মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় রচনাসমগ্র (পঞ্চম খণ্ড)/শত্রুমিত্র

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে চলুন অনুসন্ধানে চলুন

শত্ৰুমিত্র

আদালতের বাইরে আবার দেখা হয় দু জনের, পানবিড়ি চা মুড়ি মুড়কি আর উকিল মোক্তারের দোকানগুলির সামনে। দুজনে তারা পরস্পরের দিকে তাকায়। তীব্র বিদ্বেষের আগুনে যেন পুড়ে যায় দু জোড়া চোখ। দাঁতে দাঁত চেপে চাপা গলায় রসুল একটা অকথ্য কুৎসিত কথা বলে। কথাটা দামোদরের কানে যায় না, ভিতরের হিংসার ধাক্কাতেই সে হাত দুটাে মুঠো করে রসুলের দিকে দুপা এগিয়ে যায় নিজের অজান্তে, উচ্চারণ করে বিশ্ৰী একটা অভিশাপ, তারপর লাল কাঁকর বিছানো পথ ছেড়ে ঘাসের উপর দিয়ে হনহন করে চলতে আরম্ভ করে কিছু দূরের বড়ো বটগাছটার দিকে।

 বটের ছায়ায় অনেক লোক। কেউ বসে আছে, কেউ দাঁড়িয়ে। গাছটার গোড়ার দিকে ঘেঁষে বসে চাঁপা আকাশ-পাতাল ভাবছিল। তার মুখের ভাবটা ভুকুটিগ্ৰস্ত। পাশে বসে বিড়ি টানছিল দেবর মহেশ্বর। মহেশ্বরের তৈলহীন রুক্ষ চুলে নিখুঁত ভাঁজের টেরি।

 দুপুরের ঝাঁজালো রোদে চারিদিক ঝলসে যাচ্ছে। বটের বিস্তীর্ণ গাঢ় ছায়া পর্যন্ত গরম। প্রতাপগড়ের বাস ছাড়বে সেই বিকেলে, আদালতের কাজ শেষ হওয়ার পর। এখানেই সময় কাটাতে হবে সে পৰ্যন্ত।

 ফের আসতে হবে তোমাকে? চাঁপা শুধোয়।

 এগারো বছরের পুরানো উড়নি বাঁচিয়ে কোঁচার খুটে কপালের ঘাম মুছে দামোদর বলে, হাঁ, শালারা সময় নিল বেগতিক দেখে। সাতাশ তারিখ।

 একে দুয়ে দামোদরের অন্য সাক্ষীরা এসে সেখানে জোটে, মোট পাঁচজন। মাথার কাপড় চাঁপা আর একটু টেনে দেয়। আগে অনেকবার ভেবেছে, এখন অনেকবার ভাবে, তসরে তাকে কী ছাই মানিয়েছে কে জানে—আর কপালের প্রকাণ্ড চওড়া সিঁদুরের ফোঁটায়। এ বুদ্ধিটা বাতলিয়েছে বুদ্ধিমান কেদার উকিল। হাকিম নাকি পরম ধাৰ্মিক। এ সব দেখলে মন ভেজে। কিন্তু কই ভিজল বুড়োর মন, ওরা আবদার করতেই তো মুলতুবি করে দিল। মরণও হয় না বুড়ো শকুনটার!

 সাক্ষীরা তাদের গাঁয়েরই লোক। মামলা মুলতুবি হওয়ায় তারা খুশি না অখুশি হয়েছে ঠিক বোঝা যায় না। অহংকারে শীর্ণ বুক ফোলাবার চেষ্টা করে। সক্ৰোধে তারা ঘোষণা করে যে রসুল মিয়াকে আজ শেষ করে দিয়েছিল, বড়ো বাঁচা বেঁচে গেছে চালাকি করে। তারা যে সত্যই রাগ করেছে। অথচ সাক্ষী দিতে আসবার সুযোগ অনেকদিন বাড়ল বলে, আবার কিছু আদায় করা যাবে বলে, ভাবাটাও ঠিক যেন তারা চাপতে পারছে না।

 সাক্ষীদের মধ্যে গোঁসাই একেবারে চাক্ষুষ। গায়ের গলাবন্ধ ফতুয়াটার মতোই তার মুখ ময়লা, ঢিলে আর ছেঁড়া ছেঁড়া। সে উৎসাহে ফেলে ফেলে বলে, ভাবিছ কেন ভায়া, তালিম দেয়া মিছে সাক্ষী তো নই যে জেরায় কুপোকাত হব। দিক না উকিল যাকে খুশি, করুক না জেরা যদ্দিন পারে। নিক না সময়।

 হলধর সহজ সরল বোকা চাষি।—আটগন্ডা পয়সা বেশি দিতে হবে মোকে। নইলে এসবো নি কিন্তু বলে দিলাম, হাঁ। ভুবন ঘোষ মাইনর স্কুলের মাঝামাঝি মাস্টার। সে হঠাৎ খলখল করে হেসে বলে—কাণ্ড বটে বাবা। এত বেশি হেসে এ রকম একটা সাধারণ মন্তব্য করায় মনে হয় সেই বুঝি ব্যাপারটার মর্মার্থ উপলব্ধি করতে পেরেছে মাথাওলা লোকের মতো। নইলে এমন ভীষণ কাণ্ডে তার কেন মজা লাগবে?

 চাঁপার চোখে জল আসে। এরা কী নিষ্ঠুর!

 হারাধন বাস্তব বুদ্ধির লোক। সে বলে, বলি দামোদর, বাস তো ছাড়বে ও বেলা। খিদেয় পেট চোঁচোঁ করছে বাবা। খোরাকি বাবদ কী দেবে বলেছিলে, দাও দিকিনি, খেয়ে আসি।

 শুনে সকলের পেটেই খিদের জ্বালা চাড়া দিয়ে ওঠে, চাঁপার পর্যন্ত। সেই কোন সকালে গাঁ থেকে তারা খেয়ে বেরিয়েছে।


প্রতাপগড়ের একটিমাত্র বাস। প্রতাপগড়ের কাছাকাছি গিয়ে শাপুরে সবাই নামবে। দামোদরেরা বাসে উঠবার খানিক পরেই সাঙ্গোপাঙ্গ সঙ্গে নিয়ে রসুলও উঠে জাঁকিয়ে বসে। আদালতে এ পক্ষের আকস্মিক অচিন্তিত চালবাজিতে রসুলের রক্তে আগুন ধরে গিয়েছিল, ওরা কায়দা করে দিন ফেলে চালবাজিটা ব্যর্থ করে দেওয়ায় খেপে গিয়েছিল দামোদর। খুনোখুনি হয়ে যাওয়া কিছুই আশ্চর্য ছিল না। এখন সে দিশেহারা উন্মত্ত আক্রোশ আর নেই, এসেছে গভীর হিংসা আর ঘৃণা। আমি মরি মরব ওকে তো মারব, এই বেপরোয়া ভাবের বদলে দুজনের মধ্যেই জেগেছে নিজের কোনো ক্ষতি না করে অপরের সর্বনাশ করার কামনা—এমন কী পারলে অপরের সর্বনাশ থেকে নিজের কিছু লাভ করে নেবার সাধ। চাঁপা ঘোমটা টেনে ভালো করে ঢেকে ঢুকে বসে। বাসে তিনজন লালমুখো গোরা মদে চুর হয়ে বসে ছিল আগে থেকে, মাঝে মাঝে আড়ােচাখে সে তাদের দিকে তাকায়। রসুলের দিকে চোখ ফেরাতে তার সাহস হয় না।

 শহর থেকে বেরিয়ে রাস্তা সংকীর্ণ হয়ে আসে। পিছন আর সামনে থেকে ধুলো উড়িয়ে রাস্তা কাঁপিয়ে লরি চলে যায়, শব্দ পেলেই বাসচালক কানাই গতি মন্থর করে যত পারে নর্দমার ধার ঘেঁষে সরে যায়, লরি পেরিয়ে গেলে গাল দিতে থাকে চাপা গলায়। চাঁপা বসেছে রাস্তার ভেতরের দিকের জানালায়—লরি কিছু দূরে থাকতেই সে নিশ্বাস বন্ধ করে চােখ বোজে।

 চোখ বুজে থাকার সময়েই একবার প্রচণ্ড আওয়াজের সঙ্গে সে ধাক্কা খেয়ে পাশের বুড়িকে নিয়ে নীচে পড়ে যায়। বাসটাও একটু কাত হয়ে থেমে পড়ে সঙ্গে সঙ্গে।

 একজন গোরা চাঁপাকে পাঁজাকোলা করে তুলবার চেষ্টা করতেই সে ধড়মড়িয়ে উঠে পড়ে। দরজা দিয়ে বেরোবার জন্য প্যাসেঞ্জারদের তখন ঠেলা ঠেলি হুড়োহুড়ি পড়ে গেছে। দু-তিনজন দরজা থেকে সোজা নালায় গিয়ে পড়ে। কানাই গালাগালি বন্ধ করে চেঁচায়, ভয় নেই, ঠিক আছে! ভয় নেই, ঠিক আছে!

 ঠিকই আছে কলটা। ডাইনের মাডগার্ডটা শুধু ভেঙেছে আর বডির খানিকটা তুবড়ে ভেতরের দিকে দেবে গেছে। আর চার-ছ-ইঞ্চির জন্য বাসটা উলটে নালায় পড়েনি।

 নালায় যারা পড়েছিল নামতে গিয়ে তাদের একজনের হাত মচকেছে, হয়তো ভেঙেছে। সঙ্গী জল কাদা সাফ করে দিলে বাসে উঠে সে কেবলই বলতে থাকে, নম্বর নিয়েছ কেউ? নম্বর?

 আর একজন বলে, আরো মশায়, রাখুন নম্বর! নম্বর দিয়ে হবে কী?

 গাড়ি ছাড়বার আগে কানাই বলে, শালারা! যতটুকু উচিত তার চেয়ে এক ইঞ্চি যদি সরি—

 না না, গোয়ার্তুমি কোরো না হে। মাঝবয়সি মোটাসোটা একজন প্যাসেঞ্জার বলে।

 কীসের গোয়ার্তুমি? ভয় পেলেই ও শালারা মজা পায়। আমি জানি।

 বাইরে সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসে। খেত মাঠ জলায় আর আকাশে চোখ বুলিয়ে যেতে যেতে পড়ার ব্যথা ও দুর্ঘটনার আতঙ্ক চাঁপার মিলিয়ে আসে—নতুন আর একটা লরির আওয়াজ কানে আসার সময়টা ছাড়া। ধরে তুলবার ছলে মাতাল গোরাটার অভদ্র কুৎসিত স্পর্শটাই সর্বাঙ্গে ভয়ার্তা অস্বস্তিবোধের মতো রিরি করতে থাকে। একটা মুখ-ভাঙা বোতল থেকে ঢেলে ঢেলে ওরা আবার মদ খেতে শুরু করেছে। লরির ধাক্কা লাগার সময় বোতলের মুখটা বোধ হয় ভেঙে গিয়েছিল।

 পাকুনিয়ার মোড়ে বাস আসে। আরও দুজন গোরা উঠে আসে। দুজন চাষাকে ধরে তুলে দাঁড় করিয়ে দিয়ে আগের তিনজনের পাশে বসে কিচির মিচির কথা শুরু করে দেয়—একজন হাতের বোতলটা দেখায় তিনজনকে। তিনজন ঘন ঘন তাকায় চাঁপার দিকে, নতুন দুজন মাঝে মাঝে এদিক ওদিকে চোখ ফেরানোর সময়টুকু ছাড়া চাঁপার গায়েই চোখ পেতে রাখে।

 হঠাৎ বলা নেই কওয়া নেই একজন একতাড়া নোট বার করে চাঁপার দিকে বাড়িয়ে ধরে হাসে। দামোদর আর মহেশ্বর কটকটিয়ে তাকায়। রসুল ভ্রুকুটি করে নুরে হাত বুলোয়। চাঁপা তাড়াতাড়ি মুখ বার করে দেয় জানালা দিয়ে বাইরে। গাড়িসুদ্ধ লোক স্তব্ধ হয়ে বসে থাকে।

 রসুলের মুখের ভাবটা দেখবার এমন জোরালো ইচ্ছা দামোদরের জাগে। তার কেবলই মনে হয়, তার এই অপমানে রসুলের মুখে নিশ্চয় শয়তানি পরিতৃপ্তির হাসি ফুটেছে। তাকবে না ভেবেও কখন যে সে তাকিয়ে বসে নিজেই টের পায় না। রসুলের মুখে হাসি নেই। কিন্তু তার দিকেই সে তাকিয়ে আছে অনুকম্পা মেশানো অবজ্ঞাভরা এমন এক মুখের ভাব নিয়ে যার অর্থ অতি সুস্পষ্ট। চুপচাপ অপমান সহ্য করার জন্য রসুল তাকে মনে করছে অপদার্থ, অমরদ কেঁচো। কানের কাছে ঝাঁঝাঁ করতে থাকে দামোদরের। তাড়াতাড়ি সে চোখ ফিরিয়ে নেয়।

 মনে মনে বলে, রও। টের পাবে। তোমায় যদি না আমি—কী করলে যে এ অপমানের প্ৰতিশোধ রসুল পাবে সে ভেবে পায় না।

 চাঁপার দিকে গোরাটার নোটের তাড়া বাড়িয়ে ধরার সবটুকু দোষ গিয়ে পড়ে রসুলের ঘাড়ে।

 রসুল ভাবে, গোরাটা যদি হাত দিত মাগিটার গায়ে! কী খুশিই সে হত! তাকে জব্দ করতে চালাকিবাজি খেলার মজাটা টের পেয়ে যেত ব্যাটারা। বলবে না ভেবেও আজিজের কানে কানে কখন যে সে কথাটা বলে ফেলে। আজিজ কনুই দিয়ে তার বুকে একটা খোঁচা মেরে হাসতে থাকে।

 আধখানা চাঁদ আকাশে উঠেই ছিল। দিনের আলোটা ম্লান হতে হতে এক সময় আধো জ্যোৎস্না হয়ে যায়। শাপুরের নির্জন রাস্তার মাথায় বাসটা থামলে রসুলেরাই আগে নেমে যায়।

 চাঁপা নামবার সময় একজন গোরা তার আঁচলটা চেপে ধরে, হ্যাঁচকা টান দিয়ে আঁচল ছাড়িয়ে চাঁপা হুড়মুড় করে বাস থেকে প্রায় নীচে গড়িয়ে পড়ে।

 আরও একটু দাঁড়িয়ে বাস ছেড়ে দেয়। তখন সেই চলন্ত বাস থেকে টুপটাপ করে নেমে পড়ে পাঁচজন গোরা।

 শাপুরের রাস্তা ধরে রসুলেরা তখন খানিকটা এগিয়ে গেছে। বড়ো রাস্তা থেকে শাপুর প্রায় আধক্রোশ তফাতে, আঁকাবাঁকা গাছপালা ঢাকা পথ। প্রথম বাঁকটা ঘুরবার সময় মুখ ফিরিয়ে রসুল দেখতে পায়, চাঁপারা জোরে জোরে পথ হাঁটতে শুরু করেছে, তাদের কয়েক হাত পিছনে আসছে গোরারা।

 বাসের শব্দ দূরে মিলিয়ে যায়। খেত মাঠ জলা জঙ্গলের মুখর স্তব্ধতা ঝমঝম করে চারিদিকে। তারই মধ্যে চাঁপার আর্তনাদ শুনে রসুল ও তার সঙ্গীরা থমকে দাঁড়ায়।

 কী হয়েছে তাদের বলে দিতে হয় না। ম্লান জ্যোৎস্নায় তারা পরস্পরের মুখ চাওয়া চাওয়ি করে। দুটি মূর্তি ছুটে এসে তাদের পাশ কাটিয়ে উর্ধ্বশ্বাসে উধাও হয়ে যায় গ্রামের দিকে—গােঁসাই আর ভুবন ঘোষ।

 হলধরও ছুটছিল, এদের দেখে সে দাঁড়ায়। হাঁপাতে হাঁপাতে বলে ভাই সর্বনাশ! ছুটে এসো।

 অজিজ, বলে যা যা আচ্ছা হয়েছে।

 তখন বোধ হয় সরল সহজ হলধরের খেয়াল হয়, ওরা কারা এবং এরা কারা। সে চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে।

 তার মুখ হাঁ হয়ে যায়। চাঁপার আর্ত চিৎকার শোনা যায় বেশি দূরে নয়।

 হাতের লাঠি শক্ত করে চেপে ধরে রসুল সঙ্গীদের বলে, চল যাই।

 অজিজ বলে, ওদের বন্দুক আছে।

 লাঠির কাছে বন্দুক? বলে রসুল ছুটতে আরম্ভ করে।