মাউ মাউএর দেশে/৩
(৩)
এড্ভেন্চার শুনবার জন্য সকলেরই আগ্রহ হয়, কিন্তু বল ত এড্ভেন্চার বলতে কি বুঝ? তোমরা বলবে, এমন কিছু ঘটনা যা বাস্তবিকই রোমাঞ্চকর, অথচ সেই রোমাঞ্চকর দুর্ঘটনা হতে অতি কষ্টে অথবা কৌশলে রক্ষা পাওয়া যেতে পারে। এড্ভেন্চার সেরূপ কিছু নয়, তার চেয়েও কঠোর এবং আয়ুক্ষয়ী। আমাদের গ্রামের অনেকেরই অকালে চুল পেকেছে। তারা জীবন-মরণ নিয়ে খেলা করত এবং এখনও খেলা করে।
পূর্বেই বলেছি আমার বাড়ি নেওসা হ্রদের কাছে। নেওসা হ্রদের আশেপাশে যত জংগল ছিল, প্রায়ই পরিষ্কার হয়েছে। বাড়িতে ফিরে এসে দেখলাম গ্রামের অবস্থা আরও ভাল কিন্তু গ্রামে থাকতে ইচ্ছা হ’ল না। ইচ্ছা হ’ল আরও দেখতে, আরও শিখতে তাই পুনরায় রওনা হলাম। এবার আমার গন্তব্য স্থান হ’ল আরও নীচে যেখানে গভীর বন রয়েছে।
শুনতে পেয়েছিলাম, চূণীয়া অঞ্চলে সোনার খনি রযেছে। দু’হাত মাটির নীচে সোনার দানা, গুঁড়া এবং টুক্রা পর্যন্ত পাওয়া যায়। আমার কিন্তু জানা ছিল না, চূণীয়া কোথায়; শুধু চূণীয়ার কথা শুনেছিলাম, দক্ষিণ দেশে চূণীয়া নামক অঞ্চলে স্বর্ণখনি রয়েছে। অনেকে সোনার সন্ধান পায়, অনেকে পায় না।
দুঃখের বিষয় আমার দাদু সোনার সন্ধান কাউকে দিতেন না, যে কেহ তাঁর কাছে সোনার খনির কথা জিজ্ঞাসা করত, তাকেই তিনি বলতেন, “ঘরের চারপাশে প্রচুর পরিমাণে উর্বর জমি রয়েছে, মকাই, আক, আম এবং অন্যান্য ফলেব গাছ লাগাও, দেখবে সোনার চেয়ে সুন্দর এবং সুস্বাদু খাদ্য পাবে। ঘর তৈরী করার উপকরণ আমাদের আছে, নিজের হাতে ঘর তৈরী করে বসবাস কর, দেখবে আমার মত দীর্ঘায়ু এবং সুখী হবে। আমাদের কিছুরই অভাব নেই। অন্ন, বস্ত্র, ঔষধ সবই পাচ্ছি, তবে কেন মাটির নীচের সোনা অন্বেষণ করতে গিয়ে জীবন বিপন্ন করব এবং তোমাদেরও সেই পথে ঠেলে দেব? এটা হতে দেব না। গ্রাম বাড়াও, গ্রামের লোকসংখ্যা বাড়ুক, আজ যদি বৃটিশ চলে যায়, তবে পূর্বের মত আরব এবং পর্তুগীজদেব সংগে লড়াই করতে হবে। বৃটিশ ত যুদ্ধ না করেই আমাদের দেশ দখল করল, সেজন্য আমরাও দুঃখিত নই, বৃটিশও দুঃখিত নয়। বৃটিশ যদি আমাদের দেশে না আসত, তবে হয় আমরা আরবদেব গোলাম, নয় ত নির্বংশ হয়ে যেতাম। এখন বৃটিশেরও মতিগতির পরিবর্তন হয়েছে, আমরাও কতকটা শক্ত হয়েছি। হয় ত আমাদের বৃটিশের বিরুদ্ধাচরণ করতে হবে।” আমাদের দাদু জানতেন না বৃটিশের সংগে আমাদের লড়াই বাধবে অতি সত্বর। যদি তিনি সেই সত্য বুঝতে পারতেন তবে আমাদের ভিন্ন রকমেব উপদেশ দিয়ে যেতেন। আমরা হয় ত আরও উত্তম পথ অবলম্বন করে বৃটিশকে কাবু করতে পারতাম।
আমাদের দাদুর কাছে এই ধরণের কথা শুনতে হোত বলে কেউ তাঁর কাছে সোনার খনির কথা উত্থাপন করত না। দাদু যদি কাউকে জিজ্ঞাসা করতেন, কোথায় যাচ্ছ, তবে সবাই উত্তর দিত, শিকারে যাচ্ছি। শিকারে যাওয়া মানে বস্ত্র এবং অন্যান্য মনোহাবী দ্রব্য কেনার জন্য পশুর হাড়, পশুর চামড়া এ-সব যোগাড় করে আরবেব আছে বিক্রি করা।
দক্ষিণে স্বর্ণখনির উদ্দেশ্যে যাবার প্রবল ইচ্ছা হচ্ছিল। আমার মনের কথা বলার মত লোক পাচ্ছিলাম না। সমবয়সী যারা ছিল প্রায় সকলেই বিদেশে চলে গিয়েছিল। কাউকে কিছু না বলে চলে যাওয়াই যেন রেওয়াজ ছিল। আমার কিন্তু সেই রেওয়াজটা ভাল লাগছিল না। ভাবছিলাম সকলকে বলে বিদেশে রওনা হব। অবশেষে মনটা বড়ই উথলা হয়ে উঠল। কাউকে কিছু না বলেই রওনা হতে মনস্থ করলাম। দাদু কেন, মায়ের কাছেও বললাম না, কোথায় যাচ্ছি। একদিন সকাল বেলা দক্ষিণ দিকে রওনা হলাম। শুধু দক্ষিণ দিকই আমাব লক্ষ্য। সংগে তীর-ধনু নিতে ভুল্লাম না। চলে যাবার সময় মা ঘরেও ছিলেন না।
বনে জংগলে পায়ে-চলা পথ দু’একটা থাকে। আমিও সেই বকম একটি পথ ধরে চললাম। বেশিক্ষণ চলতে পারলাম না। পাশেই একটা নারিকেল গাছ ছিল। গাছ থেকে একটা নারিকেল পেড়ে প্রথমত জল খেলাম, তারপর নারিকেল। বেশ সুস্বাদু খাদ্য। চলতে ইচ্ছা হ’ল না, একটু দূরে যেয়ে বিশ্রাম করতে বসলাম।
আমাদের দেশে নারিকেল গাছের আশেপাশে বসা মোটেই নিরাপদ নয়। নারিকেল গাছে প্রায়ই বিষাক্ত সাপ থাকে। আমরা যখন নারিকেল পাড়তে যাই, তখন নারিকেলের পাতার কাছে যাই না। একটা কাঠের সংগে চাকু বেঁধে নারিকেলের বোঁটা কেটে দেই।
দূরে বসে বিশ্রাম করার সময় দেখলাম, একটা সাপ ফোঁস্ করে নারিকেল গাছে উঠছে। তোমরা বোধ হয় জান না, কি করে সাপ গাছে উঠে। যা দেখেছি তাই বলছি।
প্রথমত সাপ ফোঁস্ করে গাছের কাছে যেয়েই একেবাবে চুপ মেরে গেল, তারপর দেখলাম মাটির ওপর যেমন করে চলে ঠিক তেমনি গাছের গোড়া পেরিয়ে একটা গর্তে ঢুকল। গাছটাকে পেঁচ দেবার মত সাপটা লম্বা ছিল না। আমি একদৃষ্টে সাপের দিকে চেয়ে রইলাম। সাপ গাছে উঠছে দেখতে পেয়ে দু’টি কাঠবিড়াল কিচির-মিচির আরম্ভ করে দিল। কোথা থেকে সাপের শত্রু দু’টি বেজি গাছের গোড়ায় ঘোরাফেরা আরম্ভ করল। কাঠবিড়ালের কিচির-মিচির, বেজির রক্তচক্ষু দেখতে বেশ লাগছিল। হঠাৎ দেখলাম সাপ গাছেব ‘খোড়ল’ থেকে লাফ দিয়ে মাটিতে পড়ল, অমনি দু’টা বেজি সাপকে আক্রমণ করল। আর কি সাপের রক্ষা আছে? একটা বেজি সাপের মাথায় কামড় দিয়ে ধরল, অন্য বেজি সাপের মাঝখানে এমনি করে কামড় দিয়ে ছোবল দিচ্ছিল যে, সাপেব অর্ধেকটা দ্বিখণ্ডিত হয়ে গেল। তাবপর উভয় বেজি সাপের কিছুটা রক্তমাংস খেয়ে বিদায় নিল। আমিও আর বসলাম না, পথ ধবলাম। সাপেব বৃক্ষ চড়া দেখা এই পর্যন্তই শেষ। শুনেছি এক গোছের সাপ লাফিয়ে চলে, সেরূপ সাপ কিন্তু কখনও দেখিনি।
আমাদের দেশে অর্থাৎ আফ্রিকাতে সর্বত্র নারিকেল গাছ জন্মায় না। যে সকল স্থান সমুদ্রের লেভেল থেকে তিন-চার শত ফুট উচ্চে অবস্থিত এবং ট্রপিকেল এলাকার অন্তর্ভুক্ত, সেই সকল স্থানেই নারিকেল গাছ হয়। অনেক কথক কিন্তু নাইরবীতেও নারিকেল গাছের স্বপ্ন দেখেন! তাঁদের গল্প আমার কাছে মোটেই ভাল লাগে না।
সন্ধ্যা হবার পূর্বেই একটি গ্রামে পৌঁছলাম। গ্রামের লোক আমাকে থাকতে অথবা খেতে ডাকল না। আমরা কখনও কাউকে অযাচিতভাবে থাকতে বা খেতে ডাকি না। একটি ঘরের বাবান্দায় বসলাম এবং বিশ্রাম করে নিকটস্থ নালাতে স্নান করে ফেরবার সময় একটি ভুট্টার ক্ষেত হতে কয়েকটি ভুট্টা নিয়ে এলাম। ভুট্টা আগুনে পুড়িয়ে তাই খেলাম। রাত্রে বাইরেই শুয়ে থাকলাম। গ্রামে জানোয়ারের ভয় ছিল না। যদি জানোয়ারের ভয় থাকত, তবে গ্রামের লোক নিশ্চয়ই আমাকে ঘরে থাকতে বলত।
সকালে ঘুম থেকে উঠবার পূর্বেই একটি লোক আমার শরীরে হাত দিল। মানুষের স্পর্শে ঘুম ভাঙল। যে লোকটি আমাকে জাগিয়েছিল, সে আমার সমবয়সী। আমাকে ডেকে বললে, সে একখানা ঘর তৈরী করবে, আমি যদি তার ঘর তৈরীর কাজে সাহায্য করি, তবে সেও আমার জন্য একখানা ঘর তৈরী করতে সাহায্য করবে। আমার হাতের কাছে তীর-ধনু দেখিয়ে বললাম, “এড্ভেন্চার করতে বেরিয়েছি, ঘর তৈরী আমার পক্ষে সম্ভব হবে না।”
সমবয়স্ক যুবকের নাম তাহিব। তাহিবদের গ্রামের সকলেই আরবদের পাল্লায় পড়ে বিদেশী ধর্ম, মতবাদ গ্রহণ করেছিল; বর্তমানে সেই গ্রামের সকলেই বিদেশী মতবাদ পবিত্যাগ করেছে এবং গ্রাম উন্নয়নে আত্মনিয়োগ করেছে। তাহিবদেব গ্রামে দু’ বৎসর পূর্বে মাত্র কযেকখানা পাতার ঘর ছিল, বর্তমানে সেখানে দু’ ডজন মাটির ঘর হয়েছে। তাহিবদেব গ্রামে আরব এবং ইণ্ডিয়ানদের দেখামাত্র বিতাড়ন করা হয়, কোন ইউবোপীয়ান্ পাদরী গ্রামে ঢুকলে কেউ কথা বলে না। বিদেশীদের সংগ এই গ্রামের লোক একেবারে পরিত্যাগ করেছে।
তাহিব বললে, “তুমি এড্ভেন্চার করতে চাও, ভাল কথা। এখান থেকে দু’ মাইল দূরে একটি জংগল আছে, সেখানে কাঠ কাটতে আমরা যাই। সেখানে অনেক রকমের জানোয়ার দেখতে পাবে। যদি ইচ্ছা কর তবে ঘর বানানো হয়ে গেলে উভয়ে মিলে এড্ভেন্চার করতে যেতে পারি।”
আমার লক্ষ্য ছিল, সোনার খনি খুঁজে বের করা। জংগলে হিংস্র জীব থাকে, সবাই জানে। এর মাঝে বিশেষত্ব কি থাকতে পারে? তাহিবকে জিজ্ঞাসা করলাম, “বিদেশী মতবাদ ত পরিত্যাগ করেছ, কিন্তু বিদেশীদের কাছ থেকে কিছু জানবাব শুনবার ইচ্ছা আছে কি?”
তাহিব বললে, “কেন এই কথা বলছ, বিদেশী মানেই অত্যাচারী, কোনও বিদেশী আমাদের জন্য কিছু করেছে কি? সবাই মজুর খাটিয়ে বিদায় দিয়েছে অথবা ধরে নিয়ে গোলাম করেছে। তোমার বিদেশী প্রেম দেখে বাস্তবিকই দুঃখিত। যাও সাহায্য চাই না, যেখানে ইচ্ছা যেতে পার।”
বিলম্ব না করে আবার দক্ষিণের দিকে রওনা হলাম। সন্ধ্যার পূর্বে একটি ভারতীয় এবং আরব-অধ্যুষিত গ্রামে পৌঁছলাম। ভাবছিলাম গ্রামে নিশ্চয়ই ভুট্টা পাওয়া যাবে, কিন্তু গ্রামের আশেপাশে কোথাও ভুট্টাব ক্ষেত না পেয়ে দুঃখিত হলাম। একজন আস্কারী (পুলিশ) বললে, নিগ্রোরা বিদেশীদের গ্রামে রাত্রে থাকতে পাবে না। সূর্যাস্তের পূর্বেই যেন আমি গ্রাম ছেড়ে চলে যাই, নতুবা জেলে রাত কাটাতে হবে এবং আমার দাদুর তৈরী অতি যত্নের তীর-ধনু পুলিশ কেড়ে নেবে।
তাড়াতাড়ি করে গ্রাম হতে বেরিয়ে পড়লাম। চলছিলাম মোটর-রাস্তা ধরে। একজন ইউরোপীয়ান্ ইচ্ছা করেই তার মোটরখানা আমার দিকে লক্ষ্য করে প্রবল বেগে চালাচ্ছিল। প্রাণরক্ষার জন্য রাজপথ পবিত্যাগ করে জংগলে প্রবেশ করলাম। ইউরোপীয়ান্ লোকটা আমাকে হত্যা করতে না পেরে দুঃখিত হয়েছিল।
একটু বুদ্ধি খাটিয়ে চিন্তা করে দেখ, কালো আদমী নিগ্রো হত্যা করা কতকগুলি শ্বেতকায়ের প্রাণে একটুও লাগে না। তারা আমাদের মানুষ মনে করে না। একজন নিগ্রো হত্যা করা এবং একটা সাপ হত্যা করা ইউবোপীয়দেব কাছে সমতুল্য। সাপ আমরা ঘৃণা করি, ভয়ও করি। সাপ হত্যা করতে পারলে একটা শত্রু নিপাত হ’ল মনে করে শান্তি পাই। আমাদের দেশে কতকগুলি ইউরোপীয়ান্ আছে, তারা আমাদেব সাপের মত ঘৃণা এবং ভয় করে। ইউরোপীয়ান্দের মধ্যে এমন লোকও দেখা যায়, যাঁরা আমাদের উন্নতির জন্য প্রাণ দিয়েছেন এবং যথাসর্বস্ব দেবার জন্য প্রস্তুত। সব ইউরোপীয়ান্কে একই পর্যায়ে ফেলা কোনও মতেই যুক্তিযুক্ত হবে না।
দেশ আমাদের, আমরা মজুরী করি, অথচ আমরা আরব, ইণ্ডিয়ান এবং ইউরোপীয়ান্ অধ্যুষিত গ্রামে রাত্রে থাকতে পারি না, এটা কেমন কথা? ইউরোপীয়ান্ এবং আরবদেব আমরা রীতিমত ভয় করি। ইণ্ডিয়ান্দের ভয় করি না। যদিও ইণ্ডিয়ান্রা আমাদের ঘৃণা করে।
বাধ্য হয়ে শহরের বাইরে এক নিগ্রো গ্রামে থাকতে হ’ল। সেখানে খাদ্যের অভাব হয় নি। রাত্রে একজন লোক তার ঘরে থাকতে দিয়েছিল। তাদের গ্রামে বাঘের মত এক রকমের হিংস্র জীব প্রায়ই আসত এবং সুযোগ পেলেই শিশু নিয়ে যেত। ভাবলাম, সেরূপ জীব হত্যা করে গ্রামের লোককে সাহায্য করা অতীব কর্তব্য। যে লোকটি আমাকে তার ঘরে থাকতে দিয়েছিল, তাকে বললাম, “ভাই, আমি বাইরে থাকব, অন্তত একটা শত্রুকে নিধন করা চাই। বেগতিক দেখলে ঘরে ঢুকব এবং দরজা বন্ধ কবে দেব।” লোকটি আমার কথায় সম্মত হ’ল।
এক ঘুম দিয়েই বাইরে এলাম এবং একটা প্রকাণ্ড জানোয়ার দেখে তীর নিক্ষেপ করলাম। জানোয়ারটা চীৎকার করে পালাল। এরূপ বীভৎস চীৎকার কেউ শুনে নি। গ্রামের সকলেই সেই চীৎকার শুনেছিল, কিন্তু ঘর হতে বের হয়ে দেখে নি জানোয়ারটা কোন্ জাতের জীব। মধ্যরাত্রেও আর একটি জানোয়ারকে ঘায়েল করলাম। পরদিন সকালে জংগলের কাছে দু’টি হায়েনা মরে পড়ে রয়েছে দেখতে পেয়ে, গ্রামের লোক হায়েনার চামড়া উঠাতে গিয়েছিল। সবাইকে বাধা দিয়ে বললাম, “মাটিতে পুতে ফেল, এতে হাত দিয়ে ধরেছ কি মরেছ, জানোয়ার দুটোর সর্বাংগ বিষাক্ত। আমারই বিষতীরে মৃত্যু হয়েছে।” সকলে মিলে হায়েনা দুটোকে কবর দিল। আমি আমার গন্তব্য স্থানে রওনা হলাম।
তোমাদের জ্ঞাতার্থে বলছি, আমাদের অনেক শিশু হায়েনা খেয়ে ফেলে। এটা আমাদের মা’দের দোষেই হয়। আবার অনেক বৃদ্ধ বনে জংগলে শুয়ে থাকলে তাদেরও শৃগাল এবং হায়েনা খেয়ে ফেলে। এই প্রকারের সংবাদ ভিত্তি করে অনেক বিদেশী বিভিন্ন রকমের গল্পেব অবতারণা করে।
আফ্রিকার “বনে জংগলে” নাম দিয়ে অনেকে বই লিখেন, কিন্তু তোমাদের জানবার জন্য বলছি বনে জংগলে যে সকল হিংস্র জীব থাকে তাদেরও কতকগুলি নিয়ম-কানুন মানতে হয়। কোনও হিংস্র জীব অনর্থক অন্য জীব হত্যা করে না। অথবা যারা অসভ্য নামে পরিচিত তারাও এমন কোন কাজ করে না যাতে রোমাঞ্চ লিখবার মত উপকরণ আছে। এর পরের কথা হল আফ্রিকার ভৌগোলিক তথ্য যারা একটু জানতে পারবে তাদের কাছেই আফ্রিকার আজগুবি কথা মোটেই ভাল লাগবে না। আফ্রিকাতে এমন অনেক স্বাস্থ্যকর স্থান আছে, যে স্থানের জলবায়ু মানুষের কাছে ঔষধ থেকেও ভাল।
আমাদেরই দেশে ইয়ালা নামে একটি গ্রাম আছে। সেই গ্রামের লোক প্রায় সকলেই স্বাস্থ্যবান। ইয়ালা গ্রামের পাশ দিয়ে একটি নদী বয়ে গেছে। নদীর জল দেখলে সেই জলে কারো পা ধুইবারও ইচ্ছা করবে না। কুচ কুচে কালো ঘোলাটে জল সেই নদী বয়ে নিয়ে যায অনেক দূরে সাগরে। কিন্তু বহু দিন থেকে ইয়েলো জ্বরে অথবা টাইফয়েড রোগে আক্রান্ত যে-কোন রোগী ইয়ালা নদীব জলে স্নান করা মাত্র আরাম হয়। নদীর জল ওজনে ভারী। খেতে মোটেই ইচ্ছা হয় না, কিন্তু কোনও মতে দু’ গ্লাস জল যদি গিলে ফেলতে পারা যায় তবেই আরম্ভ হবে দাস্ত। দাস্ত শেষ হবাব সংগে সংগে রোগেরও শেষ হবে।
ভুলেও আমরা নদীর জলে মল-মুত্র ত্যাগ করি না। আমাদের দেশের পার্বত্য নদীর জল সেজন্যই পবিত্র এবং রোগের জীবাণু তাতে থাকতে পারে না। ইয়ালা গ্রামের পেছন দিয়ে যে নদী বয়ে যাচ্ছে তাতে রোগীরা মল-মূত্র ত্যাগ করে না। দরকার হলেই তারা নদীতীর বালিতে মল-মূত্র ত্যাগ করার পব নূতন বালি দিয়ে ঢেকে রেখে দেয়। দু’ ঘণ্টার মধ্যেই বালি, সকল রকমের জীবাণু নষ্ট করে ফেলে।
জানিনা বিদেশের লোক নদীর জল পবিত্র রাখার জন্য কতটুকু চেষ্টা করে! আমরা এত সাবধানে থাকা সত্ত্বেও আমাদের অসভ্য বলা হয়। দুঃখ নাই বন্ধু, আমাদের শক্তি হোক, তোমাদের মত একটু সভ্য হয়ে নেই তখন দেখবে আমাদের গুণগরিমা। তখন হয় ত বিদেশীরা তাদের কলমের গতি বদলাবে। তখন আফ্রিকার নিগ্রোদের গুণের কথা বলে বড় বড় বই লিখবে।
একবার আমাদের গ্রামে এক তুরুক জেনারেল এসেছিলেন। তাঁর চোখের তারা নীল ছিল, চুল ছিল লাল, শরীরের বর্ণ দুধের মত সাদা ছিল। আমি কিন্তু তাঁকে সুন্দর মানুষ বলতে পারি নি। সবটা শরীরই রুক্ষ। আমাদের শরীরে লাবণ্য আছে এমন কি আমাদের বৃদ্ধদের যদি ভাল করে স্নান করানো যায়, বৃদ্ধের শরীরেও কোমলতা বুঝতে পারা যায়। কিন্তু তুরুক লোকটির শরীরে কোমলতা ছিল না যেমন অন্যান্য শ্বেতকায় শরীরে কোমলতা থাকে না। তুরুক জেনারেল বলছিলেন, “যদি সৌন্দর্য দেখতে হয় তবে দেখা যায় কালো লোকের শরীরে।” গ্রামের লোককে লক্ষ্য করে বলছিলেন, “তোমরা যদি মাথার চুল ছোট করে কাট, ভাল পোশাক পর, তবে দেখবে তোমরাই সবচেয়ে সুন্দর মানুষ।”
তুরুক জেনারেলের প্রশংসা বাক্য শুনে অনেকেই মাথার চুল ছোট করে কেটেছিল। ঘর পরিষ্কার রাখার জন্য চেষ্টা করছিল। কয়েক দিনের মধ্যেই নিজের উদ্যমে টেবিল চেয়ার তৈরী করেছিল। বিছানা পাতবার জন্য খাট তৈরী করেছিল। গ্রামের অবস্থা পরিবর্তন হয়েছিল।
তোমাদের বোধ হয় জানা নাই, আমাদের দেশের শিক্ষা এবং স্বাস্থ্য কতকগুলি পাদরীর অধীনে পরিচালিত হয়। যে পাদরী আমাদের গ্রামের শিক্ষা এবং স্বাস্থ্যের পরিচালনা করতেন, তিনি আমাদের গ্রামে এসেই ভীষণ খাপ্পা হলেন। তিনি বললেন, “চেয়ার টেবিল, শুইবার খাট এ-সব হল বিদেশী সভ্যতা, তোমাদের নিজের কৃষ্টি রয়েছে, তোমাদের নিজের ভাষা রয়েছে, তোমরা আফ্রিকার প্রাচীন জাত, তোমরা কেন বিদেশী সভ্যতা অর্জন করবে? নিজের সভ্যতায় ফিরে যাও, টেবিল চেয়ার ভেঙে ফেল। শুইবার খাট বড়ই অপবিষ্কার জিনিস। খাটে শুলে আমাদেরই ঘুম হয় না, তোমরা শেষটায় খাটে শুয়ে না ঘুমিয়ে শরীর দুর্বল করে ফেলবে। তা হতে আমি দেব না, আজই খাট ভেঙে ফেল, পূর্বে যেমন করে মাটিতে উলংগ হয়ে শুতে তেমনি শুয়ে থাকবে। তাতে শরীর এবং মন ভাল থাকবে।”
পাদবী স্বাস্থ্য এবং শিক্ষা বিভাগের লোক, তাঁর কথা অমান্য করার কারো অধিকার ছিল না। কি আর করা যায়, উপায়ান্তর না দেখে চেয়াব টেবিল হতে আরম্ভ করে খাট পর্যন্ত ভেঙে ফেলা হয়েছিল। এর পর থেকে আর কেউ চেয়ার টেবিল তৈরী করে নি। ভালই হয়েছে। চেয়ার টেবিলের প্রতিও মায়া হয়, আমাদের ঘরে এমন কিছু নাই যার প্রতি আমাদের টান আছে। প্রকৃতপক্ষে আমরা গ্রামে বাস করেও আরবদের মত তাঁবুব বাসিন্দা।
আমরা তাঁবুর বাসিন্দা কেন বলছি, শুনে রাখা ভাল। মানুষের প্রতি সহানুভূতি আসে তখনই যখন মানুষ নিজের দুঃখের কথা অপরের কাছে বলতে পারে।
বর্তমানে আমরা যে গ্রামে বাস করছি সে গ্রামখানা হালে পত্তন করা হয়েছে। পূর্বে আমাদের গ্রাম অন্যত্র ছিল। পূর্বের গ্রাম বৃটিশ সরকার জোর করে কেড়ে নিয়ে একজন বৃটনকে স্বল্প মূল্যে বিক্রয় করেছেন। পূর্বের গ্রাম উচ্চভূমিতে ছিল। জ্বর অথবা পেটের অসুখ কারো হ’ত না। বর্তমানে নূতন গ্রামে অনেকের জ্বর হয়, পেটের অসুখ ত লেগেই আছে।
তাবুতে যারা বাস করে তাদের গ্রাম্য সুখ-দুঃখ নাই। আমরা নূতন গ্রাম করেছি, আবাদ করেছি আপ্রাণ পরিশ্রম করে হয়ত এক দিন সরকারী আদেশ হবে গ্রাম বিক্রি করতে হবে। রিজার্ভ শব্দটি উঠে গিয়ে কোনও শ্বেতকায় প্রভুর জমিদারীতে আমাদের গ্রাম অন্তর্ভুক্ত হবে। তখন আবার আমরা নূতন জায়গা খুঁজে নূতন করে গ্রাম পত্তন করতে বাধ্য হব। সেজন্যই গ্রামের প্রতি অন্তরেব দরদ কারো নাই।
গ্রামের লোকের কাছে একখানা ছেঁড়া কাপড়েরও মূল্য আছে, চেয়ার টেবিল ত মূল্যবান সম্পত্তি। আমাদের ঘরে ঘরে যদি বর্তমানে সেই সম্পত্তি থাকত তবে আজ আমরা বৃটিশের সংগে লড়াই করতে পারতাম না। পাদরীর কুবুদ্ধিপ্রসূত উপদেশ এখন আমাদের কাজে লেগেছে। কেনিয়া কলোনীতে যাদের বাড়িতেই চেয়ার টেবিল এবং খাট আছে তারা হল সবকারের “একান্ত বাধ্য” প্রজা। তাদের সংগে আমাদের সম্পর্ক নাই। বর্তমানে তারাই গ্রাম ছেড়ে শহরবাসী হয়েছে। গ্রামের লোকের সংগে সহযোগিতা করত না বলে গ্রামের লোক বিলাসী বিদেশী শাসকের গোযেন্দাদের গ্রাম ছাড়তে বাধ্য করেছে। অনেকগুলি গুজরাতী পুস্তকে পড়েছি এই ধরণের লোক নাকি ইণ্ডিয়াতে অনেক আছে এবং তাদের সহযোগিতার জন্যই বিপ্লবে বাধা পড়েছে।
বৃটিশ আমাদের গ্রামগুলিকে “নিগ্রো রিজার্ভ” বলে। সেখান থেকে কথিত “একান্ত বাধ্য” প্রজার উচ্ছেদ হয়েছে। তারা এখন শহরের পাশে স্থান পেয়েছে এবং তাদের প্রাণরক্ষার জন্য পুলিশ ফৌজ নিযুক্ত করা হয়েছে।
আমাদের অসুখ হলে ইংলিশ ডাক্তারের কাছে ঔষধের জন্য যাই না। এর অনেকগুলি কারণ আছে। ইংলিশ ডাক্তারের ঔষধ খেয়ে কম রোগী আরাম হতে দেখেছি। আমাদের ডাক্তারের ঔষধে কম রোগী মারা যায়। অনেকে বলে আমাদের ডাক্তার ভূতের পূজা করে। কথাটা একেবাবে মিথ্যা। আমাদের ডাক্তার যখনই কোন লতাপাতা সংগ্রহ করতে যান তখনই তিনি লতাপাতার কাছে বসে তাদের গুণাবলী বলতে থাকেন। যারা সেখানে উপস্থিত থাকে তারাই লতাপাতার গুণাবলী শুনতে পায়, এবং কোন্ লতার কি গুণ অনেকেই জানতে পারে, লতাটাকে চিনতেও পারে। পাতা অথবা শিকড় সংগ্রহের সময় একই নিয়ম প্রতিপালিত হয়। এতে লাভ হয় খুব বেশি। গ্রামে ডাক্তার না থাকলেও যে কেহ লতাপাতা সংগ্রহ করতে সক্ষম হয়।
রোগীকে যখন কোনও ঔষণ দেওয়া হয় তখন তার সামনে যে ঔষধ দেওয়া হয় তার গুণাবলী বলা হয়। তা দেখে বিদেশীরা মনে করে তন্ত্র মন্ত্র করা হচ্ছে। বিদেশীরা যা ইচ্ছা মনে করুক আমরা জানি আমাদের মধ্যে ভাওতা অথবা প্রতারণা নাই।
বিদেশীরা আমাদের সম্বন্ধে কিরূপ কুধারণা পোষণ করে তার একটি নমুনা দিচ্ছি। শুক্লপক্ষের রাতে আমরা সাধারণত কুণ্ডলী করে অনেক লোক বসি এবং আমাদের মধ্যে যে-কোনও লোকের, গ্রামের, দেশের অথবা বিদেশের গল্প করে সময় কাটাই। আমাদের একত্রে বসা দেখে একজন আরব গ্রাম ছেড়ে পালিয়ে যায় এবং শহরে যেয়ে একজন বৃটিশ অফিসারকে জানায় “কিকুউ উপজাতিকে ভূতের পূজা করতে সে দেখেছে।”
ভূত, প্রেত, জিন্ এই ধরণের শব্দ আমাদের ভাষায় নাই। এই ধরণের শব্দ রয়েছে আরবী ভাষায়। আরব জাতের প্রত্যেকটি নরনারী ভূতের ভয়ে ভীত। আরবদের মধ্যে একটি লোকও রাত্রে একাকী পথ চলতে পারে না। তাদের সামনে পেছনে, ডাইনে বামে সর্বত্র ভূত থাকে। আর আমরা গভীর রাতেও একাকী চলতে ভয় পাই না। ভূত আমাদের মনে অথবা ভাষাতে নাই।
একবার আমাদের দাদু এক পাদরীকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, “তোমরা ভূতের কথা প্রায়ই বলে থাক কিন্তু কখনও ভূত দেখেছ কি?”
পাদরী বলেছিলেন, তিনি ভূত দেখেন নি কিন্তু অনেকে দেখেছে।
বেশ ভাল কথা পাদরী, ভূত আছে স্বীকার করলাম, এখন বলত ভূত খায় কি এবং থাকে কোথায়?
পাদরী বলেছিলেন “ভূত খায় না এবং থাকে অন্ধকারে লুকিয়ে।”
আমাদেব দাদু বলেছিলেন, “বালুকণা কোথায় থাকে তাও তোমরা জান অথচ ভূত কোথায় থাকে জান না, সে কেমন কথা?”
পাদরী আমার দাদুর প্রশ্নের উত্তর দিতে পারেন নি। কিছু না বলেই চলে গিয়েছিলেন।
আমাদের মধ্যে বাহাদুবী করার নিয়ম নাই। পাদরী চলে যাবাব পর আমাদের দাদু পাদরীর সম্বন্ধে একটি কথাও বলেন নি। অথচ আরবেব বাড়িতে চাকরি করার সময় দেখেছি, যদি কোনও শ্বেতকায় আরবেব বাড়িতে আসতেন তবে আরব লোকটি মনে করত যেন তার পয়গম্বর এসেছেন। তারপর শ্বেতপ্রভু চলে যাবার পর ঘণ্টার পর ঘণ্টাব্যাপী শ্বেতপ্রভু কি বলছিলেন তাই নিয়ে আলাপ করত এবং শ্বেতপ্রভু আর কাহারও বাড়িতে না গিয়ে তার বাড়িতে গিয়েছিলেন তা নিয়েও অহংকার করত। ইণ্ডিয়ান্দেরও সেরূপ অহংকার করতে দেখেছি। শ্বেতকায়রা আরবদেব যেমন ঘৃণা করে তেমনি ঘৃণা করে ইণ্ডিয়ান্দের।