বিষয়বস্তুতে চলুন

মাউ মাউএর দেশে/৭

উইকিসংকলন থেকে

◄  
  ►

(৭)

 আমি চলছিলাম সেলিস্‌বারীর দিকে। এদিকের পাহাড়গুলো ভিক্টোরিয়া হ্রদের দিকে অনেকটা ঝুঁকে পড়েছিল। ভারতীয় গ্রাম পাচ্ছিলাম, কিন্তু থাকবার স্থান পাচ্ছিলাম না। অবশেষে একটি গ্রামে একজন উগাণ্ডাবাসী—জাতে বাগাণ্ডা—আমাকে তার ঘরে নিয়ে গেল। উগাণ্ডাতে একজন সুলতান আছেন। জাতে নিগ্রো। লোকটা বৃটিশ সরকারকে মনিব মনে করে এবং দেশের লোকের শত্রুতা করে। আমাকে যে লোকটা স্থান দিয়েছিল, তার ঘরটা ছিল একটি আড্ডা। সেই ঘরে যারাই আসছিল, তারাই উগাণ্ডার সুলতানকে হত্যা করার চক্রান্ত করছিল। ওদের কথা আমার মোটেই ভাল লাগছিল না। আমি বলছিলাম, “এত চিন্তা করছ কেন তোমরা? আমাকে দেখিয়ে দাও, দূর থেকে একটি বিষাক্ত তীর নিক্ষেপ করব আর সুলতান মারা যাবে।”

 যারা আমার কথা শুনছিল তারা কিন্তু একটি কথাও বলছিল না। এটা আমাদের নিয়ম। যখন কোন বিষয় অপছন্দ হয়, তখন কথা বলতে নাই। অতি বুদ্ধিমানদের সাথে আমার কোনও সম্বন্ধ ছিল না। আমি হলাম কিকুউ, আমরা যেমন সামনা-সামনি যুদ্ধ করতে পারি তেমনি গোপন যুদ্ধেও আমাদের অভ্যাস আছে এবং ছিল। কতবার আমরা আরব এবং পর্তুগীজদের দেশ থেকে গোপন যুদ্ধ করে তাড়িয়েছি, আমার দাদু প্রায়ই সেই ঘটনাবলী বলতেন। বাগাণ্ডা জাত আমাদের চেয়েও কঠিন, কিন্তু মাথা নত করেছিল আরবদের কাছে। হবার কথাই, তাদের চাষেব জমি বেশি ছিল। তুলা উৎপাদন করত এবং বিক্রি করত মিসরীদের কাছে। মিসরী আরব আরও কঠিন, আরও দয়ামায়াহীন। সুদান দেশটা কত যুগ ধরে লুটে খেয়েছে, সে কথা আমাব দাদুও বলতে পারেন না। মিসরীদের মুখে ‘কাফির’ শব্দ লেগেই আছে। নিগ্রো হলেই কাফির। আমি কিন্তু কাফির হতেই ভালবাসি। আরবদের আল্লার ধার ধারি না। আমাদের চন্দ্র, সূর্য, বৃষ্টি, সুন্দর বসুন্ধরা হলেই হ’ল। আমরা ত অন্যের ক্ষতি করি না, সেজন্য আমাদের আল্লার দরকার হয় না। আমাদের সূর্য পৃথিবীর সর্বত্র সমানভাবে আলো দেয়। আরববা আমাদের সংগে শত্রুতা করে—কাফির বলে, সেজন্য আমাদের সূর্য আরবদেশে বেশি করে আগুন বর্ষণ করে। সূর্যের সংগে নিশ্চয়ই দেখা হবে, তখন বলব আরবদের প্রতি যেন দয়া দেখায়। সূর্য হ’ল আমাদের ভাই, আমরা মরলে সূর্যের দেশে আশ্রয় পাই। এটাও আমাদের মধ্যে প্রচলিত প্রবাদ।

 কযেক সপ্তাহ পবে ডুডুমা শহরে পৌঁছলাম। গ্রাম্য এবং অগ্রাম্য কতকগুলি লোকের সংগে পরিচয় হ’ল। তারাও সোনার খনি অন্বেষণে এসেছিল, অনেকে সোনার সন্ধান পেয়েছিল কিন্তু সোনা তাদের মনাকর্ষণ করতে পারে নি। দেশমাতৃকার ডাক তাদের কাণে অনবরত ঢাক পেটাচ্ছিল। সোনার খনি পরিত্যাগ করে তারা ফিরে চলেছে স্বদেশে। আমাকেও তাদের সংগে যেতে বললে। ভাবলাম আমি তাদের সংগে যেয়ে কি করব? আমাদের সাধারণ ভাষা সোহেলী। লিখা হয় রোমান অক্ষরে। তাতে শতকরা পঞ্চাশটা আরবী শব্দ। নিজ ভাষার অক্ষর পর্যন্ত জানি না, দেশে যেয়ে কি করব? এদেব বললাম, ভেবে দেখব। গুজরাতী শিখেছি তাদের বললাম না। একজনকে জিজ্ঞাসা করলাম, দেশে গেলে আমাকে কি কাজে নিযুক্ত করা হবে?

 —শিক্ষা-প্রচারে, বন্ধু!

 —আমি ত রোমান অক্ষর পর্যন্ত জানি না।

 —রোমান অক্ষর এক ঘণ্টায় শিক্ষা করা যায়। বাজে কথা বলে হয়রাণ করিস্ না, জব্বো। তুই কি কাজ করবি বুঝিয়ে দিচ্ছি।

 পথের পাশে দাঁড়িয়েছিলাম। হঠাৎ সেই লোকটা আমাকে ধাক্কা দিয়ে পথে ফেলে দিলে। আঘাত খুব কমই লেগেছিল। উঠলাম, শরীর ঝেড়ে ফেললাম কিন্তু প্রত্যাঘাত করলাম না। সেই লোকটা হেসে বললে, “তুই গাছ কাটবি তাতে আঘাত লাগবার সম্ভাবনা বেশি যদি অসতর্ক থাকিস্। অসতর্ক হয়ে দাঁড়িয়েছিলে—ধাক্কা দিয়ে বুঝিয়ে দিলাম গাছ কাটার সময় অসতর্ক হয়ে পথে দাঁড়ালে যেমন বিপদে পড়তে হয়, তেমনি গাছ কাটার সময়ও অসতর্ক হয়ে দাঁড়িয়ে থাকলে অত্যধিক বিপদের সম্ভাবনা থাকে।

 তারপর সোহেলী আমাদের মাতৃভাষা, শিখতে কতক্ষণ? দিনরাত চেষ্টা করবি, আমরা সাহায্য করব, তারপর তোকেই শিক্ষক করে কোনও গ্রামে পাঠাব। আমরা হলাম কিকুউ, আমাদের পুরাতন ইতিহাস, আমাদের বীরত্ব, আমাদের গাম্ভীর্য দেখে আরব এবং পর্তুগীজ ভীত হয়েছিল। বৃটিশ পরাজিত হবে, ভয়ে পালাবে, সেই সংগে তাদের অনুচর আরব এবং ইণ্ডিয়ান্ হয় আমাদের সংগে মিশে যাবে নয় ত তারাও পালাবে। এতগুলি বিষযের সমাধান করতে প্রস্তুতির দরকার, চল স্বদেশে যাই।

 সোনা দিয়ে কি হবে? যে সোনা এখান থেকে কুড়িয়ে নিয়ে যাব সেই সোনা বিক্রি করতে হবে হয় আরব নয় ত ইণ্ডিয়ান্‌দের কাছে। তারাই ত প্রায় সবটা খেয়ে ফেলবে, যেটুকু আমাদেব দেবে তা হবে নগণ্য, লাভ হবে শুধু সোনা দেখা এবং সোনা উঠাতে পরিশ্রম করা, এব বেশি কিছুই নয়।”

 এরা যা বলছিল তা অতীব সত্য। স্বর্ণখনি দেখা অথবা সোনার মোহ কেটে গেল। আমি তাদের কথায় সম্মত হয়ে দেশে ফিরে যাবার সম্মতি জানালাম এবং বললাম, দু’ মাস পর দেশে ফিরে যাব।

 আমাদের কথা এবং কাজ এক। কথা দিয়ে যদি কেহ কথা না রাখে তবে তাকে আমরা গ্রাম থেকে বহিষ্কার করি এবং গ্রামের লোকের সংগে যদি কখনও দেখা হয় তবে কথা না বলাই পছন্দ করি। গ্রামের শত্রুর সংগে কথা বলা কি ভাল? যারা কথা দিয়ে কথা রক্ষা করে না তারা সাধারণ শত্রু নয়, বিশেষ শত্রু, বিদেশী শত্রু হতেও ভয়াবহ।

 বন্ধুদের বলেছিলাম দু’ মাসের মধ্যে গ্রামে ফিরে যাব। আমার কথা এবং কাজ এক। কথা এবং কাজ ঠিক রাখতে অর্থের দরকার হয়। ভাবছিলাম এত দূর থেকে কি করে দু’ মাসের মধ্যে ফিরতে পারব? ডুডুমা শহরে একজন গুজরাতীর সংগে দেখা হয়, তিনি অনেকগুলি রোগে ভুগছিলেন। তিনি কিসুমু যাবেন শুনে তাঁর বাড়িতে গেলাম। গুজরাতী ভাষায় কথা বললাম। তাঁকে এ কথাও বললাম যে বিনা ঔষধে অনেক রোগ সারাতে পারি। ইণ্ডিয়ান্‌রা ঔষধের চেয়ে তুক্‌তাকে বিশ্বাস করে বেশি। গুজরাতী ভদ্রলোক বিনাবাক্যব্যয়ে আমাকে কিসুমু পর্যন্ত যাবার সাথী অথবা সহায়ক রূপে নিতে রাজী হলেন।

 রেলগাড়িতে ভ্রমণ অল্পই করেছি। গুজরাতী মশাইয়ের কৃপায় রেলগাড়িতে বসতে পারলাম। ডুডুমা হতে গাড়ি যাবে মোয়াঞ্জা। গাড়িতে নানা রকমের চিত্র আঁকা ছিল। ইংলিশ সংখ্যা লিখতে ও পড়তে জানতাম। গাড়িতে প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় শ্রেণী ছাড়া আর একটি শ্রেণী ছিল, সেইটি হ’ল নিগ্রো শ্রেণী। কেনিয়া কলোনীতে নিগ্রো শ্রেণীর গাড়িতে দু’খানা বেঞ্চ থাকে কিন্তু এই দিকের গাড়িতে একখানাও বেঞ্চ ছিল না, কতকগুলি চাটাই পাতা ছিল। চাটাইয়ের উপরে বসলাম। চাটাই হতে দুর্গন্ধ আসছিল। চাটাইগুলি যদি রৌদ্রে শুকানো হ’ত তবে আর দুর্গন্ধ ছাড়ত না। দুর্গন্ধ সহ্য করা অভ্যাস ছিল, সেজন্য বেশি কষ্ট হচ্ছিল না।

 গাড়ি মোয়াঞ্জা পৌছল। গাড়ি হতে নেমে গুজরাতী মশাইয়ের সংগে দেখা করলাম। তিনি বললেন, রাত্রে মোয়াঞ্জাতে থাকবেন পরের দিনের সন্ধ্যার জাহাজে কিসুমু যাবেন।

 উপযাচক হয়ে রাত্রে গরম জল দিয়ে তাঁকে স্নান করিয়ে দিলাম। গরম জলে অনেক রকমের পাতা ছিল। চোখে জল না লাগাবার জন্য অনুরোধ করা সত্ত্বেও দু’এক ফোঁটা জল তাঁর চোখে পড়েছিল। এতে চোখে বেশি যন্ত্রণা হয়। অবশ্য সেজন্য গালমন্দ শুনতে হয়েছিল কিন্তু স্নানান্তে গুজরাতী রোগীর রোগের অনেক উপশম হয়েছিল। চোদ্দ দিনই গুজরাতী ভদ্রলোককে পূর্বের নিয়মে স্নান করিয়ে তাঁর রোগের অনেক আরাম করতে পেরেছিলাম। এই ভদ্রলোক আমার বাড়ি পর্যন্ত পৌঁছান ভাড়া দিয়েছিলেন।

 বন্ধুরা তখনও দেশে পৌঁছে নি, আমি কিন্তু গ্রামে পৌঁছে গিয়েছিলাম। গ্রামে পৌঁছে কোথায় গিয়েছিলাম, কি কাজ করেছিলাম এবং ভবিষ্যতে কি কাজ করব বলাতে সকলেই সুখী হয়েছিল।


মাউ মাউ পরিচালিত বিদ্যালয়।

 গ্রামের লোককে বললাম, এক দিকে শিক্ষা করব অন্য দিকে শিক্ষা দেব। গ্রামের লোক বুঝল আমার কথার পেছনে বাক্যবাগিশী নাই।

 পল্টনে ভর্তি না হবার জন্য গ্রাম ত্যাগ করেছিলাম, গ্রামে এসে দেখলাম রিক্রুটিং বন্ধ হয়েছে। আমরা যদিও উলংগ, যদিও নিরক্ষর এবং অসভ্য তবুও আমরা আমাদের ভালমন্দ বুঝতাম, আমরা কেন পল্টনে ভর্তি হব? যারা পল্টনে ভর্তি হয়েছিল তাদের পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল বিদেশে। তারা ফিরে আসবে কি না, কে জানে। গ্রামের লোক পল্টনে ভর্তি হওয়া বন্ধ করে দিয়েছিল। জোর জবরদস্তি চলছিল না।

 আমাদের প্রতি শক্তির প্রয়োগ বৃথা, সেই কারণ না বললে অনেকেই বুঝতে পারবে না। গ্রামের প্রতি প্রত্যেকের আকর্ষণ থাকে। আকর্ষণ থাকলেও আমরা যে একেবারে গ্রামের উপরই নির্ভর করি তা নয়। বনে জংগলেও থাকতে পারি। জমি আমাদেব ছিল না। যে সামান্য জমি ছিল বৃটিশ ধনীরা গ্রহণ করে নি। প্রকৃতপক্ষে তা ছিল অনুর্বর। ভুট্টা হয় বটে কিন্তু পরিমাণে খুবই কম। প্রকৃতপক্ষে আমাদের খাদ্য আলুজাতীয় এক রকমের উদ্ভিদের শিকড়। সেই শিকড় বনে জংগলে কেনিয়ার সর্বত্র পাওয়া যায়। বস্ত্র আমরা অল্পই ব্যবহার করি, পশুচর্মই আমাদের বস্ত্র। নূন তেল না হলেও আমাদের চলে। অতএব কিসের জন্য আমরা পরপদানত হব?

 মজার কথা হল, আমাদের মধ্যে যারা সরকারী কাজ করে এবং মাসিক বেতন পায়, তাদের মাইনে এতই অল্প যে গ্রামে এসে কোনরকম বাহাদুরী করতে পারে না। কয়েক জন যে বাহাদুরী না করত তা নয়, কিন্তু অনেকেই বাহাদুরী করতে লজ্জিত হত। অনেকে ইউরোপীয়ান্‌দের প্রশংসা করতে চাইত কিন্তু আমাদের বৃদ্ধেরা যখনই শুনতেন, কেহ ইউবোপীয়ান্‌দের প্রশংসা করেছে তখনই সেই লোকটাকে ডেকে এনে বুঝিয়ে বলতেন, “হাঁ ইউরোপীয়ান্‌রা খুবই ভাল কিন্তু কখনও কি তোমার সংগে একত্র বসেছে অথবা তুমি তাদের সংগে বসার মত সাহস রাখ?” তখনই, ইউরোপীয়ান্‌দের প্রশংসাকারী নিগ্রো মাথা নত করে চুপ করতে বাধ্য হয়েছে। শুনেছি অন্যান্য দেশের বৃদ্ধেরা বড়ই রাজভক্ত, আমাদের দেশের বৃদ্ধেরা একজনও রাজভক্ত নন বরং বিপ্লবী। এরও কারণ আছে। সাধারণত বৃদ্ধেরা ভীত এবং অক্ষম হয়ে পড়েন কিন্তু আমাদের দেশের বৃদ্ধেরা অক্ষমতা এবং ভীতি দূরে সরিয়ে দিয়ে গভীর বনে নিরাপদ স্থানে চলে যান। অবশ্য গভীর বন মোটেই নিরাপদ স্থান নয়, তবুও গ্রামের দুঃখ-দুর্দশা দেখার চেয়ে গভীর বনে হায়েনার কবলে পড়া অনেকেই পছন্দ করেন।

 আমরা যখন স্বাধীন হব তখন আমাদের বৃদ্ধেরা গ্রামেই থাকবেন যেমন থাকে ইউরোপীয়ান্ বৃদ্ধেরা। সপ্তাহে তারা পাঁচ পাউণ্ড করে পেন্‌সন পায় যা আমাদের শিক্ষিতেরা মাসেও পায় না। ইউরোপের বৃদ্ধেরা সুন্দর বাংলোতে বাস করে, তাদের আদেশ প্রতিপালন করার জন্য একটি নয়, চার-পাঁচটি করে নিগ্রো চাকর এবং চাকরাণী সব সময় প্রস্তুত থাকে। আমাদের বৃদ্ধ এবং বৃদ্ধারা যদি সপ্তাহে পাঁচ পাউণ্ড করে পান তবে তাঁরাও হায়েনার কবলে পড়বেন না, বনে যাবেন না, তাঁরাও বাংলোতে পবিবারের লোক নিয়েই বসবাস করতে পারবেন।

 গ্রামের গ্রাম্য জীবন মোটেই আরামের ছিল না। কিসুমু, মোয়াঞ্জা, নাইরোবীর চাকচিক্য আমার মনে অনবরত ভাসছিল। ভাবছিলাম আমরা যে পর্যন্ত স্বাধীন না হতে পারব সেই পর্যন্ত আমরা ইউবোপীয়ান্‌দের মত সুখী হতে পারব না। অপরের সুখের দিকে তাকালে লাভ হয় না মোটেই। নিজের সুখ কি করে আনতে হয় তারই উপায় চিন্তা করতে হয়।

 আমার বন্ধুরা গ্রামে ফিরে এল। তাদের সংগে দেখা হবার পর ঠিক হল গ্রামের বাছা কয়েকটি ছেলেমেয়ের শিক্ষা দেবার ব্যবস্থা হবে। সোহেলী ভাষা যারা ভাল করে বলতে পারে তাদেরই শিক্ষা দেওয়া হবে প্রথম। গুজরাতী ভাষা আমি জানতাম, বন্ধুদের সেই সংবাদ দিলাম। বন্ধুরা বম্বে সমাচার কিনবে বলল এবং ইণ্ডিয়াতে যা ঘট্‌ছে তার চুম্বক তারা লিখে নেবে। কি করে গুজরাতী ভাষা শিখেছিলাম বন্ধুরা জানল। আমরা শিক্ষাকেন্দ্র খুলে ফেললাম। আমাদের বিদ্যালয় এবং এই বিদ্যালয়ই হয়েছিল কেনিয়ার ভবিষ্যৎ শিক্ষাকেন্দ্র।

 শিক্ষাকেন্দ্রের অবস্থিতি এবং কার্যাবলী সবই অপরিকল্পিত ছিল। তবুও কেনিয়ার পাদরীমহল যখন শুন্‌ল আমরা একটি শিক্ষাকেন্দ্র খুলেছি তখন পাদরীরা আমাদের গ্রামে একটি বিদ্যালয় খুল্‌ল। সেখানে শুধু বাইবেল শিক্ষা দেওয়া হ’ত। আমরা তাতে দুঃখিত হলাম না, বাইবেল পড়তে শিখলেই খ্রীস্টান হয় না। অন্যান্য দেশে কি হয় বলতে পারি না, আমাদের দেশে কিন্তু ধর্মগ্রন্থকে আমল দেওয়া হয় না। এমনও দেখা গেছে, যে-কোনও কেনিয়াবাসী সারাজীবন ইস্‌লাম অথবা খ্রীস্টানী মতবাদ পোষণ করে হঠাৎ একদিন বলে বসল, “বিদেশী অবতারদের কথা অথবা উপদেশ আমাদের সহ্য হবে কেন? তারা যা বলে কাজে তা করে না। আমরা কাজ করে দেখিয়ে দেব আমাদের সভ্যতা কত ভাল।”

 বিদেশীদের মধ্যে চৌর্যবৃত্তির প্রচলন রয়েছে। আমাদের মধ্যে তা নাই। বিদেশী অবতারগণ সমাজ গঠনের জন্য যে উপদেশ দিয়েছেন আমরা তা প্রতিপালন করি, অতএব বিদেশী অবতারের দরকার আমাদের মোটেই নাই। আমরা কারো জিনিস লুকিয়ে নেই না, জানি তাতে লোকটার ভয়ানক কষ্ট হবে। সে এই রকমের আর একটা জিনিস কোথায় পাবে? আমাদের মধ্যে একটি প্রচলিত গল্প আছে সেই গল্পটি আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা সকলের মুখেই শোনা যায়।

 একদা এক বৃদ্ধ এবং বৃদ্ধা একটি বনের কাছে বাস করত। তাদের ঘরে রান্না করার একটি হাঁড়ি, জল রাখবার একটি কলসী এবং কাঠ কাটবার একখানা দা ছিল। দাখানা বেশ ধারালো এবং পরিষ্কার ছিল। বৃদ্ধ সেই দা দিয়ে কাঠ কাটত। হায়েনা এলে হায়েনার উপর ছুঁড়ে মারত। ঘরের পেছনে সামান্য জমিতে দা-এর সাহায্যে মাটি খুঁড়ে ভুট্টার দানা রোপন করত। দু’একটা সবজির বীচিও মাটির নীচে ঢেকে রাখতে পারত। মাটি ভেদ করে যখন সবজি গজিয়ে উঠত তখন বৃদ্ধ এবং বৃদ্ধার কত আনন্দ হ’ত। তাদের একমাত্র দা-ই ছিল বনের হিংস্র জীব হতে রক্ষা পাবার অস্ত্র এবং চাষ করার একমাত্র যন্ত্র।

 মিসর হতে সবে মাত্র আমাদের দেশ আক্রান্ত হয়েছিল। মিসরীরা গ্রাম লুট করত, মানুষ পেলেই হত্যা করত। বৃদ্ধ দম্পতি সে সংবাদ পেয়েছিল।

 বৃদ্ধ এবং বৃদ্ধা একদিন দরজার কাছে বসে সে কথাই আলোচনা করতেছিল।

 বৃদ্ধা বলছিল, “আমাদের এমন কি আছে যা মিসরীরা নিয়ে যেতে পারে?”

 বৃদ্ধ সায় দিয়ে বলছিল, “তাই ত, আমাদের কি আছে আর কি নেবে?”

 বৃদ্ধ এবং বৃদ্ধা যখন গল্প করছিল তখন পেছন দরজা দিয়ে একটা মিসরবাসী তাদের ঘরে প্রবেশ করেই দেখল নিগ্রোর ঘরে একখানা সুন্দর দা রয়েছে। সুন্দর দা নিয়ে লোকটা পালিয়ে গেল।

 সন্ধ্যা হয়েছে, বৃদ্ধ কাঠ কেটে দেবে, বৃদ্ধা উনুন ধরাবে কিন্তু তাদের ঘরে দা ছিল না। বৃদ্ধ দম্পতি ঘরটা তন্ন তন্ন করেও দা খুঁজে পেল না। অবশেষে বৃদ্ধ বললে, “হয়ত দা কোথাও ফেলে এসেছে।”

 বৃদ্ধা বললে, “তা হতে পারে।

 সেই রাত্রে আগুন জ্বালানো হল না। সুযোগ বুঝে হায়েনা বৃদ্ধের ঘরে ঢুকে উভয়কে হত্যা করে উত্তম ভোজন সমাপ্ত করলে।

 কয়েক দিন পর মিসরীয় আরবটা একজন নিগ্রো কর্তৃক নিহত হয়। তার কাছে ছিল বৃদ্ধ এবং বৃদ্ধার দা। দা দেখেই নিগ্রো বুঝতে পারল এই দা বৃদ্ধ এবং বৃদ্ধার। সে তৎক্ষণাৎ চলে গেল বৃদ্ধ এবং বৃদ্ধার বাড়িতে। গিয়ে দেখলে বৃদ্ধ এবং বৃদ্ধাকে হায়েনা খেয়ে ফেলেছে। নিগ্রো নিকটস্থ গ্রামের লোককে ডেকে আনল। সকলেই বৃদ্ধ-বৃদ্ধার হাড় দেখতে গেল। নিগ্রো তখন গ্রামবাসীদের বললে, “ভাইবোনেরা শোন। আমি বৃদ্ধ এবং বৃদ্ধার দা একজন আরবকে হত্যা করে পেয়েছি। নিশ্চয়ই আরব এদের দা না বলে নিয়ে গিয়েছিল। যদি এদের কাছে দা থাকত তবে হায়েনা এদের হত্যা করতে পারত না।” সেই থেকে আমরা অন্যের দ্রব্য না বলে নেই না।

 দেখ আমাদেব গল্পগুলি কেমন সুন্দর! আমরা এই রকমের অনেক গল্পের মালিক, আমরা কেন পরাধীন থাকব? আমাদের লক্ষ্য স্বাধীনতা—আজ না হয় কাল, কাল না নয় পরশু আমরা শ্বেতকায়দের আমাদের দেশ থেকে তাড়াবই। প্রাণের মালিক হলাম আমরা, প্রাণ দেব অকাতরে, বুদ্ধির অভাব হবে না, কাজের মাধ্যমে বুদ্ধি আপনি এসে যাবে।

 আরব এবং পর্তুগীজ নির্যাতন শেষ না হতেই বৃটিশ ধনীর দল, বিশেষ করে প্রাক্তন বৃটিশ সৈন্য, আমাদের দেশের উর্বর ভূমি এক শিলিং অথবা দু’শিলিংএর বিনিময়ে কিনে নিয়েছিল। যখন প্রাক্তন সৈন্যেরা ভূমি কিনে নিয়েছিল তখন আমরাই তাদের জমি পরিষ্কার করে দিয়েছি, তাদের খামার রক্ষা করেছি, বিপদে সাহায্য করেছি। প্রাক্তন সৈন্যেরা বুঝতে পেরেছিল শুধু কৃষিতে তাদের পেট ভরবে না, ব্যবসা-বাণিজ্য করতে হবে, দেশকে উন্নত করতে হবে। আমাদের বৃদ্ধেরা ভেবেছিলেন, তারাই ব্যবসা-বাণিজ্যে আত্মনিয়োগ করবেন কিন্তু বৃটিশ সরকার আমাদের সেই সুযোগ দেয় নি। তারা প্রথমত আরবদের ডেকে আনে। আরবদের সংগে আমাদের আদায় কাঁচাকলায় সম্বন্ধ। আরবের পরিবর্তে নিয়ে এল ভারতীয় গুজরাতী। গুজরাতীরা এতই বৃটিশভক্ত যে বৃটিশের আদেশ এবং উপদেশ ছাড়া এক পা নড়তেও রাজী নয়। দ্বিতীয়ত, তারা আরও বেশি নিগ্রো-বিদ্বেষী। আমাদের বৃদ্ধেরা বুঝলেন নিজের পায়ে দাঁড়াতে হবে। সেজন্য বৃদ্ধেরা যুবকদের প্রস্তুত করতে আরম্ভ করেছিলেন।

 হই আমবা উলংগ বর্বর, কিন্তু আমাদের মধ্যে দেশপ্রেম ছিল। আমাদের অতীতের ইতিহাস যদিও লিখা হয় নি তবুও আমরা শুনেছি, আমাদের পূর্বপুরুষ কত শক্তিশালী ছিলেন। আমার জীবন-কথার মধ্য দিয়ে তার কিছুটা আভাস তোমরা পেয়েছ।

 আমরা যদিও উলংগ বর্বর, তবুও আমরা বুদ্ধি বেশ রাখি, আমাদের কত বুদ্ধি বিদেশীকে অস্ত্রের মাধ্যমে বুঝিয়ে না দিলে বিদেশীরা একটুও বুঝতে পারবে না।

 পূর্বেই আমার অথবা আমাদের দাদুর কথা বলেছি। দ্বিতীয় যুদ্ধ শেষ হবার পর একদিন এক পাদরী এলেন, দাদুর ঘরে গিয়ে দাদুকে বললেন, “কিন্না ভাল আছ?”

 আমার দাদু বললেন, “হাঁ ভাল আছি, তুমি কেমন আছ?”

 পাদরী নিজের কুশল বলার পর বললেন, “আমিই এসেছি একটি আনন্দের সংবাদ নিয়ে।”

 —কি সংবাদ?

 —তোমাদের সরকার তোমাকে মস্ত বড় একটি উপাধি দিতে মনস্থ করেছেন।

 —তাতে কি হবে?

 —দশ জন মান্য করবে তোমাকে, ভয়ও করবে আরও পাবে মাসে মাসে কিছু শিলিং।

 —আমার মত সকল বৃদ্ধই কি শিলিং এবং উপাধি পাবে?

 —না, তুমি পাবে এবং তোমার মত আরও কয়েকজন পাবে।

 —হাঁ, এখন বুঝতে পেরেছি, এত বৎসর আমি নিজের লোকের বৃদ্ধ ছিলাম। আমার অভাব ছিল না, এখন থেকে তোমাদের বৃদ্ধ হতে হবে, গ্রামের লোকের সংগে সকল সম্বন্ধ ছিন্ন করে তোমাদের জয়গান গাইতে হবে। পরিবর্তে পাব কয়েকটি শিলিং। তাও যদি সব বৃদ্ধ পেত তবে তোমার কথায় সম্মত হতাম, পাব শুধু আমিই। এটা ত আমাদের নিয়ম নয়, বন্ধু। বিদেশীর কাছ থেকে আমরা যদি এক পয়সাও পাই তাও আমাদের সকলের সম্পত্তি। উপাধি এবং অর্থ শুধু আমার জন্য, তা কি করে হয়?

 পাদরী উত্তর দিতে পারল না। কোথা থেকে একজন অর্ধ নিগ্রো নিয়ে এল। বসিয়ে দিল আমাদের গ্রামে সর্দার করে। তার দম্ভ, তার প্রতারণা, তার মিথ্যা কথা আমাদের অসহ্য হয়ে উঠল। আমরা সবই দাদুকে জানালাম। দাদু বললেন, এখন চুপ করে থাক। আপাতত আমরা দেশদ্রোহীদের শাস্তি দেব না। এদের কার্য বিশেষভাবে লক্ষ্য কর।

 দিন গেল, সপ্তাহ গেল, বৎসর গেল, সর্দারদের সংখ্যা বেড়ে চলল। আমরা ভুট্টাব দানা যে দাম দিয়ে কিনতাম তার দাম বেড়ে চতুর্গুণ হল, যারা বস্ত্র ব্যবহাব করত তারা দশগুণ দাম দিয়েও বস্ত্র পেল না। বস্ত্র না পেলেও আমরা চিন্তা করতাম না কিন্তু আমাদের পেটে হাত পড়ল।

 আর ঐ পাশের বাড়িতে যে লোকটা উড়ে এসে জুড়ে বসেছিল, তার বাড়িতে নানা রকমের খাদ্য দেখা দিল। অনেক নির্বোধ, গ্রাম্য সর্দারেরা খাদ্যের প্রাচুর্য এবং অনেক রকমের খাদ্য দেখে তার দ্বারস্থ হতে লাগল।

 শুধু আমাদের দাদু নন, দেশব্যাপী যত দাদু ছিলেন তাঁরা প্রথম হলেন চিন্তিত, তাবপর হলেন ভীত। আমাদের দেশের দুর্দান্ত প্রতাপশালী মাসাই এবং বাগাণ্ডা কি করে দেখবার জন্য অপেক্ষা করতেছিলেন।

 মাসাই এবং বাগাণ্ডা যারা একদা পর্তুগীজ এবং আরবদের বিরুদ্ধে দুর্দান্ত প্রতাপে লড়াই করে বনে জংগলে রক্ত-গংগা বহিয়ে দিয়েছিল, তারা বৃটিশ প্রলোভনে এবং বিলাসিতায় পূর্বের বলবীর্য ক্রমেই হারিয়ে ফেলছিল। কিকুউ জাতের মধ্যেও দুর্বলতা দেখা দিয়েছিল। মধ্যবিত্ত শ্রেণীর সংখ্যা ক্রমেই বেড়ে যাচ্ছিল। মধ্যবিত্তের সংখ্যা বৃদ্ধি হবার পূর্বেই আমাদের আত্মরক্ষার আয়োজন করতে হবে।

 বর্তমানে তিন পরিবার নিয়ে যে গ্রামের গঠন সেই গ্রামে চতুর্থ পরিবার গ্রামের মণ্ডলরূপে দেখা দিয়েছে। নবাগত চতুর্থ পরিবারের সুখ এবং স্বাচ্ছন্দ্য দেখে অন্য তিন পরিবার অবাক হচ্ছে এবং কি করে তারাও সেই সুখ এবং স্বাচ্ছন্দ্যের অধিকারী হতে পারে তারই পথ অন্বেষণ করে। যখন দেখে কোথাও রোজগারের পথ নাই তখন তারা পাপের পথে পা দেওয়া ছাড়া অন্য পথ খুঁজে পায় না।

 ক্ষয়রোগ আমাদের মধ্যে ছিল না। ক্ষয়রোগ দেখা দিয়েছিল, তারপর শহুরে রোগ ত বহু পূর্বেই দেখা দিয়েছিল। এই অবস্থাতে আমাদের এক মাত্র করণীয় কাজ হল বিপ্লব।

 আমাদের বিপ্লবী নেতারা সকলেই বৃদ্ধ এবং পুরাতন যোদ্ধা। বিপ্লব কি প্রকারে আরম্ভ করতে হবে এবং বিপ্লবের পরিণতি কোথায় তাও দেখতে হয়। বিচার-বুদ্ধির দরবার হয়।