বিষয়বস্তুতে চলুন

ভারত কোন্‌ পথে?/জোয়াহির লাল ও কুম্যনিজম্

উইকিসংকলন থেকে

জোয়াহির লাল ও কুম্যনিজম্

জাতির স্বধর্ম্ম মিথ্যা নয়।

 ইটন্, হ্যারো, অক্সফোর্ডে শিক্ষিত পাশ্চাত্যের সেই আবহাওয়ায় মানুষ জোয়াহির লালের মত নেতারা মানুযের জীবনের গভীরতর সত্যগুলির সঙ্গে পরিচয় রাখা দূরে থাক প্রকৃত ভারতকেই চেনেন না। এঁরা ধূতিচাদর ঢাকা অক্সফোর্ড ও কেম্‌ব্রিজ ছাড়া আর কিছুই নন। মানুষের অন্তরচেতনার স্বপ্ন রূপ, রস ও ভাবের যে সব স্তররাজি আছে সেগুলির সম্বন্ধে অজ্ঞ এঁরা কেবল স্থূলেরই ব্যাপারী, তাই মানব জীবনের নব নব কৃষ্টির বিচিত্র রসধারায় এঁরা বঞ্চিত। এঁদের চক্ষে ভারত চীন জাপান পারস্য মিশর আদি প্রাচ্য জাতি জার্ম্মানী আমেরিকা ও রুষেরই সামিল, পার্থ্যকের মধ্যে কেবল ইতস্ততঃ দু’ চারটে মন্দির প্যাগোডা পিরামিড পড়ে আছে মাত্র। ভাবের ও রসের জগতের এই সব সফরীদের—এই সব অতি-পণ্ডিত পুস্তক-বাগীশদের কাছে তুহীনশৃঙ্গ হিমাচল বা জাহ্নবীর রজত ধারার কোন ভাষাই নাই, আল্‌পস্ গিরিমালা ও টেমস্ নদ এঁদের কাছে পাথর ও জলের জড় খেলা মাত্র।

 য়ুরোপের মনীষা চিরদিনই করে চিন্তা ও ধ্যান আর এঁরা সেই চিন্তার কাটেন জাবর। জার্ম্মানী ও রুষের চিন্তাশীল ব্যক্তিরা মানবজাতির ইতিহাসের পাতাগুলি খুলে তার মাঝে ডুবতে জানেন মহাধ্যানে; তাই যখন তাঁরা কথা বলেন, উৎকর্ণ জগৎকে বাণী দেন, তখন সেই মন্ত্রের অমোঘ বলে জগৎ নড়ে যায়—নূতন নূতন প্রগতির সূত্র পেয়ে মানুষ নূতন পথে যাত্রা করে। কিন্তু পাশ্চাত্যের স্কুল কলেজের এই সব পাঠমুখস্তকারী সর্দার পোড়োদের না আছে ধ্যান, না আছে মৌলিক দৃষ্টি বা স্বতন্ত্র মনীষা; এঁরা এঁদের বুদ্ধির জগতের মক্কা ঐ পশ্চিমের দিকে মুখ করেই পড়েন নমাজ, তাদের চিন্তা নিয়ে এঁরা করেন চিন্তা। এসিয়ার প্রাণ, ভারতের আত্মা এঁদের মাঝে এখনও সুপ্ত, তাই এঁদের বাণী ঐ পল্লীপ্রান্তের পর্ণকুটিরের কন্থাচীরপরা যে ভারত তার প্রাণতন্ত্রীতে ঘা দেয় না, তাদের মর্ম্ম স্পর্শ করে না।

 ইতিহাসের মূল সূত্র হচ্ছে মানব জীবন নিয়ে পরীক্ষা— experiments; ধর্ম্ম সমাজ রাষ্ট্র কলা সাহিত্য শিল্প বাণিজ্য এইগুলিকে কি রূপ দিলে তারা মানব—সত্তার ক্রম—বিকাশের—পূর্ণ পরিণতির অনুকূল হবে, সেই পরীক্ষা নানা ভাবে ইতিহাসে যুগে যুগে চলেছে। য়ুরোপ তার স্বভাব ও স্বধর্ম্মানুযায়ী ভাবধারা নিয়ে নিজেরই মৌলিক ভঙ্গীতে সমাজ ও রাষ্ট্রকে ভাঙে, গড়ে ও রূপ দেয়। তার সে স্বধর্ম্ম এসিয়ার নয়, তার স্বধর্ম্ম ও প্রতিভার পুণরাবৃত্তিমাত্রই যদি এসিয়ার স্বধর্ম্ম হতো তা’ হ’লে মহামানব কতখানি বৈচিত্র্য থেকে বঞ্চিত হতো, কত সমৃদ্ধ জ্ঞানভাণ্ডার থেকে, জীবন নিয়ে ও সমাজ, রাষ্ট্র, কলা কৃষ্টি নিয়ে কত নূতন পরীক্ষাজাত অভিজ্ঞতা থেকে মানুষ বঞ্চিত থাকতো। মানুষের একই জীবন ও তার এই একই উপকরণগুলি দেশে দেশে স্বতন্ত্র মৌলিকতার ও মনীষার রঙে রঞ্জিত হয়ে কত না বিচিত্র রূপ ধরেছে। এই বহু বিচিত্র পথেই তো মানুষ চলেছে পূর্ণতার পাথেয় সঞ্চয় করতে করতে। জীবনের এই বিচিত্র পরীক্ষাগারে যে জাতি পুরাতনে দাগা বুলায়, ভিন্ন দেশকে অনুকরণ মাত্র করে,সে শুধু বঞ্চিত নয়,সে সৃষ্টির দেবতার কাছে অপরাধী।  পণ্ডিত জোয়াহির লাল চতুর পণ্ডিত ও বুদ্ধিমান মানুষ কিন্তু তাঁর দৌড় ঐ পুঁথিগত পাণ্ডিত্য অবধি। মুনি বা মন্ত্রদ্রষ্টার প্রজ্ঞা (intuition) বা ঋষিদৃষ্টি তাঁর নাই, জীবনের স্থূল মোটা ঘটনা নিয়ে তাঁর কাজ। জাতির জীবন-যাত্রায় নূতন পাথেয় যোগানো, নূতন সৃষ্টির মন্ত্র আবিষ্কার করা—জোয়াহির লালের মত নেতারা এবং তাঁদের পাশ্চাত্য গুরুরা সে কাজ করতে গিয়ে একটি বড় কথা ভুলে যান। মানুষের সমাজ ও রাষ্ট্রকে ঢেলে সাজতে অর্থনীতি একটা বড় তত্ত্ব সন্দেহ নাই, কিন্তু শুধু বহিরঙ্গ অর্থনীতিই সব নয়, মানুষের মানবত্ব-human factor—তার অন্তরজগৎটাও কম নয়। ওটাকে ভুললে হিসাব কিতাবে যে মস্ত একটা ভুল থেকে যাবে চিরদিনই জাতিকে সেই ভুলের জের কেটে চলতে হবে। আধুনিক ধনিকতন্ত্রে—বর্ত্তমান সমাজ ও রাষ্ট্রে মানুষের দৈনিক অভাব অভিযোগ ক্ষুৎপিপাসা খুব বড় হয়ে দেখা দিয়েছে সন্দেহ নাই; কিন্তু তাই দেখে যদি একথা কেউ অনুমান বা প্রতিপাদন করেন যে মানুষের গোটা জীবনটারই ভিত হচ্ছে টাকা আনা ও পয়সা, তা’ হলে মস্ত একটা ভুল করা হবে। পাশ্চাত্যের একদেশদর্শী পাণ্ডিত্য ও বৈজ্ঞানিক বস্তুতান্ত্রিক বুদ্ধি এই ভুল বার বার করে, যেমন ফ্রয়েড করেছেন। তাঁর মতে যৌন প্রেরণাই প্রাণের সবখানি, আর আধুনিক সাম্যবাদী কম্যুনিষ্ট নেতাদের মতে আমাদের অপূর্ব্ব ধর্ম্ম সমাজ কলা সাহিত্য সৃষ্টি সভ্যতা সবই উঠেছে টাকা আনা পয়সাকে মূল করে। প্রাণ সমুদ্রে শত শত ঢেউ উঠেছে,তার একটা হচ্ছে প্রেম, একটা করুণা, অন্যটা কাম, অপরটা লোভ, কিন্তু কামটাই গোটা প্রাণ নয়। জীবনেরও বহু উপকরণের একটা হচ্ছে অর্থ, অর্থ জীবনের সবটা নয়।

কম্যুনিজম্ কোথায় ভুল করেছে?

 পাশ্চাত্যের জীবন গঠনের আধুনিকতম মন্ত্র—কম্যুনিজমে মানবতার দিকটাকে—তার human factorকে হিসাব থেকে একেবারে বাদ দেওয়া হয়েছে। মানুষের অন্তর-চেতনা একটা যাদু পেটিকা—ভানুমতীর ভেল্কীর ঝাঁপী বিশেষ; তার মধ্যে থেকে অর্তকিতে কেবলি বের হরে আসছে কখন বুদ্ধ চৈতন্য যীশু, কখন চেঙ্গিজ খাঁ, নীরো, মুসোলিনী, হিটলার। আমাদের প্রাণ সত্তা যত দিন এই রকমটি আছে তত দিন চলবে এই আলো ও আঁধারের খেলা, তার পশু ও দৈত্য স্তর থেকে উঠবে কৃষ্ণ রাজসিক রূপ সব, আর তার মানব ও দেব স্তর থেকে উঠবে উজ্জ্বল শুভ্র তেজোময় পুরুষরা; এবং তারা এলেই, তারা কৃষ্ণই হোক আর শুভ্রই হোক, বিরাট সেই শক্তির বরপুত্রদের কাছে সাধারণ থাকের লাখ লাখ মানুষের মাথা শ্রদ্ধায় পূজায় বা ভয় ভক্তিতে আপনি নুয়ে পড়বে, বুদ্ধ যীশুর সমাধিক্ষেত্রের সঙ্গে লেনিন শিবাজীর সমাধি মন্দিরেও জমে যাবে পূজারীর ও তীর্থযাত্রীর ভিড়। আমাদের শরীরের যেমন ক্ষুধা তৃষ্ণা আছে, তেমনি আমাদের হৃদয় ও প্রাণে আছে প্রবল ক্ষুধা; সে আপনাকে প্রেমে শ্রদ্ধায় উজাড় করে কারু না কারু পায়ে ঢেলে দিতে চায়, তাতেই আমাদের স্বত্তার হৃদ্পদ্ম ও প্রাণ-কমল শত সহস্র দলে ফুটে ওঠে, সার্থক ও চরিতার্থ হয়। আমাদের মানস-সত্তার—বুদ্ধি পুরুষেরও আছে জ্ঞানের ক্ষুধা; এই জড়ের মায়া ভেদ করে স্তরে স্তরে জ্ঞান আহরণ করবার তৃষ্ণা তার অদম্য; সুতরাং জ্ঞান বিজ্ঞান ধর্ম্ম দর্শন বার বার মরেও আবার গজাবে। মানুষের সত্তা হচ্ছে জগতের miniature ছবি, ক্ষুদ্রাকারে ব্রহ্মাণ্ডের পূরা প্রতীক; স্বর্গ ও মর্ত্ত্যের মাঝে আছে চেতনার যত স্তর সব ভিড় করে রয়েছে এই মানব-পেটিকার মধ্যে, তাই এই মানব ঘটের সম্ভাবনা বহুমুখী।

 রাশিয়ার একপেশো কম্যুনিজমের নো-গড্ বুলি কিছুতেই মানুষের এই দুর্ল্লভের দিকে টান—এই সূক্ষ্মের ক্ষুধা চেপে রাখতে পারবে না। মানুষের অপূর্ণ মতবাদের দম্ভ সাদাকে কখনও কালো করতে পারে না, ঘেঁটু গাছে কখন পদ্ম ফোটাতে পারে না। অন্ধ সংস্কারকের পাগল ইচ্ছার বশবর্ত্তী হয়ে এই বিচিত্র বহুমুখী জগতে কৃত্রিম সাম্য সৃষ্টি করতে গিয়ে রাশিয়ার প্রথম কম্যুনিষ্ট দল দেশের সুকুমার কলা সাহিত্য জ্ঞান সভ্যতা ভেঙে একটা প্রাণহীন নিয়ম-তান্ত্রিক সমতা এনেছিল, সকল বর্ণকে টেনে শূদ্রত্বের কর্দ্দমে নামিয়েছিল। আজ তার চক্ষু গজিয়েছে, রাশিয়া বুঝেছে শিক্ষার মূল্য, কলা সাহিত্যের কদর! এখনও তার পূর্ণ দৃষ্টি লাভ হয় নাই, এখনও সে বুঝে নাই, যে, যে সত্যকে সে ধর্ম্মবিপর্যয়ের নামে আজ দাবিরে রাখছে সেই পরম সত্য শত শিখায় জ্বলে এক দিন নবরূপে তাকে গ্রাস করবে।

 অন্ধ রাগ ও জিঘাংসা একটা জাতিকে তার শতাব্দির অজ্ঞান ও নৈরাশ্য থেকে তুলতে পারে না, একথা দেশের সন্ত্রাশবাদী তরুণদের বুঝতে হবে। যা’ দেশের ও জাতির আমূল সংস্কার আনতে পারে তা’ হচ্ছে গঠন-প্রমুখতা; তার জন্য তরুণ ভারতকে হতে হবে ময়দানবের বংশধর, কলাকুশলী, শিল্পকুশলী, কৃষিকুশলী,—গঠনের ত্বরিৎকর্ম্মা অনুপম শিল্পী। একেবারে ভিত থেকে তুলতে হবে নব ভারতকে গড়ে, মানুষের রক্তে সে সৌধ গড়ে উঠবে না, ক্রুদ্ধের বিকৃত মনে সে ছাঁচ সে নক্সা জাগবে না; সে নূতন কর্ম্ম-পদ্ধতি বা জীবন-মন্ত্র যারা আনবে তারা হবে স্থিতধী মানুষ; স্থির মনোবল, বিশাল হৃদয় অসীম দরদ ও প্রেম-শক্তি দিয়ে যারা এসেছে মানুষের ভবিষ্যৎকে গড়বে তারাই হবে নব-ভারতের ও নবীন বাংলার কর্ম্মী।

 মানুষের জীবনের গভীরতর সত্যগুলিকে কি শুধু middle class phenomena—“শিক্ষিতের ও মধ্যবিত্তের শ্রেণীগত মনোবৃত্তি” বলে গালি দিলেই তারা মানুষের জীবন থেকে বাদ পড়ে যাবে? রুষের নব প্রগতির মুগ্ধ পূজারী জোয়াহির লাল অন্ততঃ তাই মনে করেন। তাঁর লেখা “Whither India”য় তিনি লিখেছেন, “—এবং অন্য দেশের মত এদেশেও প্রবল জাতীয়তার সঙ্গে আছে— আদর্শবাদ, অতীন্দ্রিয়ের পিপাসা, ভাবের আতিশয্য, দেশের জাতীয় ব্রতের সম্বন্ধে অন্ধ ধারণা, ধর্মোন্মাদের মতই একটা ব্যাপার। এ সবই হচ্ছে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মনোভাব।” পণ্ডিত জোয়াহির লাল ম্যাজিকে অর্থাৎ ইন্দ্রজালে বিশ্বাস করেন না, তিনি সুস্পষ্ট লজিক বা যুক্তিতে রাখেন আস্থা, যে ভাব-প্রবণবতা বুদ্ধিকে করে আচ্ছন্ন তার কোন স্থানই জোয়াহির লালের যুক্তিবাদে নাই। সুস্পষ্ট বিশদ চিন্তা খুবই ভাল জিনিষ, যদি সে চিন্তা হয় সমগ্র, সুসমঞ্জস ও পূর্ণ; স্থূল ও একদেশদর্শী নয়, গোঁড়ামী-প্রসূত নয়।

 আমরা কি চাই, মানুষের জীবনের লক্ষ্য কি, তা’ আমরা কি করে বুঝবো? প্রথমে বুঝতে হবে, যে, মানুষের আছে দু’টী জগৎ—অন্তর জগৎ আর বহির্জগৎ, এই দুটিকে নিয়েই তার কারবার। সুতরাং তার চাওয়া তার সাধ আকাঙ্ক্ষাগুলিও দু’ রকমের, তারা রূপ নেয় ঐ অদৃশ্য অন্তর থেকে বাহিরের দিকে; তার শুধু দেহের অভাব অভিযোগ ক্ষুৎ পিপাসাই নাই, তার আছে মনের ও জ্ঞানের ক্ষুধা, তার আছে বুকের প্রেম, সহানুভূতির ও রসের ক্ষুধা, তাহার আরও আছে রূপ সুষমা শব্দ গন্ধের অর্থাৎ প্রাণের ক্ষুধা, কত না বিচিত্র ক্ষুধা নিয়ে অন্তর জগৎ বাহিরকে ধরে তৃপ্তি খুঁজছে, চরিতার্থতা খুঁজছে। মানুষের শুধু বহির্জীবনের উপকরণ গুলিই যদি আমরা গুছিয়ে দিই অর্থাৎ তার সমাজ, তার অর্থনীতিক ব্যবস্থা, তার রাষ্ট্রচক্র মনের মত করে সাজিয়ে তুলি অথচ তার ঐ রসক্ষুধাতুর মনপ্রাণের অন্তর জগৎটা থাকে অসংস্কৃত এলোমেলো, তা’ হ’লে তার কল্যাণ বিষিয়ে উঠবে, তার ঐ অসুর-শাসিত ছন্দহারা অন্তর যে বাহিরকে দেবে ঘুলিয়ে। নিছক বাহিরের জীবনের যন্ত্র—অর্থাৎ সমাজ ও রাষ্ট্রের বহিরঙ্গ রূপ ও তাদের কাটা ছাঁটা ছক মানুষের প্রকৃতি থেকে তার লোভ, অহংকার স্বার্থান্বেষণ, তার হিংসা ক্রূরতা কাটিয়ে তাকে বড় করে দিতে পারে, এ ধারণা আংশিক সত্য হতে পারে, পূরা সত্য নয়। গৈরিক ছিল ত্যাগের চিহ্ন, সেই গৈরিক ধরে আজ দেশে হাজার হাজার ভণ্ড স্বার্থান্বেষী চোর লম্পট ঘুরছে। স্বাধীন প্রজাতন্ত্রের দেশেও আছে দস্যু তস্কর, তাই সেখানেও আছে পুলিশ পেয়াদা জেল ফাঁসীকাঠ। এত দেখেও মানুষের জড় মন বাহিরের আয়োজন ও ব্যবস্থাকেই বেশি বিশ্বাস করে। তারা কেবলি ভাবে মন্দ সমাজ ভাঙলেই ভাল সমাজ আপনি আসবে, যারা অত্যাচারী শাসককে উৎসন্ন করবে তারা বুঝি আর অত্যাচার করবে না। তাই বার বার বলছি বাহিরের উপকরণ আয়োজন সত্য কিন্তু অন্তরের ব্যাপার আরও সত্য, মানুষের অন্তর কল্যাণ ও অকল্যাণের আরো অমোঘতর উৎস।

 বিজ্ঞান জড়বাদের এত প্রমাণ বিপক্ষে দেওয়া সত্ত্বেও মানুষের জড়ধর্ম্মী মন জড়কে এখনও নিছক জড় বলেই ভাবে। স্থূল জড়কে বিশ্লেষণ করে করে আধুনিক বিজ্ঞান কিন্তু মানুষকে নিয়ে গেছে সূক্ষ্ম থেকে সূক্ষ্মতর ভূতের মাঝে—অণুকণায়, কতকগুলি elemental শক্তির জগতে—যা’ শেষে ক্রমশঃ একটা মূল শক্তিতেই গিয়ে পর্য্যবসিত হবে। রাসায়নিক ও জীবতত্ত্বের পরীক্ষাগারে বসে মানুষ বহু বৎসরের সাধনায় জড়কে ধরে ক্রমশঃ শক্তির রাজ্যে পৌঁছেছে; তার পরই আসবে চৈতন্যের জগৎ। ঠিক যেমন জড় নিজেকে শক্তিতে হারিয়ে ফেলেছে, শক্তিও তেমনি চৈতন্যে গিয়ে একদিন রূপান্তরিত হবে। বিজ্ঞান পরীক্ষা করে দেখেছে, যে, জড়ের একটা কণার মধ্যে নিহিত আছে এমন লীন শক্তি—kinetic energy যা’ জাগলে আমাদের জগতের মত বহু সৌর জগৎ চূর্ণ করে দিতে পারে। সুতরাং দেখা যাচ্ছে একটা কিছু আদি পদার্থই আছে (দুইটা নাই—‘একং সৎ’) যার এক দিক জড় ও অন্য দিক চৈতন্য বা শক্তি।

 পণ্ডিত জহরলালের ইটন্ ও হ্যারো শিক্ষিত সাহেবী মন “ম্যাজিক” বলে উড়িয়ে দিতে চায় যা কিছু পরমার্থ বস্তু বলে আমরা জানি তা’সবই; আত্মবস্তুকে তাঁর জড়বাদী মন না মানতে পারে, তা’ নিয়ে স্থূল রসিকতা করতে পারে, কিন্তু তথাকথিত এই অনাত্ম বা জড় থেকে যে এত রূপ, এত রস, এত বর্ণ, এত গন্ধ, এত অপুর্ব্ব ভাব ও কষ্টি জন্মাচ্ছে এটা কি কম ম্যাজিক? এই অপূর্ব্ব সৃষ্টি ধারা আসছে কারণ থেকে সূক্ষ্মে, সূক্ষ্ম থেকে স্থূলে, এটা যে জড়বিজ্ঞানেরই অবিসম্বাদিত সত্য। সুতরাং পাশ্চাত্যের জড়বাদও প্রাচ্যের আত্মবস্তুতেই এসে ক্রমশঃ দাঁড়াচ্ছে। রাশিয়ার সাম্যবাদের জন্ম আমাদের এত দিনের ঐ পুরাতন কৃষ্টি ও সভ্যতারই কোলে, ওটা আকস্মিক একটা কিছু নয়; কারণ মানুষ চলেছে সত্য থেকে পূর্ণতর ও ব্যাপকতর সত্যে; আজ পূর্ণতর সত্য এসেছে বলে কালিকার অপূর্ণতর সত্যটা ভুল ছিল, গত কাল তার কোন অবদানই মানব সভ্যতায় ছিল না একথা বাতুলের প্রলাপ মাত্র, পল্লবগ্রাহিতার পরিচায়ক। জগতের শূদ্রকে অস্পৃশ্যকে অনুন্নতকে তুলতে হবে ব্রাহ্মণের তপস্যায়, ক্ষত্রিয়ের দৈবী শৌর্য্যো, বৈশ্যের কলাকুশলতায় তার পরিবর্ত্তে আমাদের শূদ্রের অজ্ঞানে অসংস্কৃতিতে নেমে গেলে চলবে না। অথচ রুষ কমিউনিজমের গোড়ার চেষ্টা ছিল একটা কালাপাহাড়ী এলোপাতাড়ী ভাঙন, সব বৈচিত্র্য মাঠসই করে একটা প্রাণহীন সমতায় সকলকে নিয়ে আসা। অথচ বৈষম্য বা বৈচিত্র্যই হচ্ছে সৃষ্টি, সমতা হচ্ছে প্রলয়—মহতি বিনষ্টি।

 রাশিয়ার কম্যুনিজমের অন্তর্নিহিত সত্য হচ্ছে জড়বাদের নয়, একেবারে পরমার্থের সত্য; যে সমতা বা বৈষম্যহীনতা সে চায় তা’ হচ্ছে আত্মার ধর্ম্ম, জড়ের নয়। সৃষ্টির সূক্ষ্মের দিকটা একতার দিক, অখগুত্বের দিক; সৃষ্টির স্থূলের দিকটাই কিন্তু বৈষম্যের দিক, তাই সেখানে এত সমৃদ্ধি, এত প্রাচুর্য্য, এত রং, এত বিপুলতা। রাশিয়ার কম্যুনিজয়ম্ যে নিরীশ্বরবাদকে ধরেছে সেটা প্রতিক্রিয়া হিসেবে, অপধর্ম্মের নাশের জন্য। ধর্ম্মের নামে মানুষ জগতে যত খুনখারাপী অনাচার উৎপীড়ন করেছে তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণার জন্য যুগদেবতার মুখে আজ এই নিরীশ্বরবাদের মুখোস। পাশ্চাত্যের ভারতীয় শিষ্যদের কিন্তু পল্লবগ্রাহী বুদ্ধি ব্যাপারটাকে এত তলিয়ে দেখে না, তারা জানে ‘ধরো আর মারো’; তারা বোঝে দুই চক্ষু মুদে দুই হাতে লগুড় চালানো। যে আদর্শবাদকে—যে ভাব-প্রবণতা ও জাতীয়তার উচ্ছ্বাসকে পণ্ডিত নেহেরু middle class phenomena মধ্যবিত্তের মনোবৃত্তি বলে উপহাস করেছেন, রাশিয়ার কম্যুনিজমে তার অভাব নাই, বরঞ্চ আতিশয্যই আছে। জাতীয়তা নিজের দেশের জাগরণ নিয়েই সন্তুষ্ট, পরের আটচালায় সে আগুন লাগাতে যায় না। রাশিয়ার এই শূদ্রোখান আন্দোলনে কিন্তু বিশ্বগ্রাসী ক্ষুধা আছে; বিপ্লবের আগুনে সে বিশ্ব সংসার ছারখার করবেই, তা বিপ্লব আবশ্যক হোক আর নাই হোক। যেহেতু রাশিয়ায় ধনিক-বধ যজ্ঞ দরকার হয়েছে সুতরাং ওটা একটা অত্যাবশ্যকীয় ব্যাপার। আগুনের মশাল হাতে জগদুদ্ধারের ব্রত ও mission নিয়ে অন্ধ ভাবোচ্ছ্বাসপাগল বিদ্রোহের পঙ্গপাল বাহির হয়েছে জগত গ্রাসের লালসায়। পণ্ডিতজীর তিরস্কৃত ঐ মধ্যবিত্তের মনোবৃত্তি বা middle class phenomena এর চেয়ে শত গুণে ভদ্রলোক।

অতীতের কোলে—তারই আদর্শ ও কৃষ্টির রসে পুষ্ট হয়ে আরও ব্যাপকতর মহত্তর আদর্শবাদ যা জন্মাচ্ছে তা অতীতের দিকে এমন নির্ম্মম হয় কেন? উদ্ধত সঙ্কীর্ণমনা একদেশদর্শী মানুষের হাতে জগৎকল্যাণের কাজ পড়লে সে ব্রতের এই দুর্দ্দশাই হয়। কম্যুনিজমের আদর্শবাদী যারা তাদের মধ্যে সবাই গভীর চিন্তাশীল মানুষ নয়, পল্লবগ্রাহী অসহিষ্ণুর দলই বেশি, তারা ধ্বংসের নেশায় পাগল হয়ে গঠনের কথা ভুলে যায়। পল্লীর দৈন্য ও নোংরা জীবনে যা’ নাই তাকে তারা মধ্যবিত্ত, বুর্জোয়া ইত্যাদি নামে গালি দেয়। ধনিকতন্ত্রকে উচ্ছেদ করতে এসে তারা ঘৃণা করতে শেখে ধনিক সমাজের গড়া কলা সাহিত্য কৃষ্টির মত মহৎ বস্তুকেও। অপধর্ম্মের exploitation দূর করতে গিয়ে তারা দাবিয়ে নষ্ট করে দিতে চায় মানুষের প্রকৃতির সহজ অনাবিল ঊর্দ্ধগামী প্রাণ ও ভাব-ধারাকে, সকল পেলব সুক্ষানুভূতিকে। এত বড় শিক্ষিত ব্যক্তি হয়েও পণ্ডিত জোয়াহির লাল এই অসহিষ্ণু পল্লবগ্রাহিতার বুলি আওড়ান তার অর্থ এই, যে, তাঁর পাণ্ডিত্য পুঁথিগত ও স্থূল, সুক্ষানুভূতি বর্জ্জিত; মৌলিক মনীষার খেলা তাতে নাই। তিনি কর্ম্মী, ঋষি বা মন্ত্রবেত্তা তিনি নন।

Whither Indiaর উত্তর-

 Whither India—“ভারত কোন পথে?”—তাঁর এই প্রবন্ধে তিনি বলেছেন, “শাসনচক্রের বিভিন্ন রূপ হচ্ছে এক একটি উপার মাত্র, লক্ষ্য নয়। এমন কি মুক্তি বা স্বাধীনতাও তেমনি উপায় মাত্র; তার লক্ষ হচ্ছে মানব-কল্যাণ,—মানুষের উন্নতি ও পরিপুষ্টি, রোগ দারিদ্র্য ও দুঃখের অবসান, এবং সকলের জন্য সুখী ও কল্যাণকর জীবন যাপনের ষোল আনা সুবিধা ও অবসর।” যদি তাই-ই হয়, তা’ হলে প্রজাতন্ত্র বা গণতন্ত্রের মত একটা শাসন তন্ত্রকে পাবার জন্য এতখানি শক্তিক্ষয়ের আবশ্যকতা কি, স্বাধীনতার জন্য সহস্রে সহস্রে আত্মদানেরই বা কি দরকার, যে কোন সুষ্ঠু পথে লোক-কল্যাণ হলেই তো হ’লো? লক্ষ্যকে মুখ্য না করে উপায়কে মুখ্য করার এ বাতুলতা কেন? রাশিয়া তার বিশেষ জীবনের বিশিষ্ট পরিণতির মাঝে যা’ উপায় বলে ধরতে বাধ্য হয়েছে, যার পূর্ণ পরীক্ষা এখনও হয়ে চুকে নাই, সেই বিপ্লবমূলক কম্যুনিজম্ ভারতকে জবরদস্তির দ্বারা উদরস্থ করানর অর্থ কি? ভারতকে তার নিজস্ব মনীষা ও প্রতিভার বলে তার বিশেষ জীবনের বিশিষ্ট ভঙ্গীটি—তার উন্নতি ও পরিপুষ্টির অনুকূল উপায়টি আবিষ্কার করবার স্বাধীনতা কেন দেওয়া হবে না? ধনিকতন্ত্র মন্দ হতে পারে, তা’ বলে ধনী মাত্রেই অমানুষ, ধনিকতন্ত্রের পরিবর্ত্তন সহসা তাদের ধনে প্রাণে না উৎসন্ন করে হবে না, এ অন্ধ একপেশো যুক্তি কোথা থেকে আসে?

 জোয়াহির লালজী কল্যাণকর জীবনের “good life”এর বলেছেন, সেটি আসলে কি বস্তু তা প্রকাশ করে বলেন নাই। কথাটাকে যা’ হোক করে শেষ করবার ত্বরায় তিনি বলেছেন, “এই good life” যে কি তার এখানে গবেষনায় ফল নাই, তবে অধিকাংশ লোকে এসম্বন্ধে একমত যে এই কল্যাণপ্রসূ “good life” এর জন্য স্বাধীনতা বা স্বতন্ত্রতা একান্ত আবশ্যক, জাতির জন্য জাতীয় স্বতন্ত্রতা এবং ব্যক্তির জন্য ব্যক্তিগত স্বাতন্ত্র্য। কারণ মানুষের প্রকৃতির যেখানটি আমরা চেপে দিই, সেইখানটিই হয়ে থাকে পঙ্গু ও বিকৃত, অর্থনীতিক দুর্গতি ছাড়াও তাতে প্রসব করে জাতীয় মনের ব্যাধি, তার বিকৃত ধারণা জনিত দুর্ব্বলতা।” জোয়াহির লালজী একথা স্বীকার করলে কি হবে, তিনি বোঝেন না, যে; এত সাধের মস্কো-মার্কা কম্যুনিজম্, ডিক্টেটরী চাপ ও শাসন ছাড়া আর কিছুই নয়। রুষের আদর্শ রূপ ঐ সাম্যবাদ সত্য ও খাঁটি হ’লে কি হবে, তার উপায় ও প্রয়োগ বিধিটি হচ্ছে ভুল; ও-দেশের নির্ম্মম ডিক্টেটরী ডাণ্ডা, সামরিক আদালৎ ও অগ্‌পু নামক করাল নিষ্ঠুর গুপ্ত পুলিশ লক্ষ লক্ষ মানুষকে চেপে সন্ত্রস্ত করে নির্ম্মম কলে ফেলে এক প্রকার standardised ছাপমারা কল্যাণ প্রসব করছে। স্বতঃস্ফূর্ত্ত স্বাভাবিক বিকাশ বলে সেখানে হয়তো বেশী কিছু নাই। জোয়াহির লাল ভারতকে এমনই একটা কঠোর শাসনযন্ত্রের পেষণ কলে ফেলতে চান। সুভাষচন্দ্রও চেয়ে ছিলেন তাই, তবে সে নিষ্পেষক কল্যাণ-যন্ত্রের নাম ফ্যাসিজম্, কম্যুনিজম্ নয়। ভারতে এই রক্তরাঙা চাপনযন্ত্র প্রবর্ত্তন করবার আগে পণ্ডিতজী একবার মস্কোয় গিয়ে তার mechanised কল্যাণের চাপটা হজম করে এলে ভাল হয়, হয়তো মস্কোর কালাপাহাড়রা তাঁকে একটা মধ্যবিত্ত মনোবৃত্তি প্রসূত মাকাল ফল বলে অচিরেই পরিত্যাগ করবে।

 অবশ্য নিছক মুক্তি বলে সংসারে কিছুই নাই, বন্ধন ও মুক্তি উভয়ে মিলে জীবনকে কল্যাণের অভিমুখী করে নিয়ে যায়। নদী থাকে তার উৎসের দিকে আর তার লক্ষ্য ও গন্তব্য ঐ সাগরের দিকে খোলা কিন্তু তা’ ছাড়া বাকি দুই দিকে উঁচু পাড় দিয়ে বাঁধা, তবেই সে নদী হয় খরস্রোতা। দু’ধারের পাড় ভেঙে সমভূমি করে দিলে নদী যায় ছড়িয়ে নিজেই নিশ্চিহ্ন হয়ে শুকিয়ে, অথবা দেয় প্লাবনে প্লাবনে পাশের গ্রাম নগর ভাসিয়ে। স্বাধীনতাও তেমনি, কতখানি চাপ ও বন্ধন মানুষের সইবে এবং কল্যাণ হবে, ততটুকু বন্ধন যে কোন গণতন্ত্রে বা শ্রেষ্ঠ শাসনতন্ত্রে থাকবেই। মানুষকে—অজ্ঞ ও কুসংস্কারান্ধকে কতকটা বুঝিয়ে কতকটা বাধ্য করে ক্রমশঃ নিয়ে যেতে হবে তার পূর্ণ কল্যাণের দিকে। জোয়াহির লালজী নিজেই স্বীকার করেছেন, “জাতির মাঝে সহযোগিতার সামর্থ্য ও সজাগ ইচ্ছাশক্তি চাই এবং সে ইচ্ছাশক্তি হবে নিজের কল্যাণের সম্বন্ধে সচেতন। আধুনিক জীবন এত জটিল হয়ে উঠেছে, জাতিতে জাতিতে এসেছে এমন আদান প্রদান ও পরস্পর নির্ভরের নিবিড় ঘনিষ্ট সম্বন্ধ, যে, সহযোগিতা বিনা কাহারও এক পা চলা সম্ভব নয়।” সুতরাং আদর্শ-ই এখন যথেষ্ট নয়, সেই আদর্শ প্রয়োগের সময় সহযোগিতার স্বাধীন ইচ্ছাকে ব্যাহত করলে আদর্শটিই ব্যর্থ হয়ে যাবে। যে কোন আদর্শ জীবনে রূপ নেয় নিয়মানুবর্তিতার পথে, স্বেচ্ছাচারে নয়; স্বেচ্ছাচার বা স্বৈরাচার মুক্তি নয়, উদ্দাম প্রবৃত্তির কাছে দাসত্বের নামান্তর মাত্র। মানুষ যত উন্নত হয়, মুক্ত হয়, ততই বন্ধন মেনে চলে, ততই তার পদক্ষেপ হয়ে আসে অন্য বহু প্রতিবেশী জাতির সহিত সমতালে অনুগামী, তাদের সকলের কল্যাণের ছন্দে বাঁধা।

 আমার মনে হয়, পণ্ডিত জোয়াহির লাল জাতির ব্যাধির সন্ধান ও পরিচয় ঠিকই দিয়েছেন, দিতে পারেন নাই ঠিক ঔষধ ও পথ্যের ব্যবস্থা। মার্ক্সের অর্থনীতিক আদর্শবাদের ছাপ জোয়াহির লালজীর মস্তিস্কে এত দুরপনেয় হয়ে পড়েছে, যে, তাঁর পক্ষে মানব জীবনের একটি পূর্ণ ছবি মানস চক্ষে ফুটিয়ে তোলা কঠিন হয়েছে। এই বিচিত্র মনপ্রাণ দেহাত্মক মানুষের জীবন বহুমুখী, শুধু টাকা আনা পাইয়ে তার সবটুকুর মূল নয়। “প্রাচ্য” এই কথাটির কোন অর্থ-ই জোয়াহির লাল বোঝেন না, কারণ “প্রাচ্য” জাতি বলতে আরবের বেদুইন, ভারতের হিন্দু, সাইবিরিয়ার মালভূমির যাযাবররা, মঙ্গোলিয়ার বন্য কৃষিজীবীরা, ঈশ্বরে অবিশ্বাসী নিছক নীতিবাদী কনফিউশিয় চীনারা—এ সকলকেই বুঝায়। এত বৈচিত্র্য যেখানে সেখানে প্রাচ্য প্রাণধারা বা প্রাচ্য সভ্যতা বলতে সুতরাং কিছুই নাই, প্রাচ্য যে অধ্যাত্মবাদী spiritual, এরও সুতরাং কোন অর্থ-ই নাই। তাঁর মতে এসিয়া বা প্রাচ্যের এত বৈচিত্র্যের মূল বা হেতু শুধুই অর্থনীতিক, ঐ কাল্পনিক পরমার্থটা হচ্ছে সাম্রাজ্যবাদীদের ছলাকলা —যার সাহায্যে তারা আপামর সাধারণকে কঠিন নিগড়ে বেঁধে রাখতে সমর্থ হয়েছে। কৃষ্টিগত ও জাতীয় পার্থক্য তিনি তবু মানেন, কিন্তু সেই পরমার্থের স্বর্ণসূত্রটি আদৌ মানেন না যা গোটা প্রাচ্যকে করেছে এক গোষ্ঠীর সহোদর ও আপন জন। অথচ তিনি অধ্যাত্মবাদী পরম নৈতিক মহাত্মাজীর ভক্ত শিষ্য, কোথা থেকে যে মহাত্মাজীর এতখানি প্রভাব তাঁর ওপর ক্রিয়া করে এ অনুভূতি জোয়াহির লালজীর নাই।

 মুস্কিল হয়েছে তাঁর চোখে মানুষের উদরটা হয়ে উঠেছে বিপুল আকার, জাতির জীবনের যত আলোড়ন বিলোড়ন, যত বাত্যা ঝঞ্ঝা ভূমিকম্প সবই হচ্ছে ঔদরিক ব্যাপার। মানুষ বেঁচে আছে নিছক উদরের জোরে, পেটে হেঁটে চলেছে গুটি গুটি মস্কোমার্কা পূর্ণ কল্যাণের এক অভিনব স্বর্গের দিকে। আর যাই ঘটুক, একথা ঠিক, যে, তাঁর ধারণায় পুরাতন গেছে একেবারে নিশ্চিহ্ন হয়ে মুছে, যে কোন রাজচক্রবর্ত্তীর তুরুক সওয়ার আর সে সপিণ্ডীকৃত পুরাতনকে ফিরিয়ে আনতে পারবে না। এই হচ্ছে আমাদের মস্কো-শিষ্য পণ্ডিতজীর মনোবৃত্তি, অথচ তিনি জাতীয়তা কংগ্রেস ইত্যাদি নানা কিছু মানেন বলে ঠিক কমিউনিষ্টও নন। তবে যে তিনি প্রকৃত পক্ষে কি তা’ তাঁর পক্ষেও বলা দুষ্কর।

 পুরাতন মরে থাকে আপত্তি নাই কিন্তু আমাদের আপত্তি হচ্ছে সেইখানে, যেখানে নূতন গণতন্ত্রের মুখোস পরে সেই অতি পুরাতন রাজার সেপাই রাজার মন্ত্রী ও উমরাহরা গড়ে তুলেছে নূতন এক মারণ ও পেষণ যন্ত্র। মানুষকে মেরে গুঁতিয়ে ছকবাঁধা জীবনের ঘরের নির্জীব খুঁটি করে নিয়ে মানবকল্যাণের দাবা যাঁরা খেলছেন তাঁরা কতখানি মুক্তি ও কল্যাণ প্রসব করবেন, বাহিরের কল্যাণের যন্ত্রে অন্তরের ছন্দ ও নিরাময়তা কতখানি আনতে পারবেন সেটা দেখবার জিনিষ। ইতিমধ্যেই মস্কোর সোভিয়েট তন্ত্র অনেকখানি রঙ বদলেছে, আজ সে পীড়ন ও চাপের বদলে শিক্ষাকে করেছে গঠনের বাহন, যষ্টিকে নয়; আজ সে আন্তর্জাতিক পরিষদে বসেছে সহযোগিতা করতে—ধণিক ও আমলাতন্ত্রীদের সঙ্গে; জাতীয়তাকে রুষ ফিরিয়ে আনছে ফাঁকা বিশ্বজনীনতার জায়গায়।

 জোয়াহির লাল আমাদের নেতাদের ব্যারিষ্টারী মনোবৃত্তিকে ঠাট্টা করেছেন, তাঁরা কথায় কথায় ‘পেপার কনষ্টিটিউশন’ ছকেন বলে, কারণ জীবন চলে আপন ছন্দে, ওঁদের কাগুজে কনষ্টিটীউশনকে ভ্রূক্ষেপ না করে। আমাদের মনে হয় জীবনের বহুমুখী গতিকে তিনি তাঁর লেখার মাঝে যত ভুল বুঝেছেন এত ভুল আর কেউ বোঝে নাই। তাঁর কংগ্রেসের পকেটে আছে ঐ রকমই স্বরাজের একটী কাগুজে খসড়া, তাঁর গুরুকূল ঐ সোভিয়েটের পকেটেও আছে আর একটি মানব-মস্তিষ্ক-প্রসূত পেপার কনষ্টিটিউশন যা’ তাঁরা রুষের ও আশপাশের বহু জাতির মুখে ঠেঙার গুঁতায় ভরে দিতে চান, তাদের গায়ের জোরে গলাধঃকরণ করাতে চান, তা’ তাদের কৃষ্টি ও জাতীয়তায় যত বৈচিত্র্য যত পার্থক্যই থাকুক না কেন।

 তাঁর “ভারত কোন পথে?” শীর্ষক লেখায় পণ্ডিত জোয়াহির লাল বলছেন, “গণসেনা বা জন-সাধারণ যে দিন রাজনীতিতে প্রবেশ করে সেই দিন রাজপ্রাসাদের কূট চক্রান্তের ও যত মজলিস প্যাক্ট ও বোঝাপড়ার আয়ুষ্কাল শেষ হয়ে যায়, অর্থাৎ রাজার মোড়লের মোড়লী যার ফুরিয়ে। আমরা এর সত্যতা কোথায়ও খুঁজে পাই না, কারণ আমরা দেখি মাথার তাজ আর পরিধানের বেশ বা উদ্দি বদলে নতুন নাম নিয়ে আসে সেই পুরাতন রাজা আর মোড়লই, যেমন বৌদ্ধ-যুগের পীতবস্ত্রধারী ভিক্ষুক হলো শাঙ্কর যুগের গৈরিকধারী সন্ন্যাসী। উচ্চচূড় রাজ প্রাসাদে না হোক, ছোট বড় নানা ইমারতে চলেছে ভাল মন্দ চক্রান্ত—মানুষকে পিটিয়ে সোজা করবার জন্য, প্রত্যেক দেশে চলেছে গণবিপ্লবের গুপ্ত সমিতির ফুসফুসানী, আর তারই সঙ্গে সোফিরেট রাশিয়ায় ও ধনিকতন্ত্রী গভর্ণমেণ্টে গভর্ণমেণ্টে পরম মিতালীতে “লীগ অব নেশনে” চলেছে কত না বিচিত্র বোঝা পড়া সল্লা পরমর্শ। চক্রান্ত ও বোঝাপড়া বিনা রাজনীতি সীতাহীন রামায়ণের মতই অপূর্ব্ব সোনার পাথরের বাটি, একথা কি জোয়াহির লালজী বোঝেন না? তিনি আবশ্যক হ’লে কংগ্রেসী ঘরোয়া বৈঠকে দুয়ার দিয়ে গুপ্ত পরামর্শ করেন না কি?

 ডিক্টেটর মুসোলিনীর মত পণ্ডিত জোয়াহির লালজী বিশ্বাস করেন, যে, জীবন স্রোত নানা ঘটনার সঙ্ঘাতে সঙ্ঘাতে এক নির্ম্মম ক্রূর ইচ্ছাশক্তির মত আমাদের ঠেলে নিয়ে চলেছে; শুধু এইটুকু পণ্ডিতজী বুঝতে চান না, যে, ঐ দুর্দ্দম ঘটনাচক্র শুধু মুসোলিনী ও পণ্ডিতজীকেই ঘোরাচ্ছে না, বেচারা ধনিক, সাম্রাজ্যবাদী, রাজরাজড়া ও মধ্যবিত্তদেরও সমান বেগে টেনে নিয়ে চলেছে। কাল-পুরুষ যে লেনিন ও কার্ল মার্ক্সের চেয়ে বহুগুণে শক্তিমান এবং অভ্রান্তদৃষ্টি; তার অপ্রতিহত গতি-মুখে কাল-পুরুষ এঁদের সব যন্ত্র বা অস্ত্ররূপে ব্যবহার করে তার কাজ হাসিল করে নেয়, এবং সে অস্ত্র ভোঁতা বা অকেজো হয়ে গেলে টেনে পথের পাশে আবর্জ্জনা স্তুপে ফেলে দেয়; কাল দেবতার অস্ত্রাগার অক্ষয় অফুরন্ত, নূতন তীক্ষ্ণধার অস্ত্রের সেখানে কখনও অভাব ঘটে না। পণ্ডিত জোয়াহির লাল নিজেই বলেছেন, “যখন জীবনের শোভাযাত্রা মহাসমারোহে চলে তখন তার মাঝে বিরাট মহাপুরুষদেরও ক্ষুদ্র দেখায়, সে জয়যাত্রার তুলনায় তাঁহাদের মহত্ত্ব কতটুকু?” আমার মনে হয় জীবনের এই জয়যাত্রার কখন বিরাম ঘটে নাই, এ শোভাযাত্রা চলেছেই, মস্কোর আজকার কৃত্রিম সাম্যের বাণী ছাপিয়ে এক দিন বৃহত্তর সামঞ্জস্যের বাণীও উঠবে সেই জয়যাত্রার শঙ্খনাদে।

 পণ্ডিতজীর “ভারত কোন পথে?” প্রবন্ধটি তিনি একটি অত্যন্ত মধ্যবিত্ত মনোবৃত্তি-সুলভ ভাব দিয়ে শেষ করেছেন। মনিষী বার্ণাড শ’র কথা উদ্ধৃত করে তিনি বলেছেন, যে, সুদূর হলেও দুষ্প্রাপ্য হ’লেও মহৎ এক আদর্শের স্বপ্নে বড় বিমল আনন্দ ও আত্মপ্রসাদ আছে। বার্নাড শ’ লিখেছেন, “তোমার প্রাণ যাকে মহান বলে স্বীকার করে নিয়েছে সেই ব্রতে নিজেকে ঢেলে দিয়ে নিঃশেষ করে ফেলার চেয়ে আনন্দ আর জগতে কি আছে? ‘সংসার আমাকে সুখ সম্মান দিল না’ এই ক্ষোভে দুঃখে জ্বরজ্বর স্বার্থের কীট হওয়ার চেয়ে যে কোন মহযজ্ঞের হবিঃ রূপে ভস্ম হয়ে যাওয়া সহস্র গুণে শ্রেয়।” প্রবন্ধের গোড়ায় পণ্ডিতজী যাকে মধ্যবিত্তের মনোবৃত্তি বলে উপহাস করেছেন, এও তো সেই আদর্শালুতা, সেই রহস্যের পিছনে অজ্ঞেয়ের পিছনে ছোটার আনন্দ ও ভাবোচ্ছ্বাস ছাড়া আর কিছুই নয়। তাঁর কাঁচা নতুন শেখা অর্থনীতিক বাতিকের পরদা ভেদ করে জোয়াহির লালজীর প্রাচ্যের প্রাণ মাঝে মাঝে আত্মপ্রকাশ না করে পারে না। তিনি বার্ণাড শ’র যে বাণী উদ্ধৃত করেছেন তা’ তাঁর এত সাধের নিছক টাকা আনা পয়সার মুক্তি ও শিশ্নোদরের তত্ত্বের ইমারৎ যে ভূমিশায়ী করে দিল সে কথা পণ্ডিতজীর বোধগম্য হয় নাই। বার্নাড শ’ গীতার নিষ্কাম ফলাকাঙ্ক্ষাহীন কর্ম্মের আনন্দই ব্যাখা করেছেন। সমাজ তাদের প্রাপ্য সুখ ও অন্নবস্ত্র দিল না —দলিত ও অবহেলিতের এই ক্ষোভ ও বেদনাকে রক্তমুখী ক্রোধবহ্নিতে জাগিয়ে তুল্‌লে কি জগতে এক মহা পুণ্য ব্রত উদ্‌যাপনের সেই আনন্দ লাভ হবে, না, নররক্তক্লিন্ন নরক আত্মপ্রকাশ করবে?

সোভিয়েটতন্দ্র কি বিশ্বব্যাপী গণ-আন্দোলন?

 ধনে কোন দোষ সংস্পর্শ নাই, মূলধন মানুষের পক্ষে এক অবিমিশ্র আশীর্ব্বাদ স্বরূপ। ধন তখনই অনিষ্ট করে যখন আমি তার অপব্যবহার করি, তাকে আমার প্রতিবাসীর অনিষ্ট সাধনে নিয়োগ করি। শ্রীরামকৃষ্ণ প্রমুখ ত্যাগপন্থী সাধকরা যেমন এক হিসাবে কামকাঞ্চন ত্যাগ করতে উপদেশ দিয়েছেন, শঙ্করাদি মায়াবাদীরা যেমন ধনকে সকল অনর্থের মূল বলেছেন, স্থূলদর্শী তরুণ কম্যুনিষ্টরা তেমনি ধন ও ধনিককে অন্য হিসাবে ঘৃণার চক্ষে দেখেছিলেন। অথচ ধনে কোন দোষ বা পাপ নাই, পাপ আছে আমাদের প্রাণে—ধনের জন্য দুরন্ত লোভে। এই অর্থগৃধ্নূ তাই প্রকৃত money-fiend বা ধন-যক্ষ।

 বর্ত্তমান সমাজের যত অশান্তি বিদ্রোহের মূল কারণ মানুষের দৈন্য ও ক্ষুধা সে বিষয়ে সন্দেহ নাই। কিন্তু একথা বললে ভুল বলা হবে, যে, এত যুগ পরে আজ মূক গণশক্তি জেগে সচেতন হয়ে আত্মোদ্ধার ও আত্মোন্নতির পথে পা বাড়িয়েছে। মূক গণশক্তি সর্ব্বত্রই সমান মূকই আছে, তাদের মধ্যে যেটুকু সাড়া বা জাগরণ দেখা যাচ্ছে তা’ হচ্ছে পণ্ডিত জোয়াহির লালজীর মত শিক্ষিত মধ্যবিত্তের তাড়নায় ও প্রেরণায়। কার্ল মার্ক্স বা লেনিন এবং তাঁদের অধিকাংশ অনুচরেরা বঞ্চিত শিক্ষিতেরই দল, এঁরাই যুগে যুগে দেশে দেশে মানব সমাজের শ্রেষ্ঠ ফলরূপে সকল আদর্শবাদের জন্মদাতা। এঁরা যখন জীবনের ভোগোপকরণে ও নিজ নিজ উন্নতির অবসরে বঞ্চিত হন, দৈন্যগ্রস্ত হন, তখনই জাগে নূতন সৃষ্টির মন্ত্র, সেই মন্ত্র মূক গণশক্তিকে কথঞ্চিৎ সচেতন করে নিয়ে তাদের সাহায্যে করে উন্নতির জয়যাত্রার নব পর্য্যায়ের সূচনা। গণশক্তি বাহন, এঁরাই অধিরূঢ় দেবতা।

 গণশক্তি বৈদিক যুগ থেকে আজ অবধি সমান অবহেলিত হয়ে রয়েছে, শিক্ষিতের ও উচ্চবর্ণের সমান দাসত্বে লিপ্ত আছে। ইলোরা, বাঘ ও অজন্তার গুহায় উৎকীর্ণ প্রাচীর-চিত্রে দেখা যায় এদের ঝুঁটিবাধা ভীত সন্ত্রস্ত যুক্তপাণি রূপ। ধনগর্ব্বিত অভিজাত শিক্ষিতের দলই রামায়ণ ও মহাভারতের বীরদল, যাঁরা তাঁদের অশ্বমেধে ও কুরুক্ষেত্রে দলিত উপেক্ষিত গণশক্তিকে ইন্ধন রূপেই ব্যবহার করেছেন, তাদের কিঞ্চিৎ দয়া দাক্ষিণ্য করা ছাড়া মানুষের পূর্ণ অধিকার কখনও দেন নাই।

 মূক ও বঞ্চিতের বেদনা ঐ ধনীর ও অভিজাতের স্বর্ণলঙ্কা অধিকার করবার স্পর্দ্ধা কখনও করে নাই, সে দৈন্য ও বেদনা নালী ঘায়ের মত সমাজ-শরীরে চির দিনই তলে তলে বিষপূঁজ উৎপাদন করে চলেছে। বর্ত্তমান যুগের বণিক-সভ্যতার তীব্র প্রতিযোগিতা ইতস্ততঃ বিক্ষিপ্ত ক্ষুধিতের পালকে সহরে সহরে জমা করেছে বলেই এ দৈন্য এত সুস্পষ্ট ও প্রকট হয়ে উঠেছে, সারা শরীরে যা’ চারিয়ে সংগোপনে ছিল সেই দূষিত ক্ষত এক জায়গায় পচা ঘায়ে জেগে ওঠায় মানুষের বিস্মিত দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। এই পুঞ্জীভূত দৈন্য ও অবনতি, সমাজ শরীরের এই উৎকট দুষ্ট ক্ষত জোয়াহির লালজীর মত মধ্যবিত্ত শিক্ষিতের শুপ্ত বিবেককে কষাঘাতে জাগিয়ে তুলেছে; কারণ জগতের যত আর্ত্তত্রাণের মহা যজ্ঞে এই মধ্যবিত্ত ও ধনীরাই চির দিন জুগিয়েছে ঋত্বিক। তারাই শতে শতে সহস্রে সহস্রে সোভিয়েটের রক্ত পতাকা তলে সমবেত হচ্ছে, তারাই দিচ্ছে মূক গণশক্তির মুখে বাণী, তাদের কুসংস্কারান্ধ অসাড় চক্ষে দৃষ্টি। এ ব্রত কি তাদের উদযাপিত হবে? শূদ্র কি এবার সত্য সত্যই জাগবে? লক্ষ বৎসরের শিক্ষায় দীক্ষায় বঞ্চিত অসংস্কৃত মূঢ় তাদের প্রাণে স্ফুরিত হবে কি মনীষা, তেজ, ধৈর্য্য? এত বড় সংস্কার কি এক পুরুষে হ’য়? এত দিনের অশিক্ষিত নারীকে শিক্ষা সাহচর্য্য দিয়েও এখনও কি আমরা পেরেছি তার মাঝে পূর্ণ নারীত্বের মহীয়সী প্রতিমাকে জাগাতে? সুতরাং এই লাল-ঝণ্ডা বহুদিন শিক্ষিত মধ্যবিত্তকেই বইতে হবে, এই শূদ্র-সংস্কার যজ্ঞের অগ্নিকে তাকেই রাখতে হবে অনির্ব্বাণ শিখায় জ্বালিয়ে, যাবৎ আমাদেরই সৃষ্ট অমানুষ মানুষ না হয়; অশিক্ষিত অসংস্কৃত কখনও সভ্যতার পতাকা উত্তোলিত রাখতে পারে না। সে শক্তি ও ধৈর্য্য তার বাহুতে নাই।

 ধনিকতন্ত্র ভাল হৌক মন্দ হৌক, যুগ যুগান্তের কলা সাহিত্য কৃষ্টির দ্বারা পুষ্ট সে ভাবধারা নবতর মহত্তর ব্যাপকতর ভাবধারায়ই রূপান্তরিত হতে পারে। তাকে বলের দ্বারা নষ্ট করে লাভ নাই, মানুষের মন কখনও অসির দ্বারা জয় করা যায় না। বঞ্চিত মধ্যবিত্ত ও মূক শূদ্র এই দুই মহাশক্তি যদি এক হয়, ত।’ হ’লেই মানুষের সংঘবদ্ধ লোভের এই শোষণ-যন্ত্র একদিন অচল হতে পারে, মানুষের মুক্তির দিন আসন্ন হতে পারে। সে অসাধ্য-সাধন সম্ভব করতে হ’লে সমাজ ও রাষ্ট্রের মনকে নূতন ছাঁচে ঢালতে হবে, সত্যের ও ভাবের অসিতে কাটতে হবে অসত্য ও কপটতার ঝুটা সভ্যতাকে। নরমেধ যজ্ঞে সে কল্যাণ আসবে না, অসুরে কখনও এ জগতে বৈকুণ্ঠ রচনা করে নাই, করবে না। ভারত চিরদিনই তপোভূমি, ইউরোপ হচ্ছে কর্ম্মভূমি; এই উদার ব্রহ্মবিদ্যার দেশেই বপন করতে হবে সত্যকার অহিংসার ও মানবপ্রেমের বীজ, এইখানে জীবনে সেধে দেখাতে হবে দৈবী শৌর্য্যের পরাক্রম, সংহতি ও সহযোগিতার অপূর্ব্ব সামর্থ্য ও সাফল্য। হিংসা ও হত্যাকে যদি সংঘবদ্ধ করে মানুষ এতখানি করতে পারে, তা’ হলে সংঘবদ্ধ প্রেমে ও ঐক্যে আরও কতখানি হয়? মানুষের ভাগ্য নিয়ে অসুর করেছে খেলা, এখন দেবতার আসছে পালা, ভারতের মুক্তি-অভিযানে সেই ধর্ম্মরাজ্যকে তুলতে হবে গড়ে।

 শুধু সাম্য বা শুধু বৈষম্যই মানুষের জীবনের ভিত হতে পারে না; তার প্রকৃত ভিত্তি হচ্ছে সামঞ্জস্য,— সুছন্দ ও সুসমঞ্জস প্রকাশ। সত্যকার সাম্য হচ্ছে অন্তর্নিহিত সূত্র, যা’ জীবনের সকল বৈচিত্র্য ও বৈষম্যকে “সূত্রে মণিগণাইব” গেঁথে তুলেছে। বৈষম্যই সৃষ্টির প্রাচুর্য্য—তার অনিবার্য্য ধর্ম্ম, কিন্তু সাম্যের ও ঐক্যের কোলে তার প্রকৃত সমন্বয়। সকল খণ্ড স্বার্থগুলিকে এক ব্যাপক পরার্থে, দেশার্থে, জাতীয় কল্যাণে মিলিয়ে নিতে হবে, যাতে সকল বর্ণ সকল শ্রেণী সকল পার্থক্য ও বৈশিষ্ট্য পায় বিকাশের ও চরিতার্থতার সমান অবসর। দেশের, গভর্ণমেণ্টের ও কংগ্রেসের নেতাদের সামনে রয়েছে এই কঠিন ব্রত। এতগুলি বিরোধী স্বার্থকে একস্বার্থে মিলিত করা—এক লক্ষ্যে সিসৃক্ষু করা শক্ত কাজ, একথা বলে লাভ নাই। কোনও মহৎ ও পুণ্য ব্রতই সহজ নয়, সুখসাধ্য নয়। আমার বিশ্বাস ভারতকে নরহত্যা, রক্তপাত বা সঙ্ঘবদ্ধ নরমেধের জন্য গঠিত ও প্রস্তুত করার চেয়ে এই পুণ্য চেষ্টায় উদ্বুদ্ধ ও গঠিত করা ঢের সহজ; কারণ ভারতের মনীষা ও ভাবধারার অনুকুল হচ্ছে মৈত্রী ও করুণা, লুণ্ঠন ও হিংসা বা প্রতিহিংসা নয়।

 এই নূতন মন্ত্রের চাই ঋত্বিক, হোতা ও দিব্য সেনানীর দল। এই অপূর্ব্ব গঠন-সেনার সৃষ্টি কর, এ যজ্ঞ উদযাপনে জীবন পণ কর, দেখবে ভারত রূপান্তরিত হয়ে যাবে, সঙ্গে সঙ্গে গোটা মানব পরিবার যাবে সেই অমল ধবল জ্যোতিতে রঙে জ্যোতিস্মান হয়ে। মস্কোর রক্তরাঙা বিপ্লবের ও বল প্রয়োগের নীতি, সেই উৎপীড়নের ও চাপের নীতি ভারতকে বা জগৎকে রক্ষা করতে পারবে না, তা’ শুধু দেবে মানুষের মনকে দাবিয়ে বিকৃত ও জিঘাংসু করে; তার ফলে সারা জগৎ জুড়ে জাগবে হিটলার ও মুসোলিনীর প্রবর্ত্তিত ফ্যাসিজমের মত সমান জিঘাংসু প্রতিক্রিয়া। যে মন ভাবতে পারে না হিংসা বা উৎপীড়ন বিনা কল্যাণ সাধনা, সে মনের কোথায় একটা twist বা বিকৃতি এসে গেছে। যুদ্ধ ও রক্তপাতই যার কাছে হয়ে আছে মুক্তির অপরিহার্য্য উপকরণ, তার মানবতাকে করেছে পশুত্বই গ্রাস। এ পাপ বীজ একবার বপন করলে নূতন সদৃশ পাপেরই করে সৃষ্টি, এ আগ্নেয়গিরির চুড়ায় প্রেমের ঘর বাঁধা বাতুলতা বই আর কিছু নয়।

 ভারতবাসী ও ইংরাজদের মধ্যে যাঁরা চিন্তাশীল ও দূরদর্শী তাঁদের দৃষ্টি আমি তাই বার বার এই দিকে আকর্ষণ করেছি; এই সোজা সত্যটা তাঁদের বোঝাতে চেষ্টা করেছি, যে, মানুষের বৈধ রাজনীতিতে যদি একবার হিংসার বাঁকা অস্ত্র—যথা হত্যা, লুণ্ঠন ও দাঙ্গার প্রবর্তন করা যায়, তা’ হ’লে এ গুণ্ডামী স্বরাজেও থামবে না; মানুষের বিরোধের বৈধ সমাধানের সকল পথ ক্রমশঃ কণ্টকিত ও রুদ্ধ হয়ে আসবে। কারণ হিংসার আছে প্রতিহিংসা, নিষ্ঠুরতা যে আক্রান্তের মাঝে জাগায় নিদারুণ ক্রোধ। কারণ পাপ বা অকল্যাণ আগুনের মত, সংক্রামক, ব্যাধির মত দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। আমরা যারা ভারতে সকল জাতি ও বর্ণের সুখের রাজ্য গড়তে চাই, তারা এ পথে চললে শীঘ্রই পড়বো একটা হানাহানির মাঝ খানে, ক্ষিপ্ত যুদ্ধরত মানুষের গুলির মুখে। এ দক্ষযজ্ঞ একবার আরম্ভ করলে থামান কঠিন হবে, কারণ এর গুপ্তচক্রীরা চির দিনই থাকে সংগোপনে, চোখের অন্তরালে। মানুষের মাঝে যে ধ্বংস-পাগল ক্ষুদ্র মর্কট আছে, সে ভালবাসে স্বর্ণলঙ্কা দাহ করতে, মরবার বেলায় মরে নিরীহ শান্তি প্রয়াসীর দল। সব কিছু ভেঙে, উজাড় করে, সবাইকে উৎসন্নে দিয়ে, মানুষের অস্থি কঙ্কালের পাহাড় জমিয়েই সেই মর্কটের আনন্দ। এই দক্ষযজ্ঞের দানা ঘুরে ফিরে জগতে আসে; অসভ্য যুগে সে এসেছিল ধনুর্বাণ হাতে ব্যাধের বেশে, সভ্য যুগে সে এসেছে মানবকল্যাণের ঠ্যাঙাড়ে সেজে। নারীর সতীত্বের নামে অন্তঃপুরের পিঁজরা ও সহমরণের চিতা এক দিন এরাই সাজিয়েছিল, এক অনন্ত সম শান্ত ভগবানের নামে কাফের ও ম্লেচ্ছ বধ করে সহীদ হতে এবং সুলভ স্বর্গলাভ করতে এই মর্কটই এক দিন মানুষকে শিখিয়েছিল। জগতের শান্তি ও কৃষ্টি অক্ষুণ্ণ রাখতে যদি কখনও কাহাকেও দমন ও শাসন করতে হয় তো সে মানুষের অন্তরের এই ধ্বংসপাগল কপিরাজকেই।

 দেশের নেতৃস্থানীয় মানুষের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সহানুভূতি পেয়েই দেশকর্ম্মীদের অন্তরে এই ধ্বংসের দৈত্য বেঁচে বর্ত্তে থাকে। মিষ্টার এইচ কে হেল্‌স্‌ অহিংসার ঋষি মহাত্মা গান্ধীকে অনুরোধ করেছিলেন সন্ত্রাসবাদের কেন্দ্র মেদিনীপুরে যেতে, তাঁর প্রভাব সেখানে বিস্তার করে এই হিংসার বীজ উন্মূলিত করতে। মহাত্মাজী তদুত্তরে বলেছিলেন, গত চল্লিশ বছর ধরে তাঁর অহিংস মন্ত্রে ব্যক্তিগত অচলা নিষ্ঠাই যথেষ্ট প্রমাণ, তিনি আর কোন প্রত্যক্ষ প্রমাণ দিতে প্রস্তুত নন। মেদিনীপুরে তিনি যেতে নারাজ, কারণ সন্ত্রাসবাদীদের উপর তাঁর কোন প্রভাব নাই! মহাত্মাজীর একথার আমি কোন অর্থ খুঁজে পাই না। সে কেমন অহিংস সত্যাগ্রহী যে বাধা পেয়ে ও মানুষের গোঁয়ার্ত্তামী দেখে নিজের ব্রত উদ্‌যাপনে পিছিয়ে যায়? এই অহিংস সংগ্রাম যখন বিদেশী রাজশক্তির বিরুদ্ধে প্রযুক্ত হচ্ছিল তখন মহাত্মাজী দেশের হাজার হাজার ছেলে মেয়েদের পুলিশের লাঠি ও মিলিটারীর সঙ্গীনের মুখে বুক পেতে দাঁড়াতে শিখিয়ে ছিলেন, আর আজ সেই হিংসা যখন দেশের দিক থেকে বিদেশীর উচ্ছেদের জন্য উঠছে তখন তিনি কিংকর্তব্যবিমূঢ়! সত্যকার অকপট অহিংস সত্যাগ্রহী যিনি তিনি সকল ক্ষেত্রে সর্ব্বঅবস্থার তাঁর অপরাজেয় প্রেমের ও করুণার শক্তি নিয়ে হানাহানির মাঝখানে গিয়ে দাঁড়াবেন। হিংসায় ও জাতিবিদ্বেষে যতই হবে আকাশ সমাচ্ছন্ন, ততই সে প্রেম-সূর্য্য জ্বলবে তার অপ্রতিহত ভেজে। শুধু মহাত্মাজীরই ত্রুটি আছে তা’ নয়, দেশের বহু নেতা মুখে দেখান অহিংসার ভাব, অন্তরে শ্রদ্ধা করেন ইংরাজঘাতক সন্ত্রাসবাদীর মোরিয়া সাহসকে, তথাকথিত আত্মত্যাগকে। অহিংসা তাঁদের কাছে একটা রাজনীতিক চাল বা অস্ত্র—a political expediency মাত্র।

 আসলে প্রকৃত অহিংসা হচ্ছে একটি পরমার্থ সত্য, যোগীজনসুলভ গুণ, তা’ তুচ্ছ নীতিবাক্য নয়। নীতিবাদী মহাত্মাজী এই অপরাজেয় প্রেমশক্তিকে চিনেন না। বনের হিংস্র বাঘকে ধ্যানস্থ যোগীর পদলেহন করতে আমরা শুনেছি, কারণ আত্মার শক্তি ও বিভূতিস্বরূপ সেই অহিংসা ও করুণা ইচ্ছামাত্রেই বা স্পর্শমাত্রেই হিংসা ও ক্রুরতাকে পরাস্ত করতে পারে। সেই Soul- force বা প্রেমশক্তিকে অকপট অবিমিশ্র রাখা এবং জীবনের কাজে— সমাজে ও রাজনীতিতে কার্য্যকরী করা সহজ নয়, আজ পর্য্যন্ত মানব-সমাজ এই সব পরমার্থ সত্যকে পুঁথিগত, নীতিগত ও ধ্যানগত করে রেখেছে, তাই মুখে আমাদের সদাই এই সব উচ্চ বাণী অথচ জীবন চলে অধোগামী হয়ে। ব্যক্তির জীবনে কোথায়ও কোথায়ও ধর্ম্মের সত্যগুলি- কিঞ্চিৎ কার্য্যকরী হলেও জাতির জীবনে এপর্য্যন্ত রাগ দ্বেষ স্বার্থ ও কামের কৃষ্ণশক্তিই প্রধানতঃ জয়লাভ করেছে। মহাত্মাজী এই সব অপূর্ব্ব সত্য—অনুপম শুভ্রভেজের নাম মাত্র নিয়ে খেলা করেছেন, এদের সঙ্গে কোন সাক্ষাৎ পরিচয়ই তাঁর নাই। অহিংসা, মৈত্রী, করুণা, প্রেম ফাঁকানীতি বাক্য নয়, যে, তাদের নিয়ে বক্তৃতামঞ্চ থেকে ফেনিয়ে ফেনিয়ে মানুষকে পরিবেশন করলেই সে সব ধ্যানগম্য ও সাধনগম্য শক্তি জীবনে কার্য্যকরী হবে।

 তাঁর নীতিমূলক ঐ মানস অহিংসাও তিনি সেই দিন কার্য্যতঃ ত্যাগ করেছেন যে দিন তিনি পিছিয়ে গেলেন এই বলে, যে, সন্ত্রাসবাদীদের উপর তাঁর কোন প্রভাবই নাই। ব্রিটিশ রাজের এত বড় সশস্ত্র সুশৃঙ্খল শক্তির সম্মুখীন হ’তে যে অহিংস সত্যাগ্রহী ইতস্ততঃ করে নাই তার মুখে একথা খাটে না। মানুষের স্বার্থপর দুর্ব্বল মন যে পরমার্থ সত্যকে নিয়ে ও বড় বড় আদর্শকে নিয়ে কি লুকোচুরী খেলে এই তার প্রমাণ। প্রকৃত সত্যের যে সন্ধানী, অহিংসার যে সাধক, সে চিরদিনই সর্ব্ব অবস্থায়ই তাই। মহাত্মাজীর প্রচারিত অহিংসা শুধু পরমার্থ সত্য নয়, তিনি জাতীয় জীবনের মন্ত্ররূপে তা’ দিয়েছেন, বহু দিন পর মানুষের ইতিহাসে এই প্রথম ব্যাপক গোষ্ঠীগত জীবনের গতিতে তাকে কার্য্যকরী করবার সংকল্প করেছেন; সুতরাং জাতির সকল কার্য্যে, আপন পর সকলের সঙ্গে সব ব্যবহারে মানবতার এই মহত্তর মন্ত্রকে রূপ দেবার প্রয়াস পেতে হবে, পরমার্থ সভ্যতার এই উচ্চস্তরে রাজনীতি, সমাজ, বাণিজ্য, শাসন সমস্তকে তুলে রূপান্তরিত করতে হবে। ভারতের অন্তর-দেবতার মনীষা ও প্রেরণা এই উজ্জল মন্ত্র ও তাহার ঋত্বিক মহাত্মাজীকে তার জীবন-যজ্ঞাগ্নি থেকে তুলে ধরেছে। এখানে দুর্ব্বলতা বা কর্ত্তব্যচ্যুতি মানে অধর্ম্মাচরণ। একবার এ অপূর্ব্ব মন্ত্র দিয়ে, প্রচার করে, এমন ভাবে জীবনে গ্রহণ করে ভারত আর পিছু হটতে পারে না। দেশের নেতারা যাঁরা ভারতের সন্তান, এই ঋষিপদধুলিপূত তপোভূমির সন্তান বলে গর্ব্ব করেন তাঁদের প্রাণপণে এই অমল ধবল পুণ্য ধ্বজা দুই হাতে তুলে ধরে রাখতে হবে; ভারতের রাজনীতিক জীবনের, অর্থনীতির, বাণিজ্যের সব কর্ম্ম-পন্থাগুলিকে এই সত্যের আলোয় ঢেলে সাজতে হবে। এ ব্রত কঠিন বললে চলবে না। ভারতে এত দিন যোগীরা ও সন্ন্যাসীরা তাদের ব্যক্তিগত জীবনে ও সাধনায় অহিংসা, সমতা ও নিষ্কামতা অভ্যাস করেছেন, এখন এসেছে জাতির সমষ্টিগত সাধনার পালা। ব্যক্তির জীবনে এই সাধনা যতই বড় হউক, তা’ ব্যর্থ হয় যদি তার আবেষ্টন তার পারিপার্শ্বিক থাকে মলিন স্বার্থদুষ্ট, যদি তার দেশ সমাজ ও জাতি চলে ক্রুরতা, হিংসা ও উগ্র সঙ্কীর্ণ কামনার পথে। শ্রীচৈতন্যের প্রেম তাই নেড়ানেড়ীর খঞ্জনীতে আবদ্ধ থেকে পঙ্কিল হয়ে নষ্ট হ’লো, শ্রীরামকৃষ্ণের সর্ব্বধর্ম্মসমন্বয় —“যত মত তত পথ” তাই জাতীয় জীবনে আজও কোন ছায়াপাত করতে পারলো না, হিন্দুমুসলমান সমস্যা ও জাতিভেদ তাই আজও সমান দ্বেষ-দুষ্ট হয়ে রয়ে গেল।

 দেশের নেতাদের কর্তব্য দেশের তরুণদের জীবনে নূতন মন্ত্র, নবপ্রেরণা ও জ্বলন্ত বিশ্বাস গড়ে তোলা; তাদের শেখানো, যে, এক ছটাক গঠন ও সহযোগিতা দশ বিশ মন বাক্য, উচ্ছ্বাস ও ভাঙনের সমতুল্য। গঠনের পথেই আসে সত্যকার ধ্বংস, আমোঘতর সৃষ্টি। গঠনের পথেই ক্রমশঃ মানুষ চেনে মানুষকে, তার অন্তরের দেবতাকে। আমাদের নেতাদের সঙ্কীর্ণ স্বার্থপর মন দেশের ত্যাগী ভাবুক তরুণদের পথ দেখাতে পারে না, বিশ্বাসের নব বল দিতে পারে না, তাই তারা নৈরাশ্যবাদের কাঁটা–বনে পথ খুঁজতে নেমে পড়ে।