ভারত কোন্ পথে?/ভারত কোন্ পথে?
ভারত কোন্ পথে?
মুক্তির মায়া
ব্যাধের গুলিতে আহত হরিণী চলেছে একটি রক্তের রাঙা রেখা এঁকে গভীর দুর্ভেদ্য হরিত বনের মাঝে, মাঠের পথে, নদীর তীরে তীরে, কাশ বনের কোলে কোলে। বিন্দু বিন্দু চুঁইয়ে পড়া সেই তাজা রাঙা রক্ত চলে গেছে এঁকে বেঁকে গাছের ঘন সবুজ পাতায়, তৃণের দলে, কাশের সাদা ফুলের গায়ে, শান্ত সুখমগ্ন আনন্দ-নিবিড় প্রকৃতির বুকে। এই হচ্ছে মানুষের সভ্যতার ইতিহাস। তার মুক্তির—সর্ব্বাঙ্গীন কল্যাণের তৃষ্ণাই তাকে করেছে আহত। সেই উদগ্র লুব্ধ বাসনাই হচ্ছে ব্যাধ যার নির্ম্মম বাণে মানুষের রক্ত ঝুঁঝিয়ে পড়ছে আজ এই দশ বিশ হাজার বছর ধরে। সে মুক্তি কিন্তু এলো না, সে রক্তক্ষরণও মানুষের থামলো না, সে ক্ষত মানুষের আজও শুখালো না। কারণ তৃষ্ণা যে মায়া, সে যে পথ ভুলায়, অন্ধকার রাত্রির বুকে মাথায় আগুণের পাত্র নিয়ে ডাকিনী সেজে সে যে মানুষকে বিপথে টানে, সে যে মরীচিকা। সীতাহরণের আয়োজনে সে যে স্বর্ণমৃগ, সোণার দেহখানিতে তার রূপের দীপ্তি হেনে সে ছুটে চলে বনের কোলে কোলে লুব্ধ গৃধনু শ্রীরামচন্দ্রকে ভুলিয়ে নিয়ে রাক্ষসকে সীতাহরণ করবার অবসর দেবার জন্যে। শ্রান্ত অধীর স্বেদসিক্ত রাম যখন বাণের মুখে বিঁধে সে মায়াহরিণকে মারে, জয়োল্লাসে এগিয়ে গিয়ে ধরে, তখন অট্ট হেসে সে মায়া বলে যায় তার ছলনার কথা। এই হচ্ছে মানুষের করুণ ট্র্যাজেডি-তার মুক্তি রচনার ব্যর্থ ইতিহাস, তার অশ্রুর মহাকাব্য।
কি ব্যাকুল কি পাগল তার সে চাওরা! কত সমাজ, কত রাষ্ট্র, কত ধর্ম্ম—কত অপূর্ব্ব মায়াপুরী মানুষ গড়েছে, ভেঙেছে, আবার নতুন করে অভিনব করে গড়েছে,—কত না আশার আশায়, কত না ক্রুদ্ধ ক্ষুব্ধ ব্যর্থ নিরাশায়। এক একবার যুগান্তের বিপুল প্রয়াসে কঠিন দৃঢ় করে গড়া ভাবের তাজমহল—আদর্শের স্বর্ণকিরীটিনী লঙ্কা ভাঙতে মানুষের রক্তে বসুধা পিছল হয়েছে, শবের পাহাড় গড়েছে, নারী-মেধ শিশু-মেধের ধোঁয়ায় নির্ম্মল আকাশ করেছে মলিন। আবার কত সার আকাঙ্ক্ষার তীব্র ব্যাকুলতা নিয়ে স্বপ্নালু মানুষ কোমর বেঁধে লেগে গেছে নব সৃষ্টির গলদ্ঘর্ম্ম প্রয়াসে—নতুন সমাজ গড়তে, অভিনব রাষ্ট্র রচনা করতে, মহানতর মুক্তির ধর্ম্ম আনতে। মুক্তি তার যে না হ’লেই নয়, বাঁধন তাকে যে বেদনা দেয়, সব দিক দিয়ে ব্যর্থ করে তোলে; জীবনের প্রতি ক্ষেত্রে, দেহ মন প্রাণের প্রতিটি ক্ষুধায়, অন্তর বাহিরের সব বিকাশে, সকল রূপ নেওয়ায়, ফোটায় তার যে চাই অবাধ অধিকার। নিজের জীবন নিয়ে নিজের খেলাটি খেলা, নিজের মনের মত করে বেঁচে থাকা— freedom to live one's own life, এই হচ্ছে তার সব চেয়ে বড় বেদনা, সব চেয়ে বড় কামনা, সব চেয়ে বড় অধিকার। অথচ এইটুকু নিয়ে কত টানাটানি, কত কাটাকাটি, কত দলন, পীড়ন, বিপ্লব, বিদ্রোহ, যুদ্ধ, নরহত্যা!
কিসে মানুষের ভাল হয় আজও তার সুষ্ঠু মিমাংসা হ’ল না, আদর্শের সংঘর্ষে শুধু নরমেধই জমে উঠলো, শুধু পাষাণস্তম্ভ ফেটে নখদন্তে ভীষণ নৃসিংহ-রূপই বার বার মানুষ আবাহন করে করে বাহির করলো, দ্বেষ হিংসা রাগ অভিমানে এমন শীতল শান্তরস সুখনিবিড় আকাশ বাতাস প্রকৃতি হয়ে উঠলো কালো। সভ্যতার শিশুকাল থেকে এই বর্বরতা চলে আসছে, মানুষের রক্তে অভিষিক্ত হয়ে মানুষ বনছে রাজা, কুরুবংশ ধ্বংস করে উঠছে নব নব পঞ্চপাণ্ডবের রত্ন সিংহাসন। ধরে, বেঁধে, মেরে, উচ্ছন্ন করে, দলনে পীড়নে অত্যাচারে পিষে মানুষ করছে মানুষের কল্যাণ। এই মানব-কল্যাণের গুণ্ডামীতে আপন পর সবাই সমান, স্বদেশী বিদেশী সব চেঙ্গিজ খাঁ তৈমুর লঙ্গের একই চেহারা, সব নরমেধেরই অন্তিম লক্ষ্য শান্তি স্থাপনা, সুশাসন, মানব কল্যাণ। হায় রে মানব কল্যাণ!
তাই এই সব দেখে এক একবার মনে হয় মানুষ কি সত্যই সভ্য? একটুখানি আঁচড়ে যার বাইরের রঙ ও জলুস চটে গিয়ে অন্তরের পশু বিকট দংষ্ট্রা বার করে বেরিয়ে পড়ে সে মানুষ কি সত্য সত্যই শিক্ষিত? এই আত্মঘাত আত্মদ্রোহই কি মানুষের চিরকালের অদৃষ্ট ও ভবিতব্য? প্রেমের ধর্ম্ম প্রচার করতে এসে যীশু কি চিরদিনই ক্রুশবিদ্ধ হবে, চিরদিনই মানুষের মদমত্ত সভ্যতার বুকে পথ-রেখা এঁকে চলে যাবে মানব-প্রেমের সহিদের রক্ত? প্রেম, মমতা, মানব-প্রীতি কি তবে দুর্ব্বলতা? মুক্তি কি তবে শৃঙ্খলের পীড়নেরই নামান্তর?
কিন্তু ভেবে দেখলে বোধ হয় সত্য ও-রকম একপেশে নয়। এই সুন্দর কুৎসিৎ, কঠোর কোমল, ভীষণ মধুর, হিত অহিত সব নিয়ে যে সোণার সূতোয় গাঁথা মালা সেই বুঝি আসল সত্য। শক্তি বাদ নিয়ে শুধু প্রেম ব্যর্থ, প্রেম বাদ দিয়ে শুধু শক্তি রাক্ষসী মায়া; সংহার বাদ দিয়ে শুধু পালন শিবহীন সৃষ্টি—দুর্ব্বলতাই তার অনিবার্য্য পরিণাম। সৃষ্টিকে বাদ দিয়ে শুধু ধ্বংস ভূতের নৃত্য, শক্তির সেখানে ছন্দহারা ডাকিনীর রূপে প্রকাশ। পুণ্য ও সদাচারের জন্য লুব্ধ নীতিধর্ম্ম সত্য নয়, কল্যাণের আর অকল্যাণের দৈত্য সমান কালো, সমান কুৎসিৎ।
প্রকৃত ভারত কোথায়?
বাংলার ও ভারতের তরুণদের সম্মুখে রয়েছে এক মহান অসমাপ্ত ব্রত—এই বিশাল জাতি-গোষ্ঠীর জাতি-পরিবারের সর্ব্বাঙ্গীন উন্নতির ব্রত। এই অসমাপ্ত ব্রতের তাগিদ, এই ভাবী উন্নতির প্রেরণা তোমাকে আমাকে পাগল করেছে; তাই আজ আমি স্বরাজী, তুমি বিপ্লববাদী, সে অসহযোগী আর একজন কম্যুনিষ্ট। কিন্তু যে দেশকে আমরা পূজা করি, যে বাংলা বা ভারতের কল্যাণের আমরা যোদ্ধা, কোথায় সে সত্যকার ভারত? আমাদের শিক্ষিত বাবুদের সভায়, আমাদের ইংরাজি-নবীশের কংগ্রেস মণ্ডপে, আমাদের রাজনীতিক তামাসার শোভাযাত্রায় কি সে ভারতকে কখন দেখেছ, খুঁজে পেয়েছ? সত্যকার সে ভারত নিদ্রিত মহানাগের মত পড়ে আছে—জীবনের গতি হারিয়ে, অসাড় হয়ে—এই মহাদেশের বন নদী পর্ব্বত জুড়ে হাজার হাজার লক্ষ লক্ষ গ্রামের জীর্ণ পর্ণকুটীরে কুটীরে। তাদের কাছে গিয়ে তাদের পার্শ্বে একবার দাঁড়িয়ে অনুভব করে দেখলে দেখতে পাই, আমাদের সভ্যতা ও তাদের শত শতাব্দি সঞ্চিত মুর্খতা ও অজ্ঞানে কতখানি তফাৎ, আমাদের বাবুয়ানার প্রাচুর্য্যে আর তাদের বীভৎস্ব নগ্নতায় কি পার্থক্য! সমাজের আঁস্তাকুড়ের আবর্জ্জনা তারা আমাদের শিক্ষিত ভদ্রলোকের ভাষা বোঝে না, আমাদের আশা আকাঙ্ক্ষার স্বাদ জানে না। ভারতের শতকরা সেই নব্বই জনই সত্যকার ভারত, সত্যকার দেশ। আমরা মুষ্টিমের শিক্ষিত সমাজ সেই আবদ্ধ জলের ভাসমান শৈবাল মাত্র।
তারা কি কখনও আমাদের রামমোহন, আমাদের বিবেকানন্দ, আমাদের মহাত্মা গান্ধীর নাম শুনেছে? তাদের জড় মনের কাছে আমাদের লেনিন, আমাদের রবীন্দ্র নাথের কি কোনও অর্থ হয়? তারা কি বোঝে আমাদের ফেডারাল ভারতের কনষ্টিটিউশন, মহাত্মাজীর স্বরাজ আর জওহরলালের গণতন্ত্রের কোথায় পার্থক্য? তাদের ক্ষুধায় ও দৈন্যে বিকৃত মস্তিষ্কে আমাদের এই সব বড় মানুষ ও মহাপুরুষেরা উপকথার দৈত্য বা হুরী পরীর মতই ভালীক অবাস্তব ব্যাপার। তাঁদের অনেকের সম্বাদ তারা রাখে না, মহাত্মাজীর মত দু’একজনের নাম মাত্র তারা শুনেছে। তাদের গ্রাম্য বট অশ্বত্থের তলার মাঝে মাঝে ত্রিশূলধারী জটাজুট সন্ন্যাসী এসে বসে। কোন এক অজানা মুক্তির আশায়, আধি ব্যাধি দুঃখ দৈন্য মোচনের দুরাকাঙ্ক্ষায় তারা এসে ভয়ভক্তি ভরে ঐ সাধুর কাছে জড় হয়। জগতের চির অনাদৃত আর্ত্ত—তাদের কাছে মহাত্মাজীর কল্পিত স্বরাজও ঐ অজানা অস্পষ্ট ত্রিতাপহারী মুক্তিরই সামিল। তারই মত এক অবাস্তব স্বপ্ন।
তবু আমাদের মত শিক্ষিত ইঙ্গবঙ্গ বাবু-নেতার চেয়ে মহাত্মাজীকে তারা বোঝে ভাল; তাঁর নগ্ন দেহ কৌপীন ধারণ এবং ধর্ম্ম ও অহিংসার কথা তাদের কাছে অতখানি প্রহেলিকা নয়। রাজনীতিক নেতার চেয়ে ত্যাগের মূর্ত্তি—অহিংসা অস্পৃশ্যতা ও ধর্ম্মের ঋষি তাদের কাছে অনেক সহজ-বোধ্য বস্তু। “ক্ষুধাই ক্ষুধিতের ড্রিল সার্জ্জেণ্ট” সাম্যবাদী জওহরলালজীর একথা কথঞ্চিৎ সত্য হতে পারে, সে কেবল আজকে রাশিয়ার সাম্যবাদ আদর্শরূপে আমাদের শিক্ষিত সমাজের চোখের সামনে এসেছে বলে। কিন্তু শ্রীরামচন্দ্রের রাম রাজত্বের যুগ থেকে আজ অবধি ভারতের শতকরা নব্বই জন দীন দরিদ্র চাষাভূষা এই অসহ্য ক্ষুধার তাড়না মূকধরিত্রীর মতই সহ্য করে এসেছে। অভাব দৈন্য তাদের কখনও রক্তপিপাসু হিংস্র পশু করে তোলে নি। এই দুরপনেয় দৈন্য সত্ত্বেও অন্তরাত্মার ক্ষুধা যুগযুগান্তর ধরে তাদের করেছে অজন্তা তাজ ও মাদুরার শিল্পী, কি এক অব্যক্ত রূপ ও সুষমার প্রেরণা তিল তিল করে তাদেরই হাতে গড়ে তুলেছে ভারতের অনুপম কলা, শিল্প ও কৃষ্টির সভ্যতা। টাকা দিয়ে শিল্পীকে, কবিকে, ঋষিকে প্রতিপালন করেছে রাজা ও দেশের ধনীরা, কিন্তু এই কৃষ্টিকে রক্ষা করেছে যারা তারা লক্ষ্মীর কৃপায় চিরদিনই ছিল বঞ্চিত।
রাজনীতি জাতির জীবনের খুব বড় জিনিস সন্দেহ নাই, কিন্তু ভারতের কৃষ্টির মূল কথা রাজনীতি নয়, সে হচ্ছে ধর্ম্ম। বহিরঙ্গ কূট রাজনীতি ও হিংস্র রক্ততর্পণের কাপালিক পূজারীর চেয়ে ভারতের সন্তান তাই প্রেমের ও আপনাভোলা ত্যাগের মানুষকে বোঝে ভাল। এই যে অন্তরের ভারত, গভীরের কল্পলোকের ভারত, এ ভারতের বাণী ও মর্ম্মকথা লেখা আছে ঐ ধবল হিমগিরির চূড়ায় চূড়ায়, ভারতের পশ্চিম ও দক্ষিণের অগাধ অনন্ত দিকচুম্বী নীলাম্বুধি জলে। যার মনীষা আছে, ধ্যান আছে, দূরদৃষ্টি আছে সেই এই লেখা পড়তে পারে, সেই খুঁজে পায় তার মাঝে এই অপূর্ব্ব তপোভূমির জীবনের মূল সূত্র।
সে সূত্র হচ্ছে শাত্তম্, শিবম্, অদ্বৈতম্। পাশ্চাত্যের জীবন সূত্র হচ্ছে শিব নয়, শান্ত নয় কিন্তু কালী—শিবের বুকে নৃত্যময়ী শক্তি—সৃজনী কর্ম্মধারা। একজন চায় স্থিতিকে আর একজন ভালবাসে গতিকে। তাই ভারতে জন্মায় বিবেকানন্দ অরবিন্দ আর পশ্চিমে গজায় কার্ল মার্ক্স লেনিন, মুসোলিনী, হিটলার!
অনেক ঐতিহাসিক চিন্তাবীর একথা বুঝতে পারেন না, যে, বহুশতাব্দির রাজনীতিক পরাধীনতায়ও এ ভারত বেঁচে রইল কি করে? ব্যাবিলন, সিরিয়া, গ্রীস, রোম মুছে গেছে, ভারতের জীবনমন্ত্র কিন্তু আজও উজ্জ্বল অম্লান-জ্যোতি—যার যজ্ঞ-শিখায় এত বড় পরাধীনতার মাঝেও জন্মাতে পারে রামমোহন, ঈশ্বরচন্দ্র, রামকৃষ্ণ, বিবেকানন্দ, দেশবন্ধু, অরবিন্দ ও মহাত্মা গান্ধীর মত দীপ্তশিরা পুরুষগণ। তার মধ্যে আবার বাংলার মত অক্ষর রত্নগর্ভা দেশ আর ভারতে কোথায় আছে? আমরা সেই দেশের সন্তান, আমাদের তাই বুঝতে হবে আত্মার ঐ গোপন বীর্য্য—যা’ ভারতকে অটুট জীবন দিয়েছে। সূক্ষ্ম যা’ তা’ চিরদিনই স্থুলের চেয়ে শক্তিশালী, ভারতের Soul-force ধরিত্রীর আবরণ স্বরূপ ঐ হরিত চির-বিদলিত তৃণের মতই অমর, ঐ চির-নির্ম্মল আকাশের মতই অটুট অচল; কোনও তৈমুর বা চেঙ্গিজ খাঁর রক্তমাখা অসি ভারতের এ অমল সত্যকে খণ্ডিত বা নষ্ট করতে পারে নাই। সৃষ্টির এই দুই দিক— স্থিতি ও গতি এবার মুখোমুখী হয়েছে, এ ওর পাশে এসে দাঁড়িয়েছে, প্রতীচ্য ধরেছে প্রাচ্যের হাত; কারণ শিবের বুকে কালী, স্থিতির ছন্দে বাঁধা গতি—এই হচ্ছে জীবনের পূর্ণ সত্য।
ভারতের জন-সাধারণ ঐ তুষারশুভ্র ধ্যানমগ্ন হিমাচল শৃঙ্গেরই সত্যকার সন্তান, ঐ অনন্ত নীল নীরবতারই পুত্র; তোমার পদতলে চিরবিদলিত অথচ অমর ঐ মূক তৃণেরই তারা সগোত্র ও সহোদর। ঐ সরল নমনীয় কোমলতাই তাদের শক্তি, অটল সহিষ্ণুতাই তাদের অক্ষয় ধর্ম্ম, জগতের চিরবঞ্চিত অবহেলিতের মূক বেদনার ডাকই ভারতের আবেদন—তার অন্তর্নিহিত বাণী। এই লক্ষ লক্ষ কোটী কোটী বঞ্চিত মূক মানুষের মাঝে শুপ্ত আত্মবলকে যদি জাগাতে পার, তা’ হ’লে ধ্যানস্থ শিবের জটাবাহিনী গঙ্গার মত তা’ থেকে যে প্রাণধারা নিঃসৃত হবে, যে সৃজনী-শক্তি বের হবে তা’ জগতের অশেষ কল্যাণ তো করবেই, পরন্ত ভারতকে দেবে দেবতার আসন। ভারতকে গতির মন্ত্র শিখতে হবে আপনার স্থিতির মন্ত্র না ভুলে, নইলে পাশ্চাত্যের মত উন্মার্গগামী ভোগৈকশরণ হয়ে সেও করবে দুঃখকেই পুঞ্জীভূত।
ভারতের তরুণ ছেলে মেয়েরা, তোমরা ঐ অবহেলিত ভারতের মূক জনগণের আবদ্ধ জলরাশিতে গিয়ে স্নান কর, ঐ শীতল প্রাণ গঙ্গায় প্রাণ ভরে ডুব দেও। দেখবে সেই অতল তলে কত শক্তিরাজি নিহিত রয়েছে। সেই অতলের স্তব্ধ মহাপ্রাণে নাই বাসনার জ্বর, কামনার প্রদাহ, সেখানে নাই হানাহানির আসুরিক গতি, স্বার্থের পাগল তাড়না, মৃত্যুর হিষ্টিরিয়া। জীবনের সেই মহাসাগরের আদি-গঙ্গায় স্নান করে তোমরা পাবে নূতন ঊষায় নবজন্ম। সেই পাবন বারিস্পর্শে তোমার লুপ্ত দৃষ্টি ফিরে পাবে, তোমার মাঝে জাগবে শুদ্ধ শক্তির ধবল শিখা, তোমার এতদিনের মৃত আত্মবিশ্বাস ও সৃষ্টির স্বপ্ন তোমার বুকে আবার হবে নূতন করে সঞ্জীবিত। তখন হারানো ভারতকে তুমি আবার ফিরে পাবে, তখন ফিরে পাবে সেই বিস্তৃত বাণী যা’ দিয়ে ভারতের সত্যকার মন্ত্র হতে পারে মূর্ত্ত ও উচ্চারিত। জীবনের সত্যকার বেদের পাতা মানুষের কাছে চির-উন্মুক্ত, সে শামগান চির দিনই অনাহত রবে দিদ্গিগন্তে উত্থিত হচ্ছেই। আমাদের অন্তরের ধ্যান-গভীরতায় ও নিষ্কামতায় আছে তার মূল সত্য—জীবনের রূপে রসে গন্ধে স্বাদে রূপায়িত হয়ে অহরহ স্বতঃই ওঠছে তার মহাকাব্য। প্রাচ্যের নীরবতা ত্যাগ ও প্রতীচ্যের খর উদ্দাম প্রাণগতিকে একই সঙ্গে গেঁথে নিতে পারলেই জীবনের সোণার কাঠি রূপার কাঠি খুঁজে পাওয়া যায়। প্রতীচ্য হচ্ছে জীবনের শিব, প্রাচ্য তার নৃত্যপরা শক্তি; একজনকে নিয়ে আর একজন পূর্ণ, প্রতীচ্যকে বাদ দিয়ে তাই প্রাচ্য অঙ্গহীন, ছন্দহারা, ব্যর্থ।
দেশ কতখানি জেগেছে?
সবে সে দিন কংগ্রেসের ঊনপঞ্চাশ বৎসর পূর্ণ হবার রজত জুবিলি হয়ে চুকেছে। ১৯০৬ সাল থেকেই কিন্তু আমাদের প্রকৃত জাতীয় মুক্তির সংগ্রামের সূচনা। ১৯০৬ সাল থেকে আজ অবধি এই ত্রিশ বছর ধরে আমরা কিসের জন্য সংগ্রাম করেছি? স্বরাজ? ঔপনিবেশিক স্বায়ত্তশাসন, পূর্ণস্বাধীনতা, দেশবাসীর জন্য দেশবাসীর দ্বারাই তাদের রচিত শাসন চক্র, গণতন্ত্র? এমনই একটা কিছু অস্পষ্ট ঘোলাটে রাজনীতিক বা অর্থনীতিক মুক্তি—যার প্রকৃত সুস্পষ্ট অর্থ আমরা কেহই বুঝি না। তাই-ই হচ্ছে অসহযোগী, বিপ্লবী, সন্ত্রাশবাদী, উদারপন্থী, ন্যাশনালিষ্ট ও কম্যুনিষ্ট সকলেরই লক্ষ্য। শুধু ভারতেই নয় পাশ্চাত্যের তথাকথিত সুসভ্য স্বাধীন দেশেও মানুষ জানে না ঠিক কোথা হতে তাদের বন্ধন, কার রচা বন্ধনের বেদনা তাদের জীবনে এমন করে দিন দিন পুঞ্জীভূত হয়ে উঠছে। মনুষ্য সমাজ তার জীবন নিয়ে তাই দেশ বিদেশে কত পরীক্ষাই না করছে। রাজতন্ত্র, প্রজাতন্ত্র, পার্লামেণ্টারী ডিমোক্রাশী, সাম্যবাদ, গণতন্ত্র, ফ্যাসিজম্—প্রত্যেকটি নূতন চিন্তাধারা মানেই নূতন আদর্শ, নবতর পরীক্ষা। সব পথেই কিছু না কিছু কল্যাণ প্রসব করেছে কিন্তু এখনও মানুষের পূর্ণ কল্যাণের সুস্পষ্ট পথ আবিস্কৃত হয় নাই, এখনও অসন্তোষ নিভে নাই, স্বাধীন বা পরাধীন কোন জাতিরই প্রাণ তৃপ্ত হয় নাই। কি স্বাধীন আর কি পরাধীন সকল জাতিই আমরা এখনও লক্ষ্য সম্বন্ধে সমান অন্ধকারে।
ভারতে—যেখানে সুষ্ঠু রাজনীতিক জ্ঞান এখনও গজায় নি, বস্তুতন্ত্র বৈজ্ঞানিক চিন্তাধারা যেখানে এখনও খুবই অপরিণত, সেখানে আমাদের জাতীয় লক্ষ্য যে আরও অস্পষ্ট হবে তা’ আর আশ্চর্য্য কি? লক্ষ্য সম্বন্ধে এই আবিলতা অস্পষ্টতা এই এলোমেলো চিন্তাধারাই আমাদের পুণঃ পুণঃ ব্যর্থতার কারণ। তাই আমরা এলোমেলো ভাবে কখনও স্বদেশী করি, কখনও জয় মহাত্মাজী রবে দলে দলে জেলে যাই, কখনও বোমা ফেলি আর কখনও বা মদ খাওয়া ছেড়ে চরকা কাটি। লক্ষ্যই যখন স্থির নয়, তখন সে লক্ষ্য উদযাপনের উপায় যে হাস্যকর হবে তা’তে বিচিত্রতা কি?
আমরা কি চাই একথা পরিষ্কার ভাবে না জানলেও আমাদের সকল দলের ভাববাদী অসহিষ্ণু নেতারাই একটা বিষয়ে কিন্তু একেবারেই একমত, সেটা হচ্ছে দেশের শাসনতন্ত্র থেকে ইংরাজ সংস্পর্শের আমূল উচ্ছেদ। ভারতের ভাগ্যে ভাল মন্দ যাই ঘটুক না কেন, ব্রিটিশ রাজ-শক্তির আশু অবসান হোক, তাঁরা তাঁদের ঘটি বাটী নিয়ে বোম্বাই মাদ্রাজ কলিকাতার বন্দর থেকে ঘরের ছেলে ঘরে ফিরে যান—এইটাই প্রায় সকল দলেরই মনের কথা। ইংরাজের এই ভাগ্যবিপর্য্যয়ে এবং ভারতের রাজনীতিক ব্যবস্থার এই হঠাৎ ওলটপালটে কতখানি মঙ্গল বা অমঙ্গল প্রসব করবে তা’ ভেবে দেখবার ধৈর্য্য খুব বেশী নেতার নাই। ভাব খুব ভাল জিনিয, কিন্তু ভাবের কুয়াসা মানুষের দৃষ্টিবিভ্রম ঘটায়।রাজনীতি কঠিন ঠাঁই, ওটা হচ্ছে একেবারে নিরেট বস্তুতন্ত্র ব্যাপার; এখানে ফাঁকা ভাববিলাসের স্থান যে কতটুকু তা’ বোঝবার দিন আমাদের মত নাবালক জাতির এসেছে বলেই আমার বিশ্বাস, তাই এত কথার অবতারণা করছি।
আমরা যখন এক কাঠা জমির জন্য আত্মীয় স্বজনের সঙ্গে মাথা ফাটাফাটি করি, তখন ইংরাজ যে ফাঁকা কথার ছলনায় ভুলে বা ভয়ের বশে এই সুনিয়ন্ত্রিত রাজ্য—তাদের কায়েমী জমিদারী ছেড়ে যাবে না, একথা যে না বোঝে তার রাজনীতি চর্চ্চা বৃথা। ইংরাজ সেই দিনই ভারতের শাসন যন্ত্রের চাকাটি ছেড়ে সরে দাঁড়াতে বাধ্য হ’বে যে দিন আমরা উপযুক্ত হবো, মানুষ হবো। একথাটা যতই অপ্রিয় হোক খুবই সত্য, এই মূল সত্যটাকে ভুলে এটার দিকে চক্ষু মুদে আমরা এত দিন অসহযোগ, বোমা, কারাবরণ ইত্যাদি যা কিছু করতে গিয়েছি, সবই একটা হাস্যকর প্রহসনে দাঁড়িয়েছে। আমাদের গত ত্রিশ বছরের রাজনীতিক আন্দোলনের যতগুলি ঢেউ বা phases এসেছে তার ব্যর্থতাও যেমন ঘটেছে, কিছু কিছু সুফলও ফলেছে, এই সব আন্দোলনের ফলে দেশময় জাতির রাজনীতিক চেতনা জেগেছে। কিন্তু যখন রোম নগরী পুড়ে ছারখার হচ্ছে তখন সঙ্গীত চর্চ্চা যেমন বাতুলতা, তেমনি সাড়ে তেত্রিশ কোটী ক্ষুধিত নিরন্ন অজ্ঞ রুগ্ন ভারতবাসীর জীবন নিয়ে এক আধ লক্ষ শিক্ষিতের ব্যর্থ ভাববিলাস কি তেমনি বাতুলতা নয়? বার বার ভূল পথে জাতির ভাগ্য নিয়ে ব্যর্থ পরীক্ষার কি আর সময় আছে?
আবার জীবনের চৌমাথায়
১৯০৬ সালের স্বদেশী ও জাতীয় শিক্ষার আন্দোলন মরেছে, ১৯১২ সালের অসহযোগ ব্যর্থ হয়েছে, ১৯০৯ সালের বোমাও আমাদের স্বরাজ দিতে সমর্থ হয় নি। প্রত্যেক রাজনীতিক আদর্শ বা উপায়ের একটা সুসময় আজে, পরমায়ু কাল আছে; তা যথা সময়ে জন্মায়, বাড়ে এবং কাজ করে ফুরিয়ে যায়। রাজনীতিতে যে উপার একবার spent bullet হয়ে গেছে তা’র জের কেটে চলে তারাই যাদের মোটা কার্য্যকরী বুদ্ধির —Sense of realityর নিতান্ত অভাব। আজ তাই আবার আমরা জীবনের চৌমাথার এসে পৌঁছেছি।— “India is on the cross-road of her destiny”—আবার আমাদের নতুন করে পথ খুঁজে নিতে হবে; এবং সে পথ যেন এবার নিছক ভাববিলাস না হয়, ফাঁকা ব্যর্থ জাতি-বিদ্বেষ ও উত্তেজনা না হয়, সে দিকে লক্ষ্য রেখেই এবার সে পথ নির্ব্বাচন করতে হবে।
সুরেন্দ্রনাথ তিলক, অরবিন্দ, চিত্তরঞ্জন, মহাত্মা গান্ধীর মত নেতাদের আমরা পূজা করি সত্য, কিন্তু তাঁদের প্রদর্শিত পন্থা সম্বন্ধে অন্ধ হ’লে চলবে না। ভারতের জীবন-গতির তাঁরা এক একটি পদক্ষেপ, এই জাতীয় জীবন জাহ্নবীর এক একটি তরঙ্গ মাত্র। নেতা আসে যায় কিন্তু ভারতের উন্নতির ও পরিণতির জীবন-যজ্ঞ অনির্ব্বাণ শিখায় দাউ দাউ করে জ্বলে, এ ব্রতের উদযাপন নাই, সমাপ্তি নাই। কখন অগ্ন্যুৎপাতে, কখন স্থির শিক্ষায় এ জীবনবহ্নি জ্বলতেই থাকবে যতক্ষণ না মানুষে মানুষে এক মহান প্রেমমৈত্রীর অখণ্ড রাজ্য গড়ে ওঠে। ভারতের স্বাধীনতা বিশ্বের কল্যাণের এক মহামন্ত্র নিয়ে উঠবে, তাই এদেশে শ্রীরামকৃষ্ণ বিবেকানন্দ জন্মেছিল, তাই এই নিগড়বদ্ধা দেশজননীর কোলে এসেছেন দেশবন্ধু, তিলক, মহাত্মা গান্ধী, শ্রীঅরবিন্দ। মানুষের তপ্ত রক্তে ললাটে রাজতিলক এঁকে ধনীর সাম্রাজ্য গড়বার জন্য ভারত ওঠে নাই। রাজসিক জীবনের ভোগোপচারে সমৃদ্ধ বাহুবলদৃপ্ত সিংহাসন অর্দ্ধপৃথিবী জুড়ে শক হুন মোগল পাঠান ও পাশ্চাত্যের জাতিরা বার বার গড়েছে। তাতে মানুষের বেদনা ও বন্ধন বেড়েছে বই কমে নাই। সেই রাজসিক রাজসূয় যজ্ঞের পুনরাবৃত্তিই ভারতের লক্ষ্য হতে পারে না।
পরাধীনতার বেদনায় ক্লিষ্ট অসহিষ্ণু আমাদের ধারণা হয়েছে, রাগ জিঘাংসা ও জাতিবিদ্বেষের ইন্ধন ছাড়া বুঝি জাতির জীবন-যজ্ঞ পূর্ণ হয় না, দেশের মুক্তি আসে না। অতীত ইতিহাসের প্রত্যেক পৃষ্টা নররক্তে নিসিক্ত বলে তোমাদের মনে হচ্ছে এখানেও বুঝি বামা—কালীর মরণ নৃত্যের পুনরভিনয় হবে। স্থির চিত্তে ভারতের জীবন ও ইতিহাসের গতি লক্ষ্য করলে দেখবে ভারতের গতি অন্যরূপ, মানুষের মধ্যে মহান যা’ উদার যা’ নিঃস্বার্থ যা’—নররক্তে পারী নগরীর পথ পঙ্কিল করে ফরাসী বিপ্লব যে সাম্য মৈত্রী স্বাধীনতার বাণী সফল করতে পারে নাই, সেই মহান উদার মন্ত্র এই দেশে সফল হবে বলেই এই দেশমাতা রামকৃষ্ণ বিবেকানন্দ দেশবন্ধু শ্রীঅরবিন্দের জননী। আমরা রাগের কথা অনেক শুনেছি; জাতি-বিদ্বেষ জাগাতে গিয়ে আজ ভারতে হিন্দু মুসলমানে, ব্রাহ্মণ-অন্তজে, স্পৃশ্যে অস্পৃশ্যে, জাতি ও ধর্ম্মবিদ্বেষের গরল ফেণিয়ে তুলেছি। ভগবানের অঙ্গুলি জাতির অন্তরদেবতার সঙ্কেতে তাই দেখাচ্ছে এ পথ ভারতের নয়। আমাদের প্রকৃত শক্তির ঘর হচ্ছে সেইখানে যেখানে স্পর্শ করে দশ শিখ গুরু বনের চাষাকে বীর জাতিতে পরিণত করেছিল। আমরা দৈবী বলের ও অমৃতের সন্তান, পশুবলের নয়। আজ তাই আমি ইতিহাসের পাতা খুলে যুক্তির ফলকে কষে দেখাব কোন্ পথে আমাদের মুক্তি, অন্ততঃ কোন্ পথে আমাদের মুক্তি নয়।
হিংসা আমাদের পক্ষে পরধর্ম্ম
এত দিন মানুষ গুণ্ডামীকে বীরত্ব বলে ভুল করেছে, যে যত বেশি মানুষের ছিন্ন মুণ্ড নিয়ে গেণ্ডুয়া খেলতে পেরেছে, সেই ছিল তত বড় বীর। তথাকথিত বীর জাপান একবার কোরিয়া দেশ জয় করে বিজিতের লক্ষ লক্ষ ছিন্ন কর্ণ নিয়ে একটি উচ্চ জয়স্তম্ভ রচনা করেছিল। সিরাজুদ্দৌলার নামে প্রচলিত ঐতিহাসিক কিম্বদন্তী—ঐ অন্ধকূপ হত্যার চেয়ে বৌদ্ধ জাপানের এই ক্রুর নিষ্ঠুরতা—এই সামুরাই শৌর্য্য কত ভীষণ। দেবতার প্রতীক স্বরূপ মানুষের পক্ষে এই পশু ও পিশাচ স্তরে নামবার অছিলা মানুষ ধর্ম্মের নামে, জাতির নামে, দেশ ও জাতিগর্ব্বের নামে চিরদিন জুগিয়ে এসেছে। দেশে দেশে আমাদের কবিরা, চারণরা, পুরাণকারেরা এই গুণ্ডামীর ও কসাইবৃত্তির প্রশংসায় চিরদিনই পঞ্চমুখ। অথচ দৈবী-বীরত্ব, আর্ত্তত্রাণের শৌর্য্য এ পৈশাচিকতা নয়; এ বীরত্ব ও মিলিটারিজম্, এই বর্ব্বর অসভ্যের আচরণ এতদিন সভ্যতার চিহ্ন বলে পূজা পেয়ে এসেছে। পরাধীন জাতি মুক্তির নামে দেশপ্রীতির নামে নর-রক্তে দেশ ভাসিয়ে এতদিন স্বাধীন হয়েছে,পূজা পেয়েছে; সে দিনও কিন্তু আর নাই। জিঘাংসা ও ক্রুরতার অন্ধ ঝটিকা তুলে জাতির বিরুদ্ধে জাতিকে ক্ষিপ্ত করে জগত আর চলতে পারবে না। মানুষ উঠেছে সভ্যতার ও মানবতার উচ্চতর পৈঁঠায়, তাই এ যুগের মহাত্মা গান্ধী ভারতে এনেছেন অহিংস অভিযানের বাণী। আজ জাতিতে জাতিতে আমরা আর বিচ্ছিন্ন ও পর নই, বিজ্ঞানের অভূতপূর্ব্ব উন্নতি ছয় মাসের পথকে ছয় দিনে পরিণত করেছে। আজ সমগ্র মানব পরিবার হয়েছে পরস্পরের পাশের ঘরের প্রতিবাসী, আজ মার্কিনকে না হলে ফরাসীর চলে না, চীনকে না হলে মার্কিনের ব্যবসার লক্ষ্মী অচল হয়। এক অখণ্ড মানবতার জন্ম আজ সন্নিহিত, তাই মানুষে মানুষে এত প্রেম, এত সমবেদনা। যখন অসি হস্তে মুসলমানের মুণ্ড কেটে শিবাজী হিন্দু রাষ্ট্র গড়ছিলেন তখন মানুষ সাম্প্রদায়িক জাতীয়তার কথাই ভাবতে পারতো, এ বিপুল মৈত্রীর স্বপ্ন দেখবারও মহাপ্রাণতা তার ছিল না। এখন দিন এসেছে যখন সঙ্কীর্ণ জাতীয়তা নয় কিন্তু এই মৈত্রী ও বিশ্বজনীনতার জন্য মানুষ জীবন দেবে, বীরত্বের স্বর্ণমুকুট অর্জন করবে।
জগতের গুরুর আসন যার, সেই গীতা ও উপনিষদের জন্মদাতা ভারত কি এই দরদ ও সমবেদনার যুগে সঙ্কীর্ণ সাম্প্রদায়িকতার নামে জাতিবিদ্বেষের নামে ভাইএর অস্থিকঙ্কালের ওপর মায়ের সিংহাসন পাতবে? ভারতের মুক্তির সংগ্রাম কি তবে নরমেধ যজ্ঞ? এর উত্তরে হয়ত বলা হবে, বিজেতার হাতে অসি ও আগ্নেরাস্ত্র, তবে আমরাই কি শুধু ব্যর্থ প্রেমের মন্ত্র আওড়াব? এর জবাবে আমি বলবো, ওরা বিজেতা নয়, ওরা দেবতার আশীর্ব্বাদরূপে ভারতে এসেছিল শত্রুর মুখোস পরে, ওদের স্পর্শে তোমরা বেঁচে উঠেছ। শক হুন মোগল পাঠানের স্পর্শে তোমরা নিছক গোলাম হয়েছিলে—এত বড় জ্ঞান বিজ্ঞান সাহিত্য কলা গণতন্ত্রের বাহন তারা ছিল না। প্রবল বন্যা এসে দেশ ভাসিয়ে যেমন পলি মাটি দিয়ে জমিকে ঊর্ব্বর করে দিয়ে যায় এরা করেছে তাই। এদের অজ্ঞান ও সজ্ঞানক্বত মৈত্রী এমন কি এদের বৈরিতাও আমাদের মানুষ করেছে, জাগিয়েছে। মুক্ত গরিমাময় ভারতের ভাবী ঐতিহাসিক ঐ শ্বেত-দ্বীপের কাছে এ ঋণ এক দিন মুক্তকণ্ঠে স্বীকার করবে! এ জাতি পররাষ্ট্রগ্রাসী হলেও অসভ্য নয়, এশিয়া গ্রাসোদত লুব্ধ জাপানী ড্রাগন নয়; এরা সভ্য, প্রাণবান, মুক্তির পূজক। বৈধ অহিংস পথে দৈবী শৌর্য্যে এদের জয় করা যায়; শত্রুর মুখোস এদের এরই মধ্যে খসে গেছে, এখন দিন এসেছে এই অপূর্ব্ব কর্ম্মকুশলী রাজস-সাত্ত্বিক জাতির সাহায্যে ও সাহচর্য্যে এই পতিত দেশকে গড়ে তোলার।
খাঁটি সহযোগিতা কি?
“সহযোগ” এই কথাটীর আমরা অনেক নিন্দাই শুনেছি, তাকে ভিক্ষাবৃত্তি বলে গালি দিয়েছি। সহযোগ কিন্তু ভিক্ষা নয়, মহারাষ্ট্র কেশরী তিলক তা’ হ’লে responsive co-operationএর সে মন্ত্র উচ্চারণ করতেন না। মুক্তির অধীর আবেগে আমরা মত্ত হয়ে সুরেন্দ্র নাথের মডারেট মনোবৃত্তির পরই নিছক ধ্বংসের পথে পা বাড়িয়েছিলাম, অসহযোগের ধ্বজা তুলে কারাবরণ করেছিলাম। আমরা ভেবেছিলাম “সহযোগ” বুঝি করা হয়ে গেছে, ব্যর্থ সে পন্থার পুনরাবৃত্তিতে কাজ নাই। সে সময়ে অরবিন্দ যদি নির্বাসনে না যেতেন, মহারাষ্ট্র কেশরী তিলক যদি অকালে মৃত্যুমুখে না পড়তেন, তা’ হ’লে জাতির এ ভ্রান্তি হয়তো সহজেই কাটতো। রাজ্য শাসনে ও রাষ্ট্র গঠনে সহযোগিতা কি শুধু চাওয়া, “দাও দাও” বলে ভিক্ষা করা? সত্যকার সহযোগিতা কি আমরা করেছি? সহযোগিতার পথ; প্রেমের পথ, কঠিন পথ বলেই না আমরা ছুটে গেছিলাম বাঁকা পথে, প্রতিহিংসার পথে, গুপ্ত ঘাতকের পথে, ছুরিকা ও আগ্নেরান্ত্রের পথে। সব বড় কাজই তো কঠিন, তাই বলে কি নরকের সহজ অনায়াস পথেই মানুষ তার মনুষ্যত্বের অপলাপ করবে? আর সে পথও তো কাণাগলিতে—ব্যর্থতায় পর্য্যবসিত হলো, এমন সোজা shortcut হয়ে গেল চোরা বালির গহন মৃত্যুর ফাঁদ। জাতির মুক্তি তা’তে এলো কই?
সত্যকার সহযোগিতার পথ হচ্ছে জাতির আত্মস্থ হবার পথ, গঠনের পথ, মনুষ্যত্ব অর্জ্জনের পথ, স্বায়ত্ত শাসনের অধিকার তিলে তিলে অর্জ্জন করবার পথ; জাতির শিক্ষা দীক্ষা অন্ন বস্ত্র স্বাস্থ্য সম্পদের ভার নেবার পথ। এ পথ ধরবার ধৈর্য্য ও একপ্রাণতা আমাদের কই? আমরা কেবলি নালিশ জানিয়েছি, যে, দেড় দুই শত বৎসরের বৃটীশ শাসনের ফলে দেশের অশিক্ষা দারিদ্র ঋণভার শুধু বেড়েছে বই কমে নাই। তার অর্থ এই যে, আমরা চেয়েছি অপরে আমাদের শিক্ষা দেবে, মানুষ করবে, আমাদের ঘর সংসার গুছাবে, আর নিছক পরোপকার করতে সাত সমুদ্র পার হয়ে এদেশে এসে ইংরাজ যেন শুধু ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়াবে; এ আবদার অলস তামসিক অসহিষ্ণু নাবালক জাতিরই সাজে। আমরা নিজেরা নিজের দেশের শিক্ষার জন্য কতটুকু করেছি, দরিদ্র চাষীর ঋণভার কমাতে আমাদের পলিটিক্যাল স্বরাজ-লুব্ধ কংগ্রেস কতটুকু খেটেছে? তারা শুধু মান অভিমানের অভিনয় করেছে, সহজ-লভ্য স্বরাজের বায়না ধরেছে, ব্যর্থ স্বার্থত্যাগের মহড়া দিয়েছে, দেশ জুড়ে অলস কর্ম্মবিমুখ ভলণ্টিয়ার গড়েছে, —সভাসমিতি মিছিল ভূয়া রাজনীতিক তামাসা আন্দোলনই যাদের হয়েছে পেশা।
কথাগুলি বড় অপ্রিয় হচ্ছে কিন্তু আমাদের আজ কঠিন অপ্রিয় সত্যই বলবার ও শোনবার দিন এসেছে। সহযোগ আমরা করি নাই, করে দেখি নাই, যে, ও-পথে সিন্ধি আছে কি না। বামন মাত্র ত্রিপাদ ভূমিটুকু চেয়েছিল, সমর্থের মহাবীরের সে ভিক্ষার ফল কি হয়েছিল আমরা জানি। আমরা সে সামর্থ্য রাখি না, আমরা জানি শুধু নাকে কাঁদুনী, শুধু পোষাকী পলিটিক্স, শুধু নিরাশার সহজ বুলি। মণ্টেগু রিফর্ম খারাপ, ডায়ার্কি খারাপ, এখন আবার নূতন কনষ্টিটিউশন খারাপ; ভাল শুধু পরের দেওয়া স্বরাজ—ফাঁকা এজিটেশনে লভ্য স্বরাজ। ঐ ভিক্ষা-লভ্য এজিটেশনের ফল ত্রিপাদ ভূমি—ঐ আধা-স্বরাজ সিকি-স্বরাজ মেকী কন্ষ্টিটিউশনকে একবার নিয়ে কাজ করে দেখেছি কি ও-পথে এগোনো সম্ভব কিনা? সত্যকার সহযোগ, কাউন্সিলের মিউনিসিপালিটির ডিষ্ট্রীক্ট বোর্ডের ভিতরে বাহিরে দেশব্যাপী শিক্ষার আয়োজন, কষি শিল্পের উন্নতির চেষ্ট, পল্লী গঠনের অসাধ্য-সাধন আমরা করে দেখি নি, আজ তাই অকপট কর্ম্মী মহাত্মাজীর মুখ ভূয়া রাজনীতির দিক থেকে ফিরে গেছে কলুর ঘানীর দিকে, ম্যালেরিয়া জীর্ণের ঢেঁকিশালের দিকে, কামারের হাঁতুড়ীর দিকে, পল্লীর পচা পানাপুকুরের দিকে, নিরন্নের জীর্ণ পাঁজরের দিকে। তাদের পানা পুকুরের পঙ্কোদ্ধার করতে, তাদের জীর্ণ বুকে সাহস দিতে, মাথার ঋণভার লাঘব করতে, তাদের ধর্ম্মের নামে সমাজের নামে অবহেলিত মূক মনে শিক্ষার আলো জ্বালতে শাসন চক্র ছাড়া আর কেউ পারবে না। ঐ গভর্ণমেণ্ট দেশের রক্তে দেশের ধনজন-বলে গড়া মায়ের শক্তিপীঠ, বিদেশী নয়, তোমার নিছক শত্রু নয়। যদি সে রাজ শক্তি এত দিন জাতির কল্যাণ সাধনে বিমুখ ছিল সে পাপ তোমার; তুমি উদাসীন ছিলে বলে তোমার দেশের গভর্ণমেণ্ট ছিল মৃতের, শক্তিহীনের, সঙ্কীর্ণ স্বার্থপরের স্বার্থপর গভর্ণমেণ্ট।
আবার বলি আজ আর ভীম সেনের গদামার্কা শৌর্য্যের ভারত নাই, আজ আর টডের রাজস্থানের ভারত ও শিবাজীর মাওলীসেনার ভারত নাই, আজ রাজসূয় যজ্ঞের ঘোড়ার পিছনে ছুটতে ছুটতে রক্তের ধারায় দেশ ভাসাতে গেলে তা প্রহসনে দাঁড়াবে, আধুনিক সভ্য জগতে তা’ পাগলের পাগলামীর মত দেখাবে। তৈমুর, বাবর বা ভাস্কর পণ্ডিতের অসির ঘায়ে সাম্রাজ্য বিস্তার আজ হয়েছে সিনেমার সং, থিয়েটারের মঞ্চের আস্ফালন। মুসোলিনী বা জাপানী বুসিডোর রক্তের জয়যাত্রা আজ সভ্য জগতের হাততালি পায় না, ঘৃণ্য লুণ্ঠকের বেশে ধরা পড়ে যায়।
তোমরা বলবে হিংসার পথের মত অহিংসাও তো ব্যর্থ হয়েছে। কথাটা সত্য নয়, কারণ অহিংসা একটা ধর্ম্ম, যুগব্রত, ওর জয়যাত্রাই নানা ভাবে আধুনিক জগতে চলেছে, একটা আন্দোলনের ব্যর্থতায় অত বড় সত্য ব্যর্থ হতে পারে না। আমরা একটা সঙ্কীর্ণ জাতি-বিদ্বেষের ক্ষেত্রে বপন করেছিলাম অহিংসার বীজ, বুকে ছিল আমাদের ইংরাজ বিদ্বেষ, মুসলমান বিদ্বেষ, হিন্দু বিদ্বেষ, বর্ণ বিদ্বেষ, অস্পৃশ্যতার পাপ, নারীদ্রোহের পাপ, ব্যক্তিগত স্বার্থের কামনা, আর ফাঁকী দিয়ে স্বরাজ নেবার লোভে আমরা পরেছিলাম অহিংসার মুকুট, সত্যাগ্রহীর বেশ। তাই আমাদের অহিংস অসহোযোগে দেশ জুড়ে জেগে উঠেছে—সাম্প্রদায়িকতার নামে, স্পৃশ্যাপৃশ্যের নামে—পরস্পরে অসহযোগ, সংগ্রাম, হানাহানি, শ্রেণী-বিদ্বেষ, জাতি-বিদ্বেষ, ধর্ম্ম-বিদ্বেষ। মাঝখানে স্বার্থ ও হিংসার কটাহে টগবগ করে ফুটছে জীবনের তৈল, আর পাশে বসে নেতারা আওড়াচ্ছেন অহিংসার মন্ত্র, দেশপ্রীতির নিস্ফল পুণ্য শ্লোক। মনে পুষবে পাপ আর কাজে থাকবে শুদ্ধ, এ রকম ব্যাপার মানব প্রকৃতিতে সম্ভব নয়। যে কোন মহাব্রতের নামে উচ্চ আদর্শের অছিলার মানুষের অন্তরের আগ্নেয়গিরির মুখ যদি একবার খোল তা’ হ’লে আর কোন মন্ত্রেই সে প্রজ্জ্বলিত উৎক্ষিপ্ত জ্বালামুখী থামবে না। হিংসার আছে দু’দিকে ধার, সে আত্মপর উভয়কেই সমানে কাটে।
“তোমার পিতা জল ঘোলা করেছিল বলে আজ আমি তোমার রক্ত খাব”—এ যুক্তি বনের বাঘের যুক্তি, মানুষের নয়। কবে কোন্ অতীত যুগে আরও দশটা দেশলুণ্ঠকের সঙ্গে বনিক বেশে কয়েকজন ইংরাজ এসে অরাজকতার অবসরে পতিত এদেশ জয় করেছিল বলে সমগ্র ইংরাজ জাতিকে ঘৃণা করা বা শাস্তি দেওয়া সেই নেকড়ে বাঘেরই যুক্তি, অসভ্য আফ্রিদির বংশপরম্পরাগত রক্তের নেশা blood feudএরই সগোত্র। বয়কট শাসকের ওপর চাপ দেবার অস্ত্র হতে পারে, কিন্তু বয়কট যে দু’ দলকেই উৎসন্ন করে ক্ষতিগ্রস্থ করে, তা’আমরা বার বার করে এবং ঠেকে বুঝেছি। রাগ বা প্রতিহিংসা প্রতিপক্ষের মাঝে সেই বৃত্তিকেই জাগায়, মুখের অন্ন নিয়ে হানাহানি কাড়াকাড়ি দুই দেশের নিরন্নকেই আঘাত করে, শোষণ ও প্রতিহিংসা exploitation and retaliation একই জঘন্য বৃত্তির দুই দিক মাত্র।
যুগ-দেবতার সঙ্কেত
ইংরাজ এদেশে এত দিন যে ভাবে অবাধে বিলাস ও শক্তি উপভোগ করেছে আজ সচেতন ভারতে সে যথেচ্ছ লুণ্ঠন সম্ভব হবে না একথা সে জানে। আজ ইংরাজ বুঝেছে তারই স্পর্শে জাগ্রত এ জাতীয়তাকে ধ্বংস করা চলবে না, ইন্ধন দিয়ে একে পুষ্ট করে মিত্রে পরিণত করতে হবে; ভারত থেকে ক্রমশঃ বিজেতার হিসাবে বিদায়কামী তারা আমাদের নবীন গঠনের সহায় এখন সহজেই হবে। নূতন কোন বিজেতা তা’ হবে না,কারণ তার উদগ্র লোভ মিটে নাই, এ জাতির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ পরিচয় এমন করে তার হয় নাই। ভারত ও ব্রিটেন দুই দেশের মিলন যখন বিধির বিধানে হয়েছে তখন ব্রিটেনকেই করতে হবে আমাদের গঠনের মন্ত্রগুরু। আজ যদি এরা অকালে চলে যায় তা’ হলে এতগুলি বিভিন্ন জাতি, ধর্ম্ম, শ্রেণী ও বর্ণের অরণ্য এই দেশে চলবে রক্তারক্তি, হানাহানি, গৃহ-বিচ্ছেদ; তার চিহ্ন সর্ব্বত্র এখনই সুস্পষ্ট দেদীপ্যমান। আমরা সংহতি শিখি নাই, পরস্পরে সমবেদনা অনুভব করি নাই, ক্ষুদ্র স্বার্থ ভুলি নাই। এখনও স্বদেশীর নামে মাড়োয়াড়, গুজরাট, বোম্বাই, পাঞ্জাব করে বাঙলাকে নির্ম্মম শোষণ। আমরা মানুষ হয়েছি বলে চিৎকার করলে কি হবে, জাতিগঠনের উপযোগী সংহতি শক্তি আমাদের এখনও জাগে নাই। রাজ পাট, রাজ্যশাসন, প্রজা পালনের ভার আমরা বহু দিন বহি নাই, দশের কল্যাণে প্রতি মুহূর্ত্তে নিজেকে নিয়োজিত রাখার অভ্যাস সবে আয়ত্ত করছি। বাহিরের নূতন শত্রুকে অন্তর কলহের অবসরে ঢুকবার সুবিধা দেওয়ার চেয়ে আমাদের উচিৎ এই বুদ্ধি-জীবী হিসাবী উন্নত ব্রিটিশ জাতিকেই অল্পে অল্পে মিত্রে ও সহকর্ম্মীতে পরিণত করে নিয়ে দুই শক্তি মিলে ভাবী ভারত গড়ে তোলা।
ইংরাজ এবং ভারতবাসী এই দুই জাতিকেই বুঝতে হবে, যে, সহযোগেই উভয়ের শক্তি ও কল্যাণ, অসহযোগে ও সংঘর্ষে দুই দেশেরই নিরন্ন প্রজা সাধারণের দুঃখ, পুঞ্জীভূত বেদনা ও অভাবের অনিবার্য্য বৃদ্ধি। নেতায় নেতায়, শাসকে ও শিক্ষিত সম্প্রদায়ে কুট রাজনীতিক বুদ্ধি নিয়ে করে লড়াই বাকবিতণ্ডা কলহ, আর তার ফলে মরে এবং উৎপন্ন হয়ে যায় দুঃখী জনসাধারণ,—হাতিতে হাতিতে লড়াই হয় আর নলখাগড়ার প্রাণ যায়। অধিকন্তু মানুষকে ধরেই যখন মানুষকে বাঁচতে হবে, চলতে হবে, তখন বিরোধের পর শান্তি ও আপোষ অনিবার্য্য তখন সহজে আশুফলপ্রদ পথ ধরাই বুদ্ধিমানের কাজ। কল্যাণের সহজ পথ হচ্ছে প্রীতি, সহযোগিতা পরস্পরের স্বার্থের সামঞ্জস্য বিধান; আর তার ঘুর-পথ বাঁকা পথ হচ্ছে হিংসা, নিষ্ঠুর প্রতিদ্বন্দ্বিতা, সংঙ্কীর্ণ স্বার্থের হানাহানি ও প্রতিযোগিতা। এই বাঁকা পথে গেলে বহু অর্থ শক্তি ও সময়ের অপব্যয় করে আবার মানুষকে ফিরে আসতে হয় মিলনে, স্বার্থের ভাগ বাঁটোয়ারায়, সামঞ্জস্যে। যদি হিংসামূলক অসহযোগ পাপ না হয়, তা’ হ’লে সহযোগিতা পাপ হবে কেন? যীশু বুদ্ধ, শ্রীচৈতন্য ও শ্রীরামকৃষ্ণ যে প্রেম, মৈত্রী ও করুণার বাণী প্রচার করে গেছেন, অর্দ্ধেক পৃথিবী যার মৌখিক ভক্ত ও অনুরাগী, সে প্রেম মৈত্রী কি ব্যক্তির জীবনেই আবদ্ধ হয়ে থাকবে, জাতির জীবনে—মহামানবের সমগ্র জীবনে কখনও ফুটবে না? আমরা কি প্রতিবাসীর ঘরে সিঁদ কাটাকে পাপ বলে পরিহার করে বণিকের বেশে তার ধন শোষণ করতে বাহির হব? ল্যাঙ্কেশায়ারকে আমরা গালি দিই, স্বদেশীর নামে গুজরাটী ও মাড়োয়াড়ীর ল্যাঙ্কেশায়ার বাঙালীর অর্থ শোষণ কি তেমনি ভাবে করছে না? অহিংসার প্রতীক বৌদ্ধ জাপান সস্তা মালে বাজার ছেয়ে ফেলে কি ভারতের শিশু-শিল্পের কণ্ঠরোধ করছে না? তাই বলছিলাম প্রেম মৈত্রী সততা ইত্যাদি ধর্ম্মকে আমরা ব্যক্তিগত জীবনেই আচরণ করবো বলে তুলে রাখি এবং যথাসাধ্য তা’ করিও। কিন্তু এই সব মহান সত্যকে ব্যাপক জাতীয় ও আন্তর্জাতীয় জীবনে কার্য্যকরী করে তোলবার দিন এসেছে।
ইংলণ্ডের প্রকৃতিই হচ্ছে’—অন্য জাতি যা’ হানাহানি রক্তপাত ও বিপ্লবের মধ্য দিয়ে করে ইংলণ্ড তা ধীর মস্তিষ্কে বিচার করে অল্পে অল্পে আপন জীবনে ফলিয়ে নেয়। সোশালিষ্ট না হয়েও ইংলণ্ড আজ অনেকখানি সমাজতান্ত্রিক হয়েছে, তাদের দেশের শ্রমজীবি ও চাষীরা অনেক অধিকার বৈধ আন্দোলনের পথেই লাভ করেছে। এই হিসাবী স্থিতধী জাতির সাহচর্য্য পেয়ে আমরা তাকে শত্রু ভাবেই এত দিন ব্যবহার করেছি, তাতেও ভারত কম লাভবান হয় নাই। আজ প্রাচ্য জাপান বা মুসলমান বা ইতালী দেশের শাসক হলে আমাদের মুক্তি অভিযান এতখানি নিষ্কণ্টক তো হ’তোই না, অধিকন্তু নির্ম্মম দলনে তোপের মুখে ওরা তা’ নিশ্চিহ্ন করে দিত। ইংরাজ মুক্তির দূত, যেখানে যায় সজ্ঞানে হোক অজ্ঞানে হোক মুক্তির বীজ বপন করে; তাই আজ অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যাণ্ড, দক্ষিণ আফ্রিকা ও আয়লর্ণ্ড ও স্বাধীন, মিশর এবং ভারত ও স্বাধীনতার পথে দ্রুত অগ্রসর হচ্ছে। আমরা জাতীয়তার কুজ্ঝটিকায় অন্ধ নেতার মুখে ইংরাজের অনেক অপগুণের কথা শুনেছি, তাদের চরিত্রের অন্য দিকটাও আমাদের বোঝা ও শোনা উচিৎ; তবেই করতে পারবো নিরপেক্ষ বিচার, তবেই বেছে নিতে পারবো দেশের জন্য সহজ ঋজু আশুফলপ্রদ কল্যাণের পথ।
ব্রিটেন ভারতের কি করেছে?
ভারতবর্ষ আজ যে ব্রিটেনের অধীনতা পাশে বদ্ধ হয়েছে, বহিঃশক্তির কাছে তার এই প্রথম পরাজয় ও পরাধীনতা নয়। শক, হুন, গ্রীক, পাঠান, মোগল, ওলন্দাজ, পর্ত্তুগীজ, ফরাসী ইত্যাদি বহু যোদ্ধ জাতি এসে তরঙ্গের পর তরঙ্গে দেশের উপর দিয়ে বন্যার জলের মত বয়ে গেছে। বন্যার পলি মাটির মতই তারা তাদের জীবনী-শক্তি, কৃষ্টি, সভ্যতা দিয়ে এদেশের প্রাণ ও মনকে পুষ্ট করেছে। ওদেরই মত ব্রিটিশ-সংস্পর্শ অজ্ঞানে বা সজ্ঞানে ভারতকে কি দিয়েছে, তার জীবনের পূর্ণ সিদ্ধির কতখানি উপকরণ জুগিয়েছে, সে বিচার উগ্র একদেশদর্শী জাতীয়তার চোখে দেখে বিচার করা শক্ত। প্রবল অন্ধ স্বজাতি-প্রীতি ও গোষ্ঠীজ্ঞান মানুষের দৃষ্টি বিকৃত করে, বিচার বুদ্ধির তীক্ষ্ণতা নষ্ট করে দেয়। কারণ দেশপ্রীতি হচ্ছে হৃদয়ের ভাব, হৃদয়ের ভাবে আছে অন্ধ প্রবল আবেগ ও গতি, যুক্তি ও বিচারের আলো সেখানে নাই। ভাব ভাল জিনিস কিন্তু ভাবই মানুষের সব নয়, মানুষের মত জাতিরও হৃদয় ছাড়া আরও আছে মন, বুদ্ধি, প্রাণ ও দেহ। নিছক ভাব বা দেশপ্রীতি তাই খণ্ড সত্যমাত্র, জীবনের পূর্ণ সত্যকে তা’ তখনই সফল করতে পারে যখন হৃদয়ের খেলা অতিমাত্রায় বেড়ে মনকে আচ্ছন্ন করে না, দেহ ও প্রাণের অভাব অভিযোগকে বিস্মৃত হয় না। বাঙালী অতিমাত্রায় ভাবপ্রবন হয়ে জীবনের যাত্রায় প্রতি পদে সকল জাতির নিকট পরাস্ত হয়েছে। বাঙালীকে সর্ব্বাগ্রে শিখতে হবে স্থির বিচারবুদ্ধির দ্বারা নিয়ন্ত্রিত গতি।
যুগ-দেবতা বা জাতির জীবন-দেবতা তার নিগূঢ় বিধানেই ইংলণ্ড ও ভারতের মিলন ঘটিয়েছে, তার পিছনে আছে এক অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য। আমাদের যে কোন ক্ষুরধার-বুদ্ধি নেতার অপেক্ষা, যে কোন সাময়িক জাতীয় আন্দোলনের চেয়ে এই যুগদেবতার প্রেরণা ও গতি অভ্রান্ত ও পরিণামে সুফলপ্রসূ। ভারতের মত একটা বিশাল মহাদেশ ও জাতিপরিবারের ভাগ্য বিপর্য্য়য়ের জন্য, সুখদুঃখের জন্য কোন বিশেষ ব্যক্তি বা জাতিকে দায়ী করা নিরর্থক। তার ব্যর্থতা ও পতন, তার রাজনীতিক ক্ষতি বৃদ্ধির কারণ এক নয় বহু, শুধু বাহিরের নয়, অন্তরেরও। ভারতের জাতীয় জীবনের এই উত্থান পতন এ হচ্ছে তার জীবন-দেবতার এক একটি পদক্ষেপ, এই বৃহৎ জাতিগোষ্ঠীর সুখদুঃখ বেদনা বন্ধন হচ্ছে সেই জীবন-শিল্পীর হাতুড়ীর ঘা’—যাতে করে মানব-প্রগতির এক পূর্ণ পরিণতির ছন্দে তার ভাগ্য-দেবতা ভারতকে নিপুণ অভ্রান্ত হস্তে গড়ে তুলছেন। প্রত্যেকটি পরাজয়, প্রতি বৈদেশিক অভিযান ও কৃষ্টির পরাভব ও খণ্ড-গ্রাস ভারতের জীবন রাগিণীকে এক অপূর্ব্ব ঐকতানে ও ছন্দে পূর্ণ থেকে পূর্ণতর করে তুলছে। তার অদৃষ্টের তরঙ্গিত গতি তাকে দিয়েছে ও দিন দিন দিচ্ছে অধিকতর যোগ্যতা—নিজের আদর্শকে ফুটিয়ে ফলিয়ে সার্থক করে তোলবার জন্য। ভারতের সে আদর্শ নিছক রাজনীতিক স্বরাজ নয় কিন্তু মানবজাতির মুক্তি—‘তার স্বারাজ্য’। ভারতে এতগুলি জাতি, ধর্ম্ম, আচার ও ক্বষ্টির সমন্বয় করতে গিয়ে আমরা যে মহানতর ব্যাপকতর জাতীয়তা বা ন্যাশনালিজম্ক গড়ে তুলছি তা’ এদেশের নিছক রাজনীতিক মুক্তি নয়, একথা যে কোন চিন্তাশীল ব্যক্তি না স্বীকার করে পারবেন না। এ সত্য যে ভারতের মূল জীবন-সত্য ও ইতিহাস প্রতিপাদ্য বস্তু।
য়ূরোপ ও অন্যান্য মহাদেশে যে পরীক্ষা যে চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে—সঙ্কীর্ণ অনুদার খণ্ড খণ্ড জাতীয়তার অভ্যুত্থানে, ভারতে বিধাতার ইঙ্গিতে সজ্ঞানে হোক অজ্ঞানে হোক ব্রিটিশ শক্তির হাতে সেই মহতী চেষ্টা চলেছে। এ মহাব্রতের উদ্যাপন না হ’ওয়া অবধি ইংলণ্ডের ছুটি নাই, ভারতের মুক্তি নাই। য়ুরোপে কিন্তু এত দেশ এত জাতি থাকতে একাজের জন্য ইংরাজই বা প্রেরণা পেল কেন, প্ররোচিত হ’লো কেন? কারণ তাদের স্বভাব ও প্রকৃ্তিতে, তাদের গুণে ও সামর্থ্যে তারাই তখন ছিল যুগশক্তির হাতে এই উদ্দেশ্য সাধনের পক্ষে উপযুক্ত যন্ত্র ও উপকরণ। ভাবপ্রবণ ও তরলপ্রকৃতি ফরাসী জাতি এত বড় লক্ষ্য পথে ভারতের নিয়ামক হতে পারতো না, তাই এদেশ গ্রাস করতে করতে তারা পরাস্ত হয়েছিল। জার্ম্মান জাতি তাদের অতি—মাত্রায় নিয়মতান্ত্রিক কঠিন অনমনীয় মন নিয়ে এতবড় সামঞ্জস্য ও সমন্বয়ের কাজে নিশ্চয়ই অপারগ হ’তো। তাদের অধিকৃত উপনিবেশে কোথায়ও তারা কোন স্বতন্ত্র সবল জাতীয়তার প্রাণ-প্রতিষ্ঠা করতে আজও পারে নাই। বহু শতাব্দি ধরে জার বংশের যথেচ্ছাচারী শাসনে নিষ্পিষ্ট রুষ জাতি এ ভার পেলে হয়তো মুক্তির নামে নবতর শৃঙ্খলেরই রচনা করতো—মানুষের এত রকম বৈচিত্র্যকে অক্ষুন্ন রেখে মুক্তিকে বিগ্রহ দিতে রূপায়িত করতে গিয়ে তারা ব্যর্থ-ই হতো। বৃটিশ জাতি তাদের স্বাভাবিক মুক্তিপ্রিয়তা ও ন্যায়নিষ্ঠায়, তাদের ধীর একাগ্র হিসাবী মন নিয়ে, তাদের সুশৃঙ্খল কর্ম্ম ও গঠন-প্রবণতায় একাজের উপযুক্ত আধার ও যন্ত্র সে বিষয়ে সন্দেহ কি? ভারতের স্বরাজ—যা’ বহু জাতি, বহু ধর্ম্ম ও বহু ভাষা এবং আচারের সমন্বয় ছাড়া আর কিছুই নয়, তা গড়বার জন্য চাই কতখানি ধৈর্য্য ও নিপুণ একাগ্র কর্ম্ম-প্রবণতা সে কথা সহজেই অনুমেয়। আজ রাজনীতিক হিসাবে ইংরাজ আমাদের বিজেতা ও শাসক বলে আমরা তাদের প্রতি বিরূপ; নহিলে এই উগ্র জাতীয়তার মোহ মুক্ত হয়ে সম বিচারশীল দৃষ্টিতে দেখলে বোঝা যায়, ইংরাজ ছাড়া ইউরোপের আর কোন জাতিই কোন দেশকে বাহির থেকে পরাধীন করেও তার আত্মাকে—তার অন্তর্নিহিত মনুষ্যত্বকে এমন করে জাগিয়ে দিতে পারে নাই। এটা যে ইংরাজ সব সময় সবটুকু সজ্ঞানে করেছে তা নয়; তাদের জীবন্ত রাজসিক প্রকৃতিই এইরূপ, যে, তাদের জীবনদায়ী স্পর্শে বাংলার ও পরে ভারতের ধর্ম্ম, সাহিত্য, কলা, জ্ঞান, বিজ্ঞান ও রাজনীতি সমস্তই মুঞ্জরিত পুষ্পিত পল্লবিত হয়ে উঠেছে। মোগল সাম্রাজ্যের অধঃপতনের যুগ আরও দীর্ঘ হ’লে, পাশ্চাত্যের জীবনদায়ী স্পর্শ শীঘ্র না এলে এ জাতি ও এদেশ পতনের ও অবনতির আরও গভীরতর গহ্বরে প্রবেশ করতো সে বিষয়ে সন্দেহ কি? ইতিহাসই তার জ্বলন্ত সাক্ষী।
আফ্রিকা ও আমেরিকায় ইউরোপ ও ইংলণ্ডের জন্য যে কাজ বিধিনির্দিষ্ট হয়ে ছিল, সেখানে যে জাগরণ আনবার ছিল, ভারতে প্রারব্ধ মহাব্রত তার চেয়ে বহুগুণে গুরুতর। তাই নিগ্রো-আফ্রিকা ও রেডইণ্ডিয়ান্ আমেরিকাকে মুছে ফেলে সে সব জাতিকে উৎসন্ন করে ঐ দুই মহাদেশে নূতন উপনিবেশ নবতর শ্বেত সাম্রাজ্য গড়া সম্ভব হয়েছিল। কিন্তু মানব সভ্যতার উদয়াচল এই ভারতকে তেমন করে মুছে গড়া সম্ভব হয় নাই, তা’ হবার কথাও নয়। তাকে নূতন প্রাণধারায় সচেতন ও সঞ্জীবিত করে ভারতের মনে এক নূতন চিন্তা, অভিনব দৃষ্টি খুলে দেওয়া আবশ্যক হয়েছিল, তা’ না হলে আধুনিক জগতে ভারত তার নির্দ্দিষ্ট আসন কেমন করে লাভ করবে? ভারতের সেই রূপান্তর সেই নবদীক্ষা এখনও চলেছে, এখনও সম্পূর্ণ হয় নাই; যত দিন সে কাজ পূর্ণ না হবে তত দিন কোন শক্তিই ইংলণ্ডকে ভারতের অদৃষ্টের ও গঠনের নিয়ন্তার আসন থেকে চ্যুত করতে পারবে না। একথা ইংলণ্ড ও ব্রিটিশ জাতির তোষামোদ নয়, ইহা ইতিহাসের কঠিন সত্য। জাতির অর্ন্তদেবতার হাতের নির্দিষ্ট অস্ত্র ও উপকরণ হচ্ছে ইংরাজ ও ভারতবাসী, এখানে ভূয়া ভাবপ্রবণতার বা উচ্ছাসের স্থান নাই। উজ্জ্বল গরীমাময় এক ভবিষ্যতের জন্য চলেছে সারা জগৎ জুড়ে নিঃশব্দ বিপুল আয়োজন,—কত না জাতির মিলন ও বিরোধের মধ্য দিয়ে, কত বিজয় ও পরাজয়, উত্থান ও পতনের আবর্ত্তনে।
আজ কাল আমরা এক দেশের দ্বারা বা এক জাতির দ্বারা অন্য দেশের ও অন্য জাতির শোষণের কথা প্রায়ই শুনতে পাই। ন্যাশনালিষ্ট দল উচ্চ কণ্ঠে ঘোষণা করেন, যে, অসভ্য আফ্রিকা ও আমেরিকার অতুল ধনরত্ন লুণ্ঠনের ফলে গড়ে উঠেছে ঘুরোপের আধুনিক বৈশ্য সভ্যতা ও সম্পদ। ভারতের শিখ মরাঠা ও মোগলের দুর্ব্বল হস্ত থেকে ছিনিয়ে নেওয়া অর্থ দিয়ে গড়ে উঠেছে ইংলণ্ডের অর্দ্ধ পৃথিবীব্যাপী সাম্রাজ্য ও বাণিজ্য প্রভাব।
কথাটা এক দিক দিয়ে সত্য হতে পারে। এমনি করেই এক সাম্রাজ্যের পতনের ফলে অন্য সাম্রাজ্য গড়ে থাকে, নদীর এক কূল ভেঙ্গে অন্য কূল জেগে ওঠে। কিন্তু রাগ ও বিদ্বেষের দৃষ্টিতে ইতিহাস পাঠ করলে মানব জাতির উত্থান পতনের মূল সত্য ধরা যায় না। সাগরের গভীর বুকে যেমন গুপ্ত সব স্রোত ধারা চলে, জাতির জীবন সাগরে তেমনি চলে কখন দৃশ্য কখনও বা অদৃশ্য বিপুল সব শক্তির ধারা—যা’ দেশের, জাতির ও নূতন নূতন কৃষ্টির জন্ম এবং পুষ্টির কারণ হয়।
অষ্টাদশ শতাব্দির প্রারম্ভে যখন যুগ-দেবতার গোপন হস্ত ইংলণ্ড, ফরাসী, স্পেন ও জার্ম্মাণী আদি জাতিকে নূতন করে জগৎ-গঠনের শানিত অস্ত্ররূপে গড়ছিল, তখন এসিয়া নিগ্রো-আফ্রিকা ও রেড ইণ্ডিয়ান আমেরিকা অসভ্যতার ও অন্ধ কুসংস্কারের গাঢ় তমিশ্রায় ডুবে গেছে। তখন য়ুরোপ ছিল তরুণ, সবল, জীবন্ত ও প্রাণবান। অর্থ, সম্পদ ও ভোগোপকরণের আছে এক স্বাভাবিক জীবন-মুখী গতি; মানবজাতির যে অংশ যখন থাকে সক্রিয় ও সিসৃক্ষু, লক্ষ্মী তখন চলেন সেই দিকে। ধনৈশ্বর্য্যের দেবী লক্ষ্মীকে কখন তামসিক জড়কে আশ্রয় করতে দেখেছ কি? শ্রীচলে জীবনেরই সঙ্গে, তাই চিরদিনই বীরভোগ্যা বসুন্ধরা। যখন এসিয়া, আফ্রিকা ও আমেরিকায় ছিল অন্ধকারের যুগ, অবসাদ ও গতানুগতিকতার যুগ, তখন য়ুরোপ ও ইংলণ্ড যে সজীব ছিল তার নিশ্চিত লক্ষণ হচ্ছে তাদের সমৃদ্ধ হবার ও উন্নত হবার প্রয়াস— পৃথিবীর চতুর্দ্দিকে ছড়িয়ে পড়ে ধন সম্পদ আহরণ করে সভ্যতা কলা সাহিত্য সাম্রাজ্য সৃষ্টি করবার তাদের অদম্য প্রাণ শক্তি ও প্রেরণা। সে অগ্নিময় প্রাণধারাকে কে রুদ্ধ করে রাখতে পারে?
যদি সঞ্চিত ঐশ্বর্য্য ও অতীত গরিমাই জাতিকে বড় করতে পারতো তা’ হলে আমাদের স্বর্ণপ্রসূ দেশে প্রায় অক্ষয় কুবের-সম্পদ তো ছিলই, সে ধনরত্ন ও গরিমা তো হিন্দু মুসলমানকে ঐ অবসাদ ও মৃত্যু হতে বাঁচাতে পারে নাই। আমরা যে তিলে তিলে মরছিলাম, আপনাতে আপনি সঙ্কুচিত হয়ে চলেছিলাম তার নিশ্চিত ধ্রুব লক্ষণ আমাদের সঙ্কীর্ণতা, অনুদারতা, ব্যর্থ আর্য্যত্বের গর্ব্ব এবং আস্ফালন, যার ফলে আমরা জগতের প্রাণদায়ী স্পর্শ থেকে জাত ধর্ম্ম বাঁচিয়ে ক্রমশঃ নিজের সঙ্কীর্ণ গণ্ডীর মাঝে সরে পড়ছিলাম। বৃহত্তর মানবগোষ্ঠীর সঙ্গে সম্বন্ধ হারিয়ে এরকম করে আত্মসর্ব্বস্ব হয়ে কোন জাতিই দীর্ঘকাল বাঁচে না।
ইংলণ্ড ও য়ুরোপ তখন জীবন্ত বলে—মহামানব নরনারায়ণের সজীব প্রাণবান অঙ্গ বলে স্বতই জগতের ধনরত্নরূপ রুধির আপনার অঙ্গে টেনে নিয়ে নিজেদের সঞ্জীবিত করে তুলেছিল। শরীরের যে অংশ গলিত ও মৃত সে অংশ থেকে রক্তধারা সরে গিয়ে জীবন্ত অংশকেই আশ্রয় করে। সজীব জাতির দ্বারা দুর্ব্বল ও নির্জীব জাতির এই সাময়িক পরাজয় ও শোষণকে ভয় করো না, এটা চির দিন কখন চলতে পারে না। যা’ তোমার কাছ থেকে আজ অপহৃত হচ্ছে তা’ দশগুণ হয়ে ফিরে আসবে এক দিন; কারণ মানবজাতির শরীর এক অখণ্ড বস্তু, রক্তধারা বা ধনরত্ন শরীরের যে অংশেই সচল থাক তা’ পরিণামে’ গোটা শরীরটাকেই সঞ্জীবিত ও পুষ্ট করে, একাঙ্গকেই মাত্র করে না। লক্ষ্মী চঞ্চলা; ব্যবসায়ে, বাণিজ্যে, কৃষিতে, কলায়, শিল্পে ও রাষ্ট্রে তাঁকে সচল (in circulation) রাখলেই লক্ষ্মী বাড়েন এবং সেই সিসৃক্ষু মানব সমাজকে আশ্রয় করে থাকেন। বদ্ধ জলের মত রুদ্ধ সঞ্চিত ঐশ্বর্য্য জাতির মৃত্যুর কারণ হয়।
লক্ষ্মী যে জাতিকে সাময়িক উপেক্ষায় ছেড়ে চলে যান, যে অধোগামী জাতি জীবনের ধারা থেকে বঞ্চিত হয়, তারও এই অপচয় স্থানুত্ব ও অধোগতি পরিণামে কল্যাণই প্রসব করে। কারণ একটি জাতি বা সমাজেরও আছে মাটির ধর্ম্ম ও স্বভাব। সেই মাটিই অধিক ফলপ্রসূ হয় যা’ সব চেয়ে বেশী কর্ষিত হয়, ওলটপালট করা হয়। মাটির মত জাতিরও উৎপাদিকা শক্তি বাড়ে যতই তাকে গভীর করে খনন করা— লাঙ্গল দেওয়া যায়, যতই তাকে ওলট পালট করে খুঁড়ে বিশ্রাম দেওয়া যায়, যাকে ইংরাজিতে বলে made to lie fallow। ইতিহাসের পাতায় পাতায় আমরা যদি ধীর চিত্তে মন দিয়ে খুঁজি, আমার বিশ্বাস প্রত্যেক নূতন সভ্যতা ও কৃষ্টির জন্মের পূর্ব্বে সে জাতির জীবনে এমনি একটা অজম্মায় ফেলে রাখার—বিশ্রামের—সংগোপনে অন্তর্পুষ্টির কাল খুঁজে পাব। ভারতে গত দুই শ’ বছরের ব্রিটিশ অধিকারের আমরা অভিযোগ করি, কিন্তু আজকার পরাক্রান্ত অর্দ্ধ পৃথিবীবিজয়ী এই ক্ষুদ্র দ্বীপ ইংলণ্ডের অতীতে সেই বহু শতাব্দিব্যাপী ভীষণ অগ্নি—পরীক্ষার কথা একবার ভেবে দেখ। এ জাতি চিরদিন এমন সুখগৌরবের উচ্চ শিখরে অধিষ্ঠিত ছিল না। বহিরাক্রমণ, লুণ্ঠন, কেণ্টিক ও টিউটনিক জাতির অধীনে দীর্ঘ ও নিষ্ঠুর দলন ও পরাধীনতা, রোমান অভিযান ও বিজয়, স্যাক্সন জলদস্যগণের দ্বারা খৃষ্ট জন্মের ৩০০ খৃষ্টাব্দ পর থেকে ৬০০ খৃষ্টাব্দ অবধি নিষ্ঠুর নিদারুণ অত্যাচার, একাদশ খৃষ্টাব্দ অবধি নর্ডিক জাতিদের অভিযানের পর অভিযান—দীর্ঘ সতর শতাব্দি ধরে ইংলণ্ডের ভাগ্যে এই অগ্নি-পরীক্ষা অল্প বিস্তর চলেছিল। দুর্দ্ধর্ষ বিজেতাদের সঙ্গে এই সংমিশ্রণ—বহু প্রাণধারা ও কৃষ্টির এই সমন্বয়ই বর্ত্তমান ইংরাজ জাতিকে দিয়েছে তাদের গুণভূয়িষ্ট, দৃঢ়, প্রতিভাদীপ্ত প্রকৃতি। এই দীর্ঘ সতর শ’ বছরের বিশ্রাম ইংরাজ জাতিকে দিয়েছিল প্রচুর অবসর—তাদের উগ্র শক্তিশালী বিজেতাদিগের রক্ত বংশধারা ও প্রকৃতি থেকে জাতি— গঠনের সার ও উপকরণ সংগ্রহ করে তা’ আত্মসাৎ করে নিতে। যে সব প্রাণবান জাতির আছে মানবের ক্রমবিকাশে দিবার কিছু অবদান সে জাতি এইরূপ শত শত অগ্নিপরীক্ষায়ও মরে না, দুঃখ বেদনা বন্ধন পরাজয় তাদের দেয় আরও উপচিত ও বর্দ্ধিত প্রাণশক্তি। কিন্তু যাদের মহামানবের ক্রম-পরিণতিতে দিবার কোন দানই নাই তারা প্রবলতর বিজেতার দ্বারা কবলিত ও নিঃশেষিত হয়ে গিয়ে তাদের রক্তে মাংসে মেধায় মনীষায় সঞ্চারিত হয়ে সেই প্রবলতর জাতিরই করে তেজ ও শক্তির বৃদ্ধি এবং পুষ্টি।
মানব জাতি-পরিবারের শরীরে কোন অপচয়, ব্যাধি বা আংশিক ক্ষয় স্থায়ী হতে পারে না। তার একাঙ্গ কোন কারণে রুগ্ন বা পক্ষাঘাতে অবসন্ন হলে সমস্ত মানবজাতি শরীরে চলে তারই দিকে প্রতিক্রিয়া— সেই অঙ্গে জীবন আনবার জন্য, সেই ক্ষীণ অংশে রুধির সঞ্চারিত করবার জন্য। লুণ্ঠন, আক্রমণ, অভিযান এই সব রূপ ধরে আসে ঐ প্রতিক্রিয়া। মানব জাতির কোন অঙ্গকেই হীনবল হতে বা নষ্ট হতে দেওয়া প্রকৃতির অপূর্ব্ব মিতব্যয়িতায় নাই। মুমূর্ষু অংশকে পুনরুজ্জীবিত করতে চারিদিক থেকে সেখানে প্রবাহিত হয় জীবনদায়ী নূতন প্রাণধারা, সৃষ্টির নব নব বীজ মন্ত্র ও ভাবরাশি। এর ফলে হয় সেই মৃত অংশ বেঁচে ওঠে, আর না হয়তো অন্য সজীব জাতি এসে সেই মুমূর্ষু শাখার রসে পুষ্ট হয়ে তাকে আত্মদেহে আত্মসাৎ করে নিয়ে সমগ্র মহামানব শরীরকে করে জীবন্ত পূর্ণাঙ্গ ও নিখুঁৎ।
ভারতের জীবনে এই পতন, সপ্ত শতাব্দী ব্যাপী এই বিরাম আজ দীর্ঘ দেখাচ্ছে। কিন্তু নিরাশ হবার কোন কারণ নাই, যেহেতু প্রকৃতিতে আশু নিরাময়তার কোন সহজ পথ্য ও ঔষধ দুর্ল্লভ। প্রকৃতি গড়ে সব কিছুই পরম ধৈর্য্যে, স্থায়ী এবং অটুট করে। শক হুন গ্রীক অভিযানের সময় ভারত যে রকম করে বিজেতাকে আত্মসাৎ করে নিয়েছিল, জাতিভেদ-দুষ্ট পরবর্ত্তী গোঁড়া ভারত সে রকম রক্তের অবাধ মিশ্রণ রোধ করে রাখলেও কৃষ্টির মিশ্রণ ও আদান প্রদান ঠেকাতে পারে নাই। আজ বনে পর্ব্বতে ও সুদূর গ্রামে ছাড়া সর্ব্বত্রই শিক্ষিত নাগরীক ভারত অতীত থেকে এক রকম নিশ্চিহ্ন হয়েই নবরূপ নিয়েছে—বিশেষতঃ পাশ্চাত্যের তরঙ্গাভিঘাতে। পাশ্চাত্যের বস্তুতন্ত্র বুদ্ধি এসে মিলেছে ভারতের মনীষায়, ধ্যানে ও ঋষি-প্রতিভায়। রামমোহন, রবীন্দ্রনাথ, বিবেকানন্দ, গান্ধী, শ্রীঅরবিন্দ হচ্ছেন য়ুরোপ ও এসিয়ার এই অপূর্ব্ব কৃষ্টি-পরিণয়ের সন্তান।
ব্রিটিশ জাতি ভারতের নিয়ামক ও কর্ণধার হয়ে তত দিন থাকবেই যত দিন ভারতের গঠনে আছে তাদের আবশ্যকতা। এই মুমূর্ষু জাতিকে তাদের প্রাণের তড়িৎ-প্রবাহে জাগাতে যুগদেবতা এনেছেন এই রাজসিক ব্রিটিশ জাতিকে, পাশ্চাত্যের জ্ঞান বিজ্ঞান ও তাদের প্রাণদায়ী সংস্পর্শ-ই এদেশে এনেছে অখণ্ড জাতীয়তা বোধ ও নূতন কর্ম্মপ্রেরণা। এসিয়া তার চিরাচরিত অভ্যাস ও আচারের বাঁধা পথ ছেড়ে, তামস জড়তা থেকে রাহুমুক্ত হয়ে পুরাতনের মোহ থেকে মুখ ফেরাতে শিখেছে রহস্য-গূঢ় অজ্ঞাত ঐ ভবিষ্যতের উদয়াচলের দিকে। কিন্তু ভারতের পুণরুজ্জীবন এখনও সম্পূর্ণ হয় নাই। ভারতের তন্দ্রা ছুটেছে বটে কিন্তু সহসা-জাগ্রতের আবিল তন্দ্রালস মন নিয়ে সে এখনও হাতড়াচ্ছে,জাগ্রতের সরল মন ও স্বচ্ছ দৃষ্টি ফিরে পায় নাই। এখনও সে শত্রু মিত্র চেনে না, সে যাকে দেখে একটা অজানিত আতঙ্কে তাকেই শত্রুজ্ঞানে আঘাত করতে চায়। আজ সে ইংরাজকে ভাবছে শত্রু,কাল মুসলমানকে, পরক্ষণেই আবার তাদের অভিজাত বংশকে—দেশের শিল্প বাণিজ্যের নির্ম্মাতাকে ঠাওরাচ্ছে দেশের দুর্গতির মূল কারণ বলে। বহু ভাষায় আধ আধ জড়িত কণ্ঠে নবজাগ্রত তন্দ্রালস ভারত তার সাধ আশঙ্কাকে দিচ্ছে বাণী। তাই বলি এখনও ভারত তার জাগ্রতের গোটা মনটি ফিরে পায় নাই।
আমাদের এত দিনের এই বিশৃঙ্খল আন্দোলন, আবেগ ও অসহিষ্ণু ভাবাতিশষ্য সত্ত্বেও ভারত সেই জাতীয় একতা গড়ে তুলতে পারে নাই যা’ ব্যতীরেকে তার স্বাতন্ত্র্য সম্ভব নয়। এমন কি যাকে আমরা গোল টেবিলের আধা-স্বরাজ বলে গালি দিই তারও লোভ আমাদের মাঝে নারীসুলভ গৃহকলহের সৃষ্টি করছে। বৈঠকের পর বৈঠক, কন্ফারেন্সের পর কন্ফারেন্স একটুখানি কার্য্যকরী একতাও আনতে পারে নাই। কংগ্রেস ও মহাত্মাজীর সমবেত চেষ্টাও জগৎতে দেখাতে অসমর্থ হ’লো, যে, ভারত তার দলগত ও সম্প্রদায়গত হীন স্বার্থ ছেড়ে মুখ্যতঃ স্বরাজ চায়। আমাদের মধ্যে কোথায় সে একতা, সে দরদ ও সহকর্ম্মীর একপ্রাণতা, কোথায় সে নিঃস্বার্থ অকুণ্ঠ জাতীয়তাজ্ঞান যা’ এই জাতি-বিদ্বেষ ও সাম্প্রদায়িক বিষ নষ্ট করে ভারতের আনবে কল্যাণ? কেন এমন হ’লো? কারণ গত ত্রিশ বছর ধরে আমরা বাহিরের ইংরাজকে আঘাত করতে আমাদের সমস্ত শক্তি অপচয় করেছি এবং অন্তরের শত্রুকে করেছি উপেক্ষা। জাতির অন্তরের অশুদ্ধি ও দৈন্য ঘুচাতে চাই নাই। সে চরিত্রের দৈন্যের ফলে এসেছে বার বার বহির্জাতির আক্রমণ ও তাদের হাতে ভারতের পরাজয়। জাতির প্রায়শ্চিত্তের জন্য ভগবান এনেছেন এই পরাজয়—মনঃক্ষোভে আমরা চেয়েছি করতে বিধাতার প্রদত্ত সেই প্রায়শ্চিত্তকে অভিশাপ। আত্মবিস্তৃত ও দুর্ব্বল যা’ করে থাকে আমরা করেছি তাই—কেবলি বৃথা বিলাপ, বার্থ অভিমান, নিরন্তর অভিযোগ। জাতির শরীরের গলিত বিষব্রণ ঢাকবার এখন আর কোন উপায়ই নাই, আর এ ছলনা করবার কোন পথই নাই, যে, ভারত জাতি ধর্ম্মে বা কৃষ্টিতে —কোন দিক দিয়েই এক। আত্মকলহের ক্ষতে তার সর্ব্বাঙ্গ গিয়েছে ছেয়ে।
এতগুলি জাতীয়তা-নাশী বিষ জাতি-শরীরে থাকতে স্বতন্ত্র ঐক্যবদ্ধ ভারতের স্বপ্ন দেখা বৃথা। এখন কিছু কালের জন্য আত্ম—গঠনে মন দিতে হবে যা’তে সমাজে, ধর্ম্মে, রাষ্ট্রে ভারতের বহুভাষাভাষী জাতিগুলি একজাতীয়তার সমবেদনা শেখে। সামুরাই জাপান যেমন তাদের আভিজাত্য ও শ্রেণীভেদ বিসর্জ্জন দিয়ে একটি অখণ্ড একাত্ম জাতিরূপে উঠে দাড়িয়েছিল, বর্ণ জাতি গোষ্ঠী সম্প্রদায় সকল ভেদ ভুলে ভারতকেও তেমনি মিলিত হতে হবে। ভূয়া ধর্ম্মের নামে, হীন আচার ও শ্রেণীবিদ্বেষের নামে রচা শৃঙ্খল এখন ভারতের তরুণদের কুঠার হস্তে নির্ম্মম ঘায়ে ছিন্ন করে ফেলতে হবে। আমাদের মুখ্য সংগ্রাম বাহিরের ইংরাজের সঙ্গে নয়, ভিতরের শত্রুর সঙ্গে, নিজের চরিত্রের দৈন্যের ও হীন ব্যক্তিগত স্বার্থলোভের সঙ্গে, অন্ধ কুসংস্কার ও কদাচারের সঙ্গে।
আমাদের জাতীয় জীবনে যতগুলি দল বা শক্তি নেমেছে ভাঙ্গার কাজে সেই সব নটরাজের দক্ষযজ্ঞনাশী সেনাকে—জাতির সেই সব উন্মার্গগামী শক্তিকে এক করে একবার প্রয়োগ করতে হবে আমাদের সমাজ জীবনের শত শতাব্দী জীর্ণ অনাচার ও কদাচারের দুর্গটিকে ভেঙে ফেলতে, যাতে জাতির একীভূত সে শক্তি অচিরে করে দেয় দুর্ব্বার বলে ভিতরের সব বাধাকে চূর্ণ বিচূর্ণ। হিন্দু ও মুসলীম ভারত দুইকেই নিতে হবে এই শিক্ষা নবীন তুর্কীর কেমালের কাছ থেকে, ভারতের মুখ তাদের ফিরিয়ে দিতে হবে অতীতের জড় হিমাচল থেকে ভবিষ্যতের রক্তরাঙা উদয়াচলের দিকে। অতীতের শিশু আমরা জন্মেছি বর্ত্তমানের কোলে স্বপ্ন দেখতে ভবিষ্যতের, জাতির জীবন নিয়ে পাশ্চাত্যে যে সব পরীক্ষা চলেছে তারই আলোয় সে স্বপ্ন সফল করে তুলতে হবে। গভর্ণমেণ্ট তার আইন পরিষদগুলির মধ্য দিয়ে এবং জাতি তাদের পুনর্গঠিত কার্য্যকরী কংগ্রেসের দ্বারা দেশের ধর্ম্মে, সামাজিক জীবনে, শিল্পে, বাণিজ্যে, কৃষিতে, স্বাস্থ্যে আনবে দ্রুত আমূল পরিবর্ত্তন; তবেই ভারত প্রকৃত শক্তি উর্জ্জন করবে—স্বরাজ লাভ করতে এবং চারিদিকের অন্তর বাহিরের বিরুদ্ধ আক্রমণ ও প্রতিক্রিয়া থেকে সেই স্বাতন্ত্র্য রক্ষা করতে।
আজ বিজ্ঞান সুদূরকে করেছে নিকট, বিচ্ছিন্ন মানব পরিবারকে করেছে সংহত ও একাঙ্গ। আজ তোমার দুঃখ আমাকে অবিলম্বে আঘাত করে, এ-জাতির প্রতিক্রিয়া ও-জাতিকে দেয় কত সহজে দুলিয়ে। আজ পরস্পরের মঙ্গল অমঙ্গল সত্য সত্যই করে পরস্পরের ওপর নির্ভর। অন্ধ সঙ্কীর্ণ জাতি-গর্ব্বের দিন চলে গেছে, আর দশ জনকে বাদ দিয়ে একের সাম্রাজ্য-গর্ব্ব হয়েছে আজ দস্যুতার সামিল। সকল দেশের সব রাষ্ট্রতন্ত্র আজ তাই যাচ্ছে ক্রমশঃ এক পরম বিশ্বজনীনতার ব্যাপক কল্যাণের রঙে রঙিয়ে। যুগদেবতা ভারতের ভাগ্য নিয়ে তাঁর গোপন হাতুড়ির ঘায়ে যে রচনায় রত আছেন, যুগযুগান্তের যে গ্রন্থী বা জটগুলি দ্রুত হস্তে খুলছেন, ব্রিটেনের অতীতে ছিল এবং এখনও আছে তাতে প্রভূত দান। বহু জাতি, বহু ধর্ম্ম, বহু ভাষা, বহু ক্বষ্টিকে নিয়ে হিন্দু মুসলমান শিখ খৃষ্টান বৌদ্ধ জৈনের এই অপূর্ব্ব কারু-খচিত জীবন গড়ে উঠছে শুধু ভারত স্বাতন্ত্র্যেরই জন্য নয়, সারা জগতের মানুষের মুক্তির জন্য। আমাদের আদর্শবাদে রাশিয়া যে যুগবিপর্য্যয় এনেছে তার ফলেও কম ওলটপালট ঘটায় নি। আজ কা’কে ছেড়ে কার মঙ্গলের দিকে উদাসীন হয়ে তোমরা ভারতের রাষ্ট্রজীবন গড়ে তুলতে পার?
এসিয়ার জাতিগুলির মধ্যে ভারতই জেগেছে সব শেষে, তাই তার সমস্যাই সব চেয়ে জটিল। তাই এ-গঠনে চাই শক্তিশালী এক নিয়ামকের হাত, অগ্নির মত যা’ বহু উপকরণকে এক অনুপম রাসায়নিক নব সৃষ্টিরূপে গড়ে তুলতে পারে। ভারতের শত শতাব্দীর সামাজিক নিষ্পেষণে নিপীড়িত কোটী কোটী সন্তানের স্তিমিত প্রাণে এখনও চেতনা আসে নাই; কঠিন প্রাণহীন অনুদার ধর্ম্ম ও আচার বন্ধন থেকে ভারতের জাতি-আত্মা এখনও রাহুমুক্ত হয় নাই। এখনও সনাতন ভারত নারীর পূর্ণ মুক্তিকে ভয় করে, তার লক্ষ কোটী অস্পৃশ্যের জাগরণকে ডরায়। গোঁড়া মুর্খ মৌলবী-পুরোহিত-দলিত ভারত, শাস্ত্রভীত পুণ্যকামুক সংস্কার-অন্ধ ভারতকে পূর্ণ মুক্তির পথে নিয়ে যাবার জন্যে চাই জাগ্রত হিন্দু ও মুসলমানের কঠোর হস্ত। চীনের ভাগ্যের পুণরভিনয় আমরা এখানে চাই না, দলে দলে সম্প্রদায়ে সম্প্রদায়ে নেতায় নেতায় স্বার্থ নিয়ে হানাহানি আমাদের নিবারণ করতেই হবে।
ভারতের এই বহু ধর্ম্ম ও জাতির মহাসমন্বয়ে গঠিত যুক্ত-ভারতের ফেডারাল্ মহারাষ্ট্রের জন্য আমাদের সবাইকে দরকার হবে, কোন উপকরণটি বাদ দিলে চলবে না। অতীতে মৃত ভারতকে কষাঘাতে জাগাতে ব্রিটেনকে যতখানি আবশ্যক হয়েছিল, তার কৃষিশিল্পের স্বাস্থ্যসম্পদের গঠনে এই কর্ম্মকুশল জাতিকে তার চেয়ে ঢের বেশি দরকার হবে। ধর্ম্মান্ধ ও সনাতনী হিন্দু বা গোঁড়া মুসলীম সে সংগঠনের উপকরণ নয়, বরঞ্চ বাধা। এ দেশের আগামী দশ বিশ বছরের জীবনে আমরা চাই নিপুণ গঠনের সেনা, ভাঙার দানা দৈত্য নয়; ভাঙতে হবে যা’ তা’ হচ্ছে জীর্ণ পুরাতনের মোহ। নূতনকে গড়লেই সে পুরাতন ভেঙে পড়বে, গঠনই হবে সত্যকার ভাঙনের মন্ত্র। আমাদের অন্তরে আছে শত্রু; অন্তরে আছে দৈন্য, বাহিরে নয়। যে জাতি সমাজে ধর্ম্মে মুক্তি চায় না, পরস্পরের দিকে সমবেদনায় ও দরদে যারা অসাড় ও পঙ্গু তারা রাষ্ট্রীয় মুক্তির কথা বলে কি করে? মুক্তি যার শিরোমুকুট, সে কি বন্ধনের পূজারী হতে পারে?