ভ্রমণ আড্ডা/২০১৭/সেকালের কলকাতার ধর্মীয় চিত্র

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন


সেকালের কলকাতার ধর্মীয় চিত্র
ই ন্দ্র জি ত দা স

 

জোব্‌ চার্নকের কলকাতায় পদার্পণের পূর্বেই যে এখানে মানুষের বসতি ছিল তা আর আলোচ্য বিষয় নয়। সপ্তদশ শতাব্দীর শেষ ও অষ্টাদশ শতাব্দীর প্রথম দিক থেকেই ইউরোপীয়রা আসতে শুরু করেছিল কলকাতাতে। সেই সময়, তিনটি গ্রামে কলিকাতা, সুতানুটি ও গোবিন্দপুরে হিন্দু ধর্মের মানুষের বসতি তো ছিলই এবং এদের পরেই বেশ এক বড় সংখ্যক মুসলমান মানুষও বসবাস করতে শুরু করেছিল। আসলে, ব্যবসা-বাণিজ্যের বা আরও অন্যান্য পেশার টানে, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সঙ্গে বা তাদের অনুসরণ করে, বিশেষতঃ গঙ্গার তীরবর্তী এই জায়গার প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিল অনেকেই। সপ্তদশ শতাব্দীর শেষ এবং অষ্টাদশ শতাব্দীর শুরুর দিক থেকেই ব্রিটিশদের সঙ্গে বা বলা যেতে পারে খ্রিস্টানদের সঙ্গে পরবর্তীকালে ইহুদী, পার্সি, চীনা ও আরও অনেক ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মানুষের বসতি গড়ে উঠেছিল এই খোদ কলকাতায়। স্বভাবতই গড়ে উঠেছিল বিভিন্ন ধর্মীয় প্রার্থনাগৃহ। কলকাতাতে ছড়িয়ে থাকা অসংখ্য উপাদানের মধ্যে এই ধর্মীয় স্থাপত্যগুলির গুরুত্ব অপরিসীম।

 কলকাতার চিৎপুরে খগেন চ্যাটার্জি স্ট্রীটে অবস্থিত চিত্তেশ্বরী মন্দিরই কলকাতার সর্বপ্রাচীন মন্দির। কথিত আছে, তদানীন্তন কুখ্যাত চিতে ডাকাত এই মন্দির প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তার মৃত্যুর পর দেবী দুর্গার বিগ্রহ পরিত্যক্ত অবস্থায় ছিল। ১৬৯০ সালে জোব চার্ণকের কলকাতায় আসার ৫০ বছর পূর্বে অর্থাৎ ১৬১০ খ্রিষ্টাব্দে, মনোহর ঘোষ বর্তমান মন্দিরটি স্থাপন করেন। ও বিগ্রহের প্রতিষ্ঠা করেন। প্রতিষ্ঠার কালনির্ণয় নিয়ে মতভেদ আছে, কারণ কোথাও ১৫৮৩, কোথাও ১৫৮৬, আবার কোথাও ১৬১০ এই তিনটি সালের উল্লেখ পাওয়া যায়। মন্দিরের গর্ভগৃহে দেবী চিত্তেশ্বরী দুর্গা অধিষ্ঠান করছেন।

 কালীঘাটের কালী মন্দির যা সাবর্ণ রায়চৌধুরীদের সময় থেকে সামান্য এগিয়ে, কলকাতার মুসলমানদের অবস্থান বা তাদের মসজিদ প্রসঙ্গে আসি, তাহলে ঐ চিৎপুরেই অবস্থিত ভোসড়ি শাহ্‌র মসজিদের কথা বিশেষ করে বলা প্রয়োজন। কাশীপুর চিৎপুর অঞ্চলের, শেঠপুকুর রোডে, ভোসড়ি শাহ্‌ বা মতান্তরে বসরি শাহ্‌, স্থানীয়ভাবে ঊষা মসজিদ নামে পরিচিত, সম্ভবত কলকাতার সবচেয়ে পুরোনো মসজিদ। এই মসজিদের পাশেই ভোসড়ি শাহ্‌ পীরের মাজার আছে। বহুদিন পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে থাকার পর, কয়েক বছর আগে এটিকে মেরামত করা হয়েছে। একসময় এখানে একটি শ্বেতপাথরের ফলক ছিল, যাতে মসজিদটি যে ১৭৯৯ খ্রিঃ (১২১৯ হিজরি) জাফর আলী খাঁন দ্বারা পুননির্মিত হয় সেটি লেখা ছিল। জনশ্রুতি আছে, দেওয়ান রেজা খাঁ পলাশীর যুদ্ধের (১৭৫৭ খ্রিঃ) পর চিৎপুরে এসে বসবাস শুরু করেন। সেই সময় থেকেই এরা চিৎপুরের নবাব বলে পরিচিত হন এবং এই মসজিদটি রেজা খাঁ নির্মাণ করেছিলেন বলে শোনা যায়।

 সপ্তদশ শতাব্দীর শেষে দিকে জোব চার্নকের কলকাতায় আসার প্রায় সঙ্গেই, আর্মেনিয়ানরাও সুদূর ইউরোপ থেকে কলকাতাতে আসে। পর্তুগীজরা কিন্তু এর অনেক আগেই অর্থাৎ ষোড়শ শতকে বাংলার হুগলী এবং সপ্তগ্রামের কাছে উপনিবেশ গড়েছিল। মনে করা হয়, খজা ফানুস কালান্তার নামে সুরাটের এক আর্মেনিয়ান ব্যবসায়ী তার ভাইপো খজা ইসরায়েল সারহাদকে সঙ্গে নিয়ে লন্ডনে গিয়েছিলেন তৎকালীন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সাথে আলোচনা করতে। সেখানে তাদের সাথে চুক্তি হয় এবং সেই চুক্তি অনুযায়ী তারা কলকাতায় তাদের নিজেদের জন্য গির্জা তৈরি করতে পারবেন বলে অনুমতি পান, সম্ভবত এই চুক্তিটি হয়েছিল ১৬৮৮ সালে। এরপরে আর্মেনিয়ানরা কলকাতায় একটি কাঠের গির্জা তৈরি করেন। ১৭০৭ সালে এই কাঠের গির্জা আগুনে ভস্মীভূত হয়ে যায়। পরবর্তীকালে এই একই জমিতে পাকা গির্জা ‘দ্যা হলি চার্চ অফ্‌ নাযারেথ’ তৈরি করা হয় এবং গির্জা তৈরির কাজ শেষ হয় ১৭২৪ সলে। কলকাতায় এটিই খ্রিস্টানদের প্রথম গির্জা বলে মানা হয়। এখানে আর্মেনিয়ানদের একটি বিশেষ রীতির উল্লেখ করা প্রয়োজন। সাধারণত, খ্রিস্টানরা প্রতি বছর যীশু খ্রিস্টের জন্মদিন অর্থাৎ বড়দিন ২৫শে ডিসেম্বর পালন করে থাকেন। কিন্তু আর্মেনিয়ানরা খ্রিস্টান হলেও তারা যীশু খ্রিস্টের জন্মদিন এখনও প্রতিবছর ৬ই জানুয়ারী পালন করেন। বর্তমানে, কলকাতায় এই আর্মেনিয়ান গির্জা ছাড়া আরেকটি আর্মেনিয়ান চ্যাপেল আছে।

 ক্যাপ্টেন অ্যালেক্সান্ডার হ্যামিলটনের বিবরণ থেকে জানা যায়, কলকাতায় ১৭০৯ সালের ৫ই জুন, পুরনো ফোর্ট উইলিয়ামের কাছাকাছি সেন্ট অ্যানে চার্চ, যা প্রকৃত অর্থে কলকাতার প্রথম অ্যাঙ্গলিকান্‌ (ইংরেজি) চার্চ, তৈরি হয়। বাংলার নবাব সিরাজ-উদ-দৌলা ১৭৫৬ সালের জুন মাসে বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যা আক্রমণ করেন এবং সেই সময় সম্পূর্ণরূপে এই গির্জা ধ্বংস হয়। আজ তার আর কোন অবশিষ্ট নেই। কলকাতার ধর্মীয়স্থান, বিশেষত এখানকার গির্জা নিয়ে আলোচনা করলে, কলকাতার প্রথম ক্যাথিড্রাল বা প্রথম প্রধান গির্জা সেন্ট্‌ জোন্স চার্চের কথা উল্লেখ করা প্রয়োজন। এই চার্চ প্রতিষ্ঠার আগে সেই জমি লাগোয়া একটি খ্রিস্টান কবরখানা ছিল, যা আজও বিদ্যমান। ১৭৬৬ সাল থেকে এখানে কবর দেয়া বন্ধ হয়ে যায়। এরপর ওয়ারেন হেস্টিংসের প্রস্তাবে শোভাবাজারের নবকৃষ্ণ দেব এই জমি কিনে নেন। তিনি হিন্দু হওয়া সত্ত্বেও সেন্ট জোন্স চার্চ তৈরির সময় এই জমি দান করেন। সেন্ট জোন্স চার্চের কবরখানায় তদানীন্তন কিছু বিশিষ্টজনের কবর আছে যেমন, জোব্‌ চার্ণক, তাঁর হিন্দু স্ত্রী, তাঁর মেয়েদের, ডাঃ হ্যামিল্টন, ওয়াটসন, বেগম জনসন, আরও অনেকের। ২৪শে জুন ১৭৮৭ সালে এটির উদ্বোধন হয়, তারপর থেকে ১৮৪৭ সাল অব্দি এটিই কলকাতার ক্যাথিড্রাল ছিল। এরপরে সেন্ট পলস্‌ চার্চকে কলকাতার ক্যাথিড্রাল করা হয়। সেন্ট জোন্স চার্চ ক্যাথিড্রাল না থাকলেও আমাদের দেশ স্বাধীনতা পাওয়ার আগে অব্দি এর সমস্ত ভার ছিল লন্ডনের অ্যাঙ্গলিকান্‌ খ্রিস্টানদের ওপর।

 অন্যদিকে, কলকাতার মুরগিহাটায় রোমান ক্যাথলিকদের প্রধান গির্জা অর্থাৎ পর্তুগীজ চার্চ, যার পুরোনো নাম ‘দ্য ক্যাথিড্রাল অফ দ্য হোলি রজারি’ এবং যার বর্তমান নাম ‘ক্যাথিড্রাল অফ দ্য মোস্ট হোলি রজারি’, পর্তুগীজরা তৈরি করেন ১৭৪৭ সালে। আগেই উল্লেখ করেছি পর্তুগীজরা অনেক আগেই বাংলায় এসেছিল এবং বাংলার প্রথম গির্জা তাদেরই তৈরি। পরবর্তীকালে, তারা কলকাতায় আসে এবং বলা হয় বর্তমানে এই গির্জার জায়গায় তারা ১৭০০ সালে একটি চ্যাপেল তৈরি করেছিল। সেটি নানা কারণে বন্ধ হয়ে যায়, তারপর তারা বর্তমান গির্জাটি তৈরি করে। প্রসঙ্গত, এই চার্চের লাগোয়া কবরখানায় দুটি গ্রীক কবরের উপরে স্মৃতিস্তম্ভ রয়েছে যাতে ১৭১৩ এবং ১৭২৮ সালের উল্লেখ পাওয়া যায়। কিন্তু তা সত্ত্বেও, প্রথম গ্রীক যিনি কলকাতায় আসেন বলে ধরা হয়, তিনি আলেক্সন্ডার আরগীরি বা হাজী আলেক্সিও আরগাইরী, তিনি ১৭৫০ সালে বাংলায় আসেন। ১৭৭৭ সালে ঢাকাতে তার মৃত্যুর পর, তার শেষইচ্ছা অনুসারে কলকাতায় এই পর্তুগীজ চার্চের কাছে আমড়াতলায় ১৭৮০ সালে গ্রীক অর্থোডক্স চার্চ তৈরি শুরু হয়। ৬ই অগাস্ট ১৭৮১ সালে এই চার্চ নিয়মিত প্রার্থনার জন্য খুলে দেওয়া হয়। পরবর্তীকালে ১৯২৪ সালে এই চার্চ উঠে আসে কালীঘাটের কালীমন্দিরের কাছে, বর্তমানে যে গ্রীক চার্চটি আমরা দেখি সেখানে। কিন্তু পুরনো আমড়াতলার গ্রীক অর্থোডক্স চার্চের কোন অস্তিত্ব আজ আর নেই। আলেক্সান্ডার আরগীরির কবরটি রয়েছে কলকাতার ফুলবাগানে গ্রীক কবরখানায় এবং এই কবরখানার মধ্যে একটি ছোট চ্যাপেলও রয়েছে।

 এটা তো গেলো খ্রিস্টানদের গির্জার কথা। এবার নজর ফেরান যাক ইহুদীদের প্রতি। প্রথম ইহুদী, যিনি কলকাতায় এসেছিলেন তিনি শালম্‌ আহারন অবাদিয়াহ্‌ কহেন্‌। তিনি সুদূর অ্যালেপ্পো বর্তমানে সিরিয়া থেকে ১৭৯২ সালে ভারতে এবং পরবর্তীকালে ১৭৯৮ সালে কলকাতায় আসেন। ইহুদীদের প্রার্থনাগৃহকে সিনাগগ্‌ বলা হয়। ১৮৩১ সালে কলকাতার প্রথম সিনাগগ্‌ ‘নভেহ্‌ শালম্‌’ তৈরি করেন শালম্‌ কহেন্‌ এবং এটি ১৮৮৪ সাল অব্দি ওখানেই ছিল। সেইসময়, ইহুদীদের সম্প্রদায় থেকে ইলিয়াস ডেভিস জোসেফ ওজরা কলকাতার শেরিফ নির্বাচিত হন। তাঁর উদ্যোগে ১৮৮৪ সালে ‘নভেহ শালম’ এর জায়গায় সুবিশাল ‘ম্যাগেন ডেভিড সিনাগগ’ তৈরি করা হয়। অবশ্য, ১৯১০ সালে ইহুদী সম্প্রদায়ের উদ্যোগে নতুন করে ম্যাগেন ডেভিড সিনাগগের পাশে ‘নভেহ শালম’ পুনর্নির্মিত হয়। কলকাতার যে সিনাগগ্‌টি সবচেয়ে পুরনো এবং বর্তমান, সেটি ‘বেথ্‌-এল’। এটি ১৮৫৬ সালে তৈরি হয়েছিল। কলকাতায় সর্বমোট পাঁচটি সিনাগগ ইহুদীরা তৈরি করেছিল। যার মধ্যে তিনটি বর্তমান এবং বাকি দুটির কোন অস্তিত্ব নেই। ১৯৩৩ সালে ওল্ড চীনাবাজার অঞ্চলে, ২৫ ব্ল্যাক বার্ন লেনে তৈরি হয় ‘ম্যাগেন আবথ্‌’, এটি নির্মাণ করেন ‘এ লেভরয়’। বর্তমানে যে শ্বেতপাথরের ফলকটি সেখানে আছে তাতে নির্মাণ সাল ১৯৪০ লেখা। কিন্তু ১৯৮৪ সালে ইহুদী ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশান দ্বারা প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী এটির নির্মাণ হয় ১৯৩৩ সালে। বর্তমানে ‘ম্যাগেন আবথ্‌’ এর কোন অস্তিত্ব নেই। ফ্রী-স্কুল স্ট্রীট ও সাদার স্ত্রীটের সংযোগস্থলে ১৮৯৭ সালে ‘শহ্‌রে রাসূন’ সিনাগগ্‌ তৈরি হয়। বর্তমানে হল ঘরটি থাকলেও, সিনাগগের কোন চিহ্নই নেই সেখানে।

 পার্সি সম্প্রদায় অগ্নির উপাসক, ফায়ার টেম্পল তাঁদের প্রার্থনাগৃহ। তাদের ধর্ম যর্‌য়াস্টিয়ান যা আমরা বাংলায় জরথুষ্ট্রীয় বলে জানি। ১৮৩৯ সালের ১৬ই অগস্ট এজরা স্ত্রীটে তৈরি হয় পার্সিদের ফায়ার টেম্পল, তদানীন্তন বিখ্যাত পার্সি রুস্তমজী কাওসজী বানাজী যিনি জাহাজ কোম্পানীর মালিক ছিলেন, তিনি এই টেম্পলটি তৈরি করেন। ১৯১২ সালে কলকাতার মেটক্যাফ্‌ স্ট্রীটে ‘আরভাদ্‌ ধুনজীভাই মেহতা যর্‌য়াষ্ট্রিয়ান আঞ্জুমান আতাস আদারন’ নামে আরেকটি ফায়ার টেম্পল তৈরি করেন স্বর্গীয় শেঠ দাদাভাই বেহ্‌রামজী মেহতার বিধবা স্ত্রী খুড়সেটবাই এবং তাদের পুত্র শেঠ রুস্তমজী ভি মেহতা। বর্তমানে কলকাতার একমাত্র এই মন্দিরটিতে পার্সিদের সমস্ত রকম ধর্মীয় কাজ হয়। কলকাতার রেইনী পার্কে আরেকটি ফায়ার টেম্পল তৈরি করেছিল মেহতা পরিবার কিন্তু মন্দিরটি থাকলেও এর সম্পর্কে বিশেষ নথি পাওয়া যায়না।

 ভারত চীন দুই বিশাল প্রতিবেশি রাষ্ট্রের প্রাচীন সভ্যতার ইতিহাস ও সংস্কৃতির বিশাল ব্যাপ্তি সবারই জানা। দুই দেশের সম্পর্ক বহুদিনের। বৌদ্ধ ধর্মের জন্ম ভারতে হলেও তার ব্যাপ্তি চীনে প্রসারিত। ব্রিটিশদের সঙ্গে চীনারাও নিজেদের ভাগ্য অন্বেষণে ভারতে এসেছিল। টং অছি নামক চীনা প্রথম ভারতে আসেন। তিনি ওয়ারেন হেস্টিংস এর (বাংলার গভর্নর জেনারেল, ১৭৭৩-১৭৮৫) থেকে ৬৫০ বিঘা জমি বছরে ৪৫ টাকা কর-বাবদ পান এবং সেখানে চিনির কারখানা তৈরি করেন। এরপর থেকেই চীনাদের কলকাতায় বাসস্থান গড়ে ওঠে, আজও এরা এই শহরের অভিন্ন অংশ। কলকাতায় বেশ কিছু চীনা টেম্পল আছে। বিশেষত, পুরোনো চীনা পাড়া বা টেরিট্টি বাজারে। সবথেকে বিখ্যাত চীনা মন্দির ‘তুং অন’। এই মন্দিরের এক তলায় একসময় ‘নানকিং’ নামে এক চীনা রেস্তরাঁ ছিল, রেস্তরাঁটি তৈরি হয়েছিল ১৯২৪ সালে। এটি কলকাতার প্রথম এবং সম্ভবত ভারতের প্রথম চীনা রেস্তরাঁ। এখানে কুয়ানদী বা যোদ্ধাদের দেবতা রয়েছেন, তিনি তার হাতে এক বিরাট ছুরি নিয়ে বিদ্যমান। এছাড়াও বিরাট এক বৌদ্ধ মূর্তিও রাখা আছে। মূলত, মন্দিরে ওনাদেরই পুজো হয়। এটির খানিক পাশেই রয়েছে ‘সী ইপ টেম্পল’। চীনা জুতো নির্মাতারা ১৮৮২ সালে মন্দিরটি প্রতিষ্ঠা করেন। চীনাদের কৃপার দেবী কুয়ান্‌ ইউমের মূর্তি এবং অনেক ধরনের চীনা অস্ত্রশস্ত্রও রয়েছে মন্দিরে। আরও কয়েকটি চীনা মন্দির রয়েছে এই অঞ্চলে। যেমন চীনা ছুতোরমিস্ত্রীরা ১৯০৮ সালে তৈরি করেন ‘সী ভয় উন্ লেওং ফুথ চার্চ’। ১৯৪৩ সালে নান-হাই, ফেন-উ ও সান্‌ তাক্‌ থেকে আসা চীনারা তৈরি করেন ‘নাম্‌ সুন্‌’ চার্চ, এই মন্দিরের আরাধ্য দেবতা কুয়ান্‌ তাই, সী ফো এবং চোই চোই। আরেকটি পুরোনো চীনা মন্দির হল ‘চুংঘী ডং থিয়েন হুএ’, তৈরি হয় ১৮৫৯ সালে, এখানে চীনাদের ভাগ্যের দেবতা কুয়ান কুন্‌ এর পুজো হয়। আরেকটি চীনা মন্দির হল ‘গী হিং’, এটি তৈরি হয় ১৮৮৮ সালে। বর্তমানে মন্দিরটি যেখানে আছে সেটি তৈরি হয় ১৯২০ সালে। কলকাতার চাঁদনিচকে রয়েছে ‘চুং ইয়ে থং’ মন্দির, যেখানে কনফুসীয়, তাও ও বৌদ্ধধর্ম এই তিনটি ধর্মীয় বিশ্বাস এক জায়গায় বিরাজ করছে।

 কলকাতার যশোর রোডেও চীনাদের বৌদ্ধ মন্দির এবং কলকাতার চৌবাগাতে হিউ-এন-সাং-এর মন্দির আছে। লেক রোডে রয়েছে ‘নিপ্পোযান্‌ মিহযি’ জাপানীদের বৌদ্ধ মন্দির। কলকাতায় আরও কয়েকটি বৌদ্ধ মন্দির আছে, বিশেষত উল্লেখ্য, কলেজ স্কোয়ারের শ্রীলঙ্কান বৌদ্ধ মন্দির এবং ইডেন হসপিটাল রোডের বার্মিস বৌদ্ধ মন্দির।

 সম্ভবত ভারতীয় ধর্মগুলির মধ্যে জৈনরাই প্রথম কলকাতায় এসেছিল। তারা কলকাতার বেলগাছিয়ায় ১৭৮৭ সালে, ২৬ বিঘা জমির ওপর ‘শ্রী পার্শ্বনাথ দিগম্বর জৈন’ মন্দির স্থাপন করে যেটি কলকাতার সর্বপ্রাচীন এবং প্রথম জৈন মন্দির। কলকাতায় দিগম্বর জৈনদের আরও কিছু মন্দির রয়েছে যেমন, ১৮০৫ সালে তৈরি ব্রজদুলাল স্ট্রীটে ‘পুরোনো দিগম্বর জৈন’ মন্দির, ১৯০৪ সালে তৈরি রবীন্দ্র সরণীতে ‘নতুন দিগম্বর জৈন’ মন্দির, দ্বিতীয়টি তীর্থঙ্কর আদিনাথ জী কে উৎসর্গ করা। ১৮৯৫ সালে তৈরি কলকাতার বদ্রীদাস টেম্পল স্ট্রীটের ‘শ্রী শ্রী চন্দ্রপ্রভুজী’ মন্দির যা তীর্থঙ্কর চন্দ্রপ্রভুজীকে উৎসর্গ করা। এটি সম্পূর্ণ শ্বেতপাথরের তৈরি একটি অসাধারণ স্থাপত্য। এর ঠিক পাশেই রয়েছে ‘শ্রী শ্রী শীতলনাথ স্বামী গার্ডেন’ মন্দির, মন্দিরটি ১৮৬৭ সালে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন হীরে জহরত ব্যবসায়ী রায়বাহাদুর শ্রী বদ্রীনাথ মুকিম প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এরপাশেই ‘শ্রী শ্রী মহাবীর স্বামী’ মন্দির যা ১৮৬৮ সালে তৈরি। এটি ২৪ তম তীর্থঙ্কর মহাবীর স্বামী কে উৎসর্গ করা হয়েছে। কলকাতার প্রথম শ্বেতাম্বর জৈন মন্দির ‘দাদাজী’ মন্দির। এটি তৈরি হয় ১৮১০ সালে, এটিও বদ্রীদাস টেম্পল্‌ স্ট্রীটে অবস্থিত। বড়বাজারের কটন স্ট্রীটে ‘শ্বেতাম্বর পঞ্চায়েত সতীনাথ জৈন’ শ্বেতাম্বরদের আরেকটি মন্দির, এর নির্মাণ সাল ১৮১৪।

 রাজা রামমোহন রায়কে বলা হয় তিনি প্রথম ভারতীয় যিনি ভারতীয় সমাজকে মধ্যযুগীয় ভারতবর্ষ থেকে বার করে আনতে চেয়েছিলেন। তাই শ্রদ্ধেয় রাজা রামমোহন রায়কে ‘আধুনিক ভারতের জনক’, ‘ভারতের নবজাগরণের জনক’ বা ‘ভূত ও ভবিষ্যতের সেতু’, বলে অভিহিত করা হয়। ১৮১৫ সালে কলকাতার মানিকতলায় তিনি একটি বাড়ি কেনেন, সেখানে ‘আত্মীয় সভা’ প্রতিষ্ঠা করেন। পরবর্তীকালে ২০ই অগাস্ট ১৮২৮ সালে কমল বসুর বাড়িতে ‘ব্রাহ্ম সমাজের ’ প্রতিষ্ঠা করেন এবং ২৩শে জানুয়ারী ১৮৩০ সালে, কলকাতার চিৎপুরে প্রথম ব্রাহ্ম সমাজের উপাসনালয় তৈরি হয়। পরের দিকে অর্থাৎ ১৮৬৬ সাল নাগাদ কেশব চন্দ্র সেনের বিভেদ এবং ব্রাহ্ম সমাজের বিভক্ত হওয়া সর্বজনবিদিত। ২২শে অগাস্ট ১৮৬৯ সালে কেশব চন্দ্র সেন বর্তমান কলকাতার কেশব সেন স্ট্রীটে তাঁর চিন্তাধারার ‘ভারতীয় ব্রাহ্মসমাজ’ এর। মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর জোড়াসাঁকো ঠাকুর বাড়িতে একটি ঠাকুর দালান বানিয়েছিলেন। তার পুত্র মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর ২২শে ডিসেম্বর ১৮৪৩ সালে ব্রাহ্মধর্ম গ্রহণ করেন এবং ঠাকুর বাড়ির সেই ঠাকুর দালানটিকে ব্রাহ্ম ধর্মের উপাসনাগৃহে রূপান্তরিত করেন। কলকাতায় আরও কিছু সাধারণ ব্রাহ্মসমাজের প্রার্থনাগৃহ এবং দেবালয় রয়েছে।

 মূলশঙ্কর, যিনি দয়ানন্দ সরস্বতী নামে অধিক পরিচিত, তিনি ১৮৭৫ সালে বোম্বাই শহরে আর্যসমাজ প্রতিষ্ঠা করেন। দয়ানন্দ সরস্বতীর কলকাতার ঠাকুর পরিবারের সাথে বিশেষ পরিচিতি ছিল, সেই সূত্রে ১৮৭২ সালে তিনি কলকাতায় আসেন। ১৮৮৫ সালে কলকাতার বড়বাজারের তুলা পট্টিতে এক গুদামঘরে কলকাতার প্রথম আর্যসমাজের মন্দির স্থাপিত হয়। বর্তমান যে মন্দিরটি আমরা সেখানে দেখতে পাই সেটি ১৯০৭ সালে জায়গাটি কিনে নিয়ে পাকাপাকিভাবে স্থাপিত।

 ঐতিহাসিক দিক থেকে শিখধর্মাবলম্বীদের কাছে কলকাতার গুরুত্ব অপরিসীম। গুরু নানক দেব যিনি শিখধর্মের প্রবক্তা ও প্রথম গুরু, তিনি ১৫১০ সালে জলপথে পুরী ভ্রমণকালে কিছুদিন কলকাতায় অবস্থান এবং স্থানীয় মানুষদের নিয়ে সঙ্গতেরও আয়োজন করেছিলেন। তাই কলকাতা এই ধর্মাবলম্বীদের কাছে খুবই পবিত্রস্থান। কলকাতার হ্যারিসন রোডে ‘বড়ে সঙ্গত গুরুদ্বারা’ কলকাতার সর্ববৃহৎ এবং প্রথম গুরুদ্বারা। শিখধর্মের ১০ জনের মধ্যে নবম গুরু হলেন গুরু তেগ বাহাদুর। উনি ১৬৬০ সালে অসম যাওয়ার পথে কলকাতায় আসেন এবং বাগমারিতে স্থানীয় মানুষদের নিয়ে সঙ্গতেরও আয়োজন করেন। বাগমারিতে একটি গুরুদ্বারা আছে যেটি এই ধর্মাবলম্বীদের এবং ঐতিহাসিকদের কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। শিখধর্মের মানুষের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গেই কলকাতায় আরও কিছু গুরুদ্বারা তৈরি হয়েছে, যেমন, ১৯৩৬ সালে কলকাতার রাসবিহারী রোডে ‘জগৎ শুধার গুরুদ্বার’ ১৯৫৭ সালে হরিশ মুখার্জি রোডে ‘সন্ত কুঠিয়া। এছাড়া আরও কয়েকটি গুরুদ্বারা কলকাতায় রয়েছে।

 আকাশপথে যদি কলকাতাকে দেখা হয় তবে দেখা যাবে মন্দির, মসজিদ, গির্জা, গুরুদ্বারার চুড়াগুলির সহাবস্থান। আক্ষরিক অর্থে কলকাতা সত্যিই এক যৌগিক সংস্কৃতির মহানগর, যার তুলনা পৃথিবীতে মেলা ভার। যেখানে, হিন্দু গির্জা তৈরির জন্য জমি দান করেন, পার্সি শিব মন্দির তৈরি করেন, মুসলমান দুর্গা পুজো করেন। এরকম অনেক নজির সৃষ্টি করেছে শহর কলকাতা। প্রকৃত অর্থে ‘বৈচিত্রের মধ্যে একতা’ কথাটির যথার্থ ও জ্বলন্ত প্রমাণ এই শহর।

এই লেখাটি ক্রিয়েটিভ কমন্স অ্যাট্রিবিউশন শেয়ার অ্যালাইক ৪.০ আন্তর্জাতিক লাইসেন্সের আওতায় প্রকাশ করা হয়েছে, যা বিনামূল্যে ব্যবহার, বিতরণ ও অভিযোজন করার অনুমতি দেয়, যতক্ষণ পর্যন্ত লাইসেন্সটি অপরিবর্তিত ও পরিষ্কার ভাবে বলা থাকে এবং মূল লেখককে কৃতিত্ব দেওয়া হয় — এবং আপনি যদি এই লেখাটি পরিবর্তন, রূপান্তর বা এর ওপর ভিত্তি করে কিছু তৈরি করেন, তবে আপনাকে অবশ্যই আপনার অবদান মূল লাইসেন্সের মত একই রকমের লাইসেন্সের আওতায় তা বিতরণ করতে হবে।