মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় রচনাসমগ্র (পঞ্চম খণ্ড)/রিকশাওয়ালা

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে চলুন অনুসন্ধানে চলুন


রিকশাওয়ালা

ময়দানে নধর পরিপুষ্ট গোরুগুলি চড়িয়া বেড়াইতেছিল। ভদ্রলোক প্রথমে আঙুল নিয়া কাছাকাছি কয়েকটি, তারপর হস্ত সঞ্চালনের দ্বারা চারিদিকে ছড়ানো সবগুলি গোরু দেখাইয়া বলিলেন, ওরা সব নাকি আদর্শবাদের জীবন্ত রূপক। জীবন্ত, বাস্তব ও প্রামাণিক বৃপক। জীবন্ত যে তাতে আর সন্দেহ কী। বাস্তব প্রমাণেই। বাংলার সমস্ত গোহাটা, মাঠঘাট ও গো-পোষা গেরস্ত ঘরে প্রত্যক্ষ, শহর ও মফস্বলের দুধের স্বাদ-গন্ধ ভোলা বা স্বাদ-গন্ধ না-জানা ছেলেপিলেগুলির সংখ্যা ও চেহারায় অতথ্য এবং চিতার ধোঁয়া ও কবরের মাটিতে পরোক্ষ প্রমাণ।—হােয়াট, আঁ, আঁ, হোয়াট? ঠিক না?

 তার ঢুলু ঢুলু লাল চোখে জল আসিয়া পড়িল। না চাহিতে গছানো সরকারি বিবৃতির মতো আমার পাঁজরে সজোরে আঙুলের খোঁচা মারিয়া স্বীকার করিলেন যে, হুইস্কি খাইতেছিলেন। মোটে চার পেগ। নেশা হয় নাই। নেশা হয় না। নতুন কন্ট্রাক্ট পাইলে, বিলের টাকা পাস হইলে, ট্যাক্সের নোটিশ আসিলে ব্যাঙ্কে কত ছিল কত হইয়াছে আর কত হইবে ভাবিলে এবং এ রকম আরও কতগুলি বিশেষ বিশেষ উপলক্ষে বুকটা তার ধড়ফড় করে, দিনের বেলাই খান। দিনে শুরু করা প্রায় অভ্যাস হইয়া গিয়াছে। কিন্তু নেশা হয় না। ময়দানে একটু হাওয়া খাইতে আসিয়াছেন। ভগবান যদি দয়া করেন, ফিরিয়া গিয়া আর গোটা চারেক পেগ খাইলে সন্ধ্যাতক নেশা লাগিতে পারে।

 বাঁচাই অসম্ভব দাদা। টাকায় দু সের দুধ, তার অর্ধেক জল, তাও পাওয়া মুশকিল। রিকশাওয়ালা ছআনা নিলে—শালা ব্লাডি ডাকাত। ওই হােটেল আর এই মনুমেন্ট, এইটুকু আসতে ছআনা—ছ ছ গন্ডা পয়সা! দেশ কি অরাজক?

 ভদ্রলোককে নামাইয়া দিয়া রিকশা রাখিয়া অ্যাসফল্ট দেওয়া ময়দানি ফুটপাথের প্রান্তে ঘাসের রাজ্যে আসিয়া রিকশাওয়ালা দুহাতে পেট চাপিয়া উবু হইয়া বসিয়া কিছুক্ষণ কাশিয়াছিল মনে আছে, ঘুংরি কাশিতে যেমন হয় তেমনিভাবে হুসপ হুসপ শব্দে আটকানো দম টানিয়া টানিয়া। কেন কাশিয়াছিল জানি। রোজগারের সুবর্ণ সুযোগ আসিয়াছে, দশটা মিনিট বসিয়া থাকিতে হয় না, বেশি রেটে ভাড়া মেলে, কতজন্মের পুণ্যফল! টাকার, দামের পুরানো সংস্কারটা এখনও টিকিয়া আছে, টাকার দাম যে কমিতে পারে ধারণায় আসে না। খরচ বাড়িয়াছে, সেটা ঠিক কথা, কিন্তু ভিন্ন কথা।

তাই হরেদরে যাতে সমান না দাঁড়াইয়া যায় সে জন্য এরা খরচ কমাইয়াছে। খাওয়ার বাবদেই বেশি যায়, এ খরচটা ছাঁটিয়াছে মোটা রকম। একদিন রাত এগারোটার পর কালীঘাট হইতে রিকশায় টালিগঞ্জ যাইতেছিলাম। রেলের পুলটার কাছে হঠাৎ রিকশা উলটাইয়া ডিগবাজি খাইয়া রাস্তায় পড়িয়া গেলাম। খুব একচোট গালাগালি আর বিরাশি সিক্কা ওজনের একটা চড় বসাইয়া দিব স্থির করিয়া গা ঝাড়িয়া উঠিয়া দেখি, রিকশাওয়ালা সটান মুখ থুবড়াইয়া রাস্তায় পড়িয়া আছে। চড় মারার বদলে পানের দোকান হইতে শরবতের গ্লাসে পান-ধোয়া জল আনিয়া লোকটির সেবা করিতে হইল। মাথার উপরে আকাশে চাঁদটা ছিল প্রায় আস্ত। রিকশাওয়ালাটিকে ভালো করিয়া দেখিব বলিয়াই যেন সেই সময়টুকুর জন্য চাঁদ জ্যোৎস্নার জোর খানিকটা বাড়াইয়া দিয়াছিল। লোকটির বয়স ত্রিশের নীচে। চিত হইয়া শোয়ার জন্য পেটের চামড়া খাদে নামায় ভাঁজ নাই কিন্তু ভাঁজের দাগগুলি বেশ স্পষ্ট। মুখের চামড়া মরা শুকনো ট্যাংরার মতো সিটা। চিকণ বিবর্ণ গোঁপের উপর বনেদি ধাঁচের চোখা দীঘল নাকটা সশব্দ শ্বাস টানার সঙ্গে ফুলিয়া ফাঁপিয়া উঠিতেছিল। দূরে সেই শ্বাস টানার শব্দ যেন আরও জোরে প্রতিধ্বনিত হইতে হইতে কাছে আগাইয়া আসিতেছিল। একটু পরে টের পাইলাম, রেলগাড়ি আসিতেছে। প্রায় আধ মাইল লম্বা মালগাড়ি টানিয়া একটা ইঞ্জিন আগুনের হলকা ছাড়িয়া হাঁপাইতে হাঁপাইতে ধীরে ধীরে আগাইয়া আসিয়া পরম উপভোগ্য বিরাট ঝনঝনির কলরবে পুলে উঠিয়া পড়িল।

 তখন খেয়াল হয় নাই। আজ ময়দানে এই হৃদয়বান দার্শনিকের জীবন্ত উপমার কথায় মনে হইল, সে রাত্রে কল্পনা করা হয়তো আমার উচিত ছিল যে রিকশাওয়ালা ও ইঞ্জিনটার একই হাঁপানি রোগ হইয়াছে। একটি খটকা শুধু মনে খচখচ করিতে লাগিল। রিকশাওয়ালা জিদ ধরিয়াছিল প্রতিদিনকার নিয়ম সে কিছুতেই ভাঙিবে না, খাইতে যদি হয় আমাকে পৌঁছাইয়া দিয়া সোয়ারি পাইলে সোয়ারি লইয়া ফিরিয়া দু-আনায় কেনা রুটি দুখানি বিনা পয়সায় পাওয়া ছোলার ডাল ও ছ্যাঁচরাটুকু দিয়া খাইবে। সামনের মিষ্টির দোকানে তাকে ছ-আনার দুধ মিষ্টি খাওয়াইতে আমাকে যেরকম ধস্তাধস্তি করিতে হইয়াছিল, ইঞ্জিনে কয়লা দিতে কি ড্রাইভারের সে রকম হাঙ্গামা ও পরিশ্রম করিতে হয়?

 বেচারার করুণ দৃষ্টি দেখিয়া মনে হইয়াছিল আমাকে পুলিশেরও অধম ভাবিতেছে। আমি দাম দিলে অবশ্য সে খুশি হইয়া খাইত। কিন্তু আমি ইচ্ছা করিয়া দিই নাই। কেবল চুক্তির ভাড়াটা চুকাইয়া দিয়া বাকি পথটা হাঁটিয়া গিয়াছিলাম।

 আজকাল অভিযোগ শুনিতে পাই রিকশাওয়ালাদের পায়াভারি হইয়াছে। সোলজারগুলোকে ঠকিয়ে মোটা পয়সা পায় আমরা ডাকলে কথাই বলতে চায় না। স্পষ্ট মুখের ওপর বলে বসে মশায়, যাব না। অনুযোগে যে পরিমাণ জ্বালা প্রকাশ পায়, কোনো রিকশাওয়ালা সেই অনুপাতে তেজ দেখাইয়া কোনো ভদ্রলোককে অপমান করিয়াছে বিশ্বাস করিতে পারিলে খুশি হইতাম। খুব খানিকটা খাতির আর সম্মান দেখায় নাই, সত্য বোধ হয় শুধু এইটুকু। ট্যাক্সিওয়ালার হুমকি আর ঘোড়ার গাড়ির গাড়োয়ানের টিটকারিতে বাবুদের বেশি লাগে না। কিন্তু রিকশাওয়ালা জাতটাই নিরীহ গোবেচারি ভীরু। তাদের দেহ কাবু হয় জঘন্য শ্রান্তিতে যা প্রায় ক্ষয়রোগ ও হাঁপানি রোগের সমবেত আক্রমণের মতো: মৃদু এবং শ্লথ কিন্তু দুর্নিবার। মন কাবু হয় আত্ম-তুচ্ছতার কঠিন রোগে। সবাই গাল দেয়, হুমকি দেয়, ধমকায়। সবাই অন্যায় করে, অবিচার করে, অত্যাচার করে। সুস্থ সবল তেজস্বী মানুষ কয়েকবছর রিকশা টানিবার পর জীর্ণ শীর্ণ হইয়া ঝিমায়, বিশ্বাস করে যে রিকশা টানাটাই চুরি করা বা ভিক্ষা করার মতো হেয় কাজ। লোকে যে রিকশা চাপিয়া পয়সা দেয় সেটা শুধু অনুগ্রহ করা নয়, উদারতার পরিচয়ও বটে—রিকশা টানার অপরাধ ক্ষমা করার উদারতা। অস্পৃশ্যরা কঠিন নোংরা কাজ করিয়া টিকিয়া থাকার সুযোগ পাওয়ার মধ্যে জাতওলাদের যে উদারতা দেখিয়া কৃতজ্ঞতায় কৃতার্থ বোধ করে। নিরীহতম দু-একটি কেঁচাে হয়তো যুদ্ধের অস্বাভাবিক অবস্থার চাপে নিরীহ হেলে সাপ সাজিয়াছে, তাতেই চোখ কপালে উঠিয়া গিয়াছে অনেকের। ছদ্মবেশী বিষাক্ত সাপগুলি যে কিলবিল করিতেছে চারিদিকে তাতে কোনো আপশোশ নাই।

 এই নিপীড়িত ক্ষয়িষ্ণু মানুষগুলির সহজ সৌজন্য আমাকে মুগ্ধ করে। ভয় বা খাতিরের বিনয় নয়, বকশিসের লোভের খোশামোদ নয়, খাঁটি সৌজন্য। অন্যের আন্তরিকতাকে চিনিয়া গ্রহণ করিয়া আন্তরিকতার প্রতিদান যার মর্মকথা।

 এই রোখো। হিঁয়া রোখো।

 সোয়ারির গর্জন শুনিয়াও মোড়ের মাথার কাছে প্রধান রাস্তাটির উপরে সেখানে গাড়ির ভিড়ের মধ্যে রিকশা থামানো গেল না। একটু আগাইয়া বাঁক ঘুরিয়া বাঁয়ের রাস্তায় ঢুকিয়া রিকশাওয়ালা গাড়ি নামাইয়া রাখিল। সোয়ারি নামিয়াই রিকশাওয়ালার গালে একটা চড় বসাইয়া দিল।

 সোয়ারি বাবু নয়। লুঙ্গিপরা গেঞ্জি গায়ে গামছা কাঁধে শ্রেণির মানুষ। সেখানে কুড়ি পঁচিশটা রিকশা ছিল, রিকশাওয়ালারা হাঁ হাঁ করিয়া ছুটিয়া আসিয়া লোকটিকে ঘিরিয়া ধরিল। পথিকও জমিয়া গোল কয়েকজন।

 সোয়ারির সেদিকে খেয়াল আছে মনে হইল না। চড় মারিয়া নিজেই চমকিয়া উঠিয়া সে কেমন এক অদ্ভুত দৃষ্টিতে রিকশাওয়ালার মুখের দিকে তাকাইয়া হতভম্বর মতো দাঁড়াইয়া ছিল, হঠাৎ সে দুহাতে রিকশাওয়ালার ঘণ্টাসমেত ডান হাতটি চাপিয়া ধরিল।

 মাপ কিজিয়ে ভেইয়া। কসুর হুয়া।

 কয়েক মুহূর্ত অপেক্ষা করিয়া সে আবার বলিল, মায় কভি এসা নাহি কিয়া। বলিয়া রিকশাওয়ালার হাতটি তুলিয়া নিজের গালে চড় বসাইয়া দিবার চেষ্টা করিল।

 আরে রাম রাম!

 কতক্ষণ দুজনে অন্তরঙ্গ বন্ধুর মতো আলাপ করিয়াছিল জানি না, মিনিট দশেক পরে বন্ধু আমাকে জোর করিয়া টানিয়া নিয়া গেলেন।

 বন্ধু বলিলেন এতে সৌজন্যের কী আছে? তোমার গালে চড় মেরে কেউ যদি ও ভাবে মাপ চায়, তুমিও তাকে ক্ষমা করবে।

 তাতে অন্তত এটুকু প্রমাণ হয় তো যে ও আমার চেয়ে ছোটাে লোক নয়?—বলিয়া আমি যোগ দিলাম, আমি শুধু ক্ষমা করতাম। ওদের মুখের ভাব দেখেছিলে, কথা শুনেছিলে? ক্ষমা করে ও রকম দিলাদরিয়া হবার ক্ষমতা তোমার আমার নেই।

 সেই দিনই রিকশাওয়ালা মহাবীরের কাছে তার মুশকিলের কাহিনি শুনিয়াছিলাম। সোয়ারি নিয়া সে চেতলায় গিয়াছিল। একটি বিধবা স্ত্রীলোককে লইয়া কালীঘাটে আসে। কালীঘাটে আত্মীয়ের বাড়ি স্ত্রীলোকটি আর খুঁজিয়া পায় না। সঙ্গে একটি পয়সাও নাই। সন্ধ্যা হইয়া আসিতেছে। মহাবীরেরও চেতলা ফিরিয়া যাওয়ার উপায় নাই। গাড়ি জমা দিতে হইবে। অনেক কষ্টে শেষে চেতলা এলাকার একটি গাড়ির খোঁজ করিয়া স্ত্রীলোকটিকে তাতে উঠাইয়া দিয়া রেহাই পায়। কালীঘাটে সোয়ারি পৌঁছাইয়া দিয়া গাড়িটি চেতলা ফিরিয়া যাইতেছিল।

 ও আপত্তি করল না মহাবীর? ভাড়া ফসকে যাবার ভয় ছিল তো?

 আপত্তি কীসের? মহাবীরের ভাড়াও তো একরকম ফসকাইয়া গিয়াছে। বাড়ি ফিরিয়া স্ত্রীলোকটি যদি ডবল ভাড়া দেয়, দেখা হইলে চেতলায় সেই রিকশাওয়ালা—তাকে মহাবীর চেনে না—অর্ধেক মহাবীরকে দিবে। ভাড়া যদি অবশ্য না পায়—

 আজ সকালে যা ঘটিয়াছে সেটা শিশুশিক্ষার গল্পের মতো শোনাইবে। বেলা তখন সাড়ে দশটা। শহর ব্যস্ত, বিব্রত উদবিগ্ন এবং একান্তভাবে আত্মকেন্দ্রিক।

 আমি অন্ধ বাবা। আমি অন্ধ ভিখিরি বাবা। আমায় পথটা পার করে দাও! অন্ধ বাবা...

 আরও কয়েক মিনিট এ ভাবে চোঁচানোর পর অন্য কেউ হয়তো তাকে পথ পার করিয়া দিত, একজন রিকশাওয়ালা আগেই কাজটা করিয়া ফেলিল। অন্ধকে যে দয়া করিল ঘটনাক্রমে সে রিকশাওয়ালা তাই উল্লেখ করিলাম। রিকশাওয়ালারাই শুধু অন্ধজনে দয়া করে এ কথা বলা উদ্দেশ্য নয়।

 আমি? আমি কি করিতেছিলাম? আমি দেখিতেছিলাম। অন্ধকে কেউ পার করিয়া দেয় কিনা, কে দেয় এবং কী ভাবে দেয়।