মিস্ মেরি/প্রথম পরিচ্ছেদ
মিস্ মেরি
প্রথম পরিচ্ছেদ।
এই মহানগরী কলিকাতার ভিতর বাস না করে, এরূপ জাতিই নাই। এই নগরী বঙ্গদেশের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত থাকিলেও হিন্দু, মুসলমান, খৃষ্টান, বৌদ্ধ, জৈন প্রভৃতি সকল সম্প্রদায়ের লোকই এখানে আছেন ও সকল সম্প্রদায়ের মধ্যেই আমাদিগের অনুসন্ধান-উপযোগী কোন না কোনরূপ ঘটনা প্রায়ই ঘটিয়া থাকে। হিন্দু ও মুসলমান সম্প্রদায়ের মধ্যবর্ত্তী ঘটনাবলীর অনেক বিবরণ সময় সময় দারোগার দপ্তরে প্রকাশিত হইয়াছে; কিন্তু অপরাপর জাতীয় ঘটনাবলী অধিক পরিমাণে প্রকাশিত হয় নাই বলিয়াই খৃষ্ট ধর্ম্মাবলম্বীগণের অন্তর্ভূত আর একটী ঘটনা এই স্থানে লিপিবদ্ধ করিলাম। ইহাদিগের মধ্যেও সময় সময় যে কিরূপ ভয়ানক পাপ স্রোত প্রবাহিত থাকে, তাহার একটী জাজ্জ্বল্যমান দৃষ্টান্ত পাঠকগণ এই স্থানে দেখিতে পাইবেন।
বৃদ্ধ জুবেয়ার আর নাই। হঠাৎ তাঁহার মৃত্যু হইয়াছে, এই কথা অতি প্রত্যুষে সহরের মধ্যে—বিশেষ ইংরাজ অধিবাসিগণের মধ্যে দেখিতে দেখিতে প্রচারিত হইয়া পড়িল। কেহ কহিল, সরদি-গরমিতে তিনি মরিয়াছেন; কেহ কহিল, তিনি আত্মহত্যা করিয়াছেন; কেহ বলিতে লাগিল, তিনি হত হইয়াএইরূপ যাহার মনে যাহা আসিয়া উদয় হইতে লাগিল, তিনি তাহাই অপরকে কহিতে লাগিলেন। যাঁহাদের বিশ্বাস, সংবাদপত্রে সমস্তই প্রকৃত কথা বাহির হয়, প্রকৃত তথ্য অবগত হইবার নিমিত্ত তাঁহারা সংবাদপত্র- বাহকের আশায় বিশেষ আগ্রহের সহিত অপেক্ষা করিতে লাগিলেন। নিয়মিত সময়ে সেই দ্বিবসের সংবাদপত্র তাঁহাদিগের হস্তগত হইল। বিশেষ কৌতূহলের সহিত তাঁহারা আপনাপন সংবাদপত্র দেখিতে লাগিলেন; কিন্তু দেখিলেন, জুবেয়ার সম্বন্ধে কোন কথা প্রকাশিত হয় নাই।
জুবেয়ারের মৃত্যু-সংবাদ লোক-মুখে প্রচারিত হইবার পূর্ব্বেই আমরা কিন্তু এই সংবাদ অবগত হইতে পারিয়াছিলাম। রাত্রি শেষ হইবার দুই এক ঘণ্টা বাকী থাকিতেই টেলিফোনযোগে এই সংবাদ আসিয়া আমাদিগের নিকট উপনীত হয়। সংবাদ পাইবামাত্র আমরাও গিয়া সেইস্থানে উপস্থিত হই। আমরা সেইস্থানে উপস্থিত হইয়া কিরূপ অবস্থা দর্শন করিয়াছিলাম, তাহা বর্ণন করিবার পূর্ব্বে, জুবেয়ার কে, তিনি কোথায় অবস্থান করিয়া থাকেন, তাহার একটু পরিচয় পাঠকগণকে অগ্রেই অবগত করান আবশ্যক।
জুবেয়ারের জন্মস্থান কোথায়, তাহা আমরা সেই সময় অবগত নহি। কিন্তু গত ২০ বৎসর হইতে তিনি ইংরাজমহলে বাস করিতেছিলেন, তাঁহাকে দেখিয়া তাঁহাকে ইউরোপ দেশবাসী বলিয়া অনুমান হয়। তাঁহাকে কোনরূপ কর্ম্মকার্য্য করিতে আমরা দেখি নাই; কিন্তু তাঁহার যে বিস্তর অর্থ আছে, তাহা কিন্তু সকলেই কহিত।
তিনি যে বাড়ীতে বাস করিতেন, উহা একটী দ্বিতলগৃহ। দ্বিতলের উপর তাঁহার ও তাঁহার কন্যা মেরির শয়ন ঘর। তদ্ব্যতীত, বসিবার উপযোগী আর একটী বৃহৎ ঘর ছিল। ঘর সদাসর্ব্বদা খোলা থাকিত সত্য, কিন্তু বৃদ্ধ জুবেয়ার প্রায়ই সেইস্থানে বসিতেন না। মেরিই প্রায় সর্ব্বদা সেইস্থানে উপবেশন করিতেন। নিম্নতলে একটা প্রশস্ত ও সুদৃশ্য লাইব্রেরী ছিল। বৃদ্ধ জুবেয়ার সদা সর্ব্বদা সেইস্থানেই বসিতেন। তাঁহার আরাম ও বিরামের স্থল সেই লাইব্রেরী। আহারের সময় ঐ ঘরের পার্শ্ববর্ত্তী একটী ঘরে গমন করিতেন বটে, কিন্তু দিবসের অধিকাংশ সময় সেই লাইব্রেরী ঘরের মধ্যে অতিবাহিত করিতেন। অতি প্রত্যূষে তিনি শয্যা হইতে গাত্রোত্থান করিয়া নীচে আসিতেন। সেই বাড়ীর সংলগ্ন বাগানের মধ্যে দুই এক ঘণ্টা ভ্রমণ করিয়া লাইব্রেরীর মধ্যে গমন করিতেন। স্নান, আহার, বিশ্রাম প্রভৃতি সমস্তই সেইস্থানে সমাপন করিয়া রাত্রি ১১টার কম শয়ন করিবার মানসে তিনি আর উপরে গমন করিতেন না। ইহাই তাঁহার নিত্যকর্ম্মের মধ্যে পরি গণিত ছিল। মেরি প্রায় সর্ব্বদাই উপরে থাকিতেন। কেবল আহারের সময় পিতার সহিত একত্র বসিয়া আহারাদি করিতেন, ও কখন কখন চকিতের ন্যায় এক এক বার কোন না কোন কার্য্যের ভান করিয়া লাইব্রেরীর মধ্যে প্রবেশ করিতেন, ও দেখিতে দেখিতে সেইস্থান হইতে অন্তর্হিত হইতেন। জুবেয়ারের গাড়ি-ঘোড়া যাহা ছিল, তাহা জুবেয়ার প্রায়ই ব্যবহার করিতেন না। মেরির ইচ্ছানুযায়ী উহা ব্যবহৃত হইত।
জুবেয়ার কোথা হইতে আসিয়া যে কলিকাতায় বাস করিতেছিলেন, তাহা কেহই জানিতেন না। কিন্তু যখন তিনি এইস্থানে আগমন করেন, তখন কেবলমাত্র তাঁহার স্ত্রী ও কন্যা মেরি তাঁহার সঙ্গে আসিয়াছিল। ক্রমে ইহাও এইস্থানে প্রকাশিশু হইয়া পড়ে, যে, জুবেয়ারের প্রথমা স্ত্রীর মৃত্যুর পর তিনি মেরির মাতার সহিত পরিণয়-সূত্রে পুনরায় আবদ্ধ হন। সেই সময় মেরির বয়ঃক্রম ২ বৎসর। মেরির মাতা কোন সম্ভ্রান্ত ইংরাজের স্ত্রী ছিলেন। তাঁহার স্বামী জীবিত থাকিতে থাকিতেই তিনি জুবেয়ারের সহিত অবৈধ প্রণয়ে আবদ্ধ হন, ও পরিশেষে তাঁহাকে পুনরায় বিবাহ করেন, এই কথা এইস্থানে রাষ্ট্র হয়। মেরি সেই ইংরাজের ঔরসজাতা কন্যা। যে সময় জুবেয়ার মেরির মাতার সহিত পরিণয়সূত্রে আবদ্ধ হন,সেই সময় জুবেয়ারের বয়ঃক্রম ৫০ বৎসরের কম ছিল না। রাষ্ট্র, বিবাহের ৪।৫ বৎসর পরে তিনি কলিকাতায় আগমন করেন। সেই হিসাবে জুবেয়ারের বয়ঃক্রম এখন প্রায় অশীতি বৎসর। মেরির বয়ঃক্রম ২৭ বৎসরের কম নহে। কিন্তু মেরি এখনও অবিবাহিতা। কেন যে তিনি এখন পর্য্যন্ত বিবাহ করে নাই, তাহা মেরিই বলিতে পারেন। বোধ হয়, জুবেয়ারও বলিতে পারিতেন। কলিকাতায় আসিবার ৪।৫ বৎসর পরেই মেরির মাতার মৃত্যু হয়, সেই সময় হইতে মেরি ও জুবেয়ার সেই বাড়ীতে বাস করিয়া আসিতেছিলেন।