বিষয়বস্তুতে চলুন

মাউ মাউএর দেশে/২

উইকিসংকলন থেকে

◄  
  ►

(২)

 তখন আমি বেশ ছোট ছিলাম। বয়স পনর হতে ষোল। খেয়াল চাপল নাইরবী দেখতে হবে। নেওয়সা হতে নাইরবী বেলগাড়ি যায়। গাড়ির ভাড়া যোগানো কঠিন ব্যাপার। আমাব আগ্রহ দেখে মা কোথা হতে গাড়িভাড়া এবং আরও একটি শিলিং আমার হাতে দিয়ে বললেন, “এখন থেকেই তোমার জেনে রাখতে হবে, আমরা টাকা পয়সার মালিক হতে পারি না। বৃটিশ সরকার আমাদের সে পথ বন্ধ করে বেখেছে। নাইরবী হতে ফিরে আসাব খরচ সংগ্রহ করা আমার পক্ষে অসম্ভব। যদি বাড়িতে ফিরে আসতে হয় এবং টাকা পয়সা না থাকে তবে হেঁটেই ফিরে আসবে।”

 নাইরবীতে কোথায় থাকতে হবে, কি খাব সে কথা আমার মা মোটেই উত্থাপন করেননি। তিনি বোধ হয় জানতেন খেটে যারা খায় তারা কোনও উপায়ে নিজের খাদ্য যোগাড় করতে পারে। মায়ের মনে আর আঘাত দিতে ইচ্ছা হল না, রেলগাড়িতে করে নাইরবীতে বওনা হলাম।

 আমরা যে গাড়িতে ভ্রমণ করি সেই গাড়ি বেলস্টেশনে পূর্বে যেত না, বর্তমানে যেতে আরম্ভ করেছে। পূর্বে শুধু বিদেশী যাত্রীদের গাড়িই রেলস্টেশনে পৌঁছত। আমাদের গাড়িটা স্টেশন হতে অনেক দূরে থামল। আমরা গাড়ি হতে শেষে হাঁটতে আবম্ভ করলাম। কতদূর যাবার পরই একজন শ্বেতকায় দৌড়ে এসে বললেন, “এদিকে নয় প্লেটফর্মের বাইরের দিকে যাও।” ভাবলাম আবার কি নিয়ম?

 শ্বেতকায় প্রভুর আদেশ মান্য করা ছাড়া গত্যন্তর ছিল না। আমরা বাইরের দিকে প্রায় দু’মাইল হেঁটে শহরে পৌঁছলাম। শহর দেখতে খুবই সুন্দর। ইচ্ছা হচ্ছিল এমন শহরে সারাজীবন কাটিয়ে দেই। কিন্তু আমাদের পক্ষে তা সম্ভবপর নয়।

 ভাবছিলাম নাইরবীতে খাবার এবং থাকবার জায়গা অতি সহজে যোগাড় করতে পারব কিন্তু সেই কাজটি তত সহজ ছিল না। শহরে থাকতে হলে পাশের দরকার হয়, আমি তা জানতাম না। এই নিয়ম শুধু নিগ্রোদের প্রতিই প্রযোজ্য। বুঝে নাও আমরা কত দুর্ভাগা জাত। নাইরবী আমাদের দেশের একটি শহর অথচ আমাদেরই শহরে থাকতে পাশের দবকার হয়। এটা কি অপমানজনক নয়? আমরা মান অপমান কাকে বলে জানি না; সেইজন্যই বৃটিশ সরকার আমাদের এই ব্যবস্থা করেছেন।

 নিগ্রোদের জন্য যিনি পাশ মঞ্জুর করেন তিনি হলেন একজন বৃটিশ পুলিশ অফিসার। তাঁর কাছে উপস্থিত হলেই তিনি শহরে যাবার পাশ মঞ্জুর করেন না। যার বাড়িতে খেটে খেতে হবে তিনি যদি নিজে অথবা চিঠি লেখে দেন তবে পাশ পাওয়া যায়। এই অবস্থায় চাকরি অর্থাৎ মজুরী কার বাড়িতে পাব তাই হয়ে দাঁড়াল সমস্যা।

 চাকরি যোগাড় করা সহজ কাজ নয়। যতদিন কাজ যোগাড় না হবে ততদিন শহরের বাইরে থাকতে হবে। শহরের বাইরে থাকার বন্দোবস্ত সহজে হয়ে গেল। কিন্তু রোজ সাড়ে তিন মাইল দূর থেকে এসে চাকরি খোঁজ করবার পরিশ্রমের কষ্ট সহজেই বুঝতে পার। তাবপর অভুক্ত অবস্থায় শহর হতে ফিবতে হ’ত নিগ্রো গ্রামে, তা আর একটা বড় পরিশ্রম। শহর ছোট হলে কি হয়? এক বাড়ি হতে অন্য বাড়ি যেয়ে চাকরি আছে কি না জিজ্ঞাসা করা, কর্তা বাড়িতে না থাকলে অপেক্ষা করা, অপেক্ষা করাব সময় হয় ত কর্তার স্ত্রী একটা কাজের আদেশ দিলেন, সেই কাজ যদি না করা যায় তবে গিন্নী নিশ্চয়ই রাগ করবেন; সেই কাজ করে দেওয়া, তাতে পরিশ্রম হয়, ক্ষুধা হয় কিন্তু কিছুই খেতে পাওয়া গেল না অর্থাৎ চাকরি পাবার পূর্বে কারো কাছে কিছু চাইতেও ইচ্ছা হয় না। এই করে যখন শহর হতে সাড়ে তিন মাইল উঁচুনীচু পাহাড়ে পথ অতিক্রম করে গ্রামে ফিরতাম তখন দাঁড়িয়ে থাকবারও ক্ষমতা থাকত না।

 শহর হতে ফিরে যেয়ে মাটিতে শুয়ে থাকতাম, উঠতে ইচ্ছা হ’ত না। যার বাড়িতে থাকতাম তিনি বড়ই দয়ালু। একটু বিশ্রামের পরই কিছু খেতে দিতেন। লক্ষ্য করে দেখেছি আমার পরিশ্রান্ত শরীর এবং শুষ্ক মুখ দেখে একটি বিদেশীর প্রাণে একটুও দয়া হয়নি। যাদের দয়া নাই, মায়া নাই তারাও নাকি সভ্য?

 একদিন একজন আরবের বাড়িতে যাবার পর শুনলাম তাঁর একজন মজুরের দরকার আছে। আমি তাঁর বাড়িতে কাজ করতে বাজি হলাম। সর্ত হল তিনি দুই বেলা তাঁদের উচ্ছিষ্ট খেতে দেবেন এবং বাবান্দার বাইরে থাকতে দেওয়া হবে। আমি তাতে রাজি হলাম।

 তিনিই আমার জন্য পাশ করালেন। পাশ পেয়ে যাবার পর আপ্রাণ পরিশ্রম করে কাজ করতে থাকলাম এবং আমার প্রভু যাতে সুখী হন তারও চেষ্টা করছিলাম। একদিন প্রভুর বাড়িতে একজন অতিথি এসেছিলেন। তিনি এসেছিলেন উগাণ্ডা হতে।

 অতিথি জাতে ইণ্ডিয়ান্। একদিন তোয়াজ করে যখন ইণ্ডিয়ান্ খাচ্ছিলেন তখন আরব বলতেছিল, “তুমি হলে ইণ্ডিয়ান্ থাকো উগাণ্ডাতে, দেখেছ ত সেখানকার লোক কতকটা সভ্য, এখানকার লোক কিন্তু সভ্যতার আলো মোটেই পায় নি। অনেকে আল্লার নামও জানে না। এখানে নিগ্রোদের কাফের ছাড়া আর কি বলা যেতে পারে? কাফেরগুলির বিবাহের কোনও নিয়ম নাই, যে-কোনও যুবতীকে ধরে নিলেই হল।”

 আরবটার কথা শুনে দুঃখিত হয়েছিলাম কিন্তু প্রতিবাদ করবার মত সাহস ছিল না। আমাদের বিবাহ-পদ্ধতি পরে তোমাদের কাছে বলব। এখন একজন ইণ্ডিয়ানের বিবাহ-পদ্ধতি তোমাদের কাছে বলছি। পাশের বাড়িতেই একটি ইণ্ডিয়ান পরিবার থাকতেন। যুবক এসেছিল তার ভবিষ্যৎ স্ত্রী কেমন হবে দেখতে। অনেকক্ষণ কথা বলার পব যে যুবতীর সংঙ্গে বিয়ে হবার কথা হয়েছিল সেই যুবতী দাঁড়ালেন এবং হাতজোড় করে যুবককে নমস্কার করলেন। যুবতীর অবস্থা দেখে অবাক হলাম। স্ত্রীলোক পুরুষকে সম্মান দেখাবে সে কেমন কথা? তারপর শুনলাম ছেলের বাবা নাকি হাজার দশেক শিলিং মেয়ের বাবার কাছে বিবাহেব যৌতুক দাবী করেছেন।

 আমি হলাম কিকুউ জাতের লোক। আমরা তোমাদের কাছে অসভ্য কিন্তু আমাদের মা-বোনেরা কখনও কোনও পুরুষের কাছে মাথা নত করেন না। স্ত্রীলোকের পক্ষে পুরুষের কাছে মাথা নত করা আমরা তা সহ্য করতে পারি না। ছোটবেলায় মা আমাদের সকল বিপদ হতে রক্ষা করেছেন, সেই মা একটা পুরুষের কাছে মাথা নত করবেন তা কি করে সহ্য করা যায়? আমরা হাজারো অসভ্য হই, হাজারো নেংটা থাকি তবুও আমাদের মা-বোন আমাদের সম্মানের। আরব এবং ইণ্ডিয়ানরা স্ত্রীলোককে কি ভাবে জানি না, বোধ হয় মা-বোনই ভাবে কিন্তু কার্যে তার পরিচয় পাওয়া যায় না।

 এই ত হোল এক গোছের জীবন-বাহিনী। অন্য গোছের জীবন-বাহিনীও বলছি একটু মন দিয়ে শোন। আরবটা বলছিল আমাদের মায়েরা নাকি তাদের শিশুদের বন্যজীব দিয়ে খাইয়ে ফেলেন। এর চেয়ে বড় মিথ্যা বোধ হয় আর নাই। আমাদের মায়েদের অনেক কাজ করতে হয়। রাত্রে ঘরে ফিরে এসে শিশু কোলে নিয়ে শোওয়ামাত্র গাঢ় নিদ্রায় নিদ্রিত হয়ে যান। মায়ের নিদ্রাবস্থায় পিতা যদি সন্তানের প্রতি লক্ষ্য না রাখেন তবেই বিপদ আসে। অনেক মা পিতাকে স্বগৃহে থাকতে দেন না। এটা আমাদের নিয়ম, বয়স্ক মেয়েদের নিয়ে যে ঘরে মা থাকেন সেই ঘরে পিতার স্থান নাই। মায়ের ঘুমন্ত অবস্থায় হায়েনা নামক জানোয়ার শিশুর প্রতি লোভ দৃষ্টি রাখে এবং সুযোগ পেলেই শিশুকে নিয়ে খেয়ে ফেলে। যাতে এরূপ দুর্ঘটনা না ঘটে সেইজন্য মায়েরা এবং বাবারা মিলে ঘর বেশ শক্ত করে তৈরী করার চেষ্টা করেন। আজকাল আমাদের গ্রামে শিশু-চোর হায়েনা দেখামাত্র গ্রামবাসী সকলে মিলে আক্রমণ করে এবং যে পর্যন্ত হায়েনাকে ধরে হত্যা না করতে পারে সেই পর্যন্ত সকলে মিলে শিশুদের পাহাবা দেয়।

 দুঃখেব সহিত বলছি আমাদের শিশু হায়েনার কবলে পড়ে যত না মরে তার চেয়ে বেশী মরে না খেতে পেয়ে। আজকাল আমরা যেই একটি রিজার্ভ আবাদ করলাম অমনি সরকার থেকে আমাদের আবাদী বিজার্ভ কেনা হযে যায় এবং আমাদেব নূতন জংলী জায়গাতে নূতন করে আবাদ করতে হয়।

 আমরা নাকি বিদেশীদের ছেলেমেয়েকে বড়ই ঘৃণা করি—এটা শুধু গল্প নয় সংবাদপত্রেও প্রচারিত হয়। আমাদের দেশে বাস্তু নামে এক শ্রেণীর লোক আছে তারা বিদেশী ভাষা খুব যত্নের সহিত শিখে। ইংলিশ, আববী এমন কি কেহ কেহ ফবাসী ভাষা লিখতে এবং পড়তে পারে। তারা সংবাদপত্র কিনে এবং পড়ে। তাদের মুখে শুনেছি আমরা বিদেশী শিশুদের ঘৃণা করি এবং পারলে হত্যা করি। তোমরা শুনে অবাক হবে, আরব, ইণ্ডিযান্ এবং বৃটেনদের ছেলেমেয়েরা তাদের মাতৃভাষা শিখবার পূর্বে আমাদের সাধারণ ভাষা সোহেলী শিখে ফেলে। তার একমাত্র কারণ হল শিশুর জন্ম হবাব পরই নিগ্রো স্ত্রীলোক বিদেশীদের ছেলেমেয়েকে লালনপালনের ভার গ্রহণ করে। বিদেশী মায়েরা অনেক ক্ষেত্রে শিশুকে স্তনের দুধ পর্যন্ত দিতে পছন্দ করেন না। স্তনের দুধ বেশি করে সন্তানকে খাওয়ালে মায়ের শরীর নষ্ট হবে এটাই সভ্য বিদেশী স্ত্রীলোকের ধারণা, আমাদের ধারণা একেবারে পৃথক। আমাদের মা-বোন নিজের স্তনের দুধ দিয়ে বিদেশীদের ছেলেমেয়ে পালন করতে একটুও দ্বিধা করেন না। যারা নিগ্রো স্ত্রীলোকের স্তনের দুধ খেয়ে বড় হয় তারা নিগ্রো ভাষা শিখবে প্রথম তাতে আর আশ্চর্য কি হতে পারে?

 এর পরেও বলছি, আমরা শিশু, স্ত্রীলোক এবং বৃদ্ধ ও বৃদ্ধাদের কোনও মতেই আঘাত করতে পারি না। আমাদের সামাজিক আইনেব আদেশ হল যদি কাউকে শিশু হত্যা করতে দেখতে পাও অমনি তার ঘাড়ে চাপবে এবং শিশুহত্যাকারীকে সেখানেই হত্যা করবে। স্ত্রীলোককে যদি কেউ অপমান করে তবে তার বুকে বল্লম ঢুকিয়ে দেবে। যদি কেউ বৃদ্ধ এবং বৃদ্ধাকে অপমান করে তবে তাকে গ্রাম হতে বের করে দেবে। তোমরা তোমাদের ধর্ম পরিত্যাগ করতে পার কিন্তু আমরা আমাদের সমাজ এবং সমাজের নিয়ম কখনও লঙ্ঘন করি না। লঙ্ঘন করতে গেলেই আমাদের বুক কাঁপে, মনে হয় সন্নিকটে অমঙ্গল দাঁড়িয়ে আছে।

 আমাদের মধ্যে একটি প্রবাদবাক্য আছে সেই প্রবাদবাক্য মতে পৃথিবীতে যত জাতের লোক আছে তারা সবই শ্বেতকায় হয়ে যাবে। এই প্রবাদবাক্যের সুযোগ নিয়ে আরব এবং পর্তুগীজেরা আমাদের দেশে প্রবেশ করেছিল। আমরা সেই প্রবাদবাক্যের দাদন অনেক দিযেছি। আরব এবং পর্তুগীজরা আমাদের দেশের লোক ধরে নিয়ে বিদেশে বিক্রি করেছে শুনেছি। আরও শুনেছি জান্‌জিবারের এবং মোম্বাসাতে নিগ্রোদের গুহাতে ফেলে দিয়ে হত্যা করা হত। তা বলে প্রবাদবাক্য বিফল হয় নি, ফলতে আরম্ভ হয়েছে। আমাদের দেশে সুমালী নামে এক জাতের লোক দেখা যায়; আমার মা বলেছেন, সুমালী জাতের সৃষ্টি হয়েছে গ্রীক, তুরুক, আবব এবং নিগ্রোদের সংমিশ্রণে। সুমালীদের শরীরের রং ক্রমেই ফর্সা হতে চলেছে। পূর্বে সুমালীরা আরবদের মেয়ে বিয়ে করতে পারত না, বর্তমানে অনেক আরব মেয়ে স্ব-ইচ্ছায় সুমালীদেব বিয়ে করে এবং তাদের ছেলেমেয়েদের রং অবিকল শ্বেতকায়দের মতই হচ্ছে। তোমরা যদি সিসেল্‌ দ্বীপে যাও দেখবে সেখানেব লোক সবাই শ্বেতকায় হয়ে গেছে। পূর্বে সবাই ছিল নিগ্রো, পরে এসেছিল ফরাসী। ফরাসীরা সেখানকার নিগ্রো মেয়ে বিয়ে করত এবং এখনও বিয়ে করে। তাদের সন্তানেরা একেবারে শ্বেতকায় হচ্ছে। আমাদের প্রবাদবাক্য মিথ্যা নয়। হয়ত ভবিষ্যতে আমাদের প্রবাদবাক্য সঠিকভাবেই সকলের কাছে প্রমাণিত হবে। প্রবাদবাক্য ঠিক হোক তাতে আমাদের ক্ষতি নাই কিন্তু আমরা আর কারো গোলাম থাকব না।

 আরবেব বাড়িতে দুই মাস চাকরি কবার পর শরীর দুর্বল হয়ে যায়। হাড়ভাঙা খাটুনি তারপর রাতে ঘুম মোটেই হত না। আরব আমাকে ঘরে শুতে দিত না। ঘরের বাবান্দায় কুকুরের মত কুণ্ডলী পাকিয়ে শুয়ে থাকতে হত। নাইরবী শীতের জায়গা। এখানে বাইরে ঘুম হতে পারে না। সকালবেলার কনকনে ঠাণ্ডা কে সহ্য করতে পারে? বাধ্য হয়েই চাকরি ছেড়ে দিয়ে নেওয়াসার দিকে ফিরতে হয়েছিল। নেওয়াসা অস্বাস্থ্যকর স্থান অর্থাৎ নীচু জায়গা যতটা সবটাই আমাদের রিজার্ভ। রিজার্ভ হলে কি হয়, মাঝে মাঝে ইণ্ডিয়ান্ অধ্যুষিত শহর রয়েছে সেখানে, আমরা মাল-মসলা কিনতে পারি কিন্তু বিক্রি করতে পারি না। আমার ইচ্ছা ছিল একখানা দোকান করি। মাকে সেই বিষয়টা বলেওছিলাম। মা বলছিলেন আইনমতে আমরা দোকান করতে পারি না, দোকান হতে সওদা কিনতে পারি মাত্র। মায়ের মুখ থেকে এই অন্যায় আইনের কথা শুনার পর বৃটিশ প্রভুদের প্রতি আমার শ্রদ্ধা কমে গিয়েছিল।

 নাইরবী হতে ফেরবার পথে দেখা হয়েছিল এক বাল্যবন্ধুর সংগে। বাল্যবন্ধু মোম্বাসা শহরে গিয়েছিল। সেখানে জাহাজ আসে, জাহাজে করে বিদেশী লোক আসে, অনেক দেখাব মত জিনিসও রয়েছে। সে প্রথমত আমার কাছে মোম্বাসা শহরে নিগ্রো নির্যাতনের সুড়ং এব কথা বলেছিল। পর্তুগীজ এবং আরববা যখন নিগ্রো ব্যবসায়ের ব্যবসা বেশ জমিয়েছিল তখন বৃটিশ প্রভুরা প্রতিবাদ করেছিলেন। কে কার প্রতিবাদ শোনে। অবশেষে বৃটিশ প্রভুরা আরব এবং পর্তুগীজ প্রভুদেব নৌকা দেখলেই কামানের গুলি ছুঁড়তেন। আফ্রিকার বন্দরে হানা দিয়ে দেখতেন কেউ নিগ্রো দাস ব্যবসা চালাচ্ছে কি না? মোম্বাসা শহরে অনেকবারই বৃটিশ প্রভুরা পর্তুগীজদের কুঠি হানা দিয়ে পরীক্ষা করতেন। বৃটিশরা যাতে নিগ্রো দাসদের না দেখতে পায় সেইজন্য সুড়ং খুদে তারই মধ্যে নিগ্রো দাসদের রাখা হত। আমার বাল্যবন্ধু সেই সুড়ংটা দেখে এসেছে। কি দুর্গন্ধময় সেই সুড়ং। অনেক নরকংকাল সেখানে দেখতে পাওযা যায়। এতেই বুঝতে পার আমাদের প্রতি পূর্বে কত অত্যাচার হয়েছে এবং এখনও ভিন্ন পন্থায কত অত্যাচার চলছে।

 আমার বাল্যবন্ধু অতি সাহসী লোক। সে কখনও কাউকে ভয় করত না। একদিন একটা আরব আমার বাল্যবন্ধুকে ছোরা নিয়ে আক্রমণ করে। সে পালায় নি। একেবারে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে আক্রমণকারী আরবের পেটে পদাঘাত করে। সেই পদাঘাতেই আরবেব মৃত্যু হয়। দুঃখের বিষয় হল, আরব প্রথম আক্রমণ করেছিল আমাদের বৃটিশ প্রভু সেই বিষয় একটুও মানতে রাজি ছিলেন নি। আরবকে পদাঘাত করেছে তাই দেখছিলেন বেশি করে। আমার বন্ধু দেখলে যদি বৃটিশ আদালতে বিচার হয় তবে অনেক বৎসর জেলে থাকতে হবে। বৃটিশ জেল ভয়াবহ স্থান। সেখানে না যাবার জন্য সে পালিয়েছিল জংগলে। জংলী পথেই তার সঙ্গে আমার দেখা হয়। সে বলছিল, “ভাই, যদি মানুষের মত বেঁচে থাকতে হয় তবে আমাদের দেশ থেকে বিদেশীকে তাড়াতে হবে। বিদেশীকে তাড়াতে হলেই বৃটিশকে তাড়াতে হবে প্রথম।”

 বৃটিশকে তাড়ানো সম্ভব হবে কি না জানি না কিন্তু আমার প্রায় বন্ধুরাই বিদেশীদের পছন্দ করে না। তা বলে আমরা বিদেশীদের ছেলে-মেয়েকে ঘৃণা করি না অথবা অযথা চোখ লাল করে কথাও বলি না। আমাদের সমাজ শিশুর প্রতি অত্যাচার কবা গর্হিত কাজ বলেই মনে করে।

 আমার বন্ধুর নাম নিক্কু। তাকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, বর্তমানে যেমন করে বন্য জীবন কাটাচ্ছে, এইভাবেই তার সারাজীবন যাবে কি?

 সে বলছিল দরকার হলে এইভাবে সে সমস্ত জীবন কাটিয়ে যাবে, ইতিমধ্যে সে বৃটিশ তাড়াবার কথাই ভাবছে বেশি করে এবং সুযোগ পেলেই বৃটিশ তাড়াবার কাজে ব্রতী হবে।

 নিক্কু জিজ্ঞাসা করেছিল, দরকার হলে আমার সাহায্য পাবে কি না?

 আমি বলছিলাম, “নিশ্চযই আমার সাহায্য পাবে।”

 আমি চলছিলাম আমার গ্রামেব দিকে, নিক্কু চলছিল নাইরবীর দিকে। তাকে বললাম, “নিক্কু, আমাদের গ্রামে যাবে?”

 হাঁ ভাই নিশ্চয়ই যাব, আমার ত গ্রাম নেই, আমার গ্রামে গেলেই আমাকে পুলিশ ধরবে, চল তোমাদের গ্রামে যাই মাস দুই থাকা যাবে।

 আমরা চললাম আমাদের গ্রামের দিকে। দুই বন্ধুতে নিশ্চিন্ত মনে চলেছি। আমাদের ধারণা ছিল, সাত হতে দশ দিন পর্যন্ত গ্রামে পৌঁছতে লাগতে পাবে। খাদ্যের অভাব ছিল না। পথের দুই পাশে জংলী লতাপাতা এবং পশুমাংসই খাদ্যরূপে ব্যবহার করতে পারব। আমাদের চিন্তার বিষয় ছিল রাত কাটানো। এদিকে হিংস্র পশুর সংখ্যা খুবই বেশি। পথের পাশেই পশুদের রিজার্ভ। পশুদের রিজার্ভ নাইরবী যাবার পথে দেখতে পাই নি, ফেরবার পথে পশুস্থান দেখে যাবার ইচ্ছা ছিল। নিক্কুকে মনের কথা বলায় সে বললে, “তাতে আর দোষ কি, আমার সময় কাটানো নিয়েই কথা। যে-কোনও রূপে সময় কাটালেই হল।”

 যাতে তাড়াতাড়ি পশুস্থানে পৌঁছতে পারা যায় সেইজন্য আমরা আরও দক্ষিণ দিকে চলতে আরম্ভ করলাম। কতক্ষণ যাবার পরই নিক্কু থমকে দাঁড়ালো।


সংরক্ষিত বনে সিংহ

 জিজ্ঞাসা করলাম, কি হয়েছে?

 নিকু বললে, চুপ কর, এদিকে যেন একটি আস্‌কারী (পুলিশ) আস্‌তে দেখলাম।

 তোমার পুলিশাতংক রোগ হয়েছে।

 নিক্কু আমাকে ধমক দিয়ে বললে, জেলে গেলেই হল না। বাইরে থাকতে হবে, মুক্ত বিহংগমনের মত এক স্থান হতে অন্য স্থানে যেতে হবে, কিকুউ জাতকে জাগাতে হবে। আমার কথা বুঝতে পেরেছ?

 এর মানে, পাখীর মত উড়া, কিকুউ জাতকে জাগানো বেশ ভাল করেই বুঝেছি, কথা হল আমরা কেউ ঘুমিয়ে থাকছি না, তুমিও না। সকালবেলা যদি কেউ ঘুমিয়ে থাকে তবে তুমি তাকে জাগাতে পার, রাতে যদি কেউ ঘুমায় তবে তাকে কেউ জাগায় না। বাস্তুরা অনেকেই বলে “দেশটাকে জাগাবে।” দেশ ত হল মাটি। মাটি কি ঘুমায়?

 নিক্কু আর কথা বললে না, চুপ করে থাকল। কতক্ষণ পর বললে, এবার চলা যাক, এটা পুলিশ নয় একটা চিতা বাঘ। আমাদের আস্‌কারীদের দেখতে অনেকটা চিতা বাঘের মতই দেখায়। এদের জ্ঞানও চিতা বাঘের মতই, জানে শুধু খেতে আর শুতে।

 আমি বললাম, আস্‌কারীরা কাজও করে।

 হাঁ, কাজ করে বই কি, নিজের জাতের লোককে ঠেঙ্গাতে জানে, আরও কিছু জানে তারা—শ্বেতকায় প্রভুদের পদসেবাও করতে জানে।

 নিক্কু এর বেশি একটি কথাও বললে না। সে চলতে আরম্ভ কবলে।

 নিক্কু যা বলছিল সবই মনের দুঃখে বলছিল বুঝতে পেরেছিলাম। বুঝতে পেরেছিলাম বলেই আর উচ্চবাচ্য করিনি। সে যেদিকে যাচ্ছিল সেই দিকে চলতেছিলাম। আরও ভাবছিলাম একজন আস্‌কারী যা মাসিক মাইনে পায় তা অতি সামান্য, একটি খরগোশের চামড়ার দামের চেয়েও কম তবুও তারা দেশদ্রোহী হয় কেন? তাদের যে অভাব আমাদেরও সেই অভাব। আরব যখন আমাদের দেশে লুটপাট করত, পর্তুগীজ যখন আমাদের লোক ধরে নিয়ে বিদেশে গোলাম করার জন্য চালান দিত, তখন আরব অথবা পর্তুগীজদের কেউ সাহায্য করত না, কেউ তাদের কাজ করত না। বৃটিশ নিশ্চয়ই আরব এবং পর্তুগীজ হতে বুদ্ধিমান, সেজন্যই অনেক বেতনভোগী গোলাম পাচ্ছে।

 পশুস্থানে পৌছতে আরও দুই দিন লাগবে। পথে গ্রাম ছিল না। রাত্রে একটা পবিষ্কার স্থানে আগুন জ্বালিয়ে থাকতে হবে। আমাদের সে মতলবই ছিল। কতক্ষণ যাবার পর অনেকগুলি লোকের সংগে দেখা হল। তারা নাইরবী যাচ্ছিল। তাদের পুরোভাগে যিনি ছিলেন তিনি একজন পাদরী। ঈশ্বরের কথা শুনিয়ে আমাদের জাতের লোককে পরিত্রাণ করতে নিয়ে যাচ্ছিলেন। এদের দেখে আমরা গা-ঢাকা দেবার জন্য জংগলে প্রবেশ করলাম। জংগলটা ভালই ছিল। গাছের নীচে অনেক শুকনা পাতা পড়ে রয়েছিল। চকমকিতে আগুন ধরিয়ে শুকনা পাতাতে লাগিয়ে দিলে বেশ ভালই দেখায়, কিন্তু সেরূপ দুষ্ট বুদ্ধি যদিও উঁকিঝুকি মারছিল তবুও বনে আগুন দিতে প্রবৃত্তি হল না। বনে আগুন লাগলে অনেক প্রাণী মারা যাবে। হয় ত আমাদের লোকও বনে কোনও কাজে যদি এসে থাকে তারাও পালাবার পথ পাবে না। বনের আগুন দেখতে ইচ্ছা হল না।

 সন্ধ্যার পূর্বেই আমরা একটি পরিষ্কার জায়গা খুঁজে বের কবলাম। সর্বপ্রথম কাজই ছিল আগুন জ্বালানো। আধঘণ্টার মধ্যে বেশ বড় একটা আগুন জ্বালাতে পারলাম। তারপর স্নান। পাশেই একটি নালা বয়ে যাচ্ছিল। পাহাড়ের ঠাণ্ডা জল বয়ে যাচ্ছিল সাগরের দিকে। আমরা নালাতে ভাল করে স্নান করে নিলাম। নিক্কুর মাথায় চুল ছিল না, আমার মাথা ত একেবারে পরিষ্কার করা ছিল। মাথা মুণ্ডন করা আমাদের মধ্যে প্রচলন নাই, কিন্তু যারাই একটু শিক্ষিত হয়েছে তারাই খুর দিয়ে মাথার চুল চেঁছে ফেলে দেয়। কেহ কেহ ক্লিপ দিয়েও চুল কাটে। আমাদের চুল কাটতে কাঁচি ব্যবহার খুব কমই হয়। যাদের মাথায় প্রচুর চুল থাকে তারা মাথা ধুতে পারে না। ধুলে অন্তত দুই তিন ঘণ্টা সময় চুল শুকাতে লেগে যায়।

 আরও একটি মজার কথা বলি, যারাই খুর দিয়ে ক্রমাগত চুল চেঁছে ফেলে দেয়, ভবিষ্যতে তাদের চুল পাতলা এবং মোটা হতে আরম্ভ করে। ভবিষ্যতে হয় ত আমাদের চুল পাতলা এবং মোটা হবে, তখন ভেড়ার লোমের মত চুল আর আমাদের কষ্ট দেবে না।

 স্নান করে ফেরবার পথে কয়েকটি বনজ গাছের গোড়া নিয়ে এলাম এবং তাই পুড়িয়ে খেয়ে রাত কাটাতে মনস্থ করলাম। নিক্কু একটা ফাঁদ পাতলে। তাতে যদি বন মোরগ অথবা সেই ধরণের কোনও পাখী পড়ে তবে আমাদের খাদ্যের কোনও কষ্ট হবে না। ফাঁদ পাতা হয়ে গেলে কয়েক টুকরা মিষ্টি গাছের চামড়া অতি পাতলা করে কেটে ছাড়িয়ে দিলে নিক্কু।

 নিক্কু বড়ই চতুর, দেখতে দেখতে একটি গিনি ফাউল ফাঁদে পা দিল। গিনি ফাউলটাকে ধরে তখনই হত্যা করা হল। নিক্কু রান্না করতে জানত। সে গিনি ফাউলটাকে পরিষ্কার করে কেটে মাংসের সংগে লবণ মাখিয়ে কয়েকখানা কাঠের মধ্যে জড়িয়ে আগুনে ফেলে দিলে। মিনিট কয়েকের মধ্যেই ঝলসানো মাংস বের করে আমাকে কিছুটা খেতে দিলে এবং নিজেও খেতে আরম্ভ করলে। বেশ উত্তম মাংস, সব্জী খেতে মোটেই ইচ্ছা হল না। মাংস খেয়েই পেট ভরে নিলাম। তারপর ঘুমাবার পালা। নিক্কু বললে সে শেষরাত্রে ঘুমাবে। তার সংগে একটা বই ছিল। উত্তপ্ত আগুনের আলোতে সেই বই পড়তে আরম্ভ করলে, আমি নাক ডাকিয়ে ঘুমাতে আরম্ভ করলাম। কতক্ষণ পর নিক্কু আমাকে অতি সন্তর্পণে জাগালে এবং বললে, “জব্বু, ভয় করিস্ নে, সামনে যাই আসুক আমরা দস্তুরমত লড়াই করে মরব।”

 চোখ খুলেই দেখি সামনে একটা প্রকাণ্ড সাপ। আমাদের গেলাব জন্য তৈরী হয়ে আছে। কাছেই কতকগুলি উদ্বৃত্ত কাঠ ছিল, আমি সেই কাঠ একটি একটি করে আগুনে দিতে আরম্ভ করলাম। কাঠ যখন আগুনের উত্তাপে পট পট শব্দ করছিল তখন সাপটা লেজ নাড়িয়ে বুঝাচ্ছিল আমাদের আর রক্ষা নাই। ধীরে ধীরে আগুনটা যখন বেশ জেগে উঠল তখন নিক্কু এক মুঠা ছাই ধুলার সংগে মিশাতে আরম্ভ করলে। ছাই এবং ধুলা বেশ ভাল করে একত্রিত করে নিক্কু বললে, “জব্বু, আগুনটা ছড়িয়ে দে।”

 একটা লম্বা কাঠ দিয়ে আগুনটাকে ছড়িয়ে দেওয়ামাত্র সাপটা একটু সরবার জন্য যেই মুখ ফেরাতে যাচ্ছিল অমনি নিক্কু পেছন দিক থেকে সাপের চোখে ধুলা মারলে। সাপটা তবুও একগুঁয়ের মত আমাদের কাউকে ধরবার জন্য বেশ নির্ভীকভাবেই কুণ্ডলী পাকিয়ে রয়েছিল।

 নিক্কু সাপটার গায়ে এক টুক্‌রা জ্বলন্ত কাঠকয়লা ফেলে দিলে। সাপ তখন বুঝতে পারল তার ভুল হয়েছে। আগুনের কাছে তার কোন বুদ্ধি অথবা শক্তি ব্যবহার চলবে না। প্রথমত সাপটার চোখ অন্ধ হয়েছিল, দ্বিতীয়ত ক্ষুধা তাকে কাবু করেছিল। দিশেহারা হয়ে শেষটায় আগুনের দিকেই এগিয়ে চলল। আগুনের কাছে আসা মাত্র আবার মুখ ফেরাতে হল। এবাব নিক্কু আরও জ্বলন্ত কাঠ কয়লা সাপের উপর ফেলে দিল।

 সাপটা এবার আরও উন্মত্ত হয়ে নিরাপদ দিকে অগ্রসর হতে থাকল। সাপটাকে হত্যা করার ইচ্ছা আমার ছিল না। নিক্কুর মতলব অন্য রকমের ছিল। সে সাপটাকে হত্যা করার জন্য সাপের মুখের দিকে একটা ডাণ্ডা দিয়ে যেই খুঁচা দিলে অমনি সাপটা মুখ খোলা মাত্র ডাণ্ডাটা সাপের মুখে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে নিক্কু সরে দাঁড়াল। আর কি রক্ষা আছে, সাপ ডাণ্ডাটা জড়িয়ে ফেললে। ডাণ্ডা ত জীব নয়, এক টুক্‌রা কাঠ মাত্র। সাপ যখন ডাণ্ডার উপর প্রতিশোধ নিচ্ছিল তখন নিক্কু তার লম্বা দা প্রজ্বলিত আগুন হতে উঠিয়ে নিয়ে সাপের উপর ছুঁড়ে মারল। লম্বা দা আপনি সাপের শরীরে প্রবেশ করল। সাপটা যন্ত্রণায় ছটপট করল না, পালাবার জন্য ধাবমান হল। কিন্তু প্রকাণ্ড সাপ খুব কম চলতে পারে। অতি বিপদ দেখলে এক রকমের শব্দ করে। সাপটা শব্দ করতেছিল। সাপের শব্দ শোনা মাত্র আশপাশের যত জানোয়ার পালাতে আরম্ভ করল।

 সাপের শব্দ অতি অল্প শোনা যায়। যা শোনা যায় তা শুধু ফুস্ ফুস্, কিন্তু অজগর শ্রেণীর সাপ বহু রকমের শব্দ করতে পারে। সাপটা যখন শব্দ করছিল, তখন নিক্কু সাপটাকে হত্যা করবার জন্য জ্বলন্ত কাঠকয়লা সাপের উপর ঢালতে আরম্ভ করলে। এবাব সাপটা সত্যিই শরীরের ভার ছেড়ে দিয়ে নির্জীব হয়ে পড়ে থাকল। আমি ত দূরে বসেছিলাম তবুও নিক্কু বললে এবার সাপটা মরণ কামড় দেবার চেষ্টা করবে, আরও দূরে সরে যাও। নিক্কুও দূরে সরে এল। মরণ কামড় দেবার জন্য সাপটা লেজ হতে মাথা পর্যন্ত আছড়াতে থাকল। তারপর অনেকটা অচেতন হল। আমরা কিন্তু কাছে গেলাম না। সাপ সহজে মরে না। দূর থেকে জ্বলন্ত কাঠ ছুঁড়ে মারতে থাকলাম। অবশেষে জ্বলন্ত কাঠ সাপটার মাংস জ্বালাতে থাকল। আমরা দেখলাম সাপটার অনেকটা পুড়ে গেছে।

 সুখের বিষয় সাপটা মরে যাবার পর আমরা ঘুমাতে পেরেছিলাম এবং ঘুমন্ত অবস্থায় অন্য কোনও জানোয়ার আমাদের কাছেও আসেনি।

 সকালেই আমাদের ঘুম ভাঙল। নিস্তেজ শরীর নিয়ে পথ চলতে আরম্ভ করলাম। এখন থেকে জংগল ক্রমেই কমতে আরম্ভ হয়েছিল। ক্রমে ক্রমে আমরা তৃণভূমিতে আসলাম। তৃণভূমি কাকে বলে বিদেশীরা সহজে বুঝতে পারে না। আফ্রিকাতে অনেক পাহাড়িয়া অঞ্চল আছে যেখানে বড় বড় গাছ মোটেই হয় না। এরূপ স্থানে তৃণজীবী জন্তু থাকতে পছন্দ কবে।

 আমরা যে অঞ্চলে পৌঁছেছিলাম সেখান থেকে তৃণভূমি দেখতে পাওয়া যাচ্ছিল। আমাদের দৃষ্টি সেই সুন্দর তৃণভূমির দিকেই ছিল কিন্তু বেশিক্ষণ নিশ্চিন্ত মনে হাঁটতে পারছিলাম না। অদূরে কয়েকটি সিংহ বিশ্রাম করছিল। তৃণভূমির নিকটে সিংহ, চিতাবাঘ এবং অন্যান্য জাতের হিংস্র জীব বাস করে। এরা কিন্তু দিনে কাউকে আক্রমণ করে না, যদি কেউ তাদের বিবক্ত না করে। অবশ্য রাত্রে তারা মানুষও আক্রমণ করে শুনতে পাওয়া যায়।

 নিক্কু সিংহ দেখেই চিন্তিত হযে পড়ল। এবাব আমি তাকে সাহস দিয়ে বল্লাম, ভয় নাই বন্ধু, এদের পেট ভর্তি রয়েছে। এরা আমাদের আক্রমণ করবে না। তবুও নিক্কু ভয়ে ভয়ে চলতেছিল। সিংহদের ছাড়িয়ে আমরা আসলাম একটি ছোট্ট নদীর পাশে, ইচ্ছা জল খাওয়া। নদীর জলে কয়েকটা মহিষ শুয়ে বয়েছিল। আমাদের দেখামাত্র মহিষেরা সন্ত্রস্ত হযে উঠল এবং আমাদের আক্রমণ করার জন্য কুচকাওয়াজ করে দিল। আমি জানতাম মহিষ কত হিংস্র জীব। তাড়াতাড়ি করে আমরা একটা জংগলে প্রবেশ করলাম। নিক্কু জংগলে প্রবেশ করতে রাজি ছিল না, তাকে টেনে নিয়ে জংগলে প্রবেশ করতে হয়েছিল।

 আমরা যখন জংগলের মধ্যে প্রবেশ করেছি তখন মহিষগুলি আমাদের আক্রমণ করার জন্য জংগলের পাশে ঘুরাফেরা করতেছিল কিন্তু জংগলে প্রবেশ করার মত শক্তি তাদের ছিল না। জংগল কণ্টকাকীর্ণ। কণ্টকাকীর্ণ বৃক্ষবাজির ভেতর দিয়ে মহিষ প্রবেশ করে না। মহিষ জানে কণ্টকাকীর্ণ বনে প্রবেশ করলে আর ফিরতে পারবে না। প্রত্যেকটা বৃক্ষে বড় বড় কাঁটা। প্রত্যেকটা কাঁটা তিন ইঞ্চিরও বেশি লম্বা। একজন মানুষ সহজেই ঘন বৃক্ষপূর্ণ বনে প্রবেশ করতে পারে কিন্তু একটা মহিষ প্রবেশ করতে পারে না।

 আফ্রিকার যে-কোনও হিংস্র জীব হতে রক্ষা পাওয়া যায় কিন্তু মহিষের হাত থেকে বেহাই পাওয়া অসম্ভব। সে কথা কে না জানে?

 আমরা জংগলে প্রবেশ করার পর থেকে মহিষগুলি আমাদের আক্রমণ করার জন্য কণ্টকিত বৃক্ষবাজির এক পাশে বার বার আসতে লাগল। আমরা জংগল থেকে বের হলেই মহিষ আক্রমণ করবে সে ভরসা রেখেই মহিষ আসা-যাওয়া করছিল।

 যে পথ দিয়ে আমরা কণ্টকিত বনে প্রবেশ করছিলাম, সেই পথে অন্তত সপ্তাহের মধ্যে বের হতে পারব না মনে হচ্ছিল। উপায়ান্তর না দেখে আমরা অন্য পথে বের হবার চেষ্টা করছিলাম। পূর্বেই বলেছি, আমরা জল খেতে বন্য নদীতে গিয়েছিলাম। আফ্রিকার বন্য নদী সম্পূর্ণ পৃথক ধরণের। নদীর দুই দিক ক্রমেই নীচের দিকে চলে গিয়েছে। এক দুই শত ফুট নয়, কমের পক্ষে পাঁচ শত ফুট ত হবেই। নদীর জলের কাছে যত বড় বড় গাছ ঘন হয়ে বয়েছিল তাতেই কাঁটা ছিল। উপরের দিকের গাছগুলিতে কাঁটা মোটেই ছিল না। গাছে কাঁটা হওয়া না হওয়া আবহাওয়ার উপর নির্ভর করে।

 আমরা মাইল পথ হেঁটে মোড় ফেরলাম। জংগলের মধ্যে মাইল পথ চলতে অন্তত ঘণ্টা তিনেকের মত সময় লাগে। তিন মাইল কণ্টকিত পথে হেঁটে আমরা পরিশ্রান্ত হয়ে পড়লাম। নিক্কু বল্লে, “রাতটা কণ্টকিত বলেই কাটানো ভাল, অন্তত সাপ, সিংহ, চিতাবাঘ এদের কাছ থেকে রেহাই পাওয়া যাবে।” আমি জিজ্ঞাসা করলাম, “কি খেয়ে রাত কাটাতে হবে?”

 নিক্কু বল্লে, আগে ত থাকবার জায়গা ঠিক হোক, তারপর ভেবেচিন্তে দেখব রাত্রে কি খাওয়া যায়। আমরা বাত কাটানোর জন্য একটি উত্তম স্থান বের করে নিলাম। চারদিকে চারটা মোটা কণ্টকিত গাছ, তারই মধ্যে বেশ প্রশস্ত একটি স্থান। প্রথমত জায়গাটা পরিষ্কার করে শুকনা লতাপাতা দিয়ে ছোট্ট একটি আগুন করা হল। আগুন চারদিকে ছড়িয়ে দিয়ে পিঁপড়া এবং অন্যান্য কীট নষ্ট করে পুনরায় পরিষ্কার করতে বেশিক্ষণ লাগল না। জায়গা পরিষ্কার করে নিক্কু আর একটা আগুন জ্বাল্‌লে—একটু দূবে নয়, অনেক দুবে। তারপব পরিষ্কার জায়গাটায় শুয়ে পড়ল।

 আমার কিন্তু ভয়ানক ক্ষুধা হয়েছিল। কি খাব ভাবতেছিলাম। নদীতেও যেতে ইচ্ছা হচ্ছিল না। এত উঠা-নামা করার মত শক্তি ছিল না। কতক্ষণ পর আমিও নিক্কুর কাছেই শুয়ে থাকলাম। একটানা নিদ্রা। ঘুম থেকে উঠে দেখি সূর্য ঠিক আমাদের মাথার উপরে। বুঝতে বাকি থাকল না আমরা চব্বিশ ঘণ্টা ঘুমিয়েছিলাম।

 নিক্কু ঘুম থেকে উঠেই একটা গাছের গোড়ায় গেল এবং একটা খরগোশকে খপ করে ধরে নিয়ে এল। আমি জানতাম না, কণ্টকিত বৃক্ষবাজির গোড়াতে খরগোশ গর্ত করে বাস করে এবং গাছের নীচে যে সকল কোমল তৃণ হয়, তাই খেয়ে প্রাণধারণ করে। খরগোশের মাংস খেয়ে আমাদের তৃষ্ণা হয়েছিল কিন্তু জল বহু নীচে। আমি বল্লাম, “আর নীচে যেয়ে কাজ নাই, চল উপরে যেয়ে জলের সন্ধান করি।” নিক্কু আমার কথার প্রতিবাদ করলে না। আমরা উপরে উঠলাম। উপরের স্নিগ্ধ মুক্ত বাতাস আমাদের প্রাণে চেতনা এনে দিল। গভীর বনে মুক্ত বাতাস পাওয়া যায় না। বন্য বাতাসে ভ্যাপসা গন্ধ থাকে।

 বন থেকে বেবিয়ে দেখি আমরা রেল লাইনের কাছে পৌঁছেছি। রেলপথ ধরে চলতে আমার কোন আপত্তি ছিল না, নিক্কু রেলপথ দেখেই ভীত হয়েছিল। সে ছিল পলাতক, পুলিশ দেখলেই তাকে কয়েদ করবে। আমার কিন্তু পুনরায় জংগলে যেতে ইচ্ছা হচ্ছিল না। নিক্কুকে বল্লাম, “ভাই, নিকটেই গ্রাম আছে, চল গ্রামে, আস্‌কারীর ভয় কর না। হয় ত গ্রামে আস্‌কারী নাও থাকতে পাবে, চল গ্রামে যাই।”

 নিক্কু বল্লে, “জব্বু, গ্রামে যেতে আপত্তি নেই কিন্তু গ্রামে আস্‌কারী আছে কি নেই তোমাকেই সে দায়িত্ব নিতে হবে। জানই ত আমাকে যে আস্‌কারীই গ্রেপ্তার করবে সে পাঁচ শত শিলিং পাবে।

 আমি জানতাম না নিক্কুকে গ্রেপ্তার করার জন্য পাঁচ শত শিলিং পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছিল। নিক্কু আমাকে বিশ্বাস করতে পেরেছে বলেই তার বিশেষ গোপন কথা আমার কাছে বলে দিয়েছে। তাকে গ্রামে নিয়ে যাওয়া আমার পক্ষে ভাল কি মন্দ হবে বুঝতে পারছিলাম না। চলার পথে চিন্তা করছিলাম, সামান্য সুখের জন্য যদি নিক্কু পুলিশের কবলে পড়ে তবে সমাজে মুখ দেখাতে পারব না। যদি কচি ছেলে হতাম তবে ভয়ের কারণ ছিল না, এখন আমি বয়স্ক, আমার অন্যায় কাজ কেউ সমর্থন করবে না। কতক্ষণ যাবার পর নিক্কুকে বল্লাম, “ভায়া, তোমাকে আমি গ্রামে নিয়ে যাব না। গ্রামে যদি আস্‌কারী থাকে এবং তোমাকে দেখতে পেয়ে গ্রেপ্তার করে তবে গ্রামের লোকের কাছে মুখ দেখাতে পারব না। আমি গ্রামের আশেপাশেই থাকব বটে কিন্তু তুমি গ্রামের মধ্যে প্রবেশ করবে না, দরকারও হবে না। গ্রাম থেকে আমিই ভুট্টাব লেই চেয়ে নিয়ে আসব।”

 আমার দায়িত্ব-জ্ঞান আছে বুঝতে পেরে নিক্কু সন্তুষ্ট হল এবং চলার গতি বাড়িয়ে দিয়ে এগিয়ে চল্ল। আমরা গ্রামের কাছে একটি ঝোপের মধ্যে থাকবার ব্যবস্থা করলাম। সর্বপ্রথমই গ্রাম্য চলন্ত জলের নালা হতে জল এনে নিক্কুকে খেতে দিলাম। তারপর আমি গ্রামে প্রবেশ করে একজন লোকের কাছ থেকে কতকটা ভুট্টাব লেই চেয়ে এনে দুজনাতে মিলে খেয়ে নিলাম। বাস্তবিকপক্ষে অনেক দিন ভুট্টার লেই না খাওয়াতে আমাদের শরীর দুর্বল হয়েছিল এবং ভুট্টার লেই খাবার পর শরীরে বেশ শক্তি হয়েছিল।

 এবার রাত কাটানোর বন্দোবস্ত করতে হবে। গ্রামটা বেড়িয়ে দেখলাম কোথাও আস্‌কারী নাই। গ্রামে মাত্র চারখানা ঘর এবং তিনটি পরিবার সে গ্রামে বাস করে। সন্ধ্যার পব খালি ঘরটাতে আমরা প্রবেশ করলাম এবং লোকে ঘুম থেকে উঠবার পূর্বেই গ্রাম হতে বেরিয়ে এসেছিলাম। এর পর থেকে আমরা ক্রমাগত গ্রামে রাত কাটাতে সক্ষম হই। পশুস্থান দেখার ইচ্ছা পরিত্যাগ করতে হল।

 এই করে যেদিন গ্রামে পৌঁছলাম সেদিন আনন্দ হবারই কথা ছিল, কিন্তু নিক্কুকে কোথায় রাখি সে চিন্তায় আমাকে পেয়ে বসেছিল। অবশেষে মায়ের কাছে বলে নিক্কুকে আমাদের ঘরের পেছনের একটি ছোট্ট ঝোপে থাকতে দিয়েছিলাম। নিক্কু তাতেই সন্তুষ্ট হয়েছিল এবং প্রায় মাস খানেক থেকে আমাদের গ্রাম ছেড়ে অন্যত্র গিয়েছিল।

 নিক্কুর সংগে পথ চলে বুঝতে পেরেছিলাম আমাদের গলদ কোথায়। বোঝা যায় সবই কিন্তু যা অনুভব হয় সেই অনুযায়ী কাজ করা কঠিন। নিক্কুর সংগে পুনরায় দেখা হয়, তখন নিক্কু গ্রামেই থাকত এবং আস্‌কারী দেখলে পালাত না, ববং আস্‌কারীরা নিক্কুকে দেখলে পালাত। নিক্কু আস্‌কারীদের যদিও ঘৃণা করত তবুও অত্যাচার করত না। আস্‌কারীদের পরীক্ষা করত এবং দেখত তার আদেশমত আস্‌কারীরা কাজ করে কি না?

 আস্‌কারী (পুলিশ) চবিত্র বড়ই জঘন্য, এদের শাস্তি না দিলে কোন কাজই হত না। এদের শাস্তি পৃথক ধরণে দেওয়া আরম্ভ হযেছিল সে কথাই এখন একটু বলে রাখি, নয় ত গল্প বলার ফাঁকে ভুলেও যেতে পারি।

 কলোনিয়েল দেশের পুলিশও মানুষই, তাদের বিবেক-বুদ্ধি সবই থাকে যেমন থাকে কশাইদের। কশাই যখন জীব হত্যা করতে থাকে, তখন শুধু মনে রাখে জীবহত্যাব কথা। ঠিক তেমনি পুলিশ যখন ডিউটিতে থাকে তখন সে মনে রাখে শুধু আদেশ পালনের কথা। আদেশ পালন করে যে পর্যন্ত তার পরিবাবের উপর কোনও আঘাত না পায়। সমাজেব বয়কট আমাদের দেশেব আস্‌কারীরা ভয় করে না। তারা ভাল করেই জানে যদি গ্রামের লোকের সংগে মেলামিশা না করে, তবে একটুও ক্ষতি হবে না। পুলিশের এরূপ মনোবৃত্তি বুঝতে পেরে নিক্কু অতি গোপনে আস্‌কারীদের আত্মীয়দের হত্যা করতে আরম্ভ করে। সুযোগমত আস্‌কারী পেলেও সে হত্যা করত। এতে করে আস্‌কারীরা বুঝতে পেরেছিল নিক্কুর মতই কয়েকটি দুর্দান্ত লোক তাদের শত্রু, গ্রামের লোক তাদের শত্রু নয়। নিজের আত্মীয়দের শহরে নিয়ে যাবারও উপায় ছিল না। সেজন্য আস্‌কারীরা নিক্কুর কাছে বশ্যতা স্বীকার করেছিল।