ময়ূখ/চতুর্দ্দশ পরিচ্ছেদ

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন


চতুর্দ্দশ পরিচ্ছেদ

পরিচয়

 বিনোদিনীকে আর্ত্তনাদ করিয়া বসিয়া পড়িতে দেখিয়া, ললিতা ছুটিয়া আসিয়া তাহার কণ্ঠালিঙ্গন করিল এবং জিজ্ঞাসা করিল, “কি হইয়াছে মা? এমন করিলি কেন মা?” বিনোদিনী উত্তর দিল না, ললিতাকে আলিঙ্গন করিয়া কাঁদিতে লাগিল। তাহা দেখিয়া ললিতার চক্ষুও জলে ভরিয়া আসিল, উভয়ে অনেকক্ষণ নিঃশব্দে রোদন করিল। ময়ূখ কিছু বুঝিতে না পারিয়া ক্ষণকাল পরে জিজ্ঞাসা করিলেন, “ললিতা, কাঁদিতেছ কেন? তোমাদের কি হইয়াছে?” উত্তর না পাইয়া তিনি পুনর্ব্বার ঐ প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করিলেন। তখন বিনোদিনী চক্ষু মুছিয়া কহিল, “মা, সমস্ত পরিচয় দিতেছি, আগে তোমাদের পরিচয় লই। উনি কি জামাই?”

 ললিতার মুখ লজ্জায় রক্তবর্ণ হইয়া উঠিল, সে অবগুণ্ঠন টানিয়া দিয়া কহিল, “ছি, তা কেন? উনি ভীমেশ্বরের রাজার ছেলে। গৌরীপুরের ঘাটে যখন আমাকে হার্ম্মাদে ধরে, তখন উনি নৌকায় বসিয়া মাছ ধরিতেছিলেন।” “তবে তুই যে বড় উহাকে লইয়া আসিলি?”

 ললিতার রক্তবর্ণ মুখ লজ্জায় আরও লাল হইয়া উঠিল, সে কহিল, “তাহা বলিতে পারি না।” এই বলিয়া ললিতা মুখ ফিরাইল, বিনোদিনী তখন আর প্রশ্ন করিল না। ময়ূখ বুঝিলেন যে হুগলীতে তাঁহার উপস্থিতির কারণ নির্দ্দেশ করার আবশ্যক হইয়াছে। তিনি খাটের উপর হইতে ললিতাহরণের বৃত্তান্ত বলিতে আরম্ভ করিলেন। ময়ূখের কথা শেষ হইলে বিনোদিনী দীর্ঘ নিশ্বাস ত্যাগ করিয়া কহিল, “মা, রাধাবিনোদ তোমাকে রক্ষা করিয়াছেন, তুমি ফিরিঙ্গীর হাতে পড়িয়াই পাগল হইয়া গিয়াছিলে, সেই জন্য গঞ্জালিস্ তোমাকে ছাড়িয়া দিয়াছিল। তোমাকে একলা হুগলীর পথে বেড়াইতে দেখিয়া আমি লইয়া আসিয়াছিলাম।”

 “তুমি কে মা? তুমি আমার পরিচয় শুনিয়া কাঁদিয়া উঠিলে কেন?”

 বিনোদিনী ললিতার প্রশ্ন শুনিয়া পুনরায় কাঁদিয়া উঠিল এবং তাহাকে বক্ষে টানিয়া লইয়া কহিল, “মা, যে দিন তোকে ধূলা কাদা মাখিয়া রুক্ষ কেশে হুগলীর পথে পথে বেড়াইতে দেখিয়াছিলাম সেই দিনই বুঝিয়াছিলাম যে তুই আমার আত্মীয়া, আমি খড়দহের তারানাথ ভট্টাচার্য্যের কন্যা, তোর গর্ভধারিণী আমার সহোদরা।”

 ললিতা বিস্মিতা হইয়া বিনোদিনীর মুখের দিকে চাহিল এবং জিজ্ঞাসা করিল, “মাসিমা, আপনি এখানে কেন? মায়ের মুখে কখনও মামার বাড়ীর নাম শুনি নাই, শুনিয়াছি আমার এক মামা ছিলেন, তিনি চৌদ্দ বৎসর পূর্ব্বে সন্ন্যাসী হইয়া গিয়াছেন।”

 “চৌদ্দ বৎসর পূর্ব্বে গঞ্জালিস্ আমাকে ও আমার ভ্রাতৃজায়াকে খড়দহ হইতে ধরিয়া আনিয়াছিল। আমি বাল-বিধবা, তোমার মামী মরিয়া স্বর্গে গিয়াছেন, আর আমি পাপের পসরা বহিয়া মরিতেছি।” বিনোদিনী এই বলিয়া পুনরায় রোদন করিয়া উঠিল, ললিতা কি বলিবে স্থির করিতে না পারিয়া নিঃশব্দে ক্রন্দন করিতে লাগিল। কিয়ৎক্ষণ পরে শান্ত হইয়া বিনোদিনী কহিল, “মা, এখন তোমার জ্ঞান হইয়াছে, ফিরিঙ্গীরা এ সংবাদ পাইলে এখনই তোমাকে ধরিয়া লইয়া যাইবে। তোমাকে এখন পলাইতে হইবে।” তাহার পরে ময়ূখের দিকে ফিরিয়া কহিল, “বাবা, তুমি যখন ললিতার জন্য এত করিয়াছ, তখন আর একটু উপকার কর, তুমি ইহাকে লইয়া ভীমেশ্বরে ফিরিয়া যাও।” ময়ূখ ঈষৎ হাসিয়া কহিলেন, “আমি উঠিতে পারিলেই লইয়া যাইব।” তাহা শুনিয়া ললিতা বলিয়া উঠিল, “মাসিমা, ভীমেশ্বরে কোথায় যাইব? পিতা কি আমাকে গৃহে স্থান দিতে ভরসা করিবেন?” বলিতে বলিতে ললিতার আকর্ণবিশ্রান্ত নীলেন্দীবরতুল্য নয়নযুগল জলে ভরিয়া আসিল। ময়ূখ কহিলেন, “ললিতা, গোস্বামী ঠাকুর তোমাকে গৃহে লইতে সম্মত হইলেও গ্রামের লোকে দিবে কি না সন্দেহ। হরিনাথ গঙ্গোপাধ্যায় আছে, মাধব গঙ্গোপাধ্যায় আছে, কালিদাস চট্টোপাধ্যায় আছে, তাহারা নিশ্চিন্ত থাকিবে না।” বিনোদিনী দীর্ঘ নিশ্বাস ত্যাগ করিয়া কহিল, “তাহাও ত বটে, তবে কি উপায় হইবে? বাবা, তুমি যখন ললিতাকে উদ্ধার করিতে আসিয়াছিলে তখন মনে কি স্থির করিয়াছিলে?” “মা, এ সকল কথা একবারও মনে হয় নাই।”

 বিনোদিনী মাথায় হাত দিয়া ভাবিতে বসিল; ক্ষণকাল পরে কহিল, “ললিতা যখন আমার আশ্রয়ে আসিয়া পড়িয়াছে তখন আমি তাহাকে ফেলিয়া দিতে পারিব না। এখানে থাকিলেও তাহাকে রক্ষা করিতে পারিব না। বাবা, আমরা আগ্রা যাইব, আর কোথাও ফিরিঙ্গীর হাত হইতে ললিতাকে বাঁচাইতে পারিব না। বাবা, তুমি কি আমাদের সঙ্গে যাইবে?

 ময়ূখ বলিলেন, “যাইব।”

 সেই দিন হইতে বিনোদিনী আর ললিতাকে ঘরের বাহির হইতে দিল না। ময়ূখ সুস্থ হইলে সে এক নিশীথ রাত্রিতে তাহার পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন কু্টীর দ্বারারুদ্ধ করিয়া ললিতা ও ময়ূখের সহিত পলায়ন করিল। তাহার দুইদিন পরে ফৌজদারী সিপাহীর সহিত তর্করত্ন মহাশয় ও ভুবন আসিয়া ময়ূখ বা ললিতাকে দেখিতে পাইলেন না।

 নাজিম্‌ আসদ্‌ খাঁ ভুবনের মুখে ময়ূখের সংবাদ পাইয়া, তর্করত্ন মহাশয় ও ভুবনকে সন্ধান লইবার জন্য গোপনে হুগলী প্রেরণ করিয়াছিলেন। তর্করত্ন যখন সপ্তগ্রামে ফিরিলেন তখন শাহ্‌ওয়াজ খাঁ, আলীনকী খাঁ ও আসদ্‌ খাঁ পরামর্শ করিতেছিলেন। বৃদ্ধ ব্রাহ্মণ নবাব নাজীমকে জানাইলেন যে, ময়ূখ জীবিত আছেন, রাধামোহন গোস্বামীর কন্যা ও তিনি হুগলীতে বিনোদিনী বৈষ্ণবীর গৃহে আশ্রয় পাইয়াছিলেন, কিন্তু দুই তিন দিন পূর্ব্বে বিনোদিনী রাত্রিযোগে তাহাদিগকে লইয়া পলায়ন করিয়াছে, কোথায় গিয়াছে কেহ বলিতে পারে না। সংবাদ শ্রবণ করিয়া শাহ্‌নওয়াজ খাঁ ও আসদ্‌ খাঁ বিষন্ন বদনে চিন্তা করিতে লাগিলেন। বহুক্ষণ পরে আসদ খাঁ কহিলেন, “নবাব, আপনি বাদশাহের দরবারে ফিরিয়া যান। শাহান্‌শাহ, বাদশাহের আদেশে অপর কেহ যতক্ষণ বাঙ্গালার নাজিম নিযুক্ত না হইবেন, ততক্ষণ আমি জহাঙ্গীর নগরে থাকিতে বাধ্য, নূতন সুবাদার আসিলে আমিও আকবরাবাদ যাইব।” শাহ্‌নওয়াজ খাঁ দীর্ঘ নিশ্বাস ত্যাগ করিয়া কহিলেন, “তাহাই হউক, রাদন্দাজ্‌ ও আমি কল্যই সপ্তগ্রাম পরিত্যাগ করিব।”

 “দেবেন্দ্র নারায়ণের যে কয়জন পুরাতন ভৃত্য ময়ূখের সন্ধানে আসিয়াছিল, তাহাদিগকে আপনার সহিত লইয়া যান, পথে মখ্‌সুসাবাদে তাহাদিগকে ছাড়িয়া দিবেন। কাফের, তোমরা নবাব সাহেবের সহিত ফিরিয়া যাও, দেবেন্দ্র নারায়ণের পুত্র যদি কখনও ফিরিয়া আসে, তাহা হইলে ভীমেশ্বরে সংবাদ পাঠাইব।”

 তর্করত্ন মহাশয় কহিলেন, “হুজুর, আমি ব্রাহ্মণ, ব্রাহ্মণ জাতি হিন্দুদিগের মধ্যে দেওয়ানা ফকীর বিশেষ। সংসারে আপনার বলিতে আমার কেহই নাই। যে দিন ভীমেশ্বর পরিত্যাগ করি, সেইদিন ভীমেশ্বর স্পর্শ করিয়া প্রতিজ্ঞা করিয়াছিলাম যে, যদি কখন প্রভুপুত্রের সহিত ফিরিতে পারি তাহা হইলে ভীমেশ্বরে ফিরিব, নতুবা কাশীবাস করিব। নবাব সাহেব আগ্রায় ফিরিবেন, আমাদের কয়জনকে সঙ্গে লইয়া গেলে বড়ই বাধিত হইব।”

 “কাফের, তুমি আগ্রায় গিয়া কি করিবে?”

 “বাদশাহের দরবারে ফিরিঙ্গির অত্যাচারের কথা নিবেদন করিব।”

 শাহ্‌নওয়াজ খাঁ বলিলেন, “উত্তম কথা, আমিও ফিরিঙ্গি হার্ম্মাদের অত্যাচারের সাক্ষী বাদশাহের দরবারে উপস্থিত করিতে চাহি। এই কাফের মোল্লা আমার সহিত যাইতে প্রস্তুত আছে; পাদ্রী যে কাফের ফকীরকে পীড়ন করিয়াছিল তাহাকেও লইয়া যাইতে পারিলে ভাল হয়।”

 আসদ্‌ খাঁ বলিলেন, “উত্তম।”

 গুলরুখ্‌ সপ্তগ্রামে ফিরিয়া আসিয়া রাদন্দাজ্‌ খাঁর গৃহে বাস করিতেছিলেন, তাঁহার ভৃত্যবর্গ একে একে ফিরিয়া আসিয়াছিল। গৃহে ফিরিয়া শাহ্‌নওয়াজ খাঁ গুলরুখকে জিজ্ঞাসা করিলেন, “মা, আমরা কল্য আগ্রা যাত্রা করিব, তোমরা কোথায় যাইবে?” যুবতী কহিল, “কোথায় যাইব তাহাত স্থির করি নাই? মনে করিতেছি, আপনার সহিত আগ্রায় যাইব।”

 “চল, আমরা কল্য প্রভাতে যাত্রা করিব।” “আমিও যাইব। আমার স্বামীর কোন সন্ধান পাওয়া গিয়াছে কি?” “গিয়াছে, তিনি হুগলীতে এক কাফের রমণীর গৃহে আশ্রয় লইয়াছিলেন, পরে সে স্থান হইতে পলায়ন করিয়াছেন। মা, তোমার স্বামী কি কাফের ছিলেন?”

 “ছিলেন, তিনি আমাকে বিবাহ করিবার জন্য মুসলমান হইয়াছিলেন।” “তুমি কি তাহার পূর্ব্ব পরিচয় জান?” “না।” “তিনি রাঢ়দেশের এক জমীদারের পুত্র।” “হার্ম্মাদ অত্যাচারের জন্য বাঙ্গালা দেশ নিরাপদ নহে; সেই জন্য মনে করিতেছি আগ্রায় গিয়া বাদশাহের দরবারে সমস্ত দুঃখ নিবেদন করিব। আমি আশ্রয়হীনা অনাথিনী,—একাকী বাঙ্গালা দেশে থাকিয়া স্বামীকে উদ্ধার করিতে পারিব না।”

 পরদিন শাহ্‌নওয়াজ খাঁ, রাদন্দাজ্‌ খাঁ ও তাঁহার পত্নী, গুলরুখ্‌, ফতেমা, নাজীর আহমদ্‌ খাঁ, হবীব, চৈতন্যদাস বৈরাগী, তর্করত্ন মহাশয় ও ভুবন জলপথে আগ্রায় যাত্রা করিলেন।