মানসী/গুপ্ত প্রেম

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন

গুপ্ত প্রেম

তবে পরানে ভালােবাসা কেন গো দিলে
রূপ না দিলে যদি বিধি হে!
পূজার তরে হিয়া  উঠে যে ব্যাকুলিয়া,
পূজিব তারে গিয়া কী দিয়ে।

মনে গােপনে থাকে প্রেম, যায় না দেখা,
কুসুম দেয় তাই দেবতায়।
দাঁড়ায়ে থাকি দ্বারে,  চাহিয়া দেখি তারে,
কী ব’লে আপনারে দিব তায়।

ভালাে  বাসিলে ভালাে যারে দেখিতে হয়
সে যেন পারে ভালাে বাসিতে।
মধুর হাসি তার  দিক সে উপহার
মাধুরী ফুটে যার হাসিতে।

যার নবনীসুকুমার কপােলতল
কী শোভা পায় প্রেমলাজে গো !
যাহার ঢলঢল্  নয়নশতদল,
তারেই আঁখিজল সাজে গাে ।

তাই লুকায়ে থাকি সদা পাছে সে দেখে,
ভালােবাসিতে মরি শরমে ।
রুধিয়া মনোদ্বার  প্রেমের কারাগার
রচেছি আপনার মরমে।

আহা,  এ তনু-আবরণ শ্রীহীন ম্লান
ঝরিয়া পড়ে যদি শুকায়ে,
হৃদয়মাঝে মম দেবতা মনোরম
মাধুরী নিরুপম লুকায়ে।

যত গােপনে ভালােবাসি পরান ভরি
পরান ভরি উঠে শােভাতে।
যেমন কালাে মেঘে  অরুণ-আলাে লেগে
মাধুরী উঠে জেগে প্রভাতে।

আমি  সে শােভা কাহারে তাে দেখাতে নারি,
এ পােড়া দেহ সবে দেখে যায়।
প্রেম যে চুপে চুপে  ফুটিতে চাহে রূপে,
মনেরই কালােকূপে থেকে যায়।

দেখাে  বনের ভালােবাসা আঁধারে বসি
কুসুমে আপনারে বিকাশে।
তারকা নিজ হিয়া  তুলিছে উজলিয়া
আপন আলাে দিয়া লিখা সে।

ভবে  প্রেমের আঁখি প্রেম কাড়িতে চাহে,
মােহন রূপ তাই ধরিছে।
আমি যে আপনায়  ফুটাতে পারি নাই,
পরান কেঁদে তাই মরিছে।

আমি  আপন মধুরতা আপনি জানি
পরানে আছে যাহা জাগিয়া,
তাহারে লয়ে সেবা  দেখাতে পারিলে তা
যেত এ ব্যাকুলতা ভাগিয়া।
.
আমি  রূপসী নহি, তবু আমারো মনে
প্রেমের রূপ সে তত সুমধুর—
ধন সে যতনের শয়ন-স্বপনের,
করে সে জীবনের তমােদূর।

আমি আমার অপমান সহিতে পারি,
প্রেমের সহে না তাে অপমান।
অমরাবতী ত্যেজে  হৃদয়ে এসেছে যে,
প্রিয়েরও চেয়ে সে যে মহীয়ান।

পাছে  কুরূপ কভু তারে দেখিতে হয়
কুরূপ দেহ-মাঝে উদিয়া,
প্রাণের এক ধারে দেহের পরপারে
তাই তাে রাখি তারে রুধিয়া।

তাই আঁখিতে প্রকাশিতে চাহি নে তারে,
নীরবে থাকে তাই রসনা।
মুখে সে চাহে যত নয়ন করি নত,
গােপনে মরে কত বাসনা!

তাই যদি সে কাছে আসে পালাই দূরে,
আপন মনাে-আশা দলে যাই।
পাছে সে মােরে দেখে থমকি বলে ‘এ কে!’
দু হাতে মুখ ঢেকে চলে যাই।

পাছে নয়নে বচনে সে বুঝিতে পারে
আমার জীবনের কাহিনী—
পাছে সে মনে ভানে  ‘এও কি প্রেম জানে!
আমি তাে এর পানে চাহি নি!’

তবে পরানে ভালােবাসা কেন গাে দিলে
রূপ না দিলে যদি বিধি হে!
পূজার তরে হিয়া উঠে যে ব্যাকুলিয়া,
পূজিব তারে গিয়া কী দিয়ে !

১৩ জ্যৈষ্ঠ ১৮৮৮