বিষয়বস্তুতে চলুন

মাউ মাউএর দেশে/৬

উইকিসংকলন থেকে

◄  
  ►

(৬)

 আবার একা চলতে আরম্ভ করলাম। পথ ভালই ছিল। সেদিন বিকালে একটি ছোট্ট শহরে পৌঁছি। শহরের বাসিন্দা সকলেই ভারতবাসী। গ্রামে রাতে থাকা নিষেধ। এদিকের ভারতবাসী আমাদের বেশ ঘৃণা করে। এক মাইল চলে গিয়ে একটি নিগ্রো গ্রাম পেলাম। গ্রামে একটি নিগ্রো বিদ্যালয় ছিল, রাত্রে পথিক বিদ্যালয়ে থাকতে পারে। আমিও বিদ্যালয়ে আশ্রয় নিলাম। তখন সন্ধ্যা হয়েছিল। একজন অর্ধ ইণ্ডিয়ান্ কতকগুলো ছাত্রকে বলছিল, “নিগ্রো জাতির আত্ম-সম্মান বজায় রাখার জন্য প্রাণ দিতে হবে।” এর অনেক কথা শোনার পর আমিই বললাম, “প্রাণ দেব কেন? আমরা বলি আত্ম-সম্মানের কথা, কিন্তু তুমি আমি ছাড়া বড় বড় শব্দের অর্থ কেউ কি বুঝতে পারে? একজন দু’জন যদি প্রাণ দেয়, তবে তার ফল কি ভাল হবে? বাজে কথা বলে মানুষকে উত্তেজিত করো না, কোনও শ্বেত প্রভু অথবা ইণ্ডিয়ান্ প্রভুদের সামনে এ-সব কথা বললে পদাঘাতে পিলে ফাটিয়ে দেবে।” লোকটা প্রায় আধ ঘণ্টা বাজে কথা বলল, তারপর চলে গেল তার বাড়িতে; আমি শুয়ে থাকলাম আরাম করে। কতক্ষণ পরে লোকটা ফিরে এল কয়েকখানা রুটি নিয়ে। সে আমাকে জাগালে এবং বললে, “ভাই, রুটি খাও।” চোখ মেলে রুটি নিলাম বটে, কিন্তু খেলাম না। ঘিএর গন্ধ সহ্য করতে পারতাম না। লোকটা ইণ্ডিয়ানের ছেলে, সেজন্যই বাজে জিনিস খেতে পছন্দ করে। আমরা মাখন খাই বটে, কিন্তু ঘি মোটেই খাই না। লোকটা আমার কাছে বসল এবং বলল, “ভাই, সুদিন আসছে, আমাদের দাপটে বৃটিশ পর্যন্ত কেঁপে উঠবে।”

 লোকটার কথা মোটেই ভাল লাগল না, বললাম, “বৃটিশের কথা ছেড়ে দাও, আরব এবং ইণ্ডিয়ান্‌দের কাছে যেতে পার?”

 লোকটা বললে, “এখন আমরা কিছুই পারি না। ভবিষ্যতে পারব, শক্তি অর্জন কর।”

 আমি বললাম, “রুটি দিয়েছিস্ বলে ভাবিস্ না তোকে আমি বিশ্বাস করি, তোর বাবা ইণ্ডিয়ান্, তুই ত এক পা মক্কাব দিকে বাড়িয়ে দিয়ে আছিস্। আমাদের কথা আমরা ভাবব। তোরা হলি বিদেশী, সুযোগ পেলেই বাপের পথেই যাবি, আমাকে আর বুঝাতে হবে না।”

 “সকলে সমান নয় বন্ধু, আমি নিগ্রো, আমার মা নিগ্রো, আমরা সকলেই নিগ্রো। আমার বাবা মাকে তাড়িয়ে দিয়েছে।”

 “ভাল করেছে, আবার ডাকলেই চলে যাবে, ভাবনা কিসের?”

 “আমরা আর যাব না, বুঝতে পেরেছি ইণ্ডিযান্ হওয়া কত কঠিন এবং কত অপমানজনক।”

 “বেশ ভাল কথা, এখন ঘুমোতে দাও, তোমার দেওয়া দুর্গন্ধযুক্ত রুটি ফেরত নিতে পার। সুবিধা হলে, কাল সকালে কিছুটা ভুট্টার আটা দিও, এখন যাও।”

 সকালেও সেই ইণ্ডিয়ান্‌টা এসেছিল এবং মেয়েলোকের মত চিবিয়ে চিবিয়ে কথা বলছিল। তার মানসিক অবস্থা আমাদের মত ছিল না। কি যেন ক্রমাগত ভাবছিল। বিদেশীদের ছেলেরা এরূপই হয়। লোকটাকে একটুও বিশ্বাস হ’ল না। পরে এর সংগে দেখা হয়েছিল। বুঝতে পেরেছিলাম সে যা বলেছিল সবই সত্য, সে খাঁটি নিগ্রোতে পরিণত হয়েছিল। সে একটি সভাতে উপস্থিত ছিল, সেই সভার সভাপতি ছিলেন মাকাটি নামে এক অর্ধ ইণ্ডিয়ান্। এখন দুঃখ হয় লোকটাকে কেন এত কটু বাক্য বলেছিলাম। মাকাটি কি করে আমাদের আপন জন হয়েছিলেন সে কথাই বলছি।

 গুজরাতী ভাষা অতি যত্নের সহিত শিখেছিলাম। মাঝে মাঝে গুজরাতী পুস্তক পড়তাম। গুজরাতী ভাষার সংবাদপত্রও বাদ যেত না। একদিন দেখলাম বম্বে সমাচার নামে একখানা দৈনিক সংবাদপত্র পথের পাশে কে ফেলে গিয়েছে। সংবাদপত্র দিয়ে একটা পুরাতন রুটি বাঁধা ছিল। রুটি নষ্ট হয়েছিল, রুটিটা ফেলে দিয়ে সংবাদপত্র পড়তে আরম্ভ করলাম। সংবাদপত্রে মাকাটি নামে এক যুবকের প্রবন্ধ ছিল। প্রবন্ধে সে লিখেছিল, “যদিও আমার পিতা একজন গুজরাতী তবুও আমি গুজরাতী নই, আমি খাঁটি কিকুউ। গুজরাতীদের মধ্যে কাস্টইজম্ রয়েছে—হিন্দু মুসলমান রয়েছে, খৃস্টান আছে কিন্তু আমার মায়ের যে ধর্ম তাতে সেরূপ কিছুই নাই। আমরা সকলেই কিকুউ। যে আমাদের ভাষা বলে, যে আমাদের মধ্যে থাকে তাকেই আমরা কিকুউ বলি। গুজরাতীরা আমাদের ঘৃণা করে বৃটিশের মতই। তারা আমাদের সংগে একত্রে খায় না, এক ঘরে থাকতে দেয় না, এমন কি কাফের বলতেও কসুর করে না। অতএব আমার পিতা যদিও গুজরাতী, তবুও আমি গুজরাতী নই, আমি কিকুউ।”

 সংবাদপত্রে মাকাটির ঠিকানা ছিল না। ইচ্ছা হয়েছিল সুযোগ পেলেই মাকাটির সংগে সংযোগ স্থাপন করব।

 আমাদের কাজ চলছিল। আমরা প্রায় গ্রামেই প্রাথমিক বিদ্যালয় খুলেছিলাম। যাকে বিদেশীরা প্রাথমিক বিদ্যালয় বলেন সেই বিদ্যালয়ে আমরা বিদেশী ভাষাও শিক্ষা দিতাম। গুজরাতী ভাষা শিখেছিলাম। প্রকৃতপক্ষে কেনিয়া কলোনীতে প্রথম ভাষা হল সোহেলী। সোহেলী রোমান্ অক্ষরে লিখা হয়। তারপরই হল গুজরাতী ভাষা। রাজভাষা ইংরেজী আমাদের মধ্যে প্রচলন করার জন্য খুবই চেষ্টা চলছিল কিন্তু এই নিয়ে মতানৈক্য দেখা দিয়েছিল। সোহেলী ভাষার মাধ্যমে জ্ঞাতব্য বিষয় যাতে শিখতে ও জানতে পারি তার পক্ষে ছিল এক দল, অন্য দল ছিল ইংলিশ ভাষার প্রচলনের পক্ষপাতী। তাদের উদ্দেশ্য ছিল ইংরেজী শিখলে বৃটিশের কাছ থেকে বেশি মাইনে পেতে পারবে। এই বিষয় নিয়ে একটি বড় সভা হবার কথা হয়। সেই সভা নাইরোবীতে না করে আমাদের পাশের গ্রামে করারই আয়োজন হয়।

 আমাদের সভা করতে মণ্ডপ তৈরী করতে অথবা খাদ্যের সংস্থান করতে হয় নি। যারা আসবেন তাঁদের জন্য ছোট ছোট পাতার ঘর তৈরী হয়েছিল মাত্র। সকলকেই নিজ নিজ খাদ্য সংগে করে নিয়ে এসেছিলেন।

 সভাতে কে সভাপতি হবেন তাই নিয়ে চিন্তা করতে হল না। যাঁরা উপস্থিত হবেন তাঁদের মধ্যে একজন সভাপতি হবেন। সবাই চায় কিকুউ জাতের উন্নতি, নামের প্রচার কেউ চাইছিল না। সংবাদপত্র ছিল না যাতে সভাপতির নাম প্রকাশ করা অথবা যে কর্ম-তালিকা নির্ধারিত হয় তাই প্রকাশ করা যেতে পারত। একদিনে রাজা হবার প্রত্যাশা কারো ছিল না। আমরা জানতাম, আজ আমরা যে সামান্য শিক্ষার প্রসারণ করছি যখন বৃটিশের সংগে লড়াই আরম্ভ হবে তখন সবই নষ্ট হবে। আমাদের একমাত্র উদ্দেশ্য বৃটিশের সংগে লড়াই করা এবং সেই যুদ্ধে কে বাঁচবে কে মরবে তার কোনও নিশ্চয়তা ছিল না। সেজন্যই বোধ হয় আমাদের মধ্যে যাঁরা শিক্ষা বিস্তার করতেন তাঁদের মধ্যে কেহই দেশদ্রোহী ছিলেন না।

 যেদিন সভা হবার কথা ছিল তার পূর্ব হতেই প্রত্যেক গ্রাম হতে প্রতিনিধি আসতেছিলেন। সকলেই জংগলের মধ্যে আত্মগোপন করে রয়েছিলেন। সভার রাত্রে মাত্র একটি ছোট্ট বাতি জ্বালিয়ে একজন যুবক বলতেছিলেন, “আমাদের ভাষা সোহেলী; অতএব সোহেলী ভাষাতেই আমাদের ভাইবোনদের জ্ঞানের উন্মেষ করাব। বিদেশী ভাষা আমরা ঘৃণা করি না। বিদেশী ভাষা শিক্ষা করার জন্য মেধাবী ছাত্র অথবা বর্ণশংকর ছাত্রদের নিয়োগ করব। আমি একজন বর্ণশংকর—গুজরাতী পিতার কাছ থেকে শিখেছি গুজরাতী, গৃহ-শিক্ষকের কাছ থেকে শিখেছি ইংরেজী কিন্তু যদিও আমার মাতৃভাষা সোহেলী তবুও আমি সোহেলী ভাষা প্রথম শিখতে পারি নি, পরে আয়ত্ব করেছি মাত্র। দু’টি বিদেশী ভাষা শিখতে অনেক পরিশ্রম করতে হয়েছিল কিন্তু নিজের মাতৃভাষা শিখতে কারো কাছে যেতে হয় নি। নিজের বুদ্ধি খাটিয়ে মাতৃভাষা আয়ত্ব করার পর দু’খানা পুস্তক প্রণয়ন করেছি, প্রথম পুস্তকের নাম রুটি, দ্বিতীয় পুস্তকের নাম মাটি। উভয় পুস্তক আমাদের মধ্যে বহুল প্রচার হয়েছে এবং লোকের মনে ধারণা হয়েছে আমরা কারো গোলাম নই, আমরা মানুষ, আমাদের বাঁচবার অধিকাব আছে। শুধু বাঁচবার অধিকার আছে জানলেই হয় না। যারা আমাদের বাঁচবার অধিকার কেড়ে নিচ্ছে, তাদের কাছ থেকে সেই অধিকার ছিনিয়ে নিতে হবে। যদি ছিনিয়ে নিতে হয় তবে লড়াই করতে হবে। লড়াইএর প্রস্তুতির প্রথম অধ্যায় হল বিদ্যালয়ের মাধ্যমে সংঘটন করা। বিদ্যালয়ে যদি আমরা বিদেশী ভাষা শিখতেই জীবন কাটিয়ে দেই তবে সংঘটন হবার উপায় থাকবে না। আমরা বেতন-বৃদ্ধি চাই না, চাই স্বাধীনতা। আমার প্রস্তাবের বিরুদ্ধে যদি কারো কিছু বলবার থাকে তবে তিনিই শুধু আসবেন, অন্যথায় আসবেন না।

 এই প্রদীপের সাহায্যে আমার মুখই আপনারা দেখছেন, আর কারো মুখ, কারো কাছে পরিচিত হওয়া বাঞ্ছনীয় নয়। আমরা প্রতিজ্ঞাবদ্ধ, আমাদের জীবন মরণের জন্য প্রস্তুত। যারা আমার মত মরণের জন্য প্রস্তুত তাদের মুখ বিশ্বাসঘাতকের কাছে অপরিচিত থাক, আমাদের মুখের পরিচয় আমাদের মা বসুন্ধরার কাছে দেব। যখন তাঁর প্রিয় সন্তান তাঁরই ক্রোড়ে রক্তাক্ত কলেবরে আশ্রয় নেবে, তখন আমাদের মা আমাদিগকে সাদর সম্ভাষণ জানিয়ে কোলে তুলে নেবেন।

 সভার কাজ পনের মিনিটে হয়ে গেল। অন্ধকারের মধ্যে আমরা মিশে গেলাম।

 ইচ্ছা হচ্ছিল মাকাটির সংগে দেখা করি, কিন্তু মাকাটি কে এবং কোথায় থাকেন তা জানবার উপায় ছিল না। আমাদের মধ্যে মাকাটি নামের প্রচলন আছে বলেও জানা ছিল না। মাকাটি মানে রুটি, রুটি কি কারো নাম হতে পারে? কিন্তু মাকাটি যেভাবে কথা বললেন এবং তাঁর মুখে যে জ্যোতি দেখেছিলাম তাতেই মনে হয়েছিল আমরা নিশ্চয়ই কৃতকার্য হব। মাকাটির পুস্তকে বুয়র যুদ্ধের অনেক কথা ছিল। আমরাও কেনিয়া দেশটাকে দ্বিতীয় ফ্রি ওরেঞ্জ কলোনীতে পরিণত করতে উদ্‌যোগী হচ্ছিলাম।

 সভা হয়ে যাবার এক বৎসর পরে একদিন একজন গুজরাতীর সংগে দেখা হয়েছিল। গুজরাতী লোকটি প্রত্যেক গ্রামে যেতেন এবং ছেলে বুড়ো সকলকে সোহেলী ভাষা শিখবার জন্য উৎসাহিত করতেন; সেই সংগে বিদেশী বিতাড়নের কথাও উত্থাপন করতেন। ইণ্ডিয়ান্‌দের তিনি বিদেশী বলতেন না। তিনি বলতেন, ইণ্ডিয়ান্‌রা মোটেই বিদেশী নয়, বর্তমানে বিদেশী হয়ে থাকবার সুবিধা পাচ্ছে। ভবিষ্যতে যখন তোমরা বৃটিশকে তাড়াতে সক্ষম হবে তখনও যাদের বিষদাঁত ভাঙবে না, তারা কেনিয়া পরিত্যাগ করে অন্যত্র যাবে।

 গুজরাতী লোকটির সংগে গুজরাতী ভাষাতেই কথা হচ্ছিল। তিনি আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন, “জব্বো, তুমি গুজরাতী শিখলে কখন?”

 —একবার বিদেশে গিয়েছিলাম বাণা, তখন গুজরাতী শিখেছিলাম।

 —বিদেশ কোন্ দেশ, জব্বো?

 —টাংগানিয়াকা

 এটা ত তোমাদেবই দেশ। মাঝে ভিক্টোরিয়া হ্রদ। একই ভাষা তারা বলে। আর্থিক দুর্গতি তাদেরও তোমাদেরই মত। টাংগানিয়াকা কি করে বিদেশ হল?

 —সবাই বলে তাই বলছি, বাণা।

 —তোমার পক্ষে বলা শোভা পায় না। তুমি আমাদের সভ্য, তোমার কথার মূল্য আছে, যারা কোন রকমের শিক্ষা পায় নি তাদের পক্ষে আফ্রিকার সর্বত্র বিদেশ এমন কি তাদের জন্মভূমিও বিদেশ। মনে রেখো জব্বো, আফ্রিকা মহাদেশের বিদেশীরা কম অত্যাচার করে নি। উত্তরে আরবগণ উপনিবেশ স্থাপন করেছে। আফ্রিকার উত্তর দিকটা এখন আরব দেশেরই একটি অংশ। দক্ষিণে ডাচ বসবাস করেছে। দক্ষিণ আফ্রিকা এখন তাদের কিন্তু আমি ত হিসাব জানি। হিসাব মতে, কি উত্তর অথবা কি দক্ষিণ আফ্রিকা কোথাও বিদেশীর সংখ্যা এক শতের মধ্যে দশজনও নয়, অথচ আফ্রিকার উত্তর দিকটা হয়ে গেল আরব দেশের অন্তর্ভুক্ত আর দক্ষিণ দেশটা হয়ে গেল ডাচদের দেশ। তারপর কেনিয়া, উগাণ্ডা এবং টাংগানিয়াকা হয়ে যাবে অন্য কারো দেশ, তখন তোমরা যাবে কোথায়?

 —চিন্তার কথা বটে, জব্বো বল্‌লে।

 —সবই চিন্তাব বিষয় জব্বো, এখন শোন আমার কথা। আমি একজন ভারতবাসী—লালজী আমার নাম। মাকাটি আমারই পুত্র। মাকাটির মাকে বিয়ে করেছিলাম রুটির লোভ দেখিয়ে, সেজন্য আমার পুত্রের নাম রেখেছিলাম মাকাটি। চেষ্টা করেছিলাম মাকাটিকে ইণ্ডিয়ান্ করতে। সে চেষ্টা বিফল হয়েছে। প্রথমত আমাদের সমাজে নিগ্রো অথবা অর্ধ নিগ্রোর স্থান নাই, দ্বিতীয়ত আমি যে সমাজে জন্ম গ্রহণ করেছি সে সমাজ হল ভারতের সর্বনিম্ন স্তরের। নিজের দেশে আমি যে কাজ করতাম সে কাজ আফ্রিকার কোন লোকই করে না, এমন কি কল্পনা করতে পারে না মানুষ হয়ে মানুষের সমাজে থেকে এত হীন কাজ মানুষ কি করে করতে পারে?

 নিজের সমাজের কথা যখন ভাবি তখন সাহস করে না আমার পুত্র ইণ্ডিয়ান্ হোক, সে আমার ধর্ম গ্রহণ করুক। তার মায়ের ধর্ম, আচার ও ব্যবহার শুধু তার কাছে উত্তম নয়, আমার কাছেও উত্তম। আমার পুত্র মাকাটি ভাল করেই জানে তার মা নিগ্রাণী, সে নিগ্রো—ভারতবাসী নয়। আমিই তার সেই জ্ঞান জন্মিয়ে দিয়েছি। আমি যে কাজ করতাম সেই কাজটা কি আমার পুত্র জানতে চেয়েছিল। সে ভাবছিল, আমি স্বদেশে চামারেব কাজ করতাম। চামারের কাজ অতীব উত্তম কাজ সে কথা কে না জানে? আজ নাইরোবী, মোম্বাসা এবং অন্যান্য শহরে যে সকল চর্মকার রয়েছেন তাঁরা সকলেই ধনী, সকলেই সমাজের শীর্ষস্থান দখল করে রয়েছেন কিন্তু আমি যে কাজ করতাম শুধু একদিন মাকাটিকে বলেছিলাম। আমার কথা শুনে সে উন্মত্ত হয়েছিল। তার মনে এত ঘৃণা জন্মেছিল যে কয়েক দিন সে অন্ন গ্রহণ করে নি। এখন সে শান্ত। মাকাটি বলছিল, যদি সে তার মাতৃভূমিকে মুক্ত করতে পারে তবে পিতৃভূমি মুক্ত করার জন্য ও চেষ্টা করবে। তার আশা—বড় আশা। তার প্রথম আশাই ফলবতী হয় কি না কে জানে?

 লালজীকে জিজ্ঞাসা করলাম, “আমাকেও বলুন, আপনি আপনার দেশে কি কাজ করতেন?”

 —হাঁ শুনে রাখ, এখন আর বলতে লজ্জা করে না। তোমাদের দেশে অর্থের বিনিময়ে কি কেউ অপরের মল-মূত্র পরিষ্কার করে?

 আমি বল্‌লাম, “অর্থের বিনিময়ে কেউ কারোকে এমন কাজ করতে এমন কি বলতেও সাহস পাবে না। আমরা যখন শিশু ছিলাম তখন মা বাবা আমাদের পরিষ্কার রাখার জন্য এই কাজটি করতেন। শুনতে পাই হাসপাতালে নার্সরা রোগীর মল-মূত্র পরিষ্কার করেন, সেজন্য নার্সদের কেউ বলে বোন, আর কেউ বলে মা। যা’হোক, এখন ও কথার শেষ এখানেই ভাল। এখন বুঝতে পারলাম আপনি ইণ্ডিয়ান্ হয়েও কেন আমাদের দলে যোগ দিয়েছেন। আপনার মত আরও কি ইণ্ডিয়ান্ আছেন যাঁরা আমাদের সমর্থন করেন?”

 —নিশ্চয়ই, তবে মুষ্টিমেয়। তোমার জেনে রাখা উচিত, যাদের অনুকরণ করছ তাদেব দলপতি জেনারেল ক্রগারকে ব্যবসায়ীরা ঠকিয়েছিল। আমি ব্যবসায়ী নই, মজুর মাত্র। তোমাদের প্রতারণা করব সে আশা আমিও রাখি না, তোমাদেরও সেরূপ মনোবৃত্তি রাখা শোভা পায় না।

 তোমাদের মধ্যে অনেকেই আমাকে জিজ্ঞাসা করেছ, যুদ্ধ করবার জন্য অস্ত্র কোথা হতে পাওয়া যাবে। তার উত্তরে অনেককে অনেক কথা বলেছি, এখন তোমাকে আরও বিশদভাবে বুঝিয়ে বলছি অস্ত্র কোথা হতে পাওয়া যাবে।

 বুয়র জাতকে অস্ত্র দিয়ে জার্মানরা সাহায্য করেছিল। জার্মানরা বেলজিয়ম সবকারের সাহায্যে অস্ত্র পাঠাতে সক্ষম হয়েছিল, কিন্তু মনে বেখো জব্বো, তোমাদের জন্য কেউ অস্ত্র পাঠাবে না। তোমাদের ব্যবহারের অস্ত্র তোমাদেরই সংগ্রহ করতে হবে। সে অস্ত্র যোগাড় হবে তোমাদেব উষ্ণ রক্তের বিনিময়ে। মা বসুন্ধরা তাতে তৃপ্ত হবেন, পৃথিবীর উৎপীড়িত লোক তোমাদের জয়গান করবে।