মহাভারত (উপক্রমণিকাভাগ)/ষোড়শ অধ্যায়

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে চলুন অনুসন্ধানে চলুন

ষোড়শ অধ্যায়—আস্তীকপর্ব্ব।

শৌনক কহিলেন, হে সূতনন্দন! তুমি যাহা বর্ণন করিলে, পুনর্ব্বার তাহারই বিস্তারিত বর্ণনা কর, আস্তীকের সবিস্তর বৃত্তান্ত শ্রবণে আমাদিগের মহীয়সী বাসনা জন্মিয়াছে। তুমি যাহা কীর্ত্তন করিতেছ, তাহা অতি ললিত ও মধুর বোধ হইতেছে; আমরা শুনিয়া পরম পরিতোষ পাইতেছি। তুমি পুরাণ কীর্ত্তন বিষয়ে আপন পিতার ন্যায় পাণ্ডিত্য প্রকাশ করিতেছ। তোমার পিতা যেমন অনন্যমনাঃ ও অনন্যকর্ম্মা হইয়া আমাদিগকে সম্পূর্ণরূপে পুরাণ শ্রবণ করাইয়াছিলেন, এক্ষণে তুমিও সেইরূপ শ্রবণ করাও।

 উগ্রশ্রবাঃ কহিলেন, হে মহাভাগ! আমি আপন পিতার নিকট আস্তীকোপাখ্যান যেরূপ শ্রবণ করিয়াছি, আপনার নিকট অবিকল সেইরূপ কীর্ত্তন করিতেছি, শ্রবণ করুন।

 সত্যযুগে কদ্রু ও বিনতা নামে দক্ষ প্রজাপতির দুই সুলক্ষণা পরম সুন্দরী কন্যা ছিলেন। ঐ দুই ভগিনীর কশ্যপের সহিত বিবাহ হয়। মহাত্মা কশ্যপ সেই দুই ধর্ম্মপত্নীর প্রতি প্রসন্ন হইয়া বর প্রদান করিলেন। তাঁহারাও কশ্যপের নিকট স্ব স্ব অভিলাষানুরূপ বর প্রাপ্ত হইয়া সাতিশয় হর্ষ ও পরিতোষ প্রাপ্ত হইলেন। কদ্রু তুল্যতেজস্বী সহস্র নাগ পুত্র প্রার্থনা করিলেন। কিন্তু বিনতা এই বর লইলেন যে, আমার দুইটি মাত্র পুত্র হউক, কিন্তু তারা যেন কদ্রুর সহস্র পুত্র অপেক্ষা বলে, বিক্রমে, ও কলেবরে শ্রেষ্ঠ হয়। কশ্যপ তাঁহাকে উক্ত অভিলষিত পবিত্র বর প্রদান করিলেন। বিনতা স্বামীর নিকট যথাপ্রার্থিত বর লাভ করিয়া সাতিশয় সন্তুষ্টা ও চরিতার্থা হইলেন। কদ্রুও তুল্যবল সই পুত্র লাভ দ্বারা আপনাকে কৃতার্থ জ্ঞান করিলেন। মহাতপাঃ কশ্যপ পত্নীদিগকে, তোমরা যত্ন পূর্ব্বক গর্ভধারণ করিবে, এই উপদেশ দিয়া বন প্রবেশ করিলেন।

বহুকাল অতীত হইলে পর, কদ্রু অণ্ডসহস্র ও বিনতা অণ্ডদ্বয় প্রসব করিলেন। পরিচারিকাগণ তাঁহাদিগের প্রসূত অণ্ড সমুদার উপস্বেদসম্পন্ন ভাণ্ড মধ্যে পঞ্চশত বর্ষ স্থাপন করিল। তদনন্তর কদ্রুপ্রসূত অণ্ডসহস্র মধ্য হইতে এক এক পুত্র নির্গত হইল; কিন্তু বিনতাপ্রসূত অণ্ড তদবস্থই রহিল। পুত্রার্থিনী দীনা বিনতা, তদ্দর্শনে লজ্জিত হইয়া, কালবিলম্ব সহিতে না পারিয়া, স্বপ্রসূত অণ্ডদ্বয়ের অন্যতর ভেদন পূর্ব্বক দেখিলেন, পুত্রের শরীরের পূর্ব্বাৰ্দ্ধমাত্র যথাবৎ সংঘটিত হইয়াছে, অন্যার্দ্ধ কিঞ্চিন্মাত্রও সংঘটিত হয় নাই। তখন সেই পুত্র ক্রোধে অন্ধ হইয়া স্বীয় জননীকে এই শাপ দিলেন, মাতঃ! তুমি লোভপরবশ হইয়া, শরীর সম্পূর্ণ সংঘটিত না হইতেই, আমাকে অকালে অণ্ড হইতে বহিস্কৃত করিলে; অতএব তুমি যে সপত্নীর সহিত প্রতিদ্বন্দ্বিতা করিতেছ, পঞ্চশত বৎসর তাহার দাসী হইয়া থাকিবে। অপর অণ্ডমধ্যে তোমার যে পুত্র আছে, যদি তাহাকেও আমার মত অকালে বহিস্কৃত করিয়া অঙ্গহীন অথবা বিকলাঙ্গ না কর, তবে সে তোমার দাসীভাব মোচন করিবেক। যদি তুমি পুত্রের বিশিষ্ট বল বিক্রম বাসনা কর, তবে ধৈর্য্য অবলম্বন করিয়া ইহার জন্মকাল প্রতীক্ষা কর; ইহার জন্মের আর পাঁচ শত বৎসর বিলম্ব আছে।

 অরুণ, জননীকে এইপ্রকার শাপপ্রদানের পর, অন্তরীক্ষে আরোহণ করিয়া সূর্যয়দেবের রথের সারথি হইলেন। এই নিমিত্ত সর্ব্ব কাল প্রভাত সময়ে অরুণকে দেখিতে পাওয়া খায়। সপভোজী গরুড়ও যথাকালে জন্মগ্রহণ করিলেন। তিনি জাতমাত্র ক্ষুধার্ত্ত হইয়া, বিধাতৃবিহিত স্বীয় ভোজ্য বস্তু আহরণার্থে, বিনতাকে পরিত্যাগ করিয়া নভোমণ্ডলে গমন করিলেন।