মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় রচনাসমগ্র (পঞ্চম খণ্ড)/মঙ্গলা

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে চলুন অনুসন্ধানে চলুন


মঙ্গলা

শীতে ঠকঠক করে কাঁপতে কাঁপতে মঙ্গলা খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে ডোবা থেকে উঠে আসে। পুলিশ হঠাৎ গাঁয়ে হানা দিয়েছিল মাঝরাতে। সেই থেকে এই সকাল পর্যন্ত সে ডোবার জলকাদায় আগাছার মধ্যে গা ঢাকা দিয়ে কাটিয়েছে।

 হাঙ্গামার পর থেকে এই নিয়ে পুলিশ সাতবার হানা দিল গাঁয়ে। আবার যদি হানা দেয় কিছুকাল পরে, শীত যখন আরও বেড়ে যাবে, এতক্ষণ ডোবায় এ ভাবে লুকিয়ে থাকতে হলে ডোবার মধ্যেই সে জমে কাঠ হয়ে যাবে নিশ্চয়, উঠে আর আসতে হবে না। অঘ্রাণের শেষেই হাত পা তার অসাড় হয়ে গেছে, পোষ মাঘের বাঘ মারা শীত সইবে কতক্ষণ!

 হঠাৎ ঘুম থেকে জেগে দিশেহারা হয়ে ছুটে ডোবায় নামবার সময় বাঁ পায়ের তলাটা কীসে যেন কেটে গিয়েছিল অনেকটা, ভাঙা কাচে না শামুকগুলিতে কে জানে। কত রক্ত যে বেরিয়ে গেছে দেহ থেকে ঠিকানা নেই। আঁচল জড়িয়ে শক্ত করে বেঁধেও রক্ত বন্ধ করা যায়নি বহুক্ষণ, চুইয়ে চুইয়ে রক্ত পড়েছে সে বেশ টের পেয়েছে। আঁচলটা কী লাল হয়েছে দ্যাখো।

 সকাল বেলার রোদের মৃদু। তেজে মঙ্গলার অসাড় অঙ্গপ্রত্যঙ্গে ধীরে ধীরে সাড়া আসে, ঘনঘন কেঁপে কেঁপে সে শিউরে ওঠে। হঠাৎ সে কেঁদে ফেলে ফুঁপিয়ে। প্রায় জমে যাওয়া অনুভূতিগুলিও যেন তার সূর্যের তাপে এতক্ষণে জীবন্ত হয়ে উঠেছে।

 তাড়াতাড়ি শীতের কাঁপুনি কমাতে কানাই এক ছিলিম তামাক সেজে নিয়েছিল। দুহাতে ছিলিমটা পাকিয়ে ধরে সাঁসাঁ করে কয়েকবার টান দিয়ে ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে আধবোজা গলায় সে বলে, কাঁদিসনি মঙ্গলা। পরের বার ভাগবনি আর। ঘরে থাকব। যা করার করবে।

 পাছা টনটন করে ওঠে মঙ্গলার। পাছায় সে বেত খেয়েছিল দুমাস আগে, সে ব্যথা আজও থাকার কথা নয়। তবে উলঙ্গ করে বেত মারা হয়েছিল বলে বোধ হয় ঘটনার সঙ্গে শারীরিক বেদনাটাও তাজা কটকটে হয়ে আছে স্মৃতিতে।

 কানাইয়ের ছোটো ভাই বলাই ডোবায় না গিয়ে উঠেছিল বাড়ির দক্ষিণে তেঁতুল গাছটায়। ওদের মতো জলকাদায় ভিজে শীতে কষ্ট না পেলেও সমস্ত শরীরটা তার ব্যথায় টনটন করছে। কলকেটা নিয়ে দাদার দিকে পিছন ফিরে বসে টান দিয়ে সে বলে, মোদের আর কিছু করবে না মন করে। ফেরার ক জনার জন্যে তো হানা দিচ্ছে, মোদের মারধোর আর না করতে পারে।

 বলেছে তোমার কানে কানে, পিরিতের স্যাঙাত তুমি।

 মঙ্গলা গর্জে ওঠে। সেই সঙ্গে তারস্বরে উদ্ধার করতে আরম্ভ করে জগতে যেখানে যত পুলিশ আছে তাদের চোদ্দোপুরুষকে।

 বাড়ির সামনে পথ দিয়ে যেতে যেতে কথাগুলি শুনতে পায় অধর ঘোষাল। হনহনিয়ে বাড়ির মধ্যে এসে মুখে হাত চাপা দেওয়ার মতো ব্যস্ত বিহ্বল মানায় তাকে থামিয়ে দেয়।

 থাম ছুঁড়ি, থাম। কে গিয়ে খবর দেবে, মরবি যে তখন?

 ঠিক। সবার হাঁড়ির খবর যাচ্ছে, অবাক কাণ্ড।

 ভূষণ শালা একজন, ও বাড়ির ভূষণ মাইতি।

 অধর ব্যাকুলভাবে ধমকে বলে, থাক না বাবা, থাক না। অত দিয়ে কাজ কি তোদের, চুপ মেরে থাক না?

 চুপ মেরেই তো আছি গো বাবু। বােবা বনে গেলোম। বলে মঙ্গলা এতক্ষণে পিঁড়ি এনে অধর ঘোষালকে বসতে দেয়।

 না, আর বসব না। বলে অধর ঘোষাল উবু হয়ে বেশ জাঁকিয়ে বসে।

 অধর রোগা, ঢাঙা, চিকণ শ্যামবর্ণ। চুলে সবে পাক ধরেছে কিন্তু ভুরু একেবারে সাদা। শীর্ণতা, লম্বা গলাবন্ধ কোট আর পাকা ভুরুর জন্য তাকে ভারী হিসেবি, বিষয়ী ও বিবেচক মনে হয়।

 বলতে তো ভরসা হয় না তোদের, পেটে কথা রাখতে পারিস নে। বলে বেড়াবি দশজনকে।

 কিছু বলতে চায় বুড়ো। পেটে কথা চেপে রাখতে পারছে না। তাই এমন মুখের ভঙ্গি করেছে যেন তাদের অবিশ্বাস করেও অনুগ্রহ করার জন্য ইচ্ছার বিরুদ্ধে বিশ্বাস করছে। অধরের কথা আর ভঙ্গিতে গা জ্বলে যায় মঙ্গলার।

 সুদেব আর ভূদেব কাল রাতে এয়েছিল। মরো-মরো মা-টাকে দেখতে।

 বটে? কানাই আর বলাইয়ের মুখ হাঁ হয়ে যায়।

 সাহস কী, মাগো। গাঁয়ে এল! মঙ্গলা বলে।

 খবর পেয়ে পুলিশ এসেছিল।

 ধরেছে নাকি? রুদ্ধশ্বাসে প্রশ্ন করে তিনজনে।

 অধর মাথা নাড়ে।—না। পালিয়ে গেল। কী করে পালাল ভগবান জানে, চাদ্দিকে ঘিরে ফেলেছিল। অধরের চােখ প্রায় বুজে আসে, মৃদু ক্ষোভ আর আপশোশের সুরে বলে, পুলিশ এবার বলবে, গাঁয়ের লোক ওদের লুকিয়ে রাখছে, সাহায্য করছে। ফের তল্লাসি চলবে নতুন করে, জিজ্ঞাসাবাদ শুরু হবে, চষে ফেলবে গাঁটাকে। দ্যাখো দিকি বাপু, তোদের ক জনার জন্যে গাঁসুদ্ধ লোকের কী দুর্ভোগ? নিজের মা বোন বাপ ভায়ের কথাটাও ভাববিনে তোরা?

 মঙ্গলা থতোমতো খেয়ে যায়। কথাটা তো ঠিক বলেছে হাড়হাবাতে বজ্জাত বুড়ো!

 বজ্জাত? আজ প্রথম মঙ্গলার খেয়াল হয় গাঁয়ের প্রায় সব লোক কতকাল অধরকে মনে মনে বজ্জাত বলে জেনে রেখেছে তার হিসেব হয় না, অথচ ওর কোনো বজ্জাতির খবর তো তারা রাখে না! সে নিজেও মনেমনে লোকটাকে কত খারাপ বলে জেনে এসেছে চিরকাল, অথচ চিরদিন সাধু, ভদ্র, পরোপকারী বিবেচক মানুষ যেন সে এমনি ব্যবহারই করে এসেছে তার সঙ্গে। ও কেন খারাপ, কোন বিষয়ে অসাধু, অভদ্র, অনিষ্টকারী বা অবিবেচক তা তো সে কিছুই জানে না।

 কিছুদিন থেকে একটু বেশি যাতায়াত আর ঘনিষ্ঠতার চেষ্টা করায় মনে হয়েছিল, বুড়ো বুঝি মজেছে। বয়স কাঁচা না থাক, যৌবন যা আছে তাতেই বুড়োকে সাতঘাটের জল খাইয়ে ছাড়তে পারবে ভেবেছিল সে। কিন্তু এক ঘাটের জল খেতে চাওয়ার সাধও তো শেষ পর্যন্ত বুড়োর দেখা যায়নি।

 কতকাল পালিয়ে বেড়াতে পারবি বল? খানিক থেমে থেকে, একটু প্রায় ঝিমিয়ে নিয়ে, অধর বলে, ধরা পড়বি, দুদিন আগে আর পরে। নিজেরাই ধরা দে, হাঙ্গামা চুকুক, আমরা বাঁচি। গাঁয়ে বা আসবার কী দরকার ছিল তোদের দুজনের? পালিয়েছিস, দূরে পালা, পুলিশ জানুক গাঁয়ের ধারে কাছে তোরা নেই। মাকে দেখতে এয়েছে? কত দরদ মায়ের জন্যে! বুড়ো বাপ থেঁতুনি খাচ্ছে, মায়ের চিকিচ্ছে নেই, ধরা না দিয়ে দরদ করে দেখতে এলেন মাকে। খুব তো দেখলি, গাঁসুদ্ধ লোককে হাঙ্গামায় ফেলে গেলি ফের!

 আর একটু বেলা করে অধর উঠল। যাবার সময় বলে গেল, আমার গোরুটা খুঁজে দিস, কানাই বলাই। কাল থেকে পাত্তা নেই। খোঁয়াড়ে যদি ফের দিয়ে থাকে যদু দত্ত, দেখে নেব এক চােট যদুকে আমি, এই বলে গেলাম তোদের।

আরও বেলায় মঙ্গলা বড়ো পুকুরে নাইতে যায়। গা-গতর জমে থাক, ব্যথা হোক, ভেঙে আসুক, নাইতে হবে, রাঁধতে হবে, পোড়া পেট শুনবে না। দত্তদের বড়ো পুকুরের ঘাটে মেয়ে পুরুষ নাইতে আর জল নিতে এসেছে, এ ঘাটে বাসন মাজা বারণ। ফিসফাস গুজগাজ চলে গত রাত্রের ব্যাপারের। অধর গোপন কথা কিছু ফাঁস করেনি, সবাই জানে সব কথা। বরং ঘটনা কিছু বেশিই জানে অধরের চেয়ে। কেবল সুদেব আর ভূদেব নয়, ফেরারিদের আরেকজনও নাকি গাঁয়ে এসেছিল কালরাত্রে। কে সে ঠিকমতো জানা যায়নি। কেউ বলে দীনু বসাকের ছেলে তিনকড়ি, কেউ বলে সতীশ সামন্তের ভাই যতীশ সামন্ত, কেউ বলে পদ্মলোচনা সাউ নিজে। মঙ্গলার হঠাৎ খেয়াল হল অধরের কথার আসল মানেটা। না, তাদের পেটে কথা থাকে না বলে ব্যাপারটা তাদের শোনাতে ভাবনা হয়নি অধরের, ব্যাপারটার যে ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ আর পলাতকদের যে সমালোচনা সে শুনিয়েছে তাই ছিল তার গোপন কথা। কে জানে গাঁয়ের মানুষ দুর্ভোগ চায়, না, ফেরারিরা ধরা দিয়ে তাদের একটু স্বস্তি দিক, এটা চায়! সে দিনকাল আর নেই, ঘা খেয়ে খেয়ে কেমন যেন হয়ে গেছে শান্তশিষ্ট অলস নির্জীব মানুষগুলি। ওদের মন বোঝা ভার।

 তবে, কিছুই না করে, বাড়ি বাড়ি অন্তত খানাতল্লাস আর সকলকে জেরা পর্যন্ত না করে, ভোর ভোর পুলিশ গাঁ ছেড়ে চলে গেল কেন ভেবে সবাই অবাক হয়ে গেছে। মঙ্গলাও এই কথাটাই ভাবছিল।

 কালু দাসের কচি বউটা, স্বামী যার এখনও আটক আছে, জলে কলসি আর পা ডুবিয়ে বসে চুপ করে সকলের কথা শুনছিল, মাথাটা একটু হেঁট করে একদৃষ্টি কালচে জলের নীচে খেলায় রত দত্তদের পোষা বড়ো বড়ো লালচে রুই কটার দিকে চেয়ে। মঙ্গলা কলসি কাঁখে তুলে উঠছে, সে হঠাৎ বলে, যাবেনি? একবার ওনারা এয়েছেন, ফের তো আসতে পারেন, তাই চলে গেছে। ফের ওনারা এলে, তখন ধরবে।

 শুনে কেউ অবাক হয় না, মুখ চাওয়াচাওয়ি করে না। পুলিশ কেন কী করে জানা যেন চাষির ঘরের এতটুকু কচি বউয়ের পক্ষে আশ্চর্য নয়। বাড়িটার দিকে চলতে চলতে মঙ্গলা ভাবে, তা বটে, ওরা আসতে পারে আবার। সুদেব আর ভূদেবের আসবার সম্ভাবনাই বেশি, মায়ের ওদের আজ-মরে কাল-মরে অবস্থা, অন্যেরাও আসতে পারে, তাদেরও মা বোন ভাই আছে।

 গোলোক যদি আসে? ওর অবশ্য তেমন আপন কেউ নেই এখানে। তার সঙ্গে যে সম্পর্ক সেটা ধরলে আছে, না ধরলে নেই। তবু, কিছুদিন তো ছিল তার কাছে লোকটা, আর ছিল বলেই ওর জন্য ভোগান্তি তার কম হয়নি এবং হচ্ছে না, খবর নিতে কি আসতে পারে না একবার?

 যদি আসে, একচোট ওকে নেবে মঙ্গলা। পাছাটা টনটন করে ওঠে মঙ্গলার, কোমরটা একটু বেঁকে গিয়ে কলসির জল খানিকটা উছলে পড়ে যায়। ইস, কী হয়ে গেছে দেহটা তার, এক কলসি জল বইতে এত কষ্ট! জেল হােক, দ্বীপান্তর হোক, ফাঁসি হােক, গোলোকের নাগাল পেলে মঙ্গলা তাকে ধরা দিতে বলবে। নিজে ধরা না দিলে, সেই তাকে ধরিয়ে দেবে। কেন, কীসের অত খাতির ওর।

 ক্ষোভে দুঃখে চােখ ফেটে জল আসে মঙ্গলার। পায়ের কাছে ঘাসে কলসিটা নামিয়ে রেখে চারিপাশের জগতকে প্রাণভরে গলা ফাটিয়ে একচোট গালাগালি দিতে মনটা তার ছটফট করে। মাঠ জঙ্গল নালা ডোবাকে, আস্ত তার পোড়া চালার ভস্মগুলিকে, ফসল ভরা আর ফসল-পোড়া খেতগুলিকে, অঘ্রানের সোনার সকালকে, চলমান মানুষ আর গোরু বাছুরগুলিকে। মাটিতে পায়ের পাতায় কাটার ব্যথা ভুলে গিয়ে লাথি মারে মঙ্গলা মোটে একবার। গোলোকের কাছে সে সতীত্ব দিতে পারত খুশি মনে আর গোলোকের জন্য তার সতীত্ব গেল আস্তাকুঁড়ে, লাঞ্ছনা হল অকথ্য। পা দিয়ে আবার রক্ত বেরোল, দ্যাখো! তার খবর নিতে কেন আসবে গোলোক!

 খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে অতি কষ্টে বাড়ি গিয়ে মঙ্গলা দুটি ভাত সিদ্ধ করে শুয়ে পড়ে। পা-টা তার একটু একটু করে ফুলতে থাকে সারাদিন, সন্ধ্যার সময় ফুলে ঢোল হয়ে যায়। রাত্রে আরও ফুলবে সন্দেহ থাকে না। পলাশ পাতা পায়ে জড়িয়ে বেঁধে দাওয়ায় শুয়ে মঙ্গলা কাতরায়। জ্বরের ঘোরে তার কেমন নেশার মতো আচ্ছন্ন ভাব এসেছে, মনে তার দেহের জ্বালা যন্ত্রণার অনুভূতি একটু ভোঁতা হয়েছে। কানাই গেছে অধরের হারানো গোরুটা ফিরিয়ে দিতে, বেগুন খেতে ঢোকায় দত্তরা সতাই নাচালের খোঁয়াড়ে পাঠিয়ে দিয়েছিল—আড়াই ক্রোশ পথ। বলাই গেছে বসন্ত কবিরাজের বাড়ি, মঙ্গলার জন্য ওষুধ আনতে।

 সন্ধ্যার আবছা অন্ধকারে একটা লোক সোজা উঠান পেরিয়ে দাওয়া ঘেঁষে এসে দাঁড়াতেও মঙ্গলা ভয় পায় না।

 ঝিমানো সুরে শুধোয়, কে? কে গো?

 গোলোক বলে, আমি গো, তুমাদের দেখতে এলাম।

 সাঁঝ সকালে জানান দিয়ে দেখতে এলে? ধরবে যে?

 ধরে ধরবে। ধরা দিতেই তো এইছি।

 ধরা দিতে এয়েছ? অ!

 সবাই এইছি ধরা দিতে। পরামর্শ করে এইছি। গাঁয়ের সবাই মোদের বেঁধে ধরিয়ে দেবে—মোরাই বলব ধরিয়ে দিতে, জরিমানাটাও যদি মাপ হয় গাঁয়ের। ইস, এ যে অনেক জ্বর গো!

 গোলোকের ঠান্ডা হাত গা থেকে সরিয়ে মঙ্গলা কপালে রাখে।

 গাঁয়ের লোক ধরিয়ে দেবে? দিচ্ছে—পায়ে ধরে সাধো গা। খানিক খানিক খপর কি পায়নি হেথা কেউ, তোমরা কোথায় আছ, কী করছ? মুখ খুলেছে কেউ? নাগসায়রে তুমি যেতে পারো, এ কথাটি বলতে পারতাম না আমি? বলেছি? দাঁতে দাঁত কামড়ে থেকেছি আগাগোড়া। মঙ্গলা একটু ঝিমায়। ধরা দিতে এয়েছ। অ্যাঁ? নাই বা দিলে ধরা? যাক না কিছুকাল। দেখা যাক না কী হয়।

 নাঃ। মোদের জন্যে গাঁসুদ্ধু লোক ভুগবে? আজ রাতটা যে যার বাড়ি কাটাব, সকালে দত্তদের ওখানে সবাইকে ডাকিয়ে বলব, মোদের আটক করে খপর পাঠাও।

 মঙ্গলা জ্বরের ঘোরে হাসে। সবাইকে ডাকিয়ে বললে খপর যাবে না। সবাই মিলে বরং বলবে, পালাও শিগগির। খপর দেবার যে আছে দু-একজন তারাই খপর পৌঁছে দেবে ঠিক। বলতে বলতে কানাই বলাই এসে গোলোককে দেখে স্তম্ভিত হয়ে থাকে। গোলোক বলে, ভয় নেই, খপর নিতে এইছি। বলাই ঢোক গিলে মঙ্গলাকে বলে, কবরেজ মশায় মালিশ দিলে একটা। আর বললে সেঁক দিতে।

 এ কথার জবাব না দিয়ে মঙ্গলা কানাইকে শুধোয়, বুড়ো ঘরে ছিল?

 ছিল।

 তখন মঙ্গলা উঠে বসে। বলাই আর গোলোককে বলে, তোমরা বসে থাকো, এখুনি আসছি।

 কষ্টে দাওয়া থেকে পা নামিয়ে বলাইয়ের দিকে হাত বাড়িয়ে বলে, ধরে নিয়ে চল দিকি ভাই আমাকে একটু। চটপট চল। থামো বাবু তোমরা, ফপরদালালি কোরো না, যা বলছি শোনো।

 বলাইয়ের ঘাড়ে ভর দিয়ে ফেলা পা-টা টেনে টেনে মঙ্গলা বাইরের কুয়াশায় বেরিয়ে যায়।

 কুয়াশা গোয়ালের খড়ের ধোঁয়ায় ভারী হয়েছে।

 কোথা যাবে?

 চল্ না দাদা। মঙ্গলা কাতরে ওঠে।

 অধরের বাড়ি পৌঁছে মঙ্গলা ভেতরে যায় না, বাড়ির সামনে কদম গাছটার তলে দাঁড়িয়ে থাকে। বলাই ডেকে আনে অধরকে।

 শোনেন। খপর আছে।

 লন্ঠনের আলোয় তার মুখের চেহারা দেখে অধরের সাদা ভুরু কুঁচকে যায়। সেই লন্ঠনের আলোতেই মঙ্গলা অধরের সদরের ঘরের জানালায় দেখতে পায় ভূষণ মাইতির মুখ।

 ওরা আজ গাঁয়ে আসছে, ধরা দিতে। সব ক জনা আসছে।

 ধরা দিতে আসছে?

 হাঁ, সব ক জনা। গোলোক এসেছিল, মোকে বলে গেল।

 অ, তা গোলোক চলে গেছে নাকি?

 আসবে ফের। মোর কাছে থাকবে। বললে কি, আজ রাতটা যে যার ঘরে থাকবে আপনজনের সাথে, কাল সকালে ধরা দেবে। রাতে যদি খবর পেয়ে পুলিশ আসে, তবে নাকি ফের পালাবে, আর আসবেনি ধরা দিতে কোনোকালে। বলে কি জানেন, গাঁয়ের লোকের মুখ চেয়ে ধরা দেব বলে আসছি, একটা রাত যদি না ঘরে থাকতে দেয় তারা, তবে কাজ কি মোদের ধরা দিয়ে! মোর ডর লাগছে গো বাবু। কালকের মতো যদি পুলিশ আসে তো সর্বনাশ। ওরাও ধরা দেবেনি, মোদেরও মরণ?

 কথাটা বিবেচনা করতে করতে ধীর শান্তভাবে অধর বলে, পুলিশ কি খপর পাবে?

 মঙ্গলা কাঁদোকাঁদো হয়ে বলে, যদি পায়? কী হবে তবে? একজনও ধরা পড়বেনি জানেন তো, গাঁয়ের আধকোশের মধ্যে পুলিশ এলে গাঁয়ে জানাজানি হয়ে যায়। কালের মতো পুলিশ আসবে, এসে দেখবে সবাই পালিয়েছে। কী উপায় হবে?

 অধর চােখ বুজে বলে, ভগবান যা করেন। আমরা কী করতে পারি বল? তবে কি জানিস, কাল এসেছিল, আজ আবার পুলিশ আসবে মনে হয় না।


বাড়ি ফিরে মঙ্গলা শুয়ে পড়ে ধপাস করে।

 বলে, আলোটা জ্বাল বলাই, যেটুক তেল আছে জ্বেলে দে। দুভাই মিলে রাঁধাবাড়া কর কী আছে ঘরে, একটা লোক এয়েছে, থাকবে একটা রাত, খেতে দিতে হবে না তাকে? আর তুমি একটু মালিশ করো পায়ে।