মিস্ মেরি/দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ
দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ।
আমরা জুবেয়ারের বাড়ীতে উপনীত হইয়া দেখিতে পাইলাম, একটা ঘরের মধ্যে বৃদ্ধ জুবেয়ার পড়িয়া রহিয়াছেন; কিন্তু তাঁহার প্রাণ বহির্গত হইয়া গিয়াছে। লাইব্রেরীর এক পার্শ্বে একটী ছোট ঘর আছে। ঐ ঘরের পার্শ্বে উপরে উঠিবার সিঁড়ি। লাইব্রেরী হইতে উপরে উঠিতে হইলে, বা উপর হইতে লাইব্রেরীতে গমন করিতে হইলে, ঐ ঘরের মধ্য দিয়া গমন করিতে হয়। ঐ ঘরের মধ্যেই জুবেয়ারের মৃতদেহ পতিত আছে। মৃতদেহটী উত্তমরূপে পরীক্ষা করিয়া দেখিলাম, কিন্তু তাহার কোনস্থানে কোনরূপ আঘাতের চিহ্ন পরিলক্ষিত হইল না। কেবলমাত্র জিহ্বা ও মুখের মধ্যে স্থানে স্থানে যেন একটু কাল বলিয়া বোধ হইতে লাগিল। আমরা সেইস্থানে উপস্থিত হইবার পূর্ব্বেই একজন ইংরাজ ডাক্তার সেই স্থানে আসিয়া উপস্থিত হইয়াছিলেন। জুবেয়ারের মৃতদেহ দেখিতে পাইবার পর মেরিই তাহাকে ডাকান। আমরা ঐ মৃতদেহটী উত্তমরূপে দর্শন করিবার পূর্ব্বেই ডাক্তার সাহেব বিশেষরূপে উহা পরীক্ষা করিয়া দেখিয়াছিলেন। জুবেয়ারের মৃত্যুর কারণ, কি অনুমান হয়, তাহা তাঁহাকে জিজ্ঞাসা করার তিনি কহেন, তাঁহার অনুমান হয়, বিষপানে ইনি ইহজীবন পরিত্যাগ করিয়াছেন। তিনি আরও কহিলেন, মহাবিষ প্রুসিক এসিডই তাঁহার উদরস্থ হইয়া ইহজগৎ হইতে তাঁহাকে বিতাড়িত করিয়াছে।
ডাক্তার সাহেবের কথা শুনিয়া আমাদিগেরও বেশ অনুমান হইল, তিনি যাহা বলিতেছেন, তাহা নিতান্ত অযৌক্তিক নহে। কোন না কোন প্রবল বিষই যে তাঁহার মৃত্যুর কারণ। সে বিষয়ে আর কিছুমাত্র সন্দেহ নাই।
মনে মনে এইরূপ ভাবিয়া সেই স্থানটী আমরা একবার উত্তমরূপে অনুসন্ধান করিয়া দেখিলাম। যে ঘরে তাঁহার মৃত দেহ পড়িয়াছিল, সেই ঘরে কিছুই দেখিতে পাইলাম না। লাইব্রেরীর ভিতর প্রবেশ করিয়া দেখিলাম, টেবিলের উপর একটী বোতলে কিয়ৎপরিমাণে মদ্য রহিয়াছে ও তাহার সন্নিকটে একটী গ্লাসও আছে। গ্লাসটী হস্তে লইয়া দেখিলাম, উহা হইতে সুরার গন্ধ নির্গত হইতেছে। অনুমানে বুঝিতে পারিলাম, ঐ বোতল হইতে সুরা ঐ গ্লাসে ঢালিয়া তাহা কেহ পান করিয়াছে।
বৃদ্ধ জুবেয়ারের একটি পরিচারক তাঁহার আদেশ প্রতিপালন করিবার মানসে প্রায় সর্ব্বদাই লাইব্রেরীর বাহিরে অপেক্ষা করিত। কোন কার্য্যের আবশ্যক হইলে জুবেয়ার যেমন তাহাকে ডাকিতেন, অমনি সে লাইব্রেরীর মধ্যে গমন করিয়া প্রভুর আদেশ প্রতিপালন করিত। কিন্তু তাহাকে না ডাকিলে বা বিশেষ কোনরূপ প্রয়োজন না হইলে, তাহার সেই লাইব্রেরীর ভিতর গমন করিবার আদেশ ছিল না। পরিচারকও সেই আদেশ সম্পূর্ণরূপে প্রতিপালন করিত।
বৃদ্ধের আদেশ প্রতিপালন করিবার জন্য দুইজন পরিচারক নিযুক্ত ছিল। পর্যায়ক্রমে একজন না একজন লাইব্রেরীর বাহিরে উপস্থিত থাকিত। উহারা দুই জনই মুসলমান, ও বহু দিবস হইতে দুই জনই ঐ কার্য্য সম্পন্ন করিয়া আসিতে ছিল। তাহারাই যদি বৃদ্ধের মৃত্যু সম্বন্ধে কোন কথা বলিতে পারে, এই ভাবিয়া আমরা তাহাদিগের উভয়কেই ডাকাইলাম। উহাদিগের নিকট হইতে সেই সময় এইমাত্র অবগত হইতে পারিলাম যে, বৃদ্ধ কোনস্থানে গমন করিতেন না, সদা সর্ব্বদা নিজের বাড়ীতেই থাকিতেন। অতিশয় প্রত্যূষে তিনি শয্যা হইতে গাত্রোত্থান করিয়া নীচে আসিতেন। বাগানের মধ্যে কিয়ৎক্ষণ ভ্রমণ করিয়া লাইব্রেরীর মধ্যে গমন করিতেন। সমস্ত দিবসের মধ্যে তিনি আর উপরে উঠিতেন না। লাইব্রেরীর সংলগ্ন স্নানের ঘরেই স্নান করিতেন। পার্শ্ববর্ত্তী দুইটি ঘরের মধ্যে একটীতে বস্ত্রাদি পরিধান ও অপরটীতে আহারাদি করিতেন। দিবাভাগে বিশ্রামও করিতেন লাইব্রেরীর ভিতর। রাত্রি ১১টার পর তিনি শয়ন করিবার মানসে উপরে উঠিতেন। যে সময়ে তিনি শয়ন করিবার মানসে উপরে উঠিতেন, সেই সময় পরিচারকগণের মধ্যে কেহই সেইস্থানে থাকিত না। রাত্রি দশটার সময় পরিচারক মাত্রেই আপনাপন স্থানে গমন করিত। ইহা বৃদ্ধের আদেশই ছিল। শয়ন করিবার অব্যবহিত পূর্ব্বেই বৃদ্ধ অতি অল্প পরিমাণে মদ্যপান করিতেন। পরিচারকগণ রাত্রি ১০টার সময় যখন সেইস্থান হইতে আপনাপন স্থানে গমন করিত, সেই সময় মদিরা সহিত একটী বোতল ও একটী গ্লাস লাইব্রেরী-ঘরের টেবিলের উপর রাখিয়া তাহারা চলিয়া যাইত। বৃদ্ধ শয়ন করিতে যাইবার সময় ইচ্ছামত ঐ মদিরা নিজ হস্তে গ্লাসে ঢালিয়া লইয়া পান করিতেন, ও উপরে গিয়া শয়ন করিতেন। ইহা তাঁহার নিত্য কর্ম্মের মধ্যে পরিগণিত ছিল।
পরিচারকগণের নিকট হইতে ইহা অবগত হইয়াছিল, তাহাদিগকে আরও দুই চারিটী কথা জিজ্ঞাসা করিবার প্রয়োজন মনে করিয়া, তাহাদিগের এক জনকে জিজ্ঞাসা করিলাম “তুমি কাল কোন্ সময় হইতে কোন্ সময় পর্য্যন্ত এই স্থানে উপস্থিত ছিলে?”
পরিচারক। আমি প্রত্যূষ ছয়টা হইতে দশটা এবং সন্ধ্যা ছয়টা, হইতে দশটা পর্য্যস্ত উপস্থিত ছিলাম।
আমি। সন্ধ্যা ছয়টা হইতে দশটা পর্য্যন্ত অপর কোন ব্যক্তি লাইব্রেরী ঘরের মধ্যে প্রবেশ করিয়াছিল?
পরিচারক। মিস্ মেরি ভিন্ন আর কাহাকেও এই ঘরে প্রবেশ করিতে দেখি নাই।
আমি। তিনি কোন্ সময়ে এই ঘরের মধ্যে প্রবেশ করিয়াছিলেন?
পরিচারক। সন্ধ্যার পর যখন আহারের সময় হয়, সেই সময় ইনি আসিয়া আহারাদি করিয়া চলিয়া যান। তাহার পর আরও দুই একবার তিনি সেই ঘরের মধ্যে প্রবেশ করিয়াছিলেন।
আমি। শেষে দুই বার যখন তিনি সেই ঘরের মধ্যে প্রবিষ্ট হন, সেই সময় সেই গৃহের মধ্যে বৃদ্ধের সহিত তাঁহার সাক্ষাৎ বা কথপোকথন হইয়াছিল কি?
পরিচারক। তাহা তো আমি ঠিক বলিতে পারি না; কারণ আমি সেই গৃহের ভিতরে ছিলাম না, বাহিরে বসিয়াছিলাম। কিন্তু প্রথমবার যখন তিনি আসিয়াছিলেন, তখন বোধ হয়, সাহেবের সহিত তাঁহার সাক্ষাৎ হইয়াছিল। কারণ আমার বোধ হইতেছে, সেই সময় উভয়েরই কথোপকথনের শব্দ আমার কর্ণে প্রবেশ করিয়াছিল। শেষ কালের কথা কিন্তু আমি বলিতে পারি না। মিস্ বাবা সেই বার ভিতরে গমন করিয়া, অগ্রেই পুনরায় বাহির হইয়া আসেন, ঘরের মধ্যে তাঁহার দুই মিনিটেরও বিলম্ব হয় নাই।
আমি। যখন ইনি শেষ বার সেই ঘরের মধ্যে প্রবিষ্ট হইয়াছিলেন, তখন রাত্রি কত?
পরিচারক। তখন রাত্রি ১০টা। মিস্ বাবাও ঘর হইতে বহির্গত হইয়া উপরে উঠিলেন, আমিও সেই স্থান পরিত্যাগ করিয়া আপন বাসাভিমুখে প্রস্থান করিলাম।
আমি। যখন তুমি সেই স্থান হইতে প্রস্থান কর, সেই সময় বৃদ্ধ কোথায় ছিলেন এবং কি করিতেছিলেন?
পরিচারক। তিনি ঠিক কোথায় ছিলেন এবং কি করিতেছিলেন, তাহা আমি বলিতে পারি না। তবে আমি এইমাত্র বলিতে পারি যে, তিনি ভিতরেই ছিলেন।
আমি। কেন, তুমি গমন করিবার সময় তাঁহাকে বলিয়া যাও না?
পরিচারক। গমন করিবার সময় আমাদিগকে বলিয়া যাইতে হয় না; আমাদিগের উপর আদেশ আছে, রাত্রি দশটা বাজিলেই আমরা চলিয়া যাই।
আমি। সুরার বোতল আর গেলাস টেবিলের উপর কে রাখিয়া গিয়াছিল?
পরিচারক। উহা খানসামার কার্য্য। সন্ধ্যার পরে আহারাদি করাইয়া যখন খানসামা বাহিরে যায়, সেই সময় সে-ই উহা টেবিলের উপর রাখিয়া যায়। ইহা তাহার প্রাত্যহিক কার্য্যের মধ্যে একটী।