মিস্ মেরি/ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ
ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ।
উইল ও চিঠির খসড়া দেখিয়া আমাদিগের বেশ অনুমান হইল যে, তাহার নকল বৃদ্ধ তাঁহার উকীলের নিকট পাঠাইয়া দিয়াছেন। মনে মনে এইরূপ অনুমান করিয়া, আমরা সেই উকীলের নিকট গমন করিলাম ও তাহার নিকট হইতে অবগত হইতে পারিলাম যে, পূর্ব্বে একবার বৃদ্ধের সহিত তাঁহার সাক্ষাৎ হইয়াছিল। সেই সময় তাঁহার বিষয়ের উইল করা সম্বন্ধে তাঁহার কথাবার্ত্তা হয় ও তিনি তাঁহার ইচ্ছামত কোন্ বিষয় কাহাকে প্রদান করিবেন, তাহার একটি খসড়া প্রস্তুত করিয়া তাঁহার নিকট পাঠাইয়া দিবেন বলিয়া যান।
কিন্তু তাহার পর কোনরূপ কাগজ পত্র আর তাঁহার নিকট হইতে প্রেরিত হয় নাই। সুতরাং তিনি কোনরূপ উইলক্ত প্রস্তুত করেন নাই।
উকীলের নিকট এই কথা অবগত হইয়া আমরা কিছুই বুঝিয়া উঠিতে পারিলাম না। একবার ভাবিলাম,—বৃদ্ধ উইল করিতে মনস্থ করিয়া একটী খসড়া প্রস্তুত করিয়াছিলেন কিন্তু উকীলের বাড়ীতে উহা পাঠাইবার পূর্ব্বেই তাঁহার মৃত্যু হইয়াছে। আবার ভাবিলাম,—উইল করিতে কৃতসঙ্কল্প হইয়া, সেই উইল শেষ না করিরাই বা তিনি আত্মহত্যা করিলেন কেন? পুনরায় মনে হইল,—মেরি যখন বৃদ্ধের একমাত্র কন্যা বলিয়া পরিচয় দিয়া থাকেন, তখন বৃদ্ধের পরিত্যক্ত সমস্ত সম্পত্তিই তিনি প্রাপ্ত হইবার আশা যে না করিয়া থাকেন তাহা নহে, অথচ উইল অনুযায়ী দেখা যাইতেছে যে, বৃদ্ধ তাঁহার সম্পত্তির নিতান্ত সামান্য অংশ মেরিকে প্রদান করিতেছেন। এরূপ অবস্থায় মেরি যদি ঐ উইলের বিষয় কোনরূপে অবগত হইতে পারিয়া থাকেন, তাহা হইলে ঐ রূপ উইল মেরি যে সহজে করিতে দিবেন তাহা অনুমান হয় না। অথচ বৃদ্ধ যখন তাঁহার উইলের লেখাপড়া শীঘ্র শীঘ্র শেষ করিরা রেজেষ্টারী করিয়া রাখিতে চান, তখন তিনিও যে বিলম্ব করিবেন, তাহা সম্ভবপর নহে। এরূপ অবস্থায় উকীলের বাড়ীতে উইলের খসড়া প্রেরিত হইল না কেন? মনে মনে এইরূপ চিন্তা করিতেছি, এমন সময় লাইব্রেরীর মধ্যস্থিত এক খানি পিয়নবুকের উপর হঠাৎ আমার নয়ন আকৃষ্ট হইল। বইখানি হস্তে লইয়া তাহার ভিতর উল্টাইয়া উল্টাইয়া দেখিতে লাগিলাম। উহারই একস্থানে দেখিতে পাইলাম যে, উইলের খসড়া ও পত্র সেই উকীলের নিকট প্রেরিত হইয়াছে ও একজন ইংরাজ উহাতে স্বাক্ষর করিয়া উহা গ্রহণ করিয়াছেন। ইহা দেখিয়া ঐ পিয়ন-বই হস্তে লইয়া পুনরায় সেই উকীলের বাড়ীতে গমন করিলাম ও তাঁহাকে উহা দেখাইলে, তিনি কহিলেন যে, ইহাতে লিখিত পত্র ও উইলের খসড়া তিনি প্রাপ্ত হন নাই, ও উহাতে যে স্বাক্ষর রহিয়াছে, তাহা তাঁহার আফিসের কাহারও স্বাক্ষর নহে। উকীলের নিকট এই অবস্থা শ্রবণ করিয়া আমাদিগের মনে আরও ভয়ানক সন্দেহের উদয় হইল। পুনরায় বৃদ্ধের বাড়ীতে আগমন করিয়া ঐ বাড়ীর দরোয়ান প্রভৃতি সমস্ত পরিচারকগণকে একত্র করিলাম, ও সকলকে সেই পুস্তক দেখাইয়া জিজ্ঞাসা করিতে লাগিলাম যে, বৃদ্ধের মৃত্যুর পূর্ব্ব দিবস কোন কাগজ বা পত্রাদির সহিত ঐ পুস্তক বৃদ্ধ কাহার হস্তে অর্পণ করিয়াছিল, ও সেই বা উহা কি করিয়াছে।
প্রত্যেকের নিকট এইরূপ অনুসন্ধান করিতে করিতে তাহাদিগের মধ্য হইতে একজন দ্বারবান্ কহিল “খুব বড় একখানি চিঠির সহিত আমার মনিব উহা আমাকে প্রদান করিয়াছিলেন” দ্বারবানের এই কথা শুনিয়া আমি তাহাকে জিজ্ঞাসা করিলাম “তোমাকে তিনি কি বলিয়া উহা প্রদান করিয়া ছিলেন?”
দ্বারবান্। আমাকে বলিয়া দিয়াছিলেন, ইহাতে যে উকীলের নাম লেখা আছে, সেই উকীলের বাড়ীতে ইছা দিয়া আইস।
আমি। তুমি উহা সেই স্থানে লইয়া গিয়াছিলে?
দ্বারবান্। না।
আমি। কেন লইয়া যাও নাই? ঐ পত্র তুমি কি করিলে?
দ্বারবান্। আমি যখন ঐ পত্র লইয়া যাইতেছিলাম, সেই সময় রাস্তায় মেম সাহেবের সহিত সাক্ষাৎ হয়। একখানি টমটমে তিনি ও আর একজন সাহেব আসিতেছিলেন। রাস্তায় আমাকে দেখিয়া তিনি তাঁহার টমটম থামান আমাকে ডাকেন। আমি তাঁহার নিকটে গেলে তিনি আমাকে কহেন, “এই পত্র লইয়া তুমি কোথায় যাইতেছ?” তাঁহার কথায় আমি কোনরূপ উত্তর প্রদান না করিয়া পিয়ন বহি সহ ঐ পত্রখানি তাঁহার হস্তে প্রদান করি। তিনি পিয়নবহিখানি দেখিয়া, তাঁহার সহিত যে সাহেবটী ছিলেন তাঁহাকে ইংরাজীতে কি বলিলেন। মেমের কথা শুনিয়া তিনি পিয়নবহিখানি আপন হস্তে লইয়া পড়িয়া দেখিলেন, ও আপন পকেট হইতে পেন্সিল বাহির করিয়া ঐ পুস্তকে সহি করিয়া দিলেন। পরে আমাকে কহিলেন “ইহা আমারই পত্র। আর তোমাকে আমার আফিস পর্য্যন্ত গমন করিতে হইবে না।” এই বলিয়া তিনি পিয়নবহি খানি আমার হস্তে প্রদান করিলেন। আমি উহা লইয়া চলিয়া আসিলাম। পত্রখানি কিন্তু মেম সাহেবের হস্তে রহিয়াছিল। আমি ফিরিয়া আসিয়া পুস্তকখানি জমার মনিবের সম্মুখে টেবিলের উপর রাথিয়া দিলাম। তিনি উহা এক বার খুলিয়া দেখিয়া পুনরায় সেই স্থানেই রাখিয়া দিলেন।
আমি। যে সাহেব ঐ পুস্তকে সহি করিয়া দিয়াছিলেন, তাঁহাকে তুমি চিন কি?
দ্বারবান্। তাঁহাকে খুব চিনি। দিবাভাগে প্রায় সর্ব্বদাই তিনি আমার মনিবের বাড়ীতে আসিয়া থাকেন, ও মেম সাহেবের সহিত প্রায় সর্ব্বদাই আমোদ আহ্লাদ করিয়া বেড়ান। তদ্ব্যতীত প্রায় প্রত্যহ রাত্রিতে বৃদ্ধ উপরে গমন করিবার পর আসিয়া থাকেন, ও বৃদ্ধ শয্যা হইতে গাত্রোত্থান করিবার পর চলিয়া যান। কোন কোন দিন আবার প্রত্যূষে গমন না করিয়া দিবাভাগেই সর্ব্বসমক্ষে গমন করিয়া থাকেন। তাঁহাকে আর আমি চিনি না।
আমি। তিনি কোথায় থাকেন, তাহা তুমি বলিতে পার?
দ্বারবান্। তাহা আমি জানি না, কিন্তু তাঁহাকে আমি উত্তমরূপে চিনি, ও বাড়ীর সমস্ত লোকেই তাঁহাকে চিনে। আমার মনিবের মৃত্যুর পর হইতে আর তিনি পূর্ব্বের ন্যায় সদা সর্ব্বদা এখানে আসেন না, বা থাকেন না; কেবলমাত্র এক আধবার আসিয়া থাকেন।
এ পর্য্যন্ত আমাদিগের মনে যে একটু সন্দেহ ছিল, দ্বারবানের কথা শুনিয়া সে সন্দেহ আমাদিগের মন হইতে একটু দূরীভূত হইল। এই উইলই যে বৃদ্ধের মৃত্যুর কারণ, তখন যেন তাহা আমাদিগকে বলিয়া দিল। আরও আমাদিগের মনে বিশেষরূপ ধারণা হইল যে, মেরি নিজে বা অপর কাহার দ্বারা এই কার্য্য সম্পন্ন করাইয়াছেন, তাঁহার নিজের স্বার্থ-সিদ্ধির নিমিত্ত তিনি এই ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করিয়াছেন।”
আমরা যে কয়েকজন দেশীয় কর্ম্মচারী এই অনুসন্ধানে নিযুক্ত হইয়াছিলাম, দেখিলাম, তাঁহারা সকলেই ক্রমে আমার মঞ্চের অনুমোদন করিলেন। এখন এই মোকদ্দমার অনুসন্ধান করিতে হইলে মিস্ মেরিকে ভাল করিয়া জিজ্ঞাসাবাদ করা, বা তাহাকে গ্রেপ্তার করার প্রয়োজন হইয়া পড়িল। কিন্তু এই কার্য্য এদেশীয় কর্ম্মচারীগণের দ্বারা সম্পন্ন হওয়া কোনরূপেই কর্ত্তব্য নহে; সুতরাং এই অনুসন্ধানে হস্তক্ষেপ করিতে হইলে ইংরাজকর্ম্মচারীর সাহায্য গ্রহণ করা কর্ত্তব্য। আমাদিগের সহিত কয়েকজন ইংরাজকর্ম্মচারীও নিযুক্ত ছিলেন। এ কথা তাঁহাদিগকে কহিলে, তাঁহারা হাস্য করিয়া আমাদিগের কথা একবারেই উড়াইয়া দিলেন ও কহিলেন “বিলাতীয় মিস্ মেরি তাঁহার পিতাকে হত্যা করিয়াছে, এ কথা কি কখন হইতে পারে? এরূপ অস্বাভাবিক অনুসন্ধানে আমরা কিছুতেই হস্তক্ষেপ করিতে সমর্থ নহি।” আমাদিগের সমপদস্থিত ইংরাজ কর্ম্মচারিগণের মুখ হইতে এই কথা শুনিয়া আমরা আমাদিগের মনের ভাব আমাদিগের ঊর্দ্ধতন কর্ম্মচারিগণের মধ্যে দুই এক জনকে কহিলাম। দেখিলাম তাঁহারাও ইংরজি-কর্ম্মচারিগণের মতের অনুমোদন করিলেন ও আমরা যে মহাভ্রমে পতিত হইয়াছি, তাহাই আমাদিগকে বুঝাইয়া দিতে চেষ্টা করিতে লাগিলেন।
এই অবস্থা দেখিয়া আমরা তাঁহাদিগকে আর কোন কথা কহিলাম না আস্তে আস্তে সেইস্থান হইতে প্রস্থান করিলাম। আমরা সেই স্থান হইতে ইংরাজ-কর্ম্মচারীর অন্তরালে গমন করিলাম সত্য; কিন্তু আমাদিগের মনের ভাব একবারে পরিত্যাগ করিতে পারিলাম না। আমাদিগের মধ্যে কোন কোন কর্ম্মচারী কহিলেন “যখন দেখিতেছি যে, আমাদিগের ঊর্দ্ধতন কর্ম্মচারিগণ পর্য্যন্ত আমাদিগের বিপক্ষে অভিমত প্রকাশ করিতেছেন, তখন এই কার্য্য হইতে আমাদিগেরও নিষ্কৃতি হওয়া কর্ত্তব্য; কারণ এই মোকদ্দমার যদি কিনারা না হয়, তাহা হইলে আমাদিগের অনিষ্ট হইবার কোনরূপ সম্ভাবনাই নাই; কিন্তু এই মোকদ্দমার কিনারা করিতে গিয়া যদি মিসের অনিষ্ট করিবার চেষ্টা করি, তাহা হইলে আমাদিগের পদে পদে বিপদ ও বিশেষরূপ অনিষ্ট হইবার সম্ভাবনা আছে।” কেহ কহিলেন “যখন আমরা বেশ বুঝিতে পারিতেছি যে, এই কার্য্য মেরির দ্বারা সম্পন্ন হইয়াছে, তখন কর্ত্তব্য-কর্ম্মের অনুরোধে আমাদিগকে এই কার্য্য হইতে পশ্চাৎপদ হওয়া কোনরূপেই কর্ত্তব্য নহে। আমাদিগের অদৃষ্টে যাহাই থাকুক না কেন, আমরা একবার মিস্কে লইয়া অনুসন্ধান করিব ও তাঁহাকে দস্তুরমত জিজ্ঞাসাবাদ করিয়া দেখিব যে, তিনি আমাদিগের কথার কিরূপ উত্তর প্রদান করেন।”
এই অনুসন্ধানে নিযুক্ত সমস্ত দেশীয় কর্ম্মচারীগণ একস্থানে উপবেশন করিয়া এইরূপ পরামর্শ করিতেছি, এমন সময় আর একজন ঊর্দ্ধতন ইংরাজ-কর্ম্মচারী সেই স্থানে আসিয়া উপস্থিত হইলেন ও আমাদিগকে জিজ্ঞাসা করিলেন “তোমরা সকলে একস্থানে বসিয়া কি করিতেছ? এইরূপে একস্থানে বসিয়া থাকিলে কি এই মোকদ্দমার কিনারা হইবে?”
যে ইংরাজ-কর্ম্মচারী আমাদিগকে এই কথা কহিলেন, তাঁহার জন্মস্থান খাস বিলাতে ও তাঁহার বয়ঃক্রমও খুব অধিক নহে। অপরাপর ইংরাজ-কর্ম্মচারিগণের সহিত তাঁহার প্রায়ই মতের মিল হইত না, অথচ তিনি কখন অপরের মতে মত দিয়া কোন কার্য্যে হস্তক্ষেপ করিতেন না। ভাল হউক বা মন্দ হউক, নিজের মনে যেমন, উদয় হইত, সেইরূপ ভাবে চলিতেন। তাঁহার সমপদস্থ অপরাপর কর্ম্মচারিগণ তাঁহাকে প্রায়ই দেখিতে পারিতেন না, ও তাঁহাদিগের কোনরূপ পরামর্শে তাঁহাকে ডাকিতেন না। তিনিও তাঁহাদিগের কাহার কোন কথা গ্রাহের মধ্যে আনিতেন না। যাহা তাঁহার মনে উদয় হইত, তাহাই করিতেন।
এই কর্ম্মচারীর কথা শুনিয়া আমরা তাঁহাকে কহিলাম, আমরা ত এই মোকদ্দমার কিনারা করিয়া আসিয়াছি, কিন্তু আপনারা তাহা চান কই? সুতরাং অনন্যোপায় হইয়া আমরা এইস্থানে চুপ করিয়া বসিয়া কেবল সময় অতিবাহিত করিতেছি।”
আমাদিগের কথা শুনিয়া তিনিও আমাদিগের সহিত সেই স্থানে উপবেশন করিলেন ও কহিলেন “এই মোকদ্দমার কিরূপ কিনারা করিয়াছ, তাহা সবিশেষ আমাকে কহ। তাহা হইলে আমি বুঝিতে পারিব যে, তোমাদিগের অনুমান কতদূর যুক্তিসঙ্গত।”
কর্ম্মচারীর কথা শুনিয়া মিস্ মেরি সম্বন্ধে আমাদিগের মনে যেরূপ সন্দেহ উপস্থিত হইয়াছিল, ও অনুসন্ধান করিয়া তাঁহার বিপক্ষে যাহা যায় প্রাপ্ত হইয়াছিলাম, তাহার সমস্তই একে একে তাঁহাকে কহিলাম। উইল ও পত্রের খসড়া তাঁহাকে দেখাইলাম। দ্বারবানের নিকট হইতে যেরূপে তিনি উহা হস্তগত করিয়াছিলেন, তাহাও তাঁহাকে কহিলাম। উইল করিবার পূর্ব্বে বৃদ্ধের মৃত্যু হইলে মেরির কিরূপ স্বার্থ আছে, আমাদিগের কথা শুনিয়া, তাহা তিনি সমস্তই বুঝিতে পারিলেন ও পরিশেষে আমাদিগের মতের অনুমোদন করিয়া কহিলেন “এরূপ অবস্থায় মেরিকে ও মেরির যিনি প্রিয়বন্ধু তাঁহাকে ধৃত করিয়া তোমরা অনুসন্ধানে প্রবৃত্ত হও নাই কেন?”
আমাদিগের অপরাপর ঊর্দ্ধতন কর্ম্মচারিগণ এই সম্বন্ধে আমাদিগকে যাহা যাহা বলিয়াছিলেন, তাহা তাঁহাকে কহিলাম, ও এরূপ অবস্থায় আমরা কিরূপে এই অনুসন্ধানে হস্তক্ষেপ করিতে পারি, তাহাও তাঁহাকে জিজ্ঞাসা করিলাম। আমাদিগের কথা শুনিয়া তিনি আমাদিগের উপর একটু বিরক্তি ভাব প্রকাশ করিয়া কহিলেন, “তোমরা ইংরাজ রাজত্বের কর্ম্মচারীর উপযুক্ত নহ, বা ইংরাজ আইনের অর্থ অবগত হইতে পার নাই। আমাদিগের আইনে শাদা ও কালায় প্রভেদ নাই, বড় ও ছোটর মধ্যে কোনরূপ পার্থক্য নাই; আইন মতে যাহাকে পাইব, রাজা হউন বা দরিদ্র হউন, দেশীয় হউন বা বিদেশীয় হউন, শ্বেতাঙ্গ হউন বা কৃষ্ণাঙ্গ হউন, সকলকেই সমান রূপে দেখিব ও সকলের সহিত সমান ভাবে চলিব। তোমাদিগের সাহসে না কুলায়, আমার সহিত আইস। আমি নিজে এখন এই মোকদ্দমার অনুসন্ধান করিতেছি।”
সাহেবের কথা শুনিয়া আমাদিগের মনে এখন আশার উদয় হইল। ভাবিলাম, এখন বোধ হয়, এই মোকদ্দমার কিনারা হইবে। এই ভাবিয়া আমরা সকলেই সেই ইংরাজ-কর্ম্মচারীকে সর্ব্বতোভাবে সাহায্য করিতে বদ্ধপরিকর হইলাম।
কর্ম্মচারী সাহেব আর কোন কথা না বলিয়া একবারে উপর উঠিলেন। সেই সময়ে মেম ও তাঁহার প্রণয়াকাঙ্ক্ষী সাহেব সেইস্থানে উপস্থিত ছিলেন। তিনি একবারেই উভয়কে কহিলেন, “তোমরা এখন প্রকৃত কথা কহিবে কি না? যদি মঙ্গল চাহ, তাহা হইলে প্রকৃত কথা কহ। নতুবা তোমাদিগের হন্তে বৃদ্ধের যে অবস্থা ঘটিয়াছে, আমার হস্তে তোমাদিগেরও সেই অবস্থা ঘটিবে।” কর্ম্মচারীর কথা শুনিয়া তাঁহারা সমস্তই অস্বীকার করিলেন। কিন্তু ঐ কর্ম্মচারী তাঁহাদিগের কোন কথায় বিশ্বাস না করিয়া, মিস্ মেরি যে ঘরে থাকিতেন, সেই ঘর অনুসন্ধান করিতে আমাদিগকে আজ্ঞা প্রদান করিলেন। আমরা কেবলমাত্র যে আদেশের অপেক্ষা করিতেছিলাম, সেই আদেশ পাইবামাত্রই ঐ ঘর উত্তমরূপে দেখিতে আরম্ভ করিলাম। মেমের দেরাজের ভিতর উইলের খসড়া ও সেই উকীলের পত্র পাওয়া গেল। উহা সেইস্থানে কিরূপে আসিল, মেম সাহের তাহার কোনরূপ সন্তোষজনক উত্তর প্রদান করিতে পারিলেন না। এদিকে আর একটী আলমারী হইতে একটী প্রুসিক এসিডের শিশিও বাহির হইল। ঐ শিশির প্রায় এক-চতুর্থ অংশ শূন্য। ঐ ঔষধ কিরূপে তাঁহার ঘরের ভিতর আসিল, তাহাও তিনি আমাদিগকে উত্তমরূপে বুঝাইতে পারিলেন না। তিনি এ সম্বন্ধে অনেক বার অনেক রূপ বলিবার পর শেষে কহিলেন, লাইব্রেরীর ভিতর টেবিলের উপর উহা পড়িয়াছিল, সেইস্থান হইতে তিনি উহা আনিয়া নিজের নিকট রাখিয়া দিয়াছেন। সে যাহা হউক, পরিশেষে উভয়েই ধৃত হইলেন, ও উভয়েই সমস্ত কথা স্বীকার করিলেন। আমরা যেরূপ অনুসন্ধান পাইয়াছিলাম, বা আমরা যেরূপ অনুমান করিয়াছিলাম, তাঁহারও পরিশেষে সেইরূপই কহিলেন। তখন সকলেই জানিতে পারিলেন যে, ঐ উইলই বৃদ্ধের মৃত্যুর কারণ, ও মিস্ মেরিই স্বহস্তে ঐ বিষ টেবিলস্থিত শূন্য গ্লাসে ঢালিয়া রাখিয়া দিয়াছিলেন। বৃদ্ধ অনবধান বশতঃ সেই গ্লাসেই সুরা ঢালিয়া পান করিবার সঙ্গে সঙ্গে ইহজগৎ পরিত্যাগ করিয়াছেন। মেরির প্রণয়াভিলাষী সেই ইংরাজ যুবক ইহার মধ্যে সংসৃষ্ট থাকিলেও, তাঁহার দণ্ড হইতে পারে, এরূপ বিশেষ কোন প্রমাণ না পাওয়ায় তিনি অব্যাহতি পাইলেন। কিন্তু মিস্ মেরি বিচারার্থ বিচারকের নিকট প্রেরিত হইলেন। তাঁহারও ভাগ্যে ইংরাজ আইন অনুসারে বিচার- দণ্ড ঘটিল না, ঈশ্বরই তাঁহাকে দত্ত প্রদান করিলেন। হাজতে থাকিবার কালীন বিশেষ সঙ্কটপীড়ার আক্রান্ত হইয়া তিনি ইহজীবন ত্যাগ করিলেন। বলা বাহুল্য যে, বৃদ্ধের ইচ্ছানুসারে তাঁহার সমস্ত বিষয় বিভাগ হইয়া গেল; কেবল মিস্ মেরির অংশে যাহা পড়িয়াছিল, তাহাও তাঁহার পুত্র প্রাপ্ত হইলেন।
সম্পূর্ণ
সহরে মেয়ে।
(অর্থাৎ কলিকাতা সহর নিবাসী জনৈক বালিকার অদ্ভুত রহস্য!)
যন্ত্রস্থ।