মাউ মাউএর দেশে/৫
(৫)
এবার আমরা দু’জনে চলতে আরম্ভ করেছি। চলার পথ খুবই সোজা, উৎরাই আব চড়াই। উৎরাই চড়াই করা আমাদের বেশ অভ্যাস ছিল সেজন্য চিন্তা করতে হচ্ছিল না একটুও। পথে দু’টি শ্বেতকায় গ্রামের পাশ দিয়ে যাওয়া বিপজ্জনক ছিল। কালো লোক দেখলেই মোটর চাপা দিয়ে নরহত্যা করার প্রবৃত্তি তাদের জেগে উঠে। এই দু’টি গ্রাম বুয়রদের। বুয়র দক্ষিণ আফ্রিকার বাসিন্দা শ্বেতকায় জাতি। এদের বর্তমান রাষ্ট্রনায়ক মিস্টার মালান। তাঁর প্রতি আমরা বড়ই কৃতজ্ঞ। পূর্বে কোনও নিগ্রো শ্বেতকায়ের পাশ দিয়ে যেতেও ভয় পেত। মিস্টার মালান চাইছিলেন, দক্ষিণ আফ্রিকার জুলুদের দিয়ে সেখানকার ভাবতবাসীদের অত্যাচার করাবেন। জুলুরা নাটালের ভাবতবাসীকে অত্যাচার করেছিল। যখন তারা ভারতবাসীর প্রতি অত্যাচার করছিল তখন কয়েক জন শ্বেতকায়ও আক্রান্ত হয়েছিলেন এবং মরেছিলেন। তখন থেকে আমাদের জাতের লোকের মন থেকে শ্বেতকায় ভীতি অপসৃত হয়। এর পরই আমাদের জাত সর্বপ্রথম শ্বেতকায়দের বিরুদ্ধাচরণ করতে আবন্ত করে। দক্ষিণ আফ্রিকার জুলুরা যদি ভারতবাসীর বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ না করত তবে মাউ মাউ মোভমেণ্ট হ’ত কি না সন্দেহ। বহু পূর্বে সেই দেশের বুয়রগণ সোনার খনির অন্বেষণে এসেছিল, কিছু সোনা পেয়েছিল। তাবপর সোনার খনির কাজ ছেড়ে আবাদ করতে আরম্ভ করেছে। খামারে কাজ করা কঠোর কাজ নয় কিন্তু এদের ব্যবহার নিন্দনীয় এবং ঘৃণ্য। এরা কালো লোককে মানুষ বলেই গণ্য করে না।
তোমরা শুনলে অবাক হবে, ভুলক্রমে যদি কোনও ইণ্ডিয়ান এই দু’টি গ্রামের পাশ দিয়ে যেত, তবে তাকে ধরে নিয়ে জমিতে পশুব মত খাটাত। যখন দেখত ইণ্ডিয়ান্ লোকটা চলতেও অক্ষম তখন তাকে হত্যা করত। আমরা নিগ্রো, আমাদের প্রতি এরা কি ব্যবহার করবে না বলাই ভাল।
আমাদের ভাষায় প্রবাদ আছে রৌদ্র হতে ধূলিকণার উত্তাপ বেশি, আরব হতে আরব-ভাবাপন্ন নিগ্রোদের ব্যবহার অসহ্য। এদিকের ইংলিশ অথবা জার্মানদের অত্যাচার হতে অন্যান্য ইউরোপীয় জাতের অত্যাচার অত্যধিক। বুয়র জাত দক্ষিণ আফ্রিকা হতে কেনিয়ার যে-কোনও জায়গায় বসবাস করতে আরম্ভ করেছে, সেই জায়গার পাশ দিয়েও নিগ্রোরা চলাফেরা করতে পারে না। আমরা উভয় গ্রাম পাশ কাটিয়ে চলে যেতে বাধ্য হয়েছিলাম।
দুই দিন চলার পরই আমরা একটি বনে প্রবেশ করলাম। বন বেশি বড় নয় তবে বনের বৃক্ষরাজি খুবই উচ্চ এবং দিবাভাগেও সূর্যালোকের অভাব ছিল। আমার সাথী ভূতের উপাসক এবং ভূত এতই ভয় করতেন যে ভূতের কথা মনে হলেই তিনি মাটিতে বসে ভূতের উদ্দেশ্যে মাথা নত না করে উঠতেন না। বলতে পারি না কি কারণে আমাদের মধ্যে ভূতের পূজাও নাই, উপদ্রবও নাই। পূর্বেও ছিল না, বর্তমানেও নাই।
আমার বন্ধু হঠাৎ থেমে গেলেন। একরূপ কেঁদে ফেলে বললেন, “ঐ যে সামনে ভূত দাঁড়িয়ে আছে, দেখতে পাচ্ছেন না?”
তর্ক করার সময় ছিল না, শুধু বল্লাম, “ভূত হত্যা করার কৌশল আমার দাদুর কাছ থেকে শিখেছি, আমাকে শুধু ভূতটাকে দেখিয়ে দিন।” ভূত হত্যা করব শুনে তিনি আমাকে ভূত দেখাতে রাজি হলেন না। তখন আমি সাথীকে ধমক দিয়ে বললাম, “আপনারা আমার কাছে দেশান্তর যাবার যে সকল গল্প বলেছেন সবই মিথ্যা বলে মনে হচ্ছে।”
সাথী মাথা নত রেখেই বললেন, “দেশ হতে দেশান্তরে আমি যাই নি, আমরা হলাম মাসাই। বান্তুদেব সংগে এখানে মিলিত হয়েছি। ঐ যে যুবতীকে দেখছেন তার সংগে আমার বিয়ে হবে। যুবতীর জন্য কিছু বস্ত্র এবং গহনা যোগাড় করার অপেক্ষায় আছি।”
মাসাইদের মোটেই পছন্দ করতাম না, এদের মধ্যে যত কুসংস্কার আছে অন্য কোন নিগ্রোদের মধ্যে তেমন কুসংস্কার নাই। মাসাইদের মধ্যে খৃস্টান এবং মুসলমান অনেক আছে। ভূতের ভয় হতে রক্ষা পাবার জন্য কেউ ক্রস গলায় বেঁধেছে আবার কেউ তাবিজ গলায় ধারণ করেছে। চিতাবাঘের দাঁত, এক টুক্রা লৌহ এবং একটা পাথর সংগের লোকটার গলায় বাঁধা ছিল। কতক্ষণ পরে তিনি মাথা উঠিয়ে বলেন, “ভূত চলে গেছে, এবাব পথ চলতে কষ্ট হবে না।”
সন্ধ্যার পূর্বেই আমরা এক নিগ্রো গ্রামে পৌঁছলাম। গ্রামে অনেক জাতের লোক বাস করে। উগাণ্ডা, বাগাণ্ডা, কিকুউ, মাসাই, বান্তু, জুলু এবং আরও অনেক জাতের লোক। সকলের ভাষাই সোহেলী। উপভাষা যাদের মধ্যে যা ছিল প্রায় লোপ পেয়েছিল। এই গ্রামের লোক সকলেই মৎস্যজীবী। প্রত্যেকেই বস্ত্র ব্যবহার করে। প্রত্যেক পরিবারের একখানা করে ঘর আছে। নবাগতদের জন্য অতিথিশালা ছিল না। নবাগত ব্যক্তিরা গ্রামের পরিত্যক্ত গৃহে থাকেন। গ্রামে কযেকখানা পরিত্যক্ত ঘর ছিল।
গ্রামের সবগুলি ঘবই মেটে ঘর। একখানা ঘরও ছোট নয়। প্রত্যেকটা ঘরের চাল চারটা এবং খড় দিয়ে ছাওয়া। এরা সকলেই আমাদের মত লেই খায়। এদেশে যব পিশে যেমন চূর্ণ করা হয় তেমনি মাটির নীচের নানা প্রকারের শিখর চূর্ণ করেও লেই তৈরী করা হয়। এখানে মাছেরও প্রচলন আছে। মাছ ভাজা করে সকলেই খায়। মাছ খাওয়া মোটেই ভাল লাগত না, সেজন্য লেই খাবাব আয়োজন করতে বাধ্য হয়েছিলাম।
গ্রামেব লোকের মুখে হাসি লেগেই ছিল যেন তাদেব অভাব ছিল না, সকলেই যেন সসম্মানে বাস করছিলেন, অসুখ-বিসুখ যেন কারো ছিল না। এই গ্রামে আসার পর আমারও মনের পরিবর্তন হয়েছিল যেদিন ![]()
সিনেমার জন্য ছবি তোলা হচ্ছে। গ্রামে পৌঁছেছিলাম সেই রাত্রেই এক সিনেমা কোম্পানী ফটো উঠাতে এসেছিল। গ্রামের লোক প্রায় সকলেই জংলী পোষাক পরেছিল। অনেকে মুখে চুণকালি লাগিয়েছিল, গরু এবং মহিষের শিং দিয়ে মাথার টুপি করেছিল। অনেকে দাঁতে লাল কালি লাগিয়ে এসেছিল। যেন এই মাত্র রক্ত খেয়েছে। কালো চামড়ার উপর লাল রং বেশ ভাল করে ফুটে উঠে না, সেজন্য চূণের কাছে অথবা চুণের উপর লাল রং ঢেলে দিলে বীভৎসতা ফুটে উঠে ভাল করে। তারা তাই করছিল।
এরূপ করে সাজবার পর সকলে গেল একটা ময়দানে। ময়দানের চারদিকে বড় বড় গাছ। কোনও গাছে মাটি দিয়ে সাপ তৈবী করে রাখা হয়েছিল। মাটির বাঘেরও অভাব ছিল না। আমাদের দেশে চিতাবাঘ ছাড়া অন্য কোনও রকমের বাঘ নাই, তবুও মাটিব বাঘ বনের মধ্যে রাখা হয়েছিল যেন আক্রমণ করবে একটু পরেই। তারপর ছিল সিংহ এবং হাতী। সবই মাটির।
আমার জাত-ভাইরা মাঠের মাঝখানে সারি বেঁধে দাঁড়াল, তারপর আরম্ভ করলে জুলু ধরণে হুংকার দিতে, সেও এক বীভৎস চীৎকার। অনেকটা মহিষের চীৎকারের মত, স্বর অনেকটা মুখের মধ্যেই থেকে যায়। কতক্ষণ পরে এলেন দু’জন শ্বেতকায়। তাঁদের হাতে বড় বড় কেমেরা ছিল।
নরপশুরা এতক্ষণ চীৎকার করাতেই পরিশ্রান্ত হয়েছিল। নুতন করে চীৎকার করতে সকলে পারল না। এর পরই আরম্ভ হল দুই দলে দাংগা। সত্যিকারের দাংগা নয়। যখন দাংগা হচ্ছিল তখন কেমেরা চালক ফটো তুলতেছিল। ফটো তোলা হয়ে গেলে প্রত্যেককে দু’শিলিং দিয়ে বিদায় করা হয়েছিল। আমার সাথী ওদের সংগে গিয়েছিল। তার দু’শিলিং পাওয়াকে ঘৃণার চক্ষেই দেখতেছিলাম। আমার মনে হয় না, কিকুউদের মধ্যে এমন লোক আছে যারা দু’শিলিং নিয়ে শ্বেতকায়দের আদেশ অনুযায়ী এই ধরণের জাতিদ্রোহী কাজ করবে।
সাথীকে জিজ্ঞাসা করলাম, “দু’শিলিং দিয়ে কি করবেন?”
—ঠিক বলেছেন সাথী, দু’শিলিং দিয়ে কি হবে জানতে চেয়েছেন, এই ত? পারতপক্ষে দু’শিলিং খরচ করব না, ইচ্ছা আছে ভিক্টোরিয়া হ্রদে মাছ ধরে মাছ বিক্রি করব এবং পোল্ টেক্স যাতে যোগাড় হয় তারই চেষ্টা করব। সেই সংগে দু’শিলিং যোগ দিলে দশ শিলিং হতে কতক্ষণ?
সাথীর কথা শুনে দুঃখ হয়েছিল। বৃটিশ, ইণ্ডিয়ান্, আরব এবং অন্যান্য বিদেশীরাও পোল্ টেক্স দেয়। তাদের আয় করার পথ বয়েছে, আমাদের সেই পথ একেবারেই বন্ধ, সেজন্যই আমরা সামান্য অর্থের জন্য কাতর হয়ে পড়ি। বন্ধুকে মনের কথা বললাম না, কিসুমু যাওয়াই লক্ষ্য। শুনলাম পরের দিন রাত্রে পুনবায় ছবি উঠানো হবে। কি ছবি এবং কেমন করে ছবি উঠানো হয় দেখবার জন্য থেকে গেলাম।
সন্ধ্যা হয়ে গেছে। গ্রামের লোক সবাই নিজ নিজ ঘরে শুয়েছে। এটা হল প্রথম চিত্র। তারপর কয়েকখানা ঘরের দরজা খুলে কয়েকটা লোক বেরিয়ে এল। এদের প্রত্যেকের হাতেই ছোরা। ছোরা নিয়ে তারা চলল গ্রামের বাইরে একটা জংগলে। সেখানে একজন শ্বেতকায়কে পূর্বেই দড়ি দিয়ে গাছের সংগে বেঁধে রাখা হয়েছিল। আসলে শ্বেতকায় লোকটি মানুষ ছিল না। রবারের প্রতিমূর্তি মাত্র। কিন্তু কাছে যেয়েও মনে হয় না এটা প্রতিমূর্তি।
এই লোকগুলি সেখানে যেয়েই শ্বেতকায়ের প্রতিমূর্তিটাকে একটা বড় দা দিয়ে এক কোপে কেটে ফেললে। মাথাটা জোড়া দেওয়া ছিল। জোড়া দেওয়া স্থানে আঘাত করা মাত্র মাথাটা খসে গেল এবং ছিন্ন গলা দিয়ে ফিকে লাল রং বের হয়ে আসছিল, মনে হচ্ছিল যেন রক্ত বের হচ্ছে।
এর পর এরা যা আরম্ভ করেছিল তা বাস্তবিকই নিগ্রো জাতির কলংক। এরা প্রতিমূর্তিটাকে টেনে নিয়ে আগুনে ফেলে দিলে। আগুনের চারদিকে উন্মত্তের মত দৌড়াতে থাকলে। অনেকক্ষণ পরে যে লোকটা দলপতি সেজেছিল সে জ্বলন্ত আগুন হতে প্রতিমূর্তি মানুষটাকে বের করে চাকু দিয়ে কতকটা মাংস কেটে নিজেই মুখে দিলে। এর পর সকলেই যেন নরমাংস খাচ্ছে ভান করতেছিল। এরূপভাবে তথাকথিত নরমাংস খাওয়া চলছিল প্রায় এক ঘণ্টা। তথাকথিত নরমাংস খাওয়া হয়ে গেলে একজন শ্বেতকায় প্রভু প্রত্যেক অভিনেতাকে পাঁচ শিলিং দিয়েছিলেন। আমার সাথীও পাঁচ শিলিং পেয়েছিলেন।
ফেরবার পথে সাথীকে বললাম, “সাথী, এটা হল চলচ্চিত্র। এই চলচ্চিত্র বিদেশে যাবে। বিদেশীরা বুঝবে আমরা সত্যিই নরমাংস খাই। আমাদের নরমাংস ভোজনকারীরূপে বিদেশীরা জানতে পারবে। শ্বেতকায় প্রভুরা ছবিতে যখন দেখবে তাদেরই জাত-ভাইকে হত্যা করে আমরা মাংস খেয়েছি তখন তারা কি আমাদের ঘৃণা করবে না?”
আমার সাথী বললেন, “ভুল করেছেন বন্ধু, আমি যদি না যেতাম তবে অন্য লোক যেত, আমি কেন আমার রোজকার নষ্ট করব। মনে রাখবেন আমাদের ভবিষ্যৎ আমরা নির্ধারণ করব যখন আমাদের অনেকেই আমাদের দুঃখ-দুর্দশা বুঝতে পারবে। আজ যদি আমাদের দেশে সত্যিকারের কোনও আন্দোলন হয়, তবে কি শুধু দাঁড়িয়ে দেখব আমরা? আন্দোলন আরম্ভ হোক, আমরা আন্দোলনে যোগ দিয়ে নিহত হই, আমাদের সংবাদ বিদেশে প্রচার হোক, তখন দেখবেন এই ধরণের ছবির কোনও মূল্য থাকবে না।”
সাথীর কথায় সায় দিতে পারি নি। শুধু বললাম, “যা ইচ্ছা তাই করুন।”
পরের দিনই আমরা স্থানত্যাগ করলাম। পথ খুবই ভাল। বারো মাইল চলতে চার ঘণ্টা লেগেছিল। সামনেই কিসুমু বন্দব। অনেক দূর থেকে হ্রদের ঢেউ তীরে প্রচণ্ড বেগে আঘাত করতেছিল। এই আমার প্রথম সাগর-দর্শন। সাগর দেখামাত্র দাঁড়ালাম। এরূপ দৃশ্য কল্পনাও করতে পাবি নি। সাগর—যার জলের শেষ নাই, সাঁতরিয়ে পাড়ি দেওয়া যায় না! যাকে দেখামাত্র বিহ্বলতা হয়! সেই সাগর অনেকক্ষণ দেখলাম তারপর সাগর-তীরে এলাম। সাগরের ঢেউ আরও মারাত্মক। প্রত্যেক ঢেউ পাহাড়ের মত উচ্চ। সাগরতীরে ধপাস্ ধপাস্ আঘাত করে। বালি আঘাত সহ্য করে। কত ভাববার বিষয়, সাগর-তীরে বসে!
ভিক্টোরিয়া হ্রদের তীরে অনেকক্ষণ বসে থাকলাম। উঠতে ইচ্ছা হচ্ছিল না, শুধু দেখতেই ভাল লাগছিল। আমার সাথী পূর্বেও ভিক্টোরিয়া হ্রদ দেখেছিলেন। বোধ হয় হ্রদের সৌন্দর্য তাকে বিমোহিত করতে পারছিল না। আমাকে ডেকে বললেন, “উঠুন, বসে থেকে কি লাভ হবে? শহবে আমরা থাকতে পারব না, নিকটস্থ গ্রামে যেতে হবে।” সাথীর ডাকে উঠতে হল। কাছেই একখানা গ্রাম ছিল, আমরা সেই গ্রামে গেলাম। গ্রাম হ্রদের তীরে অবস্থিত। গ্রামের এক দিকে হ্রদ অন্য তিন দিকে পরিষ্কার বালুকণাসমন্বিত ভূমি। বাস্তবিক পক্ষে সমুদ্রতীর ছাড়া এমন গ্রাম অনত্র হতে পারে না। গ্রামের প্রত্যেকেই জেলে। প্রত্যেকেই মাছ বিক্রি করে বেশ শিলিং উপার্জন করছিল। শিলিং উপার্জনের দিকে আমার লক্ষ্য ছিল না, ভিক্টোরিয়া হ্রদ কত লম্বা দেখতে ইচ্ছা হচ্ছিল। হ্রদ কত লম্বা দেখতে হলে জাহাজে উঠা চাই। ওপারে যেতে হলে অনেকগুলি শিলিংএর দরকার। আমার দ্বারা এতগুলি শিলিং রোজগার করা সম্ভব হবে না। একমাত্র পথ রয়েছে জাহাজে চাকরি নেওয়া, আমি সেই অপেক্ষায় থাকলাম।
আমরা যে গ্রামে ছিলাম সেই গ্রামে খাদ্যের অভাব ছিল না। প্রচুব পরিমাণে ভুট্টার ছাতু পাওয়া যেত। মাটির হাঁড়ি কিনে গ্রামের প্রধানের ঘরের বারান্দায় রান্না করে খাচ্ছিলাম। প্রধান আমাকে বেশ ভাল বাসতেন। তিনি বলতেন, কিকুউ জাতের লোক এই দিকে বড় আসে না। অন্যান্য গ্রামবাসীদের মত আমি চতুর ছিলাম না। আমার হাফ পেণ্ট পুরাতন ছিল। প্রধান বলছিলেন, কোনও মৎস্য- ব্যবসায়ীর সংগে আমার পরিচয় করিয়ে দেবেন, চাকরি হতে কতক্ষণ?
একদিন সকালে শহরে গেলাম। শহরে কোথাও একটি নিগ্রো পরিবার দেখতে পাই নি। সবাই ইণ্ডিয়ান্। যত রকমের কারবার সবই ইণ্ডিয়ান্দেব হাতে। শ্বেতকায়রা সরকারী কর্মচারী মাত্র। এই ধারণা নিয়ে শহর হতে ফিরে এলাম। প্রধানকে আমার অভিজ্ঞতা বললাম। প্রধান একটু হাসলেন, তারপর বললেন, “শ্বেতকায় প্রভুদের শহরে যেয়ো না। তবুও ইণ্ডিয়ান্রা গা ঘেসতে দেয়, শ্বেতকায় প্রভুরা তাদের শহরে হাঁটতেও দেয় না।”
জিজ্ঞাসা করলাম, “শ্বেতকায় প্রভুদের শহর কোথায়?”
ইন্টেরী, সেই দিকে যেও না। হয় ত মোটর-চাপা পড়েই মারা যাবে। মরতে ইচ্ছা করছিল না সেজন্য ইন্টেরী যাওয়া মন হতে ধুয়ে মুছে ফেলে দিলাম। কিন্তু দুঃখ হচ্ছিল এই ত আমাদের দেশ। আমরা কি ইণ্ডিয়ান্দের মতও হতে পারব না?
শান্তি ছিল না একটুও। প্রায়ই শহরে যেতাম এবং দেখতাম—শুধু দেখতাম। কি যে দেখতাম তা মনেও থাকত না। বাজারে যেয়ে দেখতাম বহু রকমের জিনিস ইণ্ডিয়ান্রা কেনা-বেচা করছে। নিগ্রোরা বিক্রি করছিল নানা রকমের বৃক্ষচর্ম, শুষ্ক ফল, কুড়ানো পাথর, বড় বড় মাছের আঁইশ ও কাঁটা এবং কিনছিল সবই। ভাবছিলাম যদি নিগ্রোরা বিদেশী মধ্যম ব্যক্তির কাছে তাদের সওদা বিক্রি না করে নিজের জাতের কাছে বিক্রি করত, তবে নিজের জাত মধ্যম ব্যক্তির কাজ করে সমৃদ্ধিশালী হতে পারত। পরবর্তীকালে মধ্যম ব্যক্তি মাত্রেই যে ধাপ্পাবাজ হয় বুঝতে পেরেছিলাম—তা নিজের জাত অথবা ভিন্ন জাতের লোক হোক।
প্রায় ইণ্ডিয়ানের বাড়িতে নিগ্রো চাকর দেখতে পেয়েছিলাম। একদিন ইচ্ছা হয়েছিল একজন ইণ্ডিয়ানের বাড়িতে কয়েক মাস চাকরি করি। একজন পরিচিত লোককে বলামাত্র সে বললে, “ইণ্ডিয়ান্দেব বাড়িতে চাকবি করে শুধু বাবুই হবে, ভবিষ্যৎ নষ্ট করবে। বাবু হওয়া আমাদের শোভা পায় না।”
পরিচিত লোকটির উপদেশ মোটেই ভাল লাগছিল না, তাকে বললাম, “আমি চাকরি চাইছি, আমার ভাল-মন্দ আমি বুঝব, পার ত একটা চাকরি যোগাড় করে দাও।”
—আচ্ছা চল, এখনই চাকরি করে দিচ্চি।
আমরা চললাম মেইন্ রোড ধরে। কতক্ষণ যেয়েই লোকটা আমাকে জিজ্ঞাসা করলে, “তোমার নাম কি?”
—আমার নাম জব্বো।
একটা বাড়ির দবজার কড়া নাড়া মাত্র একজন স্ত্রীলোক দরজা খুলে দিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, “কি চাই?”
—আপনি বলেছিলেন একটি ছেলে চাই, এই ছেলেটিকে নিয়ে এসেছি, রাখতে পারেন?
—টাকা পয়সা চিনে ত?
—পরীক্ষা করে দেখুন।
মহিলা আমাদের বাড়ির মধ্যে নিয়ে গেলেন। আমরা রান্নাঘরে বসলাম। মহিলা অনেকগুলি শিলিং এবং সেণ্ট নিয়ে এলেন এবং আমাকে বললেন, “এর ভেতর থেকে দশ সেণ্ট-এর একটি রৌপ্যমুদ্রা বের কর ত?”
অনেকগুলি দশ সেণ্টের রৌপ্যমুদ্রা ছিল, তার থেকে একটি উঠিয়ে মহিলার হাতে দিলাম। মহিলা বুঝলেন আমি সেণ্ট, দশ সেণ্ট, পঞ্চাশ সেণ্টের মুদ্রা কি হয় জানি। তখন মনিব্যাগ্ হতে কতকগুলি নোট ফেলে দিয়ে বললেন, একখানা পাঁচ শিলিংএর নোট বের কর। যতগুলি নোট ছিল তার মধ্যে ছিল শুধু পাঁচ এবং দশ শিলিংএর নোট। কুডি শিলিংএর নোট ছিল মাত্র একখানা। নোট পরীক্ষায় পাশ করার পর মহিলা বললেন, “জব্বো, তুমি মাসে পাঁচ শিলিং পাবে, বস্ত্র পাবে আবও পাবে উত্তম খাদ্য, উচ্ছিষ্ট খেতে হবে না। তোমাকে বাজার করতে হবে এবং আরও কিছু কাজ করতে হবে। পূর্বের ছেলেটা শিলিংও চিনত না, সেণ্টও চিনত না, তাকেও তাড়াব না, সে বস্ত্র ধুয়ার কাজ করবে।”
ইণ্ডিয়ানের বাড়িতে চাকরি করিয়ে দিয়ে লোকটি চলে গেল। সেই দিনই আমার জন্য একটি নূতন পেণ্ট এবং গেঞ্জী কিনে আনলাম। বাজার করতে পারছিলাম কিন্তু হিসাব দিতে পারছিলাম না। বাজার করে ঘরে ফিরে মহিলাকে একটি একটি করে জিনিস উঠিয়ে দাম বলে দিলাম, তিনি জিনিসগুলির দাম লিখলেন, তারপর বাঁ হাতের রক্ষিত অবশিষ্ট শিলিং এবং সেণ্টগুলি তাঁর সামনে রেখে দিয়ে বললাম, এই নিন বাকি পয়সা। বাজার করা দেখে মহিলা সুখী হলেন এবং বললেন, তিনি আমাকে মানুষ কবে ছেড়ে দেবেন।
গিন্নী আমাকে প্রথম যোগ অংক শিখালেন। কি করে দুটো সংখ্যা যোগ করতে হয় শিখে নেবার পরই আপনা হতে আরম্ভ করলাম বেশি সংখ্যক অংকের যোগ করতে। একদিন আপন মনে যোগ অংক করছিলাম, এমনি সময় গিন্নী এলেন এবং যোগ অংক করছি দেখে আমাকে বিয়োগ অংকও শিখিয়ে দিলেন। এর পরে আমার আগ্রহ দেখে পূরণ এবং ভাগও শিখিয়ে দিলেন।
একদিন কর্তার কাছে আমার পরীক্ষা হল। আমার অংক কষা দেখে কর্তা গিন্নীকে বললেন, “একে গুজরাতী শিখাতে আরম্ভ কর।”
আমি আরম্ভ করলাম গুজরাতী শিখতে। দু’ মাসের মধ্যে প্রথম, দ্বিতীয় এবং তৃতীয় ভাগ শেষ হয়ে গেল। গিন্নীর বাড়িতে গুজরাতী সংবাদপত্র আসত তাই পড়তে আরম্ভ করলাম। এক দিকে পাঠ অন্য দিকে কায়িক পরিশ্রম উভয় চলতে থাকল। অবশেষে গিন্নী আমাকে কাপড় কাচার কাজ হতে মুক্ত করে দিয়ে কয়লা আনা এবং ভাঙার কাজে নিযুক্ত করলেন। বাড়িতে যত পরিশ্রমের কাজ সবই আমি করতাম।
একদিন গিন্নী নিজেই বললেন, “তোমরা হলে নিগ্রো, খেটে খেতে হবে। তুমি হাজারো গুজরাতী শিখো তোমাকে কেউ কুডি শিলিংএর বেশি মাইনে দেবে না। তুমি যাতে অলস না হও সেজন্য তোমাকে পরিশ্রমের কাজ হতে দূরে সরিয়ে দিয়ে বাবু তৈরী করতে মোটেই ইচ্ছা নাই।”
ছ’মাসের মধ্যে গুজরাতী ভাষাতে আমার বেশ অভিজ্ঞতা হয়েছিল। মহাত্মা গান্ধীর দক্ষিণ আফ্রিকার সত্যাগ্রহ, তাঁর আত্ম-জীবনী, বাঙালীদের বিদ্রোহ সবই পড়ে নিয়েছিলাম কিন্তু তাঁদের লেখার মধ্যে ঈশ্বর, ভগবানে ভক্তি—এই ক’টি বিষয় আমার ভাল লাগত না। আমার মনে হ’ত, ইণ্ডিয়ান্রা আরব এবং পর্তুগীজদের জাত-ভাই। সেজন্য বোধ হয় ভাল লাগত না বাঙালীদের আত্ম-বলিদান।
আমি যে ভদ্রলোকের বাড়িতে থাকতাম তাঁব নাম ছিল লালজী রহমৎ উল্লা। তাঁর স্ত্রীর নাম ছিল ফতেমা বেগম। একদিন জিজ্ঞাসা করলাম, “আপনারা কোন অবতারকে মেনে চলেন?”
বেগম বললেন, “আলী নামে এক অবতার ছিলেন, আমরা তাঁর আদেশ মেনে চলি।”
তারপর জিজ্ঞাসা করলাম, “আলীর দেশ কোথায় ছিল?”
বেগম বললেন, “আলী ছিলেন মোহাম্মদের আত্মীয়।”
আরব জাত আমাদের প্রতি অত্যধিক অত্যাচার করেছিল বলে তাদের কারো প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা ছিল না এবং বর্তমানেও নাই, সেজন্য বল্লাম, “মহাত্মা গান্ধীকে অবতার করে নিলেই ভাল হয়, দেশী লোক, বিদেশের লোক নিয়ে টানাটানি করে কি লাভ?”
বেগম মনের কথা গোপন রেখে বললেন, “জব্বো, তোমার এই সব কথা নিয়ে চিন্তা করে কোন লাভ হবে না, আশা করি তুমি তোমার নিজের দেশ স্বাধীন করবে। তাই যদি করতে পার তবেই মনে করব তোমাদের জন্য অনেক কিছু করেছি।”
প্রতিবাদ করতে ইচ্ছা হ’ল না। ভিক্টোরিয়া হ্রদের ওপারে কি আছে জানার বাসনা ছিল, সেজন্য জাহাজের চাকরি পাবার ইচ্ছায় একদিন জাহাজ-ঘাটের অফিসে গেলাম। ইচ্ছা করেই একখানা বম্বে সমাচার সংগে নিলাম। জাহাজ-ঘাটে যত কেরানী এবং সুপারভাইজার সবই গুজরাতী। একজন গুজরাতী কেরানী আমার হাতে বম্বে সমাচার দেখতে পেয়ে সোহেলী ভাষায় বললেন, “কাগজখানা দাও, একটু দেখে নেই।”
গুজরাতী ভাষায় বললাম, “এতে এমন কোনও সমাচার নাই যা তুমি পড়ে আনন্দ পাবে, বহু পুরাতন কাগজ।”
কেরানী ত অবাক! আমাকে জিজ্ঞাসা করল, “তুমি গুজরাতী জান?”
—নিশ্চয়।
—আচ্ছা, একটু পড়ে শুনাও ত?
সম্পাদকীয় প্রবন্ধ পড়ে শুনালাম। কেরানী আরও অবাক হল। জিজ্ঞাসা করল, “কত বৎসরে গুজরাতী শিখেছ?”
—ছয় মাস।
গুজরাতী কেরানী আরও অবাক হল। হবার কথাই, কোনও নিগ্রো গুজরাতী শিখতে চেষ্টা করে না। কোনও ভাষা আয়ত্ত করা নিগ্রোদের পক্ষে এত সহজ, বিদেশীরা ধারণাও করতে পারে না।
কেরানী জিজ্ঞাসা করল “এই দিকে কেন এসেছিলে?”
কেরানীকে অতি বিনয় করে বললাম, “বাণা, মোয়াঞ্জা দেখাব বড়ই ইচ্ছা, যদি জাহাজে কোনও কাজ যোগাড় করে দিতে পার যেমন বয়, কুক, কয়লাওয়ালা ইত্যাদি তবে বড়ই বাধিত হব।”
—আগামী বুধবারে একখানা জাহাজ যাবে, তুমি এস।
বুধবার দিন সকালে সকলের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে জাহাজ-ঘাটে গেলাম। সেখানে কেরানীর সংগে দেখা হ’ল। কেরানী জাহাজের একজন সাহেবের কাছে নিয়ে গেল। সাহেব আমাকে তার বয়ের কাজ দিল। কথা থাকল আমি তার বয়ের কাজ অতি সামান্যই করব, করতে হবে মাসাজ। লোকটার রুমেটিজম্ ছিল। শরীরের রক্ত চলাচল করাবার জন্য মাসাজের দরকার হ’ত। রোগ আক্রমণ করলে বিছানা হতে উঠতে পারত না। ইন্টেরীতে দু’জন নিগ্রো তার সেবা করত, জাহাজে আমি একাই সেবা করব ঠিক হয়েছিল।
এই দিকের ইউবোপীয়ান্রা গরম জলে স্নান করে না। দেশ গরম, সেজন্যই শীতল জলে স্নান করে। আমি শুনেছিলাম যাদের গ্রন্থিতে ব্যথা তারা যদি গরম জলে স্নান করে তবে গেঁটে বাতের ব্যথা অনেকটা কম থাকে। ব্যাপার বুঝতে পেরেই জাহাজের স্নানাগার দেখতে গেলাম। প্রত্যেকটা টেপ হতে ঠাণ্ডা জলই পড়ছিল। ঠিক করে রাখলাম জাহাজ ছাড়ামাত্র গরম জল দিয়ে স্নানের টব ভর্তি করে রাখব। ইতিমধ্যে একজন নিগ্রো আমার থাকবার কেবিন এবং খাবারের জায়গা দেখিয়ে দিল। কেবিনটা শুধু আমার জন্য নির্ধারিত ছিল না। আঠার জন নিগ্রোর এক কেবিনে শুইবার ব্যবস্থা ছিল। কোম্পানী হতে শুধু খড়ের বালিশ দেওয়া হ’ত, আর কিছুই নয়। তাতেই আমাদের জাতের লোক সন্তুষ্ট থাকত। দুঃখের বিষয়, গুজরাতী মহিলা আমাকে উত্তম সুযোগ দিয়েছিলেন; সেজন্যই কাঠের উপরে শুতে প্রথম কয়েক দিন কষ্ট পেতে হয়েছিল, পরে অভ্যস্ত হয়েছিলাম।
জাহাজে উঠেছিলাম সকালের দিকে। প্রথমত জাহাজ ভাল করে দেখে নিলাম। দেখবার মত অনেক কিছুই ছিল অন্তত আমার পক্ষে। অসভ্য জংলী জাতের লোক আমি, আমার পক্ষে সবই নূতন। যাদের মা-বোন নেংটা থাকে, শিক্ষার নামগন্ধও যাদের মধ্যে নেই, তাদের পক্ষে সভ্যতাব সবই নূতন।
জাহাজ দেখা তিনটার মধ্যেই শেষ হল। শ্বেত প্রভু চারটার সময় আসবেন, তাঁকে মাসাজ করতে হবে। মাসাজ হতে রক্ষা পাবার জন্য কয়েক বালতি গরম জল করে তাতে এক পোয়ার মত শহুরে রোগের পাতা ছেড়ে ছিলাম। শহুরে রোগের পাতা আমাদের দেশে সর্বত্র পাওয়া যায়, এমন কি জাহাজেও বস্তায় বস্তায় সেই পাতা ছিল।
শ্বেতকায় প্রভুর কেবিন ঝাঁট দিয়ে বিছানা পরিষ্কার করে রেখে দিলাম। প্রভু কেবিনে প্রবেশ করেই বললেন তাঁর ডান পায়ের গোড়ালিতে ভয়ানক ব্যথা। প্রভুকে একটু অপেক্ষা করতে বললাম। তাড়াতাড়ি এক বালতি গরম জল এনে তাঁর ডান পা আস্তে গরম জলে ডুবিয়ে দিলাম। শ্বেতকায় প্রভুর বেশ আরামই লেগেছিল নতুবা চোখ বুজবেন কেন? আধ ঘণ্টাব পর পা উঠিয়ে মুছিয়ে দিলাম। প্রভু জুতা পায়ে দিয়ে হাঁটতে আরম্ভ করলেন। তাঁর পায়ের ব্যথা চলে গিয়েছিল। তাঁর ত পায়ের ব্যথা গিয়েছিল কিন্তু আমার মাথা ঘুরতে আরম্ভ করেছিল। উত্তাল তরঙ্গমালা ভেদ করে জাহাজ চলছিল। বুদ্ধি খাটিয়ে স্নান করে বেশ আরাম পেয়েছিলাম। ভিক্টোরিয়া হ্রদ, হ্রদ নয়—সাগর। সাগরের জল লোনা আর ভিক্টোরিয়া হ্রদের জল লোনা ছিল না, এই যা প্রভেদ। যখনই বমিব ভাব হচ্ছিল তখনই স্নান করে আরাম পাচ্ছিলাম। রাত দশটার সময় শ্বেতকায় প্রভুর শরীর টিপবার আদেশ হল। আমি বললাম, “প্রভু, শরীর টেপবার পূর্বে স্নান করুন, আমি আপনার জন্য বিশেষ জল তৈরী করে রেখেছি। আমিই স্নান করিয়ে দেব।” প্রভু রাজি হলেন। তাঁকে বাথরুমের টবে বসিয়ে দিয়ে ধীরে ধীরে গরম জল দিয়ে টব পূর্ণ করে দিলাম। আমার প্রভু আরামের সহিত চুপ করে বসে থাকলেন। বসে থাকলেন অনেকক্ষণ। তারপর যখন উঠলেন তখন আমিই টাওয়েল দিয়ে তাঁর সর্বাংগ মুছিয়ে দিলাম। কেবিন হতে বের হযে মুক্ত বাতাসে বের হওয়ামাত্র তাঁর মুখ হতে গান বেবিয়ে এল। বুঝলাম প্রভুর আর শরীর টিপতে হবে না। কেবিনে ঢুকেই প্রভু বললেন, “জব্বো, এখন তুমি শুতে পার, কাল সকালে এস।”
আমার বয়স বেশি নয়, মাত্র আঠার কি ঊনিশ কিন্তু বুদ্ধি খাটিয়ে যে কাজটি আমার প্রভুর জন্য করেছিলাম তাতেই তাঁর শরীর হতে গাউট রোগ অপসৃত হয়েছিল।
জাহাজে ছিলাম মাত্র চৌদ্দ দিন অর্থাৎ দুই সপ্তাহ। জাহাজ মোঘাঞ্জাতে (MUANZA) পৌঁছবার পর আমার প্রভু আমাকে পাঁচ পাউণ্ড দিয়েছিলেন। আমি পাঁচ পাউণ্ড নিই নি, পাঁচ শিলিং নিয়েছিলাম। ‘অর্থই অনর্থের মূল’—এ-কথা বেশ ভাল করে বুঝতে পেবেছিলাম।
প্রভুকে চার পাউণ্ড পনের শিলিং ফেরত দেওয়াতে তিনি আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন, “জব্বো, মাত্র পাঁচ শিলিং রেখে বাকিটা ফেরত দিলে কেন?”
—এর বেশি দরকার নাই, বাণা। আমি এবার দেখব ওপারের লোক কেমন আছে।
শ্বেত প্রভু সব ভুলে গেলেন। আমি নিগ্রো, তিনি শ্বেতকায়, তাও ভুলে গেলেন। নিগ্রো প্রথায় আমার করমর্দন করে বললেন, “তুমি ভবিষ্যতে তোমার দেশের গৌরব হবে, বিদায় বন্ধু, আমার কথা মনে রেখো।” শ্বেতকায়দের মধ্যেও এমন অনেক লোক আছেন যাঁরা বাস্তবিকই মহৎ। আমরা কালো লোক, সামান্যতেই তুষ্ট। আমার প্রভুর কথায় তৃপ্ত হয়ে পরের দিন জাহাজ-ঘাটে ফিরে এসে প্রভুকে বলেছিলাম, “বাণা, মনে রাখবেন আপনি গাউট হতে আরোগ্য হন নি। এই নিন দু’টি পাতা, চিবিয়ে খেয়ে ফেলুন তবেই গাউট হতে রক্ষা পাবেন, আর গাউট আক্রমণ করবে না।” বাণা তৎক্ষণাৎ পাতা দু’টি চিবিয়ে খেলেন। আমিই করমর্দনার্থ হাত বাড়িয়ে দিলাম। তিনি করমর্দন করলেন। তারপর আমি তাঁর কাছ থেকে বিদায় নিলাম চিরতরে।