মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় রচনাসমগ্র (পঞ্চম খণ্ড)/পেটব্যথা

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে চলুন অনুসন্ধানে চলুন


পেটব্যথা

কথা মতো মানোর মা শেষ রাত্রে ভৈরবকে তুলে দিতে গিয়ে টের পায় সে জেগেই আছে। মুখে আগে ডেকে আর দেখবে কী একেবারে ঠেলা দিয়ে মানোর মা বলেছে, ওগো ওঠো। শুনছ? ওঠো গো।

 তাতে গোসা হয়েছে জাগন্ত ভৈরবের।

 এত তাড়া কীসের, আঁ, কীসের তাড়া এত? ঘুমোসনি রাতে বুঝি কত্খনে কালীকে তাড়িয়ে হাড় জুড়োবি ভেবে?

 এ পর্যন্ত বললে কোনো কথা ছিল না, মানোর মা গায়ে মাখত না কথা। পুরুষ মানুষ। অমন বলেই থাকে। কিন্তু উঠে এসে হাইটাই তোলার পর জানলার চাঁদের আলোয় নেংটি ছেড়ে ছেঁড়া মোটা হেঁটাে ধুতিটি পরবার সময়তক জের চলে ভৈরবের গোসার।

 হাঃ, সে বলে মাঝখানে যত ঘরোয়া কথা হয়েছে তা ডিঙিয়ে তার প্রথম রাগের কথাটাই একটানা বলে যাওয়ার মতো, মেয়েলোক নইলে বলে কাকে। পেলে-টেলে মেয়ে বেচে দেয় পেটের লেগে। মেয়ের মত পেলে একটা ছাগল বেচতে চেয়ে পাগল হবে সে তো ডালভাত।

 এতে অগত্যা গোসা করতে হয় মানোর মাকে।

 ছাগল লোকে বেচে না পোড়ার মুখো, অভাবে নয়তো স্বভাবে? মানোর মা বলে কলহের গরম অবস্থায় গাল দেবার সুরে, মেয়ের কথা বলো না যদি শরম থাকে একরতি। না খেয়ে মরেছে মেয়েটা, হায় গো! ছাগলটা বেচলে তখন বাঁচত মেয়েটা। ছাগলের মায়ায় নিজের মেয়েকে খেতে না দিয়ে মারতে পারে কেউ পুরুষলোক ছাড়া! হাউ হাউ করে কেঁদে ফেলে মানোর মা কথা শেষ করার সঙ্গে সঙ্গে।

 ছাগল বেচলে বাঁচত? মানাের মার ধাঁধায় কাবু হয়ে পড়ে ভৈরব, ছাগল কোথা ছিল তখন? কালী তো জন্মালে দু-চার দিন আগে, মানো যাওয়ার দু-চার দিন আগে ওই গোয়ালঘরটায়।

 ওর মাটাকে বেচা যেত না? বাচ্চা কটাকে?

 কার ছাগল কী বিত্তান্ত কিছু জানি না, বেচে দেব? আর সবে বিইয়েছে দুটাে তিনটে দিন আগে?

 রওনা দেও না? এসো না গিয়ে ভালোয় ভালোয়? মানোর মা বলে। লড়াইয়ে জেতা রানির মতো, বেলা যে দুকুর হয়ে যাবে সদরে পৌঁছতে ছাগল খেদিয়ে নিয়ে?

 গলায় কাপড়ের পাড় বেঁধে কালীকে টানতে টানতে ভৈরব রওনা দেয় সদরের উদ্দেশে শেষ রাত্রির অস্তগামী চাঁদের ম্লান জ্যোৎস্নায়। দু-পা গিয়েছে কি না গিয়েছে মানোর মা ছুটে এসে বাঁশের কঞ্চিটা হাতে তুলে দেয়। উপদেশ দেয় যে টানতে টানতে ছাগল নিয়ে যাওয়া চলে তিন কোশ পথ? কালীকে সামনে দিয়ে পেছন থেকে কঞ্চির বাড়ি মেরে মেরে নিয়ে গেলে যদি ভরসা থাকে আজ সদরে পৌঁছবার।

 উপদেশটা কাজে লাগে ভৈরবেরা, বউয়ের উপদেশ। সে যেন জানে না ছাগল তাড়িয়ে নিয়ে যাবার কায়দা, জন্মভোর খেত চষে আর গোরু-ছাগল তাড়িয়ে নিয়ে চুলে তার পাক ধরেছে। তবে কি না কালীকে বারবার কঞ্চির বাড়ি মারতে হয় এই যা দুঃখ। পাড়ের দড়ি বেশ লম্বা ও শক্ত। বাঁধন খুলে পালাবার চেষ্টা করে করে কালী শেষে হার মানে। যুদ্ধের আগের সস্তা শাড়ির পাড়, চওড়া যেমন শক্ত তেমন। ঘরে কাপড় নেই ভৈরবের। এই কটা পাড় আজও টিকে আছে, গোরু-বাঁধা দড়ির কাজ পর্যন্ত বুঝি ভালো চলত। আজকালকার দড়ির চেয়ে এই পাড় দিয়ে, যদি গোরুটা তার থাকত।

 কোথা থেকে কার একটা ছাগল এসে তার ভাঙা গোয়ালের ফাঁকা চালাটার নীচে পাঁচটা বাচ্চা বিইয়েছিল। মানোর শোকে কাতর, না খেয়ে না খেয়ে আধমরা মানোর মা শুকনো পাতা জেলে মাঘের বাঘ-মারা শীত থেকে বঁচিয়েছিল ছাগল আর তার বাচ্চা কটাকে নয়তো ছাগলটা বাঁচলেও কটা বাচ্চা টিকত কে জানে! কয়েক দিন পরে জাফর এসেছিল তার ছাগল আর বাচ্চা নিয়ে যেতে। একটা বাচ্চা পুরস্কার দিয়ে গিয়েছিল।

 দুধ না খেয়ে বাঁচিবে তো? জাফর শুধিয়েছিল। বাঁচাব। বলেছিল ভৈরব উদাসীন ভাবে। মনে মনে সে ভাবছিল, বাঁচে তো বাঁচবে, না বাঁচে তো কচি ছাগলের মাংস একদিন মন্দ লাগবে না খুদের সঙ্গে দুটাে পেঁয়াজ যদি কোনো মতে তুলে আনা যায় কাল্লুর খেত থেকে।

 তার মেয়ে মানো কিন্তু সত্যিই না খেয়ে মরেনি। চলতে চলতে এলোমেলো ভাবনার মধ্যে খাপছাড়া ভাবে ভৈরব অন্তত দশবার মনের মধ্যে জোর গলায় বলে যে মানো না খেয়ে মরেনি। মানোর মা ওকথা বলে গায়ের জ্বালায়। নয়তো পেটের জ্বালায়। মানো মরেছে রোগ হয়ে, ব্যারামে। না খেয়ে না খেয়ে গায়ে শক্তি না থাকায় হয়তো সে মরেছে রোগে, তেমন পথ্য পেলে হয়তো মরত না, তবু না খেয়ে যে মরেছে এ কথা কোনো মতে মানবে না ভৈরব তার বাপ হয়ে। মানোর মা মরত না তা হলে? জোয়ান মদ্দ মেয়েটা খেতে না পেয়ে মরল আর তার মা বেঁচে রইল, এ কখনও হয়। সেও তো মরেনি, তার আর দুটাে ছেলেমেয়ে। দুর্ভিক্ষটা কোনোমতে সামলেছে ভৈরব। একবেলা আধবেলা শাকপাত খুদকুঁড়ো কোনোমতে জুটিয়ে হাড়-চামড়া টিকিয়ে রেখে কোনোমতে বেঁচে থেকেছে সবাই মিলে,—মানো ছাড়া। মানোর অসুখ হল। ওই অবস্থায় পোয়াতি মেয়ে বাঁচে কখনও অসুখ হলে। অসুখটা যদি না হত, না খেয়ে মানো মরত না, শাকপাতা খুদকুঁড়ো তারও জুটত, মানোও বেঁচে থেকে দেখত খেতে খেতে ভরপুর অজস্র ফসল, অনেককাল যেমন ফসল কারও মাটিতে ফলেনি।

 আর কটা দিন পরে মাঠের ফসল তার ঘরে উঠবে—জমিদার অবশ্য যদি কেড়ে না নেয় বাকি খাজনার দায়ে। তা, করালীবাবু কি এমন রাক্ষস হবে যে একটা বছর তাকে সময় দেবে না। সামলাবার জন্য, এত বোকা কি হবে করালীবাবু যে সে বুঝতে পারবে না একটা বছর তাকে সময় না দিলে সে উৎখাত হয়ে যাবে, বছর বছর খাজনা দেবার কেউ আর থাকবে না তখন।

 আনমনা ভৈরবের সামনে দাঁড়িয়ে কৈলাস বলে, বলি চলেছ কোথা ছাগল নিয়ে শুঁড়ির পো?

 গায়ে যেন হাজার বিছে লাগে ভৈরবের। সা বটে তার উপাধি, কিন্তু পাঁচ-পুরুষে শুঁড়ির কর্ম তো কেউ করেনি তার বংশে, পাঁচ-পুরুষে তারা চাষি। তার এক দূর সম্পর্কের কুটুম সদরে মদ বেচে টাকা করে। এ জন্য তাকে শুঁড়ি বলা আর বাপ-মা-বউ মেয়ে তুলে গাল দেওয়া সমান কথা।

 এই যাচ্ছি। হেথা হোথা।

 কৈলাস ব্যাপার বুঝে মুহুর্তে নিজেকে সামলে নেয়। সুর বদলে বলে, রাগ কোরো না। ওটা নিছক তামাশা। তামাশা বোঝা না, কেমন চাষি তুমি? যাই হােক, যত হােক, তুমি লোক ভালো, তা কি জানি না আমি? তবে কথা কি জানো, ছাগল নিয়ে যাচ্ছে কোথায়?

 সদরে বেচে দেব ছাগলটা। ফসল তোলা-তক কটা দিন। আর চলে না কোনোমতে।

 সদরে গিয়ে ছাগল বেচবে? কৈলাস বলে আশ্চর্য হয়ে, তোমার তো আস্পদ্দা কম নয় ভৈরব! গায়ের গোরু-ছাগল সব কিনে নিচ্ছি আমি, যে যা বেচিতে চায়, আমার লোক চাদ্দিকে রয়েছে, বেচতে যাতে কারও অসুবিধা না হয়, তুমি সদরে চলেছ একটা ছাগল বেচতে? আমাকে ছাড়িয়ে উঠতে চাও দেখছি তুমি!

 পুবের আকাশে সূর্য তখন কয়েক হাত উঠেছে। কালাপুর ছাড়বার পথ এটা, একটু আগেই পুল। খালের চেয়েও মরা-মজা ছোটাে-খাটাে নদীটা লোকে অনায়াসে হেঁটেই পার হয়ে যেত, পুল তৈরি করে দেবার কন্ট্রাক্ট নিয়ে কৈলাস গুছিয়ে নিয়েছিল। ভোরের রোদে ঝলমলে বাঁকাটে পুলটার দিকে চেয়ে ভৈরব ভয়ডর ভুলে যায়।

 আপনাকে গোরু-ছাগল দেওয়া মানে তো খয়রাত করা।

 বটে না কি? সবাই তাই আমাকে গছিয়ে দিতে পাগল! নাক ঝেড়ে কৈলাস বলে, শোন বলি তোকে, ছ টাকা সবাই পায়, তোকে আট দিচ্ছি। আর কাউকে বলিস না। এমনি ছাগলের জন্য আট টাকা করে দিতে হলে ব্যাবসা গুটােতে হবে। গাঁয়ে গিয়ে লতিফকে এ চিঠিটা দিবি যা—পেনসিলে লিখে দিলাম তো কী হয়েছে, ওতেই হবে। ছাগলটা জমা দিলে লতিফ তোকে আটটা টাকা দেবে।

 রও, রও। ভৈরব সাতঙ্কে বলে, আট টাকা কীসের? সদরে এ ছাগল আঠারো টাকায় বেচব। কৈলাসের মুখ গম্ভীর হয়ে যায়।—বাড়াবাড়ি করিস নে ভৈরব। ছাগল নিয়ে সদরে যাবার তোর রাইট নেই। তা জানিস ব্যাটা?

 কী জন্যে? আমার ছাগল আমি যেথা খুশি নিয়ে যাব।

 মাইরি? কৈলাস খোঁকিয়ে ওঠে বাঘা কুকুরের মতো, আমি দশ-বিশ হাজার ঢেলে লাইসেন্স নেব সরকারের কাছ থেকে, আর তোমরা যার যেথা খুশি নিয়ে গোরু-ছাগল বেচাবে? সরকার আইন করে দিয়েছে, চাল কাপড়, কেরোসিনের মতো গোরু-ছাগল কেউ গাঁয়ের বাইরে নিতে পারবে না। আরে বোকা, আইন যদি না থাকবে তো অত টাকা ঢেলে কে নেবে লাইসেন্স?

 ভৈরবকে ভড়কে যেতে না দেখে কৈলাস আশ্চর্য হয়ে যায়। ভৈরব নিশ্চিন্তভাবে বলে, বোকা পেলে না কি কৈলাসবাবু? আইন শুধিয়েছি। চালানি কারবারে নামি যদি তো আইন দেখিও তখন।

 ভৈরব বলতে শুরু করলে কৈলাস ভুরু কুঁচকে তার দিকে চেয়ে ভাবে। একটা ছাগল কিছুই নয়, কিন্তু লক্ষণটা মন্দ। দশজনে জেনে বুঝে সাহস পেয়ে এ রকম শুরু করলেই তো সে গেছে। এ বিদ্রোহ দমন করা দরকার।

 শহরে ঢুকতে না ঢুকতে সহজেই কালী বিক্রয় হয়ে যায় একুশ টাকায়। ভৈরব খুশি হয়। শুধু ভালো দাম পেয়েছে বলেই নয়, গেরস্ত ঘরে কালীকে বেচতে পেরেছে বলে। পোষা ছাগল বেচতে হওয়ার খেদটা তার দ্বিগুণ হয়ে উঠেছিল এই ভাবনায় যে কার কাছে কালীকে বেচবে, কেটেকুট গর্ভিণী কালীকে হয়তো খেয়ে ফেলবে, নয় মাংস বেচে দেবে। যে দিনকাল পড়েছে। কৈলাসের কাছে তো গোরু মহিষ পাঠা খাসি ছাগলের কোনো তফাত নেই, মাংস হলেই হল। কুকুর-বেড়ালও নাকি সে মেশাল দেয়, সে যে মাংস দৈনিক জোগান দেয় তাতে। কালী ভালো ঘরে পড়েছে। ফল ফুল আনাজের মস্ত বাগানের মাঝখানে পুরানো একতলা বাড়ি, ছেলেপুলে নিয়ে সংসারী ভদ্র গৃহস্থ, কালী বিয়োলে তার দুধটা খাবে, কালীকে নয়। বাড়ির লাগাও মাঠ-জঙ্গল আছে, কালী চরে বেড়াতেও পারবে।

 কিছু সওদা করতে বাজারে যায় ভৈরব। একখানি গামছা কেনে, শাড়ির বদলে এতেই মানোর মারা একরকম চলে যাবে। আধ সের আলু এক সের ডাল মোট সাড়ে ছ-আনার হলুদ লংকা ধনে আর জিরে, চার পয়সাতে সোডা আর দু-আনার একটি কাপড় কাচা সাবান কিনে গামছায় বাঁধে। শেষে ভেবেচিন্তে দু-আনার তামাকপাতাও কিনে ফেলে মানোর মার জন্য।

 তারপর পথের ধারে তেলেভাজার দোকানে গিয়ে বসে গাঁয়ের দিকে চলতে শুরু করার আগে একটু বিশ্রাম করতে ও কিছু তেলেভাজা খেয়ে নিতে। তেলেভাজা বড়োই পছন্দ করে।

 বাদাম তেলের চেনা গন্ধে পুরানো দিনের খিদে যেন পাক দিয়ে চেগে ওঠে ভৈরবের মন ও পেটের মধ্যে। বসে বসে অনেকগুলি তেলেভাজা সে খেয়ে ফেলে, জল ও তেলেভাজায় পেট ভরে যাওয়া পর্যন্ত। পেট ভরার আরামে অলস অবশ হয়ে আসে সর্বাঙ্গ, মাথা ঝিমিয়ে আসে মধুর শাস্তিতে। শুধু তার জীবনটা নয়, জগৎটাও জুড়িয়ে গেছে ভৈরবের। সামনে নোংরা রাস্তায় ধুলো উড়িয়ে যে মিলিটারি লরিগুলো চলছে, দিক কাঁপিয়ে সেগুলি চলতে শুরু করার পর দেখতে দেখতে দুৰ্দশা তার চরমে এসে ঠেকেছে, সেগুলিও এখন আর বুকের মধ্যে অভিশাপের দপদপানি জাগায় না। রাগ দুঃখ আপশোশ দুর্ভাবনা সব তলিয়ে গেছে ভরা পেটের তেলেভাজার তলে।

 ঘুম আসা চোখে ভৈরব বাইরে বেলার দিকে তাকায়। গাঁয়ে যখন ফিরতে হবে, রওনা দেওয়াই ভালো। তেমন নাছোড়বান্দা হয়ে যদি চেপেই ধরে ঘুম, পথের ধারে কোনো গাছতলায় ঘুমিয়ে নিলেই হবে খানিক। গামছায় বাঁধা জিনিস কাঁধে তুলে আস্তে আস্তে সে হাঁটতে শুরু করে। আসবার সময় চোখে লাগানো ছিল নানা ভাবনার ঠুলি, দেখতে পায়নি, এবার শহর ছাড়িয়েই দুদিকে ছড়ানো পরের খেতের ফসল দেখে চোখ তার জুড়িয়ে যায়, মন ভরে যায় ওই সবুজের মতোই তাজা খুশিতে। তার নিজের খেতটুকু যেন লুকিয়ে আছে যে দিকে তাকায় সেইখানে।

 ডাক দিয়ে তাকে দাঁড় না করিয়ে এবার কৈলাস সামনে থেকেই তার পথ আটকায়। তার সঙ্গে এবার দুজন ষন্ডাগুন্ডা চেহারার মানুষ।

 ছাগল বেচলি ভৈরব?

 ভৈরব উৎসাহের সঙ্গে বলে, বেচেছি গো কৈলাসবাবু, তোমার আশীর্বাদে। দর পেয়েছি এক কুড়ি এক টাকা।

 তাই না কি! তা বেশ করেছিস, আমার বেচাকেনার ঝক্কিটা তুই নিজেই পুইয়েছিস। আট গন্ডা কমিশন দেব তোকে। বার কর দিকি টাকাটা।

 কৈলাস তাকে ছোঁয় না, সঙ্গের লোক দুজন ভৈরবকে ধরে কোমরে-বাঁধা টাকা বার করে তার হাতে দেয়। টাকা পয়সা গুণে হিসাব করতে করতে কৈলাস বলে, হুঁ, খরচা করা হয়েছে এর মধ্যে। দাঁড়া, হিসেব করে তোর পাওনা বুঝিয়ে দিচ্ছি। তোর ছাগলের দাম বাবদ আট টাকা আর আট আনা মেহনত—সাড়ে আট টাকা। একুশ থেকে সাড়ে আট গেলে থাকে সাড়ে বারো, এই আমি নিলাম।

 এ কেমন ধারা তামাশা কৈলাসবাবু? ছাড়ো আমায়, ছেড়ে দাও।

 তামাশা? ব্যাটা, তুই আমার তামাশার পাত্র? দাঁতে দাঁত ঘষে কৈলাস গালে এক চড় বসিয়ে দেয় ভৈরবের, বলিনি তোকে, আমি ছাড়া এ এলাকায় গোরু-ছাগল কেনাবেচার লাইসেন্স কারও নেই, ছাগল বেচাতে হলে আমাকে বেচতে হবে? ঘাড়ে তোর কাটা মাথা রে হারামজাদা, গটগট করে সদরে চলে গেলি ছাগল বেচিতে বারণ না মেনে?

 ভৈরব ক্রুদ্ধ অসহায় আর্তনাদের সুরে বলে, ডাকাতি করে গরিবের পয়সা কেড়ে নেবে? নাও—আমি থানায় যাব, নালিশ করব।

 থানায় যাবি? নালিশ করবি? কৈলাসের মুখে হাসির ব্যঙ্গ দেখা দেয়, যা ব্যাটা থানায়, নালিশ করা গা। বলে তাকে থানার দিকে এগিয়ে দেবার জন্যই যেন পা তুলে জোরে এক লাথি কষিয়ে দেয় তার বাঁ কোমর লক্ষ করে। লাথিটা লাগে ভৈরবের পেটে।

পথচলতি রাম-শ্যাম-যদু-মধুরা ভৈরবকে জমিদার শ্রীযুক্ত লক্ষ্মীনারায়ণের প্রতিষ্ঠিত ও সরকারি সাহায্যপ্রাপ্ত হাসপাতালে নিয়ে যায়। ওদের মধ্যে দুজন কাছাকাছি এসে পড়েছিল ঘটনাটা ঘটবার সময়। লাথি মারাটা তারা দেখেছে,—কৈলাসকেও কে না চেনে এ অঞ্চলে! তারা কাছে এসে পৌঁছতে পৌঁছতে কৈলাসেরা অবশ্য চলতে শুরু করে দিয়েছিল ভৈরবকে রাস্তায় ফেলে রেখে,—দৌড়ে পালায়নি, কৈলাস আগে আগে হাঁটছিল হেলেদুলে, পিছনে চলছিল সঙ্গী দুজন, কিছুই যেন ঘটেনি এমনিভাবে। পথে পড়ে মানুষটাকে দুমড়ে মুচড়ে কাতরাতে দেখে, বমির সঙ্গে রক্ত তুলতে দেখে, রাম-শ্যাম গোড়াতে ভড়কেই গিয়েছিল খানিকটা। কিন্তু যদু-মধুরা এসে পড়বার আগেই কাছাকাছি খানা থেকে আঁচলা ভরে জল এনে ভৈরবের মুখে-চোখে ছিটিয়ে দিতেও আরম্ভ করেছিল।

 দুহাতে পেট চেপে ভৈরবের বেঁকে তেবড়ে যাওয়া কিছুতে কমছে না দেখে সবাই পরামর্শ করে চলতি এক গোরুর গাড়িতে চাপিয়ে তাকে হাসপাতালে নিয়ে এসেছে।

 আর ভৈরবের এমনই সৌভাগ্য যে, এই অসময়ে বাড়িতে দিবানিদ্রা দেওয়ার বদলে স্বয়ং কুঞ্জ ডাক্তার হাসপাতালে হাজির ছিল। কৈলাসের প্রতিনিধি বলাইয়ের সঙ্গে কুঞ্জ ডাক্তারের কুইনিন সংক্রান্ত আলোচনা চলছিল একটা।

 হাসপাতালে পৌঁছেই আর একবার বমি করে ভৈরব। একগাদা তেলেভাজার সঙ্গে উঠে আসে একগাদা রক্ত। কুঞ্জ ডাক্তার তাকে পরীক্ষা করতে করতে শুধোয়, কী হয়েছে?

 মধু বলে, রাস্তায় পড়ে ছটফট করছিল আর রক্তবমি করছিল ডাক্তারবাবু। আমরা তুলে এনেছি।

 যদু বলে, কারা না কি মারধোর করেছে।

 শ্যাম বলে, পেটে লাথি মেরেছে একজন।

 রাম বলে, ছি, ছি, পেটে এমন লাথি মানুষ মারে মানুষকে! মরে যদি যায়!

 কুঞ্জ ডাক্তার বলে, লাথি মেরেছে? কে লাথি মেরেছে? ধরতে পারলে না তোমরা তাকে?

 রাম বলে, আজ্ঞে, লাথিটা মারলেন কৈলাসবাবু।

 শুনে বলাই বলে, হুম।

 শ্যাম বলে, মোরা দুজন আসতেছিলাম, কাছে যেতে যেতে লাথি মেরে কৈলাসবাবু চলে গেলেন সাথের লোক নিয়ে।

 আচ্ছা, আচ্ছা, হয়েছে। থামো বাবু তোমরা একটু, লোকটাকে দেখতে দাও। বলে কুঞ্জ ডাক্তার গম্ভীর মুখে গভীর মনোযোগের সঙ্গে ভৈরবকে পরীক্ষা করে, লোকদেখানো অনাবশ্যক পরীক্ষাও করে ডাক্তারি যন্ত্রপাতি দিয়ে। বমিটা ভালো করে দেখে। তারপর সে রায় দেয়, কলিক। কলিক হয়েছে।

 বলাই বলে, আঃ! তাই বটে। পেট চেপে ধরে মোচড় খাচ্ছে দেখে আমারও তাই মনে হচ্ছিল। রাম-শ্যাম-যদু-মধুদের শুনিয়ে কুঞ্জ ডাক্তার বলে, কলিকের ব্যথা উঠেছে। কলিকের ব্যথা হল, যাকে তোমরা শূলবেদনা বল। ঠেসে তেলেভাজা খেয়েছে, দেখছ না বমি তেলেভাজায় ভর্তি?

 মধু বলে, কিন্তু ডাক্তারবাবু—ও রক্তটা?  কলিকে রক্ত ওঠে।

 যদু বলে, পরশু মোকে শূল বেদনায় ধরেছিল ডাক্তারবাবু। রক্ত তো ওঠেনি? বমি হতে পেট ব্যথাটা নরম পড়ল।

 রোগের লক্ষণ সবার বেলা একরকম হয় নাকি?

 শ্যাম বলে, আমরা যে দেখলাম ডাক্তারবাবু লাথি মারতে?

 দেখেছ তো বেশ করেছ। ডাক্তারের চেয়ে বেশি জানো তুমি? লাথি কে মেরেছে কে মারেনি জানি না বাবু, তেলেভাজা খেয়ে ওর কলিকের ব্যথা উঠেছে।

 রাম বলে, কৈলেসবাবু লাথি মারতেই পড়ে গেল, রক্তবমি করতে লাগল।

 যাও দিকি তোমরা, যাও। যাও, যাও, বাইরে যাও, ভিড় কোরো না। ওষুধপত্তর দিতে দাও মানুষটাকে, চিকিৎসা করতে দাও। বেরোও সব এখান থেকে।

 রাম-শ্যাম-যদু-মধুরা হাসপাতালের প্রাঙ্গণে নেমে যায়। ভৈরব দুমড়াতে মোচড়াতে থাকে হাসপাতালের দুটি লোহার খাটের একটিতে। আর একবার সে বমি করে। এবার তেলেভাজা ওঠে কম, রক্ত ওঠে বেশি। মনে হয়, রক্তবমি করে তার পেটব্যথা বুঝি একটু নরম হয়েছে। তার ছটফটানি অনেকটা কমে আসে।

 বাইরে থেকে গুঞ্জন কানে আসে কুঞ্জ ডাক্তারের, বাড়ি যাবার জন্য হাসপাতাল থেকে বেরোতেই ক্রুদ্ধ ঝাপটার মতো এসে লাগে গুঞ্জনধ্বনিটা। ইতিমধ্যে রাম-শ্যাম-যদু-মধুদের সংখ্যা অনেক বেড়ে গেছে। তেঁতুলগাছটার তলায় জোট বেঁধে তাদের উত্তেজিত আলোচনা চলছে। একটু শঙ্কিত দৃষ্টিতেই তাদের দিকে তাকাতে তাকাতে পাশ কাটিয়ে খানিক তফাত দিয়ে কুঞ্জ ডাক্তার এগিয়ে যায়।

 বাড়ি গিয়ে খেয়ে দেয়ে ঘুমের আয়োজন করছে কুঞ্জ ডাক্তার, সেই উদ্ধত ক্রুদ্ধ গুঞ্জনধ্বনি দূর থেকে এগিয়ে এসে থেমে দাঁড়ায় তার বাড়ির দরজার সামনে।

 বাইরে থেকে হাঁক আসে: ডাক্তারবাবু! ও ডাক্তারবাবু! শূলবেদনার রুগি এসেছে আর একজন—কলিকের রুগি।

 ভয়ে বিবর্ণ কুঞ্জ প্রায় কাঁপতে কাঁপতে বাইরে গিয়ে দেখতে পায়, তারই সদরের চৌকাঠে মুখ থুবড়ে পড়ে দুমড়ে মুচড়ে গোঙাচ্ছে কৈলাস। মুখ দিয়ে গড়িয়ে পড়ছে রক্ত।

 রাম-শ্যাম-যদু-মধুরা বলে, পোলাও মাংস খেয়ে শূলবেদনা ধরেছে ডাক্তারবাবু, কলিক হয়েছে।