মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় রচনাসমগ্র (পঞ্চম খণ্ড)/আজ কাল পরশুর গল্প

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে চলুন অনুসন্ধানে চলুন


আজ কাল পরশুর গল্প

মানসুকিয়ার আকাশ বেয়ে সূর্য উঠেছে মাঝামাঝি। নিজের রাঁধা ভাত আর শোল মাছের ঝাল খেতে বসেছে রামপদ ভাঙা ঘরের দাওয়ায়। চালার খড় পুরোনো পচাটে আর দেয়াল শুধু মাটির। চালা আর দেয়াল তাই টিকে আছে, ছ মাসের সুযোগেও কেউ হাত দেয়নি। আর সব গেছে, বেড়া খুঁটি মাচা তক্তা—মাটির হাঁড়ি-কলসিগুলি পর্যন্ত। খুঁটির অভাবে দাওয়ার চালাটা হুমড়ি খেয়ে পড়েছে কাত হয়ে। চালাটা কেশব আর তোলেনি। কার জন্য তুলবো? দাওয়ার দুপাশ দিয়ে মাথা নিচু করে ভেতরে আসা-যাওয়া চলে। অন্ধকার হয়েছে, হোক।

 হুমড়ি খেয়ে কাত-হয়ে-পড়া চালার নীচে আঁধার দাওয়ায় নিজের রাঁধা শোলের ঝাল দিয়ে ভাত খেতে বসেছে রামপদ, ওদিকে খালের ঘাটে নৌকো থেকে নেমেছে তিনটি মেয়েছেলে আর একটি ছেলে।

 এদের মধ্যে একজন রামপদর বউ মুক্তা। তার মাথায় রীতিমতো কপাল-ঢাকা ঘোমটা। সুরমার ঘোমটা সিঁথির সিঁদুরের রেখাটুকুও ঢাকেনি ভালো করে। এতে আর শাড়ি-পরার ভঙ্গিতে আর চলন-ফিরন-বলনের তফাতে টের পাওয়া যায় মুক্তা চাষাভুসো গেরস্থঘরের বউ, অন্য দুজন শহুরে ভদ্রঘরের মেয়ে বউ, যারা বাইরে বেরোয়, কাজ করে, অকাজ কি সুকাজ তা নিয়ে দেশজুড়ে মতভেদ। নইলে, শাড়িখানা বুঝি দামিই হবে আর মিহিই হবে মুক্তার, সাধনা আর সুরমার কাপড়ের চেয়ে। এর চেয়ে কম দামি ময়লা শাড়ি মুক্তার নেই। নইলে তাই পরে সে গাঁয়ে ফিরত।

 তার বুক কাঁপছে, গা কাঁপছে, মুখ শুকিয়ে গেছে। মোটা চট মুড়ি দিয়ে বস্তা হয়ে আসতে পারলে বাঁচত, মানুষ যাতে চিনতে না পারে।

 চিনতে পারা হয়তো কিছু কঠিন হত। কিন্তু মানসুকিয়ার কে না জানে মুক্তা আজ গাঁয়ে ফিরছে। বাবুরা আর মা ঠাকরুনরা রামপদর বউকে উদ্ধার করে ফিরিয়ে এনে দিচ্ছে রামপদর ঘরে।

 চারটি বাঁশের খুঁটির ওপরে হোগলার একটু ছাউনি—গগনের পানবিড়ির দোকান। পিছনের বড়ো গাছটার ডালপালার ছায়া এখন চওড়া করেছে হােগলার ছায়া। গাছের গুঁড়িটা প্রায় নালার মধ্যে ও পাশের ধার ঘেষে, নইলে গুঁড়ি ঘেঁষে বসতে পারলে হােগলার ছাউনিটুকুও গগনের তুলতে হত না।

 কজন ঝিমুচ্ছিল বাঁচবার চেষ্টার কষ্টে, খানিকটা তারা সজীব হয়ে ওঠে। বুড়ো সুদাসের চোয়ালের হাড় প্রকাণ্ড, এমনভাবে ঠেলে বেরিয়েছে যে পাঁজরের হাড় না গুণে ওখানে নজর আটকে যায়।

 রামের বউটা তবে এল?

 তাই তো দেখি। নিকুঞ্জ বলে, তার আধপোড়া বিড়িটা এই বিশেষ উপলক্ষে ধরিয়ে ফেলবে কি না ভাবতে ভাবতে। এক পয়সার চারটি বিড়ি কিনেছিল কাল। আধখানা আছে।

 ঘনশ্যামের টিনের চালার আড়ত থেকে গোকুল চারজনের ঠিক সামনে দিয়ে রাস্তা পেরোবার ছলে ঘনিষ্ঠ দর্শনের পুলক লাভ করে এদের সঙ্গে এসে দাঁড়ায়।

 গদার বউ মারা গেছে ও বছর। ওরা খানিকটা গাঁয়ের দিকে এগিয়ে গেলে সে মুখ বাঁকিয়ে বলে, রাম নেবে ওকে?

 না নেবে তো না নেবে। ওর বয়ে গেল। জোয়ান গোকুল বলে, ঘনশ্যামের আড়তে কাজ করে মোটামুটি পেট ভরে খেতে পাওয়ার তেজে।

 সুদাস কেমন হতাশার সুরে বলে, উচিত তো না ঘরে নেয়া।

 গোকুলকে সে ধমক দেয় না ‘তুই থাম ছোঁড়া' বলে। তীব্র কুৎসিত মন্তব্য করে না মুক্তাকে ফিরিয়ে নেবার কল্পনারও বিরুদ্ধে! গোকুলের কথাতেই যেন প্রকারান্তরে সায় দিয়ে যোগ দেয়, ফিরবার কী দরকার ছিল ছুঁড়ির?

 গোকুল ইয়ার্কি দিয়ে কথাটা বলেছিল। কিন্তু ইয়ার্কিতেও বাস্তব যুক্তি টােল খায় না, হালকা হয় না।

 ছেঁড়া ময়লা ন্যাকড়া-জড়ানো কঙ্কাল ছিল মুক্তা। সকলের মতো সুদাসেরও চোখে পড়েছে মুক্তার শাড়িখানা। সকলের মতো সেও টের পেয়েছে মুক্তার দেহটি আজ বেশ পরিপুষ্ট।

 আঁকাবাঁকা রাস্তা, এপাড়া ওপাড়া হয়ে, পুকুর ডোবা বাঁশবন আমবাগান গাছপালা জঙ্গলে শান্ত। মুক্তা চেনে সংক্ষেপ পথ। যতটা পারা যায় বসতি এড়িয়ে চলতে আরও সে পথ সংক্ষেপ করে প্রায় অগম্য জঙ্গল মাঠ বাগানে তাদের পথ দেখিয়ে নিয়ে চলে। তবু গাঁ তো অরণ্য হয়নি, পাড়া পেরোতে হয়, ঘন বসতি কোনটা, কোনটা ছড়ানো। ভদ্রমানুষেরা তাকায় একটু উদাসীন ভাবে, যারা গুজব শুনেছে তারাও, শুধু ভুরুগুলি তাদের একটু কুঁচকে যায় সকৌতুক কৌতুহলে। চাষাভুসোদের কমবয়সি মেয়ে-বউরা বেড়ার আড়াল থেকে উঁকি দেয়, উত্তেজিত ফিসফিসানি কথার আওয়াজ বেশ খানিকটা দূর পর্যন্তই পৌঁছায়। বয়স্করা প্রকাশ্যে এগিয়ে যায় পথের ধারে, কেউ কেউ মুক্তাকে কথা শোনায় খোঁচা-দেওয়া ছ্যাঁকা-লাগানো কথা। কেউ চুপ করে থাকে, কেমন একটা দরদ বোধ করে, বাছার কচি ছেলেটা মরেছে, কোথায় না জানি বাছা কত লাঞ্ছনা কত উৎপীড়ন সয়েছে ভেবে।

 মধু কামারের বউ গিরির মা একেবারে সামনে দাঁড়িয়ে পথ আটকায় তার মস্ত ফোলা-ফাঁপা শরীর নিয়ে। মধু কামার নিরুদ্দেশ হয়েছে বছরখানেক, কিছুদিন আগে গিরিও উধাও হয়ে গেছে।

 ক্যান লা মাগি? গিরির মা মুক্তাকে শুধোতে থাকে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে কুৎসিত গালাগালি দিয়ে দিয়ে, ক্যান ফিরেছিস গাঁয়ে, বুকের কী পাটা নিয়ে? ঝেঁটিয়ে তাড়াব তোকে। দূর-অ দূর-অ! যা।

 হাঁপাতে হাঁপাতে সে কথা বলে, যেন হলকায় হলকায় আগুন বেরিয়ে আসে হিংসার বিদ্বেষের। সুরমা স্মিতমুখে মিষ্টিকথায় তাকে থামাতে গিয়ে তার গালের ঝাঁঝে এক পা পিছিয়ে আসে। মনে হয় গিরির মা বুঝি শেষ পর্যন্ত আঁচড়ে কামড়েই দেবে মুক্তাকে। মুক্তা দাঁড়িয়ে থাকে নিস্পন্দ হয়ে। এরা মুখ চাওয়াচাওয়ি করে।

 মানুষ জমেছে কয়েকজন একজন, কোমরে গামছা-পরা আর মাথায় কাপড়খানা পাগড়ির মতো জড়ানো, হঠাৎ জোরে হেসে ওঠে। একজন বলে, বাঃ। বাঃ বেশ। একজন উরুতে থাপড় মেরে গেয়ো ভঙ্গিতে হাততালি দেয়।

 একটু তফাতে নালা পেরোবার জন্য পাতা তালগাছের কাণ্ডটার এ মাথায় বসেছিল গদাধর, বহুদূরের মানুষকে হাঁক দেবার মতো জোর গলায় এমনি সময়ে সে ডাকে, গিরির মা। বলি ওগো গিরির মা।

 গিরির মা মুখ ফিরিয়ে তাকাতে সে আবার বলে তেমনি জোর গলায়, গিরি যে তোমায় ডাকছে গো গিরির মা কখন থেকে! শুনতে পাও না?

 গিরির মা থমকে যায়, দুঃস্বপ্ন-ভাঙা মানুষের মতো ক্ষণিক সংবিৎ খোঁজে বিমূঢ়ের মতো, তারপর যেন চোখের পলকে এলিয়ে যায়।

 ডাকছে? অ্যাঁ, ডাকছে নাকি গিরি? যাই লো গিরি, যাই।

 এতগুলি মানুষ দেখে লজ্জায় সে জিভ কাটে। কোমরে এক পাক জড়ানো ছেঁড়া কাঁথাখানা চট করে খুলে নিয়ে মাথায় ঘোমটার মতো চাপিয়ে এগিয়ে যায় ঘরের দিকে।

 ঘরের সামনে পুরোনো কাঁঠাল গাছের ছায়ায় বসে রামপদ সবে হুঁকোয় টান দিয়েছিল। তামাক সেজেছে একটুখানি, ডুমুর ফলের মতো। তামাক পাওয়া বড়ো কষ্ট। মুক্তাকে সাথে নিয়ে ওদের আসতে দেখে সে হুঁকোটা গাছে ঠেস দিয়ে রেখে উঠে দাঁড়ায়। এমনিই পুড়ে যেতে থাকে তার অত কষ্টে জোগাড় করা তামাক।

 আসেন। রামপদ বলে ক্লিষ্ট স্বরে, দ্বিধা-সংশয়-পীড়িত ভীরু, অসহায়ের মতো। তিনজন কাছে এগিয়ে এসেছে, ওদের দিকে না তাকিয়েই সে অনিশ্চিত অভ্যর্থনা জানায়, চোখ সে পেতে রাখে মুক্তার উপর। খানিক তফাতে থাকতেই মুক্তা থেমে গিয়ে হয়ে আছে কাঠের পুতুল।

 তোমার বউকে দিয়ে গেলাম ভাই। যা বলার সব তোমায় বলেছি। ওর মন ঠিক আছে। যা হবার হয়ে গেছে, ভুলে গিয়ে আবার তোমরা ঘর-সংসার পাতো। আর একদিন এসে আমরা দেখে যাব।

 দিয়ে তো গেলেন। বলে উৎসাহহীন বিমর্ষ রামপদ। মাথার চুলে হাত বুলিয়ে একবার সে ঢোক গেলে, চোখের পাতা পিটপিট করে তার। শীর্ণ মুখখানা বসন্তের দাগে ভরা, চুপসানো বাঁ গালটাতে লম্বা ক্ষতের দাগ। তবু এই মুখেও তার হৃদয়ের জোরালো আলোড়নের কিছু কিছু নির্দেশ ফুটেছে তার শিথিল নিস্তেজ সৰ্বাঙ্গজোড়া ঘোষণার সুস্পষ্ট মানে ভেদ করে।

 যাবে বলেছিলে, গেল না কেন রামপদ?

 তাই তো মুশকিল হয়েছে দিদিমণি।

 সমাজ তাকে শাসিয়েছে, বউকে ঘরে নেওয়া চলবে না। নিলে বিপদ আছে। সমাজ মানে ঘনশ্যাম দাস, কানাই বিশ্বাস, নিধু নন্দী, লোচন কুমার, বিধু ঘোষ, মধু নন্দী এরা কজন। ঘনশ্যাম একরকম সমাজপতি এ অঞ্চলের চাষাভুসোদের, অর্থাৎ চাষি গয়লা কামার কুমার তেলি ঘরামি জেলে প্রভৃতির। সেই ডেকে কাল ধমক দিয়ে বারণ করে দিয়েছে রামপদকে। অন্য কজন উপস্থিত ছিল সেখানে। একটু ভয় হয়েছে তাই রামপদর। একটু ভাবনা হয়েছে।

 একটু!

 নৌকোতে পাতবার শতরঞ্চিটা কাঁঠালতলায় বিছিয়ে তিনজন বসে। রামপদকেও বসায়। মুক্তা এতক্ষণ পরে সরে এসে সুরমার পিছনে গা ঘেঁষে মাটিতেই বসে। ঘোমটা তার ছোটাে হয়ে গেছে। ছোটাে ঘোমটার মিথ্যে আড়াল থেকে একদৃষ্টে সে তাকিয়ে থাকে রামপদর মুখের দিকে। বউয়ের চোখে এমন চাউনি রামপদ কোনোদিন দ্যাখেনি।

 এ সমস্যা তুচ্ছ করার মতো নয়। একজন বড়ো মাতব্বর আর তার ধামাধারা কজন তুচ্ছ লোক রামপদর পারিবারিক ব্যাপারে নিয়ে কর্তালি না করতে এলে এ হাঙ্গামা ঘটত না। দু-চারজন হয়তো ঠাট্টা বিদ্রুপ করত কিছুদিন, দু-চারজন হয়তো বর্জনও করত রামপদকে, কিন্তু সাধারণভাবে মানুষ মাথা ঘামাত না। চারিদিকে যা ঘটেছে আর ঘটছে তার কাছে। এ আর এমন কী কাণ্ড? না খেয়ে রোগে ভুগে কত মানুষ মরে গেল, কত মানুষ কত পরিবার নিরুদ্দেশ হয়ে গেল, কোনো বাড়ির দশজন কোথায় গিয়ে ফিরে এল মোটে দুজন ধুঁকতে ধুঁকতে, কত মেয়ে-বউ চালান হয়ে গেল কোথায়, এমনি সব কাণ্ডের মধ্যে কার বউ কোথায় কমাস নষ্টামি করে ফিরে এসেছে, এ কী আবার একটা গণ্য করার মতো ঘটনা? এ যেন প্রলয়ের সময় কে কার ডোবার জল নোংরা করছে তাই নিয়ে ব্যস্ত হওয়া। কিন্তু ঘনশ্যামের কজন যখন গায়ে পড়ে উসকে দিতে চাইছে সবাইকে, কী জানি কী ঘটবে।

 সুরমা জিজ্ঞেস করে, যাই হােক, বউয়ের জন্য ভাত তো রেখেছ রামপদ?

 আজ্ঞে আপনারা?

 আমাদের ব্যবস্থা আছে। বউকে দুটি খেতে দাও তো তুমি। চালাটা তোলোনি কেন?

 তুলব। তুলব।

 সুরমাই বলে কয়ে নিয়ে দুটি খাওয়ার ছলে মুক্তাকে ভিতরে পাঠিয়ে দেয় রামপদর সঙ্গে। বাইরে যা ঘটুক, ওদের মধ্যে আগে একটু কথা আর বোঝাপড়া হওয়া দরকার। গ্রামের একজন কর্মী শঙ্করের বাড়িতে তাদের এ বেলা নাওয়া-খাওয়ার ব্যবস্থা আছে। অনেক আগেই তার এসে পড়া উচিত ছিল। গ্রামের অবস্থা সে ভালো জানে। তার সঙ্গে পরামর্শ করবারও দরকার হবে।

 ঝাঁপটা উঁচু করে তুলে দিতে আরেকটু আলো হয় ঘরে।

 নাইবে? রামপদ শুধোয়।

 মোর জন্যে রেঁধে রেখেছ! বলে মুক্তা।

 শোলের ঝাল আর ভাত। আলুনি হৈছে কিন্তু?

 এগারো মাস আর অঘটনের ব্যবধান আর কিছুতে নেই, শুধু যেন আছে অতি বেশি রয়ে রয়ে অল্প দুটি কথা বলায়, নিজের নিজের অনেক রকম ভাবনার গাদা নিয়ে নিজে নিজে ফাঁপরে পড়লে যেমন হয়। চুপ করে থাকার বড়ো যন্ত্রণা। ভাবনাগুলি নড়তে নড়তে মুক্তার মনে আসে: ছেলেটা তার ছিল সাতমাসের রামপদ যখন বিদেশ যায়। এটা বলার কথা। মুক্তা বাঁচে।

 খোকন গেল কুপথ্যি খেয়ে। মাই-দুধ শুকিয়ে গেল, এক ফোঁটা নেই। চাল গুঁড়িয়ে বার্লি মতন করে দিলাম কদিন। চাল ফুরলে কী দিই। না খেয়ে শুকিয়ে মরবে। এমনিতে, শাকপাত যা সেদ্ধ খেতাম, তাই দিলাম, করি কী! তাতেই শেষ হল।

 না কেঁদে ধীর কথায় বিবরণটা দেবে ভেবেছিল মুক্তা, কিন্তু তা কি হয়! আগে পারত, না খেয়ে যখন ভোঁতা নির্জীব হয়ে গিয়েছিল অনুভূতি। আজ পুষ্ট শরীরে শুধু কমাসের অকথ্য অভিজ্ঞতা কেন বোধকে ঠেকাতে পারবে? গলা ধরে চোখে জল আসে মুক্তার।

 শেষ দুটাে দিন যা করলে গো পেটের যন্ত্রণায়, দুমড়ে মুচড়ে ধনুকের মতো বেঁকে—

 মুক্তা এবার কাঁদে।

 কেউ কিছু করলে না?

 দাসমশায় দুধ দিতে চেইছিল, মোকেও দেবে খেতে পরতে। তখন কি জানি মোর অদেষ্টে এই আছে? জানলে পরে রাজি হতাম, বাচ্ছাটা তো বাঁচিত। মরণ মোর হলই, সেও মরাল।

 চোখ মুছে নিজেকে সামলাতে চেষ্টা করে মুক্তা। এবার কৈফিয়ত দিতে হবে। কেঁদে ককিয়ে দরদ সে চায় না, সুবিচার চায় না। সব জেনে যা ভালো বুঝবে করবে রামপদ, যেমন তার বিবেচনা হয়।

 খোকন মরল, তোমার কোনো পাত্তা নেই। দাসমশায় রোজ পাঠাচ্ছে নেড়ার মাকে। দিন গেলে একমুঠো খেতে পাইনে। এক রাতে দুটাে মদ এলে, কামড়ে দিয়ে বাদাড়ে পালিয়ে বাঁচলাম এতটুকুর জন্যে। দিশেমিশে ঠিক রইল না আর, গেলাম সদরে চলে।

 দাসমশায় তো খুব করেছেন মোদের জন্যে! রামপদ বলে চাপা ঝাঁঝালো সুরে।—যা তুই, নেয়ে আয় গা।

 শোলের ঝাল দিয়ে মুক্তা বসেছে ভাত খেতে, বাইরে থেকে ঘনশ্যাম দাসের হাঁক অ্যাসে: রামপদ!

 তুই খা। বলে রামপদ বাইরে যায়। জন পাঁচেক সঙ্গীকে সঙ্গে নিয়ে ঘনশ্যাম এসে দাঁড়িয়েছে সরকারি সমনজারির পেয়াদার মতো গরম গাম্ভীর্য নিয়ে। শঙ্কর এসেছিল একটু আগে, ঘনশ্যামদের আবির্ভাবে সুরমাদের যাওয়া হয়নি।

 বউ এসেছে রামপদ?

 আজ্ঞে।

 ঘরে নিয়েছিস?

 আজ্ঞে।

 বার করে দে এই দণ্ডে। যারা এনেছে তাদের সঙ্গে ফিরে যাক।

 ভাত খাচ্ছে।

 রামপন্দর ভাবসাব জবাব ভঙ্গি কিছুই ভালো লাগে না ঘনশ্যামদের। টেকো নন্দী শুধোয়, তোর মতলব কী?

 রামপদ ঘাড় কাত করে।—আজ্ঞে।

 বউকে রাখবি ঘরে?

 বিয়ে করা ইস্তিরি আজ্ঞে। ফেলি কী করে?


এই নিয়ে একটা গোলমালের সৃষ্টি হয়। মানসুকিয়ার চাষাভুসোর সমাজে। ঘনশ্যামরাই জোর করে জাগিয়ে রাখে আন্দোলনটাকে। নইলে হয়তো আপনা থেকেই ঝিমিয়ে ঝিমিয়ে থেমে যেত মুক্তার ঘরে ফেরার চাঞ্চল্য। সামাজিক শাস্তি দেওয়া ছাড়া আর কিছু করার ক্ষমতা ঘনশ্যামদের নেই, জমিদার দেশে থাকলেও হয়তো তাকে দিয়ে কিছু করানো যেত। তবে সামাজিক শাস্তিই যথেষ্ট সবাই যদি সব রকমে বর্জন করে রামপদকে, কথা পর্যন্ত বন্ধ করে, তাতেই পরম শিক্ষা হবে রামপদর। সমাজের নির্দেশ অমান্য করলে শুধু একঘরে হয়েই যে সে রেহাই পাবে না, তাও জানা কথা। টিটকারি, গঞ্জনা, মারধোর, ঘরে আগুন লাগা সব কিছুই ঘটবে তখন। সবাই এ সব করে না, তার দরকারও হয় না। সবাই যাকে ত্যাগ করেছে, যার পক্ষে কেউ নেই, হয় বিপক্ষে নয় উদাসীন, যার উপর যা খুশি অত্যাচার করলেও কেউ ফিরে তাকাবে না, মিলেমিশে স্নেহ পরিত্যক্ত অসহায় মানুষটাকে পীড়ন করতে বড়ো ভালোবাসে এমন যারা আছে কজন, তাদের দিয়েই কাজ হয়।

 তবে সময়টা পড়েছে বড়ো খারাপ। প্রায় সকলেই আশাহত, উৎপীড়িত, সমাজ-পরিত্যক্ত অসহায়েরই মতো। মনগুলি ভাঙা, দেহগুলিও। আজ কী করে বাঁচা যায় আর কাল কী হবে এই চেষ্টা আর ভাবনা নিয়ে এমন ব্যস্ত আর বিব্রত সবাই যে জোট বেঁধে ঘোট পাকবার অবসর আর তাগিদ যেন জীবন থেকে মুছে গেছে। সকলকে উত্তেজিত করতে গিয়ে এই সত্যতা বেরিয়ে আসে। রামপদর কাণ্ডের কথাটা হুঁ হাঁ দিয়ে সেরে দিয়েই সবাই আলোচনা করতে চায় ধান চাল নুন কাপড়ের কথা, যুদ্ধের কথা। পেতে চায় বিশেষ অনুগ্রহ, সামান্য সুবিধা ও সুব্যবস্থা। একটু আশা-ভরসার ইঙ্গিত পেলে যেন জীবন্ত হয়ে ওঠে, যার চিহ্নটুকু দেখা যায় না, রামপন্দর বিচার থেকে রোমাঞ্চলাভের সুনিশ্চিত সম্ভাবনায়।

 কয়েকজন তো স্পষ্ট বলে বসল, ছেড়ে দেন না, যাক গে। অমন কত ঘটছে, কদিন সামলাবেন? যা দিনকাল পড়েছে।

 আপনজনকে যারা হারিয়েছে দুর্ভিক্ষে মহামারীতে বাঁচবার জন্য শহরে পালিয়ে, আপনজন যাদের হয়ে গেছে নিরুদ্দেশ, বিদেশ থেকে ফিরে যারা ঘর দেখেছে খালি, এ ব্যাপারে চুপ করে থাকার আর ব্যাপারটা চাপা দেবার ইচ্ছা তাদেরই বেশি জোরালো। এ রকম কিছুই ঘটেনি এমন পরিবারও কটাই বা আছে।

 ঘনশ্যাম একটু দমে যায়। বোঝার উপর শাকের আঁটি চাপায় গোকুল।

 বাড়াবাড়ি করলেন খানিক।

 বটে?

 সাধু হিদে নখাদের দিয়ে মেরে লাল করে দিতেন একদিন, চুকে যেত, বিচারসভা ডেকে বসলেন। দশজনে যদি দশটা কথা কয়, যাবেন কোথা? দুগগার কথা যদি তোলে কেউ?

 তুই চুপ থাক হারামজাদা। ঘনশ্যাম বলে ধমক দিয়ে, কিন্তু হাত তার উঠে গিয়ে ঘাঁটতে থাকে বুকের ঘন লোম। জ্বালাও করে মনটা রামপদর স্পর্ধায়। সে নাকি দাওয়ায় চালা তুলেছে, বেড়া দিয়েছে, গুছিয়ে নিচ্ছে সংসার। বলে নাকি বেড়াচ্ছে, গাঁয়ে না টিকতে দিলে বউকে নিয়ে চলে যাবে অন্য কোথাও। আগের চেয়ে কত বেশি খাতির করছে ঘনশ্যামকে লোকে আজ, তুচ্ছ একটা রামপদর কাছে সে হার মানবে। মনটা জ্বালাও করেও ঘনশ্যামের।

 পরদিন বসবে বিচারসভা। সদরে জরুরি কাজ সারাতে বেরোবার সময় ঘনশ্যাম ঠিক করে যায় সকাল সকাল রওনা দিয়ে বিকাল বিকাল গাঁয়ে ফিরবে, গিরির কাছে আজ আর যাবে না। কাজ শেষ হয় বেলা দুটাের মধ্যেই, কিন্তু মনের মতো হয় না, যেমন সে ভেবেছিল সে রকম। মনটা তার আরেকটু দমে যায়। সাধ হয় একটু বিলাতি খাবার। গিরির সাথে রাত কাটাবার। সময়ের হিসাবেও আটক পায় না। সভা হবে অপরাহুে, সকালে রওনা দিলেও গাঁয়ে সে পৌঁছবে ঠিক সময়ে।

 গোকুলকে সবচেয়ে কমদামি বিলাতি বোতল কিনতে দিয়ে সে যায় গিরির ওখানে। খোলা দরজায় দাঁড়িয়ে ঘনশ্যামের চোখ উঠে যায় কপালে, হাত বুকে উঠে লোম খোঁজে জামার কাপড়ের নীচে। মাদুর পেতে ভদ্রঘরের চারটি মেয়ে গিরিকে ঘিরে বসেছে, দুজন তার চেনা। মুক্তাকে নিয়ে যারা রামপদর কাছে পৌঁছে দিয়েছিল।

 নিঃশব্দে সরে পড়বার চেষ্টা করারও সুযোগ মেলে না—এই! শোন, শোন। বলে গিরি লাফিয়ে উঠে এসে চেপে ধরে গলাবন্ধ কোটের প্রান্ত।

 ভাগছ যে? দাঁড়াও, কথা আছে অনেক।

 ওনারা কারা?

 তা দিয়ে কাজ কী তোমার? গিরি ফুঁসে ওঠে। জামা সে ছাড়ে না ঘনশ্যামের, পিছন ছেড়ে সামনেটা ধরে রাখে। কটমটিয়ে তাকায় বিষণ্ন ক্রুদ্ধদৃষ্টিতে। ঢোক গিলে দাঁতে দাঁতে ঘষে।

 মা নাকি ভালো আছে, বেশ আছে, মোর মা?

 আছে না?

 আছে? মাথা বিগড়েছে কার তবে, মোর? খেপেছে কে, মুই! তা খেপিছি, মাথা মোর ঘুরতে নেগেছে। ওরে নক্ষ্মীছাড়া, ঠক, মিথ্যুক—

 ও গিরিবালা! সুরমা ভিতর থেকে বলে মৃদু স্বরে।

 গাল বন্ধ করে নিজেকে গিরি সামলায়, গলা নামিয়ে বলে, মোর ব্যাপকে টাকা দিয়ে বিঁভুয়ে মরতে পেঠিয়েছিল কে?

 ওনারা বলেছে বুঝি?

 মিছে বলেছে? গিরি ডুকরে কেঁদে ওঠে বাপের শোকে, ও বাবা। মোর নেগে তুমি খুন হলে গো বাবা। এ নচ্ছার মেয়ার ধরে প্রাণ কেন আছে গো বাবা। ভেতর থেকে আবার সুরমা ডাকে: ও গিরিবালা! তোমার বাবা মরেছে কে বললে? খবর তো পাওয়া যায়নি কিছু। বেঁচেই হয়তো আছে, মরবে কেন?

 নিখোঁজ তো হয়েছে আজ দশ মাস। গিরি বলে নিজেকে সামলে গলা নামিয়ে।

 অন্য ঘরের মেয়েরা জানালা-দরজায় উঁকি দেয়, কেউ কাজের ছুতোয় ঘর থেকে বেরিয়ে এদিক-ওদিক চলাচল করে তাদের দিকে চেয়ে চেয়ে। অঙ্গন ঝকঝকে পরিষ্কার, নালা ছিটাল থেকে উঠে আসছে অশ্লীল গন্ধ। এঁটাে বাসনগুলির অখাদ্যের গন্ধটাও কেমন বদ। সুরমারা চারজনে বেরিয়ে আসে। তাদের দিকে না তাকিয়েই সদর দরজার দিকে যেতে যেতে বলে যায়, সকালে আমরা আসব গিরিবালা, তৈরি থেকো।

 সকালে কেন?

 মোকে গাঁয়ে পৌঁছে দিতে, মার কাছে। ঘরে এসো, বসবে।

 গিরি তাকে টেনেই নিয়ে যায় ঘরে। ঘনশ্যামের দিশেহারা অবস্থা, শত উপায় শত মতলবের এলোমেলো টুকরো পাক খেতে থাকে। তার মাথার মধ্যে, কী করা যায় কী করা যায় এই অন্ধ আতঙ্কের চাপে।

 মাদুরে বসে বিড়ি ধরিয়ে কেশে বলে, গাঁয়ে গিয়ে কী করবি গিরি? আমি বরং—

 বরং টরং রাখো তোমার। মার চিকিচ্ছে করাব। সব খরচা দেবে তুমি, যত টাকা নাগে। নয়তো কী কেলেঙ্কারি করি দেখো। ঘনশ্যামের পকেট হাতড়ে সিগারেটের প্যাকেটটা বার করে গিরি ফস করে একটা সিগারেট ধরায়। ধপাস করে বসে পা ছাড়িয়ে পিছনে একটা হাত রেখে পিছু হেলে। কয়েক মাসেই মুখের স্নিগ্ধ লাবণ্য উপে গেছে অনেকখানি, মাজা রঙের সে আভাও নেই তেমন, কিন্তু গড়নশ্রী হয়েছে আরও অপরূপ, মারাত্মক, সাধে কি ওকে পাবার জন্য অত করেছে ঘনশ্যাম, ছেড়ে দেবে দেবে করেও ছাড়তে পারছে না, কায়স্থের মেয়ে না হলে ওকে বিয়েই করে ফেলত এখানে টেনে না এনে।

 ছেড়ে দেবে ভাবছিল কিছুদিন থেকে, যদি ছেড়ে দিত! আজ তাহলে এ হাঙ্গামায় তাকে পড়তে হত না ভদ্রঘরের ও এই ধিঙ্গি মাগিগুলোর কল্যাণে।

 এত পয়সা করেছ, বিড়ি টানো। গিরিবালা বলে, মুখ বাঁকিয়ে। বলে সোজা হয়ে বসে, রামপদর পেছনে নেগেছ তুমি? একঘরে করবে? সাধুপুরুষ আমার। মোর ঘরে ফেরবার পথে কাঁটা দেবার মতলব, না? ওর বউকে ঘরে ফিরতে না দিলে, মোকে কে ঘরে ফিরতে দেবে শুনি? মোকে একঘরে করবে না সবাই?

 গোকুল মদের বোতল নিয়ে এলে গিরি একদৃষ্টে বোতলটার দিকে তাকিয়ে থাকে। জিভ দিয়ে ঘনঘন ঠোঁট ভেজায়। মুখের ভাব পালকে পলকে বদলে গিয়ে ঘনিয়ে আসে রুগণের যাতনাভরা লোলুপতা, নিষিদ্ধ বস্তুর প্রতি বিকারগ্রস্তের তীব্র কাতরতা।

 বিলাতি?

 গোকুল সায় দেয়। গিরি যেন শিথিল হয়ে ঝিমিয়ে যায়। অতি কষ্টে বলে, যাক, এনেছ যখন, খাও শেষ দিনটা। ভোর ভোর উঠে চলে যাবে কিন্তু।

 মদের গ্লাসে দু-চারবার চুমুক দিয়ে একটু স্থির হয়ে ঘনশ্যাম ভাবে, না, কোনো উপায় নেই। ভয় দেখানো জবরদস্তি, মিষ্টি কথা, লোভ দেখানো, বানানো কথায় ভোলানো কিছুই খাটবে না। সে গিরি আর নেই, সেই ভীরু লাজুক বোকা হাবা সরল গেঁয়ো মেয়ে। পেকে ঝানু হয়ে গেছে।

 কিছু পেসাদ পেয়ে গোকুল বিদায় হয়। খুব ভোরে এসে সে ঘনশ্যামকে ডেকে তুলে নিয়ে যাবে।

 রাত বাড়লে গিরি জড়িয়ে জড়িয়ে বলে, কী করি বল? কাল একবার যেতে হবেই। মার জন্য আঁকুপাঁকু করছে মনটা। তা ভেবো না তুমি। মার একটা ব্যবস্থা করে ফিরে আসব কদিন পরে। মাঝে সাঝে গাঁয়ে যেতে দিয়ো মোকে, অ্যাঁ? ভেবো না, ফিরে আসব।

 গেলাস থেকে উছলে পড়ে শাড়ি ভিজে যায় গিরির। খিলখিল করে হাসতে হাসতে রাগের চোটে গিরি গেলাসটা ছুঁড়ে দেয় ঘরের কোণে।

বিচারসভায় লোক খুব বেশি হল না, মানসুকিয়ার ঘেঁষাঘেঁষি পাঁচ-ছটা গাঁ ধরলে। লোক কমেই গেছে দেশে। রোগে শয্যাশায়ী হয়ে আছে বহুলোক। অনেকে আসতে পারেনি আসবে ঠিক করেও, কাঁপতে কাঁপতে জ্বরে পড়ায়। অনেকে ইচ্ছা করে আসেনি। সমাবেশটাও কেমন ঝিম-ধরা, নিরুত্তেজ, প্রাণহীন। ক্ষীণ শীর্ণ অবসন্ন সব দেহগুলি, চোখে উদ্দেশ্যহীন ফাঁকা চাউনি। সভার বাকগুঞ্জনও স্তিমিত। কথা কইতে ভালো লাগার দিন যেন নেই। বছর দুই আড়াই আগে, ঘনশ্যামের এই সদর দাওয়া আর সামনের ফাঁকা জমিতে শেষ সামাজিক বিচারসভা বসেছিল এই চাষাভুসো শ্রেণির, পদ্মলোচনের বোনের ব্যাপার নিয়ে। কী চাঞ্চল্য আর উত্তেজনা ছিল সে জমায়েতে, মানুষের কলরবে গমগম করছিল। কী ঔৎসুক্য ফুটেছিল সকলের মুখে এক বিবাহিতা নারীর কলঙ্কের আলোচনা আরম্ভ হওয়ার প্রতীক্ষায়। তার তুলনায় এ যেন সরকারি জমায়েত ডাকা হয়েছে বর্তমান অবস্থায় গ্রামবাসীদের কী করা উচিত বুঝিয়ে দিতে।

 দাওয়ায় বসেছে মাথারা, মাঝবয়সি আর বুড়ো মানুষ। ঘনশ্যাম বসেছে মাঝখানে, একেবারে চুপ হয়ে, অত্যন্ত চিন্তিতভাবে। তার ভাব দেখে মাথাদের অস্বস্তি জেগেছে—উপস্থিত মানুষগুলির ভাব দেখেও। দাওয়ার এক প্রান্তে মোড়ায় বসেছে শঙ্কর, সে এসেছে অযাচিত ভাবে। কেউ কেউ অনুমান করেছে তার উপস্থিতির কারণ, অনেকেই বুঝে উঠতে পারেনি। অঙ্গনের দক্ষিণ কোণে জনসাতেকের সঙ্গে ঘেঁষাঘেঁষি করে বসেছে রামপদ, এদের সঙ্গে আগে থেকে তার ভাব ছিল, বিশেষ করে করালী ও বুনোর সঙ্গে। মেয়েদের মধ্যে বসেছে মুক্তা, গিরির গায়ে লোগে। সে অবশ্য গিরিকে খুঁজে তার গা ঘেঁষে বসেনি, গিরিই তাকে ডেকে বসিয়েছে। পুরুষের অনুপাতে মেয়েদের সংখ্যা বড়ো কম হয়নি সভায়।

 ঘনশ্যামের দৃষ্টি বারবার গিরির ওপরে গিয়ে পড়ে, সঙ্গে সঙ্গে সে চোখ সরিয়ে নেয়। বিচারের কাজে গোল বাধে গোড়া থেকেই। পূর্বপরামর্শ মতো বুড়ো টেকো নন্দী গৌরচন্দ্রিকা শুরু করলে জমায়েতের মাঝখান থেকে রুক্ষ চুলে, খোঁচা খোঁচা গোঁফদাড়িতে আর একটা হাতাছেঁড়া ময়লা খাকি শার্ট গায়ে পাগলাটে চেহারার বনমালী উঠে চেঁচিয়ে বলে, কীসের বিচার? কার বিচার? রামপদর বউ কোনো দোষ করেনি। সবাই জানে, বনমালীর বউকে সদরেব দত্তবাবু ভুলিয়ে ভালিয়ে ঘর ছাড়িয়ে চালান দিয়েছে ব্যাবসা করার জন্য। প্রথমে সদরে রেখেছিল বউটাকে, বনমালী হন্যে হয়ে খুঁজে খুঁজে তাকে যখন প্রায় আবিষ্কার করে ফেলেছিল তখন আবার তাড়াতাড়ি করে কোথায় চালান করে দিয়েছে। অনেক চেষ্টা করেও বনমালী আর হদিস পায়নি। এখনও সে মাঝে মাঝে সদরে গিয়ে সন্ধান করে।

 টেকো নন্দী বলে, আহা, দোষ করছে কি করেনি তাই তো মোরা বিচার করব।

 বনমালী রুখে বলে, বটে? কোনো দোষ করেনি, তবু বিচার হবে দোষ করেছে কি করেনি? এ তো খুড়ো ঠিক কথা নয়। গাঁয়ের কোনো মেয়েছেলে গাঁ ছেড়ে কদিন বাইরে গেলে যদি তার বিচার লাগে, তবে তো বিপদ।

 করালী বসে থেকেই গলা চড়িয়ে বলে, ঠিক কথা, গাঁয়ে খেতে পায়নি, সোয়ামি কাছে নেই, তাই সদরে খেটে খেতে গেছে। ওর দোষটা কীসের?

 কে একজন মাথাটা নামিয়ে আড়াল করে বলে, সে-বেলা তো কেউ আসেনি, দুটি খেতে-পরতে দিতে?

 কানাই বিদেশে তিন ছেলে আর দুই মেয়ে হারিয়ে শুধু নিজের বউ আর বড়ো ছেলের বউকে নিয়ে গাঁয়ে ফিরেছে। সে বলে, তাদের তিনজনের কইমাছের প্রাণ, সহজে যাবার নয়, যায়ওনি। তাই তাকে উঠে দাঁড়াতে দেখা যায়, সে থরথর করে কাঁপছে, মুখে এক অদ্ভুত উদভ্রান্ত উন্মাদনার ভাব। কথা তার এলোমেলো হয়ে যায়, প্রাণে বেঁচে ফিরেছে মেয়েটা, ভগবান ছিল না তো কী? ভগবান বাঁচত কি, মেয়েটা ফিরেছে তো মরে এসে। তা ভগবান আছেন।

 কেউ হাসে না। সভায় ভগবান এসে পাড়ায় শঙ্করের মতো অযাচিত আবির্ভাবের কৌতুহলমূলক একটা অনুভূতি জাগে অনেকের মনে।

 জমায়েত স্তব্ধ হয়ে থাকে খানিকক্ষণ। শুধু মেয়েদের মধ্যে গুজগাজ ফিসফাস চলতে থাকে অবিরাম। মুক্তার মতো মেয়েরা আবার গাঁয়ে ফিরুক এটা যারা পছন্দ করে না তারাও চুপ করে থাকে। শেষে দাওয়া থেকে ভুবন বলতে যায়, কথা হল কি, ও যদি সদরে সত্যি খেটে খেতে যেত, খেটেই খেত—

গিরি তড়াক করে ঘাড় উঁচু করে গলা চিরে ফেলে, খেটে খায়নি তো কী? মোরা একসাথে খেটে খেয়েছি। এ পাড়ায় দু বাড়ি ঝিগিরি করেছি, এক দোকানে মুড়ি ভেজেছি। কোন মুখপোড়া বলে খেটে খাইনি মোরা, শুনি তো একবার?

 প্রায় সকলেই জানে এ কথা সত্য নয় গিরির। কয়েকজন স্বচক্ষে মুক্তাকে দেখেছে সদরে। কিন্তু কেউ কথা বলে না। কিছুকাল আগে গাঁয়ে লজ্জাবতী লতার মতে কাঁচা মেয়ে গিরির পরিবর্তনটা সকলকে আশ্চর্য করে দেয়—খুব বেশি নয়। যে দিনকাল পড়েছে। দাওয়ার নাছোড়বান্দা মাথা টেকো নন্দীই শুধু বলে, কিন্তু বহু লোকে যে চোখে দেখেছে। ফণি বলছে সে নিজের চোখে—

 মাঝবয়সি বেঁটে ফণি, চট করে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ জানাহ, না না, আমি তা বলিনি। আমি কেন ও কথা বলতে যাব?

 এতক্ষণ পরে ঘনশ্যাম মুখ খোলে। জমায়েতে টুঁ শব্দ নেই কারও মুখে মেয়েদের ফিসফিসানি ছাড়া, তবু নেতাদের সভার কলরব থামাবার ভঙ্গিতে দু হাত খানিকক্ষণ তুলে রেখে সে বলে, যাক, যাক। ভাইসব, আজকালকার দিনে অত সব ধরলে মোদের চলবে না। আমি বলি কী, কথাটা যখন উঠেছে, রামপদর ইস্তিরি নামমাত্র একটা প্রাচিত্তির করুক, চাপা পড়ে যাক ব্যাপারটা।

 বনমালী ফুঁসে ওঠে, কীসের প্রাচিত্তির? দোষ করেনি তো প্রাচিত্তির কীসের?

 গিরি গলা চেরে, মোকেও প্রাচিত্তির করতে হবে নাকি তবে?

 তারপর বিশৃঙ্খলার মধ্যে জমায়েত শেষ হয়। বনমালীর বউ চোখ ভরা জল নিয়ে মুক্তার ঝাপসা মুখখানি দেখে তার চিবুক ধরে চুমো খেতে গিয়ে গলাটা টিপে দেয়। কয়েকটি স্ত্রীলোক মুখ বাঁকিয়ে আড়চাখে মুক্তার দিকে চাইতে চাইতে চলে যায়। শঙ্কর নিঃশব্দে মোড়া থেকে উঠে যেমন অযাচিতভাবে এসেছিল তেমনি অযাচিতভাবে বিদায় না নিয়ে বনমালীর সঙ্গ ধরে।

 বলে, যদি খুঁজে পেতে এনে দিই, ফিরিয়ে নেবে ভাই?

 বনমালী আশ্চর্য হয়ে যায়।—ফিরে নেবে না তো খুঁজে মরছি কেন?

 একটা কথা বলতে গিয়ে শঙ্কর থেমে যায়। ফিরিয়ে আনার মতো অবস্থা যে সকলের থাকে না, মন এমন বিগড়ে যায় যে ঘরসংসার আর যোগ্য না তার, সেও যোগ্য থাকে না ঘবসংসারের। কিন্তু কী হবে ও কথা বলে বনমালীকে? মহামারীতে লক্ষ লক্ষ দৈহিক মৃত্যু ঘটানোর মতো লোকে যদি তার বউয়ের নৈতিক মৃত্যু ঘটিয়েই থাকে, ওকে সে সম্ভাবনার কথা জানিয়ে লাভ নেই। বউ হিসাবে ওর বউয়ের মরণ হয়েছে, মনের এমন রোগ হয়েছে যা চিকিৎসার বাইরে অথবা চিকিৎসা করে সুস্থ করে তাকে আবার ফিরিয়ে আনা সম্ভব মানুষের জগতে, সেটা আগে জানা দরকার।

 চেষ্টা করে দেখি কী হয়। বলে সহানুভূতির আবেগে বনমালীর হাতটা শঙ্কর চেপে ধরে হাতের মধ্যে, কলেজের বন্ধুর হাত যেমন ভাবে চেপে ধরত।

সিকিখানা চাঁদের আলো ছাড়া মানসুকিয়া অন্ধকার সন্ধ্যা থেকে। বেলতলার ভূতের ভয়—বছরখানেক বছর দুই আগেও খুব প্রবল ছিল। আজকাল বেলতলার ভূতের ভয়ের প্রসঙ্গই যেন লোপ পেতে বসেছে মানসুকিয়ায়। এই বেলতলায় দাঁড়িয়ে গিরি বলে ঘনশ্যামকে তুমি যদি না বলতে ব্যাপারটা চাপা দিতে—

 ঘনশ্যাম বলে, চোখ-কান নেই? দ্যাখোনি, আমি কী বলি না বলি তাতে কী আসত যেত? আমি শুধু নিজের অবস্থাটা সামলে নিলাম লোকের মন বুঝে।

 গিরির বাড়ি বেলতলার কাছেই। বেলতলায় সে ভয় পায়নি, বাড়ি যেতে পথের পাশে নালার ওপর তালের পুলটার মাথায় একটা মানুষকে বসে থাকতে দেখে তার বুক কেঁপে যায়।

 কে গা?

 আমি গা গিরি, আমি।

 অঃ! এত রাতে এখানে বসে আছ?

 এই দেখছিলাম, গাঁয়ে তো এল, গাঁয়ে গিরির মন টিকবে কি টিকবে না।

 কী দেখলে?

 টিকবে না। গিরি, গাঁয়ে মন তোর টিকবে না। মোর সাথে যদি তোর বিয়েটা হয়ে যেত, মুক্তার মতো একটা ছেলেপিলে যদি হত তোর, ক বছর ঘর-সংসার যদি করতিস, তবে হয়তো—না, গিরি, গায়ে মন তোর টিকবে না।

 কখন সে উঠে দাঁড়িয়েছে কথা বলতে বলতে, কখন সে তালের পুল ডিঙিয়ে অদৃশ্য হয়ে গেছে কথা শেষ না করে আর গিরির দুটাে ভারী কথা না শুনেই, ভালোমতো টের পায় না গিরি। মুখ বাঁকিয়ে সিকি চাঁদের আলোর আবছাতে অজানাকে সে অবজ্ঞা জানায়। পরক্ষণে মনে হয় বুকের কাছে কীসে যেন টান পড়ে টনটন করে উঠেছে বুকের শিরাটিরা কিছু, তাই ব্যথায় গিরি আরেক বার মুখ বাঁকায়।

 গিরির মা শুয়েছিল কাঁথামুড়ি দিয়ে।

 গিরি ডাকে, মা? ওমা?

 গিরির মা ধড়মড়িয়ে উঠে বসে। গিরির মুখের দিকে চেয়ে বিরক্তির সুরে বলে, কে গো বাছা তুমি? হঠাৎ ডেকে চমকে দিলে?