মাউ মাউএর দেশে/৮
(৮)
নেতাদের অজ গ্রামে চলে আসবার কারণ আছে। আমাদের দেশে বৃটিশ আসার পর আরবগণই মোম্বাসাতে বৃটিশ সৈন্যদের পুষ্পমাল্যে সুশোভিত করে বশ্যতা স্বীকার করেছিল। একজন নিগ্রোও বৃটিশ সৈন্যের আশে-পাশে যায় নি। বৃটিশ বড়ই চতুর। আমাদের দেশে আসবার পর কয়েকজন আরব-ঘেসা নিগ্রোকে তাদের দলে টেনে নিয়েছিল এবং তারাও বৃটিশ সৈন্যের আদেশ প্রতিপালন করতেছিল। ক্রমে এই আজ্ঞাবহ নিগ্রোরাই বড় বড় উপাধি পেয়ে কেনিয়ার বড় বড় নিগ্রো রিজার্ভগুলোতে রাজত্ব আরম্ভ করে দেয়। এরা এতই আবব-ঘেসা ছিল যে সর্বপ্রথম যখন আমরা সোহেলী ভাষাকে রোমান অক্ষরে প্রচার করতে চেয়েছিলাম তখন এই আরব-ঘেসা বৃটিশ-দাস শুধু বিরুদ্ধাচরণ করেনি, আমাদের কয়েকজনকে রাজদ্রোহী প্রতিপন্ন করে বৃটিশ জেলে ফাঁসিতে ঝুলিয়েছিল।
বিদে মিশনারীরা চেষ্টা করছিল ছোট ছোট উপজাতীয় ভাষাকে সোহেলী ভাষা হতে পৃথক রেখে উপজাতীয় ভাষাগুলি রোমান অক্ষরে প্রচলন করে, তাতে কিন্তু আমাদের দেশের খেতাবধারীরা বাধা দেয়নি। খেতাবধারীরা বলত নিজ নিজ জেলার ভাষা রোমান অক্ষরে লেখা চাই, সোহেলী ভাষা হবে আববীতে লেখা। এই নিয়ে যারাই তাদের সংগে বাক্যযুদ্ধ করেছিল তাদেরই পরিণাম খারাপ হয়েছিল।
আমাদের জ্ঞানীগণ এই শ্রেণীর বৃটিশ-দাস এবং আরব-ঘেসাদের পরিত্যাগ করেছিলেন। তারপর প্রশ্ন উঠেছিল মধ্যবিত্ত যারা একের নম্বর সুবিধাবাদী তারা বিদেশী অধ্যুষিত শহরের কাছে থাকবার আদেশ পেয়েছিল। বিদেশীকে গুরুঠাকুর মনে করত। বড় বড় মাটির ঘরে থাকত এবং কয়েক একর জমির মালিক হয়েছিল। এরাও আমাদের সংগে ছিল না। এদের মধ্যে কয়েকজন ডাক্তারী শিখেছিল। অনেকে বিদেশী পরিচালিত রেলওয়েতে কাজ করত এবং কালেক্টারীর আশে-পাশে বসে সাধারণ মানুষের দরখাস্ত সোহেলী ভাষায় লিখে দিত। এরা কিন্তু রোমান অক্ষরেই সোহেলী লিখত। অনেকের টাইপ-রাইটিং মেশিনও ছিল। যাদের টাইপ-রাইটিং মেশিন ছিল তাদের আমরা উচ্চ মধ্যবিত্ত বলতাম এবং জানতাম এরা কখনও তাদের টাইপ-রাইটিং মেশিন ফেলে বনে জংগলে পালাবে না এবং আমাদের দলে যোগও দেবে না। আমরা তাদেরও দলে টানবার চেষ্টা করিনি। করলেও লাভ হবে না জানতাম—হয় ত তারাই হবে প্রথম নম্বরের স্পাই।
আরও একটি শ্রেণীকে আমরা পরিত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছিলাম। তারা বাইরের লোক, যেমন উগাণ্ডা রাজ্যের বাগাণ্ডা জাতি, আমাদের প্রদেশের মাসাই জাতি। বাগাণ্ডা জাতির লোক যদিও আমাদের মধ্যে থাকে, যদিও আমাদের প্রচলিত সোহেলী ভাষাই বলে তবুও তারা আমাদের সংগে যোগ দেবার মত শক্তিশালী ছিল না। তাদের ঘরে পিয়ানো, রেডিও এবং অন্যান্য বিদেশী সামগ্রী দেখে আমরা চম্কে উঠতাম। তারা তাদের পিয়ানো এবং রেডিওকে নিজের প্রাণ থেকেও বেশি ভালবাসত। দ্বিতীয়ত কিছু ঘটলেই এরা ম্যাজিস্ট্রেট এবং পুলিশের সাহায্য নিত। গ্রামের লোককে বিশ্বাস করত না। বিপ্লব করার মত মতিগতিও তাদের ছিল না।
প্রত্যেক গ্রামে হেড্ম্যানরূপে যারা এসেছিল তারা প্রথম নম্বরে বৃটিশ-দাস। গ্রামের লোকের চলাফেরা লক্ষ্য রাখাই তাদের একমাত্র কাজ। তাদের আমরা কোনও মতেই দলে টানতে পারব মনে করতাম না, কিন্তু এদের প্রতি আমরা অবিচার অথবা অত্যাচার কখনও করিনি। যারা যেমন করেছে তাদের প্রতি আমরা তেমনি করেছি মাত্র।
প্রত্যেক গ্রামে বিদ্যালয় স্থাপন হবার পর, যারা ছিল বৃটিশের দাস এবং ভাষা আন্দোলনের সময় আমাদের লোককে বৃটিশ জেলে পাঠিয়ে যারা হত্যা করিয়েছিল তাদের তিনজনকে হত্যা করি। তাদের বাড়ি পুড়িয়ে দেই এবং পরিবারের অন্যান্যকে আমাদের মত বনে-জংগলে বাস করতে আদেশ করি।
শুধু আইনের দিকে চেয়ে থাকলে হয় না। শাসকরা তাদেব সহায়করূপেই আইন গঠন করে, সেজন্য আমরা আইনের বিচারের অপেক্ষা করা মোটেই পছন্দ করিনি। যে তিনজন তথাকথিত বড়লোককে হত্যা করা হয়েছিল তাদের হত্যাকারী খুঁজে পাওয়া যায় নি। এতে সুফল হয়েছিল। আমাদের গ্রামগুলোতে উডে এসে যারা জুড়ে বসেছিল তারা হুঁসিয়ার হয়েছিল। বুঝতে পেরেছিল জনমতের বিরুদ্ধাচরণ করলেই ঘাড়ে মাথা থাকবে না।
এর পরে দেখা গেল একদল লোক হত্যাকারীর অন্বেষণে সর্বত্র ঘুরে বেড়াচ্ছে এবং যাকে তাকে অত্যাচারও করছে। সুখেব বিষয় আমাদের বিদ্যালয়ের প্রতি এদের দৃষ্টি ছিল না। কি করে থাকতে পারে? ছাত্রেরা এত তন্ময় হয়ে লেখাপড়া করছিল যে বাইরের দিকে তারা তাকাতও না। যে-কোনও লোক ছাত্রদের বিদ্যাভ্যাসের প্রতি লক্ষ্য রাখত তারাই বুঝতে পারত এবা অসহায়। তারা শিক্ষার দিকে অতীব উৎসাহী। তাদের কেউ সন্দেহ করতে পারত না। প্রকৃতপক্ষে তারা ছিল নির্দোষ।
তিনজন সর্দারের হত্যাকারীর অন্বেষণ করার পর যখন কোনও সংবাদ পাওয়া যায় নি, তখন পুলিশ নাইরোবী এবং নিকটস্থ গ্রামের প্রতি দৃষ্টি নিক্ষেপ করে। হত্যাকারীদের কয়েকজন শহরের পাশে বাস করত। এদের মধ্যে একজনকে পুলিশ গ্রেপ্তার করে অমানুষিকভাবে অত্যাচার করতে থাকে। সুখের বিষয়, লোকটি মৃত্যু বরণ করেছিল বটে কিন্তু তার মুখ হতে একটি কথাও বের করতে পারে নি। এই ঘটনা ঘটবার পরই এক গুপ্ত সভাতে স্থিব হয়, অজ পাড়াগাঁয়ে নেতাদের বসবাস করাই যুক্তিযুক্ত।
আমাদের বৃদ্ধ নেতা প্রস্তাব করলেন, তিনি শহরের নিকটের গ্রামে না থেকে একেবারে অজ গ্রামে চলে আসবেন এবং সেই গ্রাম হবে বিপ্লবের কেন্দ্রস্থল।
আমাদের দেশে সত্যিকারের যত নেতা ছিলেন তাঁদের মধ্যে সকলেই নিজ নিজ বাসস্থান পরিত্যাগ করলেন। সরকার একটুও মাথা ঘামালেন না। সাধারণ লোক চিন্তিত হয়ে পড়ল। গ্রামে যাঁরা নেতারূপে ছিলেন তাঁরা কোথায় গেলেন, প্রশ্ন আপনা হতেই সকলের মনে জেগেছিল। সাধারণ লোক সেই প্রশ্নের মীমাংসা না করতে পেরে নেতাদের অন্বেষণে বের হল। অনেকে নেতাদের দেখা পেল। যারা দেখা পেল তারা বুঝল নেতারা কেন নিজ নিজ গ্রাম ত্যাগ করে অন্যত্র চলে গেছেন। অনেকে উত্তেজিত হল, অনেকে ম্রিয়মাণ হল, কিন্তু সকলের প্রাণেই আঘাত লাগল। সকলেই বুঝল বৃটিশ আমাদের শত্রু। বৃটিশকে না তাড়ালে অন্যান্য বিদেশীকে তাড়ানো সহজ হবে না।
নেতাদের অন্তর্ধানের কথা সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ল। বৃটিশ বুঝল মহা বিপদ। নিজেদের নিরাপত্তার জন্য বৃটিশ সরকার শ্বেতকায়দের মধ্যে অস্ত্র বিতরণ করতে থাকল। শ্বেতকায়রা হাত পাকাবার জন্য নির্দোষী মানুষের প্রাণ হরণ করবে ভয় দেখাতে আরম্ভ করল। তবুও বৃদ্ধ নেতারা সাধারণ লোককে উত্তেজিত করা অথবা নিজে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়া কোনটাই করলেন না। তাঁরা শান্তির বাণী গ্রামে গ্রামে গানের মারফতে ছড়িয়ে দিলেন।
আমাদের প্রধান নেতা থাকতেন নাইরোবী শহর হতে চার মাইল দূরে। তাঁকে সেখান হতে সরানো ভাল হবে কি না তাই নিয়ে আলোচনা চল্ল। অবশেষে ঠিক হল তিনিও তাঁর বাসস্থান ছাড়বেন। ঠিক হল তিনি আসবেন আমাদের গ্রামে। তাঁর থাকবার জন্য একখানা ঘর করা হল। চেয়ার, টেবিল, খাট তৈরী করা হ’ল, তারপর তিনি এলেন আমাদের গ্রামে। ইতিমধ্যে আমাদের দ্বারা অনেকগুলি বিদ্যালয় খোলা হয়েছিল। আমাদের নেতা প্রত্যেকটি বিদ্যালয়ের জন্য কবিতা পাঠের বন্দোবস্ত করতে আদেশ দিলেন। ইউরোপীয়ান্ সুরে আমাদের কবিতা আবৃত্তি করার আদেশ দেওয়া হয়েছিল। আমাদের নেতার রচিত প্রথম কবিতা আমরা প্রত্যেক বিদ্যালয়ে প্রত্যেক গ্রামে এমন কি নাইরোবী শহরে যেয়েও আবৃত্তি করতে ভুলিনি। সেই কবিতার কি প্রভাব, পৃথিবীর লোক ভবিষ্যতে দেখতে পাবে। এখন আমি আমাদের নেতার রচিত কবিতা আবৃত্তি করছি:—
“সকলের তরে সকলে আমরা
প্রত্যেকে আমরা পরের তরে।”
“মাউ মাউ”
—সমাপ্ত—