ভারতবর্ষের ইতিহাস (হেমলতা দেবী)/সপ্তম পরিচ্ছেদ
সপ্তম পরিচ্ছেদ।
পাঠান রাজত্ব।
কুতব যে বংশের আদি পুরুষ সে বংশকে দাসবংশ বলে; কারণ
![]()
কুতবমিনার।
তিনি ও তাঁহার বংশের অনেকে ক্রীতদাস ছিলেন। এই বংশে দশজন রাজা হন। তাহার মধ্যে অনেকে নামমাত্র রাজা। তাঁহারা যেমন অপদার্থ, তেমনই শক্তিহীন ছিলেন। কুতব মোটে ৪ বৎসর রাজত্ব করেন এবং সেই কয় বৎসর বেশ সুশাসন করিয়াছিলেন। তৃতীয় রাজা আলতামস বেশ বুদ্ধিমান্ ও ক্ষমতাপন্ন রাজা ছিলেন। আলতামস ক্রীতদাস ছিলেন, তৎপরে রাজার জামাতা হন। আলতামসের রাজত্বকালে চেঙ্গিস খাঁ নামে একজন মোগল বীর ঘোর দাবানলের মত আসিয়ার এক প্রান্ত হইতে অপর প্রান্ত এবং ইউরোপের কোন কোন অংশ গ্রাস করেন। যেখান দিয়া চেঙ্গিস খা গিয়াছেন, সেইখানেই রক্ত-স্রোত, হাহাকার ও অগ্নিকাণ্ডে পৃথিবী শ্মশান হইয়াছে। মানবজাতির এমন শত্রু পৃথিবীতে অতি অল্পই জন্মিয়াছে। সৌভাগ্য এই, ভারতের দিকে ইহার দৃষ্টি পড়ে নাই। তাড়িত রাজারা আলতামসের আশ্রয় চাহিয়াছিলেন, চতুর আলতামস পাছে মোগলকে স্বরাজ্যে ডাকিয়া আনা হয়, এই ভয়ে কাহাকেও তাঁহার রাজ্যে স্থান দেন নাই। আলতামস ২৫ বৎসর বেশ যোগ্যতার সহিত রাজত্ব করিয়াছিলেন। তিনি সমুদয় আর্যাবর্ত্তকে তাঁহার অধীন করেন।
আলতামসের অপদার্থ পুত্র রোকন উদ্দীনের নাম উল্লেখযোগ্য নহে। রোকন উদ্দীনের পর তাঁহার ভগিনী রজিয়া রাজপদ প্রাপ্ত হন। দিল্লীর সিংহাসনে কেবল এই একমাত্র রমণী সুলতানা নামে বসিতে পারিয়াছিলেন। এ সম্মান আর কাহারও ভাগ্যে ঘটে নাই এবং রজিয়া এই সম্মান লাভের সম্পূর্ণ উপযুক্তা ছিলেন। তিনি যেমন বুদ্ধিমতী ও বিদুষী, তেমনি রাজকার্য্যেও খুব নিপুণা ছিলেন। এই বিষয়ে কোন পুরুষ সম্রাটের অপেক্ষা তিনি হীন ছিলেন না। আলতামস যখন দূরে থাকিতেন, তখন পুত্রদের হস্তে না দিয়া রজিয়ার হস্তে সমস্ত কার্যভার দিয়া নিশ্চিন্ত হইতেন। সম্রাজ্ঞী হইয়া রজিয়া প্রতিদিন পুরুষের বেশে রাজসভায় বসিয়া রাজকার্য্য দেখিতেন। প্রথম প্রথম রাজসভায় সকলেই তাঁহার উপর সন্তুষ্ট ছিল; কিছুদিন পরে তিনি অশ্বশালার রক্ষক আবিসীনিয়া দেশীয় একজন ক্রীতদাসের প্রতি এত অনুগ্রহ দেখান যে, রাজ্যের বড় বড় লোকেরা তাহাতে অতিশয় বিরক্ত হন। আলতুনিয়া নামে একজন বড় আমীর বিদ্রোহী হইয়া সেই ক্রীতদাসকে হত্যা করে। আলতুনিয়াকে শাসন করিতে গিয়া, রজিয়া বন্দী হইলেন। কিন্তু শেষে সে ব্যক্তি রজিয়ার রূপে গুণে এত মুগ্ধ হইলেন যে, রজিয়াকে বিবাহ করিয়া দুইজনে সিংহাসনে বসিবার চেষ্টা করেন; কিন্তু অকৃতকার্য্য হইয়া দুইজনেই প্রাণ হারাইলেন।
ইহার পর আলতামসের পুত্র বাহরাম ও তাঁহার পৌত্র মসউদ সিংহাসনে বসেন। ইহাদের রাজত্ব সিংহাসনে বসা মাত্র। দুইজনেই অপদার্থ ছিলেন। তাহার পর আলতামসের আর এক পুত্র নসিরউদ্দীন দিল্লীর সম্রাট্ হন। ইহার মত ধার্ম্মিক, নির্ম্মলচরিত্র ব্যক্তি আর কেহ কখনও দিল্লীর সিংহাসনে বসেন নাই। ইনি কোরান লিখিয়া যে টাকা পাইতেন, তাহাতেই নিজের ব্যয় চালাইতেন; রাজকোষ হইতে কিছু লইতেন না। নসিরউদ্দীন ১০ বৎসর রাজত্ব করেন বটে, কিন্তু তাঁহার মন্ত্রী গোয়াসউদ্দীন সর্ব্বেসর্ব্বা ছিলেন। নসিরউদ্দীন যতই কেন ভাললোক হউন না, রাজ্য চালাইবার ক্ষমতা তাঁহার বেশী ছিল না। কাজেই গেয়াসের উপর সকল বিষয়েই নির্ভর করিতে হইত। গেয়াস আলতামসের এক ক্রীতদাস ছিলেন। নসিরউদ্দীনের রাজত্বকালে মোগলেরা বার বার ভারতবর্ষ আক্রমণ করে; কিন্তু গেয়াসের সুবন্দোবস্তে তাহারা প্রতিবারই তাড়িত হয়। গেয়াসের প্রতাপে রাজ্যে কোথাও কাহারও মাথা তুলিবার যো ছিল না। নসিরউদ্দীন নিজের দুর্ব্বলতা ও গেয়াসের প্রতাপ দেখিয়া লজ্জিত হইতেন; কিন্তু তাহার প্রতিবিধান করিবার কোন উপায় ছিল না। নসিরউদ্দীনের মৃত্যুর পর গেয়াসই সম্রাট্ হন। ইনিও ২০ বৎসর রাজত্ব করেন ৷
গেয়াসউদ্দীন বলবন্। পূর্ব্বেই বলিয়াছি, ইনি কিরূপ কার্য্যপটু লোক ছিলেন। বিশেষতঃ রাজ্য-শাসন করি বার ইহার বিশেষ ক্ষমতা ছিল। কিন্তু প্রকৃতিতে ইনি নসিরউদ্দীনের ঠিক্ বিপরীত। তিনি অতি দয়ালু ও বিনীত ছিলেন; ইনি ঘোর অহঙ্কারী ও ভয়ানক নিষ্ঠুর ছিলেন। নিজে ক্রীতদাস ছিলেন, অথচ যাঁহারা নীচকুলে জন্মিয়াও কাজের গুণে বড় হইয়াছিলেন, তাঁহাদিগকে তিনি অন্তরের সহিত ঘৃণা করিতেন। তাঁহার রাজত্ব-কালে দুই একজন হিন্দু রাজা এবং বাঙ্গালার মুসলমান শাসনকর্তা তঘরল বিরোধী হন। গেয়াস তাঁহাদিগকে যুদ্ধে পরাজিত করিয়া, বিস্তর লোককে হত্যা করেন। ইহার রাজত্বকালেও মোগলেরা বারবার ভারতবর্ষে আসিতে চেষ্টা করে, কিন্তু গেয়াসের পুত্র তাহাদিগকে বার বার তাড়াইয়া দেন। অবশেষে শেষ যুদ্ধে তিনি নিজেই প্রাণ হারান। গেয়াস ভয়ানক নিষ্ঠুর হইলেও পুত্রশোক তাঁহার প্রাণে বড়ই লাগে; এবং সেই শোকে বৃদ্ধ বয়সে তাঁহার মৃত্যু হয়। গেয়াসের সভায় বড় বড় পারসী কবি ও পণ্ডিতেরা অবস্থিতি করিতেন। গেয়াসের যখন মৃত্যু হয়, তখন তাঁহার একমাত্র পুত্র বঘরা খাঁ বাঙ্গালার নবাব ছিলেন। পিতা অসুস্থ শুনিয়া তিনি দেখিতে আসেন; কিন্তু শেষ পর্য্যন্ত না থাকিয়া চলিয়া যাওয়াতে, গেয়াস তাঁহার উপর বিরক্ত হইয়া পৌত্র কায়খুসরুকে রাজ্য দিয়া যান। কিন্তু আমীরেরা কায়কোবাদকে মনোনীত করেন।
কায়কোবাদ—কায়কোবাদ যখন দিল্লীর সম্রাট্ হন, তখন তাঁহার বয়স ১৮ বৎসর মাত্র। ইনি এমন বিলাসী ও অপদার্থ ছিলেন যে, ইহার নাম মুখে আনিবার অযোগ্য। সম্রাট্ হইয়া কোথায় রাজকার্য্য দেখিবেন, না যত পাপ, যত মন্দ কার্য্যে রাত্রি দিন ডুবিয়া থাকিতেন। তাঁহার মন্ত্রী নিজামউদ্দীন অতিশয় দুষ্ট লোক ছিল; সে কেবল সম্রাটকে মন্দ কাজে উৎসাহিত করিত। মানুষের শরীরে কি এত অত্যাচার সহ্য হয়; অচিরে তাঁহার পক্ষাঘাত রোগ হইল। পুত্রের দুর্গতির কথা শুনিয়া, বঘরা খাঁ বাঙ্গালা-দেশ হইতে আসিলেন। মন্ত্রী বলিল পুত্র যখন দিল্লীর সম্রাট্, তখন তাঁহাকে সম্রাটের মত সম্মান করিতে হইবে। তাহা না হইলে সম্রাটের সহিত সাক্ষাৎ হইবে না। বঘরা খাঁ কি করেন, পুত্রের মঙ্গলের জন্য তাহাতেই সম্মত হইলেন। পুত্র সিংহাসনে আসীন; পিতা সেলাম করিতে করিতে আসিতেছেন। পুত্র স্থিরভাবে বসিয়া আছে দেখিয়া বঘরা খাঁ আর থাকিতে পারিলেন না; কাঁদিয়া ফেলিলেন। তখন কায়কোবাদের মন গলিয়া গেল; এবং সিংহাসন হইতে নামিয়া পিতার গলা জড়াইয়া কাঁদিতে লাগিলেন। কিন্তু ঐ পর্যন্ত; ভাল হওয়া তাহার সাধ্য ছিল না। বঘরা খাঁ বেগতিক দেখিয়া বাঙ্গালায় ফিরিলেন। পুত্র আবার পাপে ডুবিল অবশেষে কায়কোবাদের চক্ষু ফুটিল; দুষ্ট মন্ত্রী তাঁহার সর্ব্বনাশ করিয়াছে বুঝিলেন; এবং তাহাকে হত্যা করিয়া নিজেও হত হইলেন। এইরূপে দুরাচারের পাপজীবনের শেষ হইল। কায়কোবাদের মৃত্যুর সঙ্গে দাসবংস লোপ পাইল। এই বংশে যে কয়জন রাজা উপযুক্ত ছিলেন (কুতব, আলতামস, গোয়াসুদ্দীন) তাঁহারা সকলেই ক্রীতদাস। যথার্থই ইহা দাসবংশ।
খালজীবংশ।
জলালুউদ্দীন—জলালুদ্দীন কায়কোবাদকে ও তাঁহার শিশুপুত্রকে হত্যা করিয়া রাজা হন, তাঁহার’ নামে এই অপবাদ আছে বটে, কিন্তু সম্রাট্ হইয়া তিনি যেরূপ ব্যবহার করেন, তাহাতে এ কথা বিশ্বাস হয় না। তিনি অপরাধীদিগকে কিছুমাত্র শাস্তি দিতেন না। যুদ্ধে শত্রুদিগকে বন্দী না করিয়া নিরাপদে ছাড়িয়া দিতেন। একবার মোগলদিগকে যুদ্ধে পরাজিত করিয়া, সদলে ভারত হইতে নিরাপদে যাইতে দেন। তাঁহার অপরিসীম ক্ষমা ও দয়া দেখিয়া, রাজ্যে দুষ্ট লোকদিগের উপদ্রব বাড়িয়া গেল। রাজ্যে ছোট বড় সকলে ঘোর যথেচ্ছাচার আরম্ভ করিল; কাজেই চারিদিকে বিশৃঙ্খলা ও অরাজকতা দেখা দিল। জলালুদ্দীনের ভ্রাতুষ্পুত্র আলাউদ্দীন তাঁহার রাজত্ব সমরে বিন্ধ্যাচল পার হইয়া, মহারাষ্ট্র দেশের রাজধানী দেবগিরি আক্রমণ করেন (১২৯৭ খৃঃ অঃ)। ইহার পূর্ব্বে মুসলমানেরা দাক্ষিণাত্যে পদার্পণ করেন নাই। আলাউদ্দীন ফিরিয়া আসিলে, জালালুদ্দীন তাঁহাকে যেই আলিঙ্গন করিলেন, অমনি দুষ্ট তাহার প্রাণ বৃধ করিল।
আলাউদ্দীন—জালালুদ্দীনের মৃত্যুর পর আলাউদ্দীন দিল্লীর সম্রাট্ হইলেন। তিনি অতিশয় বীর ও কার্য্যপটু ছিলেন। দাক্ষিণাত্য জয় করিবার জন্য তাঁহার অত্যন্ত উৎসাহ হয়। আলাউদ্দীনের সেনাপতি মালিক কাফুর রামেশ্বর পর্য্যন্ত সমস্ত দাক্ষিণাত্য জয় করেন। আলাউদ্দীন গুজরাটের হিন্দু রাজাকে যুদ্ধে পরাজিত করিয়া, তাঁহার পত্নী কমলাদেবীকে নিজের বেগম করিয়া লন। তিনি বেগমদিগের মধ্যে তাঁহাকে খুব ভালবাসিতেন। কমলাদেবীর কন্যা দেবলাদেবীকে নিজের পুত্রের সহিত বিবাহ দেন। আলাউদ্দীন মিবারের রাজধানী চিতোর ধ্বংস করেন। তিনি শুনিয়াছিলেন, চিতোরের রাণী ভীমসিংহের স্ত্রী পদ্মিনীর মত সুন্দরী ভারতে আর নাই। ইহা শুনিয়া ভীমসিংহের পত্নীকে তাঁহার নিজের বেগম করিবার একান্ত ইচ্ছা হইল; কিন্তু সে ত আর সহজ কথা নয়। তিনি ভীমসিংহকে বলিলেন যে, তাঁহার পত্নীর রূপের কথা শুনিয়া তাঁহাকে দেখিবার অত্যন্ত ইচ্ছা হইয়াছে। রাজপুত বীরের স্ত্রী কত সম্মানের পাত্রী! যবনের সাক্ষাতে তিনি রূপ দেখাইতে আসিবেন? এ জঘন্য প্রস্তাবে রাণা কিছুতেই সম্মত হইলেন না। তখন আলাউদ্দীন বিনীতভাবে বলিলেন, রাজ্ঞী যদি সন্মুখে আসিতে লজ্জা বোধ করেন, তাহা হইলে শুধু দর্পণে তাঁহার রূপের ছায়া দেখিয়া “আপনাকে কৃতার্থ মনে করিয়া চলিয়া যাইবেন। অগত্যা তাহাই হইল। দর্পণে রাণীর অপরূপ রূপ দেখিয়া আলাউদ্দীন একেবারে মোহিত হইলেন। পরে ভদ্রতার খাতিরে ভীমসিংহ তাঁহার সহিত সাক্ষাৎ করিতে আসিলেন; তখন দুষ্ট আলাউদ্দীন তাঁহাকে বন্দী করিয়া, এই সংবাদ ঘোষণা করিলেন যে, রাণীকে না পাইলে রাজাকে ছাড়িবেন না। রাজপুতেরা বলিল, রাণী সখীদের সঙ্গে লইয়া আসিতেছেন। এই বলিয়া শত শত পাল্কীতে রমণীবেশে রাজপুতবীরগণ উপস্থিত হইয়া মুসলমানদিগকে হত্যা করিয়া রাজাকে উদ্ধার করিল। ইহার পর ঘোরতর যুদ্ধ হয়; তাহাতে রাজপুতেরা পরাজিত, ভীমসিংহ হত ও চিতোর ধ্বংস হইল। পদ্মিনী জলন্ত চিতায় আরোহণ করিয়া দেহ ভস্মসাৎ করিলেন।[১]
মবারক—আলাউদ্দীনের মৃত্যুর পর তাঁহার পুত্র মবারক পাঁচ বৎসর রাজত্ব করেন। ইনি অতিশয় নিষ্ঠুর ও ঘোর বিলাসী ছিলেন। ইহার মন্ত্রী ইহাকে হত্যা করেন।
টগলক বংশ।
গেয়াস উদ্দীন টগলক—মবারকের উজীর খুসরু খাঁকে হত্যা করিয়া গেয়াসউদ্দীন টগলক স্বয়ং দিল্লীর সম্রাট্ হন। ইনি বেশ শক্তিশালী ও বিচক্ষণ লোক ছিলেন। যে কয় বৎসর রাজত্ব করেন, তাহাতে সকলে তাঁহার শাসনে সন্তুষ্ট ছিলেন।
মহম্মদ—গেরাসের মৃত্যুর পর তাঁহার পুত্র জুনা খাঁ বা মহম্মদ দিল্লীর সম্রাট্ হন। ইনি এত পণ্ডিত ছিলেন যে, দিল্লীর সম্রাট্ আর কেহ এত বিদ্বান ছিলেন না। কিন্তু বিদ্বান হইলে কি হয়, ইহার বুদ্ধি বিবেচনা দেখিলে, ইহাকে পাগল ছাড়া আর কিছু বলা যায় না। মহম্মদের যখন যাহা ইচ্ছা হইত, তখন তাহাই করিতেন; ফলাফলের কথা একবার ভাবিতেন না। কি করিয়া নিজের রাজ্যের সুশাসন ও সুবন্দোবস্ত করিবেন, তাহা না ভাবিয়া, পরের রাজ্য কি করিয়া কাড়িয়া লইবেন, তাহাই ভাবিতেন। পারস্য জয় করিতে হইবে মতলব হইল, অমনি হাজার হাজার সৈন্য জড় হইল, শেষে আর তাহাদের বেতন দিতে পারেন না, কাজেই তাহারা দল ছাড়িয়া পলাইয়া দেশের চারিদিকে লুঠ পাট আরম্ভ করিল। পারস্য জয় করা হইল না, তখন চীন জয় করিতে হইবে, এই খেয়াল উঠিল। অমনি লক্ষ সৈন্য হিমালয় পার হইয়া চীন আক্রমণ করিতে গেল; যুদ্ধ করা দূরে থাকুক, অগণ্য চীন সেনা দেখিয়া তাহারা ভয়ে পলাইয়া আসিল। পথ-কষ্টে, শত্রুর আক্রমণে, তাহাদের ভিতর আর একজনকেও দেশে ফিরিতে হইল না।
এই প্রকার করিয়া যখন রাজকোষ শূন্য হইল, তখন মহম্মদ হুকুম দিলেন যে, তামার পয়সা রূপার দরে কাটিবে এবং টাকার বদলে নোট চলিবে। তখন লোকেরা তামার পয়সা আর নোট দিয়া কর দিতে আরম্ভ করিল। রাজকোষে রাশি রাশি পয়সা ও কাগজ আসিয়া জমা হইল। সম্রাট্ জব্দ হইলেন। কিন্তু টাকা ত চাই, তখন তিনি কর বাড়াইলেন। প্রজারা কর দিতে না পারিয়া, গ্রাম ছাড়িয়া বনে পলাইল; এবং চুরি ডাকাতি করিয়া খাইতে লাগিল। কৃষি বাণিজ্য বন্ধ হইল। সম্রাট্ এই সকল দেখিয়া শুনিয়া একেবারে চটিয়া গেলেন এবং এমন সকল অমানুষিক নিষ্ঠুরতা আরম্ভ করিলেন যে, তাহা স্মরণ করিলে প্রাণ কাঁপিয়া উঠে। মানুষ শিকার করিতে হইবে বলিয়া, দলে দলে নিরীহ কৃষকদিগকে ঘিরিয়া পশুর মত হত্যা করিতে লাগিলেন। অভাগা প্রজারা যে কি করে, ভাবিয়া পাইল না। দেশে চারিদিকে দুর্ভিক্ষ, মহামারী উপস্থিত হইল; দেশ ছারখার লণ্ডভণ্ড হইয়া গেল। আবার খেয়াল হইল, দিল্লী হইতে রাজধানী উঠাইয়া দক্ষিণাপথে দেবগিরিতে রাজধানী করিতে হইবে। দেবগিরির নাম দৌলতাবাদ হইল। দিল্লীবাসীদের উপর হুকুম হইল, সকলে দৌলতাবাদে চল; সেখানে গিয়া ও নিষ্কৃতি নাই; আবার বলিলেন, সকলে দিল্লীতে চল। পুনর্ব্বার দিল্লী রাজধানী হইল; আবার সকলে দিল্লীতে ফিরিয়া আসিল। এইরূপে সকল প্রজাদিগকে ধনে প্রাণে সারা করিলেন। প্রজাদিগের হাহাকারে ভারত কাঁপিয়া উঠিল। কি কুক্ষণেই পণ্ডিত মহম্মদ দিল্লীর সিংহাসনে বসিয়াছিলেন! পরের দেশ ত কাড়িয়া লইতে পারিলেন না, নিজের রাজ্যও হারাইবার উপক্রম হইল। চারিদিকে লোকে বিদ্রোহী হইল। বাঙ্গালা, বিজয়নগর এবং তৈলঙ্গের হিন্দু রাজারা স্বাধীন হইলেন। দাক্ষিণাত্যে হোসেন গাঙ্গু নামে একজন মুসলমান “বাহমণি” রাজ্য স্থাপন করেন (১৩৪৭ খৃঃ অঃ)। হোসেন গাঙ্গু ছোট বেলায় একজন ব্রাহ্মণের ক্রীত দাস ছিলেন; ব্রাহ্মণ তাঁহার আশ্চর্য্য বুদ্ধি ও সততা দেখিয়া স্বাধীন করিয়া দেন। নিজে ব্রাহ্মণের দাস ছিলেন বলিয়া, তাঁহার সম্মানের জন্য নিজের রাজ্যের নাম “বাহমণি” রাজ্য রাখেন। মহম্মদ দৌলতাবাদে রাজধানী স্থাপন করিলে, হোসেন গাঙ্গু তথায় এক জায়গীর লাভ করেন; এবং তখন হইতে
![]()
তৈমুরলঙ্গ।
ক্রমশঃ শক্তি ও ধন লাভ করিয়া অবশেষে মহম্মদের প্রতিনিধি শাসনকর্তাকে যুদ্ধে পরাজিত ও নিহত করিয়া স্বয়ং স্বাধীন রাজা হন। বাহমণি রাজ্যের প্রথম রাজধানী গুলবর্গ ছিল, পরে বিদরে রাজধানী হয়। ইহার পর শতাধিক বৎসর ধরিয়া দাক্ষিণাত্যে বাহমণি রাজ্যের অক্ষুণ্ণ প্রতাপ ছিল, কিন্তু ক্রমশঃ হীনবল হইয়া পঞ্চদশ শতাব্দীর শেষভাগে এই বাহমণি রাজ্য ভাঙ্গিয়। দাক্ষিণাত্যে পাঁচটী স্বাধীন মুসলমান রাজ্য হয়। মহম্মদ ২৬ বৎসর রাজত্ব করেন। তাঁহার মৃত্যুতে দেশে শান্তি আসিল।
মহম্মদের পরে সম্রাট্ ফিরোজ বেশ শান্তিতে রাজত্ব করিয়াছিলেন। তাহার পর যে সকল সম্রাট্ দিল্লীর সিংহাসনে বসিয়াছিলেন, তাঁহাদের নাম উল্লেখ যোগ্য নহে। তাঁহাদের রাজ্য ক্রমে আয়তনে ছোট হইতে হইতে দিল্লী এবং তাহার চারিপার্শ্বের দেশে পরিণত হইল। টগলক বংশের শেষ রাজা মহম্মদের সময়ে দিগ্বিজয়ী তৈমুরলঙ্গ ভারতবর্ষ আক্রমণ করেন। তিনি যে পথে আসেন, কেবল লুণ্ঠন ও হত্যা করিয়া দেশকে রক্তস্রোতে ভাসাইয়াছিলেন। অবশেষে দিল্লী আসিয়া পৌঁছিলেন (১৩৯৮ খৃঃ অঃ)। তাঁহার আগমনের সংবাদ পাইয়াই সম্রাট্ দিল্লী ছাড়িয়া পলাইয়া যান। দিল্লীবাসীদিগের অব্যাহতি দিবেন, এই সংবাদ পাইয়া তাহারা দিল্লীর দ্বার খুলিয়া দিল এবং তাঁহাকে সম্রাট্ বলিয়া গ্রহণ করিল। কিন্তু তাঁহার রক্তপিপাসু সৈন্যগণ অচিরে হত্যাকাণ্ড আরম্ভ করিল। দিল্লীর রাজপথ সকল রক্তের নদী হইয়া গেল। পথে এত মৃতদেহ পড়িল যে, পথ-চলা বন্ধ হইয়া গেল। অগ্নিকাণ্ড ও হাহাকারে দিল্লী ফাটিয়া গেল। কিন্তু তৈমুরলঙ্গ মহা আনন্দে উৎসব করিতে লাগিলেন। পাঁচ দিন পরে, সৈন্যেরা ক্লান্ত ও পরিশ্রান্ত হইয়া পড়িল এবং সহরের অবস্থা এমন হইল যে, সেখানে বাস করা অসাধ্য হইল। তখন তৈমুরলঙ্গ সেখান হইতে যাত্রা করিলেন; দিল্লীতে প্রায় এক লক্ষ লোককে তিনি হত্যা করেন। পূর্ব্বে আর এক নরশত্রু চেঙ্গিস খাঁর কথা বলিয়াছি; ইনি দ্বিতীয়, ইহার মাতা চেঙ্গিস খাঁরই বংশজাতা ছিলেন। মানবজাতির এমন শত্রু পৃথিবীতে অল্পই জন্মিয়াছে। ইহার পর লোদীবংশ দিল্লীতে রাজত্ব করেন; তাঁহাদের ভিতর দুই জন ছাড়া সকলেই অতি অকর্ম্মণ্য ছিল। লোদীবংশের শেষ রাজা ইব্রাহিমের সময় তৈমুরের বৃদ্ধ-প্রপৌত্র বাবর ভারতবর্ষে আসেন। তিনি পাণিপথের যুদ্ধে ইব্রাহিমকে পরাজিত করিয়া দিল্লীর রাজ্য কাড়িয়া লন। এই সময় হইতে পাঠান রাজ্য শেষ হইয়া মোগল রাজত্ব আরম্ভ হইল।
রামানন্দ, কবির ও চৈতন্য।
পাঠানগণের রাজত্বকালে বঙ্গদেশ—পাঠান রাজ্য ত শেষ হইল, এই সময়ের মধ্যে ভারতবাসীর অবস্থাও অনেকটা পরিবর্ত্তিত হইল। এই সময়ের মধ্যে সমুদায় আর্য্যাবর্তে মুসলমান রাজত্ব প্রতিষ্ঠিত হইয়াছিল। বঙ্গদেশে মুসলমান রাজা। কিন্তু তিনি প্রায় স্বাধীন রাজার ন্যায় বাস করিতেন এবং তাঁহার অধীনে বাঙ্গালী জমিদারগণও ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাজার ন্যায় থাকিতেন। তাঁহাদেরও সৈন্য-সামন্ত গড় সবই ছিল তাঁহারাই প্রজার রক্ষক এবং শাসনকর্ত্তা ছিলেন।
রাজ্যশাসন বিষয়ে হিন্দুগণ তখনও বিলক্ষণ নিপুণ ছিলেন। পাঠানগণ রাজ্যশাসন বিষয়ে বিজিত হিন্দুদিগের উপর নির্ভর করিতেন। মোটের উপর পাঠান রাজত্বকালে হিন্দুদিগের অবস্থা নিতান্ত হীন হয় নাই। কিন্তু মুসলমান ধর্ম্মের সংশ্রবে, হিন্দুধর্ম্মের ভিতর একটা প্রতিঘাত আসিল এবং এই যুগে অনেক প্রসিদ্ধ ধর্ম্মসংস্কারক ভারতের নানা স্থানে আবির্ভূত হইয়াছিলেন। রামানুজ, রামানন্দ, কবীর, তুলসীদাস, চৈতন্য প্রভৃতি এই সময়ের মহাপুরুষ। দাক্ষিণাত্যে রামানুজ ও বল্লভাচার্য্য; রামানন্দ, কবীর, নানক প্রভৃতি উত্তরপশ্চিম প্রদেশে, এবং বঙ্গদেশে চৈত্যন্য আবির্ভূত হইয়াছিলেন।
রামানন্দ, চতুর্দ্দশ শতাব্দীর শেষ ভাগে রামানন্দ জন্মগ্রহণ করেন। তিনি বিষ্ণু অবতার রামের উপাসক ছিলেন। রামানন্দের শিষ্যগণ “ভকতমালা” নামে হিন্দী ভাষায় একখানি পুস্তক রচনা করিয়াছিলেন। ইতিপূর্ব্বে সংস্কৃত ভাষায় ভিন্ন কেহ ধর্ম্ম পুস্তক রচনা করিত না। রামানন্দ সকল সম্প্রদায় হইতে শিষ্য গ্রহণ করিতেন। তুলসীদাস এবং কবীর নামে রামানন্দের দুইজন ভক্ত শিষ্য ছিলেন। তুলসীদাসের পদাবলী আজও উত্তর পশ্চিমাঞ্চলে লোকের মুখে মুখে শুনিতে পাওয়া যায়। অতি সরল কথায় এমন উচ্চ অঙ্গের ধর্ম্মের কথা বোধ হয় কোন দেশে শুনিতে পাওয়া যায় না। তুলসীদাসের একটী পদ এইরূপ আছে:—
“তুলসী যব্, তোম্ জগমে আয়া জগ্হাসে তোম্ রোয়
এসা কর্না কর্ যাও ভাই তোম হাসে জগ্ রোয়।”
অর্থাৎ তুলসী যখন তুমি ভূমিষ্ঠ হয়েছিলে সকলে তখন আনন্দ করেছিলেন কিন্তু তুমি কাঁদিয়াছিলে এমন কাজ করে যাও ভাই যাঁহাতে অন্তিমে তুমি হেসে এ জগৎ থেকে চলে যাবে আর সকলে কাঁদ্বে। অতি সোজা কথার কি সুন্দর উপদেশ।
কবীর—একজন উচ্চদরের ভক্ত ছিলেন। তিনি জাতিভেদ প্রথা একেবারে অস্বীকার করিতেন। হিন্দু মুসলমান সকলেই তাঁহার শিষ্য হইত। তাঁহার উপদেশের সার মর্ম এই যে সকলেই ধর্ম্মের আবরণ পরে, কিন্তু অন্তরে ধর্ম্ম সাধন করে না। বাহিরের ক্রিয়া কর্ম্মে কিছু আসে যায় না। কথিত আছে তাঁহার মৃত্যুর পর তাঁহার মৃতদেহ লইরা তাহার হিন্দু এবং মুসলমান শিষ্যগণ কলহে প্রবৃত্ত হয়; কলহান্তে মৃতদেহের আবরণ খুলিয়া দেখে সেখানে মৃতদেহের পরিবর্তে কতকগুলি ফুল পড়িয়া আছে। উভয় সম্প্রদায় তাহা ভাগ করিয়া আপন আপন বিশ্বাস অনুসারে তাহার সৎকার করে। কবীরের অনেক সুন্দর সুন্দর উক্তি শুনিতে পাওয়া যায়। তিনি শত্রু মিত্র সকলকেই ভাল বাসিতেন। একবার তাঁহার একজন নিন্দুকের মৃত্যু হইলে তিনি কাঁদিতে ছিলেন। তাঁহার শিষ্যগণ রোদনের কারণ জিজ্ঞাসা করিলে তিনি বলেন।
“নিন্দুক বিচারা ভালা আদ্মি নিত্ নিত্ মলা ধোয়
নিন্দুক বিচারা মর গিয়া কবীরা বৈটকে রোয়।”
অর্থাৎ আমার নিন্দুক বড় উপকারী লোক ছিল, প্রতিদিন আমার মনের মলা ধৌত করিত। নিন্দুক আমার মরিয়া গিয়াছে তাই আমি কাঁদিতেছি। নিন্দুকের নিন্দা কে শুনিতে ভালবাসে কবীরের ন্যায় ধার্ম্মিক ভিন্ন?
চৈতন্য—পাঠান শাসনকালে ভারতবর্ষে প্রেমভক্তিপ্রবন বৈষ্ণব ধর্ম্ম প্রবল হইয়া উঠিয়াছিল। কি উত্তর পশ্চিমাঞ্চলে, কি দাক্ষিণাত্যে, কি বঙ্গদেশে সর্ব্বত্রই প্রেম ভক্তির কথা। বৌদ্ধ ধর্ম্মের কঠোর নীতিবাদ যেন মানুষের প্রাণ শুষ্ক করিয়া দিয়াছিল। সহসা সর্ব্বত্র প্রেমের বন্যা আসিয়া উপস্থিত হইল। বঙ্গদেশও এই শুভযোগে বঞ্চিত হয় নাই। তথায় ১৪৮৫ খৃঃ নবদ্বীপে প্রেমাবতার শ্রীচৈতন্য জন্মগ্রহণ করিলেন। তিনি ভক্তি এবং প্রেমের বন্যায় বঙ্গদেশ উড়িষ্যা ভারতবর্ষের নানা প্রদেশ একেবারে ভাসাইয়া দিয়াছিলেন। প্রেমভক্তির এমন স্বর্গীয় দৃশ্য ভারতবাসী বহুদিন দেখে নাই। কবি যথার্থ ই গাহিয়াছেন।
“শান্তিপুর ডুবু ডুবু নদে ভেসে যায় রে” সুধু নদিয়া কেন সমুদায় বঙ্গদেশ ও উড়িষ্যা সে প্রেমে ভাসিয়া গিয়াছে। চৈতন্য হরিপ্রেম প্রচার করিয়া গিয়াছেন, ভক্তিতেই মুক্তি এই তাঁর মূল মন্ত্র! তাঁহার সম্প্রদায় মধ্যে জাতিভেদ নাই। একজন মুসলমান তাঁহার শিষ্য ছিল। তিনি ২৪ বৎসর বয়সে সন্ন্যাস গ্রহণ করিয়া দেশে দেশে হরি প্রেম প্রচার করিয়া ১৫১৫ খৃষ্টাব্দে পুরীতে অন্তর্হিত হন। বঙ্গদেশের বৈষ্ণবগণ তাঁহারই সম্প্রদায় ভুক্ত।
- ↑ কোন কোন ঐতিহাসিক এই ঘটনাটি মিথ্যা বলিয়া মনে করেন।