মিল্টনের জীবন চরিত

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন

 

A SERIES

OF

BIOGRAPHICAL SKETCHES

IN BENGALI.

 

No. 1

 

THE LIFE OF

MILTON

মিল্টনের জীবন চরিত।

 

 

STANHOPE PRESS:

J. C. BOSE & Co., 182, Bow-BAZAR RoAD, CALCUTTA.


1st July, 1864.

 

মিল্টনের জীবন-চরিত।

 

 মহানুভব মনুজবর্গের জীবনচরিত পাঠ করিলে মহোপকার সম্ভাবনা। এই সুবিস্তৃত সৃষ্টির সর্বাগ্রগণ্য পদে অধিষ্ঠিত হইয়া, আমরা বিবিধ উদ্দেশ্য সাধনাৰ্থে স্থাপিত হইয়াছি; এবং পুরাকালে যাঁহারা বিদ্যাবুদ্ধি সম্পন্ন হইয়া গণ্য ও মান্য হইয়াছেন ও সুতরাং মনুষ্যোপযুক্ত নানা কীৰ্ত্তি সম্পন্ন করিয়াছেন, তাঁহাদের গুণকীৰ্ত্তন করা সাতিশয় হৃদ্য। সুবিখ্যাত ইংলণ্ডীয় কবি জন মিল্টনের জীবনবৃত্তান্ত অনেক ইংরাজি গ্রন্থকৰ্ত্তা দ্বারা লিখিত হইয়াছে কিন্তু অস্মদেশীয় বাঙ্গালাভাষায় অদ্যপি উত্তমৰূপে প্রকাশিত হয় নাই। গ্রিস দেশীয় হোমর, রোমীয় বর্জিল এবং ইংলণ্ডীয় মিল্টনের নাম, সুসভ্য জাতিগণ বহুকালাবধি অবগত আছেন; এবং এতদ্দেশে ইংরাজি ভাষার সমধিক চর্চ্চার সহিত তাঁহদের মনোহর কবিতাগুলি ক্রমে ক্রমে অধিকতর আদরণীয় হইতেছে। না হইবে কেন, যে দেশে বাল্মীকি, কালিদাস, ঘটকর্পর ইত্যাদি মহাত্মারা সুরস কবিতা রচনা দ্বারা ভাষার উন্নতি সাধন করিয়াছেন, সে স্থানের লোকেরা যে অদ্যাবধি কাব্যচর্চ্চায় মনোযোগী থাকিবেন, তাহার আশ্চর্য্য কি?

 জন মিল্টন, ১৬০৮ খৃঃ অব্দে, ৯ই ডিসেম্বর তারিখে, সদ্বংশে লণ্ডননগরে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি প্রথমে জনৈক খৃষ্টধর্ম্ম যাজক টমাস ইয়ঙ্গের নিকট শিক্ষিত হয়েন। মিল্‌টন তাঁহার শিক্ষককে সাতিশয় মান্য ও ভক্তি করিতেন, এবং লাটিন ভাষায় তাঁহার প্রশংসাসূচক দুইটি কবিতা লিখিয়া গিয়াছেন। তদনন্তর মিল্‌টন সেণ্টপাল্‌স বিদ্যালয়ের ছাত্র হইয়া লাটিন ভাষা শীঘ্র শীঘ্র শিক্ষা করিতে লাগিলেন। পূর্ব্বোক্ত বিদ্যালয়ের অধ্যক্ষের পুত্র জিলের সহিত তাঁহার অত্যন্ত বন্ধুত্ব জন্মিল, এবং সেই বন্ধুত্ববিষয়ক তিনটি লাটিন কবিতা অদ্যাপি বর্ত্তমান আছে। ষষ্ঠ দশ বর্ষ বয়ঃক্রম কালে, তিনি সুবিখ্যাত কেম্ব্রিয বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হইয়া সপ্ত বৎসর তথায় অধ্যয়ন করেন। এই সময়ে লাটিন ভাষায় তাঁহার বিলক্ষণ ব্যুৎপত্তি জন্মিল। লাটিন কবিতা, উক্ত পুরাতন ভাষার স্বাভাবিকী সরলতার সহিত রচনা করা অতি দুৰূহ ব্যাপার; কথিত আছে মিল্‌টনের পূৰ্ব্বে ইংলণ্ডদেশে কেহই উহা সম্পন্ন করিতে সক্ষম হয়েন নাই। বিশ্ববিদ্যালয় ত্যাগ করিয়া তিনি হর্টন নগরে পিতৃভবনে বাস করেন এবং উক্ত কালে গ্রিক ও লাটিন ভাষার সমস্ত বিখ্যাত গ্রন্থ গুলি পাঠ করেন। কিঞ্চিৎ পরেই মিল্‌টন কোমস ইত্যাদি তিনখানিগ্রন্থ প্রকাশ করেন।

 হলণ্ডদেশীয় মহাজ্ঞানী গ্রোশসের নাম অনেকে শ্রবণ করিয়া থাকিবেন। এই মহাত্মার ফ্রান্সদেশীয় ভূপতির নিকট বাসকালীন, মিল্‌টন তাঁহার সহিত আলাপ করিবার মানসে উক্ত দেশে গমন করেন। তিনি ফান্স হইতে ইটালি দেশে যাইয়া, জগদ্বিখ্যাত গালিলিয়োর সহিত সাক্ষাৎ করেন। এই ভূমণ্ডল সূৰ্য্যের চতুর্দ্দিকে ভ্রমণ করিতেছে, এবং সূৰ্য্য অচল, ইহা গালিলিয়োর আবিষ্ক্রিয়া। তাঁহার দেশীয় লোকেরা বহুকাল-কথিত পৃথিবীর অচলতার অবিশ্বাসোৎপাদক কথা শুনিয়া গালিলিয়োকে অত্যন্ত ঘৃণা করিতে লাগিলেন এবং উক্ত কারণে গালিলিয়ো কারারুদ্ধ হইলেন। সেই সময়েই মিল্‌টন তাঁহার সাক্ষাৎলাভ করেন। সিসিলি দ্বীপ ও গ্রিস পৰ্য্যটন করিবার ইচ্ছা থাকাতেও তিনি মাতৃদেশের রাজ্যসম্বন্ধীয় গোলযোগ শ্রবণ করিয়া তথায় প্রত্যাগমন করিলেন। তাঁহার পিতার আয়ের অল্পতা হেতু স্বীয় ব্যয়াদি নিৰ্ব্ব্বাহার্থে মিল্‌টন একটি বিদ্যালয় স্থাপন করিলেন।

 ১৬৪১ খৃঃ অব্দে তিনি তৎকাল প্রচলিত ধৰ্ম্মের বিপক্ষে “উন্নতির প্রবন্ধ” নামে একখানি পুস্তক প্রকাশ করেন এবং তাহার পরবৎসরেই কাথলিক ধৰ্ম্মের বিপক্ষে আর একখানি পুস্তক লেখেন। শেষোল্লখিত পুস্তকে তিনি স্বীয় ক্ষমতার বিষয়ে যৎকিঞ্চিও মনের ভাব ব্যক্ত করিয়াছেন, যথা,— ‘পরিশ্রম ও দৃঢ় মনোযোগ পূৰ্ব্বক পাঠ দ্বারা আমি কোন অবিনাশ্য গ্রন্থ লিখিয়া যাইতে পারি’।

 ১৬৪৩ খৃঃ অব্দে পঙ্কত্রিংশৎ বর্ষ বয়ঃক্রম কালে মিল্‌টন অক্‌সফোর্ডের শান্তিরক্ষক বিচারপতি পাউয়েল সাহেবের কন্যাকে পরিণয় করেন। বোধ হয়, তাঁহার বনিতা তত্তুল্য মহৎ লোকের সঙ্গী হইবার উপযুক্ত পাত্রী ছিলেন না। বিবাহের কয়েক সপ্তাহ পরেই একটি আশ্চর্য্য ঘটনা উপস্থিত হয়। পিতার সহিত সাক্ষাৎ করিতে যাইব বলিয়া, উক্ত স্ত্রী ভৰ্ত্তার নিকটে কিছুকালের জন্য বিদায় গ্রহণ করিলেন কিন্তু তাহার পরে আর প্রত্যাগমন করিলেন না। মিল্‌টন পুনঃ পুনঃ আসিতে অনুরোধ করিতে লাগিলেন কিন্তু তাহা কোনমতেই গ্রাহ্য হইল না এক জন লোক প্রেরিত হইলে সেও অপমানিত হইয়া ফিরিয়া আসিল। পাউয়েল সাহেব পদচ্যূত সম্রাট প্রথম চার্লসের পক্ষ ছিলেন এবং তাঁহার জামাতা ইংলণ্ডীয় সাধারণ-তন্ত্র কমনওয়েল্‌থের এক জন প্রধান পোষক ছিলেন। কথিত আছে ভিন্ন মতাবলম্বী জামাতার নিকট দুহিতাকে বাস করিতে দিতে পাউয়েল সাহেব অত্যন্ত অনিচ্ছুক ছিলেন। মিল্‌টন এই অবাধ্যতা হেতু পত্নিকে ত্যাগ করিলেন, কিন্তু ব্যবহারানুসারে ডাইবোর্সকোর্ট নামা বিচারালয়ের সম্মতি গ্রহণ করা অনাবশ্যক ইহা বাইবেল গ্রন্থ হইতে নানা প্রস্তাব প্রদর্শন দ্বারা প্রমাণ করিলেন। সেই পুস্তক প্রকাশিত হইলে ধৰ্ম্মযাজকেরা মিল্‌টনের প্রতি অত্যন্ত অসন্তুষ্ট হইয়া পার্লিয়ামেণ্ট মহাসভায় তাঁহার নামে অভিযোগ করেন কিন্তু সেই স্থানে তিনি অব্যাহতি প্রাপ্ত হইলেন। পূৰ্ব্বোক্ত সাংসারিক কষ্টে পতিত হইয়াও মিল্‌টন বিদ্যাচর্চা হইতে নিরস্ত হয়েন নাই। তিনি ‘বিদ্যাশিক্ষা’ নামে একটি প্রবন্ধ রচনা এবং রাজ্যের অজ্ঞাতসারে পুস্তক মুদ্রাঙ্কন পক্ষে একটি বক্তৃতা প্রকাশ করেন। প্রথমোল্লিখিত পুস্তকখানি পাঠ করিলেই, গ্রন্থকৰ্ত্তার সাহিত্য-শাস্ত্রে অসাধারণ ব্যুৎপত্তির চিহ্ণ প্রাপ্ত হওয়া যায়। হেলি সাহেব বলেন যে, দ্বিতীয় গ্রন্থে মিল্‌টন উত্তম গ্রন্থের যে বর্ণনা করিয়াছেন, তাহা সেই গ্রন্থেরই গুণ বর্ণনা মাত্র। মহাকবি মিল্‌টন কহেন, ‘গ্রন্থকৰ্ত্তার সদ্গ্রন্থ, পরকালের নিমিত্ত রক্ষিত কোন অসাধারণ পুরুষের দুর্ম্মূল্য শোণিতের ন্যায়’। মিলটন ১৬৪৫ খৃঃ অব্দে স্বকৃত লাটিন ও ইংরাজি কবিতা গুলি একত্র করিয়া প্রকাশ করেন।

 মিল্টন ডাক্তার ডেবিসের দুহিতার পাণিগ্রহণ করিবার প্রস্তাব করিলে সেই রমণী উক্ত বিবাহ স্বদেশীয় বিধি বিরুদ্ধ হইবে কেবল এই সন্দেহ করিয়া, বিবাহ স্থগিত রাখিয়াছিলেন, ইত্যবসরে এক সুখকর ব্যাপার ঘটিয়া উঠিল। মিল্টন তাঁহার জনৈক জ্ঞাতির নিকট সৰ্ব্বদা যাতায়াত করিতেন; একদা সেই স্থানে উপস্থিত আছেন, এমন সময়ে তাঁহার বনিতা আসিয়া একবারে পদানত হইয়া ক্ষমা প্রার্থনা করিলেন। মিল্‌টন অতি সরল-স্বভাব ছিলেন, সুতরাং পত্নীর যাচ্‌ঞা অগ্রাহ্য না করিয়া স্বীকার প্রাপ্ত হইলেন। ফেণ্টন সাহেব কহেন, পাপাসক্ত হইবার পর আদমের নিকট হবার অবস্থা যাহা মিল্‌টন দ্বারা বর্ণিত আছে, তাহা স্বীয় অবাধ্য স্ত্রীর অনুশোচনীয় সাক্ষাৎ লাভ দ্বারাই মহাকবির মনে উদিত হইয়া থাকিবে।

 হতভাগ্য চার্লসের শোচনীয় মৃত্যুর সহিত তাঁহার বন্ধুদিগেরও দুরবস্থা উপস্থিত হইল। তাঁহার পক্ষীয় অনেক সম্ভ্রান্ত ব্যক্তির প্রাণবধ এবং কাহারও২ স্বদেশ নিৰ্ব্বাসন হইয়াছিল। অনেককে আবার প্রাণরক্ষার্থে গুপ্তভাবে থাকিতে হইল। সপরিবারে স্বীয় জামাতৃভবনে বাস করিতে লাগিলেন। মিল্‌টন ভিন্নমতাবলম্বী ছিলেন বলিয়া তাঁহার শ্বশ্রূ তাহার প্রতি অত্যন্ত নিষ্ঠুর ব্যবহার করিয়াছিলেন; তত্ৰাচ তাঁহাকে বিপদের সময়ে আশ্রয় প্রদান করা মহৎ স্বভাবের চিহ্ণ, সন্দেহ নাই।

 মিল্‌টন ১৬৪৯ খৃঃ অব্দে, প্রথম চার্লসের মস্তকচ্ছেদন অন্যায়াচরণ হয় নাই, ইহার বিবিধ তর্ক বিতর্ক সম্বলিত এক খানি পুস্তক প্রকাশ করেন। তদনন্তর তিনি স্বদেশের ইতিহাস লিখিতে প্রবৃত্ত হইলেন। অনতিবিলম্বে পার্লিয়ামেণ্ট মহাসভার লাটিন কৰ্ম্মাধ্যক্ষের পদে নিযুক্ত হইয়া মিল্‌টন অসামান্য কাৰ্য্যদক্ষতা প্রকাশ করিতে লাগিলেন। এই সময়ে তিনি প্রথম চার্লসের বিপক্ষে এক খানি পুস্তক প্রচারিত করেন। উক্ত সম্রাটের সন্তান দ্বিতীয় চালর্স হলাণ্ড দেশে বাস করিতেছিলেন; তিনি কিছু পরে পার্লিয়ামেন্টের নিন্দাসূচক একটি প্রবন্ধ, জনৈক পণ্ডিত দ্বারা রচনা করাইয়া প্রকাশ করিলেন। মিল্টন শেষোক্ত প্রবন্ধের এক খানি প্রত্যুত্তর মুদ্রিত করাইলে তাহা অসঙ্খ্য লোক দ্বারা সাদরে গৃহীত হইল। কৃস্‌টিয়েনা নাম্নী সুইডেন দেশীয় রাজ্ঞী বলিয়াছিলেন, যে মিল্টন দয়ালু ও উপযুক্ত সম্রাট গণের বন্ধু ও নিষ্ঠুর রাজাদিগের পরম শক্র ছিলেন।

 ১৬৫২ খৃঃ অব্দে তাহার চতুর্থ সন্তানের জন্মের পর তাঁহার বনিতা কাশ রোগাক্রান্ত হইয়া পরলোক যাত্রা করেন। এই সময়েই মিল্‌টন পীড়াবশতঃ একবারে অন্ধ হইয়া গেলেন, কিন্তু তাঁহার চক্ষুর অবয়বের কিঞ্চিম্মাত্রও বৈলক্ষণ্য হয় নাই। অন্ধ হইবার দুই বৎসর পরে তিনি তৎকালিক ঘটনাবলী সম্বন্ধীয় দুই খানি পুস্তক প্রচারিত করেন। হেলি সাহেব তন্মধ্যে এক খানির বিষয় উল্লেখ করিয়াছেন, যথা;—এই পুস্তক পাঠ করিলে প্রতীয়মান হইবে যে হোমরের অদ্ভুত কবিতাশক্তি ও মহাবক্তা ডিমস্থিনিসের বাদানুবাদ সম্পৰ্কীয় ক্ষমতা, এই অসাধারণ পুরুষের গুণাধারে একত্রিত হইয়াছিল। মিল্‌টন দৃষ্টিশক্তি বিলীন হইয়াও রাজকীয় কৰ্ম্মের পরিচালনা করিতে সক্ষম ছিলেন। কিছু দিন পরে তিনি দ্বিতীয়বার বিবাহ করিয়া বহুকাল দাম্পত্য সুখ সম্ভোগ করেন। সেই স্ত্রীর পরলোক প্রাপ্তিতে তিনি অতীব স্নেহ সুচক একটি কবিতা রচনা করেন।

 ১৬৫৯ খৃঃ অব্দে তিনি দুই খানি ধৰ্ম্ম সম্বন্ধীয় পুস্তক প্রকাশ করেন। পর বৎসরেই প্রথম চার্লসের পুত্র দ্বিতীয় চার্লস ইংলণ্ড দেশের অধিপতি হইলেন; সুতরাং মিল্‌টনকে কিছুকাল গুপ্তভাবে থাকিতে হইল। তদনন্তর ভাগ্যক্রমে কোন বিশেষ বিধি অনুসারে তিনি নিরাপদ প্রাপ্ত হইলেন। ইহার পর তিনি আর কোন রাজকীয় কৰ্ম্মে নিযুক্ত হয়েন নাই। ৫৪ বৎসর বযংক্রম কালে তিনি তৃতীয় বার বিবাহ করেন। সেই স্ত্রী বিশেষ গুণবতী ছিলেন না, সুতরাং স্বীয় ভৰ্ত্তার অসামান্য গুণের সম্পূর্ণ আদর করিতে সক্ষম হয়েন নাই। ১৬৬১ খৃঃ অব্দে তিনি এক খানি লাটিন ব্যাকরণ প্রকাশ করেন, এবং বোধ হয় এই সময়েই ‘সেমসন এগনিস্‌টিস’ নামা কবিতা রচনা করেন।

 ১৬৬৭ খৃঃ অব্দে তাহার অদ্বিতীয় কবিতা প্যারাডাইস লষ্ট’ বা ‘সুখনষ্ট’ প্রথমবার প্রকাশিত হয়। এই কবিতাতে মনুষ্য কি প্রকারে পাপভ্রষ্ট হইয়া মৃত্যুর বশ হইলেন, তাহা খৃষ্টধৰ্ম্মানু্যায়ী বর্ণিত আছে। ড্রাইডেন মিলটনের বিষয় লিখিয়াছেন, যথা;—

গ্রিস, ইটালি, ইংলণ্ড, এই তিন দেশে।
তিন কালে তিন কবি ক্রমে পরকাশে।।
গ্রিক কবি সুবিখ্যাত উচ্চ চিন্তা জন্য।
ইটালীয় কবি দেখি মহদ্ভাব পূর্ণ।।
দুই গুণ মিলিয়াছে ইংলণ্ডীয় কাছে।
তৃতীয়ে অগত্যা দেব দুই মিলায়েছে।।

 হোমর এবং বর্জিল অপেক্ষা মিল্‌টন মহত্তর কবি। সুবিখ্যাত কবি কাউপর ইত্যাদি মহৎ মহৎ লোক ‘সুখনষ্টের’ যথাযোগ্য প্রশংসা করিয়া গিয়াছেন। এডিসন কহেন, এই কবিতা পাঠ করিলে আমাদিগের মনে নানা মহান্‌ ভাবের উদয় হয়; সৰ্ব্বনিয়ন্তা পরমেশ্বরের আজ্ঞাধীন হইয়া সকল কৰ্ম্মে নিযুক্ত হইলে সুখী, এবং তাঁহার প্রতি অবাধ্যতা প্রকাশ করিলে দুঃখে পতিত হইতে হয়, এই পুস্তক পাঠ করিলে এই দুর্ম্মূল্য শিক্ষা প্রাপ্ত হওয়া যায়। ইহা অমিত্রাক্ষরছন্দে রচিত, কিন্তু সারল্যের কিছুমাত্র ব্যতিক্রম দৃষ্ট হয় না। ডাক্তার ব্লেয়ার বলেন যে মিল্‌টন এই কবিতা রচনা দ্বারা পুরাকালীয় ও আধুনিক কবিদলের সর্ব্বাগ্রগণ্য পদে অধিষ্ঠিত হইয়াছেন। জনসন, লর্ড অফর্ড ইত্যাদি শত২ ব্যক্তি মহাকবির অসাধারণ কবিতাশক্তির সাক্ষ্য প্রদান করিয়াছেন। ইংরাজি ভাষায় বিশেষ ব্যুৎপত্তি লাভের আকাঙ্ক্ষা করিয়া, ‘প্যারাডাইস লষ্ট’ না পাঠ করিলে কৃতকাৰ্য্য হইবার সম্ভাবনা নাই।

 ১৬৭০ খৃঃ অব্দে মিল্‌টন ছয়ভাগে ইংলণ্ডের ইতিহাস প্রকাশ করেন। তাহাও গুণীগণের নিকট আদরণীয়া হইয়াছিল। পরবৎসরে ‘সুখ পুনঃপ্রাপ্ত’ নামে কবিতা প্রকাশ হয়। ইহাতে খৃষ্টধৰ্ম্মে, যিশুর পুনর্জীবন ও ধাৰ্ম্মিক লোকদিগের অন্তিম সুখের যে বর্ণনা আছে তাহা কবিতাছলে লিখিত হইয়াছে। ১৬৭২ ও ১৬৭৩ খৃঃ অব্দে তিনি ন্যায়শাস্ত্র ও ধৰ্ম্ম সম্বন্ধীয় দুইখানি প্রবন্ধ রচনা করেন। এই মহাকবি ইহার পর আর কোন গ্রন্থ প্রকাশ করেন নাই। ১৬৭৪ খৃঃ অব্দে ১৪ই নবেম্বর তারিখে তিনি মানবলীলা সম্বরণ করেন। লর্ড মেকলে, মিল্‌টনকে মহাকবি, রাজনীতিজ্ঞ পুরুষ, মহাজ্ঞানী, ইংরাজি সাহিত্যের গৌরব এবং ইংরাজি স্বাধীনতার প্রধান পোষক বলিয়া প্রশংসা করিয়াছেন। তিনি কহেন ইতিহাস পাঠে এ প্রকার লোক অতি অল্প দৃষ্টিগোচর হয়, যাহাদের জীবনবৃত্তান্ত মনঃসংযোগ পূৰ্ব্বক পরীক্ষা করিলে কোন না কোন দোষ পাওয়া যায় না, কিন্তু মিল্‌টনকে নিরুপেক্ষ হইয়া অবলোকন করিলে পূৰ্ব্বোক্ত সন্দেহ বর্জিত বোধ হয়।

 ইংলণ্ডীয় কবি জন মিল্‌টন সহিষ্ণুতার একটি উত্তম দৃষ্টান্তস্থল। কি উত্তম শরীরে, কি অন্ধ দশায়, কি সুখের সময়, কি দুঃখের সময়, সৰ্ব্বদাই তাঁহার মন পরম কারুণিক পরমেশ্বরের প্রতি ভক্তি রসার্দ্র হইয়া প্রফুল্লিত হইয়াছিল। আহা! যখন তিনি ‘প্যারাডাইস লষ্ট’ রচনা করেন তখন অন্ধ; স্বীয় দুহিতাদ্বয় দ্বারা মুখনিঃসৃত কাব্য লিখিত হইতে লাগিল, অথচ সেই কবিতা কি অবিনাশ্য খ্যাতি লাভ করিয়াছে! সেই সহিষ্ণু, সদ্বিদ্বান, স্বদেশানুরাগী, মহাকবি মিল্‌টনের জীবনবৃত্তান্ত বঙ্গদেশীয় বালক বালিকা গণের হস্তে সমৰ্পিত হইল।

 উপসংহার কালে মিল্‌টনের মহদ্‌গ্রন্থ ‘প্যারাডাইস লষ্টের’ কিঞ্চিৎ বর্ণনা করা আবশ্যক । এই পুস্তক দ্বাদশ পর্ব্বে বিভক্ত। পুস্তকাভ্যন্তরে যে২ বিষয় বাহুল্যৰূপে বর্ণিত আছে, তাহার সারাংশ প্রথম পর্ব্বে পাওয়া যায়। মনুষ্যের অবাধ্যতা এবং তজ্জন্য সৰ্ব্ব সুখদ স্থান ‘প্যারাডাইস’ হইতে বহিষ্কৃত হওয়া, তথা তাঁহার পতনের প্রধান কারণ, সৰ্পৰূপধারী সয়তানের চরিত্র, এই দুই বিষয় সৰ্ব্বাগ্রে পাঠকবর্গের মনোরঞ্জন করে। ঈশ্বরের প্রতি বিদ্রোহিতাচরণ করণার্থে সয়তান সহস্র২ স্বৰ্গীয় পুরুষকে স্বীয় দলভুক্ত করে, তাহারা সকলেই তাঁহার ইচ্ছাক্রমে নরকগামী হয়। তাহাদের সেই অবস্থা অত্যাশ্চৰ্য্য ৰূপে প্রথম পর্ব্বে বর্ণিত আছে। বিদ্রোহী সৈন্য নরকে পতিত হইবামাত্র কিছুকাল এক প্রকার অচৈতন্যাবস্থায় রহিল; পরে সয়তান দ্বারা জাগরিত হইয়া, তাহার আদেশানুসারে ‘পাণ্ডিমোনিয়ম’ নামা সহসা উত্থিত সয়তানের প্রাসাদে একত্রিত হইল। ইহার কিছু পূৰ্ব্বে সয়তান সেনাগণকে মনুষ্যের জন্মের বিষয় জ্ঞাত করিয়াছিলেন। সভায় অধিবেশন পূৰ্ব্বক উক্ত নূতন সৃষ্ট জীবের প্রতি কি প্রকার আচরণ করা কর্ত্তব্য এবং তৎসম্পৰ্কীয় সকল সংবাদ জ্ঞাত হইবার কি উপায়াবলম্বন করা শ্রেয়, ইহা বিবেচিত হইতে লাগিল।

 দ্বিতীয় পর্ব্বের আরম্ভে, সয়তান ঈশ্বরের সহিত পুনৰ্ব্বার যুদ্ধে নিযুক্ত হইবার উপায় দেখিতে সৈন্যগণকে উত্তেজনা করিতেছে। শেষে, পূৰ্ব্বোল্লেখিত নূতন জীব মনুষ্যের অবস্থা নির্ণয় করা স্থির হওয়ায় সৰ্ব্ব সম্মতিক্রমে সয়তান নরক হইতে এই পৃথিবীর দিকে আগমন করিতে লাগিল। নরকসীমা পরিত্যাগ কালীন দ্বার রক্ষকের সহিত সাক্ষাৎ ও তাহার বর্ণনা অতি চমৎকার।

 ঈশ্বর সয়তানের দ্বারা মনুষ্যের অমঙ্গল সাধন ব্যাপার সর্গে ব্যক্ত করেন এবং তদীয় প্রিয়সন্তান উক্ত জীবের উপকারার্থে মৃত্যু স্বীকার করিতে উদ্যত হয়েন, পরে ঈশ্বর দ্বারা তাঁহার মনুষ্য জন্মগ্রহণের ও পূৰ্ব্বোক্ত মহান কীৰ্ত্তির জন্য সৰ্ব্বমান্য হইবার আজ্ঞা প্রচারিত হয়। এ দিকে সয়তান ছলনাশ্রয় করিয়া পৃথিবীতে পদার্পণ করিল। এই সকল বিষয় তৃতীয় পর্বের সারাংশ।

 আদম এবং হবার বাসস্থান সুখোদ্যানে প্রবিষ্ট হইবার পূৰ্ব্বে, সর্ব্বনিষ্টমূল সয়তানের মনের অবস্থা চতুর্থ পর্ব্বের প্রারম্ভে বর্ণিত আছে। সেই উদ্যানস্থ সৰ্ব্বোচ্চ বৃক্ষের ফল ভক্ষণ করিতে আদম ও হবার প্রতি নিষেধ ছিল; সয়তান পক্ষীৰূপে উক্ত বৃক্ষে উপবেশন করিয়া নিম্নস্থ অত্যাশ্চর্য্য সুখী জীবদ্বয়ের কথোপকথন দ্বারা এই সংবাদ প্রাপ্ত হইয়া তাহাদের অনিষ্ট করিতে দৃঢ়মন হইল। উদ্যান রক্ষক সয়তানের আগমন-বাৰ্ত্তা প্রাপ্ত হইয়া তাঁহার অন্বেষণার্থে দুইজন ভৃত্যকে নিযুক্ত করিলেন। সয়তান হবার নিদ্রাবস্থায় স্বপ্ন দ্বারা ঈশ্বরানুজ্ঞা লঙ্ঘন করিতে প্রলোভন দিতেছিল, এমত সময়ে ভৃত্যদ্বয় দ্বারা ধৃত হইয়া রক্ষকের নিকট আনীত হইল। তাঁহার সহিত সংগ্রাম করিবার উদ্যোগ করিতে২ স্বর্গে স্বীয় অমঙ্গল প্রকাশক কোন চিহ্ণ অবলোকন করিয়া সয়তান সুখোদ্যান হইতে পলায়ন করিল।

 প্রাতঃকালে হবা আদমকে স্বপ্নের বৃত্তান্ত জ্ঞাত করান। তদনন্তর ঈশ্বর তাঁহাদিগের সাবধানার্থে র‍্যাফেল নামক স্বৰ্গীয় দূতকে পৃথিবীতে প্রেরণ করেন। তিনি সয়তানের অভীষ্ট ও সমুদয় ইতিহাস ব্যক্ত করেন। পঞ্চম পর্বে এই সকল বিষয় লিখিত আছে।

 ষষ্ঠ পর্ব্বে সয়তানের স্বৰ্গীয় বিদ্রোহিতাচরণের বাহুল্য বিবরণ অাছে। ঈশ্বরের প্রিয়সন্তান দ্বারা তাহার পরাজয় ও নরকবাস এবং উক্ত বিজয়ী সন্তানের স্বীয় জনকের নিকট প্রত্যাবৰ্ত্তনের বর্ণনার সহিত এই পৰ্ব্ব শেষ হইয়াছে।

 সয়তান ও সমস্ত বিদ্রোহী সৈন্যকে স্বর্গ হইতে দূরীভূত করিয়া ঈশ্বর এই পৃথিবী ও মনুষ্য ও নানাপ্রকার জন্তু সৃষ্টি করিতে ইচ্ছা করিলেন। অগণ্য স্বৰ্গীয় দূত সমভিব্যাহারে তাঁহার প্রিয় সন্তান ছয় দিবসের মধ্যে সৃষ্টিকার্য্য সমাধা করিলেন। পৃথিবী সৃষ্ট হইলে দূতেরা সুললিত স্বরে ঈশ্বরের গুণগান করিলেন। পরে পূর্ব্বোক্ত সন্তান স্বর্গে প্রত্যাগমন করিলেন। সপ্তম পর্ব্বে আদম র‍্যাফেলের নিকট এই সকল বিবরণ শ্রবণ করিতেছেন।

 অষ্টম পর্ব্বে আদম, তাঁহার সৃষ্টি, সুখোদ্যানে অবস্থিতি, ঈশ্বরের সহিত কথোপকথন, হবার সহিত সাক্ষাৎ ও বিবাহ ইত্যাদি নানা প্রকার কথোপকথনে র‍্যাফেলের মনস্তুষ্টি করেন। উক্ত স্বৰ্গীয় দূত আদমকে পুনঃ পুনঃ সয়তানের বিষয় সাবধান থাকিতে অনুরোধ করিয়া বিদায় গ্রহণ করিলেন।

 এদিকে সয়তান সুখোদ্যানে পুনরাগমন করিয়া সর্পবেশ ধারণ করিল। আদম ও হবা উদ্যানের ভিন্ন২ স্থানে কর্ম্ম বিশেষে নিযুক্ত থাকিবেন, হবা এই প্রস্তাব করিলে, আদম সয়তানের ভয়ে প্রথমে সম্মত হয়েন নাই। হবা স্বীয় ক্ষমতার প্রতি নির্ভর করিয়া উক্ত প্রকারে নিযুক্ত থাকিবার বিষয়ে অত্যন্ত উৎসুক হওয়ায় আদম তাঁহার প্রস্তাবে সম্মত হইলেন। পরে সয়তান সর্পৰূপে হবার নিকটে উপস্থিত হইয়া তাঁহার অত্যাশ্চর্য সৌন্দর্য্যের প্রশংসা করিতে লাগিল; বাক্শক্তি প্রাপ্তির বিষয় জিজ্ঞাসিত হইলে, ফল বিশেষ ভক্ষণ, কারণ বলিয়া নির্দ্দেশ করিল। হবা, স্বভাবতঃ সেই ফলবৃক্ষ দর্শনেচ্ছুক হওয়ায় সর্প তাঁহাকে পূর্ব্বোক্ত মনুষ্যজীবন সংসৃষ্ট বৃক্ষের নিকটে লইয়া গেল। এবং নানা ছলনা দ্বারা বশীভূত কইয়া হবা সেই ফল আস্বাদন করিলেন। আদম তাহা জ্ঞাত হইয়া হবাকে শাপভ্রষ্ট জানিয়া কিঞ্চিৎ চিন্তান্নিত হইলেন কিন্তু পরক্ষণেই তদ্ভাগ্যভোগী হইবার ইচ্ছায় উত্তেজিত হইয়া স্বয়ং সেই ঈশ্বর পরিত্যক্ত ফল ভক্ষণ করিলেন। ফলভক্ষণ দ্বারা তাঁহাদের অবস্থা, নগ্নাবস্থা ত্যাগ করিবার চেষ্টা এবং উভয়ের বিরোধ পূৰ্ব্ব বিবরণের সহিত নবম পর্ব্বে বর্ণিত আছে।

 মনুষ্য এই প্রকারে পাপভ্রষ্ট হইলে সুখোদ্যান রক্ষক স্বৰ্গীয় দূতেরা পৃথিবী ত্যাগ করিয়া স্বর্গে গমন করিলেন। ঈশ্বরের ইচ্ছায়, তাঁহার সন্তান দ্বাএয়া, মানুষের দুর্ভাগ্য হেতু ভ্রষ্ট স্বর্গবাসি দিগের প্রতি শাপ প্রচারিত হইল। সয়তান ‘পাণ্ডিমোনিয়মে’ প্রত্যাগমন কালে তদীয় অপত্য দ্বয় পাপ এবং মৃত্যুর সহিত সাক্ষাৎ করে; পরে স্বীয় জয় বর্ণনা করে। সয়তান সহিত সমস্ত বিদ্রোহী সেনা শাপানুসারে সর্প-বেশধারী হইয়া ধূলি ও তিক্ত অগ্নিস্ফুলিঙ্গ ভক্ষণ করিতে লাগিল। ঈশ্বর তাঁহার সন্তানের অন্তিম জয় ব্যক্ত করেন। আদম হবাকে উপাসনা ও অনুশোচনায় নিযুক্ত হইবার উপদেশ দেন। ইহা দশম পর্ব্বের বিবরণ।

 একাদশ পর্ব্বে ঈশ্বর-সন্তান সেই সকল উপাসনা স্বীয় জনকের নিকট উপস্থিত করিয়া ভ্ৰষ্ট জীবগণের প্রতি কৃপাবলোকন করিতে অনুরোধ করেন। পরমেশ্বর তাঁহাদের প্রতি কৃপা প্রকাশ করেন, কিন্তু সুখোদ্যান হইতে বহিস্কৃত করিতে আজ্ঞা দেন। হবার খেদোক্তি, আদম ও হবার জনৈক স্বৰ্গীয় দূতদ্বারা অত্যুচ্চ পৰ্ব্বতে স্থাপন এবং তদকর্ত্তৃক বর্ণিত মহাবন্যার পূর্ব্ব পর্য্যন্ত ভবিষ্যৎ ঘটনাবলীর বৃত্তান্ত এই পৰ্ব্বান্তর্গত।

 দ্বাদশ পর্ব্বে ঈশ্বর-সন্তানের পৃথিবীতে অবতরণ তথা তাঁহার মৃত্যু, পুনর্জীবন ও স্বর্গে প্রত্যাগমন, এই বিবরণ পূৰ্ব্বোক্ত দূত বর্ণনা করিয়া আদম ও হবাকে সুখোদ্যান হইতে লইয়া যান।

 ‘প্যারাডাইস লষ্টের’ পূর্ব্ব বিবরণ পাঠ করিলে সকলেরই হৃদয়ঙ্গম হইবে যে ইহা খ্ৰীষ্ট ধৰ্ম্ম সম্বন্ধীয় গ্রন্থ। সকলে খ্ৰীষ্টান নহেন, কিন্তু তজ্জন্য এতদ্গ্রন্থকে অবহেলা করা যাইতে পারে না। ধৰ্ম্মের বিষয় বিবেচনা ও রচনা লালিত্যের প্রশংসা ভিন্ন। ইংলণ্ডীয় লোকেরা অধিকাংশ পৌত্তলিক ধৰ্ম্মের বিপক্ষ। কিন্তু মহাজ্ঞানী ইংরাজেরা ইলিয়দ্গ্রন্থ বা রামায়ণ, মহাভারত পাঠ করিয়া যথোচিত প্রশংসা করিতে অনিচ্ছা প্রকাশ করেন নাই। আধুনিক কালে সুবিদ্বান বাঙ্গালিরাও সেই দৃষ্টান্তের অনুগামী হইয়াছেন। এমন কি তাঁহারা বিবিধ ধৰ্ম্মের গুণাগুণ পরীক্ষা করিতে ভীত হয়েন নাই। সে যাহাহউক, একালে যে বঙ্গদেশে মিল্‌টনের নাম প্রত্যেক যুবা পুরুষ দ্বারা উল্লেখিত হইবে তাহার সন্দেহ নাই। বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন হেতু তাঁহাদিগকে কৃতবিদ্য হইয়া জীবনের নানা উদেশ্যসাধন করিতে হইবে, কাহাকেও বা রাজকীয় পদে নিযুক্ত হইয়া স্বদেশীয় ভ্রাতাদিগের বিবিধ মঙ্গল সাধন করিতে হইবে; কাহাকেও বা দেশ বিদেশ পর্য্যটন দ্বারা তত্তদ্দেশীয় সুনীতি-সমূহ স্বদেশে প্রচলিত করিতে চেষ্টান্নিত হইতে হইবে; অপর কাহাকেও বা অধ্যাপনা দ্বার সুশিক্ষা কাৰ্য্য সম্পাদন করিতে হুইবে। কিন্তু সকলকেই ন্যায়ব্ৰত অবলম্বন পূৰ্ব্বক জীবনের সকল কার্য্যে তৎপর হইতে হইবে। সকল ধৰ্ম্মাবলম্বী স্বীকার করিবেন যে মিল্‌টনের চরিত্র ন্যায়পরতাপূর্ণ। তিনি যথেচ্ছাচারী সম্রাটের রাজ্য, বিপুল দুঃখের আকর বলিয়া জ্ঞাত ছিলেন; সুতরাং প্রথম চার্লসের বিপক্ষৰূপে পরিদৃশ্যমান হইতে ভীত হয়েন নাই। দ্বিতীয় চার্লসের সময়েও তদীয় পিতার চরিত্রের প্রতি মিল্‌টনের শ্রদ্ধাপ্রকাশক কোন চিহ্ণ প্রাপ্ত হওয়া যায় না। অপিচ তাঁহার কবিতাশক্তির মহানুভবতার বিষয়ে কেহই সন্দেহ করিতে পারেন না। গুণ, যে স্থান স্থায়ী হউক না কেন, অবশ্যই সাদৃত হইবে।

 

এই লেখাটি ১ জানুয়ারি ১৯২৩ সালের পূর্বে প্রকাশিত এবং বিশ্বব্যাপী পাবলিক ডোমেইনের অন্তর্ভুক্ত, কারণ উক্ত লেখকের মৃত্যুর পর কমপক্ষে ১০০ বছর অতিবাহিত হয়েছে অথবা লেখাটি ১০০ বছর আগে প্রকাশিত হয়েছে ।