বিষয়বস্তুতে চলুন

মাউ মাউএর দেশে/৪

উইকিসংকলন থেকে

◄  
  ►

(৪)

 বন-জংগলের কথা পূর্বে কিছু বলেছি, এখন গভীর বনের কথা বলছি। গভীর বনের কথা শুনে ভয় পেয়ো না। আমরা মানুষ, আমাদের ভয় করার কিছুই নেই। শুনলে স্তম্ভিত হবে, যখন আরব এবং পর্তুগীজরা আমাদের দেশের লোককে দাস করার জন্য গ্রামে প্রবেশ করত, তখন খুব লড়াই হ’ত। আরব অথবা পর্তুগীজদের হাতে থাকত বন্দুক। তারা বন্দুকের সাহায্যে মানুষ শিকার করত। আমাদের পূর্বপুরুষরা তীর-ধনুর সাহায্যে আরবদের সংগে লড়াই করতেন। আরব অথবা পর্তুগীজরা আমাদের সংগে কিরূপ ব্যবহার করত তোমরা যদি লাল-বে-লালের গল্প শোন তবেই বুঝতে পারবে আরব কত দুর্দান্ত ছিল। এখানে লাল-বে-লালের গল্প বলে তোমাদের সময় নষ্ট করব না। লাল-বে-লালের গল্প আমরা শুনেছি, তাও বহু পুরাতন, আমার নূতন কথা শুনলেই তোমরা আনন্দ পাবে এবং সেই সংগে হয়ত তোমাদের কিছুটা রোমাঞ্চও হবে।

 আমাদের পূর্বপুরুষরা পরাজিত আরবদের গোলাম করতেন না, তাদের প্রতি অন্যায় ব্যবহারও করতেন না, তা বলে ছেড়েও দিতেন না। আরব এবং পর্তুগীজদের গ্রামে থাকতে দিতেন। ইচ্ছা করলে তারা বিয়ে করতে পারত, জমি তো প্রচুর ছিল। যাদের ইচ্ছা হ’ত তারা হাল চাষ করে জীবিকা অর্জন করত। সেরূপ আরব এবং পর্তুগীজদের আমরা আর গ্রামে থাকতে দেই না। তারা আমাদের বিপথগামী করে, বৃটিশ প্রভুর কাছে ধরিয়ে দিয়ে নানারূপ শাস্তির ব্যবস্থা করে। এখন আরব এবং পর্তুগীজরা শহরবাসী। আমরা শহরে থাকি না। ভালই হয়েছে, দুষ্ট লোকের সংগে না থাকাই ভাল।

 আমি বড়ই দুষ্ট ছেলে, সেজন্য গভীর জংগলে প্রবেশ করতে একটুও ভয় পাই নি। ভীতিবিহ্বলতার মধ্যেও আনন্দ আছে, সেই আনন্দে পশুভাব জাগে আর কখন জেগে ওঠে সাহসের ঔদার্য। গভীর বন কাকে বলে পূর্বে বলেছি তবুও আবার বলছি, গভীর বনে হিংস্র জীব দূরের কথা, সাপ পর্যন্ত থাকতে ভয় পায়। এরূপ কথা কি কখনও তোমরা শুনেছ? আমার ত মনে হয় না এরূপ কথা কেউ তোমাদের কাছে বলেছেন। আফ্রিকার ট্রপিকেল অঞ্চলে গভীর জংগলে যে সকল বৃক্ষ হয়, লতাপাতা হয়, তার প্রত্যেকটাতেই কাঁটা থাকে। সবচেয়ে বড় কাঁটা যে কয়টি আমি দেখেছি ইচ্ছা করলে তাতে ঝুলতে পারতাম, এবং সবচেয়ে ছোট কাঁটা, সব সময় চক্ষেও দেখা যায় না। গণ্ডার, হাতী, হরিণ, সিংহ এ-সব জীব গভীর জংগলের পাশ দিয়েও যায় না। ঝড় যখন বইতে থাকে তখন গাছে গাছে, ডালে ডালে ঘর্ষণ হয়, পাতা পড়ে, ডাল ভাঙে। যদি একটা ডাল একটা সাপের উপর পড়ে তবেই সাপের অস্তিত্ব আর থাকতে পারে না। প্রকৃতির কি সুন্দর নিয়ম! সাপও তার বিপদ কোথায় বুঝতে পারে। আমি কেন গভীর বনে প্রবেশ করেছিলাম সেকথা তোমরা নিশ্চয় জিজ্ঞাসা করবে? হাঁ সে কথাই বলছি, আরও বলছি কোথায় গভীর বন হতে পারে।

 লোকে বলে এশিয়া, ইউরোপ এবং আফ্রিকা এই তিনটায় মিলে হয়েছে পুরাতন মহাদ্বীপ। আমার মনে হয় আফ্রিকা পুরাতন নয়, নূতন। এখনও আফ্রিকা মহাদেশে নদীব সংখ্যা বেশি নেই। হয় ত একই সংগে তিনটা মহাদেশই সাগরের নীচ থেকে মাথা উঠিয়েছিল কিন্তু আমাদের দেশে কৃষিকার্য না হওয়ার জন্য এখনও দেশের পূর্বাবস্থাই রয়ে গেছে। যে সকল স্থান হতে ঝম্-ঝম্ করে জল নির্গত হয় এবং সাগরের দিকে চলে, আমাদের ভাষায় তাদের বলি খাড়ি। খাড়িব দু’দিকে গভীর জংগল হয়।

 যেখান থেকে আমি রওনা হয়েছিলাম সেটাই হ’ল খাঁটি কিকুউ অঞ্চল। কয়েক সপ্তাহ ভ্রমণ করার পর কিকুউ অঞ্চলের শেষ সীমায় পৌঁছি, তারপরই আরম্ভ হযেছিল মাসাই অঞ্চল। মাসাইদের আচার ব্যবহার আমাদের মত নয়। যদিও আমরা মাংস খাই, কিন্তু কোনও জীবের রক্ত খাই না। মাসাইরা গৃহপালিত পশুর রক্ত চুষে যায়। মাংস ত খায়ই, এর পরেও আমাদের সংগে তাদের পার্থক্য অনেক রয়েছে। আমরা ভুট্টার ছাতু সিদ্ধ করে খাই, তারা খায় জংলী আলু সিদ্ধ করে। আমরা সুযোগ পেলেই লেখাপড়া করি, মাসাইরা লেখাপড়া মোটেই করে না। একেবারে অবুঝ তারা, সেজন্য পল্টনী চাকরিতে তাদের নেওয়া হয় না। মাসাই অঞ্চলের কাছেই একটা খাড়ি। খাড়িতে প্রবেশ করতে মাসাইরা নিষেধ করেছিল। তারা বলেছিল, একটা সিংহ খাড়িতে প্রবেশ করে আর বের হতে পারছে না। সিংহটার করুণ ক্রন্দন প্রায়ই শোনা যায়। হয়ত কাছে মানুষ পেলেই আক্রমণ করবে। সিংহ যখন রাগে তখন তার মত নির্ভীকতা আর কোন পশুতে দেখা যায় না। সিংহের আক্রমণ সম্বন্ধে একটুও চিন্তিত না হয়ে নীচের দিকে নামতে আরম্ভ করলাম। কি ভীষণ সে বন! যেদিকে চোখ যায় সর্বত্রই অজগর বৃক্ষে পূর্ণ। অজগর বৃক্ষের কাঁটা বেশ বড় হয়। তাতে আমার ভয় ছিল না। অজগর বৃক্ষের কাঁটা বেয়ে অনেক উপরে উঠবার শক্তি আমার ছিল।

 প্রথমেই কতকগুলো গিনী ফাউলের দেখা পেলাম। চলন্ত জলে আনন্দে নেচে নেচে খেলা করছিল তারা। কখনও জল থেকে উঠে ঘাস খাচ্ছিল। গিনী ফাউল জল থেকে কোনরূপ খাদ্য কুড়িয়ে খায় না। গিনী ফাউল দেখাব জন্য একদিকে চুপ করে বসেছিলাম। কতক্ষণ বসে আছি, গিনী ফাউল দেখছি, হঠাৎ শুনতে পেলাম সিংহের গর্জন। জন্তুটা মহাবিপদে পড়েছে আর কি! যেদিক থেকে সিংহের গর্জনের আওয়াজ আসছিল সেদিকে রওনা হলাম। বেশি দূর যেতে হল না, দেখলাম সিংহটা তিনটা কাঁটাওয়ালা গাছের মধ্যে রয়েছে, একটুও নড়তে পারছে না। সিংহটা আমাকে দেখতে পেল। অন্য সময় হলে সিংহের ডাকের শব্দেই বন কাঁপত এবং চলা অথবা আক্রমণের দাপটে কে কোথায় পালাত তার ইয়ত্তা থাকত না। সিংহটা আমাকে দেখে অনেকটা
আফ্রিকার অজগর বৃক্ষ
আশ্বস্ত হ’ল—তার চাহনি দেখেই বুঝতে পারলাম। সিংহটা যে দিক দিয়ে আটক হয়েছিল সেদিকে না যেয়ে পেছন দিক দিয়ে যেয়ে কতকগুলো কাঁটা কেটে ফেললাম। সিংহটা পেছন দিকে হটতেছিল, ভাবছিল পেছন দিকে হটলে মুক্ত হবে, কিন্তু জানত না পেছন দিকে আরও বিপদ। একটু পেছন দিকে হটে আসায় আমার বেশ সুবিধা হ’ল। সিংহের থাবাব বাইরে থেকে সামনের কাঁটাগুলো কেটে দিয়েই একটা গাছের পেছনে দাঁড়ালাম। সিংহটার বেবিয়ে যাবার সুযোগ করে দিয়েছিলাম। হাজার হোক পশু ত, ভাবছিল যত পেছনে যাবে ততই মুক্ত হবে, কিন্তু তার পেছনে বড় বড় কাঁটা ছিল। একটা কাঁটা সিংহটার পেছনে লাগা মাত্র সামনে এগিয়ে গেল। তারপর সিংহকে আর পায় কে? এক লাফে নদীতে ঝাঁপ দিল। নদীর জল সিংহটাকে অনেক দূর টেনে নিয়ে গেল বটে, কিন্তু সিংহটা মরল না।

 তোমরা ত শুনেছ আফ্রিকার গভীর জংগল শুধু হিংস্র জীবে ভর্তি, তা কিন্তু সত্য নয়। যে সকল স্থানে হিংস্র জীব থাকে সেই স্থানগুলোব কথা পূর্বে বলেছি, এখন গভীর বনে আমি কি করছিলাম তাই বলছি।

 সিংহটাকে মুক্ত করে দিয়ে বেশ আনন্দ পেয়েছিলাম। আনন্দ হবার কথাই, আমাদের কাছে বিড়াল, চিতাবাঘ এবং সিংহ একই শ্রেণীর প্রাণী। সিংহের বাচ্চা নিয়ে ছোটবেলায় অনেক খেলা করেছি। নাইরোবির কাছে অনেক সিংহ দেখতে পাওয়া যায়। আমাদের লোক সিংহের বাচ্চা চুরি করে আনতে জানে, কিন্তু সে কাজটি এখন আর কেউ করে না। আমরা অনেক সভ্য হয়েছি, সেরূপ দুষ্ট কাজ করব কেন? দেখা গেছে বিড়াল-ছানা, চিতাবাঘের বাচ্চা অথবা সিংহের বাচ্চা চুরি করে এনে যদি ফিরিয়ে দেওয়া যায়, তবে সেই বাচ্চাকে বিড়াল, চিতাবাঘ অথবা সিংহ মাই খেতে ত দেয়ই না, উপরন্তু মেরে ফেলে। সিংহের বাচ্চা পোষা বড়ই কষ্টকর, সেজন্য বর্তমানে কেউ সিংহের বাচ্চা চুরি করে না। বৃটিশ প্রভুরা অনেক সময় সিংহের বাচ্চা চুরি করে আনতে বলেন। আমরা এনে দেই কিন্তু ফিরিয়ে নেই না।

 সিংহেব বাচ্চা ফিরিয়ে না নিলে শ্বেতকায় প্রভুরা বিষ খাইয়ে তাদের হত্যা করেন। আমরা সেরূপ বিষ পাই না। আমরা অনেক বিষ পাই যার প্রভাব অল্প সময়ে মানুষের শরীরেই কাজ করে না, সেই বিষ দিয়ে পালিত পশু হত্যা করা বর্বরতা ছাড়া আর কি হতে পারে?

 হাঁটতে হাঁটতে অনেক দূরে চলে গিয়েছিলাম। হঠাৎ লোকালয় দেখতে পেয়ে চমকে উঠলাম। এই সকল স্থানে লোকালয় কি করে হ’ল? সাহস করে লোকালয়ে গেলাম। দেখলাম, কয়েকজন শ্বেতকায় প্রভু বন্দুক নিয়ে বসে আছেন কিসের সন্ধানে। আমাকে দেখামাত্র একজন শ্বেতকায় প্রভু জিজ্ঞাসা করলেন, “এদিকে কি করে এলে?”

 আমি বললাম “প্রভু, এদিক দিয়েই আমার মামার বাড়ি যেতে হয়। আমি চলেছি এন্‌টেবীর দিকে, আব কয়েক দিন হাঁটলেই ভিক্টোরিয়া হ্রদের দেখা পাব। সেখানে হ্রদের তীর ধরে দু’দিন হাঁটলেই আমার মামার বাড়ি।”

 “হুঁ। বুঝতে পেরেছি, থাক্‌তে চাস্ ত থাক্‌তে পাবিস্, কাজ করতে হবে, মাইনে পাবি না, থাক্‌বি কি?”

 “না হুজুব, আজই মাত্র থাক্‌ব, কাল সকালে বওনা হ’ব। শুনতে পাচ্ছি মামার বাড়িতে কেউ নেই, সবাই চলে গেছেন বিদেশে। মামী বড়ই কষ্টে আছেন, আর কিছু না পারি কয়েকটা মাছ ধরে দিয়ে আসব।”

 শ্বেতকায় প্রভু কথা না বলে জংগলের দিকে তাকিয়ে বইলেন। কতক্ষণ পর গুডুম গুডুম্ করে ফায়ার করলেন। যেদিকে গুলি ছুঁড়লেন সেদিকে কিন্তু কোন সাড়া-শব্দ পাওয়া গেল না। আমি জানতাম না, কি লক্ষ্য করে শ্বেতকায় প্রভু ফায়ার করেছেন। শ্বেতকায় প্রভু হয়ত মনে করেছিলেন তাঁর লক্ষ্য ভ্রষ্ট হয়েছে। কতক্ষণ পরে দেখা গেল একটি সিংহ জলে হাবুডুবু খাচ্ছে—এটি সেই সিংহ যাকে আমি মুক্ত করেছিলাম। সিংহটার প্রতি আমার দয়া হয়েছিল। দেখলাম সিংহটা মাঝে মাঝে জলে তলিয়ে যাচ্ছে। কালবিলম্ব না করে আমার তীর-ধনু এবং অন্যান্য সব-কিছু রেখে জলে ঝাঁপিয়ে পড়লাম। বেশ সাঁতার জানতাম, সেজন্য সিংহটার পেছনের পা ধরে তীরে পৌঁছতে বেশি দেরী হ’ল না। সিংহটার মাথায় গুলি লেগেছিল। জলের ভেতর থেকে সিংহটাকে উপরে উঠাতে বেশ বেগ পেতে হয়েছিল। সিংহটাকে তীরে উঠাবার পর শ্বেত প্রভুরা তাড়াতাড়ি করে এলেন। প্রথম ফটো তারপর উপরে উঠিয়ে আবার ফটো নিলেন। দ্বিতীয় বারে যখন ফটো তোলা হয় তখন আমি ছিলাম না। সিংহটার প্রতি আমার দয়া হয়েছিল একথা পূর্বেই বলেছি, সেজন্য দ্বিতীয় বারের ফটো তোলার সময় দূরে দাঁড়িয়েছিলাম।

 শ্বেত প্রভুদের সেদিন কত আনন্দ! গভীর বন থেকে সিংহ শিকাব করতে সমর্থ হয়েছেন, সেটা ‘বেকর্ড’ বই আর কিছু হতে পারে না! বিদেশের লোক আফ্রিকার গভীর বনে সিংহের কথাই শুনে বেশি তার একটি অপূর্ব প্রমাণ দেখাবার সুযোগ তাদের হয়ে গেল। বিদেশীরা আমাদের দেশে না আসুক সেরূপ ইচ্ছা আমাদের নাই। চীনারা আমাদের দেশে এসেছে, আমাদের সংগে থাকে এবং আমাদের যাতে উন্নতি হয় তারও চেষ্টা করে। চীনা, জাপানী, শিক্ষিত ইণ্ডিয়ান্ এবং অন্যান্য শিক্ষিত লোক যাতে আমাদের দেশে না আসে সেজন্য বৃটিশ সরকার নানা রকমের মিথ্যা সমাচার বিদেশে প্রচার করেন। তার দৃষ্টান্ত সাপ্তাহিক গুজরাতী বম্বে সমাচারে প্রায়ই আমি পড়েছি। অবাক হযেছি মিথ্যা প্রচারের বহর দেখে। এখানে একটি দৃষ্টান্ত দিলে ভাল হবে।

 নাইরোবী শহরে আমি ছিলাম এবং সেখানকার বাসিন্দাদের সংগে পরিচিত না হই অন্তত তাদের দৈনন্দিন কাজের সংগে পরিচিত ছিলাম। হঠাৎ একদিন বাজারে গিয়ে শুনলাম গরুর মাংস বিষাক্ত, কেউ যেন গরুর মাংস না কিনে। নাইরোবীতে গরুর মাংস শুধু পোষা কুকুরের খাদ্যের জন্যই কেনা হয়। আরবেব বাড়িতে একটা কুকুর ছিল; তার জন্য দু’ পাউণ্ড গরুর মাংস রোজ কিনতে হত। গরুর মাংস না পেয়ে অন্য মাংস কিনেছিলাম।

 সন্ধ্যার পর আরব প্রভু তাঁর বন্ধুদের কাছে গল্প করছিলেন। তিনি বলছিলেন, কেনিয়ার দক্ষিণ অঞ্চলে মাসাই (এক রকমের নিগ্রো) বাস করে, তাদের বেঁচে থাকার একমাত্র উপায় গরু। মাসাই কোনও কাজ কবে না, দই, দুধ এবং গোমাংস খেয়েই জীবন ধারণ করে। এদের কাজে লাগাবাব জন্য অনেক চেষ্টা করা হয়েছে কিন্তু কিছুতেই তারা কাজ করবে না। অবশেষে আইন অনুযায়ী গরুর ডাক্তার পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং গোপনে বলা হয়েছে গরুর ডাক্তারেরা যেন মাসাইদের গরু রোগাক্রান্ত হয়েছে বাহানা করে গরুর বংশ নিপাত করে। মোম্বাসা, দার-এ-সেলাম প্রভৃতি বন্দর হতে যেন কোনও সমুদ্রগামী জাহাজ গোমাংস না ক্রয় করে তারও ব্যবস্থা হয়েছিল। বন্দরে বন্দরে প্রচার করা হয়েছিল কেনিয়ার গো-জাতি রোগাক্রান্ত, কেউ যেন গোমাংস না কিনে।

 এদিকে গরুর ডাক্তার গো-হত্যা আরম্ভ করেছে দেখে মাসাইরা মহাত্মা গান্ধীর প্রচলিত অহিংস মতে এক নূতন পথ অবলম্বন করেছে। তারা গরুর পাল ঘেরাও করে বসে আছে। গরুর ডাক্তারকে বলে দিয়েছে যে পর্যন্ত তাদের হত্যা না করা হবে সে পর্যন্ত তাদের গরুর কাছেও কেউ যেতে পারবে না।

 মাসাইদের শত্রু নাই। আমরা কখনও তাদের ঘৃণা করি না অথবা তাদের সর্বনাশ চিন্তা করি না। কিংস্ রাইফেল সৈন্যদলে হয় বাগাণ্ডা নয় কিকুউ জাতের লোক কাজ করে, তারা পরিষ্কার করে সরকারকে জানিয়ে দিয়েছে যে তারা মাসাইদের গুলি করবে না।

 এর পরেই আরব প্রভু বললেন, “এবাব হয়ত আমাদের ডাকা হবে, যদি ডাকা হয় তবে যাব বই কি? অনেকগুলো কাফ্রি হত্যার সুযোগ পাওয়া যাবে।” কিন্তু আরব প্রভুর যাওয়া হয় নি, বৃটিশ প্রভুদের কি সুবুদ্ধি হযেছিল যাতে গরুর ডাক্তারদের ফিরিয়ে আনা হয়।

 অথচ প্রচার করা হয়েছিল কেনিয়ার সব গরুই বিষাক্ত রোগে আক্রান্ত হয়েছে। ভেবে দেখো যারা এরূপভাবে মিথ্যা প্রচার করতে পারে তারা মানুষের শত্রু কি মিত্র?

 সিংহটাকে আমি যে মুক্ত করেছিলাম সেই কথা শ্বেত প্রভুদের বললাম না; কি জানি রাগ করে যদি আমাকেও সিংহের মতই হত্যা করে ফেলেন। তারা আমাকে রাত্রে থাকতে এবং খেতে দিয়েছিলেন। পরদিন সকালে সকলের কাছে বিদায় নিয়ে স্থান ত্যাগ করেছিলাম। শ্বেত প্রভুরা অনেক সময় একের জিনিস অন্যে চুরি করেন এবং আমাদের উপর দোষ চাপিয়ে দেন। সেরূপ যাতে কিছু না ঘটে সেজন্য প্রকাশ্য দিবালোকে বিদায় নিয়েছিলাম। দিনটা ছিল বড়ই সুন্দব, চলতে বেশ আরাম লাগছিল। পথ চলার সময় সিংহটার কথা অনেকক্ষণ ভেবেছিলাম।

 শ্বেত প্রভুদের কেম্প্ হতে একটু দূরেই দেখা হ’ল একজন মাসাইয়ের সংগে। লোকটাকে উলংগ বললেও চলে। আবল-তাবল বকছিল। আমার মনে হয় ইংরেজীতে কথা বলছিল। তার পায়ে কিন্তু একজোড়া ইংলিশ জুতা ছিল। লোকটার পাগলামীতে একটুও ভীত না হয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, “মুসাই, কথা বলতে পাবি কি?” আমাদের নিয়ম হ’ল তাই, কোন অপরিচিত লোকের সংগে কথা বলতে হলে আদেশ নিতে হয়।

 লোকটা বললে, “হাঁ, কথা বলতে পার, কিন্তু বাজে কথা নয়, একেবারে কাজের কথা।” কাজেব কথা কি আর বলি। পথ চলেছি, পথের সন্ধান ছাড়া জিজ্ঞেস করার কিছুই ছিল না। তবুও সাহসের উপর নির্ভর করে বললাম, “আপনি যেদিক দিয়ে এসেছেন সেদিকের ঘাসেও বোধ হয় কাঁটা আছে, খালি পায়ে যেতে পারব কি?

 —হাঁ, পারবি, চলে যা। কাউকে বলিস্ না, একটা উলংগ লোক দেখেছিস্ যার পায়ে ইংলিশ জুতা রয়েছে, মনে থাকবে ত?

 —মনে থাকবে মুসাই, এখন যাই?

 —যাস্ নে একটু দাঁড়া, এদিকে কযেকটা শ্বেতকায় দেখেছিস?

 —দেখেছি।

 —তারা কি করছে?

 —কেম্প্ করেছে, বেশ আনন্দ করছে। আপনি বোধ হয় তাদের জানেন।

 —জানি নিশ্চয়ই, তারাই আমাকে উলংগ করে বিদায় দিয়েছে। এদিকে কতদূর গেলে গ্রাম পাব বলতে পারিস্?

 —তা বলতে পারি না, তবে গ্রাম কাছেই, দেখছেন ও নদীটা ক্রমশ বড় হয়েছে।

 —তুই সেদিকে যাচ্ছিস্ নাকি?

 —হাঁ।

 “তোর সংগেই যাব।” লোকটা আমার সংগ নিল। সূর্য যখন ঠিক মাথার উপর, তখন আমরা এক মাসাই গ্রামের কাছে পৌঁছলাম। লোকটা বললে, “যা ত একখানা চামড়া নিয়ে আয়, উলংগ হয়ে ত গ্রামে যাওযা যায় না।”

 “এদিকের লোক প্রায়ই উলংগ থাকে। মুসাই, চলুন আমার সংগে, এক টুক্‌রা কেন একটা বড় চামড়া দিতে পারব, হয়ত সূতার কাপড়ও পাওয়া যেতে পারে।” লোকটা চল্‌ল আমার সংগে, কিন্তু খুবই সংকোচ বোধ করছিল। গ্রামের মধ্যে মাত্র পাঁচ-ছ’টি পরিবার বাস করে। প্রায় সকলেই বাইরে চলে গিয়েছিল। শুধু কয়েক জন বৃদ্ধ এবং বৃদ্ধা শিশুদের রক্ষণাবেক্ষণ করেছিলেন। একজন বৃদ্ধার কাছে একখানা চামড়া চাওয়ামাত্র তিনি একখানা জাপানী লুংগি দিলেন। লোকটা লুংগি পরল, তারপব আবার বিড়বিড় করে কি বলতে লাগল। তাকে জিজ্ঞাসা করলাম, “আপনি কি বলছেন?” লোকটা মাথা চাপড়িয়ে বললে, “আমি সভ্য হয়েছিলাম, সেজন্য এখানে থাকতে ইচ্ছা হচ্ছে না। হয় ন্যাসালেণ্ড, নয় ত উত্তর রোডেসিয়াতে যেতে হবেই। বলত সেখানে যাবাব কি কোনও উপায় নেই?”

 একজন বৃদ্ধের কাছে ন্যাসালেণ্ডের পথ জিজ্ঞাসা করতেই তিনি বললেন, “এই যে নদীটা বয়ে যাচ্ছে, তার বাঁ তীর দিয়ে একটা একপেয়ে পথ আছে। সেই পথ ধরে চলবে তিন দিন। সামনেই দেখতে পাবে একটি হাতীব চিরবিশ্রামেব স্থান। সেখানে কোনও উৎপাত করবে না, এমন কি রাতও কাটাবে না। তারপর যাবে আরও দু’দিন। তৃতীয় দিন সন্ধ্যার সময় তোমরা ভিক্টোবিয়া হ্রদের সীমান্তে পৌঁছবে। সামনেই একটা জলাভূমি দেখতে পাবে। সেখানে অনেক লোক মাছ ধরতে যায়। যদি তোমরা জেলেদের সাহায্য কর, তবে অন্ন-বস্ত্রেব অভাব হবে না।”

 অন্ন-বস্ত্রেব কথা হ’ল কথাব কথা, এই প্রকারের বাজে কথা বলাব আমার প্রবৃত্তি হ’ত না। বৃদ্ধকে রাগালাম না। আমার ইচ্ছা হ’ল যেখানে হাতী মরে সেই জায়গাটা দেখতে দোষ কি? অপরিচিত লোকটাকে বললাম, “আমিও সেদিকে যাচ্ছি, আপনার যদি ইচ্ছা হয় ত আমার সংগে যেতে পারেন।” দ্বিরুক্তি না করে লোকটি আমার সংগে চলল। আমরা বৃদ্ধের বর্ণিত পথ ধরলাম। পথে খাদ্যের অভাব ছিল না। এদিকে ওরেঞ্জ বৃক্ষ প্রচুর ছিল। তৃষ্ণা হলেই ওরেঞ্জ পেড়ে খেতাম। ক্ষুধা পেলেই আম কুড়িয়ে পেট ভরে খেয়ে পথ চলতাম। এদিকের আম বড়ই মিষ্টি, একটুও টক নেই, অথচ গাছ থেকে পড়ে পচে, খাবার লোক নেই। রাত্রে ছোট্ট একটি আগুন জ্বালিয়ে শুয়ে থাকতাম, বন্য জীবের দেখাও পাওয়া যেত না।

 আমাদের ভ্রমণ বেশ ভালই হয়েছিল। হাতী মরার স্থানটা দেখার বড় ইচ্ছা ছিল, সংগের লোকটিকে বললাম, “কাছেই হাতী মরার স্থান, চলুন দেখে আসি।” যদিও লোকটার যাবার ইচ্ছা ছিল না, তবুও আমার অনুরোধ রক্ষা করল। আমরা একপেয়ে পথ ছেড়ে ডাইনের দিকে
আমি এবং ইংরেজী বাক্যবাগীশ বন্ধু
চলতে থাকলাম। একটু দূরে যেয়েই দেখি নদী বেশ প্রশস্ত হয়েছে; জলের সংগে কাদা মিশে ঘোলাটে জল নীচের দিকে চলেছে। বেশি দূবে নয়, একশ’ হাত দূরে একটা হাতী মরে পড়েছিল, আরও একটু দূরে আর একটা হাতী মর মর অবস্থায়—মরতে পারলেই যেন বাঁচে। হাতীটা একটুও নড়ছিল না। কতক্ষণ পরে শুধু শুঁড়টা উপরের দিকে উঠিয়ে দিচ্ছিল। হাতী মরার করুণ দৃশ্য দেখতে ভাল লাগছিল না। এটা ভাল করে বুঝলাম, যেখানে হাতীটা দাঁড়িয়েছিল তার আশেপাশে কোন পোকা ছিল না। আমাদের দেশে এক রকম উদ্ভিদ আছে, যার পাশ দিয়েও কোন পোকা যায় না। পাতায় বসা মাত্রই পোকা মরে যায়। হাতী মরার স্থানের সবদিকে সেরূপ উদ্ভিদ অফুরন্ত রয়েছে দেখতে পেয়ে হাতীর বুদ্ধির প্রশংসা করেছিলাম।

 সংগের লোকটা কিন্তু এই বিষয় নিয়ে একটুও মাথা ঘামাত না। তার মুখে একটি কথা লেগেই ছিল, সেই কথাটি ‘ননসেন্স’। তার কথা তার মুখেই ছিল, এর কি মানে হয় জেনে লাভ কি? বৃদ্ধের কথিত নির্ধারিত দিনে আমরা জেলেদের সন্ধান পেয়েছিলাম। জেলেরা অপরিচিত লোকটাকে একটা শার্ট এবং পেণ্ট দিয়েছিল। আমি কিন্তু এদের সাহায্য গ্রহণ না করেই গন্তব্য স্থানের দিকে রওনা হয়েছিলাম।

 এদিকের লোক ভাত খায়। ভাত খাওয়া অভ্যাস না থাকায় অনেকেই আমাকে রুটি খেতে দিত। রুটিও আমার ভাল লাগত না, অবশেষে উপায়ান্তর না দেখে নিজেই ভুট্টার ছাতু লেই করে খেতে আরম্ভ কবলাম। আমার গন্তব্য স্থান এখনও অনেক দূবে।

 ভুট্টার লেই খাওয়া সর্বত্র হয়ে উঠত না, সেজন্য ভাত এবং রুটি খেতে অভ্যাস করতে আরম্ভ করলাম। এদিকের বাসিন্দা প্রায়ই মাসাই। মাসাইদের মোটেই ভাল লাগত না। এরা ভুলেও চুল কাটত না। চুল যতই লম্বা হতে থাকে ততই মাথায় এক রকম ছাই মাখিয়ে মাথাতে একটা ছাতা গড়ে তুলে। ছাতাটা বেশ ভারি হয়। উকুন হয় না মোটেই, তবে মাথায় জল দেবার উপায় থাকে না।

 একদিন এক মাসাইএর বাড়িতে অতিথি হলাম। লোকটা বেশ আদর করে থাকতে দিলে। তার মাত্র একখানা ঘর। স্ত্রী এবং ছেলেমেয়ে নিয়ে বাস করে। লোকটার স্ত্রীর মাথায় মস্ত বড় একটা চুলের ছাতা। আমার মাথায় চুল নাই দেখে মাসাই স্ত্রীলোকটি জিজ্ঞাসা কবলে, “তুমি চুল কেটে ফেলে দিয়েছ তাতে কি মাথা ঠিক থাকে?”

 রমণীর কথায় জবাব না দিয়ে তাকে জিজ্ঞাসা করলাম, “তোমরা মাথায় চুল রেখে কেমন থাক?”

 স্ত্রীলোকটি বললে, “বৃষ্টিতে বাইরে যাওয়া কষ্টকর ব্যাপার। একবার চুলের ছাতাটা জলে ভিজে গেলে অন্তত সাত দিন যায় শুকাতে। তোমার কাটা চুল দেখে আমারও ইচ্ছা হয় চুলগুলি ছোট করে কেটে ফেলতে।”

 —ইচ্ছা হয় ত কেটে ফেল, আমি কেটে দিতে পারি, আমার সংগে একখানা কাঁচি রাখি।

 স্ত্রীলোকটি অনেকক্ষণ কি ভাবল, তারপর বললে, “আচ্ছা আমার মাথাটা পরিষ্কার কর তারপর অন্যদের কথা।”

 স্ত্রীলোকটির চুল কাটতে অন্তত এক ঘণ্টা সময় লেগেছিল। আশ্চর্যের বিষয় একটিও উকুন দেখতে পাই নি। মাথাটা পরিষ্কার করে দেবার পর স্ত্রীলোকটি নিকটস্থ নদীতে স্নান করতে গেল।

 স্ত্রীলোকটির স্বামী বললে, সেও চুল কাটবে। আমি তাকে বললাম, “তোমার স্ত্রী আসুন, তারপর তাঁর আদেশমত কাজ করব।” নিগ্রো সমাজে পুরুষের আদেশ চলে বাইরে, ঘরোয়া ব্যাপারে স্ত্রীলোকের আদেশই মানতে হয়। অনেকক্ষণ পরে মহিলাটি ঘরে ফিরে এলেন এবং বললেন, “আমার ঘরের সকলের মাথার চুল কেটে ফেল।”

 বিনা বাক্যব্যয়ে চুল কাটতে আরম্ভ করলাম। গৃহিণী বলতেছিলেন, “জীবনে আজই স্নান করে আরাম পেয়েছি। হয় ত বেশ ভাল ঘুমও হবে।”

 কাচ্চা-বাচ্চা সকলের চুল কাটতে সন্ধ্যা হয়ে গেল। সকলেই নদীতে স্নান করতে গেলাম। গৃহিণী তখন রুটি তৈরী করতে ব্যস্ত ছিলেন।

 স্নান করে ঘরে ফিরে গৃহিণীর কদর্য হাত দুটোর দিকে তাকাতে ইচ্ছা হচ্ছিল না। কতকগুলি ভুট্টার চূর্ণ চেয়ে নিয়ে চূর্ণগুলি জলের সঙ্গে একখানা চামচের সাহায্যে মিশিয়ে নিয়ে উনুনে বসিয়ে দিলাম। কতক্ষণ পরেই জলাক্ত চূর্ণ নাড়তে থাকলাম। কয়েক মিনিটের মধ্যে চূর্ণ লেই-এ পরিণত হল, সুন্দর গন্ধ বের হতে আরম্ভ হল। গৃহিণী দেখলেন এত অল্প সময়ে, এত পরিষ্কার করে এক অপরূপ খাদ্য তৈরী করেছে বিদেশী। সকলেই আমার তৈরী লেই একটু একটু করে খেল এবং বললে বেশ ভাল খাদ্য ত; কাল সকালে আমরাও লেই খাব। এদের লেই খাওয়া দেখরার জন্য আমিও থেকে গেলাম। পরের দিন যখন গৃহিণী লেই তৈরী করতেছিলেন তখন লেই-এ নুন, মাংস এবং কলা ফেলে দিতে বললাম। আমার আদেশ অনুযায়ী লেই হল। এদের ঘরে মাত্র একখানা চামচ ছিল। যাতে প্রত্যেকে চামচ ব্যবহার করতে পারে সেজন্য প্রত্যেকের জন্য চামচ তৈরী কবে দিলাম।

 সকাল থেকেই লেই খাওয়া আবম্ভ হ’ল। শিশুরা যখনই খেতে চাইছিল তখনই হাঁড়ি হতে বড় চামচ দিয়ে কিছুটা লেই একটা প্লেটে ঢেলে আপন মনে নিজ নিজ চামচ দিয়ে খেয়ে প্লেট ও চামচ ধুয়ে রেখে বাইরে চলে যাচ্ছিল। লেইএর স্বাদ বুঝতে পেরেছে বুঝতে পেরে হাঁড়ি এবং প্লেট রাখবাব জন্য একটি কাঠের মাচা তৈরী করে দিলাম। গৃহিণীর কাজ অনেক কমে যাওয়াতে এবং স্নান করে আরাম বোধ করাতে তিনি এতই আনন্দিত হয়েছিলেন যে নিকটস্থ পরিবারের সংগে আমাকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন এবং সেই পরিবাবেরও পরিবর্তন যাতে হয় আমাকে সেজন্য অনুরোধ করেছিলেন।

 নিকটস্থ পরিবার এক মাইল দূরে বাস করত। তাদের বাড়িতে শিশুর সংখ্যা খুবই কম। মাত্র দু’টি। প্রকৃতপক্ষে তিনটি পরিবার একই ঘরে থাকত। এদের শিশুর সংখ্যা কম কেন জানতে ইচ্ছা হল।

 একজন গৃহিণী বললেন, তাঁর সন্তান বাঁচে না। শিশুর জন্ম হবাব পরই কি এক রোগ হয় এবং শিশু মারা যায়। দ্বিতীয় স্ত্রীলোকটিব সন্তান হয় না।

 কথা প্রসংগে জিজ্ঞাসা করে জানলাম উভয় মহিলা পূর্বে মোয়াঞ্জা নামক শহরে ভারতীয় ব্যবসায়ীদেব বাড়িতে কাজ করতেন। বিষয় জানতে পেরেই জিজ্ঞাসা করলাম তাদের “শহুরে রোগে” পায় নি ত?

 উভয়েই স্বীকার করলেন তাদের শহুরে রোগ হয়েছিল। শহুরে রোগ তাদের মধ্যে ছিল না। বিদেশী বলতে আরবদেরই বুঝায় বেশি। এর পরেই পর্তুগীজ, বর্তমানে ইণ্ডিয়ান্ এবং বৃটন। এদের কাছ থেকেই শহুরে রোগ এঁরা পেয়েছিলেন।

 বিদেশী বোগ নিবারণের ঔষধ আমার জানা ছিল। যে-কোনও রকমের বিদেশী রোগ হোক সেই ঔষধে সম্পূর্ণ রকমে আরোগ্য হয়। দু’জন স্ত্রীলোককে নিয়ে ঔষধের অন্বেষণে বের হলাম। প্রথম দিন ঔষধ পাওয়া গেল না, দ্বিতীয় দিন আমরা একটি ঝরনার কাছে যেয়ে ঔষধ পেলাম। এক রকমের পাতা হ’ল এর ঔষধ। পাতা ছিঁড়বার পূর্বে পাতাকে লক্ষ্য করে কি বলছিলাম শোন:—

“হে পাতা, মহা পাতা, ক্ষতরোগনাশিনী
‘বিদেশী রোগের’ যম তুমি, বহু ক্ষমতাধাবিণী
খসখসে পাতা তুমি, কাজল হল তোমার রূপ,
দুর্গন্ধরূপ গন্ধে তুমি

নাশ তুমি
সকল অন্তর বাইরের কুরূপ।
তোমাকে ধন্য, তোমাকে ধন্য
নিচ্ছি তোমায় আমার বোনের জন্য
তুমি নাশো যত বিদেশী কামরূপ।”

 উল্লিখিত কথা বলে দু’টি পাতা উঠিয়ে দু’জনকে খেতে দিলাম। উভয়ে পাতা খেলেন। দুর্গন্ধে তাদের মুখ ভরে গেল। মুখ ধুতে নিষেধ করলাম। কতক্ষণ পরেই তাদের মুখের দুর্গন্ধ চলে গেল। জিহ্বা পরিষ্কার হল। বাড়িতে পৌঁছে বল্‌লাম, “আপনারা ঘরের বাইরে নিভৃত স্থানে বসে থাকুন। সন্ধ্যার পূর্বে ঘরে ফিরে আসবেন।”

 মাসাই জাত অতি সহজে বিদেশীদের প্রলোভনে ভুলে যায়। কিকুউ স্ত্রীলোক সহজে গ্রাম ছেড়ে শহরে যায় না। আমাদেব জাতের স্ত্রীলোক বিদেশীকে বিশ্বাস করে না। তারা জানে “শহুরে বোগ” কত বিপজ্জনক। অবশ্য আমাদের বৃদ্ধেরা শহরে রোগ আরাম করার ঔষধ বিশেষভাবেই জানেন। বান্তুরা শহুরে রোগে আক্রান্ত হয়ে অসময়ে মরে, সে কথা কে না জানে?

 নূতন পরিবারে মোট পনের দিন ছিলাম। পনের দিনের মধ্যে একটি গৃহপালিত জীব হত্যা করতে দেই নি। মাসাইরা গরু পালন করতে বড়ই ওস্তাদ কিন্তু তারা যে নিয়মে জীব হত্যা করে, আমরা সে নিয়মকে কঠোর এবং নিষ্ঠুর নিয়ম মনে করি। কোনও জীবেব গলা কাটা আমরা পছন্দ করি না। যে-কোন জীবকে আমরা এক আঘাতে হত্যা করি।

 আমার প্রতি সন্তুষ্ট হয়ে মাসাই পরিবার একটি জীব হত্যা করতে চেয়েছিল কিন্তু যখন শুন্‌তে পেল গলা-কাটা জীবের মাংস আমি খাই না, তখন মাসাই লোকটি আমাকে খৃস্টান মনে করেছিল। মাসাইদের মধ্যে যারা একটু সভ্য হয়েছে তারা সকলেই খৃস্টধর্ম অবলম্বন করেছে। খৃস্টানেরা কোনও জীবের গলা কাটে না, এক আঘাতে হত্যা করে। মাসাইদের মধ্যে যাদের কোনও ধর্মের প্রচলন নাই তারা প্রত্যেক জীবেব গলা কেটে হত্যা করে। এই পবিবারেরও কোনও ধর্ম ছিল না।

 পূর্বে আমাদের মধ্যেও অনেক খৃস্টান এবং মুসলমান ছিল। এরা আমাদের কাছ থেকে পৃথক হতে চলছিল। তাদের মন বিদেশী বিষে জর্জরিত হয়েছিল। তাদের ছেলেমেয়ে আমাদের কাছ থেকে পৃথক থাকতে চেষ্টা করত। বিদেশী বিষে দুষ্ট লোক আরব অথবা বৃটিশ হতে বিশেষ সুযোগ-সুবিধা পেত না। আরবগণ কখনও আমাদের দেশের মুসলমানদের সংগে একত্রে নামাজ করত না, বিদেশী পাদরীরা কখনও আমাদের দেশের খৃস্টানদের গীর্জায় উপাসনা করত না। তারা আমাদের লোককে উপাসনা করিয়ে দিত মাত্র। নিজেদের উপাসনা শহরে যেয়ে তাদের গীর্জায় করত। আমরা যখন গ্রামে গ্রামে বিদ্যালয় খুলতেছিলাম তখন প্রত্যেক গ্রামবাসীকে বিদেশী পয়গম্বর এবং তাদের উপদেশপূর্ণ পুস্তক বর্জন করার জন্য অনুরোধ করা হচ্ছিল। গ্রামবাসী একটুও প্রতিবাদ না করে বিদেশী আচার-ব্যবহার পরিত্যাগ করেছিল। আমাদের মধ্যে বিদেশীরা যে বিভেদ আনতে আরম্ভ করেছিল তার ধ্বংস প্রথম আঘাতেই হয়েছিল। এখন আমরা বিদেশী পয়গম্বরের প্রভাব হতে মুক্ত হয়েছি। তবে আমরা এশিয়াবাসীর সংস্কৃতি গ্রহণ করব না এটা ঠিক, আমরা গ্রহণ করব ইউবোপীয়ান্ সংস্কৃতি সেই সংগে যোগ দেব আমাদের সংস্কৃতি।

 আমাকে কি খাইয়ে সন্তুষ্ট করবে মাসাই পবিবাব কিছুই ঠিক করতে পারছিল না। এদের এরূপ অবস্থা হতে মুক্ত করার জন্য আমিই প্রস্তাব কবলাম দু’টি বন মোরগ ধরে আনতে। এদিকে বন মোরগের সংখ্যা খুবই বেশি। পেঁপে ত সর্বত্র পাওয়া যায়। অর্ধ পাকা পেঁপে, বন মোরগের মাংস এবং ভুট্টার ছাতু একত্রে সিদ্ধ করে উপাদেয় খাদ্য হয়। এরূপ উপাদেয় খাদ্য তৈরী করতে মাসাই পরিবাবের কেউ জানত না। আমার আদেশমত বন মোরগ বান্না হবার সময় থেকে অনেকের ক্ষুধা হয়েছিল, তাদের মুখের অবস্থা দেখেই বুঝতে পেরেছিলাম। রান্না হয়ে গেলে সবাই পেট ভরে খেল এবং সকলে এক বাক্যে বললে, এরূপ খাদ্য কখনও খায় নি। ভবিষ্যতে এই পরিবারের লোক আমার বর্ণিত পদ্ধতিমতেই রান্না করবে আশ্বাস দিয়েছিল। নূতন পদ্ধতিতে রান্না করতে সময় কম লাগবে এবং শরীরের শক্তিও বর্ধিত হবে বুঝিয়ে দিয়েছিলাম।

 নূতন পরিবারে পনর দিন থেকে পুনরায় ইন্‌টারীর দিকে রওনা হলাম। আমার ইচ্ছা ছিল না ইন্‌টারী যাই, কিসুমু যেতে পারলেই ভিক্টোরিয়া হ্রদের ওপারে যেতে পারব সে ধারণা আমার ছিল। কিসুমু আরও অনেক দূরে। পার্বত্য পথের ভেতর দিয়েই যেতে হবে। পার্বত্য পথ, বলতে বিদেশীরা কি মনে করে বলতে পারি না তবে এই পর্যন্ত বলতে পারি, আমি যে পার্বত্য পথ বলছি তার সংগে তুলনা দেবার যদি কিছু থাকে তবে এই পার্বত্য পথই তুলনা করা যেতে পারে।

 পাঁচ হাজার ফুট উচ্চ মালভূমি হতে ঝিরঝিরে বয়ে যাওযা একটি নালা দেখতে পেয়ে তাই অনুসরণ করে চললাম। নালাটির ডান দিকে একটি একপেয়ে পথ ছিল এবং সেই পথ ধরে চলতে হচ্ছিল। তোমাদের জানা উচিত এদিকের গভীর বনের বৃক্ষরাজিতে কাঁটা ছিল না। পূর্বে যত বন-জংগলের কথা বলেছি সর্বত্র কাঁটার কথাই বলেছি বেশি করে। এদিকে যেমন কণ্টকাকীর্ণ বন-জংগল নাই তেমনি হিংস্র জন্তুর সংখ্যাও কম। বানর, টিয়াপাখী এবং অন্যান্য পাখীর সংখ্যাই বেশি দেখতে পেয়েছিলাম।

 খরগোশ অথবা বন মোরগের সংখ্যাও কম। হাতী, মহিষ এবং বন গরুর সংখ্যাই বেশি দেখেছি। প্রকৃতপক্ষে আমার সাহস, আমার বুদ্ধি এবং শক্তির পরিচয় এই জংলী পথেই পেয়েছিলাম। এড্‌ভেন্‌চার বলতে যা বুঝা যায় এই জংলী পথেই অনুভব করেছিলাম। এড্‌ভেন্‌চারের গালগল্প অনেক শুনেছ কিন্তু বল ত পথে যদি জংলী মহিষ দেখতে পাও এবং মহিষও যদি দেখতে পায় তবে কি করবে? তোমরা বলবে গাছে উঠে প্রাণ বাঁচাবে, মহিষ তত সহজ জীব নয়। গাছে উঠে প্রাণ বাঁচানো যায় না।

 আমিও মহিষ দেখেই গাছে উঠেছিলাম। মহিষের পালে একটি অথবা দশটি মহিষ ছিল না। একশ’ মহিষের বেশি ছিল। মহিষগুলো যখন দেখলে আমি গাছে উঠেছি তখন তারা গাছটার গোড়ায় আড্ডা করল। তাদের ধারণা ছিল গাছ থেকে নামতে হবেই এবং গাছ থেকে নামলেই মেরে ফেলবে। মহিষের ভাবগতিক দেখে বুঝতে পেরেছিলাম, প্রাণ বাঁচাতে হলে বুদ্ধি খাটাতে হবে।

 গাছের ডাল ভেঙে মহিষের উপর ছুঁড়ে মারতেছিলাম এতে মহিষগুলো একটুও নড়েনি অথবা ছুঁড়ে ফেলা গাছের ডালের প্রতি একটুও আক্রোশ দেখায় নি। উপায়ান্তর না দেখে এক গাছ হতে অন্য গাছে যাচ্ছিলাম এবং লক্ষ্য করছিলাম মহিষগুলোর লক্ষ্য কোন্ দিকে? দূর থেকে অন্যান্য গাছের উপর বসেই লক্ষ্য করছিলাম মহিষগুলো সেই গাছটার নীচেই বসে বয়েছে। গাছ থেকে নামলেই আক্রমণ করবে। একটি গাছ হতে অন্য গাছে যেয়ে নালা অতিক্রম করতে পেরেছিলাম। নালার ওপার থেকেও দেখছিলাম মহিষগুলো গাছের নীচেই বসে রয়েছে।

 এই অঞ্চলে খাদ্যের জন্য বিশেষ চিন্তা করতে হ’ত না। আলু জাতীয় এক রকমের মূল পাওয়া যায়। মূলগুলি আগুনে পুড়লে খেতে আলুর মতই লাগে। খেতে রুটি হতে অনেক ভাল। শ্বেত প্রভুরাও রুটি খায়, সে রুটি কাগজে মোড়া থাকে, বেশ সুগন্ধ বের হয়, কিন্তু কোথায় তৈরী করে কে জানে? আমরা যখন লেই রান্না করি তখন হাঁড়িতে হাত লাগাতে হয় না।

 আজ তোমাদের কাছে গল্প বলছি বলেই নানা জাতের লোকের খাদ্য নিয়ে সমালোচনা করছি কিন্তু একাকী গভীর বন দিয়ে পথ চলার সময় এই সব বাজে কথা মোটেই মনে হত না। প্রাণ বাঁচিয়ে গন্তব্য স্থানে পৌঁছতে পারলেই জীবনের এক কষ্টকর অধ্যায শেষ হয়েছে মনে করতে পারতাম।

 আর একটি কথা বলতে ভুলে গিয়েছিলাম। অতি পরিশ্রমে যখন চোখ বুজে আসত তখন চোখ বুজতে ভয় হত। কি জানি যদি ব্য জানোয়ার ঘুমন্ত অবস্থায় আক্রমণ করে এবং আমার জীবনের আলো চিরতরে নিবিয়ে দেয়।

 অনেকে বলে, মরণের ভয় তাদের নাই। জানি না যারা এরূপ কথা বলে তাদের কথা কতটুকু সত্য, আমার কিন্তু মরণের ভয় ছিল এমন কি মরণভয়ের আতংক সব সময়ই থাকত।

 বনে প্রবেশ করে দুঃখিত হয়েছিলাম। আমার তীর-ধনু, আমার লম্বা দা এই সব যেন কোনও কাজের বস্তু নয়। মহিষ আক্রমণ করেছিল, একটি তীরও অপব্যয় করিনি। তীবের সংখ্যা মাত্র কুড়িটি। যদি তীরগুলো নষ্ট করে ফেলি তবে কি করে আত্মরক্ষা করব—এই ছিল ভয়। লম্বা দা কোমরে ঝুলান থাকত বটে কিন্তু বন্য জীবকে আক্রমণ করার মত সাহস আমার ছিল না।

 রাত্রে মস্ত বড় একটা আগুন জ্বালিয়ে তারই কাছে বসে থাকতাম। অতি কষ্টে চোখ দুটোকে বুজতে দিতাম না, কিন্তু কখন যে আগুনের কাছে শুয়ে থাকতাম বুঝতেও পারতাম না। ঘুম যখন ভাঙত তখন হঠাৎ উঠে দাঁড়াতাম। ঘুমোবার পূর্বে যে ভয়গুলি আমাকে আতংকগ্রস্ত করত, সেই ভয়গুলি নূতন করে দেখা দিত। বেঁচে আছি সেজন্য কাউকে ধন্যবাদ দিতে হ’ত না, পাশের আগুন আর আমার শরীরের শক্তিকে ধন্যবাদ দিয়ে কি লাভ হবে? আগুন এবং শরীরের শক্তি ধন্যবাদের প্রত্যাশী নয়। আগুনের নাম করে আগুনকে মন্দ বল, আগুন উত্তর দেবে না। শরীরের শক্তিকে প্রশংসা কর, শরীরের শক্তি শরীরের ভেতরেই থাকে, বলবার ক্ষমতা নাই তার।

 তিন দিন চলার পর একটি গ্রামে পৌঁছলাম। গ্রামের বাসিন্দা মাত্র তিনটি পরিবার তারা জাতে বান্তু। দক্ষিণ আফ্রিকার জার্মানদের দ্বারা অত্যাচারিত হয়ে পায়ে হেঁটে সবটা পথ অতিক্রম করে এই গভীর জংগলে ডেরা করেছে। এরা ডাচ ও ইংলিশ বলতে পারত এবং বেশ শিক্ষিতও ছিল।

 আমাকে পেয়ে তাদের কি আনন্দ! তাদের আনন্দের কথা বলবার পূর্বে আমার কি আনন্দ হয়েছিল তাই বলছি। গভীর জংগলের মধ্য দিয়ে নদী কলকল করে বয়ে যাচ্ছিল, নদীর উত্তর তীরে সুন্দর বৃক্ষবাড়ি দাঁড়িয়েছিল। দক্ষিণ তীরে তিনখানা চার-চালা ঘর, একটু দূরে দূবে অবস্থিত ছিল। তিনখানা ঘরের সামনে মস্ত বড় পরিষ্কার জায়গা। ঘরের পেছন দিকটাও পরিষ্কার। সূর্য পশ্চিমদিকে চলে গিয়েছিল, তবুও প্রখর সূর্যকিরণ তিনখানা ঘরকেই আলোকিত করছিল। ঘরের সামনে কয়েকটি শিশু খেলা করছিল। তাদের প্রত্যেকের হাতেই বড় বড় ডাণ্ডা। ডাণ্ডা দিয়ে ছেলেমেয়েরা মাটিতে আঘাত করছিল। এরূপভাবে আঘাত করতে কোনও নিগ্রো শিশুকে দেখতে পাই নি।

 পূর্বদিকে একটি প্রকাণ্ড বাগিচা। বাগিচায় অনেক রকমের ফলের গাছ। ফলবৃক্ষের নীচে সাপে যাতে বাসা না করতে পারে সেজন্য বিশেষ দৃষ্টি রাখা হয়েছিল।

 প্রত্যেক ঘর দু’ ভাগে বিভক্ত। একদিকে শুয়ে থাকবার জায়গা অন্যদিকে বসবার। বনের কাঠ দিয়ে চেয়ার টেবিল তৈরী হয়েছিল। প্রত্যেকটি জিনিস পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। এক কথায় বলছি, যেন কোনও শ্বেতকায়ের বাসস্থান।

 এই অঞ্চলে বকুল ফুলের গাছ প্রায়ই দেখা যায়। বকুল ফুলের সুগন্ধ সকলেই পছন্দ করে, উপরন্তু বকুলের গোটা ছেলেমেয়েরা আনন্দ করে খায়। বকুল গাছের ছায়া যেমন শীতল তেমনি নিরাপদ। সাপ অথবা কাঠবিড়াল আড্ডা জমাতে পারে না। এদের বাড়ির সামনে নদীতীরে কয়েকটি বকুল গাছ ছিল। নদীতীরে একটিও বড় বৃক্ষ ছিল না। ঘাস গজিয়েছিল, তাও পরিষ্কার করে কেটে রাখা হয়েছিল। ছোট্ট সাপ পর্যন্ত লুকিয়ে থাকার উপায় ছিল না।

 তিন পরিবার সমবেতভাবে একখানা অতিথিশালা গড়েছিলেন। আমাকে অতিথিশালা দেখিয়ে বললেন, “আপনি এখানে থাকবেন। আজ আমাদের পরিশ্রম সার্থক হল। আজ পর্যন্ত কোনও অতিথি আমাদের বাড়িতে আসেন নি। এসেছিল পুলিশ। পুলিশ যদিও নিজের জাত তবুও তারা পর হয়েছে, তাদের আমরা অতিথি বলতে পারি না।”

 অতিথির ঘর দেখিয়ে আমাকে মল-মূত্র ত্যাগের জায়গা দেখিয়ে দিলেন। নদীতে মল-মূত্র ত্যাগের নিয়ম নাই। সে জায়গাটাও বেশ পরিষ্কার ছিল। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা সর্বত্র বিরাজ করছিল। পার্বত্য জাতির মধ্যে মল-মূত্র পরিত্যাগের জায়গা নির্ধারিত থাকে না কিন্তু এই গ্রামে তার ব্যবস্থা দেখে অবাক হয়েছিলাম। অনেক কিকুউ এবং অন্যান্য উপজাতির গ্রাম ভ্রমণ করেছিলাম, কোথাও এরূপ ব্যবস্থা দেখতে পাই নি। তারপর গ্রামের পেছন দিকটাতে যেখানে পাহাড় আরম্ভ হয়েছে সেখানেও বনের পশু লুকিয়ে থাকার উপায় ছিল না। বন-জংগল কেটে তাতে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হযেছিল।

 এঁরা কাঠ-কয়লা ব্যবহার করতে শিখেছেন। এঁদের ঘরের মধ্যে কাঠ-কয়লার অভাব ছিল না। এত কাঠ থাকতে কাঠ-কয়লা কেন ব্যবহার করা হয় জানতে ইচ্ছা হয়েছিল কিন্তু জানবার পুর্বেই দেখলাম কাঠ-কয়লা জ্বালিয়ে জল সিদ্ধ করা হচ্ছে। গরম জলেব প্রাচুর্য এঁদের মধ্যে অত্যধিক। গরম জল দিয়ে হাত-পা ধুয়া, মুখ ধুয়া এবং কুলকুচি করা এঁদের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। গরম জল ব্যবহার করা বেল্‌জিয়ান্‌দের কাছ থেকে এঁরা শিখেছেন বলছিলেন এবং গরম জলের কত উপকার তাও বলছিলেন।

 এত গভীর বনে পুলিশ আসার কারণ জেনে রাখা ভাল। আমাদের দেশে প্রত্যেক সক্ষম ব্যক্তির দশ শিলিং করে জিজিয়া কর (পোল্ টেক্স) দিতে হয়। এই তিনটি পরিবাবের সক্ষম ব্যক্তি কে কে জানবার জন্য বৎসরে একবার করে পুলিশ আসে। মিথ্যা অথবা প্রবঞ্চনা এঁদের মধ্যে নাই; সেজন্য সক্ষম ব্যক্তিদের শুধু নাম লিখিয়ে দিয়েই পুলিশকে বিদায় দিতেন না, হিসাব করে পোল্ টেক্সও দিয়ে দিতেন।

 পোল্ টেক্স এবং বস্ত্র যোগাড় করতেই এই তিন পরিবারের লোক হয়রাণ হয়ে পড়তেন। এঁরা কেহই পশুচর্ম ব্যবহার করেন না। সকলেই বস্ত্র ব্যবহার করেন। স্ত্রীলোকের বস্ত্রের জন্য বিশেষ বেগ পেতে হয় না কিন্তু পুরুষদের ট্রাউজার কিনতেই বিপদগ্রস্ত হতে হয় তাঁদের। একটি ট্রাউজাবের দাম সাড়ে বার শিলিং, পরিবারের মধ্যে কয়েক জন পুরুষ ছিলেন। অনেকেই হাফ পেণ্ট পরে লজ্জা নিবারণ করছিলেন। এদিকে রাত্রে বেশ ঠাণ্ডা লাগে এবং বিছানার দরকার বিশেষভাবে অনুভূত হয়। তুলা নিজেদের বাগানে হয়। তুলার বালিশ, তুলার তোষক এবং লেপ প্রত্যেকের ঘরেই ছিল। একখানা তাঁতও তাঁদের ছিল। তাতে পালা করে কাজ চলত। তাঁতের কাজ দিনরাত চলছিল। এতে সুবিধা হচ্ছিল বেশি। রাত্রে বন্য জীব এ তাঁত-চালকের দৃষ্টি এড়াতে পারত না। বস্ত্র এবং সুতা যা উৎপাদন হ’ত তাতে তিন পরিবারের কোন রকমে চলে যেত, বিক্রি করার মত হ’ত না সেজন্য তাঁরা দুঃখিত ছিলেন না।

 বান্তুরা বড়ই দূরদৃষ্টিপবায়ণ এবং লোককে উপদেশ দেবার জন্য সর্বদাই প্রস্তুত। এই তিনটি পরিবারের ইতিহাস অতীব মর্মন্তুদ এবং তাঁদের দুঃখের কাহিনী বলাই যেন তাঁদের একমাত্র কাজ।

 পশ্চিমের পর্তুগীজ অধিকারে এই তিনটি পরিবার বাস করতেন। নিজের চেষ্টায় পরিবারের স্ত্রী-পুরুষ সকলেই লেখাপড়া শিখেন এবং পর্তুগীজদের কাছে থাকায় সভ্যতার আলো পান। পর্তুগীজ পশ্চিম আফ্রিকাতে বেগার খাটানোর নিয়ম ছিল এবং এখনও আছে। বেগার খাটা হতে বেহাই পাবার জন্য এই তিনটি পরিবার দক্ষিণ-পশ্চিম আফ্রিকাতে চলে আসেন। সেখানেও তাঁদের প্রতি বুয়র দস্যুরা আক্রমণ চালায়। বুয়রদের অত্যাচার হতে মুক্ত হবার জন্য পুনরায় নূতন বাসস্থানের অন্বেষণে বের হয়ে কেনিয়ার শেষ সীমান্তে গভীর বনে আশ্রয় নিয়েছেন। যারা আইন অমান্য করে না বৃটিশ প্রভুরা তাদের উপর অত্যাচার করেন না। এখানে আসার পর বৃটিশের আইনমতে প্রত্যেক পরিবার হতে বৎসরে প্রায় চল্লিশ শিলিং করে দিতে হয়, কিন্তু চল্লিশ শিলিং রোজগার করার মত একটিমাত্র উপায় ছিল। গভীর বন হতে হাতীর হাড় এবং শিং সংগ্রহ করে ওজন দরে বাজারে বিক্রি করার পর যা পেতেন তাই পোল্ টেক্স দিয়ে আসতে হত। পোল্ টেক্সের জন্য অর্থ সংগ্রহ করতে যে ঝুঁকি তাঁদের নিতে হ’ত সেই ঝুঁকি ছাড়া আর কোনও কষ্ট ছিল না।

 এঁদের বাড়িতে সাত দিন ছিলাম। আমি কিসুমু যাচ্ছি শুনে গ্রামের একজন লোক কিসুমু যেতে ইচ্ছা প্রকাশ করলেন এবং বললেন, কিসুমু যাবার পথ তাঁর জানা আছে, পথে বিপদের সম্ভাবনা খুবই কম।