বিষয়বস্তুতে চলুন

মিস্‌ মেরি/চতুর্থ পরিচ্ছেদ

উইকিসংকলন থেকে

চতুর্থ পরিচ্ছেদ।

 সুরার বোতল ও গ্লাস, সরকারি রাসায়নিক পরীক্ষকের নিকট প্ররিত হইল। মৃতদেহও ডাক্তারের দ্বারা পরীক্ষা হইবার পরে উহার পাকস্থলীও সেই স্থানে প্রেরিত হইল। রাসায়নিক পরীক্ষক, পরীক্ষা করিয়া পাকস্থলীতে এবং সুরার গ্লাসে প্রুসিক এসিডের চিহ্ন পাইলেন; কিন্তু সুরার বোতলে কোনরূপ বিষের চিহ্ন পাওয়া গেল না। রাসায়নিক পরীক্ষকের পরীক্ষার ফল অবগত হইবার পর সকলেই অবগত হইতে পারিলেন যে, প্রুসিক এসিড পানই বৃদ্ধের মৃত্যুর কারণ। আর ইহাও সকলের অনুমান হইল যে, বোতল হইতে গ্লাসে সুরা ঢালিবার পর গ্লাসের মধ্যেই সুরার সহিত সেই মহাবিষের সংমিশ্রণ হয়। এই অবস্থা দৃষ্টে অনুসন্ধানকারী কর্ম্মচারীগণের মধ্যে এখন দুইটী প্রধান চিন্তা আসিয়া উপস্থিত হইতে লাগিল। প্রথম চিন্তা—বৃদ্ধ হত হইয়াছেন কি না, যদি হতই হইয়া থাকেন, তাহা হইলে কে তাঁহাকে হত্যা করিল এবং কেনই বা তাঁহাকে হত্যা করিল, গ্লাসে সুরার সহিত কে এই মহাবিষ সংমিলিত করিতে সমর্থ হইল। যতদূর জানিতে পারা যাইতেছে, তাহাতে বৃদ্ধ বোতল হইতে সুরা নিজ হস্তে গ্লাসে ঢালিয়াই পান করিয়া থাকেন, এরূপ অবস্থায় সেই সময়ের মধ্যে গ্লাসে সুরার সহিত সহসা বিষ মিশ্রিত করিতে কে সমর্থ হন? তবে হইতে পারে, পূর্ব্ব হইতেই শূন্য মাসে যদি কেহ সেই বিষ রাখিয়া দিয়া থাকে, এবং সুরা ঢালিবার সময় বৃদ্ধ যদি তাহা দেখিতে না পাইয়া তাহাতেই সুরা ঢালিয়া পান করিয়া থাকেন, তাহা হইলে হইতে পারে।

 দ্বিতীয় চিন্তা, বৃদ্ধ সুরার সহিত বিষ পান করিয়া আত্মহত্যা করেন নাই ত? যদি তিনি আত্মহত্যাই করিবেন, তাহা হইলে আহারাদির পর শয়ন করিতে যাইবার সময়ে আত্মহত্যা করিবেন কেন? আর কি দুঃখেই বা তিনি আত্মহত্যা করিবেন? তাহার ত এরূপ কোন দুঃখ এখন পর্য্যন্ত দেখিতে পাইতেছি না, যাহার নিমিত্ত তিনি আত্মহত্যা করিতে পারেন। আর আত্মহত্যা করিবার নিমিত্ত তিনি প্রুসিক এসিড কোথা হইতে এবং কিসে করিয়াই আনিলেন? যদি তিনি আত্মহত্যা করিতেন, তাহা হইলে যে পাত্রে তিনি প্রুসিক এসিড সংগ্রহ করিয়া আনিয়াছিলেন, বা যাহা হইতে তিনি উহা গ্লাসে ঢালিয়াছিলেন, তাহা নিশ্চয়ই এই স্থানে পাওয়া যাইত। এইরূপ অবস্থায় তিনি যে আত্মহত্যা করিয়াছেন, তাহাই বা কিরূপে অনুমান করা যাইতে পারে? যাহা হউক, লাইব্রেরী ঘরটী একবার অনুসন্ধান করিয়া দেখা কর্ত্তব্য; কারণ যদি তিনি আত্মহত্যাই করিয়া থাকেন, তাহা হইলে বিষের পাত্র তাহার মধ্যে কোন না কোন স্থানে নিশ্চয়ই পাওয়া যাইবে। তদ্‌ব্যতীত যদি তিনি কোন পত্রাদিও লিখিয়া গিয়া থাকেন, তাহাও কোন না কোন স্থানে থাকিবার সম্ভাবনা।

 লাইব্রেরীর মধ্যে একপার্শ্বে একখানি টেবিল ছিল। কোন রূপ লেখাপড়া করিতে হইলে তিনি সেইস্থানে বসিয়া লেখাপড়া করিতেন ও লেখাপড়া করিবার কাগজপত্র ঐ টেবিলের একটী দেরাজের মধ্যে বন্ধ থাকিত। দেরাজের চাবি বৃদ্ধ তাঁহার পরিহিত কোটের পকেটেই সর্ব্বদা রাখিয়া দিতেন। বৃদ্ধ যে কোট পরিয়া লোকান্তর গমন করেন, সেই কোটের মধ্যে একগুচ্ছ চাবি ছিল। টেবিলের সংলগ্ন যে কয়েকটী দেয়াজ আছে, তাহার প্রত্যেকের চাবি স্বতন্ত্র; এবং ঐ সমস্ত চাবি ও অপর আর কয়েকটী চারি লইয়াই সেই চাবিগুচ্ছ।


 লাইব্রেরীর ভিতর অন্য স্থানে অনুসন্ধান করিবার পূর্ব্বে ঐ টেবিলের দেরাজের মধ্যে আমরা প্রথমেই অনুসন্ধান করিতে প্রবৃত্ত হইলাম। একটী দেরাজের মধ্যে কতকগুলি কাগজ ছিল, ঐ কাগজগুলির মধ্যে বিশেষরূপ অনুসন্ধান করিয়া দেখিতে দেখিতে একখানি পত্র ও একখানি উইলের খসড়া একত্র প্রাপ্ত হইলাম। ঐ পত্র ও উইলের সহিত এই হত্যাকাণ্ডের যে বিশেষ কোনরূপ সংস্রব আছে, তাহা প্রথমে আমরা কিছু অনুমান করিতে সমর্থ হই না; কারণ সেই সময় আমাদিগের বিশেষরূপ লক্ষ্য ছিল, যদি তিনি আত্মহত্যা করিয়া থাকেন, তাহা হইলে তাঁহার লিখিত কোন পত্রাদি সেইস্থানে পাইবার সম্ভাবনা। তাই আমরা সেই সময় সেইরূপ কোনপত্রাদি যদি পাওয়া যার, তাহারই অনুসন্ধান করিতেছিলাম। উইল বা অপর কোন কাগজপত্রে সেই সময় হস্তক্ষেপ করার বিশেষ কোন প্রয়োজন উপলব্ধি হয় নাই।

 টেবিলের ভিতর যে কয়েকটী দেরাজ ছিল, এর এক করিয়া তাহার সমস্ত গুলিই আমাদিগের দেখা হইল, কিন্তু যে দ্রব্যের নিমিত্ত আমরা অনুসন্ধান করিতেছিলাম, তাহার কিছুই আমরা প্রাপ্ত হইলাম না। টেবিলের দেরাজগুলির অনুসন্ধান হইয়া গেলে সেই লাইব্রেরীর অপরাপর স্থানেরও অনুসন্ধান করিলাম, কিন্তু আমাদিগের অভীপ্সিত দ্রব্য কিছুই পাওয়া গেল না।

 আমরা যে পর্য্যন্ত অনুসন্ধানে নিযুক্ত হইয়াছিলাম, তাহার মধ্যে এ পর্য্যস্ত মেরিকে কোন কথা জিজ্ঞাসা করা হয় নাই। কারণ মেরি ইউরোপীর জাতি, তাহাতে আর তিনি এখনও মিস্ আছেন, অর্থাৎ এখন পর্য্যন্ত তিনি পরিণয়সূত্রে আবদ্ধ হন নাই। সুতরাং আমাদিগের অর্থাৎ এদেশীয় কালা বাঙ্গালীদিগের কোন কথা তাঁহাকে জিজ্ঞাসা করিবার অধিকার ছিল না। যে সকল ইংরাজকর্ম্মচারী এই অনুসন্ধানে নিযুক্ত ছিলেন, মেরিকে কোন কথা জিজ্ঞাসা করা না করা তাঁহাদিগের কার্য্য, সে সম্বন্ধে আমাদিগের কোনরূপ কথা কহিবার প্রয়োজন ছিল না। সুতরাং আমরা তাঁহার নিকট কোন কথার নিমিত্ত অগ্রগামী হইলাম না। কিন্তু কোন কোন কথা মেরিকে জিজ্ঞাসা করিবার নিমিত্ত দুই একজন ইংরাজকর্ম্মচারীকে অনুরোধ করিলাম। তাঁহারাও প্রথম প্রথম আমাদিগের অনুরোধ রক্ষা করিয়া মেরিকে দুই একটী কথা জিজ্ঞাসা করিবার মানসে অগ্রগামী হইলেন। মেরিকে তাঁহারা দুই একটী কথা জিজ্ঞাসা করিতে চাহেন, এই সংবাদ মেরির পরিচারককে দিয়া মেরির নিকট প্রেরণ করিলে তিনি উপর হইতে সংবাদ পাঠাইয়া দিলেন, “একজন কর্ম্মচারীকে উপরে আসিতে কহ।” এই সংবাদ পাইয়া একজন ইংরাজকর্ম্মচারী আস্তে আস্তে উপরে উঠিলেন। যে ঘরে মেরি বসিয়াছিলেন, সেই ঘরের মধ্যে সহসা প্রবিষ্ট হইতে সাহসী না হইয়া সেই ঘরের সম্মুখে একটি দরজার সন্নিকটে দণ্ডায়মান হইলেন। মেরি ঘরের মধ্য হইতে এই অবস্থা দেখিতে পাইয়া, তাঁহাকে ঘরের ভিতরে আসিতে কহিলে, তিনি আপন মস্তক হইতে টুপি উন্মুক্ত করিয়া দূর হইতে সেলাম করিয়া, বিশেষ আদব কায়দার সহিত সেই ঘরের মধ্যে প্রবেশ করিলেন। মেরি তাঁহাকে একখানি চেয়ার দেখাইয়া দিয়া বসিতে বলায়, তিনি যেন আপনাকে বিশেষ কৃতার্থ মনে করিলেন এবং সেই চেয়ারের একটীমাত্র কোণ অবলম্বন করিয়া এরূপ ভাবে উপবেশন করিলেন যে, তাঁহার দেহের ভর যেন তাঁহার দেহেই রহিয়া গেল, চেয়ার যেন তাহার কিছুই উপলব্ধি করিতে পারিল না।

 সেইস্থানে বসিয়া সেই খুনী মোকদ্দমার অনুসন্ধান-কারী ইংরাজ কর্ম্মচারীর সহিত একজন বয়স্থা মিসের খুনীর অনুসন্ধান সম্বন্ধে যেরূপ কথাবার্ত্তা হইল, তাহা পাঠকগণ জানিতে চাহেন কি?

 ইং কর্ম্মচারী। জুবেয়ার আপনার পিতা?

 মিস্ মেরি। হাঁ।

 ইং কর্ম্ম। আপনার কি বিবেচনা হয়,— জুবেয়ারকে কেহ হত্যা করিয়াছে, কি তিনি আত্মহত্যা করিয়াছেন?

 মিস্। কেহ হত্যা করিয়াছে বলিয়া আমার অনুমান হয় না। আমি ভিন্ন যাঁহার আর কেহ নাই, অথচ যিনি সংসারের সহিত একরূপ সম্পর্ক পরিত্যাগ করিয়াছেন, তাঁহাকে হত্যা করিবার যে কাহারও স্বার্থ আছে, তাহা আমার বোধ হয় না। বোধ হয়, তিনি আত্মহত্যা করিয়া থাকিবেন।

 ইং কর্ম্ম। আত্মহত্যার কারণ?

 মিস্। তিনি অতিশয় বৃদ্ধ হইয়া পড়িয়াছিলেন, ক্রমেই তাঁহার শরীর শিথিল হইয়া আসিতেছিল, আরও কিছু দিবস বাঁচিলে তাঁহাকে সম্পূর্ণরূপে পরাধীন হইতে হইত, এই ভাবিয়া শরীরে একটু বল থাকিতে থাকিতেই, পরাধীন হইতে না হইতেই তিনি ইহলোক হইতে নিষ্কৃতি লাভ করিয়াছেন, আমার এইরূপ অনুমান হয়।

 ইং কর্ম্ম। তিনি বিষ পাইলেন কোথা হইতে?

 মিস্। যাহার অর্থের অভাব নাই, পরিচারকের অভাব নাই, যাহাব নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধাচরণ করিবার যখন কাহার ক্ষমতা নাই, তখন তাঁহার পক্ষে সামান্য বিষের সংগ্রহ করা অসম্ভব কিসে?

 ইং কর্ম্ম। কোন পরিচারক যে তাঁহাকে বিষ আনিয়া দিয়াছে, তাহা ত কেহ স্বীকার করে না।

 মিস্। উহারা এদেশীয় লোক, একে সামান্য কারণে মিথ্যা কথা বলিতে কিছুমাত্র সঙ্কুচিত হয় না; তাহার উপর যখন দেখিতেছে, সেই বিষপান করিয়া বৃদ্ধ মরিয়া গিয়াছেন, তখন নিজহস্তে করিয়া বিষ আনিয়া দিয়াছে, এ কথা উহারা কখনই স্বীকার করিবে না।

 ইং কর্ম্ম। যদি তাহারা কোন কথা স্বীকার না করে, তাহা হইলে আমরা কিরূপে অবগত হইতে পারিব যে, তিনি কোথা হইতে বিষ সংগ্রহ করিলেন?

 মিস্। তিনি নিজেও আনিতে পারেন। তাঁহার কোন স্থানে গমনাগমন করিবার কোনরূপ প্রতিবন্ধক ছিল না, অর্থেরও অভাব ছিল না।  ইং কর্ম্ম। কাল যে তিনি কোন স্থানে গমন করিয়াছিলেন, তাহা ত কোন পরিচারক বলে না।

 মিস্। তিনি যে কালই উহা সংগ্রহ করিয়া আনিয়াছিলেন, তাহারই বা অর্থ কি? ইতি পূর্ব্বে তিনি ঐ বিষ সংগ্রহ করিয়া অনায়াসেই আপনার নিকট রাখিতে পারেন।

 ইং কর্ম্ম। তাহা হইলে আপনার বিবেচনায় বৃদ্ধ কি আত্মহত্যা করিয়াছেন?

 মিস্। আমার তাহাই অনুমান হয়।

 ইং কর্ম্ম। আপনার অপর আর কোনরূপ সন্দেহ হয় না?

 মিস্। আমার আর কোনরূপ সন্দেহ নাই।

 ইং কর্ম্ম। বৃদ্ধের আর আছে কে?

 মিস্। আর কেহই নাই। আমিই কেবল তাঁহার একমাত্র কন্যা আছি।

 মিস্ মেরিকে এই কয়েকটী কথা জিজ্ঞাসা করিয়াই, তিনি সেই স্থান হইতে গাত্রোত্থান করিয়া আস্তে আস্তে নীচে আসিলেন। বলা বাহুল্য, মিসের নিকট হইতে বিদায়-গ্রহণের সময় তিনি বিশেষ সম্মানের সহিত তাঁহাকে অভিবাদন করিতে ভুলিলেন না। নীচে আসিরা তিনি আমাদিগের নিকট আগমন করিলেন, ও কহিলেন যে, মিস্ মেরির নিকট হইতে তিনি যতদূর অবগত হইতে পারিয়াছেন, তাহাতে তিনি বেশ বুঝিতে পারিয়াছেন যে, বৃদ্ধ জুবেয়ারকে কেহ হত্যা করে নাই, তিনি আত্মহত্যা করিয়া তাঁহার অতিশয় বার্দ্ধক্যের হস্ত হইতে নিষ্কৃতি লাভ করিয়াছেন। ইংরাজ কর্ম্মচারীর এই কথা শুনিয়া আমরা তাঁহাকে কহিলাম, “আপনি ইহা কিরূপে অবগত হইতে পারিলেন, ও তাহার প্রমাণই বা কি?” উত্তরে তিনি কহিলেন, “যে কথা একজন বিলাতীয় মিসের মুখ হইতে বাহির হইয়াছে, তাহাতে কি আর কোনরূপ সন্দেহ হইতে পারে? আপনারা মনে কেন যাহাই ভাবুন না, ও যতই কেন অনুৎসন্ধান করুন না, আপনারা ঠিক জানিবেন যে, বৃদ্ধ আত্মহত্যা করিয়াছেন।”