনকালে আর্য্যগণ প্রবেশ করিয়াছিলেন; এবং প্রায় সে দিন পর্য্যন্ত (১৫৫০ খৃষ্টাব্দে) হিন্দু রাজারা উড়িষ্যাতে রাজত্ব করিতেছিলেন। এখন যে ভুবনেশ্বরের সুন্দর মন্দির দেখা যায়, তাহা কেশরীবংশের রাজারা নির্মাণ করিয়াছিলেন, এবং তাহার অনেক পরে গঙ্গাবংশীয় রাজাদিগের সময়ে উড়িষ্যার বিখ্যাত জগন্নাথের মন্দির নির্ম্মিত হয়। জগন্নাথ ক্ষেত্র এখন হিন্দুদিগের একটা প্রধান তীর্থ। দাক্ষিণাত্যেও অনেক বড় বড় রাজ্য ছিল, তাহাদের এক এক রাজ্য এক এক সময়ে প্রধান হইয়া, অন্য রাজ্য সকলকে অধীন করিয়া লইত। এইরূপে ভারতবর্ষে কত শত রাজ্য স্থাপিত হইয়াছিল।


ভুবনেশ্বরের মন্দির।

 হিন্দুদিগের সভ্যতা ও পাণ্ডিত্য—হিন্দুদিগের বিশ্বাসযোগ্য কোন ইতিহাস নাই বটে, কিন্তু ইহারা সেই ঋগ্বেদের সময় হইতে যে সকল অমূল্য গ্রন্থ রচনা করিয়া আসিতেছেন, তাহা হইতে ইতিহাসের কথা অনেক জানিতে পারা যায়। হিন্দুদিগের ন্যায় পুরাতন সুসভ্য জাতি পৃথিবীতে আর নাই। গ্রীক, রোমীয় প্রভৃতি জাতীয়েরা পুরাকালের সভ্য জাতি বলিয়া খ্যাত; হিন্দুরা তাঁহাদের অপেক্ষাও পুরাতন জাতি। এমন একদিন ছিল, যখন জগতের লোক শ্রদ্ধা ও বিস্ময়ের সহিত ভারতের দিকে চাহিয়া থাকিত। জগতে কিছুই চিরদিন এক ভাবে থাকে না। হিন্দুরা দর্শনশাস্ত্র এমন জানিতেন যে, এখন ইউরোপীয়েরা তাহা দেখিয়া বিস্মিত হইতেছেন; জ্যোতির্বিদ্যাও হিন্দুরা বেশ জানিতেন; আর অঙ্ক ও বীজগণিতে হিন্দুরা অদ্বিতীয় ছিলেন। এখন আমরা যে দশমিক নিয়মে অঙ্ক কসি, হিন্দুরা কত সহস্র বৎসর পূর্ব্বে তাহা আবিষ্কার করেন। এখন সেই নিয়মেই সভ্য-জগতের লোক অঙ্ক কসিতেছে। ত্রিকোণমিতি, জ্যামিতি সবই এদেশে ছিল। হিন্দুরা এই সকল বিদ্যা অন্য জাতির নিকট শিখেন নাই; জগতের লোক তাঁহাদিগের নিকট শিখিয়াছে। হিন্দুদিগের মত ভাষা ও ব্যাকরণ (অর্থাৎ সংস্কৃত ভাষা ও সংস্কৃত ব্যাকরণ) পৃথিবীর আর কোন জাতির নাই। এমন ভাষায় যাঁহারা মনের ভাব ব্যক্ত করিতেন, তাঁহাদিগকে শতবার প্রণাম করিতে হয়। কি প্রতিভা! কি পাণ্ডিত্য! সুন্দর অট্টালিকায় বাস ও সুন্দর পোষাক পরিলেই সুসভ্য জাতি হয় না; যাঁহাদের মনের ভাব উচ্চ, যাঁহাদের ধর্ম্মভাব সুন্দর তাঁহারাই সুসভ্য। হিন্দুজাতির আর এক গৌরবের বিষয় এই—হিন্দুরা বড়ই ধর্ম্মপ্রিয়; জীবনটাকে তাঁহারা আমোদ আহ্লাদ করিয়া কাটাইবার জিনিস ভাবিতেন না, ধর্ম্মলাভ করিবার জন্যই এই জীবন; পৃথিবীতে দুদিনের বাস, ইহা তাঁহারা সর্ব্বদা মনে করিতেন। তাঁহারা পৃথিবীর সকলই মিথ্যা ও মায়া ভাবিতেন। পৃথিবীর সুখ সুবিধাকে তুচ্ছ ভাবিতেন বলিয়াই, তাঁহারা ঐহিক বিষয়ে মন দেন নাই। সভ্যতার প্রধান লক্ষণ যেগুলি সেই অনুসারে হিন্দুরা অতি সভ্য।

 মুসলমানদিগের ভারতবর্ষে আসিবার প্রাক্কালে রাজপুতজাতির উত্থান—মুসলমানগণ যখন এদেশে প্রথম আসেন, তখন তাঁহারা আর্য্যাবর্তে, রাজপুতানা অঞ্চলে রাজপুত নামে এক জাতি দেখেন। ইাহারাও হিন্দু, এবং ইহাদিগের তুল্য বীর জগতে ছিল না। অনেকে অনুমান করেন, ইহারা আর্য্য-সন্তান নহেন; ভারতবর্ষে সময়ে সময়ে শক প্রভৃতি যে সকল বিজাতীয়েরা আসিয়া বাস করিয়াছিলেন, ইাহারা বোধ হয় সেই শক জাতি। ৭৫০ হইতে ১০০০ খৃঃ অব্দের মধ্যে রাজপুতেরা আর্য্যাবর্তের সকল পুরাতন রাজাকে পরাস্ত করিয়া সর্ব্বে সর্ব্বা হইয়া উঠিলেন। মুসলমানেরা যখন এদেশে আসিলেন তখন পাঞ্জাবে, দিল্লীতে, আজমীঢ়ে, কান্যকুব্জে, বারাণসীতে সর্ব্বত্রই রাজপুতেরা রাজত্ব করিতেছিলেন। এত বড় বীরজাতি থাকিতে মুসলমানেরা এদেশ কিরূপে জয় করিলেন তাহা ভাবিলে আশ্চর্য্য বোধ হয়। যদি রাজপুত জাতিসকলের মধ্যে একতা থাকিত, তাহা হইলে তাঁহারা এত সহজে কখন পরাজিত হইতেন না। যখন মুসলমানেরা প্রথম এদেশে আসিলেন, তখন পৃথ্বীরায় দিল্লী ও আজমীঢ়ের রাজা ছিলেন। কান্যকুব্জের রাজা জয়চন্দ্রের সহিত কোনও কারণে পৃথ্বীরায়ের বিবাদ ছিল। কান্যকুব্জের রাজার কন্যা সংযুক্তার স্বয়ম্বর উপস্থিত হইল। দেশ বিদেশের রাজারা বিবাহের জন্য আসিলেন, পৃথ্বীরায় আসিলেন না। জয়চন্দ্র পৃথ্বীরায়কে অপমানিত করিবার জন্য তাহার এক মূর্ত্তি গড়িয়া, দ্বারদেশে দ্বারবান্ করিয়া রাখিলেন। স্বয়ম্বর সভায় সংযুক্তা মালা হাতে করিয়া, একে একে সকল রাজাকে ছাড়িয়া পৃথ্বীরায়ের মূর্ত্তির গলায় মালা দিলেন। এরূপ কথিত আছে, পৃথ্বীরায় কাছেই লুকাইয়াছিলেন, তিনি সংযুক্তাকে হরণ করিয়া লইয়া গেলেন। জয়চন্দ্র তাঁহাকে ছাড়িলেন না। দুই রাজায় ঘোর শত্রুতা বাধিয়া গেল। জয়চন্দ্র পৃথ্বীরায়ের সঙ্গে একা না পারিয়া, মুসলমানদিগকে ডাকিলেন। দেশের ও স্বজাতির সর্ব্বনাশ করিলেন। প্রথম যুদ্ধে[] পৃথ্বীরায় মুসলমানদিগকে পরাজিত করেন, কিন্তু শেষ যুদ্ধে[] স্বয়ং হারিয়া যান ও প্রাণ হারান। মুসলমানেরা দিল্লী ও ও আজমীঢ় কাড়িয়া লইলেন। তাহার পর বৎসর আসিয়া জয়চন্দ্রকে মারিয়া কান্যকুব্জ কাড়িয়া লইলেন। জয়চন্দ্র জব্দ হইলেন, ভারত স্বাধীনতা হারাইল, মুসলমানেরা আসিয়া সকল অধিকার করিল। এই খানেই হিন্দুদিগের স্বাধীনতার সূর্য্য অস্ত গেল।


  1. ইহাকে তিরৌরীর যুদ্ধ বলে। ১২৯১ খৃষ্টাব্দে হয়।
  2. ১২৯৩ খৃষ্টাব্দে থানেশ্বরের যুদ্ধ হয়।