বিষয়বস্তুতে চলুন

ভারতবর্ষের ইতিহাস (হেমলতা দেবী)/ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ

উইকিসংকলন থেকে

মুসলমান বিজয়।

ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ।

 সুকুমারমতি পাঠকপাঠিকাগণ, একবার আসিয়ার ম্যাপখানা দেখ দেখি, আমাদের ভারতবর্ষই বা কোথায়, আর আরবদেশই বা কোথায়। আমদের ভারতবর্ষ যখন স্বাধীনতার গৌরবে সমুজ্জ্বল, তখন আরবদেশের মক্কানগরে কোনও গৃহস্থের গৃহে একটি শিশু জন্মগ্রহণ করিল, তখন কেহ একবার স্বপ্নেও ভাবে নাই, এই শিশু কালে জগতের ইতিহাসে এক মহাপ্রলয় ঘটাইবে। এই শিশুটী কে জান? ইনি মুসলমানধর্ম্মের প্রতিষ্ঠাতা মহম্মদ।

 মহম্মদের জন্মের পূর্ব্বে আরবদেশের নাম জগতের লোকে বড় একটা জানিত না, কারণ আরবদেশ বড় অনুর্ব্বর; চারিদিকে মরুভূমি; আরবদেশ শস্যশালী না হওয়াতে, আরবের লোকেরা কোনও কালে ধনী বা সুসভ্য হইতে পারে নাই। মহম্মদের জন্মের পূর্ব্বে আরবেরা মুসলমান ছিল না—অর্থাৎ এক ঈশ্বরের পূজা করিতে জানিত না। তাহারা গ্রহ, নক্ষত্র ও দেবদেবীর পূজা করিত। মহম্মদই আরববাসীদিগকে এক ঈশ্বরের পূজা করিতে শিখান। এখন মহম্মদের জীবন সম্বন্ধে তোমাদিগকে কিছু বলিব।

 ৫৭০ খৃঃ অব্দে মহম্মদের জন্ম হয়। তাঁহার পিতার নাম আবদুল্লা ও মাতার নাম আমেনা। মহম্মদের জন্মের পূর্ব্বেই তাঁহার পিতার মৃত্যু হয়। সে সময়ে ধাত্রী-গৃহে রাখিয়া সন্তান মানুষ করা, মক্কা নগরের লোকের রীতি ছিল। মহম্মদ যখন ৪০ দিনের শিশু, তখন তাঁহাকে একজন ধাত্রীর নিকট দেওয়া হয়। সেই ধাত্রী তাঁহাকে অতি যত্নে মানুষ করেন এবং মহম্মদও তাঁহাকে ঠিক মায়ের মত ভালবাসিতেন। মহম্মদ যখন ৬ বৎসরের বালক, তখন তাঁহার মাতা আমেনার মৃত্যু হয়। তিনি নাকি মৃত্যুর সময়ে বলিয়াছিলেন, “সকলেরই মৃত্যু আছে, আমিও মরিতেছি, কিন্তু যে পুত্ত্র আমি গর্ভে ধরিয়াছি সেই আমার অমর করিয়া রাখিবে।” মহম্মদের পিতামহ এই পিতৃমাতৃহীন বালককে অতি যত্নের সহিত পালন করিতে লাগিলেন; কিন্তু কিছুদিন পরে তাঁহারও মৃত্যু হইল। বৃদ্ধ মৃত্যুর সময় মহম্মদের কথা ভাবিয়া আকুল হইলেন। তিনি বালকের পিতৃব্যকে ডাকিয়া, তাঁহার হস্তে মহম্মদকে সমর্পণ করিলেন, এবং নিজের সন্তানের ন্যায় যত্ন করিবার জন্য বারম্বার অনুরোধ করিলেন। তাঁহার পিতৃব্যও পিতার মৃত্যু সময়ের এই অনুরোধ প্রাণপণে পালন করিয়াছিলেন। যখন মহম্মদের ২৫ বৎসর বয়স, তখন খোদেজা নাম্নী একজন ধনশালিনী বিধবার কর্মচারী হইয়া বাণিজ্যের জন্য তিনি দেশান্তরে যান। খোদেজা মহম্মদকে দেখিয়া ও তাঁহার গুণের কথা শুনিয়া, তাঁহাকে বিবাহ করিবার জন্য একান্ত উৎসুক হন। সেই সময়ে খোদেজার মত সম্পত্তিশালিনী রমণী সে দেশে আর কেহ ছিলেন না। তিনি যেমন বুদ্ধিমতী, তেমনি সাধ্বী ছিলেন। খোদেজার আগ্রহ দেখিয়া, মহম্মদ তাঁহাকে বিবাহ করিলেন। তখন মহম্মদের বয়স ২৫ বৎসর মাত্র। কিন্তু খোদেজার বয়স ৪০ বৎসর হইয়াছিল। মহম্মদ বাল্যকাল হইতে অতিশয় চিন্তাশীল ছিলেন, সর্ব্বদা একাকী থাকিতে ভালবাসিতেন। কথিত আছে, বিবাহের পর প্রায় তিনি শুনিতে পাইতেন, কে তাঁহাকে ডাকিতেছে। চারিদিকে চাহিয়া কাহাকেও দেখিতে পাইতেন না। ক্রমে তাঁহার প্রাণের শান্তি চলিয়া গেল, এবং কোনও এক অজ্ঞাত পদার্থের জন্য প্রাণ ব্যাকুল হইয়া উঠিল। তিনি পরমেশ্বরের আরাধনার জন্য অস্থির হইয়া উঠিলেন। লোকের সঙ্গ অসহ্য বোধ হইল। মক্কার নিকটে হোরা নামে এক পর্ব্বত আছে, ঐ পর্ব্বতের নির্জ্জন গুহার তিনি রাত দিন ঈশ্বর-চিন্তায় কাটাইতেন। মধ্যে মধ্যে আসিয়া পরিবার পরিজনদিগের সহিত সাক্ষাৎ করিতেন। এইরূপে বহুদিন ধরিয়া নির্জ্জনে ঈশ্বরচিন্তায় কাটাইয়া ৪০ বৎসর বয়সে তিনি প্রচার করিলেন যে, এক ঈশ্বর ভিন্ন দ্বিতীয় ঈশ্বর নাই এবং স্বয়ং মহম্মদ ঈশ্বরের প্রেরিত পুরুষ। আরবের লোকের নিকট এই নূতন ধর্ম্ম প্রচার করিবার জন্য তিনি ব্যস্ত হইলেন। মক্কানগরের নিকট পর্ব্বতে উঠিয়া, মক্কাবাসীদিগকে ডাকিয়া বলিলেন, “হে মক্কাবাসীগণ, শ্রবণ কর, একমাত্র পরমেশ্বর ব্যতীত জীবের আর উপাস্য নাই।” মক্কাবাসীগণ এ কথার অর্থ বুঝিতে পারিল না। কেহ তাঁহাকে পাগল বলিল, কেহ বা তাঁহার কথা শুনিয়া ক্রোধে আগুন হইল; কিন্তু মহম্মদ নূতন ধর্ম্ম প্রচার করিতে থাকিলেন। তাঁহার স্ত্রী খোদেজা তাঁহার প্রথমা শিষ্যা হইলেন। ক্রমেই মহম্মদের আরও নূতন শিষ্য জুটিতে লাগিল। তখন মক্কাবাসিগণ তাঁহাকে ভয়ানক উৎপীড়ন করিতে আরম্ভ করিল। এই ঘোর অত্যাচারের সময় মহম্মদের পত্নী খোদেজার মৃত্যু হয়। তাহাতে মহম্মদ শোকে বড় কাতর হন। কারণ খোদেজা সকল বিষয়ে মহম্মদের সহায় ছিলেন, এবং তিনিও তাঁহাকে অতিশয় সম্মান করিতেন ও অন্তরের সহিত ভালবাসিতেন।

 যতদিন খোদেজা বাঁচিয়াছিলেন, ততদিন মহম্মদ আর বিবাহ করেন নাই; কিন্তু তাঁহার মৃত্যুর পর আরও ৪।৫ জনকে বিবাহ করিয়াছিলেন। অনেক বিবাহ করা আরবদেশের রীতি ছিল। খোদেজার মৃত্যুর পর মক্কার লোকেরা মহম্মদের প্রতি এমন ভয়ানক অত্যাচার করিতে আরম্ভ করিল যে তিনি প্রাণ লইয়া আর সেখানে থাকিতে পারিলেন না। অবশেষে মক্কা ত্যাগ করিয়া, মদিনায় প্রস্থান করিলেন। মহম্মদ আসিতেছেন শুনিয়া, মদিনাবাসীরা দলে দলে তাঁহাকে অভ্যর্থনা করিবার জন্য উপস্থিত হইল। সকলেই মহম্মদকে একবার দেখিবার জন্য ও তাঁহার কথা শুনিবার জন্য ব্যাকুল হইল। মদিনায় এমন দৃশ্য কখনও দেখা যায় নাই। মহম্মদের জীবনে এমন দিন কখনও হয় নাই। তিনি মদিনাবাসীদিগের আদর পাইয়া, আপনাকে ধন্য মনে করিলেন। মহম্মদের মদিনা পলায়নের দিন হইতে হিজরী অর্থাৎ মুসলমানী সাল গণনা করা হয় (৬২২ খৃঃ অঃ)। মদিনায় তিনি এক মসজিদ নির্ম্মাণ করিলেন। সেখানে সকল মুসলমানেরা মিলিয়া নমাজ পড়িতেন। ক্রমে মুসলমানের সংখ্যা এত বাড়িয়া উঠিল যে, সে মজিদে আর কুলাইত না। মহম্মদ মদিনায় চলিয়া আসিলেন বটে, কিন্তু মক্কার যে সকল মুসলমান ছিল, তাহাদের প্রতি ঘোর অত্যাচার চলিতে লাগিল। তখন মহম্মদ এত অত্যাচার সহ্য করিয়া চুপ করিয়া থাকা উচিত বিবেচনা করিলেন না। অত্যাচারীর হাত হইতে আত্মরক্ষা করিতে হইবে, এই স্থির করিয়া সৈন্যদল প্রস্তুত করিলেন। মুসলমানদিগকে তখন হইতে মহম্মদ শান্তভাব ত্যাগ করিয়া অস্ত্রধারণ করিয়া, শত্রু-দমনের জন্য প্রস্তুত করিলেন। তিনি বলিলেন, “ঈশ্বর আমাকে বলিয়াছেন, তুমি শত্রু নিপাত কর, আমি তোমার সহায়।” তখন হইতে মুসলমানেরা কাফেরদিগের সহিত যুদ্ধে অবতীর্ণ হইলেন। মক্কায় গিয়া মক্কা জয় করিলেন। মুসলমানদিগের বিজয় হুঙ্কারে আরবের দিগ্দিগন্ত কাঁপিতে লাগিল। চারিদিকে মুসলমানধর্ম্মের পতাকা উড়িতে লাগিল। ৬৩২ খৃঃ অব্দে মহম্মদের মৃত্যু হয়।

 মহম্মদ আরববাসিদিগকে অনেক ভাল কথা, অনেক নূতন কথা শিখাইয়াছিলেন সন্দেহ নাই। মহম্মদের ধর্ম্ম আরববাসীদের প্রাণে ও শরীরে যেন নূতন বল আনিয়া দিল। মহম্মদ ধর্ম্ম-প্রচারক হইয়া ধর্ম্ম-প্রচারের জন্য মুসলমানদিগের হস্তে যে তরবারি দিলেন তাহার দুর্জ্জয় শক্তি রোধ করে সাধ্য কার? ধর্ম্মের নামে মানুষের হৃদয়ে কত না বল আসে। সেই ধর্ম্মের নামে মুসলমানেরা যখন তরবারি ধরিল, তখন বলিতে গেলে সমুদায় পৃথিবী সে তরবারিকে বাধা দিতে পারিল না। মহম্মদের মৃত্যুর পর একশত বৎসর অতীত হইতে না হইতে, আট্‌লাণ্টিক মহাসাগর হইতে সিন্ধুনদ পর্যন্ত প্রায় সমস্ত দেশ মুসলমানদিগের অধীন হইল।

মুসলমানদিগের ভারতবর্ষে প্রবেশ।

 মহাল্যিব—মহম্মদের মৃত্যুর ৩২ বৎসর পরে মহাল্যিব নামে একজন মুসলমান সেনাপতি সর্ব্বপ্রথম ভারতবর্ষে প্রবেশ করেন। তিনি মুলতান পর্য্যন্ত আসিয়াছিলেন এবং অনেক লোককে বন্দী করিয়া দেশে ফিরিয়াছিলেন। পরে বহুদিন পর্য্যন্ত মুসলমানেরা আর ভারতবর্ষের দিকে বিশেষ দৃষ্টিপাত করেন নাই।

 মহম্মদ বিন কাশিম— (অর্থাৎ কাশিমের পুত্র মহম্মদ)। এই ঘটনার প্রায় ৪৭ বৎসর পরে, (৭১২ খৃঃ অঃ) মহম্মদ বিন কাশিম নামে একজন মুসলমান সেনাপতি সিন্ধুনদের মুখে দেবল নামে যে প্রসিদ্ধ বন্দর ছিল, তাহা আক্রমণ করেন। সেই বন্দরের হিন্দু জলদস্যুগণ আরবদের একখানি বাণিজ্যের জাহাজ ধরিয়াছিল, তাই মহম্মদ হিন্দুদিগকে জব্দ করিবার জন্য আসেন। সেই সময়ে দাহির নামে একজন রাজপুত রাজা মুলতান ও সিন্ধুদেশে রাজত্ব করিতেছিলেন। আলোর তাঁহার রাজধানী ছিল। মুসলমানেরা তাঁহার রাজধানী আক্রমণ করিল। রাজা দাহির অনেক সৈন্য সামন্ত লইয়া মহম্মদের গতি রোধ করিবার জন্য উপস্থিত হইলেন। মহম্মদ তাঁহার সৈন্যবল দেখিয়া কিঞ্চিৎ ভীত হইলেন এবং আর অগ্রসর না হইয়া, একটী ভাল স্থান দেখিয়া, তথায় আপন সৈন্যদিগকে রাখিলেন। দাহির অমিতবলে মুসলমানদিগকে আক্রমণ করিলেন। তাঁহার জয়ী হইবার সকল সম্ভাবনাই ছিল, কিন্তু দৈব তাঁহার প্রতি বান হইলেন; যুদ্ধের মধ্যভাগে একটি অনন্ত গোলা আসিয়া, দাহিরের হস্তীকে বিদ্ধ করিল; হস্তী আহত হইয়া ঊর্দ্ধশ্বাসে ছুটিয়া গিয়া, নিকটস্থ এক নদীতে নামিল। সৈন্যগণ হঠাৎ রাজাকে পলাইতে দেখিয়া রণে ভঙ্গ দিল। রাজা ঘোড়ায় চড়িয়া ফিরিয়া আসিয়া, ছত্রভঙ্গ সৈন্যদিগকে ফিরাইতে কতই চেষ্টা করিলেন, কিন্তু কোন ফল হইল না। ইতিপূর্ব্বেই তিনি বাণাহত হইয়াছিলেন, তথাপি কিছুই গ্রাহ না করিয়া, অসীম সাহসের সহিত মুসলমানদিগের সহিত যুদ্ধ করিতে করিতে, সম্মুখসমরে বীরের মত প্রাণ হারাইলেন। তাঁহার রাজ্য মহম্মদের হস্তগত হইল। মহম্মদ প্রায় তিন বৎসর সিন্ধুদেশ শাসন করেন। যদিও তিনি নিতান্ত অল্পবয়স্ক ছিলেন, তথাপি হিন্দু প্রজাগণ তাঁহার শাসনে সন্তুষ্ট ছিলেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে তাঁহার সৌভাগ্য-সূর্য্য উদর হইতে না হইতেই অস্ত গেল। পারস্যরাজের আজ্ঞায় তিনি বন্দী হইয়া, অশেষ যন্ত্রণা ভোগ করিয়া মৃত্যুমুখে পতিত হন। মহম্মদের মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে মুসলমানদিগের ভারতবর্ষবিজয় স্থগিত হইল। ৪০ বৎসরের মধ্যে মুসলমানদিগের অধিকৃত সমস্ত স্থান হিন্দুদিগের হস্তগত হইল। ইহার পরে ২০০ বৎসরের মধ্যে মুসলমানেরা আর ভারতবর্ষের দিকে অগ্রসর হয়েন নাই। ভারতবর্ষ পূর্ণমাত্রায় স্বাধীনতার সুখ ভোগ করিতে লাগিল।

 মুসলমানদিগের অধিপতি মহম্মদের উত্তরাধিকারীকে খলিফা কহিত; সকল সেনাপতি ও সকল শাসনকর্ত্তাই খলিফার অধীন ছিলেন। আমরা যে সময়ের কথা বলিতেছি, সে সময়ে খোরাসান দেশে আলপ্তগিন নামে তুর্কী জাতীয় একজন শাসন কর্তা ছিলেন, তিনি পূর্ব্বে ক্রীতদাস ছিলেন। তাঁহার প্রভুর মৃত্যু হইলে, তিনি দলবল লইয়া গজনীতে আসিয়া একটি নূতন রাজ্য স্থাপন করেন। ৯৭৭ খৃঃ অব্দে তাঁহার মৃত্যু হইলে, তাঁহার ক্রীতদাস এবং জামাতা সবুক্তগীন রাজা হইলেন।

 যে সময়ে সবুক্তগীন গজনীর রাজা হইলেন, সে সময়ে লাহোরে হিন্দুরাজা জয়পাল রাজত্ব করিতেছিলেন। ভারতবর্ষের এত নিকটে এই নূতন মুসলমান রাজ্য দেখিয়া, জয়পালের অত্যন্ত আতঙ্ক হইল। তাঁহার প্রাণের শান্তি ভঙ্গ হইল এবং তিনি অকারণ বিস্তর সৈন্য সামন্ত লইয়া যুদ্ধযাত্রা করিলেন। কিন্তু যুদ্ধের পূর্ব্বে ভয়ানক ঝড় বৃষ্টি হওয়াতে হিন্দুরা ভাবিলেন, দৈব তাঁহাদের প্রতিকূল কাজেই যুদ্ধে তাঁহারা ক্ষান্ত হইলেন। জয়পাল সবুক্তগীনকে অনেক অনুনয় বিনয় করিয়া ৬০টি হাতী ও অনেক অর্থ দিবার অঙ্গীকার করিয়া, দেশে ফিরিলেন। স্বরাজ্যে আসিয়া জয়পাল সকল প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করিলেন এবং সবুক্তগীন যে দূত পাঠাইলেন, তাহাকে বন্দী করিলেন। এই অপমান ও বিশ্বাসঘাতকতা সবুক্তগীন কিছুতেই সহ্য করিতে পারিলেন না। তিনি জয়পালের শাসনের জন্য যুদ্ধযাত্রা করিলেন। জয়পাল নিশ্চিন্ত ছিলেন না। তিনি অন্যান্য হিন্দুরাজাদিগের সাহায্যে প্রায় এক লক্ষ সৈন্য সংগ্রহ করিলেন; কিন্তু যুদ্ধে জয়লাভ করিতে পারিলেন না। সিন্ধুনদ পর্য্যন্ত সমস্ত দেশে আপনার অধিকার স্থাপন করিয়া সবুক্তগীন দেশে ফিরিলেন।

 মহমুদ—সবুক্তগীনের পুত্র মহমুদ একজন খুব বড় রাজা ছিলেন। সেই সময়ে সমস্ত আসিয়ায় তাঁহার মত প্রতাপান্বিত রাজা আর কেহই ছিলেন না। মহমুদ সতের বার ভারতবর্ষে আসেন; তিনি এই সময় মধ্যে নগরকোট, মথুরা, থানেশ্বর, সোমনাথ প্রভৃতি হিন্দুদিগের প্রসিদ্ধ প্রসিদ্ধ তীর্থ স্থানের দেব-মন্দির সকল চূর্ণ করিয়া, অনেক ধনরত্ন লইয়া এবং বিস্তর বন্দী সঙ্গে করিয়া দেশে ফিরিয়া যান। মহমুদ রাজা হইবার কয়েক বৎসর পরেই, লাহোরের রাজা জয়পালকে শাস্তি দিবার জন্য ভারতবর্ষে আসেন; এবং যুদ্ধে তাঁহাকে হারাইয়া, বন্দী করিয়া লইয়া যান। জয়পাল পরে অনেক অর্থ দিয়া কারামুক্ত হন বটে, কিন্তু বার বার মুসলমানদিগের সহিত যুদ্ধে হারিয়া ও তাঁহাদিগের হস্তে বন্দী হইয়া, তাঁহার প্রাণে দারুণ ঘৃণার উদয় হয়। তাই তিনি পুত্রকে রাজ্য দিয়া অগ্নিকুণ্ডে দেহ ভস্মসাৎ করেন। তাঁহার পুত্র অনঙ্গপালও মহমুদের সহিত যুদ্ধ করিয়াছিলেন, কিন্তু জয়লাভ করিতে পারেন নাই। দেশ জয় করা মহমুদের উদ্দেশ্য ছিল না; কেবল হিন্দুধর্ম্মের অবমাননা ও ধনরত্ন লুণ্ঠন করাই তাঁহার উদ্দেশ্য ছিল। তিনি শেষবার আসিয়া সোমনাথের প্রসিদ্ধ মন্দির চূর্ণ করেন (১০২৪ খৃঃ অঃ)। এইবারে তাঁহাকে অনেক কষ্টে মরুভূমি পার হইয়া আসিতে হইয়াছিল। পথে আসিতে আসিতে, দুই জন হিন্দু রাজার রাজধানী আক্রমণ করিয়া বিস্তর ধনরত্ন লুণ্ঠন করেন। অবশেষে তিনি সোমনাথের মন্দিরের নিকট আসিয়া উপস্থিত হইলেন। গুজরাটের দক্ষিণে সোমনাথের বিখ্যাত মন্দির ছিল। দেশের যত রাজা ও ধনী লোকেরা এই মন্দিরে রাশি রাশি অর্থ দান করিতেন। ইহার ২০০০ পুরোহিত ছিল এবং ২০০০ গ্রামের আয়ে ইহার খরচ চলিত। সোমনাথের ধন ঐশ্বর্য্যের জাঁক জমকের সীমা পরিসীমা ছিল না; তাই এই মন্দিরের ধনরত্নের প্রতি মহমুদের এত লোভ পড়িয়াছিল; এবং সেই জন্যই অশেষ কষ্ট সহ্য করিয়া মরুভূমি পার হইয়া তিনি আসিয়াছিলেন। মহমুদকে সসৈন্যে উপস্থিত দেখিয়া, মন্দির হইতে একজন ব্রাহ্মণ তাঁহার সন্মুখে আসিয়া বলিল,—“তোমরা ফিরিয়া যাও, যদি আক্রমণ কর, স্বয়ং সোমনাথ তোমাদিগের সর্ব্বনাশ করিবেন।” মহমুদ সে কথায় কর্ণপাত করিলেন না; মন্দির আক্রমণ করিলেন। তখন হিন্দুরা সোমনাথের সম্মুখে পড়িয়া কাঁদিতে কাঁদিতে বলিল “ঠাকুর, আজ তোমার নামের গৌরব রক্ষা কর। ম্লেচ্ছেরা যেন এই পবিত্র মন্দিরে প্রবেশ না করে।” তখন মন্দিরের বাহিরে মুসলমানদিগের গগনবিদারী “আল্লা হো আক্‌বর! অর্থাৎ মহান্ ঈশ্বর” এই রবে পৃথিবী কাঁপিয়া উঠিল। রাজপুত বীরগণ দেবতার আশীর্ব্বাদ ভিক্ষা করিয়া, অসীম উৎসাহের সহিত মন্দির রক্ষা করিবার জন্য ছুটিয়া গেলেন; মুসলমানগণ মন্দিরের প্রাচীরে উঠিতে আরম্ভ করিলেন; রাজপুতেরা তাঁহাদিগকে কোন প্রকারেই উঠিতে দিলেন না। তার পর দিনও মুসলমানেরাও উঠিতে চেষ্টা করিলেন; রাজপুত বীরদিগের নিকট এক পা-ও অগ্রসর হইতে পারিলেন না; এবং বিস্তর মুসলমান হত হইল। তৃতীয় দিন হিন্দুরাজারা সৈন্য সামন্ত লইয়া, মন্দির রক্ষার জন্য উপস্থিত হইলেন; তখন মুসলমানদিগের মন দমিয়া গেল; কিন্তু মহমুদ কিছুতেই ভীত বা নিরাশ হইলেন না। তিনি ঘোড়া হইতে নামিয়া ঈশ্বর স্মরণ করিলেন; তার পর “ভয় নাই! ভয় নাই! ঈশ্বর আমাদের সহায়” বলিয়া মহাতেজে সৈন্যদিগকে উৎসাহিত করিতে লাগিলেন। তাহারাও “আল্লা হো আকবর!” রবে গগন কাঁপাইয়া মহাতেজে মন্দিরের দিকে ছুটিল। তখন তাহাদের গতি রোধ করে কার সাধ্য? ঘোর যুদ্ধ বাধিল। কথিত আছে সে দিন ৫০০০ হাজার হিন্দু রণক্ষেত্রে পড়িল অবশেষে মন্দির রক্ষা করা অসম্ভব দেখিয়া, হিন্দুসৈন্যগণ নৌকায় চড়িয়া সমুদ্রের দিকে পলায়ন করিল। মহমুদ অবাধে মন্দিরে প্রবেশ করিলেন; এবং মন্দিরের ভিতরের সৌন্দর্য্য, গাম্ভীর্য্য ও কারুকার্য্য দেখিয়া স্তব্ধ হইয়া দাড়াইলেন। তার পর মুর্ত্তি ভাঙ্গিবার জন্য তরবারি তুলিলেন। ব্রাহ্মণেরা আসিয়া চরণ ধরিয়া বলিলেন যে, যদি তিনি মূর্তিটি না ভাঙ্গেন, তাহা হইলে তাঁহারা উহাকে বিস্তর অর্থ দিবেন। মহমুদ শুনিলেন না, তিনি আঘাত করিলেন। কথিত আছে অমনি রাশি রাশি মাণিক্য মূর্ত্তির ভিতর হইতে বাহির হইল।[] তাহার পর মন্দির চূর্ণবিচূর্ণ করিয়া, বহু মণি রত্ন লইয়া মহা উল্লাসে মহমুদ দেশে ফিরিলেন। মুসলমানেরা মহমুদের বড় প্রশংসা করেন। তাঁহার প্রশংসার যোগ্য অনেক গুণ ছিল, তাহাতে সন্দেহ নাই। তিনি বীর, কষ্টসহিষ্ণু, ন্যায়পরায়ণ রাজা ছিলেন এবং মুসলমানধর্ম্মে তাঁহার প্রগাঢ় বিশ্বাস ছিল। কিন্তু ভারতবাসীর তাহাতে কি? ভারতের ধন রত্ন লুণ্ঠন করিয়া, তাঁহার লোভ অত্যন্ত বাড়িয়া গিয়াছিল। তিনি ভারতবর্ষের সুন্দর সুন্দর নগরসকলকে শ্রীহীন শ্মশান সমান করিয়া তাঁহার নিজের রাজধানী গজনীকে সেই সকল মণিমাণিক্য দিয়া অমরাপুরীর মত সাজাইয়াছিলেন।

 মহমুদের সময় কিছু দিনের জন্য পঞ্জাব মুসলমানদিগের অধীন হইল। মহমুদের পরে ১৫০ বৎসরের মধ্যে মুসলমানেরা আর এদেশে আসেন নাই। এই সময়ের মধ্যেই মহমুদের এত সাধের গজনী সহর ধ্বংস হইল। এইবারে যিনি ভারতক্ষেত্রে অবতীর্ণ হইলেন, তাঁহার নাম সাহাবউদ্দীন বা মহম্মদ ঘোরী। ইনি ঘোরনগরের রাজা গিয়াসউদ্দিনের ভাই। ইহারাই গজনীনগর ধ্বংস করেন। আমরা পূর্ব্বেই বলিয়াছি এবং হয় ত তাহা তোমাদের মনে আছে, জয়চন্দ্র কি করিয়া সাহাবউদ্দীনকে ডাকিয়া দেশের সর্ব্বনাশ করিয়াছিলেন। ইনিই সেই সাহাবউদ্দীন। তিরৌরীর যুদ্ধে ইনি পৃথ্বীরায়ের নিকট হারিয়া যান; তাহার পর আসিয়া, পৃথ্বীরায়কে থানেশ্বরের যুদ্ধে পরাস্ত ও হত করেন; জয়চন্দ্রকে মারিয়া কান্যকুব্জ কাড়িয়া লয়েন। শেষে কুতবুদ্দীন নামক এক শক্তিশালী ক্রীতদাসের উপর ভারতবিজয়ের ভার দিয়া, তিনি দেশে ফিরিয়া যান। ভারতের ইতিহাসে কুতবুদ্দীন খুব প্রসিদ্ধ। সাহাবউদ্দীনের মৃত্যুর পর ইনিই সর্ব্বপ্রথম ভারতবর্ষের স্বাধীন মুসলমান রাজা হইলেন।


  1. সোমনাথের মুত্তিটি শূন্যগর্ভ ছিল না। সেটি শিবলিঙ্গ ছিল। সুতরাং ঐতিহাসিকেরা এ ঘটনাটি মিথ্যা বলিয়া মনে করেন।