বিষয়বস্তুতে চলুন

ভারতের সংবিধান (১৯৮৭)/ভাগ ৪

উইকিসংকলন থেকে
বিধি ও ন্যায় মন্ত্রক অনূদিত
(পৃ. ১৮-২১)

ভাগ ৪

রাজ্যের কর্মপদ্ধতির নির্দেশক নীতিসমূহ

 সংজ্ঞার্থ। ৩৬। এই ভাগে, প্রসঙ্গতঃ অন্যথা প্রয়োজন না হইলে, “রাজ্য” শব্দের সেই অর্থই হইবে উহার যে অর্থ ভাগ ৩-এ আছে।

 এই ভাগের অন্তর্ভুক্ত নীতিসমূহের প্রয়োগ। ৩৭। এই ভাগের অন্তর্ভুক্ত বিধানাবলী কোন আদালত কর্তৃক বলবৎকরণযোগ্য হইবে না, কিন্তু তৎসত্ত্বেও উহাতে নিবদ্ধ নীতিসমূহ দেশশাসন বিষয়ে মৌলিক, এবং বিধি প্রণয়নে ঐ নীতিসমূহ প্রয়োগ করা রাজ্যের কর্তব্য হইবে।

 জনকল্যাণ বর্ধনের জন্য রাজ্য কর্তৃক সমাজব্যবস্থা প্রবর্তন। ৩৮।[][(১)] জাতীয় জীবনের সকল প্রতিষ্ঠানকে সামাজিক, আর্থনীতিক ও রাজনীতিক ন্যায়বিচারের প্রেরণা দান করে এরূপ একটি সমাজব্যবস্থা যথাসাধ্য কার্যকরভাবে প্রবর্তন ও রক্ষণ করিয়া রাজ্য জনকল্যাণ বর্ধনের প্রয়াস করিবেন।

 [][(২) রাজ্য, কেবল ব্যক্তিগণের মধ্যেই নহে, বিভিন্ন অঞ্চলে বসবাসকারী বা বিভিন্ন বৃত্তিতে নিযুক্ত জনসমষ্টির মধ্যেও, বিশেষতঃ, আয়ের অসমতা হ্রাস করিবার জন্য প্রয়াস করিবেন এবং প্রতিষ্ঠা, সুযোগ ও সুবিধার ক্ষেত্রে অসমতা দূর করিবার জন্য সচেষ্ট হইবেন।]

 রাজ্য কর্তৃক অনসরণীয় কয়েকটি কর্মপদ্ধতি সংক্রান্ত নীতি। ৩৯। রাজ্য, বিশেষতঃ, স্বীয় কর্মপদ্ধতি এরূপে চালিত করিবেন যাহাতে—

(ক) নাগরিকগণ, পুরুষ ও নারী সমভাবে, যেন পর্যাপ্ত জীবিকা অর্জনের অধিকার প্রাপ্ত হন;
(খ) জনসমাজের পার্থিব সম্পদের স্বামিত্ব ও নিয়ন্ত্রণ এরূপে বণ্টিত হয় যেন সর্বোত্তমভাবে সাধারণের হিত সাধিত হয়;
(গ) আর্থনীতিক ব্যবস্থার ক্রিয়ার পরিণতি এরূপ না হয় যে সাধারণের ক্ষতিসাধন করিয়া ধন ও উৎপাদনের উপায়সমূহের সংকেন্দ্রণ ঘটে;
(ঘ) সমান কাজের জন্য পরুষ ও নারী উভয়েরই সমান বেতন হয়;
(ঙ) পুরুষ ও নারী শ্রমিকগণের স্বাস্থ্য ও শক্তির এবং শিশুগণের সকুমার বয়সের অপব্যবহার যেন করা না হয় এবং আর্থিক প্রয়োজনে নাগরিকগণ তাঁহাদের বয়স বা শক্তির অনুপযোগী কোন পেশায় প্রবৃত্ত হইতে যেন বাধ্য না হন;
[][(চ) শিশুদের সুষ্ঠুভাবে এবং স্বাধীন ও মর্যাদাপূর্ণ পরিবেশে গড়িয়া উঠিবার সংযোগ ও সংবিধা প্রদত্ত হয় এবং শৈশবাবস্থা ও যুবাবস্থা শোষণ হইতে এবং নৈতিক ও বৈষয়িক অবহেলা হইতে রক্ষিত হয়।]

 সম-ন্যায়বিচার এবং বিনা খরচে বৈধিক সহায়তা।[][৩৯ক। রাজ্য, বৈধিক ব্যবস্থার ব্যবহার যাহাতে সমসুযোগের ভিত্তিতে ন্যায়বিচারের সুবন্দোবস্ত করে, তাহা নিশ্চিত করিবেন এবং বিশেষতঃ, আর্থিক বা অন্যান্য অক্ষমতার কারণে কোন নাগরিক যাহাতে ন্যায়বিচার লাভ করিবার সূযোগ হইতে বঞ্চিত না হন তাহা নিশ্চিত করিতে, যথোপযোগী বিধিপ্রণয়ন বা প্রকল্পের দ্বারা বা অন্য কোন উপায়ে, বিনা খরচে বৈধিক সহায়তার ব্যবস্থা করিবেন।]

 গ্রাম পঞ্চায়ত সংগঠন। ৪০। রাজ্য, গ্রাম পঞ্চায়তসমূহ সংগঠন করিবার ব্যবস্থা অবলম্বন করিবেন এবং স্বায়ত্তশাসনের এককরূপে উহারা যাহাতে কার্য করিতে সমর্থ হয় তজ্জন্য যেরূপ প্রয়োজন সেরূপ ক্ষমতা ও প্রাধিকার উহাদিগকে প্রদান করিবেন।

 কর্ম ও শিক্ষা প্রাপ্তির এবং কোন কোন স্থালে সরকারী সাহায্য প্রাপ্তির অধিকার। ৪১। কর্ম ও শিক্ষা প্রাপ্তির অধিকার এবং বেকার অবস্থায়, বার্ধক্যে, অসুস্থতায়, কর্মক্ষমতানাশে এবং অনুচিত অভাবের অন্য স্থলসমূহে সরকারী সাহায্য প্রাপ্তির অধিকার যাহাতে নিশ্চিত হয় তজ্জন্য রাজ্য স্বীয় আর্থনীতিক সামর্থ্য ও উন্নয়নের সীমার মধ্যে কার্যকর বিধান করিবেন।

 কর্মের ন্যায়সঙ্গত ও মানবোচিত শর্তাবলীর এবং প্রসূতি সহায়তার বিধান। ৪২। রাজ্য, কর্মের শর্তাবলী যাহাতে ন্যায়সঙ্গত ও মানবোচিত হয় তাহা সুনিশ্চিত করিবার জন্য এবং প্রসূতি সহায়তার জন্য, বিধান করিবেন।

 শ্রমিকগণের জন্য জীবনধারণোপযোগী মজারি ইত্যাদি। ৪৩। রাজ্য, যথোপযোগী বিধিপ্রণয়ন বা আর্থনীতিক সংগঠন দ্বারা বা অন্য কোন উপায়ে, কৃষি, শিল্প বা অন্যবিধ কার্যে নিতে সকল শ্রমিকের জন্য কর্ম, জীবনধারণোপযোগী মজুরি এবং যে শর্তাবলীর অধীনে কর্ম করিলে ভদ্রভাবে জীবনযাত্রার মান এবং পূর্ণমাত্রায় অবসর এবং সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সুযোগসমূহের উপভোগ অব্যাহত থাকে তাহা, সুনিশ্চিত করিতে প্রয়াস করিবেন এবং রাজ্য, বিশেষতঃ, গ্রামাঞ্চলে ব্যক্তিভিত্তিক বা সমবায়ভিত্তিক কুটীরশিল্পের উন্নতিবিধান করিতে প্রয়াস করিবেন।

 শিল্প-পরিচালনব্যবস্থার কর্মিগণের অংশগ্রহণ।[][৪৩ক রাজ্য, যথোপযোগী বিধিপ্রণয়ন দ্বারা বা অন্য কোন উপায়ে, কোন শিল্পে নিয়োজিত উদ্যোগ, সংস্থা বা অন্যান্য সংগঠনের পরিচালনব্যবস্থায় কর্মিগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করিতে ব্যবস্থা করিবেন।]

 নাগরিকগণের জন্য একই প্রকার দেওয়ানী সংহিতা ৪৪। ভারতের রাজাক্ষেত্রে সর্বত্র নাগরিকগণের জন্য একই প্রকারের দেওয়ানী সংহিতা প্রবর্তন করিতে রাজ্য প্রয়াস করিবেন।

 শিশুগণের জন্য অবৈতনিক এবং অবশ্যক শিক্ষার ব্যবস্থা। ৪৫। রাজ্য, এই সংবিধানের প্রারম্ভ হইতে দশ বৎসর সময়সীমার মধ্যে সকল শিশুর জন্য, তাহারা চৌদ্দ বৎসর বয়স পূর্ণ না করা পর্যন্ত, অবৈতনিক এবং অবশ্যক শিক্ষার ব্যবস্থা করিতে প্রয়াস করিবেন।

 তফসিলী জাতি, তফসিলী জনজাতি এবং অন্যান্য দুর্বলতর বিভাগের শিক্ষাবিষয়ক ও আর্থনীতিক স্বার্থের উন্নতিবিধান। ৪৬। রাজ্য, বিশেষ যত্নসহকারে, জনগণের দুর্বলতর বিভাগের, এবং বিশেষতঃ, তফসিলী জাতি ও তফসিলী জনজাতিসমূহের, শিক্ষাবিষয়ক ও আর্থনীতিক স্বার্থের উন্নতিবিধান করিবেন এবং তাঁহাদিগকে সামাজিক অবিচার ও সর্বপ্রকার শোষণ হইতে রক্ষা করিবেন।

 খাদ্যপুষ্টির স্তরের ও জীবনধারণের মানের উত্তোলন এবং জনস্বাস্থ্যের উন্নতিকরণ রাজ্যের কর্তব্য। ৪৭। রাজ্য খাদ্যপুষ্টির স্তরের ও তদীয় জনগণের জীবনধারণের মানের উত্তোলন এবং জনবস্বাস্থ্যের উন্নতিকরণ স্বীয় প্রধান কর্তব্যসমূহের অন্যতম মনে করিবেন এবং, বিশেষতঃ, মাদক পানীয় ও যে ভেষজ স্বাস্থ্যের পক্ষে অনিষ্টকর, ঔষধীয় প্রয়োজনে ভিন্ন, অন্য প্রকারে তাহার সেবন প্রতিষিদ্ধ করিতে প্রয়াস করিবেন।

 কৃষি ও পশুপালনের সংগঠন ৪৮। রাজ্য আধুনিক ও বৈজ্ঞানিক প্রণালীতে কৃষি ও পশুপালন সংগঠন করিতে প্রয়াস করিবেন এবং বিশেষতঃ, গাভী, গোবৎস ও অন্যান্য দুঃখবতী ও ভারবাহী গবাদি পশুবংশের পরিরক্ষণ ও উন্নতি করিতে এবং ঐরূপ পশুসমূহের হত্যা প্রতিষিদ্ধ করিতে ব্যবস্থা অবলম্বন করিবেন।

 পরিবেশের রক্ষণ ও উন্নতিবিধান এবং বন ও বন্য প্রাণীর সংরক্ষণ।[][৪৮ক। রাজ্য দেশের পরিবেশের রক্ষণ ও উন্নতিবিধান করিতে এবং বন ও বন্য প্রাণীর সংরক্ষণ করিতে প্রয়াস করিবেন।]

 জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ স্মারক ও স্থান ও বস্তুসমূহের রক্ষণ। ৪৯।[][সংসদ কর্তৃক প্রণীত বিধি দ্বারা বা বিধি অনুযায়ী।] জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বলিয়া ঘোষিত, কলাত্মক বা ঐতিহাসিক কারণে চিত্তাকর্ষক, প্রত্যেক স্মারক বা স্থান বা বস্তু লুণ্ঠন বা, স্থলবিশেষে, বিকৃতি, ধ্বংস, অপসারণ, হস্তান্তরণ বা রপ্তানি হইতে রক্ষা করিবার দায়িত্ব রাজ্যের থাকিবে।

 নির্বাহিকবর্গ হইতে বিচারপতিবর্গের পৃথককরণ। ৫০। রাজ্যের সরকারী কৃত্যকসমূহে নির্বাহিকবর্গ হইতে বিচারপতিবর্গকে পৃথক্‌ করিতে রাজ্য ব্যবস্থা অবলম্বন করিবেন।

 আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা বর্ধন। ৫১। রাজ্য প্রয়াস করিবেন—

(ক) আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা বর্ধন করিতে;
(খ) জাতিসমূহের মধ্যে ন্যায়সঙ্গত ও সম্মানজনক সম্পর্ক রাখিতে;
(গ) সংগঠিত জনসমূহের মধ্যে পরস্পরের সহিত ব্যবহারে আন্তর্জাতিক বিধি ও সন্ধিবন্ধনের প্রতি শ্রদ্ধা পোষণ করিতে; এবং
(ঘ) সালিসী দ্বারা আন্তর্জাতিক বিবাদসমূহের মীমাংসায় উৎসাহ প্রদান করিতে।

  1. সংবিধান (চতুশ্চত্বারিংশ সংশোধন) আইন, ১৯৭৮, ৯ ধারা দ্বারা ৩৮ অনুচ্ছেদটি ঐ অনুচ্ছেদের (১) প্রকরণরূপে (২০.৬.১৯৭৯ হইতে) পুনঃসংখ্যাত হইয়াছে।
  2. ঐ ৯ ধারা দ্বারা (২০.৬.১৯৭৯ হইতে) সন্নিবেশিত।
  3. সংবিধান (দ্বিচত্বারিংশ সংশোধন) আইন, ১৯৭৩, ৭ ধারা দ্বারা, (চ) প্রকরণের স্থলে (৩.১.১৯৭৭ হইতে) প্রতিস্থাপিত।
  4. ঐ, ৮ ধারা দ্বারা (৩.১.১৯৭৭ হইতে) সন্নিবেশিত।
  5. ঐ, ৯ ধারা দ্বারা (৩.১.১৯৭৭ হইতে) সন্নিবেশিত।
  6. সংবিধান (দ্বিচত্বারিংশ সংশোধন) আইন, ১৯৭৬, ১৩ ধারা দ্বারা (৩.১.১৯৭৭ হইতে) সন্নিবেশিত।
  7. সংবিধান (সপ্তম সংশোধন) আইন, ১৯৫৩, ২৭ ধারা দ্বারা, “সংসদ কর্তৃক বিধি দ্বারা,”—এর স্থলে প্রতিস্থাপিত।