ভারতবর্ষের ইতিহাস (হেমলতা দেবী)/প্রথম পরিচ্ছেদ
ভারতবর্ষের ইতিহাস।
হিন্দু রাজত্ব।
প্রথম পরিচ্ছেদ।
আদিম আর্য্যজাতি—আমরা বাঙ্গালী, আমাদের দেশ বাঙ্গালা, উড়িয়াদের দেশ উড়িষ্যা, পঞ্জাবীদের দেশ পাঞ্জাব; কিন্তু ভারতবর্ষ আমাদের সকলেরই দেশ। তোমরা সকলেই জান, ইংরেজেরা আমাদের দেশের লোক নহেন, তাঁহাদের দেশ বিলাত; আমাদের সম্রাট্ও ইংরেজ, তিনি বিলাতে থাকেন। ইহারা আমাদের দেশ জয় করিয়া এখানে আসিয়া বাস করিতেছেন। পণ্ডিতেরা অনুমান করেন যে, ইংরেজদের মত আমাদের পূর্ব্বপুরুষগণও এ দেশ জয় করিয়া, এখানে আসিয়া বাস করিয়াছিলেন; কিন্তু সে অনেক দিনের কথা। পাঁচ ছয় হাজার বৎসরেরও পূর্ব্বের কথা বলিতেছি।
পণ্ডিতেরা বলেন যে এ দেশে আসিবার পূর্ব্বে আমাদের পূর্ব্বপুরুষগণ মধ্য-আসিয়ার কোন স্থানে বাস করিতেন। তাঁহারা আপনাদিগের আর্য্য বলিতেন। সে সময়ে কৃষিকার্য্য পশুপালন তাঁহাদের প্রধান কাজ ছিল, এবং তাঁহারা অনেকটা যাযাবর অবস্থাতে ছিলেন; অর্থাৎ আপনাদের স্ত্রী, পুত্ত্র ও পশুদল লইয়া সর্ব্বদা এক স্থান হইতে অপর স্থানে ঘুরিয়া বেড়াইতেন। তৎপরে কি কারণে বলিতে পারি না, ইহারা এক এক দল বাঁধিয়া এক এক দেশে গিয়া, সে দেশ জয় করিয়া তথায় বাস করেন। এই আর্য্য-জাতিয়েরাই এখন পৃথিবীর মধ্যে বড় জাতি। ইহারা বুদ্ধিতে, বাহুবলে সকলের শ্রেষ্ঠ। ভারতের হিন্দুরা, বিলাতের ইংরেজেরা, ইউরোপের অনেক জাতীর লোক আর্য্যসন্তান। ইহারা সকলে ‘পরস্পরের ভাই। কিন্তু আফ্রিকার কাফ্রিরা, চীনেরা, তাতারেরা, জাপানীরা আর্য্য-জাতীয় নহেন।
এই যে মধ্য-আসিয়ার আর্য্য-জাতির কথা বলিলাম, ইহাদেরই একদল ভারতের উত্তর-পশ্চিম দিক্ হইতে আসিয়া, এ দেশ অধিকার করেন। পাঞ্জাব তাঁহাদের আদিম বাসস্থান।
আর্য্যেরা ভারতবর্ষে আসিয়া এ দেশে এক জাতীয় লোক দেখেন; তাহারা কৃষ্ণবর্ণ, খর্ব্বাকৃতি, খাঁদা ও অসভ্য ছিল। তাহাদিগকে তাড়াইয়া আর্য্যেরা এ দেশ জয় করেন। এই কাল লোকেরা যদিও খুব অসভ্য ছিল, তথাপি সহজে আর্য্যদিগকে স্বদেশ ছাড়িয়া দেয় নাই। কত শত বৎসর ধরিয়া যে তাহারা আর্যদের সঙ্গে যুদ্ধ করিয়াছে তাহার ঠিক নাই; তাহারা শেষে যুদ্ধে না পারিয়া, দেশ ছাড়িয়া, জঙ্গলে পর্ব্বতে আশ্রয় লইয়াছে, তথাপি সহজে অধীনতা স্বীকার করে নাই। শেষে তাহাদের মধ্যে অনেকে আর্যদের দাস হইলেও অধিকাংশ দাসত্ব স্বীকার করে নাই। অনেকে অনুমান করেন, এখন যে ভারতবর্ষের নানা স্থানে পর্ব্বতে জঙ্গলে ভীল কোল প্রভৃতি অসভ্যজাতীয় লোক দেখিতে পাওয়া যায়, তাহারাই এ দেশের আদিম অধিবাসীদের সন্তান। পাঁচ ছয় হাজার বৎসর পূর্ব্বে আমাদের পূর্ব্বপুরুষগণ তাহাদিগকে যে অবস্থায় দেখিয়াছিলেন, এখনও আমরা তাহাদিগকে প্রায় সেই অবস্থাতে দেখিতেছি। এই সময়ের ভিতরে পৃথিবীর কত জাতি উন্নত হইয়া আবার ধ্বংস পাইয়াছে, কিন্তু ইহাদের উন্নতিও হইল না এবং ধ্বংসও হইল না। হিন্দু রাজত্ব শেষ হইল, মুসলমানেরা এ দেশের রাজা হইলেন; তার পর আবার ইংরেজেরা আসিলেন, কিন্তু ঐ ভীল কোলেরা যেমন ছিল, প্রায় তেমনিই রহিল—তাহাদের কোন প্রকার
![]()
আদিম অসভ্যজাতি।
বিশেষ পরিবর্ত্তন দেখা গেল না। কেন এরূপ হইল ইহা ভাবিয়া দেখিবার বিষয়। যাহা হউক এই অসভ্য জাতীয়দিগকে লইয়া আমাদের পূর্ব্ব-পুরুষদিগকে অনেক কষ্ট পাইতে হইয়াছিল। আর্য্যেরা ইহাদিগকে অত্যন্ত ঘৃণা করিতেন। সর্ব্বদাই ইহাদের বিনাশের জন্য দেবতার নিকট করযোড়ে প্রার্থনা করিতেন।
ঋগ্বেদ—আর্য্যজাতির কোন বিশেষ ইতিহাস নাই বটে, কিন্তু অত্যন্ত পুরাকাল হইতে তাঁহারা যে সকল গ্রন্থ রচনা করিয়া আসিতেছেন, তাহা হইতে আর্য্য-জাতির প্রাচীন ইতিহাস অনেক সংগ্রহ করা যায়। ঋগ্বেদ কি জান? ইহা ভারতীয় আর্য্যগণের প্রাচীনতম ধর্ম্ম শাস্ত্র। বহু সহস্র বৎসর পূর্ব্বে ইহা রচিত হইয়াছিল। পণ্ডিতেরা বলেন যে, আর্য্যদিগের ঋগ্বেদের ন্যায় পুরাতন গ্রন্থ আর পৃথিবীতে নাই। ইহার ভাষা এখনকার সংস্কৃত ভাষার মত নহে। গ্রন্থখানি নিতান্ত ছোটও নহে; ইহাতে এক হাজার চব্বিশটি স্তোত্র আছে, দশ হাজারের বেশী ছন্দ আছে। ঋগ্বেদ আর্য্যদিগের পবিত্র শাস্ত্র। আজ পর্য্যন্ত হিন্দু-সন্তানগণ বেদকে অভ্রান্ত ঈশ্বরের বাণী বলিয়া বিশ্বাস করেন। ঋগ্বেদের স্তোত্র যাঁহারা রচনা করিতেন, তাহাদিগকে ঋষি বলে। মেয়েরাও ঋষি হইতেন। হিন্দুগণ বিশ্বাস করেন যে, ঋষিগণ ঋগ্বেদের মন্ত্র রচনা করেন নাই, এ সকল মন্ত্র তাঁহাদিগের নিকট স্বতঃই প্রতিভাত হইয়াছিল। ঋগ্বেদে আমরা অনেক দেব দেবীর নাম দেখিতে পাই;—ইন্দ্র, চন্দ্র, বরুণ, অগ্নি, বায়ু, সবিতা (সূর্য্য), মারুত ইত্যাদি। এই সকল দেবতার নাম দেখিয়া এবং ঋগ্বেদের মন্ত্র সকল পড়িয়া, আমরা বুঝিতে পারি যে, আর্য্যেরা প্রকৃতিতে যা কিছু সুন্দর, যা কিছু মহান্, যা কিছু শক্তিশালী, যা কিছু উপকারী দেখিতেন, তাহাতেই ভগবানের অধিষ্ঠান ভাবিয়া ভক্তিভরে পূজা করিতেন।
ঋগ্বেদের একটী গান দিতেছি;—“হে ক্ষেত্রের রাজা, গাভীর দুগ্ধের ন্যায় নবনীত সমান সুখকরী বারিধারা আমাদের উপর বর্ষণ কর। হে জলের দেবতা, আমাদিগকে আশীর্ব্বাদ কর। বৃক্ষ সকল আমাদিগের নিকট সুখকর হউক, আকাশ, বারিধারা, পৃথিবী সকল সুখময়ী হউক; ক্ষেত্রের রাজা আমাদের প্রতি প্রসন্ন হউন; শত্রুর আঘাত হইতে অক্ষত থাকিয়া আমরা তাঁহার দিকে চলি।” দেখ, কেমন সুন্দর কথা! তাঁহারা প্রকৃতির অধিষ্ঠাতৃদেবতাকে কত ভক্তি করিতেন, কত ভালবাসিতেন। তখনকার আর্যদের প্রাণ কেমন সরল, স্বাভাবিক, সুন্দরভাবে পূর্ণ ছিল।
বৈদিক ধর্ম্ম—ঋগ্বেদে আমরা যে ধর্ম্মের আভাস পাই, তাহাকেই বৈদিক ধর্ম্ম বলিতেছি। ঋষিরা যখন যে দেবতার পূজা করিতেন, তাহাতেই এমন তন্ময় হইয়া যাইতেন যে, সে সকল স্তব স্তুতি পড়িলে মনে হয়, তাঁহারা এক ভিন্ন দ্বিতীয় দেবতা জানিতেন না। ঋগ্বেদের একটী মন্ত্রে আছে;—
“সেই যে সত্য বাক্য—আকাশ এবং দিবা যাঁহাকে অবলম্বন করিয়া বর্ত্তমান আছে, বিশ্ব ভুবন এবং প্রাণিগণ যাঁহার আশ্রিত, যাঁহার প্রভাবে প্রতিদিন জল প্রবাহিত হইতেছে এবং সূর্য্যদেব উদিত হইতেছেন—সেই সত্য বাক্য যেন আমাকে সকল বিষয়ে রক্ষা করেন।”
ঋগ্বেদের সময় পাঞ্জাববাসী আর্য্যদের আচার ব্যবহার—গো মেঘ আর্য্যদের প্রধান সম্পত্তি ছিল। ঋগ্বেদ পড়িলে জানা যায়, তাঁহারা সর্ব্বদাই গো মেষদিগের জন্য দেবতার নিকট প্রর্থনা করিতেন, তাহারা যেন আহার পায়, তাহারা যেন ভাল থাকে!
যথা;—“ধেনুগণ, তোমাদের বৎস হউক। তোমরা সুন্দর শস্য ভক্ষণ কর, সুগম সরোবরে জল পান কর। তস্কর যেন তোমাদিগকে অধিকার না করে; হিংস্র জন্তুও যেন তোমাদিগকে আক্রমণ না করে; এবং রুদ্রঅস্ত্র যেন তোমাদিগের দূরে থাকে।” আর্য্যেরা দেখিতে খুব সুন্দর ছিলেন, তাঁহাদের শরীরে খুব বল ছিল। তাঁহারা সরল, সাহসী সত্যবাদী লোক ছিলেন; কাহারও পদানত ছিলেন না। অসভ্য জাতীয়দিগের সহিত তাঁহারা সর্ব্বদাই যুদ্ধ করিতেন; তীরধনুক, তলোয়ার, বর্শা প্রভৃতি তাঁহাদের যুদ্ধের প্রধান অস্ত্র ছিল। আর্য্যেরা সর্ব্বদাই নৌকায় চড়িয়া দেশ বিদেশে ব্যবসা করিতে যাইতেন। ঋগ্বেদে আছে;—“বরুণদেব ও আমি যখন নৌকায় চড়িয়া সমুদ্রে যাই, তখন আমি কত সুখে জলের উপর ভাসি, কত সুখে তরঙ্গে দোল খাই।” আর্য্যেরা আহারের জন্য শস্য পিশিয়া রুটি প্রস্তুত করিতেন; জঙ্গলের ফল মূল ভালবাসিতেন। তদ্ভিন্ন ছাগ মেষ প্রভৃতি গৃহপালিত পশুদের মাংসও আহার করিতেন। ইহা ভিন্ন সোমরস নামে একপ্রকার মাদক দ্রব্য তাঁহারা পান করিতেন। দুগ্ধের সহিত সোম নামক লতার রস মিশাইয়া এই পানীয় প্রস্তুত হইত। তাঁহারা সোমরস দিয়া দেবতার পূজা করিতেন। তখন এখনকার মত গাড়ী ছিল না বটে, কিন্তু তাঁহাদের যে এক রকম গাড়ী ছিল, তাহাকে রথ বলিত। তাহা ঘোড়ায় টানিয়া লইয়া যাইত। যুদ্ধের সময়ে তাঁহারা রথে চড়িয়া যাইতেন। বীর্য্যবান্ পুত্রলাভ করা আর্য্যেরা বড়ই সৌভাগ্যের বিষয় মনে করিতেন; “হে অগ্নি, আমরা যেন যজ্ঞকারী সুচেতাঃ পুত্র লাভ করিতে পারি” এই বলিয়া দেবতার নিকট প্রার্থনা করিতেন। আর্য্যগণ বিবাহ বন্ধন ধর্ম্মের অঙ্গ বলিয়া মনে করিতেন। স্বামী স্ত্রী একত্রে দেবতার পূজা কিম্বা যজ্ঞ করিতেন। বিবাহের সময় পিতা কিম্বা তাঁহার হইয়া অপর কেহ কন্যাকে দান করিতেন। তবে তখনও বোধ হয় স্বয়ম্বর প্রথা প্রচলিত ছিল; অর্থাৎ কন্যা আপনার বর মনোনীত করিয়া তাঁহারই গলে বরমাল্য দিয়া পতিরূপে বরণ করিতেন। আর্য্যদিগের ভিতর একাধিক স্ত্রী গ্রহণের নিয়ম ছিল। পিতার সম্পত্তি পুত্রই পাইত, কন্যা পতিকুলে বাস করিত।
ভারতীয় প্রাচীনতম আর্য্যদিগের অবস্থা অনেকটা এইরূপ ছিল। তারপর ক্রমে তাঁহাদের বংশ ও বল বাড়িতে লাগিল, এবং তাঁহারা ক্রমশঃ গঙ্গার উপকূলস্থ দেশ সকল জয় করিয়া বাস করিতে আরম্ভ করিলেন।