ভ্রমণ আড্ডা/২০১৬/কাশ্মীরনামা — অফরুটে পায়ে পায়ে

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন


কাশ্মীরনামা—অফরুটে পায়ে পায়ে
ই ন্দ্র জি ৎ দা স

 

ঘোড়া ছুটছে ছুটছে ছুটছে, একরাশ কুণ্ডলী পাকিয়ে চারদিকে বড় বড় পাহাড়ের মাঝখান দিয়ে ছুটছে সৈন্যরাও। আর ঠিক তার কিছুদূরে একটি শ্বেতপাথরের প্রাসাদে মণিমুক্ত খচিত স্বর্ণমুকুটে শোভিত এক রাজা হাতে ইরানী গোলাপ নিয়ে নাচ দেখছেন বাইজীর। কাশ্মীর, এই নামের সঙ্গে আমার ঠিক এমনই এক চলচ্চিত্রময় ছবি ভেসে ওঠে মনে। এই নানান ছবির জন্যই আমার কাশ্মীরের প্রতি এক অমোঘ আকর্ষণ।

 এবারের কামীর ভ্রমণটা হঠাই তৈরি হয়ে গেছিল। পার্কে দৌড়তে দৌড়তে মধু একদিন এসে প্রস্তাব দিল অমরনাথ যাত্রার। শুনেই নৈব নৈব চ, আমি যে একেবারেই ধার্মিক নই। কিন্তু অমরনাথের ট্রেকিং আর কাশ্মীর এই দুই-এর লোভটা ছাড়তেও পারলাম না। রাজি হয়ে গেলাম, শুরু করলাম ট্র্যাভেল প্ল্যান। নানান রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে যে জায়গাগুলো প্রথমবার কাশ্মীর ভ্রমণের সময় দেখা হয়ে ওঠেনি সেগুলো লিস্টের প্রথমে জায়গা পেলো। কিন্তু, এইবারও কাশ্মীর ভ্রমণের সময় কাশ্মীর ছিল অশান্ত। যাইহোক, তারই মধ্যে নানান সমস্যার সম্মুখীন হয়েও জায়গাগুলো স্বচক্ষে দেখতে পেরেছি, এটাই আমার কাছে অনেকটা।

 রোজাবল! তখন আমি কলেজে, হাতে এলো স্বামী অভেদানন্দের লেখা ‘পরিব্রাজক স্বামী অভেদানন্দ—কাশ্মীর ও তিব্বতভ্রমণ” বইটি। তাতে, রোজাবল নিয়ে তার লেখা পড়ে আমার প্রথম রোজাবল দেখার ইচ্ছা। সেই বই থেকে আমি প্রথম জানতে পারি, যীশুখ্রিস্টকে ক্রুশবিদ্ধ করার পর উনি নাকি বেঁচে ছিলেন। শুধু তাই নয়, তিনি তার শেষ জীবন ভারতের শ্রীনগরে অতিবাহিত করেন এবং ভারতের মাটিতেই তিনি দেহ রাখেন। স্বামীজি, তার বইতে রুশ পরিব্রাজক ডঃ নটোভিচ-এর কথা উল্লেখ করে লিখেছেন যে, ডাঃ নটোভিচ্‌ যখন ভারতে আসেন তখন লাদাখের হেমিস মনাস্ট্রিতে কিছু হাতে লেখা নথি দেখেছিলেন। যার থেকে তিনি প্রমাণ পেয়েছিলেন যে যীশুখ্রিস্ট ভারতে এসেছিলেন। স্বামী অভেদানন্দ তার বইতে এটাও উল্লেখ করেছেন যে, ১৯২২ সালে তার ভ্রমণকালে তিনি একই নথির তিব্বতি তর্জমা দেখেছেন। যে বৌদ্ধ সন্ন্যাসী ওঁকে এই নথি দেখান, তিনি স্বামীজিকে সেটি অনুবাদ করে শুনিয়েছিলেন। সেই বৌদ্ধ সন্ন্যাসী ওঁকে এও বলেছিলেন, আসল নথিটি লাসার কাছে অবস্থিত মারবার মনাস্ট্রিতে আছে। তারপর এই বিষয় নিয়ে নানান বই পড়ে জেনেছিলাম, যীশুখ্রিস্টকে ক্রুশবিদ্ধ করার পরেও উনি নাকি বেঁচেছিলেন এবং পরবর্তীকালে তিনি পাকিস্তান হয়ে ভারতবর্ষের শ্রীনগরে এসে পাকাপাকি ভাবে বসবাস করতে শুরু করেন। পরবর্তীকালে যীশুখ্রিস্টের মৃত্যু হলে শ্রীনগরে রোজাবলে তাঁকে কবর দেওয়া হয়। এখানে বলে রাখা ভাল পাকিস্তানে বসবাসের সময় যীশুখ্রিস্টের মায়ের মৃত্যু হয়। বর্তমান, শ্রীনগরের ১৭০ কিমি পশ্চিমে অবস্থিত মারী শহর যা বর্তমান পাকিস্থানের রাওয়ালপিণ্ডির কাছে অবস্থিত। পাকিস্থানে অবস্থিত মারী নামক এই স্থানে এক প্রাচীন কবর “মাই মারী দা আস্থান” আছে। যার, বাংলা তর্জমা করলে এমন দাঁড়ায় “মা মরিয়মের চিরনিদ্রার স্থান” বলা হয় এই কবরটি যীশুখ্রিস্টের মা মেরির।

 সময়ের সাথে সাথে আমার কৌতূহলও বেড়েছে এই রোজাবল নিয়ে। এই বছরের জুলাই মাসের ৩ তারিখে আমি গিয়ে পৌঁছাই, শ্রীনগরের কাছে ছোট্ট এক পুরনো শহর আঞ্জিমারে, যা খানিয়ারে অবস্থিত। খানিয়ারের মোড় থেকে মাত্র ২ কিলোমিটার দূরে, বহরি কাদালের সরু গলির মধ্যে অবস্থিত বহু বিতর্কিত ও চর্চিত এই রোজাবল। যে দিকেই তাকাই, রাজনৈতিক অবজ্ঞা আর নানান ঝড়ের ছাপ সেখানে। এখানে, খুব কম টুরিস্টের দেখা পাওয়া যায়, আর পাওয়া গেলেও অধিকাংশই বিদেশী। কিন্তু আমি যেদিন গিয়ে পৌছলাম সেদিন কোন টুরিস্ট ছিল না সেখানে। প্রথম দিকটা, ভাবতেই অবাক লাগছিল, আমি কি সত্যি যীশুখ্রিস্টের কবরের সামনে দাঁড়িয়ে? বারবার এই প্রশ্ন করছিলাম নিজেকে। হারিয়ে গিয়েছিলাম কিছুক্ষণের জন্য নিজের মধ্যেই। সম্বিত ফিরতেই, নিজেকে আর সামলাতে পারলাম না। ব্যাগ থেকে ক্যামেরাটা বের করে ফেললাম ছবি তোলার জন্য। আসলে ছবি তোলার লোভ সামলাতে পারিনি, এটা জানা সত্বেও যে সেখানে ছবি তোলা নিষিদ্ধ। শুধু তাই নয় ওর ভেতরে ঢোকার চেষ্টাও নিষিদ্ধ। আমার জানা ছিল একটা জানালা দিয়ে সেই বহু চর্চিত কবরটি দেখা যায়। এর পরে ঘটে গেল এমন এক ঘটনা, যা আমার চিন্তা ভাবনার মধ্যেই ছিল না। এটি বলার আগে দু-এক কথা রোজাবল নিয়ে বলে নেয়া ভাল।

 রোজাবল কথাটির যদি বাংলায় তর্জমা করা হয়, তবে তার মানে এই রকম হবে ‘নবীর সমাধি’। এর ভেতরে দুটি কবর আছে, একটি জিয়ারাতি হজরাতি ইউযা আসযা (Ziarati Hazrati Youza Asouph or Yuz Asaph or Asaf) এবং অপর কবরটি সৈয়দ নাসিরুদ্দিন (Sayed Nasir-u-Din)-এর। সৈয়দ নাসিরুদ্দিন যিনি মুশা আলি রযার বংশোদ্ভূত, বলা হয় উনি যীশুখ্রিস্টের খুব বড় ভক্ত ছিলেন। তাঁর মৃত্যু হয় ১৪৫১ খ্রিস্টাব্দে এবং রোজাবলে তাঁকে কবর দেওয়া হয়। এবার আসা যাক ইউযা আসফ-এর কথায়, বলা হয় আসলে উনি নাকি যীশুখ্রিস্ট এবং রোজাবলের ওপর কবরটি ওনারই, আর এই নিয়েই নানান বিতর্ক। এই কবর নিয়ে বিতর্কের পক্ষে ও বিপক্ষে নানান কারণ রয়েছে। মূলত যে কারণগুলো প্রাধান্য পেয়েছে, তার থেকে কয়েকটি এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন।

 যীশুখ্রিস্টের হিব্রুতে নাম হল ইউযা (Youza), আরবি বা কোরান অনুযায়ী হজরত ঈশা (Hazrat Isa or Isa) এবং তিব্বতিতে ঈশা। ফারহাং-আসাফিয়াতে পাওয়া যায়, কি ভাবে যীশু রোগীদের সুস্থ করে তোলেন এবং তাঁর আসফ (যিনি আরোগ্য করেন) হয়ে ওঠার কথা। আসলে, ইউযা মানে অগ্রদূত এবং আসফ হল যিনি আরোগ্য করেন। তাহলে, Yuz Asaph or Youza Asouph এর মানে দাঁড়ায় ‘আরোগ্যের অগ্রদূত’, যা যীশুখ্রিস্টের দিকেই ইশারা করে। ইহুদীরা যে দিক নির্দেশ করে কবর দেন সেটি হল পূর্ব-পশ্চিম এবং রোজাবল-এ রাখা জিয়ারাতি হজরাতি ইউযা আসফের কবরের অভিমুখ পূর্ব-পশ্চিম। তাই, মুসলমান কবরের পাশে এই বিতর্কিত কবর, যা একজন ইহুদীর কবর। আমরা সকলেই জানি যীশুখ্রিস্ট ইহুদী ছিলেন।

 প্রফেসর ফিদা হাসনাইন বহু বছর ধরে যীশু এবং তাঁর জীবন নিয়ে কাজ করেছেন, বিশেষ করে রোজাবল নিয়ে তার গবেষণা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এই বিতর্কিত কবরটি বহুকাল আগে সাধারণ মানুষের জন্য খোলা ছিল এবং সেখানে নিয়মিত সাধারণ ভাবে মোমবাতি জ্বালানো হতো। প্রফেসর ফিদা হাস্‌নাইন একবার কবরের সেই যুগযুগ ধরে জমে থাকা মোম সরিয়ে আবিষ্কার করেন এক টুকরো পাথর। দেখতে পান সেই পাথরের টুকরোর মধ্যে খোদাই করা দুপায়ের ছাপ এবং পায়ের ওপর খোদাই করা দুটি পেরেকের দাগ। ওনার মতে, যা যীশুখ্রিস্টের ক্রুশবিদ্ধের দিকে দিক নির্দেশ করে। তাই অনেকে মনে করেন যে যীশুখ্রিস্টকে রোজাবল-এ কবর দেওয়া হয়েছিলো এবং বিতর্কিত কবরটি যীশুরই।

 সুজেন অলসন্‌ যিনি দাবি করেন যে উনি যীশুখ্রিস্টের ৫৯তম বংশধর, তিনি ২০০২ সালে শ্রীনগরে আসেন কবরের ডিএনএ পরীক্ষা করাতে। সেই সময় তিনি ছাড়াও অনেকে বিশ্বাস করতেন যীশুর কবর এটি, এক্ষেত্রেও বিশেষ করে যার নাম উঠে আসে তিনি হলেন ফিদা হাস্‌নাইন। এছাড়াও, সম্প্রতি ২০১৫ সালে ব্রিটিশ ঐতিহাসিক জেরাল্ড গ্রাহাম দাবি করেন রোজাবলের বিতর্কিত কবরটি যীশুখ্রিস্টের নয়, আসলে ওটি হিটলারের কবর। তার দাবির সপক্ষে যুক্তি হিসাবে, তিনি নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বোসের সাথে হিটলারের সুসম্পর্ক ও মহারাজা হরি সিং-এর সাথে ভাল সম্পর্কের রেশ টেনে যুক্তি খাড়া করেছেন। তাতে তিনি বলেছেন। যে, হিটলার আত্মহত্যা করেন নি, বরং সুভাষ বোসের সাহায্য নিয়ে ভারতে আসেন। কাশ্মীরের মহারাজা হরি সিং-এর সাহায্যে ভারতে বসবাস শুরু করেন। পরবর্তীকালে মৃত্যু হলে তাকে রোজাবলে কবর দেওয়া হয়। শ্রীনগরে থাকাকালীন, ৪ঠা জুলাই আমি সেবার ফিদা হাস্‌নাইনের সঙ্গে দেখা করতে তার বাড়িতে যাই। কিন্তু তাঁর শারীরিক অবস্থা ভাল না থাকার দরুন তার সাথে আমার দেখা হয়নি। কলকাতা ফিরে আসার পর জানতে পারি তার মাত্র ৫ দিন মানে ১০ই জুলাই ২০১৬ তাঁর মৃত্যু হয়েছে।

 যাইহোক, ফেরা যাক আমার কথায়। নিজেকে সামলাতে না পেরে ক্যামেরার লেন্সটি জানালা দিয়ে ঢুকিয়ে টপাটপ তিনটে ছবি তুলে নিলাম কবরের। বুঝতে পারিনি কত বড় ভুল করেছিলাম। মুখ ফেরাতেই দেখি একদল লোক ততক্ষণে আমাকে ঘিরে ফেলেছে। সাথে সাথে, কিছু বুঝে ওঠার আগেই তারা আমার ক্যামেরা কেড়ে নিল এবং আমি যে এক বিশাল অন্যায় করেছি তা বলতে থাকল। রাস্তার ওপর আমাকে বসিয়ে রেখে, তারা নিজেদের মধ্যে কথা বলাবলি শুরু করল। বুঝতে পারছিলাম না কি করবো, তার ওপর ওদের ভাষাও আমি জানিনা। বড় অসহায় অবস্থা, কি করবো কিছুই মাথায় আসছিল না। বারবার আমি ক্ষমা চাইছিলাম যাতে তারা আমাকে মুক্তি দেয়। যতটা বুঝলাম, তারা মোটামুটি ঠিক করে ফেলেছে আমাকে জম্মু কাশ্মীর পুলিশের হাতে তুলে দেবে। হঠাৎ, আমার মুখ থেকে বেরিয়ে এলো ‘ইনশাল্লাহ্‌ গলতি হো গয়া’। যদিও বাক্য গঠন ও প্রয়োগ দুটিতেই ভুল ছিল, তবুও এই ‘ইনশাল্লাহ’ কথাটি শোনার সাথে সাথে বদলে গেলো সমস্ত মানুষের চেহারা, বদলে গেলো পরিস্থিতি। বুঝতে সময় লাগলোনা আমার ভগবান তখন আল্লাহ্‌ রূপে পরিত্রাতার ভূমিকায় অবতীর্ণ। তোলা ছবিগুলি ক্যামেরা থেকে মুছে ফেলতে বলল তারা। তাদের কথার অন্যথা না করে, সবকয়টি ছবি মুছে ফেললাম। ব্যাস, তাতেই পেলাম মুক্তি। মনে মনে আমি আশ্বস্ত, প্রযুক্তির সাহায্যে ছবিগুলি উদ্ধার শুধুমাত্র সময়ের অপেক্ষা। ওখান থেকে মুক্তি পাবার পর, বেরিয়ে পড়েছিলাম শ্রীনগরের আরেক বিতর্কিত স্থানের উদ্দেশ্যে।

এই লেখাটি ক্রিয়েটিভ কমন্স অ্যাট্রিবিউশন শেয়ার অ্যালাইক ৪.০ আন্তর্জাতিক লাইসেন্সের আওতায় প্রকাশ করা হয়েছে, যা বিনামূল্যে ব্যবহার, বিতরণ ও অভিযোজন করার অনুমতি দেয়, যতক্ষণ পর্যন্ত লাইসেন্সটি অপরিবর্তিত ও পরিষ্কার ভাবে বলা থাকে এবং মূল লেখককে কৃতিত্ব দেওয়া হয় — এবং আপনি যদি এই লেখাটি পরিবর্তন, রূপান্তর বা এর ওপর ভিত্তি করে কিছু তৈরি করেন, তবে আপনাকে অবশ্যই আপনার অবদান মূল লাইসেন্সের মত একই রকমের লাইসেন্সের আওতায় তা বিতরণ করতে হবে।