বিষয়বস্তুতে চলুন

ভারত কোন্‌ পথে?/সন্ত্রাসবাদীর প্রতি

উইকিসংকলন থেকে

সন্ত্রাসবাদীর প্রতি

ভারতের পক্ষে লজ্জার কারণ, গৌরবের নয়

 সন্ত্রাশবাদ জন্মেছে নৈরাশ্যে ও বিফলতার ক্ষোভে। গুপ্ত ঘাতকের ছোরা ও বিস্ফোরক বোমা রাজনীতিতে আমদানী করলেই কি তার হীন পাশবতা ঘোচে? আসুরিক যা’, অন্ধ জিঘাংসু যা’, তা’ মানুষের চরিত্রকে পাশব ও নিষ্ঠুর করে দেয়, মানুষের অন্তরের মহত্ত্বকে ম্লান করে আনে। গুণ্ডা সর্ব্বত্রই গুণ্ডা, মেছোবাজারের গুণ্ডা, ধর্ম্মের গুণ্ডা, রাজনীতির গুণ্ডা এদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ নিকৃষ্ট ভেদ কোথায়? কোনও মহান উদ্দেশ্য সিদ্ধির জন্য নীচ জঘন্য উপায় ও অস্ত্রের প্রয়োগ তখনই যুক্তিযুক্ত হয় যখন আর সব উপায় ব্যর্থ হয়েছে, সাম দাম ভেদ সকল নীতির প্রয়োগ সমান নিস্ফলে গেছে। যুদ্ধ ও বিপ্লবের মত ব্যাপক হত্যা ও রক্তপাত যদি মন্দ ও আজকালকার উচ্চতর মানবতার চক্ষে নিন্দার্হ হয়, তা’ হলে যার মাঝে সন্মুখ যুদ্ধের শৌর্য্য নাই সে গুপ্তহত্যা আরও কত বেশী নিন্দার্হ ও জঘন্য! ভারতের উজ্জ্বল যুগের কত বীরত্বের কাহিনী আছে, ধর্ম্মপ্রাণ ভারতের সে সব যুগে মানুষ কখন অতর্কিতে পিছন হতে নিরন্ত্রকে হত্যা করা সমর্থন করে নাই, এ হীনতা জাতির ধারা ও স্বধর্ম্মের বিরোধী। অর্থগৃধ্ন গুণ্ডার ছোরাকে আমরা ঘৃণা করি, ধর্ম্ম বা সাম্প্রদায়িকতার নামে নির্জ্জনপথে যখন সেই ছোরা ধর্মান্ধের হাতে হিন্দু বা মুসলমানকে অতর্কিতে হত্যা করে তখনও আমরা তার জঘন্যতা বুঝি, অথচ রাজনীতিক অভিসন্ধি ও দেশপ্রেমের নামে সেই নরঘাতক অস্ত্রকে আমরা শ্রদ্ধার চোখে দেখি। এ কোন্ দেশের যুক্তি? আমাদের নৈরাশ্যের ও ব্যর্থতার ক্ষোভ আমাদের বুদ্ধিকে বিকৃত করেছে, নইলে এই তপোভূমির বীর-পুত্র বীর-কন্যাদের নিষ্ফল নিঃস্বার্থ প্রাণকে এই পঙ্কিল পথ ধরতে দেখে এমনভাবে আনন্দ পেতাম না।

 ১৯০৫ সালে ভারতের রাজনীতিক মুক্তির উপায় স্বরূপ আমিই দেশে বোমা ও সন্ত্রাশবাদের প্রথম প্রবর্ত্তন করেছিলাম। সেই থেকে আজ অবধি আমাদের রাজনীতিক জীবনের তলে তলে এই পঙ্কিল গুপ্ত অন্তঃস্রোত বয়ে চলেছে এবং মাঝে মাঝে বাহিরে আত্মপ্রকাশ করছে। দেশের বিশেষতঃ বাংলার এক দল তরুণ এই বাঁকা পথের মোহ ছেড়ে কিছুতেই বাহির হতে পারছেন না। আমাদের প্রথম বিপ্লববাদ মূলক সংবাদপত্র যুগান্তরের যুক্তিগুলি দুরপনের হয়ে এঁদের অন্তরে আজও জেগে আছে। ভারত বদলেছে, আমি বদলেছি কিন্তু এঁরা বদলান নাই। তাই সময় এসেছে যখন আমাকেই মুক্ত কণ্ঠে দেখাতে হবে এ পথের জঘন্যতা, এ উপায়ের ব্যর্থতা; যাতে ভারতের রাজনীতি আবার মুক্ত নির্ম্মল ও পূত ধারায় আমাদের বিপক্ষেরও অকুণ্ঠ শ্রদ্ধা আকর্ষণ করে এ জাতিকে আত্মস্থ ও সঞ্জীবিত করে তুলতে পারে। জাতির ও জগতের সামনে বিচারের জন্য আমার বক্তব্যটি ও যুক্তিগুলি খুলে বলার সময় এসেছে, যাতে এর নিরাকরণের একটা উপায় হয়।

 সন্ত্রাশবাদের বিরুদ্ধে এমন করে আমি লেখনী ধরেছি, কারণ যে দেশ রামমোহন, শ্রীরামকৃষ্ণ, বিবেকানন্দ, শ্রীঅরবিন্দ, রবীন্দ্র নাথের জন্ম দিয়েছে, সেই বাংলার ছেলে মেয়েকে হীন গুপ্ত ঘাতক ও পরস্বাপহারী দেখে আমি সত্য সত্যই অন্তরে ব্যথা ও লজ্জা পাই। এতে যে তাদের শুভ্র নিঃস্বার্থ প্রাণগুলি মলিন হয়ে যায়। ঝোপে ঝাড়ে লুকিয়ে দেশের নামে এখন তখন এই গুণ্ডামীর চেয়ে যে বহু শ্রেষ্ঠতর উপার ও পন্থা রয়েছে যা’ আমাদের দেশের রাজনীতিক মুক্তির জন্য ব্যাপক ভাবে অমোঘ হস্তে প্রয়োগ করা যায়। সে সব পথ ও উপায় কি আমরা প্রয়োগ করে ব্যর্থ হয়ে তার পর এই নিকৃষ্ট উপায় গ্রহণ করেছি? তা’ যে নয় তা’ সন্ত্রাশবাদ বাংলায় কি করে এলো তার কাহিনী শুনলেই বোঝা যাবে।

 মডারেটদের ভিক্ষানীতির পরই সন্ত্রাশবাদের জন্ম, তখনও দেশে তিলকের Responsive Co-operation বা মহাত্মা গান্ধীর অহিংস অসহযোগ প্রয়োগ করা হয় নাই। পরবর্ত্তী যুগে অসহযোগের প্রয়োগও ব্যর্থ হয়েছিল কিন্তু তিলকের পন্থাটির পরীক্ষা আজও হয় নাই। সন্ত্রাশবাদ যে সকল দিকে ব্যর্থতার ফলে আপদ্ধর্ম্ম হিসাবে গ্রহণ করা হয় নাই তা’ প্রমান করা শক্ত নয়।

সন্ত্রাশবাদের জন্মকথা

 ১৯০৩ সালে যখন বাংলায় প্রথম গুপ্ত বিপ্লব-সমিতির সূচনা হ’লো, সে সময়টা আমাদের ইতিহাসে এক অন্ধকারের যুগ; দেশে তখন জীবনের কোন সাড়াই নাই, আশার কোন ক্ষীণ রেখা ও জাতির অদৃষ্টীকাশের পূর্বাচলে দেখা যায় নাই। দেড় শ’ বছরের যথেচ্ছ ব্যুরোক্র্যাটিক শাসনের ফলে তখন দেশের বিদেশী রাজ-শক্তি ও সিভিলিয়ান কর্ম্মচারী দল দেশবাসীর উন্নতির দিকে উদাসীন ও উদ্ধত হয়ে উঠেছেন। মানুষের প্রকৃতিই এই, যথেচ্ছ প্রভুত্বের অধিকার দীর্ঘকাল ভোগ করতে পেলে স্বভাবতঃই তার চরিত্র হয়ে পড়ে গর্ব্বিত অনমনীয় ও বেদরদী, এত বড় জাতির অদৃষ্টের অপ্রতিদ্বন্দ্বী নিয়ামকত্ব যারা দেড় শ’ বছর অবাধে নির্ব্বিবাদে ভোগ করেছে তাদের সে কার্য্য যে অভ্যাসে দাঁড়িয়ে স্বভাবগত হয়ে যায়। এই জাতির ও সমাজের অপ্রতিদ্বন্দ্বী নেতৃত্ব কোন এক যুগে ভারত এই ভাবে ব্রাহ্মণকে দিয়েছিল, তার কি বিষময় ফল ফলেছে আমরা তা’ জানি; প্রভুত্বের মদগর্ব্বে তপোবল হারিয়ে তারা দেশের কোটী কোটী সন্তানকে জাত্যভিমানের শিক্ষা দীক্ষা সংস্কার থেকে বঞ্চিত করে মূঢ় পশুর স্তরে নামিয়ে দিয়েছিল। সমগ্র মানব জাতির ইতিহাসে এত বড় হীন ক্রুর অত্যাচার আর কখনও অনুষ্ঠিত হয় নাই। কোটী কোটী ভারতবাসীর আত্মার এই অধোগতির চেয়ে রাজনীতিক পরাধীনতা তুচ্ছ ব্যাপার। রাজনীতিক সাতন্ত্র্য হারিয়েও আমরা বেঁচে আছি এবং বেঁচে থাকতে পারি; পরাধীন অবস্থায়ও আমরা বড় বড় মনীষীর জন্ম দিয়েছি; কিন্তু মুষ্টিমের উচ্চবর্ণের অত্যাচারে দেশের শতকরা নব্বই জন নারী ও শূদ্র একেবারে অমানুষ হয়ে গেছে; তার ফলে দুর্ব্বল সংহতিহীন ভারত বার বার একতাবদ্ধ দুর্দ্ধর্য বহিঃশক্তির কাছে পরাস্ত হয়েছে। পরবর্ত্তী যুগে ভারতের শাসক-সম্প্রদায় এই শ্বেত জাতিরা যেমন নিজেদের শ্রেষ্ঠত্বের অহঙ্কারে স্ফীত হয়ে দেশের মঙ্গল উপেক্ষা করেছিল, অতীতে দেশের শ্রেষ্ঠ বর্ণরাও তপোবল হারিয়ে সূত্রসর্ব্বস্ব ব্রাহ্মণত্বের গর্ব্বে দেশকে তেমনি এবং ততোধিক অধোগতি পাইয়েছিল এবং নিজেরাও অমানুষ হয়ে গিয়েছিল।

 যে যুগান্তরের যুগের কথা আমি বলছি তখন ভারতের শাসকসম্প্রদায় ও আই সি এস্ দল দেশের রাজনীতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার দিকে উদাসীন তো ছিলই, অধিকন্তু দেশব্যাপী এই পরাধীনতা-জনিত অসন্তোষ প্রকাশ করবার কোন বৈধ পথ জাতির সন্মুখে মুক্ত ও সুলভ ছিল না। মুষ্টিমেয় শিক্ষিত সম্প্রদায় ছাড়া গোটা জাতিটা ছিল মূক ও পঙ্গু। সুরেন্দ্রনাথ, রাণাডে ও মেটার কংগ্রেস তখন ছিল একটা বাৎসরিক মজলিস বা তর্ক সভা মাত্র, যেখানে বছর বছর বড়দিনের বন্ধে ধনী নেতারা একত্র হয়ে বক্তৃতা করতেন ও কতকগুলি অভাব অভিযোগের বাঁধিগত সরকার বরাবরে পেশ করে প্রস্তাব পাশ করতেন। এই ছিল তখনকার দেশসেবা ও রাজনীতি কিন্তু শিক্ষিত তরুণ সমাজে সত্যকার মুক্তি-স্পৃহা জেগেছিল, তার চিহ্ন বঙ্কিম চন্দ্রের আনন্দমঠ, কবিদের উদ্দীপনাময় জাতীয় সঙ্গীত ও এই গুপ্ত চক্রান্তের সূচনা।

 পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রচারেও য়ুরোপের কৃষ্টির সংঘাতে এই মৃতকল্প জাতি নূতন আশা আকাঙ্ক্ষার প্রেরণায় চঞ্চল হয়ে উঠেছিল, সঙ্গে সঙ্গে জেগেছিল পরাধীনতার ব্যথা ও আত্মপ্রকাশের আকুলতা। দেশের শিক্ষিত ইংরাজি নবীশরা ফরাসী বিপ্লব, ইতালীর জাগরণ, মার্কিন স্বাধীনতার সমর ও ডাচ্ প্রজাতন্ত্রের কাহিনী লুব্ধ প্রাণে পড়তো; পাশ্চাত্য কৃষ্টির মূল কথা—মুক্তি কামনা ও গণতন্ত্রের বাণী তাদের তৃষ্ণার্ত্ত মনে তুলেছিল প্রবল প্রতিক্রিয়া। দাদাভাই নৌরজীর “ভারতে ব্রিটিশের অ-ব্রিটিশ শাসন” ও রমেশ চন্দ্র দত্তের “ব্রিটিশ ইণ্ডিয়ার অর্থনীতিক ইতিহাস” এই বই দু’খানি বৈদেশিক শোষণের দিকে তরুণদের চোখ খুলে দিয়েছিল। এই সব পুঞ্জীভূত ক্ষোভ ও বেদনা প্রকাশ করে তৃপ্ত হবার উপযোগী কোন বৈধ রাজনীতিক আন্দোলন ও প্রতিষ্ঠান দেশে তখন ছিল না। সুরেন্দ্র নাথ, গোখলে ও রাণাডের মত নেতারা এই অসন্তোষ বহ্নিতে ইন্ধন জোগাতেন কিন্তু জাতির বুকের এ আগুন কোন্ পথে চালিত করলে কল্যাণ হবে তা’ তাঁরা জানতেন না। তাঁদের মনে স্বরাজ বা ফেডারেটেড্ ইণ্ডিয়া—অখণ্ড মহান যুক্ত-ভারতের কোন চিত্রই ছিল না, বক্তৃতার উচ্ছাসে ঔপনিবেশিক স্বায়ত্ত্ব শাসনের নাম তাঁরা করলেও সে আশা পূরণের উপযোগী কোন বৈধ আন্দোলন তাঁরা দেশে সৃষ্টি করতে পারেন নাই। তাঁদের সে বক্তৃতার আতসবাজীতে কি দেশবাসী আর কি ভারত সরকার কেহই কর্ণপাত করতেন না। বিলাতের পার্লামেণ্টে কমন্স সভায় ভারতের সম্বন্ধে আলোচনা কালে মেম্বারদের তা’ নিদ্রাকর্ষণ করতো মাত্র; সুরেন্দ্র নাথের ওজস্বিনী বক্তৃতা শিক্ষিত শ্রোতার কর্ণকুহর তৃপ্ত করেই ফুরিয়ে যেত।

 জাতির বুকের এই অশান্তি, এই আত্ম-প্রকাশের ক্ষুধা, এই পুঞ্জীভূত বেদনা কোনও সহজ মুক্ত কল্যাণকর পথ না পেয়ে অগত্যা অন্ধ রাগ ও দ্বেষে পরিণত হবে, বাঁকা গোপন গতি নেবে, তাতে আর আশ্চর্য্য কি? নাবিকহীন তরণী যেমন কর্ণধার বিনা আবর্ত্তে পড়ে বিপথগামী হয়, পিতা মাতার শিক্ষার দোষে সন্তান যেমন কুপথে গিয়ে সকলকে বিপন্ন করে ও নিজেও বিপন্ন হয়, তেমনি জাতিও প্রকৃত নেতার অভাবে বিকৃতি ও অকল্যাণের মাঝে গিয়ে আত্মঘাতী হয়। কর্ণধারহীন ভারতের এই অতৃপ্ত রাজনীতিক ক্ষুধা তাকে তার স্বধর্ম্মের বিপরীত দিকে নিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু তা’ হলেও আমাদের “যুগান্তর” বোমাকে স্বরাজ লাভের উপায় বলে কখন প্রচার করে নাই, “যুগান্তর” কখনও লেখে নাই, যে, গুপ্ত হত্যায় দেশের মুক্তি আনবে! “যুগান্তর” ছিল অকপট বিপ্লবাত্মক পত্রিকা, সে বলতো ব্যাপক বিদ্রোহের কথা, এখন তখন গুটিকতক রাজ কর্ম্মচারীকে হত্যা করে ভারত স্বাধীনতা পাবে এ কুযুক্তি যুগান্তর কখনও জাতিকে দেয় নাই। যার সহজ মোটা বুদ্ধি আছে সেও বোঝে এ যুক্তি কতখানি হাস্যকর, কতখানি অসার ও ভ্রমাত্মক। ভারতে সশস্ত্র বিপ্লব-চেষ্টাও ভ্রমাত্মক হতে পারে, নিরস্ত্র ভারতের পক্ষে তা’ সদুপায় না হতে পারে, কিন্তু তা’ গুপ্তহত্যার মত কুটিল ও ঘৃণ্য কখনই নয়।

 যাঁরা সে সময়ের গুপ্ত সমিতির মর্ম্মকথা জানেন, তাঁরা জানেন কিসে অনিচ্ছা সত্ত্বেও আমাদের রাজনীতিক গুপ্তহত্যার মধ্যে টেনে নিয়ে গিয়েছিল। আমাদের গুপ্তচক্রের নেতারা—যাঁরা সবাই-ই ছিলেন সুখ স্বাচ্ছন্দের কোলে লালিত, যাঁদের গায়ে বিপদের কোন আঁচ লাগার সম্ভাবনাই তখন ছিল না, তাঁরা এই গুপ্ত হত্যাকেই করেছিলেন আমাদের কাজে টাকা দিয়ে সাহায্য করবার একমাত্র সর্ত্ত। দেশের মুক্তি-যজ্ঞের এই যে প্রচার, এই যে আয়োজন, একাজে তাঁরা তবেই টাকা দেবেন যদি আমরা অমুক অত্যাচারী রাজ-কর্ম্মচারীকে,অমুক গভর্ণরকে, অমুক জজকে হত্যা করতে পারি। তাঁরা চলতেন আপাতঃ ক্রোধের ও দ্বেষের বশে। গুপ্ত হত্যার দ্বারা দেশের মুক্তির একটি সহজ আয়োজনকে তাঁরা এই ভাবে বিকৃত ও হীন পথে চালিয়ে অকালে নষ্ট করেছিলেন। সশস্ত্র বিদ্রোহে অনেক দেশ উঠেছে, তারা জগতের শ্রদ্ধাই অর্জ্জন করেছে! তপোভূমি ধর্মপ্রাণ ভারতে সেরূপ সশস্ত্র পশুবলের খেলা পরিণামে ভাল না হ’তে পারে, তা’ আমাদের জন্য বিধি নির্দ্দিষ্ট না হতে পারে, কিন্তু সন্মুখ-যুদ্ধ চিরদিনই প্রশংসার্হ, গুপ্ত নরহত্যার মত জঘন্য জিনিষ তা’ নয়।

 রাজশক্তির চোখে, আইনের কাছে হয়তো বিপ্লব ও গুপ্তহত্যা দুই-ই সমান রাজবিদ্রোহাত্মক; সমান অবৈধ। কিন্তু নীতির দিক দিয়ে, মানুষের মহত্ত্বের দিক দিয়ে একটির চেয়ে অপরটি বহুগুণে হীন, একটি হচ্ছে আপদ্ধর্ম্ম ও অন্যটি পাপ। সশস্ত্র বিদ্রোহের ফলে যুদ্ধ করে জাতি মুক্ত হয়েছে এ রকম বহু দৃষ্টান্ত ইতিহাসে পাওয়া যায় কিন্তু বোমা ও রিভলভার নিয়ে গুণ্ডার মত খুন করে করে কোনও দেশ কখন মুক্তি অর্জ্জন করেছে এ দৃষ্টান্ত কোন জাতির ইতিহাসেই নাই। যদি গুপ্তঘাতকে একটি সুনিয়ন্ত্রিত সুগঠিত রাজশক্তিকে ভাঙতে পারতো, এক বলদৃপ্ত বীর-জাতিকে তার দেড়শ’ বছরের সাম্রাজ্য ভয় প্রদর্শনে ত্যাগ করাতে পারতো তা’ হ’লে ভারতকে বহু আগেই কলিকাতার মেছো বাজারের এক দল গুণ্ডা স্বাধীন করে দিত। দেশের রাজনীতিক মুক্তির জন্য এত যুদ্ধ, এত বিপ্লব, এত বিপুল আয়োজন তা’ হ’লে কখনও আবশ্যক হ’তো না।

 আমরা দেশের প্রথম বিপ্লববাদীর দল ছিলাম উদ্দাম অন্ধ ভাবুক; ভারতে সশস্ত্র জাতীয় অভিযান ও বিদ্রোহ যে সম্ভব এ সম্বন্ধে কোন দ্বিধা, বিতর্ক বা সন্দেহ আমাদের আদর্শ-পাগল মনে ছিল না। যখন বিপ্লবী ভারত একটা দেশব্যাপী সংঘর্ষ ও অভ্যুত্থানের জন্য প্রস্তুত হয়েছে তখনই বোমা বা রাজনীতিক হত্যা দেশে অরাজকতা আনবার জন্য দরকার হবে এই ছিল আমাদের ধারণা ও মনের কথা। ১৯০৩ সাল থেকে একদল অন্ধ ভাবুক আমরা এই স্বপ্ন দেখছিলাম, এই অসাধ্য সাধনকে সফল করতে কাজে নেমেছিলাম। দেশব্যাপী সশস্ত্র জাগরণ সম্ভব বলে আমাদের ধারণা হয়েছিল, তার আর এক কারণ আমাদের গুপ্তচক্রের নেতারা বলতেন মহারাষ্ট্র ও উত্তর ভারত মুক্তি-সমরের জন্য একেবারে প্রস্তুত, বাংলার প্রতীক্ষায় তারা পথ চেয়ে আছে, এখন বাংলার আয়োজন সম্পূর্ণ হ’লেই হয়। ১৯০৭ সালে সুরাট কংগ্রেসের ভাঙনের সময়ে যখন আমি নিজে গিয়ে মহারাষ্ট্রের নেতাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে স্বচক্ষে দেখে এলাম, যে, একথা কত ভূয়া, কতখানি মিথ্যা, তখনই বাংলায় আরম্ভ হ’লো এই অসাধ্য সাধনে একা দাঁড়াবার—একা আয়োজন করবার পাগল সংকল্পের। আমাদের নিরাশ প্রাণ মোরিয়া হয়ে উঠে গাইতে লাগল “ওরে, একলা চলো রে”। ভাবুক বাংলার এই দোষ, তার কার্য্যকরী জ্ঞান এখনও কম, তখন আদৌ ছিল না। বাংলা চলতো অন্ধ আবেগে ও ভাবের দমকা ঝড়ের বশে। তবু তখনও আমরা এভাবে বোমা বা রিভলভার দিয়ে নিরর্থক রাজকর্ম্মচারী হত্যার কথা ভাবি নাই।

 ইতিমধ্যে ১৯০৫ সালে আমাদের গুপ্ত সমিতির আগুন উত্তেজনাকে চুরি করে নিয়ে তাকেই মোড় ফিরিয়ে দেশব্যাপী স্বদেশী আন্দোলন আরম্ভ হয়ে গেছে, স্বদেশী শোভাযাত্রার ওপর বরিশালে ও বৌবাজারে পুলিশ লাঠিবাজী করেছে, নির্ম্মম প্রহারে কন্ফারেন্স ও শোভাযাত্রা ভেঙে দিয়েছে। এতে আমাদের নেতারা গেছেন চটে। ক্রুদ্ধ বিচলিত তাঁরা এই তুচ্ছ ব্যাপারের প্রতিশোধ নেওয়াটাই বড় মনে করে নিছক বোমা বাজীর জন্যই টাকা দিতে স্বীকৃত হলেন, একটা সুদূর পরাহত বিদ্রোহের আর রুধির জোগাতে রাজী হলেন না। ধীর মস্তিষ্কে বসে দেশে বিপ্লবের আয়োজন করার অগত্যা কোন আশাই আর রইলো না। এক দল দরিদ্র তরুণ ভাবুক ছেলে ছাড়া এত বড় দুরূহ লক্ষ্যের জন্য দেশের কোথায়ও কারও কাছে সাড়া ও সহানুভূতি পাওয়া গেল না। সে আয়োজন সম্পূর্ণ করা দূরে থাক তা’ কোন গতিকে আরম্ভ করার অর্থ ও পাথেয় পর্য্যন্ত পাওয়া দুর্ল্লভ হলো। ক্রমাগত সিপাহী যুদ্ধের উত্তেজনাপূর্ণ কাহিনী পড়ে এবং পড়িয়েও তার একটা ক্ষীণ অনুকরণ—একটা আংশিক বিদ্রোহ দেশে কার্য্যকরী করে যে তোলা যাবে সে আশা আমাদের উকিল ব্যারিষ্টার কর্ত্তাদের দেখে মনে বাঁচিয়ে রাখা দুস্কর হলো। নিরস্ত্র প্রাণহীন মৃত বাংলার সৌখীন বিপ্লবী নেতাদের এই অর্থ—সাহায্য তাঁদেরই সর্ত্তে—জেনে শুনেই নিশ্চিত আত্মঘাতের পথে পা বাড়িয়েই তবে নিতে হলো।

 বিপ্লবী চক্রের যখন এই অবস্থা তখন এই বেদরদী ইজি-চেয়ার নেতাদের তাড়নায় আমাদের সহায় সম্বলহীন বুভুক্ষু দলটি নিছক অন্নবস্ত্রের অভাব মেটাবার জন্যই বাংলার জনপ্রিয় লেফটেন্যাণ্ট গভর্ণর সার এণ্ড ফ্রেজারের গাড়ীর তলায় মাইন পুঁতে তা’ উড়িয়ে দেবার চেষ্টা করেছিল। যে দারুণ অভাবের বশে আমরা অকালে এমন করে বোমার অপ-প্রয়োগে বাধ্য হলাম সেই অভাবেই আমাদের পরিশেষে রাজনীতিক উদ্দেশ্যে ডাকাতীতেও লিপ্ত করেছিল। যুগান্তরের দল গুপ্ত হত্যার মত ডাকাতী, লুণ্ঠন ও দেশের ধনীর অর্থ বলপ্রয়োগে গ্রহণ সমর্থন করতো ঠিক বৈপ্লবিক অভ্যুত্থানের অব্যবহিত পূর্ব্বের জন্য, তখন দেশে অরাজকতা আনবার জন্য। দেশবাসীর সর্ব্বস্ব সাধারণ চোর ডাকাতের মত অপহরণ করে দেশবাসীর শ্রদ্ধা হারানো এ দলের মত কখনও ছিল না। আপদ্ধর্ম্ম হিসাবে ধনীর টাকা বা অর্থবান ব্যবসায়ীর টাকা যা’ পরে কেড়ে নেওয়া হবে তা’ দেশে স্বরাজ স্থাপিত হলে প্রত্যর্পণ করা হবে এই ছিল আমাদের ধারণা। গভর্ণমেণ্টের ট্রেজারি লুণ্ঠন অবশ্য বিপ্লবীর চোখে আমরা বৈধই মনে করতাম কিন্তু ঢাকার অনুশীলন দল ও অন্যান্য দলেরা যে হীন রাহাজানী ও গৃহস্থের সর্ব্বস্বাপহরণ আরম্ভ করলো সে কেবল সরকারী অর্থ লুট করা কঠিন ব্যাপার বলেই। যুগান্তর দল দু’ এক জায়গায় কঠিন দারিদ্র্যের জ্বালায় নিতান্ত অনিচ্ছায় এ চেষ্টা করেছিল কিন্তু সৌভাগ্য ক্রমে সফল হয় নাই। অনুশীলন দলের দ্বারা এই হীন চেষ্টা সফল হবার পর থেকে আর দেশহিতব্রতী ও সাধারণ চোর ডাকাতে কোন পার্থক্যই রইলো না। এই ডাকাতী দ্বারা লব্ধ অর্থ খুব কম জায়গায়ই দেশের কাজে লেগেছিল। এ পাপের ধন নয় গেছে বেশ্যালয়ে অথবা গেছে স্বার্থপরের উদরে কিম্বা গেছে মোকদ্দমায় উকিল ব্যারিষ্টারের পেটে। আমি যখন আণ্ডামান থেকে ফিরে এসে ১৯২৩ সালে পণ্ডিচারীতে শ্রীঅরবিন্দ আশ্রমে যোগ-সাধনা করছি, তখন দু’টি ছেলে চাটগাঁর রেল কোম্পানীর লুণ্ঠিত দশহাজার টাকা নিয়ে সেখানে শ্রীঅরবিন্দকে দিতে গিয়েছিল। তারা শীঘ্রই ধরা পড়বে, এত কষ্টের টাকা যার হাতে গচ্ছিত রাখবে সেই সে অর্থ আত্মসাৎ করে খেয়ে ফেলবে। এই ভেবে তারা সে অর্থ মন্দের ভাল হিসাবে শ্রীঅরবিন্দকে দিতে গিয়েছিল। আমার মুখে এ সংবাদ পেয়ে শ্রীঅরবিন্দ বললেন, “বারীন, সাবধান! এ পাপের টাকা নিও না, এর পিছনে আছে এক অশুভ শক্তির ছায়া। এ সব অর্থে সাধনাশ্রম গড়া দূরে থাক কোন সৎকাজই কখনও হতে পারে না।” তারা নিরাশ হরে ফিরে এসে ভবানীপুরে একজন বন্ধুর কাছে টাকাটি গচ্ছিত রেখে ধরা পড়ে গেল, সেই টাকায় পরে সেই বন্ধুর দোতলা বাড়ী উঠেছে তা’ আমি জানি। আন্দামানে থাকতে আমরা দেশে পাঁচ হাজার টাকা তুলিয়ে কোন এক জন নির্ব্বাসিত বন্দীর ভাইএর হাতে রাখিয়েছিলাম। সে টাকা আমাদের কাজে লাগে নাই; কলেজ স্ট্রীটের খুব বড় একখানি বইএর দোকানে সে টাকা আজও মূলধন রূপে খাটছে। এসব অর্থের চিরদিনই এই পরিণাম। দেশকে লুণ্ঠন করে দেশের সেবা—তার মত নির্ব্বুদ্ধিতার ও হঠকারিতার কাজ আর নাই, এই সব হীন পথ ধরেই এত বড় ত্যাগের পথ মলিন হয়ে গেল, বিপ্লবীরা দেশের শ্রদ্ধা হারালো।

 বোমা ও ডাকাতীকে দেশসেবার সোপান করার এই হচ্ছে প্রকৃত ইতিহাস। রাশিয়ান এনার্কিষ্ট ও আইরিশ সিন্-ফিন্ দলের অনুপ্রেরণা আমাদের তরুণ মনকে পাগল করে তুলেছিল। পেটের দায়ে ও সৌখীন দায়িত্ব-জ্ঞানহীন নেতার পীড়নে অকালে বোমার এরকম অপপ্রয়োগে যে দেশের কতখানি ক্ষতি হবে, কত মূল্যবান প্রাণ বিফলে নষ্ট হয়ে যাবে একথা বোঝবার ধৈর্য্য ও ইতিহাস-জ্ঞান আমাদের তখন কারও ছিল না। আজ তা’ অবিসম্বাদিত ভাবে প্রমাণ হয়ে গেছে। দেশের মুক্তি-অভিযানও এই কুহকে পড়ে যে কতখানি পিছিয়ে গেছে, কত সময়, শক্তি ও অমূল্য প্রাণ নষ্ট হয়েছে, তা’র হিসাব আজ কে করবে?

সন্ত্রাশবাদ জাতীয় আন্দোলন আখ্যার যোগ্য নয়

 আমাদের দেশের ত্যাগী দেশপ্রাণ ছেলে মেয়েরা কেন যে বোমা রিভলবারের রাজনীতি ত্যাগ করবে তার আরও যুক্তিযুক্ত কারণ আছে। দেশে মহাত্মাজীর আনীত অসহযোগ আন্দোলন ব্যর্থ হয়েছে। দেশকে মুক্তির সন্নিহিত করবার জন্য এখন দরকার দেশব্যাপী এক নূতন আন্দোলন; এখন চাই এমন মন্ত্র, এমন মহান উচ্চ ভাব ও সত্য, যার কাছে হিন্দু মুসলমান খৃশ্চান নির্ব্বিশেষে দেশের সকল সন্তানের শির শ্রদ্ধায় আপনি নত হয়, সবার প্রাণতন্ত্রীতে ঘা পড়ে। তপোভূমি ভারতের দেশপ্রেম হবে আকাশের মত উদার নির্ম্মল ও বৃহৎ, রাগদ্বেষ-বর্জ্জিত অহঙ্কার-মুক্ত সে প্রেরণা শ্রদ্ধা ও প্রীতি আকর্ষণ করবে শুধু দেশবাসীর নয়, বাহিরের মানুষের, এমন কি আমাদের শাসকদেরও। মহাত্মাজীর অহিংস মহাব্রত তবু কতক পরিমানে সে পূজা পেয়েছে, কারণ দলের কর্ম্মী ও অন্য নেতারা জাতিবিদ্বেষ পোষণ করলেও মহাত্মাজী ও তাঁর অন্তরঙ্গরা তা’ করেন নাই। রাগ দ্বেষের বশে অন্ধ ও ক্রূর না হলে আমরা বড় কাজ ও দেশসেবা করতে পারবো না এর চেয়ে ভ্রমাত্মক ধারণা আর কি আছে? অথচ ধ্বংসমূলক যে কোন রাজনীতির প্রেরণা দেয়, গতি যোগায় যে বস্তু তা হচ্ছে (কোন না কোন আকারে) জাতি-বিদ্বেষ, ধর্ম্ম-বিদ্বেষ বা শ্রেণী-বিদ্বেষ। মানব কল্যাণের বাহন করা হয় পশুকে, অসুরকে। তাই ছারপোকা যেমন ডিম পাড়ে তেমনি আমাদের এই প্রবল ইংরাজ-বিদ্বেষ আজ বহু সাম্প্রদায়িক ও প্রাদেশিক খণ্ড বিদ্বেষের জন্ম দিয়েছে। এই হানাহানি কাড়াকাড়ী স্বার্থের হুড়াহুড়ির আবহাওয়ায় অনুরূপ উগ্র আত্মসর্ব্বস্ব স্বার্থ ছাড়া আর কিই বা জন্মাবে?

 দেশের তরুণদের এই কথা বুঝতে হবে, যে, এখানে একটা ওখানে একটা ব্যক্তিগত আক্রমণকে—বিক্ষিপ্ত নরহত্যাকে একটা জাতীয় আন্দোলন আখ্যা দেওয়া কোন ক্রমেই যায় না। পুলিশ রিপোর্ট সন্ত্রাশবাদ সম্বন্ধে যাই বলুক, এদলের ছেলেদের চেয়ে আর কেউ একথা ভাল করে জানে না, যে, আমাদের মধ্যে সামান্য মাত্র একতাই ছিল এবং ছোট ছোট দলের নেতাদের হীন ব্যক্তিগত পরশ্রীকাতরতা ও আত্মকলহে সেটুকু ঐক্যও ভেঙে পড়ছে। এই হিংস্র পথের তরুণদের মনে এখন আর কোন ঐক্য, ভ্রাতৃত্ব বন্ধন বা সহমর্ম্মিতা, কোন কার্যকরী পন্থা বা প্রোগ্রাম নাই। কৃষ্ণ রাজস শক্তির সন্তানদের ধর্ম্মই এই, এ বিয়ের এই মন্ত্র; বিষ আত্মপর বাছে না —সকলকে সমান ভাবে ধ্বংস করে। স্বার্থ মানুষকে ক্রমশঃ সঙ্কীর্ণ বিকৃত ও হীন করে আনে। স্বাধীন চীনের স্বাধীন সামরিক নেতাদের ব্যক্তিগত স্বার্থ ও হানাহানিই চল্লিশ কোটী মানুষের অমন দেশকে আজও একপ্রাণ হতে দিচ্ছে না। অথচ তারাও মুক্তি-যজ্ঞ আরম্ভ করে তারই ফলে ক্রমশঃ এই ব্যক্তিগত স্বার্থের নরকে নেমেছে। আমরা আংশিক স্বরাজও পাই নাই, অথচ বাংলার ও অন্যান্য প্রদেশের কংগ্রেসী রাজনীতির মেছোহাটার চিত্রটি একবার চেয়ে দেখো। হাতে অস্ত্র পেলে, জাতির কাছে ক্ষমতা পেলে এরাই চীনের মিলিটারী লর্ডস্দের সগোত্রজ হয়ে দাঁড়াবে।

 সন্ত্রাশবাদীরা তর্ক ভুলে বলতে পারেন, যে, তাঁদের পন্থাকে সন্ত্রাশবাদ নাম দেওয়া শাসকদের রাগের কথা; আসলে তাঁরা বিপ্লববাদী, তাঁদের আছে সুস্পষ্ট পথ ও প্রোগ্রাম, এলোমেলো ধ্বংসের দূত সন্ত্রাশবাদী তাঁরা নন। বেশ তো, আমার পূর্ব্ব সহযাত্রী বন্ধুদের যাঁরা বন্দীশালায় আজ ব্যর্থতার মাঝে জীবনের লহরী গুণছেন আর যাঁরা পালিয়ে বনে বাদাড়ে আছেন, তাঁদের যে কেউ আমাকে বুঝিয়ে দিন, যে, স্বরাজ-লাভের সুস্পষ্ট সুগম পন্থা ধরে দেশে তাঁরা একতাবদ্ধ সংহত এক দল গড়তে আজও পেরেছেন। আমরা যুগান্তরের দল গোড়ায় ছোট হলেও সংহত একপ্রাণ এমনি একটি দল গড়ে সুস্পষ্ট প্রোগ্রাম নিয়ে দাঁড়িয়েছিলাম। ঘটনাচক্রে এবং অসম্ভব বলে তা’ টিকে নাই, দেশের শুধু আংশিক জাগরণ এনে নিভে গিয়েছিল। তখন যা’ হয় নাই, এখন তা’ আরও অসম্ভব। এখন গভর্ণমেণ্ট অধিকতর সতর্ক, গ্রামে গ্রামে সহরে সহরে গুপ্তচর চার চক্ষু হয়ে ঘুরছে, তোমাদের কাজের ফলে উৎপীড়িত দেশবাসী তোমাদের বিরুদ্ধে দল বাঁধছে, এখন দেশব্যাপী কার্য্যকরী বিপ্লবের আয়োজন আদৌ সম্ভব নয়। তাই যদি হয় তবে দেশের সব চেয়ে নিঃস্বার্থ প্রাণগুলি বৃথা এমন করে নষ্ট করায় লাভ কি? দেশের কাঁচা অগঠিত মনগুলিকে ভুলপথে আলেয়ার মত ভুলিয়ে নিয়ে ব্যর্থতায় বিষিয়ে তোলায় লাভ কি? দেশের শিক্ষা, দীক্ষা, কৃষি, বাণিজ্যে, স্বাস্থ্যে, রাজনীতিতে, সমাজে, ধর্ম্মে সমস্ত ক্ষেত্রেই গঠনের কাজ অসমাপ্ত পড়ে রয়েছে, তোমাদের অমূল্য প্রাণগুলির আত্মদান ও সেবা যে সেখানে দরকার।

 অতর্কিত আক্রমণে এ রকম করে বিক্ষিপ্ত নরহত্যার আন্দোলন, যা’ আইনের কবলে ও পুলিশের পীড়নে বার বার ভেঙে পড়তে পারে এবং পড়েছে তা’কে জাতীয় আন্দোলন নামে গড়ে তোলা তো যাবেই না, তা’ দিয়ে এ পতিত জাতির কোন কল্যাণই হবে না। যা’ সমস্ত দেশকে নিয়ে আমূল নাড়া না দিতে পারে তাকে জাতীয় আন্দোলন বলি কি করে? একবার নয়, দুইবার নয়,— ১৯০৭, ১৯২৩ ও ১৯৩০ সালে তিন তিনবার দেশে সন্ত্রাশবাদ সজোরে মাথা তুলেছে, গভর্ণমেণ্টের গোয়েন্দা বিভাগ ও অর্ডিন্যান্সের চাপে তা’ তিনবারই মরেছে। একথা যে কতখানি সত্য তা’ আমি সরকারী কাগজপত্র ও অঙ্ক শাস্ত্রের অকাট্য প্রমাণ দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছি।

 ১৯০৭ সালে যুগান্তর, অনুশীলন ও আত্মোন্নতি আদি দল দেশে যে তরঙ্গ এনেছিল তা’ সাত বছরে ১২৫টি হত্যা ইত্যাদি সন্ত্রাশবাদমূলক দুর্ঘটনা ঘটায়, ১৯১৫ সালেই তার চরম প্রকাশ। কিন্তু Defence of India Actsএর বলে গুপ্তচক্রের ১০২৯ জন নেতা ও কর্ম্মীকে বেড়াজালে আটক করবামাত্র প্রাণহীন এ আন্দোলন মরে নিঃশেষে ফুরিয়ে গেল। ১৯১৬ থেকে ১৯১৯ অবধি অনুষ্ঠিত হত্যা ইত্যাদির বহর দেখলেই সন্ত্রাশবাদের অবশ্যম্ভাবী অপমৃত্যু সুস্পষ্ট প্রমাণ হবে।

সাল দুর্ঘটনা
১৯১৬ (জুন মাসের পর)
১৯১৭ ১২
১৯১৮ (জুন অবধি) ১০
১৯১৮ পরে
১৯১৯ (সেপ্টেম্বর অবধি)

 ১৯২১ সালে ধর্ষণ-মূলক আইন গুলি প্রত্যাহার করার পর ১৯২৩ সালে আবার এলো সন্ত্রাশবাদের তরঙ্গ। ১৯২৫ সালে বিধিবদ্ধ হয়ে Criminal Law Amendment Act বেড়াজালে ঘিরে নেতা ও কর্ম্মী নিঃশেষ করার ফলে পুনরপি ঘটলো এ তরঙ্গের অপমৃত্যু। তারপর ঘটলো ১৯৩০ সালে চাটগাঁর অস্ত্রাগার লুণ্ঠন ও খণ্ডযুদ্ধ—Chittagong Armoury Raid; বাঙালীর ছেলে সম্মুখ যুদ্ধ করতে পারে এই ভাবাবেগ উন্মাদনার ফলে বাংলার সন্ত্রাশবাদ আন্দোলন আর একবার উজ্জ্বল শিখায় জ্বলে উঠে অর্ডিন্যান্স, মিলিটারী শাসন ও অন্তরীণ নীতির ফলে এবার যে অপমৃত্যু মরলো তাতে দেশের চোখ এর অনিবার্য্য ব্যর্থতার দিকে বিশেষ করে খুলে দিয়ে গেল। এই আগুন এই শেষবারের জন্য দেশে কত হঠাৎ জ্বলে উঠে কত হঠাৎ নিভে গেছিল নীচের তালিকায় তা’ স্পষ্ট প্রতীয়মান হবে।

ঘটনা ১৯৩০ ১৯৩১ ১৯৩২ ১৯৩৩
হত্যা
হত্যার চেষ্টা
ডাকাতি ১০ ২০ ৩১
ডাকাতির চেষ্টা
চুরি বা লুণ্ঠন ১৮ ১৯
চুরি বা লুণ্ঠন চেষ্টা
বোমা নিক্ষেপ
বোমা বিস্ফোরণ
সশস্ত্র লুণ্ঠন

 এই চার বছরে সন্ত্রাশবাদের এই সব দুর্ঘটনার দরুণ হতাহতের তালিকা নিম্নে দেওয়া গেল।

১৯৩০
হত আহত
রাজকর্ম্মচারী ... ১১ ১২
বাহিরের লোক ... ১০ ১৪
সন্ত্রাশবাদী ... ২৬
১৯৩১
হত আহত
রাজকর্ম্মচারী ... ১৩
বাহিরের লোক ...
সন্ত্রাশবাদী ...
১৯৩২
হত আহত
রাজকর্ম্মচারী ... ১০
বাহিরের লোক ... ২৭
সন্ত্রাশবাদী ...
১৯৩৩
হত আহত
রাজকর্ম্মচারী ...
বাহিরের লোক ...
সন্ত্রাশবাদী ...

 ঝোপে ঝাড়ে গা ঢাকা দিয়ে এই ভাবে তাড়িত জীবন যাপন করে দেশের কাজ তো হয়ই না, এ রকম বিক্ষিপ্ত এক আধটা চেষ্টায় দেশের তেমন কোন রাজনীতিক শিক্ষা হওয়া বা জনসাধারণের মাঝে শক্তির প্রেরণা আসাও সম্ভব নয়, যেমন দেশব্যাপী কোন মুক্ত বৈধ আন্দোলনে হয়। এ হচ্ছে সাধারণ নিরক্ষর দেশবাসীর চোখে বাবুদের ব্যাপার, শিক্ষিত সমাজেরও মাত্র মুষ্টিমেয় একাংশের আন্দোলন। স্বদেশী এবং বিদেশী উভয়েরই পীড়নে ও শোষণে উদ্বাস্তু জনসাধারণের সঙ্গে এই সন্ত্রাশবাদের কোন নাড়ীর যোগ নাই। এত বড় বিপুল ভারতের এত জাতি এত বর্ণ এত ধর্ম্ম এত স্পৃশ্যাস্পৃশ্যের ভেদের মাঝে কয়েক জন পুলিশ-তাড়িত পলাতক কর্ম্মী এ আন্দোলনকে কখনই দেশব্যাপী আন্দোলনে দাঁড় করাতে পারবে না। অধিকন্তু আজ কাল আমাদের দেশের বহু তরুণ ও যুবকেরা পাশ্চাত্যের আমদানী করা আরও নূতন নূতন আদর্শে মেতে উঠছেন, যথা, সমাজ-সাম্যবাদ, কম্যুনিজম্ বা গণতন্ত্র। আমি এঁদের অনেকের সঙ্গে আলাপ করে দেখেছি, এই সোসালিষ্ট ও কম্যুনিষ্টরা সন্ত্রাশবাদীদের অবজ্ঞা ও ঘৃণার চোখে দেখে থাকেন, কোন বিশেষ লক্ষ্য বা পথ যাদের নাই এমন একদল ভ্রান্ত বুর্জোয়া বলেই তাদের মনে করেন। তাঁরা বলেন এই সন্ত্রাশবাদীরা দেশের শাসনচক্র হাতে পেলেই বর্ত্তমান ধনিকতন্ত্রকেই জাতীয়তার নামে পুনঃ প্রতিষ্ঠিত করবেন, জন-সাধারণের দুঃখ তাতে ঘুচবে না, তারা যে তিমিরে সেই তিমিরেই থেকে যাবে। তাদের গড়া বাবু-রাজ হবে ধুতিপরা ব্রিটিশ রাজ মাত্র। ব্রিটিশ রাজের চেয়ে অনেক দিক দিয়েই তা নিকৃষ্ট ছাড়া উৎকষ্ট হবে না। ভারতে সাম্যবাদের নব-পুরোহিত কংগ্রেস সভাপতি পণ্ডিত জোয়াহির লালঙ্গী সন্ত্রাশবাদকে বলেছেন—“That tragic and futile philosophy”—“সেই ব্যর্থ সর্ব্বনাশা আদর্শবাদ”। “Terroism is always a sign of political immaturity in a people” “—অর্থাৎ সন্ত্রাশবাদ জাতির রাজনীতিক নাবালকত্ব ও অপক্কতার চিহ্ন।”

 যখন দেশব্যাপী নৈরাশ্যের অন্ধকারে বোমার জন্ম হয়েছিল দেশের সে অবস্থা বহু দিন হ’লো কেটে গেছে। এখন শিক্ষিত ভারত এবং অশিক্ষিত জনসাধারণের কতক অংশ তাদের দেশ ও রাজনীতিক অধিকার সম্বন্ধে সজাগ হয়েছে। এদিক দিয়েও সন্ত্রাশবাদীর সে দেশ জাগাবার অছিলাও আর নাই। মহাত্মাজীর অহিংস মুক্ত দেশব্যাপী আন্দোলনের ফলে দেশের উপর দিয়ে বয়ে গেছে ভাবের তরঙ্গের পর তরঙ্গ, জাতিকে দিয়ে গেছে এক অটুট আত্মবিশ্বাস ও প্রচুর প্রাণশক্তি। এমন কি ত্রিশ বছর আগে যে ব্রিটিশ গভর্ণমেণ্ট ছিল তারও বহু পরিবর্ত্তন এসেছে, যে দৃপ্ত উচ্চাসনে বসে রাজশক্তি তখন যথেচ্ছাচারের রাজদণ্ড চালনা করতেন তাঁরা আর সেখানে নাই; দেশের উন্নতির দিকে অন্ধ সে অবজ্ঞা থেকে দেশের মুক্তিযজ্ঞ তাঁদেরও করেছে সচেতন, তাঁদেরও দিয়েছে অনেকখানি বদলে। এখন আর সে দিন সুদূর নয়, কল্পনারও অতীত নয়, যখন এই বিদেশী শাসনচক্র বৈধ উন্নতির খরবেগের ক্রমবিবর্ত্তনে সম্পূর্ণ স্বদেশী হয়ে যাবে। সে দিন আর দূরে নাই, যখন দেশের শাসনচক্রের স্বদেশী ও বিদেশী দুই শক্তিই সম্মিলিত হয়ে গড়ে তুলবে কষ্টি ও সভ্যতায়, ধনে ও ধান্যে, শিল্পে ও বাণিজ্যে এক নূতন ভারত। সংহতিই শক্তি, মানুষে মানুষে হানাহানিই দুর্ব্বলতা। দেশ-গঠনের উপকরণে এই গঠনকুশলী শ্বেত জাতির দান অনেকখানি, তাদের বাদ দিয়ে দেশ শাসন, রক্ষণ ও জাতীয় জীবন গঠনের সামর্থ্য এখনও এই শতধা বিভক্ত ভারতীয় আর্য্য জাতি অর্জ্জন করতে পারে নাই।

 সন্ত্রাশবাদের মত বিশৃঙ্খল লক্ষ্যহীন বিক্ষিপ্ত চেষ্টা সমগ্র ভারতকে গড়ে তোলবার মত কোন কর্ম্মধারাই দেশে আনতে পারে না। সন্ত্রাশবাদের প্রণালী হচ্ছে আসুরিক ও দ্বেষ-মূলক, কি দেশবাসী আর কি শাসক দু’ দলেরই প্রাণতন্ত্রীর সেইখানে সন্ত্রাশবাদ ঘা দেয় যেখানে সুশুপ্ত আছে মলিন পশুশক্তি বা অসুর, বুদ্ধি বা যুক্তির তারে তা’ আঘাত করে না, হৃদয়ের প্রেম আদি মহৎ বৃত্তিগুলিকে জাগায় না, জাগায় ঘৃণাকে, ক্রোধকে, জিঘাংসাকে। যাকে সে আক্রমণ করে সেই আক্রান্তের মধ্যেও সন্ত্রাশবাদের ফলে প্রথমে জাগায় আতঙ্ক, আত্মরক্ষার ব্যাকুল চেষ্টা এবং শেষে প্রতিহিংসার—পিপাসা ও ক্রোধবিকৃত যুক্তি। এইভাবে মানুষের রক্তে দেশ ভাসিয়ে যে রাজশক্তি আমরা লাভ করব তা’ হবে ক্রূর সাম্রাজ্যবাদ ও পশুবলের জননী। জাপানের যে বাহুবল এক দিন রাশিয়ার সামরিক শক্তিকে চূর্ণ করতে সমর্থ হয়েছিল আজ সেই বলদৃপ্ত জাপান মঙ্গোলিয়া, কোরিয়া ও চীনের বিমল দেশপ্রেমের হয়েছে পরম শত্রু। এক দিন পরাধীন ভারতে আমরা এই জাপানের সামুরাই ক্ষাত্রশক্তির জয়গান করেছিলাম, মুগ্ধনেত্রে উদীয়মান জাপানের দিকে চেয়ে ভেবেছিলাম এই বৌদ্ধ জাতি এক দিন এসিয়ার হবে ত্রাণকর্ত্তা। সেই জাপান আজ পররাষ্ট্র লুণ্ঠক ও সাম্রাজ্যলোভী হয়ে দাঁড়িয়েছে, সাম্রাজ্যগর্ব্বে জগৎ গ্রাস করবার স্বপ্ন দেখছে। আট বছর আগে জাপানের প্রধান মন্ত্রী ব্যারন টানাকা বলেছিলেন, “আমাদের ম্যাঞ্চুরিয়া ও মোঙ্গলিয়ার কেন্দ্র স্থানটি ধরতে হবে, যাতে চীনের সামরিক, রাজনীতিক ও অর্থনীতিক গঠন আমরা ভেঙে ফেলতে পারি এবং সেখানে রুষের প্রভাব চূর্ণ করতে পারি। তার পর চীনের সমগ্র শক্তি গ্রাস করে তার বলে আমরা ক্রমশঃ ভারত, এসিয়া মাইনর, মধ্য এসিয়া গ্রাস করে ঘূরোপ অবধি জয় করবো—“We must seize the heart of Manchuria and Mongolia in order to be able to destroy the military, political and economic development of China, and prevent the permeation of Russian influence.

 "With all the resources of China at our disposal, we shall pass forward to the conquest of India, the Archipelago, Asia Minor, Central Asia and even Europe.” মদমত্ত জাপান তার বৎসরে সাত লক্ষ হারে ক্রমবর্দ্ধমান প্রজার জন্য খাদ্য চায়। এসিয়া ও ভারতের ত্রাণকর্ত্তা সে হবে না, হবে ভক্ষক। তাই তোমাদের বার বার বলছি মানুষের প্রকৃতিতে যে অসুর আছে, পশু আছে, তার ওপর ভর করে যে শক্তি আমরা অর্জ্জন করবো তা ধর্ম্মরাজ্য স্থাপনায় সহায় হবে না, মানুষের কল্যাণ তা’তে আনবে না।

 রাজশক্তির সঙ্গে হানাহানি তো আমাদের মুখ্য লক্ষ্য নয়, আমাদের প্রধান লক্ষ্য জাতির মুক্তি, মানুষের মুক্তি ও কল্যাণ। সন্ত্রাশবাদ, স্বদেশী, সহযোগ, অসহযোগ, বা তিলকের responsive সহযোগ, সবই হচ্ছে সাময়িক উপায় মাত্র—political devices, তাদের লক্ষ্য হচ্ছে রাজ-শক্তির সঙ্গে প্রজার একটা বোঝা পড়া। মানব পরিবারের অন্তর্গত খণ্ড খণ্ড জাতিগুলি কোন স্বার্থ নিয়ে ধৈর্য্যচ্যুত হয়ে যদি বা কখনও কলহ করে, হানাহানি করে, কিন্তু তার পর তারা শান্ত হয়ে বসে এবং একটা রফা বা বোঝা পড়া করে নেয়। কাল যে জাতিরা পরস্পর শত্রু ছিল আজ তারা হয় বন্ধু—allies; রাগের পরকলায় যাদের কাল বিকৃত করে জিঘাংসার পাত্র মনে হচ্ছিল আজ যুক্তি ও বিচারের চোখে তাদের আবার সমধর্ম্মী মানুষ বলে মনে হচ্ছে। এই হচ্ছে মানুষের ধারা, তাই আগেই বলেছি হানাহানিতে কল্যাণ নাই, কল্যাণ মিলনে, সংহতিতে ও সহযোগে। যতই হানাহানি বা প্রতিযোগিতা কর, এক দিন মানুষ বলে তার সঙ্গে সৌহার্দ্য বন্ধনে মিলতেই হবে।

 ১৯০৫ সাল থেকে আজ অবধি আমরা রাজশক্তির সঙ্গে কেবলি করেছি হানাহানি, কেবলি ভেবেছি সংঘর্ষের কথা, জাতি বিদ্বেষের কথা। তাদের সঙ্গে এত যুদ্ধের পর এত সংঘর্ষের পর কি লাভ করেছি তা’ ফিরে দেখি নাই, সে লাভ জাতির কল্যাণে নিয়োগ করার কথা ঘুণাক্ষরেও ভাবি নাই। সেই ফিরে চাওয়ার দিন এসেছে, জাতির নবজাগ্রত আত্মবিশ্বাস ও জাতীয়তা জ্ঞানকে গঠনের কাছে প্রয়োগ করার দিন এসেছে। আজ দিন এসেছে যখন কংগ্রেসকে ও দেশের রাজশক্তিকে পরস্পরের সহযোগে হোক, পৃথক পৃথক বা পাশাপাশি হোক—জাতি গঠনের কর্ম্মপদ্ধতি ছকে ও সফল করে তুলতেই হবে। ভূয়া রাজনীতিক আন্দোলন ও হানাহানি ছেড়ে জাতির এত দিনের নষ্ট অবহেলিত শিক্ষা, দীক্ষা, কৃষি, বাণিজ্য, ধর্ম্ম, সমাজ, স্বাস্থ্য শিল্প পুণরুজ্জীবিত করতে হবে। দেশের তরুণরা এত দিন যে শক্তি নিয়ে দলে দলে গেছে ধ্বংসমূলক আন্দোলনের দিকে সেই শক্তির দিতে হবে গঠনের দিকে মোড় ফিরিয়ে; দলে দলে নিঃস্বার্থপ্রাণ কর্ম্মীদের দেশময় ছড়িয়ে পড়তে হবে শিক্ষার সেনা হয়ে, কবির সেনা হয়ে, কুটির শিল্প ও বাণিজ্যের সেনা হয়ে, স্বাস্থ্যের পল্লীগঠনের সেনা হয়ে। বাঙালীর ছেলেমেয়ের মনগুলিকে করে তুলতে হবে গঠন-ক্ষেপা, সৃষ্টি-পাগল।

 যাঁরা অবসাদগ্রস্ত আশাহীন মন নিয়ে বলেন রাজশক্তি সম্পূর্ণ করায়ত্ত করা বিনা গঠন সম্ভব নয়, বিদেশী রাজশক্তি দেশব্যাপী গঠন হ’তে দেবে না; তাঁদের সে যুক্তি যে কতখানি ভ্রান্ত তা’ একটু তলিয়ে দেখলেই বোঝা যাবে। আমরা এক কাঠা জমি নিয়ে ভাইয়ে ভাইয়ে মাথা ফাটাফাটি করি, বাঙালী জমিদার সামান্য খাজনার দায়ে প্রজাকে উৎসন্ন করে দেয়; আর আমরা আশা করি এত বড় সাম্রাজ্য ইংরাজ জাতি বিনা বাক্য ব্যয়ে ছেড়ে দিয়ে যাবে। রাজনীতিতে দান খয়রাৎ নাই, দয়া মায়া নাই, ওখানে আছে যোগ্যের আদর, বুদ্ধিজীবি ও গঠনকুশলীর জয়। এত বড় সংহত সুদৃঢ় সুনিয়ন্ত্রিত রাজশক্তির বিরুদ্ধে যখন আমরা বিদ্রোহের সন্ত্রাশবাদের আয়োজন করি, অসহযোগ ও আইনভঙ্গের আন্দোলন গড়ি, তখন এ যুক্তি মনে আসে না, যে, দৃঢ়প্রতিষ্ঠিত রাজশক্তি এ অবৈধ আন্দোলন হতে দেবে না, নির্ম্মম হস্তে ভেঙে দেবে। গঠনের বেলাই কেবল অলস কর্ম্মবিমুখ আমাদের এই কুযুক্তির অবতারণা; তার মানে আমাদের মন নৈরাশ্যবাদী—cynic হয়ে গেছে, আমরা অতিরঞ্জিত করে কেবলি দেখছি বাধা, কেবলি দেখছি “না” এর—নেতি নেতির দিকটা; কেবলি বড় করে ধরছি অবিশ্বাস, সন্দেহ, ছিদ্রান্বেষণকে। একথা ভাবি না, যে, রাজশক্তি যদি বৈধ গঠনের আন্দোলনকে বাধা দেয় তা’ হ'লে জনপ্রিয় হবার তাদের এত ব্যাকুলতা ব্যর্থ হয়ে যাবে, গভর্ণমেণ্ট অচল হবে। দেশে আজ রাজশক্তিই গঠনের কাজ করছে, কৃষি-ব্যাঙ্ক স্থাপন, কৃষি-ঋণ লাঘব, পল্লীগঠন, কুটির শিল্প উদ্ধার, বেকার সমস্যার সমাধান, বাধ্যতা মূলক শিক্ষাপ্রচার এসব কাজ যতটুকুই হোক গভর্ণমেণ্টই করছে। কংগ্রেস করছে এখনও ভূয়া সভা সমিতি, আত্মকলহ ও চরকা হাতে যন্ত্রশিল্পের বিরুদ্ধতা।

 আমি জাতিকে, বিশেষতঃ বাংলা দেশকে কিছু দিনের জন্য ভুলতে বলি এই দলাদলির রাজনীতি, সামপ্রদায়িকতার রাজনীতি, জাতিবিদ্বেষের রাজনীতি, বাক্য-বাগীশের রাজনীতি। যাঁরা এখনও ঐ সব করতে চান করুন, কিন্তু দেশের অবশিষ্ট লক্ষ লক্ষ তরুণকে গড়তে হবে শিক্ষার কংগ্রেস, শিল্পবাণিজ্যের কংগ্রেস, নূতন সমাজগঠনের কংগ্রেস, স্বাস্থ্য ও পল্লী প্রগতির কংগ্রেস। লাল রাশিয়া উৎপীড়িত অবহেলিত শূদ্রের আত্যন্তিক কল্যাণের জন্য বাণী এনেছে, তপোভূমি ধর্ম্মপ্রাণ ভারতের আদর্শ ও বাণীর সঙ্গে তার কোন সঙ্গতি নাই; ভারতের বাণী হবে আরও ব্যাপক, আরও করুণা ও মৈত্রী মূলক, আরও সার্ব্বজনীন। আমি তোমাদের বলছি কম্যুনিষ্ট রাশিয়া মানবের পূর্ণ মুক্তি আনতে পারবে না,কারণ তাদের এত বড় আদর্শেরও পন্থা বা উপায় হচ্ছে সেই পশুবল, সেই হানাহানি ও শ্রেণীবিদ্বেষ, সেই মিলিটারিজম্ ও নরহত্যা। আগেই তোমাদের বলেছি এই আসুরিক পন্থায় প্রকৃত মানবকল্যাণ হয় না, হয় বামা—কালীর রক্তরাঙা আসনের প্রতিষ্ঠা। মানবকল্যাণের নামে পশুবলদৃপ্ত ঠ্যাঙাড়ের সৃষ্টি ইতিহাসে মানুষ বার বার করেছে, ভারত যদি তারই পুণরাবৃত্তি করে তা’ হলে সে তার জগদ্‌গুরুর আসন হারাবে, আর্ত্তত্রাণ মহাব্রত তার ব্যর্থ হয়ে যাবে।

“পরিত্রাণায় চ সাধুনাম বিনাশায় চ দুষ্কৃতাম্।
ধর্ম্ম সংস্থাপনার্থায় সম্ভবামি যুগে যুগে॥”

 নারায়ণের এ বাণী ব্যর্থ হয়ে যাবে। এ কথা ভেবো না, যে, আমাদের বন্ধনের হেতু শুধু ইংরাজ। পাশ্চাত্য শিক্ষার এত বড় অগ্রদূত এই ইংরাজ জাতির আসার পূর্ব্বে শতাব্দির পর শতাব্দি এসেছে নিছক ধনলুব্ধ লুণ্ঠকের দল; অশোক ও চন্দ্রগুপ্তের গড়া অত বড় সাম্রাজ্য মুছে গেছে অসভ্য জাতির সঙ্ঘাতে সঙ্ঘাতে। বার বার আমাদের কেন এ বন্ধন, কেন এ পরাধীনতা? কারণ এই সব লুণ্ঠক বিজেতারা এসে পেয়েছিল মুষ্টিমেয় ব্রাহ্মণ ক্ষত্রিয়ের ভারত, সমবেদনায় ভ্রাতৃত্বে বাঁধা এক অখণ্ড ত্রিশকোটীর ভারত নয়। ধর্ম্মান্ধতা, অপশাস্ত্র ও সামাজিক কদাচারের নামে দেশের নারী-শক্তি ও শূদ্র-শক্তিকে পদদলিত মুর্খ ও প্রাণহীন করে রেখে ব্রাহ্মণ ক্ষত্রিয়ের ভারত কাজেই তাসের গড়া ঘরের মত বার বার বাহিরাক্রমণে ভেঙে পড়েছে। এ কথা যে কত সত্য তা’ মহামনা রামমোহনের লেখা পড়লেই বোঝা যায়, তিনি এই কথা স্পষ্ট বাক্যে বলে গেছেন। সেই বহু শতাব্দি ধরে অনুষ্ঠিত নারীদ্রোহ ও শূদ্রদ্রোহের এই প্রায়শ্চিত্য আমরা পরাধীনতার শৃঙ্খল পরে সাত শতাব্দি ধরে করছি। আত্মঘাতী ঐ সামাজিক নিপীড়নের মত এই তুচ্ছ রাজনীতিক বন্ধন এতখানি বিকৃতি ও মনুষ্যত্বের খর্ব্বতা আনতে পারে না। বরঞ্চ পাশ্চাত্য তার মানুষ-গড়া বৈদ্যুতিক স্পর্শে শুধু ভারতে নয়, সারা এসিয়ায় এনেছে নূতন প্রাণ, নব প্রেরণা, অভিনব প্রগতি। ঐ মানবদ্রোহিতার পাপ আমাদের দূর করতে হবে—আগে গড়ে তুলতে হবে দরিদ্র চাষী মজুরের ঘর, তাদের ফিরে দিতে হবে নিস্তেজ মূক মন, তাদের অপহৃত মনুষ্যত্ব। ধনে ধান্যে পূর্ণ পল্লী, শিক্ষায় স্বাস্থ্যে নিরাময় জাতিই স্বরাজের পাকা ভিত। রাজনীতিক স্বরাজ আসবার আগে তোমাদের আহার চলছে, সন্তান উৎপাদন চলছে, ভদ্রলোকের আয়াস আরাম শিক্ষা দীক্ষা চলছে, ভূয়া রাজনীতিক দলাদলি চলছে, চলবে না শুধু দরিদ্র দেশের গঠন, তার অন্নবস্ত্রের সমস্যা পূরণ, একথা আমি বিশ্বাস করি না। এ কেবল অলস তামসিক মনের ছলনা, নৈরাশ্যবাদীর অপযুক্তি।