বিষয়বস্তুতে চলুন

মাউ মাউএর দেশে/১

উইকিসংকলন থেকে

  ►

মাউ মাউএর দেশে

(১)

 আমার নাম জব্বো। বৃটিশ পূর্ব আফ্রিকার কেনিয়া কলোনীতে আমার জন্ম। বর্তমানে যাদের মাউ মাউ বলা হয় আমি সেই মাউ মাউ জাতের লোক। আমার নাম শুনেই তোমরা হাসবে। হাসবার কথাই। জব্বো নামধারী কোনও লোক নিশ্চয়ই তোমাদের দেশে নেই। অনুরোধ করছি, আমার নাম শুনে তোমরা হেসো না। পৃথিবীতে নানা জাতির বাস। প্রত্যেক জাতির ভাষা অনুযায়ী নাম হয়ে থাকে। এমন অনেক দেশ আছে, যে সব দেশে নামের অর্থ হয়। আমাদের দেশে নামের কোন মানে হয় না। জব্বো শব্দের অর্থ জানবার জন্যে চেষ্টা করো না। যদি চেষ্টা কর, তবে কোন লাভও হবে না।

 এখন আমার দেশের কথা একটু শোন, তারপর আমার জীবনের বিচিত্র অভিজ্ঞতার কথা তোমাদের কাছে বলব। আমার দেশের উত্তরে সোমালীল্যাণ্ড, ইথোপিয়া এবং সুদান, দক্ষিণে টেংগানিয়াকা, পূর্বে ভারত মহাসাগর এবং পশ্চিমে কংগো। তোমাদের প্রত্যেকের বাড়িতেই মানচিত্র রয়েছে। মানচিত্র খুললেই দেখতে পাবে, আমার দেশের অর্ধেকেরও বেশি সমতল ভূমি এবং বাকি পঁয়তাল্লিশ ভাগ পার্বত্য অঞ্চল। পার্বত্য অঞ্চলে ইউরোপীয়ানরা বাস করে। সমতল ভূমিতে আমরা, নবাগত ভারতবাসী, আরব, তুরুক, চীনা এবং অন্যান্য জাতি বাস করে।

 আমার দেশের পাশ দিয়ে বিষুব রেখা চলে গেছে। তোমরা ভাববে দেশটা কতই গরম, সেখানে কি মানুষ বাস করতে পারে? তোমাদের কারো যদি সেরূপ ধারণা থাকে, তবে সেই ধারণা ভুল। ভারত মহাসাগর হতে যখন পূর্বের বাতাস আমার দেশের উপর দিয়ে বয়ে যায়, তখন বিষুব বেখা কাছে থাকার জন্য যে গরম হয়, তা আর থাকে না। তারপর উত্তর-পশ্চিম হতে যখন বাতাস বইতে আরম্ভ করে, তখন ত দস্তুরমত শীত করে। এই ত গেল সমতল ভূমির কথা।

 শুনেছি তোমাদের দেশে হিমালয় পর্বতের পাদদেশে অনেক শহর আছে, আরও আছে কাশ্মীর। যখন তোমাদের দেশের দিল্লী, লাহোর, পাটনা প্রভৃতি স্থানে ১১৮ ডিগ্রী উত্তাপ হয়, তখন কাশ্মীরের লোক গরম কাপড় গায়ে রাখতে বাধ্য হয়। সিমলা, নাইনিতাল, মুসৌরী, নীলগিরি এ-সব স্থানে গরমের সময়ও লোক শীতে থরথর করে কাঁপে। এর একমাত্র কারণ হল, এই সব স্থান সমুদ্রের লেভেলের অনেক হাজার ফুট উচ্চে অবস্থিত। আমাদের দেশের পার্বত্য অঞ্চলও সমুদ্র লেভেল্ হতে পাঁচছয় হাজার ফুট উচ্চে অবস্থিত, সেজন্য বৎসরের সব সময়ই পার্বত্য অঞ্চলে শীত লেগে থাকে।

 যদিও পার্বত্য অঞ্চলে আমাদের বসবাসের অধিকার নেই, তবুও এমন অনেক পার্বত্য জাতি আছে যারা এখনও সমতল ভূমিতে আসতে রাজী হচ্ছে না। হয়ত ভবিষ্যতেও রাজী হবে না। কে নিজের জন্মভূমি পরিত্যাগ করে, অন্যত্র যেতে চায় বল ত?

 যারা কখনও জন্মভূমি পরিত্যাগ করে নি, তারা ভাল ঘর অথবা গ্রাম তৈরী করে থাকার মত অধিকার পায় না। আমার মায়েরও হয়েছিল সেই অবস্থা। ভাল ঘর তৈরী করতে পারেন নি বলে মা কখনও দুঃখিত ছিলেন না। কিন্তু যেখানে আমাদের ঘর তৈরী করা হয়েছিল, সেই স্থানটি বড়ই সুন্দর। ঠিক উত্তর দিকে নিকুরু লেক্‌, দক্ষিণে মস্ত বড় একটা জংগল, তারই পাশে আমাদের ঘর। ঘরটা কাদার তৈরী, ছাউনি উলুখড়ের। পৃথিবীর অনেক সভ্য দেশেও আমাদের ঘরের মত ঘর আছে। বাংলা, বিহার, উড়িষ্যা, আসাম প্রভৃতি দেশের লোক নাকি আমাদের ঘরের মত ঘরে থেকেও বেশ উঁচু গলায় নিজেদের সভ্য বলে পরিচয় দেয়।

 আমার মা এদিকের মধ্যে একজন প্রতাপান্বিতা মহিলা। অনেকগুলি ভুট্টার জমি ত আছেই, উপরন্তু আছে অনেকগুলি গাই। গাইএর দুধের উপরই আমরা নির্ভর করি সবচেয়ে বেশি। আমাদের বাড়ির কাছে অনেক ইণ্ডিয়ান্ বাস করে, তারা গাইয়ের দুধ দুইয়ে গরম করে, তারপর গ্লাসে ঢেলে খায়। আমরা কিন্তু সেরূপ করি না। বাছুরটাকে একদিকে সরিয়ে দি‍য়ে গাইয়ের বাঁট চাবটা ভাল করে ধুয়ে মুছে ফেলি, তারপর বাছুর যেমন তার মার দুধ চুষে খায়, আমরাও তেমনি দুধ খাই। কিন্তু পুরাতন প্রথা বোধ হয় থাকবে না। আমাদের মধ্যে যারা শহরের কাছে থাকতে পায়, তারা ইণ্ডিয়ান্‌দের মত দুধ দোহন করে এবং পরে গরমও করে। এর পরে কিসে করে খায় আমি দেখি নি।

 তোমরা যেমন কাপড় ব্যবহার কর, আমরা ঠিক সেরূপ কাপড় ব্যবহার করি না। অনেকে হাফপ্যাণ্ট ব্যবহার করে। মেয়েরা ব্যবহার করে নানারূপ জীবজন্তুর চামড়া। জীবজন্তুর চামড়া ব্যবহার কমে আসছে। অনেকে ইংলিশ ফ্যাসনে ফ্রক ব্যবহার আরম্ভ করেছেন। মনে হয ভবিষ্যতে এটাই চলবে, চামড়া চলবে না। আমার একটি বোন সেদিন শহরে গিয়েছিল। শহরে আমরা খুব কমই যাই। সেদিন আমার বোন অনেকগুলি খরগোশ বিক্রি করতে নিয়ে গেল। খরগোশ বিক্রি করে প্রায় ত্রিশ শিলিংএর মত পায়। অন্যান্য মেয়েরা যখন কাপড় কিনছিল, তখন সেও কাপড় কিনতে যায় এবং তার জন্য একটি ফ্রক কিনে আনে। ফ্রক তাকে বেশ মানায়। এখন থেকে সে ফ্রক ব্যবহার করছে, কিন্তু আমার মা এখনও চামড়াই ব্যবহার করছেন।

 খরগোশ বিক্রিতে অর্থ পাওয়া যায় দেখে আমার ইচ্ছা হল অনেকগুলি খরগোশ ধরে এনে আমার বোনকে দেব এবং সে বাজারে এ-সব বিক্রি করে আরও ফ্রক কিনবে। মনে রেখো, আমাদের অন্য কোনও অভাব নেই। এর মানে হল আমাদের কিছুই কিনতে হয় না, যা আমাদের দরকার সবই আমরা আমাদের ক্ষেত এবং জংগল হতে কুড়িয়ে আনি।
জুলু সর্দার
যদি আমার বোন ফ্রক না কিনত, তবে হয়ত আমি গভীর জংগলে খরগোশ ধরতে যেতাম না।

 আমাদের বাড়ি হতে বেশি হয় ত তিন মাইল দূরে পশুস্থানের আরম্ভ হয়েছে। সরকারী আইনমতে পশুস্থানে মানুষ বাস করতে পারে না। সরকারের এই আইন সকল জাতের নিগ্রোই আনন্দের সহিত মেনে চলে। ভুলেও আমবা সেদিকে ঘর তৈরী করার কল্পনাও করি না। কিন্তু যারা এই আইন করেছে, তারাই কিন্তু আইন ভঙ্গ করে। ইউরোপ হতে আগত শ্বেতকায়রা মাঝে মাঝে কাপড়ের ঘর করে। যাকে তোমবা তাঁবু বল, সেই ঘরে বাস করে এবং পশু হত্যা করে। এটা কিন্তু ভয়ানক অন্যায়। যাদের স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছে তাদের হত্যা করা কি অন্যায় নয়?

 পূর্বেই বলেছি, আমার বোনকে আরও কয়েকটা ফ্রক কিনে দেবার ইচ্ছা ছিল, সেজন্য একদিন মায়ের কাছে বললাম, “আচ্ছা মা, পশুস্থান হতে খরগোশ ধরে আনলে হয় না?”

 কি ভেবে মা বললেন, “পশুস্থান হতে পশু হত্যা করা সবকারী আইন মতে নিষেধ রয়েছে, কিন্তু ইউবোপীয়ানরা পশু হত্যা করে এবং পশুর চামড়া, হাড়, শিং, এমন কি দাঁত পর্যন্ত বিদেশে চালান দেয়। আমরাও যদি পশুস্থান হতে পশু হত্যা করি, তবে আইন অমান্য করা হয় না, কিন্তু কথা হল পশুস্থানে যেতে হলে অস্ত্রের দরকার, তোমার কি অস্ত্র আছে?”

 হাতের কাছে মস্ত বড় চাবুকখানা উঁচিয়ে বললাম, “এর চেয়ে বড় অস্ত্র আর কি হতে পারে?”

 মা বললেন, “এই যদি যথেষ্ট হয় তবে যাও। ঘরে বসিয়ে আজীবন ত খাওয়াতে পারব না, বাইরে যেতেই হবে, আজ না হয় কাল; জব্বু তুমি তোমার ইচ্ছামত যেখানে সেখানে যেতে পার।”

 এটা কিন্তু আমার মায়ের আদেশও ছিল না, অনুরোধও ছিল না। পুরুষ ছেলে কখনও ঘরে বসে থাকে না, এটাই হল আমাদের নিয়ম।

 পরের দিন সকালে মস্ত বড় ছোরা কোমরে বেঁধে একটি শক্ত লাঠি হাতে করে আমি বের হলাম খরগোশ শিকারে। খরগোশ শিকারে বের হয়ে মনে হল, আস্ত পশুস্থানটা (Reserve for Animals) বেড়িয়ে আসব। যদি হাতীব দাঁত পেয়ে যাই, তবে অনেক কিছু কিনতে পারব। বিদায়ের সময় মা একটি কথাও বললেন না, বোনটা একটু কাঁদল। আমার বোন একটু বোকা, সেজন্যই কেঁদেছিল। বড় হলে সেও আর কাঁদবে না। গম্ভীর হয়ে থাকাই হল দুঃখ প্রকাশের লক্ষণ। যারা কেঁদে ফেলে, তাদের মন বড়ই কোমল। তারা জানে না দুঃখ কাকে বলে।

 এই ত কয়েক বৎসর পূর্বে আমার এক কাকাকে অন্য একটা লোক খুন করেছিল। সংবাদ শুনে আমাব বাবা একটুও দুঃখ প্রকাশ করেন নি। গম্ভীর হয়ে বয়েছিলেন অনেকক্ষণ। কেউ তাঁকে সান্ত্বনা দেয় নি। কয়েক বৎসর পর আমার কাকার হত্যাকারী একদিন নিজেই আমাদের বাড়িতে এল এবং আমার বাবাকে হত্যার কারণ বলল। বাবা বলছিলেন, “তোমার কথা যে ঠিক তার প্রমাণ নিয়ে এস।” লোকটি তার সাক্ষী নিয়ে এসেছিল একটি পাথর। পাথর দিয়ে আমার কাকা এই লোকটির উপর ঢিল ছোঁড়েন। সেও অন্য পাথর দিয়ে ঢিল ছুঁড়েছিল। যে পাথর দিয়ে সে ঢিল ছুঁড়েছিল, সেই পাথরটাই সংগে করে নিয়ে এসেছিল। বাবা যখন বুঝলেন, ঢিল ছোঁড়াছোঁড়ির জন্যই আমার কাকার মৃত্যু হয়েছে, তখন তিনি হত্যাকারীকে বিদায় দিলেন। আমাদের সামাজিক নিয়মমতে যারাই ঢিল ছোঁড়ে, তখন তাদের জ্ঞান থাকে না। অজ্ঞান হয়ে একজন অপর জনকে হত্যা করার জন্য ‘অজ্ঞান ভূত’ দায়ী। অজ্ঞান ভূত যাতে কারো ঘাড়ে না চাপে, সেজন্য আমরা প্রত্যেক বৎসর একটা করে পাঁঠা অজ্ঞান ভূতকে উপহার দেই। আমাদের পুরোহিত সেই পাঁঠাকে এক কোপে কেটে তার রক্ত পান করে, আমরা সেই পাঁঠার মাংস খাই।

 বিদায়ের সময় আমার মায়ের গাম্ভীর্য ভয়ের সৃষ্টি করে নি, এনে দিয়েছিল দীর্ঘ সময়ের বিচ্ছেদ-যন্ত্রণা। আমিও জানতাম না, একবার গভীর জংগলে ঢুকলে সহজে বের হওয়া যায় না।

 প্রথম দিনই পাঁচ মাইল পথ অতিক্রম করে জংগলের কাছে পৌঁছলাম। সন্ধ্যার পরই নানা রকমের হিংস্র জীব আহার অন্বেষণে বের হয়, তা’ আমার জানা। সেজন্য তাড়াতাড়ি করে চক্‌মকি পাথর বের করে আগুন জ্বালিয়ে ফেললাম। আমাদের কোমরে একটি রশি বাঁধা থাকে, সেই রশিতে নানারূপ জিনিস আমরা বেঁধে রাখি। চক্‌মকি পাথর এবং একটি লোহার টুক্‌রা সেগুলির মধ্যে দু’টি জিনিস।

 তাড়াতাড়ি করে আগুন জ্বেলে অনেকগুলি গাছের ডাল তাতে দিয়ে দিলাম। আগুনটা বেশ বড় হয়ে উঠল। আমিও মায়ের দেওয়া এক টুক্‌রা মাংস আগুনে ঝলসিয়ে খেয়ে ফেললাম। তারপর ঘুম। এক ঘুমেই প্রভাতী সূর্যের দেখা পেলাম। প্রভাতী সূর্য আমার নাকে মুখে কিরণ ঢেলে দিচ্ছিল, সেজন্য ঘুম ভেংগে গেল।

 তোমরা হয়ত ভাববে, সেদিন আমার পাশ দিয়ে কোনও বন্য জন্তু যাওয়া আসা করে নি। কিন্তু জেনে রেখো, আগুনের পাশ দিয়ে কোনও বন্য জীব যাওয়া আসা করে না। যদি আগুনের পাশ দিয়ে যাওয়া আসা করত, তবে আজ পৃথিবীতে এত লোক দেখা যেত না। আগুনকে বন্য জীব বড়ই ভয় করে। বনে জংগলে যদি তোমরা কেউ কোন দিন যাও এবং ঘুমোতে ইচ্ছা কর, তবে পাশে বেশ জমকালো একটি আগুন জ্বেলে রেখো, দেখবে বনের পশু তোমাদের কাছে কখনও আসবে না।

 ঘুম থেকে উঠেই দেখলাম একটু দূরে একটি খরগোশকে হত্যা করে কোনও বন্য জীব অর্ধেক খেয়ে বাকিটুকু ফেলে রেখে গেছে। আমারও বেশ ক্ষুধা হয়েছিল, কিছু খেতে হবে, নতুবা বাঁচব কি করে? সেজন্য আমিও খরগোশের অন্বেষণে বের হলাম। দিনের আলোতে খরগোশ ধরা বড়ই সহজ। খরগোশ কোনও ঝোপে অথবা পাহাড়ের গুহায় দল বেঁধে চুপ করে বসে থাকে, কিন্তু সেই ঝোপ অথবা গুহা অনুসন্ধান করতে বড়ই বেগ পেতে হয়।


কিকুউ যুবক

 আমাদের দেশে যারা সভ্য বলে পরিচয় দেয়, তারা সকালে ঈশ্ববের নাম স্মরণ করে। আমরা হলাম অসভ্য, ঘুম থেকে উঠেই আমরা ভাবি কি কাজ করতে হবে। খাবারের কথাই প্রথম মনে হয়। খাবার কোথায় পাওয়া যাবে, সে বিষয় চিন্তা হয় প্রথম, সেই সংগে চিন্তা হয় খাদ্য আহরণ করতে গিয়ে যদি বিপদে পড়ি, তবে কি করে আত্মরক্ষা করব। আমার মনেও সে ধারণাই প্রথম হয়েছিল, সেজন্য সর্বপ্রথমই মনে হল ছুরির কথা। ছুরি কোমরে বাঁধাই ছিল। চট্‌ করে ছুরিটা বের করে একটু ধার দিয়ে নিলাম, তারপর কোথায় খরগোশ পাব তারই অন্বেষণে জংগলে প্রবেশ করলাম।

 জংগলে প্রবেশ করলেই জানোয়ারের সন্ধান পাওয়া যায় না। জংগল সম্বন্ধে অনেক কিছু জানা দরকার। আমাদের দেশে জংগল নানা প্রকারের। গরম প্রধান স্থানে যে সকল বন আছে, সেই বনে কোনও জানোয়ার প্রবেশ করে না, এমন কি সাপও না। প্রত্যেকটি গাছে বড় বড় কাঁটা থাকে, এমন কি সাধারণ লতার কাঁটায় যে কোন জীবের প্রাণনাশ হতে পারে। এই প্রকারের জংগলে কোন জীবের অন্বেষণে যাওয়া মূর্খতা ছাড়া আর কিছুই হতে পারে না। আফ্রিকার যে সকল স্থান চার হাজার ফুটের বেশি উচ্চ, সেই সকল স্থানের জংগলেই বন্যপশু দেখতে পাওয়া যায়। হাজারে হাজারে জেব্রা, বনগরু, আরও অন্যান্য উদ্ভিদজীবী জন্তু যখন পরিষ্কার তৃণভূমিতে চরে, তখন পাহাড়েব উপর থেকে দেখলে মনে হয় যেন ধূসব বর্ণের একটি হ্রদ এবং তাতে ঢেউ বয়ে যাচ্ছে। তৃণভোজীরা দিনে আক্রান্ত হয় না, আক্রান্ত হয় রাতে। অনেক তৃণভোজী উন্মুক্ত মাঠেই শুয়ে থাকে। তাদের দু’একটা কেন, দু’দশটাকে হিংস্র জন্তু যদি নিয়ে যায় তবুও টের পায় না—যেমন মনে কর জেব্রা। হাজার হাজার জেব্রার মাঝ থেকে যদি দুটো কি দশটা জেব্রা সিংহ অথবা চিতাবাঘ টেনে নিয়ে যায়, তবে জেব্রাদের মধ্যে ক্ষণিকের তরে চাঞ্চল্য হয়, তারপরই যেমন তেমন।

 যে সব স্থানে হাজার হাজার জানোয়ার থাকে সেখান থেকে আমার বাড়ি অন্ততঃ দু’শ মাইল দূরে। জেব্রা, বনগরু, হরিণ এ-সব মেরেও লাভ হবে না, কেউ এ-সবের চামড়া আমার কাছ থেকে কিনবে না। লাইসেন্স থাকলে তবে এ-সব জীবের চামড়া বিক্রি করা চলে। পশু-চামড়া বিক্রি করার অধিকার আমাদের নেই। নিগ্রো ছাড়া সবাই পশু-চামড়া বিক্রি করতে পাবে, লাইসেন্সও পায়। আমরা খরগোশ, হাঁস, মোরগ, ছাগল, ভেড়া, পালা গরু এবং শূকর বিক্রি করতে পারি, কিন্তু কোন জীবেব চামড়া বিক্রি করতে পারি না। কাজেই খরগোশ ছাড়া আর কিছু মারবার অথবা চামড়া বিক্রি করার অধিকার আমার ছিল না।

 বনের দিকে এগিয়ে চলছিলাম। এ-সব বনের গাছ এবং লতাপাতাতে কাঁটা নেই, সেজন্য হেঁটে যেতে কোন কষ্ট হচ্ছিল না। ভয় হচ্ছিল, পেছন থেকে যদি চিতাবাঘ ঘাড়ে লাফিয়ে পড়ে, তবে বাঁচবার উপায় থাকবে না। আরও ভয় ছিল সিংহের। সিংহের যদি পেট ভরা থাকে এবং তার পাশ দিয়েও যাওয়া যায়, তবে কোন মতেই আক্রমণ করে না। আমি যেদিকে চলছিলাম সেদিকে সিংহ ছিল না। তবুও মনে হচ্ছিল যদি দু’জন হতাম তবুও ভাল ছিল। আমি যে একেবারে একাকী। সংগের মাংসের টুক্‌রা বয়ে নিয়ে যেতেও ইচ্ছা হচ্ছিল না, প্রথমত সংগের টুক্‌রা শেষ করে নেই এই ভেবে যখন আগুন জ্বালতে আরম্ভ করছিলাম, তখন এক প্রকারের একটি বেঁটে অজগর সাপ আমার পাশ দিয়ে যাচ্ছিল। সাপটা আমাকে দেখতে পাচ্ছিল। বোধ হয় ইচ্ছা ছিল আমাকে আক্রমণ করতে, কিন্তু আগুনের ভয়ে দূর দিয়েই চলে গিয়েছিল। সাপটারও বোধ হয় ক্ষুধা ছিল, নতুবা এত কড়া দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকাবে কেন?

 সাপটা তাড়াতাড়ি চলতে পারছিল না। ইচ্ছা হ’ল সাপটাকে হত্যা করতে। বোধ হয় এটার চামড়া ভাল দরেই বিক্রি হবে। চিন্তা অনুযায়ী কাজ। তাড়াতাড়ি করে একটি গাছের ডাল কেটে নিলাম এবং সেই ডালটি দিয়ে পেছন থেকে সাপের মাথায় আঘাত করতেই সাপটা পাশের গাছটা জড়িয়ে ফেলল। সাপের পিছন দিক থেকে আক্রমণ করা কত বিপজ্জনক বুঝতে বাকি থাকল না। চট করে আর একটা ডাল দিয়ে সাপের মাথাটাতে বাববার আঘাত করে যখন দেখলাম, সাপটার মাথা টুক্‌রা টুক্‌রা হয়ে গেছে, তখন আগুনের কাছে ফিরে এলাম এবং ঝলসানো মাংস খেয়ে সাপের চামড়াটা নিয়ে বাড়ির দিকে রওনা হলাম। আমি জানতাম, এ-সব সাপের বিষ থাকে না, সেজন্য সাপটার চামড়া উঠাতে ভয় হয়নি। জেনে রেখো, এটাই কিন্তু আমার জীবনের প্রথম হিংস্র জীব হত্যা। এতে যেমন আনন্দ হয়েছিল, তেমনি ভয়ও হচ্ছিল। আমার শরীরটা খুব কাঁপছিল। ভয়ে না আনন্দে তা জানি না,—হয়ত ভয়েই কাঁপছিল। সাপটা যদি সুযোগ পেত তবে আমার মত একটা লোককে গিলতে কতক্ষণ?

 বাড়িতে ফিরে এসেই শুনলাম পুলিশ এসেছিল। আমার নাকি পোল-ট্যাক্স দেবার সময় হয়েছে। আঠার বৎসর বয়স না হলে পোল-ট্যাক্স দেবার নিয়ম নেই। প্রত্যেক পুরুষকেই পোল-ট্যাক্স দিতে হয়। কেনিয়া প্রদেশের শতকরা পঞ্চাশজনের বেশি হ’ল নিগ্রো, এক্ষণে ভেবে দেখ আমবা কত পোল-ট্যাক্স দিই, অথচ সরকারী সহায়তা আমাদের জন্য মোটেই নেই। সরকারী চাকরি আমরা পেতে পারি না। যদিও পাই, তবে সেই চাকরির মাইনে চল্লিশ শিলিংএর বেশি হতে পাবে না। শিক্ষিতই বা কত জন আর চাকরিই করে কত জন? অতি সামান্য।

 পরের দিন একজন আস্‌কারী এল। কনেস্টবলকে আমাদের দেশে আস্‌কারী বলা হয়। ইউবোপীয়ানরা আস্‌কারীর কাজ করে না, তারা অফিসার হয়। আস্‌কারী আমাকে দেখেই হেসে ফেলল এবং বললে, আমার বয়স পনর বৎসরের বেশি হতে পারে না। ঘরের সামনে সাপের চামড়া ছিল। জিজ্ঞাসা করে জানলে, আমিই সাপটা হত্যা করেছি। আমার সাহস দেখে বললে, আমি নাকি বড়ই সাহসী, চামড়াটার দাম কমের পক্ষে ষাট-সত্তর শিলিং হবে। কোনও আস্‌কারী কুড়ি শিলিংএর বেশি মাইনে পায় না। একজন আস্‌কারীর তিন মাসের মাইনে এক দিনে রোজগার হয়েছে জেনে মনে বেশ উত্তেজনা হ’ল। সে দিনই বিকালে সাপের চামড়া একজন আরবের কাছে বিক্রি করে ফেলি। সে আমাকে ষাট শিলিং দিয়েছিল। তাকে জিজ্ঞাসা করে জানলাম, চামড়াটা একটু পরিষ্কার করে এক শত শিলিং পাবে। আববের চামড়া বিক্রি করার লাইসেন্স আছে, আমার নেই, সেজন্য বড়ই দুঃখ হ’ল; কিন্তু মনে মনে স্থির করে রাখলাম এরূপ অন্যায়েব প্রতিকার করতে হবে।

 অনেকগুলি শিলিংএর মালিক হবার পর বোনকে নিয়ে আর একদিন বাজারে গেলাম। বোন অনেক কিছু কিনলে, আমি মাত্র পাঁচ সেণ্টের নিগ্রো মদ খেয়ে এলাম। তোমরা যাকে মদ বল আমরা কখনো সে জাতীয় মদ খাই না, আমরা নিগ্রো-মদ খাই, যা খেতে তোমাদের সববতের চেয়েও ভাল লাগে। যত ইচ্ছা খাও, বেশ মিষ্টি লাগবে, তৃপ্তি হবে। ভুট্টাব ছাতু ভেজে জলে সিদ্ধ করে তাতে সামান্য চিনি দিলেই আমাদের নিগ্রো-মদ হয়ে যায়। চিনি বিদেশী জিনিস। আমাদের দেশে এক রকমের মিষ্টি আলু আছে, তাকেই আমরা চিনির মত ব্যবহার করি। অনেকে চিনি খেতে পছন্দ করে না, সেজন্য মিষ্টি আলুর ছাতু ভুট্টার সংগে সিদ্ধ করে খায়।

 বোনকে সুখী দেখে বেশ আনন্দ হয়েছিল। কয়েক দিন পর আবার বনে যাবার মনস্থ করে একটি তীর-ধনু প্রস্তুত করতে আরম্ভ করলাম। জানি না তীর-ধনু অন্য দেশে প্রচলিত আছে কি না, আমাদের দেশের প্রধান অস্ত্রই ছিল তীর-ধনু। বর্তমানেও অনেকে তীর-ধনু পছন্দ করে। বন্দুক ছুঁড়লে শব্দ হয়, তীর-ধনুতে সেরূপ শব্দ নেই। ফস্ করে একটি শব্দ হয়, তাও দূরের লোক শুনতে পায় না। আসল কথা হ’ল, ধনুর বাঁশ যোগাড় করা বড়ই কঠিন। সাধারণ বাঁশ দিয়ে ধনু তৈরী হয় না। কয়েক দিন কেটে গেল শুধু বাঁশ খুঁজতে। আমাদের দেশের জংগলে বাঁশ খুজে পাওয়া বড়ই কষ্টকর ব্যাপার। শুনতে পাই, ইণ্ডিয়ার মধ্যপ্রদেশে আমাদের দেশেব মত কণ্টকিত বাঁশ পাওয়া যায়, সেই বাঁশই ধনুর পক্ষে উপযোগী; সহজে ভাংগে না।

 একদিন বাঁশের খোঁজে যেয়ে ত মহাবিপদে পড়তে হয়েছিল। একটা চিতাবাঘ আমার মাথা লক্ষ্য করে লাফ দেয়। বাঘটা ছিল কাঁটা-বিহীন একটি গাছের উপর, আর আমি ছিলাম কাঁটাপূর্ণ বাঁশবনে। একটু শব্দ হতেই আমি বাঁশের ঝাড়ের মধ্যে প্রবেশ করি। চিতাবাঘটার বোধ হয় বেশি ক্ষুধা হয়েছিল, সেজন্য তার বুদ্ধির বিপর্যয় ঘটে। বাঁশবনের নীচে পড়ামাত্র বড় বড় কাঁটা তার থাবার মধ্যে ঢুকে যায়। চলবাব ক্ষমতা ছিল না। নিজের রক্ত নিজেই চুষে খাচ্ছিল। দা নিয়ে যে বাঘটাকে আক্রমণ করব, সে সাহস আমার হয় নি। আমি আরও একটু ভেতরে চলে যাই। কিন্তু স্থান ত্যাগ করতেও ইচ্ছা হচ্ছিল না। অনেকক্ষণ সেখানে ছিলাম। চিতাবাঘটা ক্রমাগত তার থাবা চাটছিল। একটা পা পরিষ্কার করার পরই আমার দিকে তার দৃষ্টি যায়, কিন্তু আরও তিনটা পা পরিষ্কার না করলে ত আক্রমণ করতে পারবে না, সে ধারণা আমার ছিল। ব্যাঘ্র শ্রেণীর যত জীব দেখেছি, তাদের শরীরের অন্যত্র যে কোন স্থানে আঘাত কর, তার একটুও কষ্ট হবে না; কিন্তু যেই থাবাতে কোনরূপ আঘাত পায়, তখনই খাদ্যের কথা ভুলে যায়, থাবা চাটতে থাকে। ব্যাঘ্র শ্রেণীব জীবেব সত্যিকারের অসুবিধা যদি থাকে তবে সেই একমাত্র থাবা।

 চিতাবাঘটা আমার দিকে চেয়েছিল বটে, কিন্তু উঠে দাঁড়াবার পর অতিকষ্টে চলতে পারছিল। চিতাটা চলছিল অতি সন্তর্পণে। আমাব কথা বোধ হয় ভুলেই গিয়েছিল। চিতাবাঘটা চলে যাবার পর মনের মত একটি বাঁশ কেটে তার এক দিক বেশ করে চোখা করে নিয়ে ঘরের দিকে বওনা হলাম। চিতাবাঘটাকে কিন্তু আর দেখতে পাই নি।

 সেদিন ছিল মাসের শেষ। আমরা সেদিন কোন কাজই করি না, কিন্তু মাসের শেষের কথা ভুলে গিয়েছিলাম, চলে গিয়েছিলাম জংগলে। পৃথিবীর সব জাতের মধ্যেই কুসংস্কার আছে। আমাদের মধ্যেও যে নেই তা বলা চলে না। মাসের শেষের দিনে কাজ করলে বিপদ হয, এই কথা আমাদের লোকেরা প্রায়ই বলে। ঘরে ফিরে মায়ের কাছে যখন চিতাবাঘটাব কথা বললাম, তখন মা হঠাৎ বলে ফেললেন, “আজ মাসের শেষ, তুইও ভুলে গিযেছিলি তা, আমিও ভুলে গিযেছিলাম। তারপর এটা হ’ল রমজা্্‌ মাস। শয়তানরা না খেয়ে থাকে, মানুষ পেলেই খেয়ে ফেলে, বোধ হয় চিতাবাঘটাই শয়তান ছিল। শয়তান রূপ বদলাতে পারে।”

 আমাদের নিজস্ব কোনও মাস, দিন অথবা ক্ষণের নাম নেই। সবই আরবদের কাছ থেকে কর্জ করা। আরবদের সংগে আমাদের পরিবারের মনের মিল ছিল না, সেজন্য আমরা আরবী মাস, দিন অথবা ক্ষণের ধার ধারতাম না। আমার মা যে পরিবাবের মেযে, তারা সকলেই আরবদের বৎসর, মাস এবং দিন অনুযায়ী হিসাব রাখতেন। সেজন্য মা মাসেব শেষের কথা বলা মাত্র আমার মনটা বিগড়ে গিয়েছিল। আমাদের গ্রামের লোক আরব, পর্তুগীজ এবং তুরুকদের সংগে অনেক বৎসর লড়াই করেছিল; ইথোপিয়ার রাজা আমাদের পূর্বপুরুষকে সাহায্য করেছিলেন; সেজন্য আমরা গ্রীক মাস, বৎস্র এ সবই মেনে চলতাম। বৃটিশ আমাদের দেশে আসার পর যে মাস, বৎসর এবং দিনের প্রচলন করেছে তাও নাকি গ্রীকদেরই। প্রকৃতপক্ষে বৃটিশেরও নিজস্ব কোন মাসের নাম অথবা দিনেব নাম নেই। আমরা খৃস্টান নই। আমরা কোন ধর্মের অন্তর্ভুক্ত নই; সেজন্য প্রত্যেকের জন্মবৎসর হতে প্রত্যেকে বৎসর গণনা করে। তোমরা বল ১৯৫১ খৃস্টাব্দ। আমি বলব দশ জব্বো, পাঁচ মাস, দশ দিন। আমাদের মাসের হিসাবের সংগে বৃটিশ প্রচলিত মাসের মিল থাকে বলে সবকারী কাজে কোন গণ্ডগোল হয় না। তবে ভবিষ্যতে আমাদের পূর্ব নিয়ম চলবে কি না সন্দেহ। অনেকে খৃস্টধর্ম মেনে নিয়েছে। মুসলিম ধর্মও অনেকে গ্রহণ করেছে।

 আমাদের মধ্যে যাদের একটু আত্মসম্মান জ্ঞান আছে তারা কোনও বিদেশী ধর্মপ্রচারকের আদেশ কিংবা উপদেশ মানতে রাজী নয়। অল্প বয়সেই বুঝতে পেরেছি, সমাজকে সংগঠন করার জন্য প্রত্যেক ধর্মপ্রচারক চেষ্টা করেছেন এবং সেই সময়ের ঘটনা ও সামাজিক নিয়ম ধর্মপ্রচারকদের অনেক বিষয়ে সাহায্য করেছে। আমাদের দেশের একজন জ্ঞানী লোক অতিকষ্টে লণ্ডন গিয়েছিলেন। সেখান থেকে তিনি এই অভিজ্ঞতা অর্জন করে আমাদের সমাজের সবাইকে বলে দিয়েছেন। ইংলণ্ড থেকে তিনি শিখে এসেছিলেন নৃতত্ত্ব। বর্তমানে আমরা নৃতত্ত্ব নিয়েই মাথা ঘামাই। তোমাদের দেশে ছোটবেলা হতে যেমন ঈশ্বরের প্রতি ভক্তি ও ধর্মকর্ম সম্বন্ধে অনেক উপদেশ তোমাদের মা-বাবা দিয়ে থাকেন, আমরা যতই অসভ্য হই না কেন, আমাদের মা-বাবাও আমাদের নৃতত্ত্ব সম্বন্ধে অনেক কথাই বলেন।

 ভূত, প্রেত এ-সবের সম্বন্ধে অনেক আজগুবি কথা আমরা আরব, গ্রীক, ইটালীয়ানদের কাছ থেকে শুনে শুনে নিজেদের মনকে দুর্বল করেছি। আমার দাদু—যাঁর বয়স এখন এক শত জব্বোরও বেশি, তিনি কিন্তু বিদেশীদের কিছুই গ্রহণ করেন নি। এখনও তিনি বেশ হাঁটতে পারেন। দু’ পাউণ্ডের মত দুধ এবং আট আউন্স ভুট্টার ছাতু প্রত্যহ খান। তাঁর একটি দোষ আছে। তিনি প্রায় সময়ই তামাকপাতা চিবিয়ে খান। আমরা সেই জিনিসটি কেউ ছুঁই না। হাতে লাগলেই হাঁচি হয়। তামাক আমি মোটেই পছন্দ করি না।

 আমাব ধনু অনেকটা তৈরী হয়েছিল। আরও এক সপ্তাহের মধ্যে ধনু হবে কিনা সন্দেহ। আজকাল আমার দাদু ধনুর বাঁশখানা একটা চাকু দিয়ে কেটে যাচ্ছেন। এতেই নাকি তাঁর সপ্তাহ যাবে। তারপর ধনুর বাঁশকে জলের নীচে রাখতে হবে সাত দিন। জল থেকে উঠিয়ে আবার চাছাপুছা করতে হবে। তারপর বৌদ্রে শুকিয়ে আগুনে শুকাতে হবে। এ-সব কাজ আমার দাদুই করবেন। ইত্যবসরে আমি শহরে যাব ঠিক করেছি। শহরের কথা বলবাব পূর্বে আমার দাদুর সংবাদটা বলা চাই, নতুবা আমাদের নিয়ম-কানুন কিছুই তোমাদের জানা হবে না।

 তোমাদের যেমন দাদু থাকেন, আমাদের দাদু বলতে কিছুই নেই। আমাদের আছেন পিতা। গ্রামের যিনি সবচেয়ে বয়সে বড়, তাঁকেই সকলে বাবা বলে। তিনি আমারও বাবা, আমার বাবারও বাবা। তোমাদের কানে কথাটা বড়ই বিতিকিচ্ছে শুনাচ্ছে, কিন্তু করব কি বল? এটাই আমাদের নিয়ম। গ্রামের সকলের বাবা অর্থাৎ দাদু আমার ধনুর কাজ করছেন, এতে আমাব গর্ব করার অনেক কিছু আছে। আমি সাহসী বলেই তিনি আমাকে ধনু করে দিচ্ছেন।

 আমার দাদু অর্থাৎ আমাদের ছোট্ট গ্রামের সকলের বাবা, বড়ই ভাল মানুষ। কারো অসুখ করলে তিনি পাশে বসে থাকেন। চেয়ে থাকেন রোগীর দিকে। রোগীর যখন যা দরকার, তখনই দিয়ে থাকেন। আমাদের দাদু ঔষধ দেন। তাব সাধারণ ঔষধ হ’ল গবম জল ঠাণ্ডা করে রোগীর মুখে বার বার দেওয়া, গরম জলে গামছা ডুবিয়ে গামছাটা নিঙড়িয়ে রোগীর শরীর মুছে দেওয়া, নাপিত ডেকে রোগীর মাথার চুল কেটে ফেলা। আমাদেব চুল উলেব মত হয়, সেজন্য ধূলা এবং মাটিতে অপরিষ্কার হয় তাড়াতাড়ি। চুল ছেটে দেওয়া, নখ কাটা, পরিষ্কার বিছানাতে রোগীকে রাখা, এ-সব কাজ তিনি যেমন করতে পারেন, তেমন আর কেউ পারে না।

আমরা সকলেই তাঁকে শ্রদ্ধা করি। যার ঘরে যে-কোনো ভাল খাদ্য হউক, দাদুকে না দিয়ে কেহ খায় না। আমাদের দাদুর শরীরেব চামড়া অনেক স্থানে কুঁকড়িয়ে গেছে, সেজন্য সপ্তাহে একদিন করে গরম জল দিয়ে স্নান করিয়ে দিতে হয়। গ্রামের মেয়েরাই এই কাজটি করে। ছেলেদের সময় থাকে না, অথবা এ-সব কাজ পছন্দ করে না। যারা আমার বয়সী তারাও দাদুর শরীর পরিষ্কার করে দেয়। আমিও দাদুর শরীর পরিষ্কার করি, চুল কেটে দিই।

 হালে দাদুর মেজাজ একটু খিটখিটে হয়েছে। তাঁর কাছে কেউ চীৎকার করে কথা বললে বড়ই চটে যান। জানি না, তোমরা রাগ করলে কি কর; আমাদের মধ্যে যারা রাগ কবে, তারা একেবারে চুপ মেরে যায়, একটুও হাসে না। আমরা তখন বুঝি কোথাও কিছু ঘটেছে। জিজ্ঞাসা করে জানতে চেষ্টা করি কে কি করেছে। হদিস্ পাওয়া মাত্র অন্যায়কারীকে শাস্তি দেওয়া হয়।

 আমাদেব হোল গ্রাম্য বিচার। অনেক সময় বিচারে ভুল হয়, অনর্থক শাস্তি দেওয়া হয়। যার প্রতি অন্যায় বিচার করা হয়, সে আর গ্রামে থাকে না, গ্রাম ছেড়ে জংগলে নূতন গ্রাম পত্তন করে। এরূপ করেই নূতন গ্রামের সৃষ্টি হয়। নূতন গ্রামের লোক খুব কম অন্যায় বিচার করে। তাদের মধ্যে যদি কেউ উত্তেজিত হয়ে কথা বলে, তবে উত্তেজিত লোককে বেশি শাস্তি দেওয়া হয়। আমাদের দেশের নূতন গ্রামগুলিতেই সভ্যতা বেশি অনুভূত হয়। যতই গ্রাম বাড়ছে, ততই সভ্যতারও প্রসার হচ্ছে।

 গৃহপালিত জীবজন্তু গ্রামে থাকতে দেওয়া হয় না। গ্রাম থেকে দূরে রাখার ব্যবস্থা রয়েছে। গরুই আমাদের একমাত্র গৃহপালিত জন্তু। গরুর দুধ আমরা খাই। দই, ঘি, মাখন, ছানা—এ-সব করতে দেওয়া হয় না। এ-সব করাকে আমরা পাপ মনে করি। তোমাদের দেশে পাপের কি মানে হয় জানি না। আমাদের দেশের খৃস্টান পাদরী এবং ইস্‌লাম মৌলভীরা বলে, “পাপীদের ঈশ্বর শাস্তি দেন।” আমরা পাপ বলতে বুঝি অসামাজিক কাজ এবং যারাই অসামাজিক কাজ করে তাদেরই আমরা শাস্তি দিই। আমাদের দাদুর সংগে কেউ যদি রাগ করে কথা বলে, তবে তাকে গ্রাম হতে বের করে দেই।

 গরুর দুধে কেউ জলও মিশায় না অথবা মাখনও উঠায় না। গাভীহত্যা আমাদের মধ্যে প্রচলন নেই। তা বলে আমরা গরুকে পূজা করি না। শুনা যায়, আমাদের দেশের উত্তর দিকের লোক বিড়াল, কচ্ছপ এবং শূকর পূজা করত। যারা এই সকল জীবকে পূজা করত, তারা এখনও পূজিত জীবের মাংস খায় না। আমাদেব দু’টা বিড়াল আছে। বিড়াল আমরা ভালবাসি, কিন্তু বিড়াল হত্যা করি না অথবা বিড়ালের মাংস খাই না।

 একবার আমাদের গ্রামে কয়েক জন জাপানী ‘প্রভু’ এসেছিলেন। আমাদের মতে জাপানীরাও শ্বেতকায়, অতএব প্রভু (Boss)। তাঁরা বিড়াল কিনে বিড়াল হত্যার চেষ্টা করেন। আমরা কিন্তু চুপ করে বসে থাকিনি। এক দল লোক পুলিশ স্টেশনে, অন্য দল জাপানী প্রভুদের বাড়িব সামনে চীৎকার করতে থাকি। বিকালে ইংলিশ প্রভু এসেছিলেন এবং দু’টি বিড়ালকে মুক্ত করে আমাদের কাছে দিয়েছিলেন। দুটো বিড়াল লাফ দিয়ে এক দৌড়ে গ্রামে পৌঁছে হাঁপাচ্ছিল। জিহ্বা দিয়ে টস্‌টস্ করে জল পড়ছিল। বিড়াল এবং বেজি আমরা পালি। এই দু’টি জীব আমাদের প্রায় বাড়িতেই থাকে। সাপ দেখামাত্র উভয় জীবই আক্রমণ করে এবং হত্যা করে। এই প্রকারের বন্ধু শ্রেণীর প্রাণীকে হত্যা করা আমরা মোটেই পছন্দ করি না। তোমরা কি কর তোমরাই জান। আমরা হলাম অসভ্য। অসভ্যদেব নিয়ম-কানুন তোমাদের নিশ্চয়ই ভাল লাগবে না।

 আমার মনে হয়, তোমরা আমাদের আচার-ব্যবহার জানতে মোটেই রাজী নও, তোমরা বোধ হয় আফ্রিকার জংগলের কথাই শুনতে ভালবাসবে। তোমরা আফ্রিকার জংগল সম্বন্ধে যে সকল আজগুবী গল্প শুনতে পাও, তা কিন্তু সত্য নয়। আমাদের গ্রামে আবুইয়া নামে একটি ছেলে আছে। সে একটি বিড়াল-ছানা পুষেছিল। আবুইয়া আদর করে বিডাল-ছানার নাম রেখেছিল মেনী। মেনী আবুইয়ার কাছে ঘুমাত, এক সংগে খেত। কুকুরের মত বাড়ি হতে কিছু দূরেও যেত, কিন্তু বেশি দূর যেত না। আবুইয়া মেনীকে দূরে নিয়ে গেলে এক দৌড়ে বাড়িতে চলে আসত, কিন্তু আবুইয়া মেনীকে একটু একটু করে বাড়ি হতে দূরে যাবার অভ্যাস করাচ্ছিল। অবশেষে একদিন আবুইয়া মেনীকে নিয়ে গভীর জংগলে প্রবেশ করল। মেনী বাড়ি হতে দূরত্বের কিছুটা আভাস পেয়েই আবুইয়ার মাথায় উঠে বসল, আব হাঁটল না। আবুইয়া খরগোশ শিকার করতে বের হযেছিল। খরগোশ শিকারে অনেকক্ষণ কাটিয়ে অবশেষে যখন কিছুই পেল না, তখন আবুইয়া ভিন্ন পথে বাড়ির দিকে রওনা হোল। চলার পথে হঠাৎ একটা পাতা আবুইয়ার পা জড়িয়ে ফেলল। বিড়ালটা আবুইয়ার মাথায় আর বসে থাকল না, লাফ দিয়ে নীচে নেমেই পাতাটার ডগায় কামড় দিয়ে চারটা পা দিয়ে খামচাতে আরম্ভ করল। ডগা থেকে রক্তবর্ণের এক প্রকার রস বেরিয়ে আসামাত্র বিড়ালটা জিভ দিয়ে চাটতে আরম্ভ করল। কতক্ষণ চাটার পরই ডগা নেতিয়ে পড়ল। আবুইয়ার পা হতে পাতা আপনি খসে পড়ল। আবুইয়া পাতা হতে মুক্ত হয়েই মেনীকে ডাকল। মেনী আবুইয়াব ডাকে সাড়া দিল না। ক্রমাগত পাতাটা চেটে যখন আর রস পেল না, তখন মেনী পুনরায় আবুইয়ার মাথায় উঠে বসল। আবুইয়া মেনীকে নিয়ে ঘরে ফিরল এবং গ্রামের সকলের কাছে নূতন উদ্ভিদের কথা জানাল। আবুইয়ার কাছ থেকে নূতন উদ্ভিদেব কথা শুনে গ্রামবাসীরা নূতন উদ্ভিদের সন্ধানে বের হোল এবং আবুইয়ার কথামত অনেকগুলি উদ্ভিদ দেখতে পেল। যে উদ্ভিদ মানুষের এবং অন্যান্য জীবজন্তুর রক্ত চুষে খায়, গ্রামবাসী সকলে মিলে এই মানব-শত্রু উদ্ভিদের বনে আগুন ধরিয়ে দিল। উদ্ভিদগুলি যখন পুড়ে ছাই হয়ে গেল, তখন তারা মহানন্দে ঘরে ফিরে এসে দেখল তাদের মেনী বিষাক্ত পাতা চুষে আধমরা হয়ে শুয়ে আছে। তাড়াতাড়ি করে মেনীকে দাদুর কাছে নেওয়া হোল। দাদু একটা গাছের শিকড় বেটে মেনীর মুখে ঢেলে দিলেন। মেনী অনেকক্ষণ বমি করল, তারপর সুস্থ হয়ে দাদুর ঘরে এক কোণে শুয়ে থাকল। মেনী আরাম হয়েছিল। এখন মেনী বনে জংগলে যায় না, গ্রামেই থাকে এবং ছোট ছোট সাপ মেরে গ্রামের লোককে সর্পদংশন হতে রক্ষা করে। ভেবে দেখ ত বিড়াল আমাদের কত উপকারী! তোমাদের এরূপ বিড়াল আছে কি?

 বেজি প্রত্যেক বাড়িতে একটা করে ত আছেই, পারলে কেউ দুটো করেও রাখে। আমাদের মতে বেজি হত্যা মহাপাপ। একবার আমাদের গ্রামের একটি ছেলে বেজি হত্যা করেছিল। গ্রামের লোক সেই ছেলেটাকে উপযুক্ত শাস্তি দিয়েছিল। প্রত্যেক গ্রামে একজন ডাক্তার থাকেন। তিনি যখন শুনলেন ছেলেটা বেজি হত্যা করেছে তখন তিনি বললেন, “ছেলেটা নিশ্চয়ই উন্মাদ হয়েছে, এর হাত-পা বেঁধে রাখা অতীব দরকার, আজ বেজি হত্যা করেছে, কাল শিশু হত্যা করবে, আরও বড় হলে গ্রামের লোক হত্যা করবে, ও কি না করতে পারে? ছেলেটা গ্রামের লোক দ্বারা কয়েকদিন অত্যাচারিত হবার পর গ্রাম ছেড়ে পালিয়েছিল। তার বাবা একজন গ্রীক, সে বোধ হয় তার বাবার বাড়ি চলে গিয়েছিল। তার বাবা থাকতেন তিউনিস্। তোমরা হয়ত মনে করবে, এতদূর কি করে ছেলেটা গিয়েছিল। চলার পথে আমাদের দেশে ছেলেমেয়েদের দুটো ভয় আছে। প্রথম ভয় বন্য জন্তুর, দ্বিতীয় ভয় আরবের। আরবরা এখনো নিগ্রোদের মানুষ বলে স্বীকার করে না। এ-সব দুষ্টপ্রকৃতিক লোকের সংখ্যা বর্তমানে খুবই কম। দ্বিতীয়ত আরব মাত্রেই এখন শহরবাসী। কিন্তু বন্য পথে যখন কোনও আরব চলে এবং তখন যদি কোনও নিগ্রোর সংগে তার দেখা হয় তবে সাধারণতই নিগ্রো লোকটাকে মোট বইতে বলে। যদি আমরা তার আদেশ অমান্য করি তবেই সে একটুও দ্বিধা না করে গুলি করে হত্যা করে। আমরা বন্দুক রাখতে পারি না কারণ আমরা আফ্রিকার নিগ্রো। নিগ্রো ব্যতিরেকে সকল জাতের লোকই আগ্নেয়াস্ত্র রাখবার লাইসেন্স পায়। বনে জংগলে চলার সময় আরবদের মন এতই কঠোর হয় যে পনর ষোল বৎসরের ছেলেও যদি ভুল করে আরবের তাঁবুতে চলে যায়, তবে তাকেও ক্রীতদাসে পরিণত করার চেষ্টা করা হয়। এতে অবাধ্য হলে মৃত্যু অনিবার্য।

 আমাদের সামাজিক জীবনের কথা অনেক বলা হয়েছে, এখন আমার তীর-ধনুর কথা বলি। ধনুটা ঠিক হয়ে যাবার পর তীর তৈরীতে মনোনিবেশ করলাম। প্রায় দুই শত তীর তৈরী হবার পর বনে জংগলে বের হ’ব ঠিক করেছি, অমনি একজন লোক বললে, যুদ্ধ আরম্ভ হয়েছে, বৃটিশ সরকার অনেক নিগ্রো সেপাই নিযুক্ত করবে। এ বিষয় নিয়ে দাদুর ঘরে সভা হয়, দাদু সকলকে বললেন, “এই যুদ্ধের সংগে আমাদের কোনও সম্পর্ক নেই। রোগে এবং বন্য জন্তুর কবলে পড়ে আমাদের অনেক লোক প্রত্যেক বৎসরই মবে; বৃটিশ থাকুক আর জার্মান আসুক ক্ষতিবৃদ্ধি আমাদের মোটেই হবে না। তোমাদের মধ্যে যারা সেপাই হবার উপযুক্ত, বনে জংগলে চলে যাও এবং নূতন গ্রাম তৈরী কর।” দাদু আমাকে বললেন, “তোমার তীর-ধনু হয়েছে, এখন গ্রাম ছেড়ে বনে যাও। বনে একা থাকবে জব্বু, তাতে জ্ঞান অর্জন হবে।”

 দাদুর আদেশ পাওয়া মাত্র আমি বনে জংগলে নিজের যথাসর্বস্ব, তীরধনু ও একখানা চাকু নিয়ে রওনা হলাম। উদ্দেশ্য গভীর বনে যাওয়া কিন্তু এবারের অভিজ্ঞতা বলবার পূর্বে তোমাদের কাছে আমার একটি পুরাতন অভিজ্ঞতা বলব যা শুনলে বুঝতে পারবে বনে জংগলে দিন কাটানো কত কষ্টকর।