মুর্শিদাবাদ-কাহিনী/রাজা উদয়নারায়ণ

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন


রাজা উদয়নারায়ণ

 খ্রীস্টীয় অষ্টাদশ শতাব্দীর প্রারম্ভে ভারতবর্ষের চতুর্দিকে ঘোর রাজনৈতিক বিপ্লব উপস্থিত। বিজয়ী সম্রাট আরঙ্গজেবের মৃত্যুর পর মোগল-গৌরব-সূর্য ধীরে ধীরে অস্তমিত হইতে বসিয়াছে; তদীয় পুত্রগণ পরস্পর কলহে উন্মত্ত; দাক্ষিণাত্যে বীরেন্দ্রকেশরী শিবাজী যে-বীরজাতির সৃষ্টি করিয়াছিলেন, সেই মহারাষ্ট্রীয়গণ বিশ্ববিস্ময়কর প্রতাপে মোগল সাম্রাজ্য বিধ্বস্ত করিবার জন্য ব্যগ্র; মধ্যস্থলে রাজপুতগণ রাজা রাজসিংহ প্রভৃতির অধীনতায় পুনর্বার আপনাদিগের স্বাধীনতা বদ্ধমূল করিতে প্রয়াসী। আবার পঞ্চনদের নদীবিপ্লাবিত প্রদেশ হইতে এক ধর্মপ্রাণ জাতির অভ্যুদয় হইতেছিল, যাহারা শিখ নামে অভিহিত হইয়া উত্তরকালে মোগল ও ব্রিটিশ রাজত্বে সমরাগ্নি প্রজ্বলিত করিয়াছিল; ভারতের চতুর্দিকে ইংরেজ, ফরাসী ও অন্যান্য বৈদেশিক বণিকগণ বাণিজ্য-বিস্তারচ্ছলে রত্নপ্রসবিনী ভারতভূমিকে করতলস্থ করিবার জন্য মনে মনে সঙ্কল্প করিতেছিলেন। এই সময় নবাব মুর্শিদকুলী খাঁ বাঙ্গলার সিংহাসনে আসীন; প্রসন্নসলিলা ভাগীরথী-প্রান্তস্থিত মুর্শিদাবাদ তাঁহার রাজধানী। অল্পকাল হইল, তিনি নায়েব নাজিমীর ভার প্রাপ্ত হইয়াছেন; আজিম ওশ্বান বঙ্গরাজ্যের শাসনকর্তা; তাঁহার পুত্র ফরখ্‌শের নামমাত্র প্রতিনিধি হইয়া বাঙ্গলায় অবস্থিতি করিতেছিলেন। বস্তুতঃ, মুর্শিদকুলী খাঁ সর্বেসর্বা; এতদিন কেবল দেওয়ানীর ভারমাত্র তাঁহার হস্তে থাকায়, তিনি স্বীয় প্রভুত্ব অধিক পরিমাণে বিস্তার করিতে পারেন নাই। নায়েব নাজিমী পদলাভ করিয়া ও তৎ সঙ্গে সঙ্গে দেওয়ানীর ভার থাকায়, তিনি বঙ্গদেশে আপন শাসন-নীতি প্রচারের আরম্ভ করিলেন। সর্বাপেক্ষা জমিদারগণ তাঁহার শাসনদণ্ডের কঠোরতা বিশেষরূপে অনুভব করিয়াছিলেন। নিজের আদেশ থাকুক, আর না-ই থাকুক, তাঁহার কর্মচারিগণের আসুরিক ব্যবহারে বাঙ্গলার জমিদারগণ মৃতপ্রায় হইয়া উঠিলেন। ইহাদের মধ্যে নাজিম আহম্মদ ও সৈয়দ রেজা খাঁ সর্বপ্রধান। যাঁহার এক কপর্দক রাজস্ব বাকি পড়িত, অমনি তাঁহাকে নানাবিধ অত্যাচার ভোগ করিতে হইত। প্রচলিত ইতিহাসে দেখা যায় যে, কাহারও পাদদেশ রজ্জুবদ্ধ করিয়া তাঁহাকে লম্বিত করিয়া রাখা হইত; জমিদারগণ গ্রীষ্মের প্রখর রৌদ্রে, শীতের প্রবল শীতে, সামান্য অপরাধীর ন্যায় নগ্নগাত্রে উন্মুক্ত স্থলে দিবারাত্র কষ্ট ভোগ করিতেন। সৈয়দ রেজা খাঁর অত্যাচারের কথা পাঠ করিলে শরীর রোমাঞ্চিত হইয়া উঠে। একটি বিস্তৃত গর্ত খনন করিয়া তাহা নানাবিধ দুর্গন্ধময় আবর্জনা দ্বারা পরিপূর্ণ করা হইত, পরে অপরাধী জমিদারগণকে তাহার মধ্যে নিক্ষেপ করিয়া দীর্ঘকাল অবস্থানের জন্য আদেশ প্রদত্ত হইত। হিন্দুগণকে উপহাস করিবার জন্য, তাহার নাম ‘বৈকুণ্ঠ’ দেওয়া হইয়াছিল।[১] এতদ্ভিন্ন কারাবাস ও অর্থদণ্ডাদির তো কথাই নাই। এই বর্ণনা অতিরঞ্জিত হইলেও জমিদারগণ যে মুর্শিদকুলী খাঁর সময়ে যারপরনাই কষ্ট ভোগ করিয়াছিলেন, তাহার অনেক প্রমাণ আছে। এইরূপ অযথা অত্যাচারে হিন্দু জমিদারগণ অত্যন্ত ব্যতিব্যস্ত হইয়া উঠিলেন। লজ্জায়, অপমানে, কষ্টে তাঁহারা প্রতিনিয়ত আপনাদিগের মৃত্যু কামনা করিতে লাগিলেন। মনুষ্য সহস্রগুণে বলহীন হইলেও, অত্যাচারের ঝটিকা যখন তাহাকে আক্রমণ করে, তখন তাহা অতিক্রম করিতে প্রাণপণে প্রয়াস পাইয়া থাকে; তখন তাহার ক্ষীণ শক্তি দৃঢ়সংহত হয়। তাই মুর্শিদকুলী খাঁর রাজত্বে এই অত্যাচার অসহ্য হওয়ায়, বাঙ্গলায় দুইজন হিন্দুবীরের অভ্যুদয় হইল। যে-বাঙ্গলা দ্বাদশ ভৌমিকের জননী, রাজা প্রতাপাদিত্য প্রভৃতি যাঁহার সন্তান, তাঁহা হইতে দুই-একজন পুরুষকারসম্পন্ন ব্যক্তির যে-অভ্যুদয় হইবে, ইহা আশ্চর্যের বিষয় নহে। উক্ত দুই জনের মধ্যে একজন ভূষণার জমিদার রাজা সীতারাম রায়; দ্বিতীয়, রাজসাহীর জমিদার রাজা উদয়নারায়ণ রায়। সীতারাম রায়ের বিবরণ অনেকেই সবিশেষ অবগত আছেন; কিন্তু উদয়নারায়ণের বিষয় সকলে সম্যগ্‌রূপে জ্ঞাত না থাকায়, এ প্রবন্ধে তাঁহার সংক্ষিপ্ত বিবরণ প্রদত্ত হইতেছে। কিরূপে তিনি মুর্শিদকুলী খাঁর বিরুদ্ধে অভ্যুত্থান করিয়াছিলেন, ইহা হইতে অনেকেই তাহার অনুমান করিতে পরিবেন।

 রাজা উদয়নারায়ণ রায় মুর্শিদাবাদের বড়নগরের নিকটস্থ বিনোদ-নামক গ্রামে জন্ম পরিগ্রহ করেন বলিয়া কথিত হইয়া থাকে।[২] বড়নগর ভাগীরথী-তীরবর্তী এবং রানী ভবানীর প্রিয় বাসস্থান ছিল। বিনোদ তাহারই নিকটস্থিত। এই বড়নগরই আবার উদয়নারায়ণের রাজধানী। উদয়নারায়ণ বংশীয়দের উপাধি লালা ছিল; এই লালা হইতে তাঁহাকে কায়স্থ-বংশসম্ভূত মনে করা যাইতে পারে। কিন্তু তাঁহারা শাণ্ডিল্যগোত্রীয় রাঢ়ীয় ব্রাহ্মণ; অন্য কোন কারণে তাহাদের লালা উপাধি হয়। উদয়নারায়ণ জঙ্গীপুরের সমীপবর্তী গণকরবাসী ভরদ্বাজগোত্রীয় ঘনশ্যাম রায়ের কন্যা শ্রীমতীর পাণিগ্রহণ করেন। তাঁহার পুত্রের নাম সাহেবরাম।[৩] যৎকালে মুর্শিদকুলী

খাঁ বাঙ্গলার নবাব হইয়া মুর্শিদাবাদে অবস্থিতি করিতেছিলেন, সেই সময়ে উদয়নারায়ণের প্রতি এক বিস্তীর্ণ জমিদারি-শাসনের ভার ছিল। সমগ্র রাজসাহী চাকলা তাঁহার দ্বারা শাসিত হইত। তাঁহার জমিদারি পদ্মার উভয় পারে বিস্তৃত ছিল। বর্তমান মুর্শিদাবাদ, বীরভূম, সাঁওতালপরগণা এবং রাজসাহীবিভাগস্থ দুই-একটি জেলার অধিবাসিগণ তাঁহাকে রাজস্ব প্রদান করিত। তাঁহার সমস্ত জমিদারির নামই রাজসাহী।[৪] এক্ষণে মুর্শিদাবাদ ও বীরভূম জেলায় রাজসাহী নামে এক-একটি পরগণা দৃষ্ট হয়, এবং তাহাও উদনারায়ণের জমিদারির অন্তর্ভুক্ত ছিল। ফলতঃ তাঁহার জমিদারী যে পদ্মার উভয় পারে বিস্তৃত ছিল, তাহাতে সন্দেহ নাই। বিশেষতঃ মুর্শিদাবাদে তাঁহার জন্ম হওয়ায়, এতদঞ্চলের রাজস্ব তাঁহার দ্বারা সংগৃহীত হইত। জমিদারগণের প্রতি অত্যন্ত অবিশ্বাস থাকায়, নবাব মুর্শিদকুলী খাঁ কতিপয় আমীন নিযুক্ত করিয়া, তাঁহাদের দ্বারা রাজস্ব আদায় করিতেন। কেবল দুই-একজন কার্যদক্ষ জমিদারের প্রতি অনুগ্রহ করিয়া নবাব রাজস্ব সংগ্রহের ভার তাঁহাদের উপর অপর্ণ করিয়াছিলেন। রাজা উদয়নারায়ণ তাঁহাদের অন্যতম। বহুদূর বিস্তৃত জমিদারী অবাধে শাসন করায় এবং শাসনকার্যে অত্যন্ত সুনাম থাকায়, নবাব মুর্শিদকুলী খাঁ তাঁহার প্রতি প্রথমে অত্যন্ত সন্তুষ্ট হইয়াছিলেন ।

 নবাব মুর্শিদকুলী যাঁহার উপর সন্তুষ্ট হইতেন, তিনি যে কিরূপ উপযুক্ত লোক, তাহা বলা বাহুল্য মাত্র; কারণ তাঁহার ন্যায় চতুর, সূক্ষ্মবুদ্ধি ও কার্যকুশল ব্যক্তি বাঙ্গলার নবাবদিগের মধ্যে বিরল বলিয়া ঐতিহাসিকেরা উল্লেখ করিয়া থাকেন। উদয়নারায়ণের সৌভাগ্য, তিনি যে মুর্শিদকুলীর দৃষ্টি আকর্ষণ করিতে পারিয়াছিলেন। উদয়নারায়ণ নবাব-কর্তৃক ভারপ্রাপ্ত হইয়া প্রাণপণে আপনার কার্য করিতে লাগিলেন; দিন দিন তাঁহার কার্যদক্ষতা বৃদ্ধি পাইতে লাগিল, বাঙ্গলার সমস্ত জমিদারগণের মধ্যে তাঁহারই নাম বিখ্যাত হইয়া উঠিল। নবাব আরও সন্তুষ্ট হইলেন। এই সময়ে উদয়নারায়ণের জমিদারীর মধ্যে কিঞ্চিৎ গোলযোগ উপস্থিত হয়। নবাব তাহা অবগত হইয়া, উদয়নারায়ণের সাহায্যার্থে জমাদার গোলাম মহম্মদ ও কালিয়া জমাদার নামে দুইজন কার্যদক্ষ সেনানীকে নিযুক্ত করিলেন, তাহদের অধীন দুই শত সুশিক্ষিত অশ্বারোহী সৈন্য ছিল। উক্ত দুইজনের প্রতি এইরূপ আদেশ দেওয়া হয় যে, তাহারা রাজার অধীন থাকিয়া সম্পূর্ণভাবে তাঁহার আদেশ প্রতিপালন করিবে; যখনই যাহা আবশ্যক হইবে উদয়নারায়ণের আদেশপ্রাপ্তিমাত্র তদ্দণ্ডেই তাহা সম্পাদন করিবে। সৈন্যগণ রাজসাহী প্রদেশের চতুর্দিকে গোলযোগ নিবৃত্তি করিতে লাগিল, যে-যে স্থলে গোলযোগের সম্ভাবনা ছিল, অল্পকাল মধ্যে সেই সেই স্থলে শান্তি স্থাপিত হইল। রাজা উদয়নারায়ণের শাসনে এবং গোলাম মহম্মদের কার্যনিপুণতায় রাজসাহী বাঙ্গলার সকল জমিদারীর আদর্শ হইয়া উঠিল। অন্যান্য জমিদারগণ উদয়নারায়ণের পথানুসরণের চেষ্টা করিতে লাগিলেন। ইহাতে নবাবও তাঁহাদিগের প্রতি সন্তুষ্ট ছিলেন। কিন্তু ভাগ্যলক্ষী চিরদিন কাহারও প্রতি সন্তুষ্ট থাকেন না। এই গোলাম মহম্মদ হইতেই উদয়নারায়ণের ভাগ্যলক্ষীর অন্তর্ধানের সূচনা হইল। গোলাম মহম্মদের কার্য-দক্ষতায় উদয়নারায়ণ এতদূর সন্তুষ্ট হইলেন যে, তিনি তাহাকে অত্যন্ত প্রিয় জ্ঞান করিতে লাগিলেন। এইরূপ অযথা বিশ্বাস হওয়াতেই তাঁহার অধঃপতনের সূত্রপাত হয়।

 গোলাম মহম্মদের জন্য উদয়নারায়ণ ক্ৰমে ক্ৰমে দুর্ভাগ্যের ঘোর আবর্তে নিপতিত হইলেন। গোলাম মহম্মদ এতদূর কার্যকুশল ছিল যে, রাজা তাহাকে বিশ্বাস না করিয়া থাকিতে পারিতেন না। তাহার অধ্যবসায় ও উৎসাহে রাজসাহী প্রদেশে উদয়নারায়ণের জমিদারী বদ্ধমূল হইতেছিল, সুতরাং গোলাম মহম্মদ-যে তাঁহার প্রিয় পাত্র হইবে, ইহা আশ্চর্যের বিষয় নহে। উদয়নারায়ণ ও গোলাম মহম্মদের ক্ষমতা দিন দিন বৃদ্ধি হওয়ায়, নবাব মুর্শিদকুলী অত্যন্ত চিন্তান্বিত হইলেন। তিনি মনে ভাবিলেন, উদয়নারায়ণ যেরূপ উপযুক্ত রাজা, তাহাতে গোলাম মহম্মদের ন্যায় কার্যকুশল যোদ্ধা তাঁহার সহায় হওয়ায় পরিণামে ঘোর বিপ্লবের সম্ভাবনা। সুতরাং নবাব তাঁহাদের প্রতি কিঞ্চিৎ তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখা প্রয়োজন বোধ করিয়াছিলেন। সহসা এক ঘটনা উপস্থিত হইল। রাজার অধীনতায় যে-সমস্ত সৈন্য ছিল, অনেক দিন হইতে তাহারা বেতন প্রাপ্ত হয় নাই। তৎকালে এইরূপ নিয়ম ছিল যে, সৈন্যদিগের বেতন বাকি পড়িলে, তাহারা প্রজাগণের নিকট হইতে উহা গ্রহণ করিবার অনুমতি পাইত। উদয়নারায়ণের সৈন্যগণ তাহাই আরম্ভ করিল। কিন্তু সেই উপলক্ষে রাজসাহী প্রদেশে ঘোর অত্যাচারের স্রোত প্রবাহিত হইল। সৈন্যগণ নিরীহ প্রজাগণকে উৎপীড়ন করিতে লাগিল। নিঃসহায় দরিদ্র প্রজাবর্গ ব্যতিব্যস্ত হইয়া উঠিল। সংবাদ নবাবের কর্ণগোচর হইলে, তিনি গোলাম মহম্মদ ও উদয়নারায়ণকে এই সুযোগে দমন করিতে কৃতসঙ্কল্প হইলেন ।

 রাজা উদয়নারায়ণ গোলাম মহম্মদের এতদূর বশীভূত হইয়াছিলেন যে, তিনি সৈন্যগণের অত্যাচারের কোন প্রতিবিধান করেন নাই। নবাব এই ছল পাইয়া, উভয়কেই শাস্তি প্রদানের ইচ্ছা করিলেন; এতদ্ব্যতীত অনেক দিন হইতে রাজসাহী প্রদেশের রাজস্ব প্রেরিত হয় নাই। অচিরে মহম্মদ জান-নামক একজন সৈন্যাধক্ষের অধীনতায় একদল সৈন্য রাজসাহী প্রদেশে প্রেরিত হইল।[৫] রাজা উদয়নারায়ণ এই সংবাদে স্তম্ভিত হইলেন; তিনি কি করিবেন, কিছুই স্থির করিতে পারিলেন না। সামান্য কারণে তাঁহার প্রতি নবাবের বিদ্বেষ-বহ্নি প্রজ্বলিত হওয়ায় তিনি আশ্চর্য বিবেচনা করিলেন। গোলাম মহম্মদ তাঁহার দোলায়মান চিত্তকে উত্তেজিত করিবার জন্য নানা প্রকার উৎসাহবাক্য প্রয়োগ করিতে লাগিল। মুর্শিদকুলীর অন্যায় ব্যবহার ও জমিদারগণের প্রতি অত্যাচারের কথা স্মরণ করাইয়া, গোলাম মহম্মদ রাজাকে সমরক্ষেত্রে অবতীর্ণ হওয়ার জন্য বারংবার অনুরোধ করিতে লাগিল। রাজার অন্যতম সৈন্যাধ্যক্ষ কালিয়া জমাদারও নিতান্ত নীরব ছিল না। রাজা উভয় সৈন্যাধক্ষের প্রতি অত্যন্ত অনুরক্ত হওয়ায়, নবাবের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করিলেন। বিশেষতঃ নবাব রাজাকে সৈন্যগণের অত্যাচার নিবারণ করিতে অনুরোধ না করিয়া, কিংবা সে বিষয়ে কিছুই জিজ্ঞাসা না করিয়া, যখন একেবারে তাহার বিরুদ্ধে সৈন্য প্রেরণ করিয়াছেন, তখন তিনি নবাবের গূঢ় উদ্দেশ্য হৃদয়ঙ্গম করিতে সক্ষম হইলেন। তিনি বুঝিতে পারিলেন যে, তাঁহার যে-যশোগরিমা দিন দিন পূর্ণচন্দ্রের ন্যায় বৃদ্ধি পাইতেছিল, নবাব তাহারই ধ্বংসের জন্য ব্যগ্র হইয়াছেন। এই সমস্ত বিবেচনা করিয়া তিনি গোলাম মহম্মদের কথায় সম্মত হইলেন। হিন্দু জমিদারগণের প্রতি অযথা অত্যাচারের স্মৃতিও তাঁহার হৃদয়মধ্যে এক ঘোর বিপ্লব উপস্থিত করিল। তিনি তাহাতে উত্তেজিত হইয়া, অদম্য ভাগীরথী প্রবাহের ন্যায় নবাবসৈন্যের সমক্ষে সামান্য শৈলবৎ দণ্ডায়মান হইলেন। কিন্তু সেই স্রোতে তাঁহাকে চিরদিনের জন্য ভাসিয়া যাইতে হইয়াছিল। উভয় সেনাপতির সহিত পরামর্শের অল্প কাল পরে উদয়নারায়ণ বড়নগর পরিত্যাগ করিয়া সুলতানাবাদের অন্তর্গত বীরকিটি-নামক স্থানে তাঁহার সুরক্ষিত বাসভবনে বাস ও তাহার নিকটবর্তী জগন্নাথপুরের গড়ে সৈন্য স্থাপন করেন। বীরকিটি এক্ষণে বর্তমান সাঁওতাল পরগণার অন্তর্গত।

 ক্ষিতীশবংশাবলিচরিতে উদয়নারায়ণের সহিত যুদ্ধ-সম্বন্ধে যাহা লিখিত আছে, এস্থলে তাহারই সংক্ষিপ্ত বিবরণ প্রদত্ত হইতেছে। উক্ত পুস্তকে উদয়নারায়ণ, গোলাম মহম্মদ ও মহম্মদ জানের পরিবর্তে, উদয়চাঁদ, আলি মহম্মদ ও লহরীমাল লিখিত হইয়াছে।[৬] নবাব সেনাপতি লহরীমাল সসৈন্যে বীরকিটি[৭] গ্রামের নিকটস্থ হইলে, মহম্মদও তথায় শিবির সন্নিবেশ করে। আলি মহম্মদের সৈন্যগণের উৎসাহ ও অধ্যবসায় দেখিয়া লহরীমাল অত্যন্ত চিন্তান্বিত হইলেন। তিনি উদয়চাঁদ ও আলি মহম্মদ উভয়কেই উত্তমরূপে জানিতেন; উভয়ে সমরক্ষেত্রে অবতীর্ণ হইলে, তাঁহার পক্ষে যে বিষম অনর্থ উপস্থিত হইবে, ইহা তিনি বিলক্ষণ রূপে বুঝিতে পারলেন এবং কিংকর্তব্যবিমূঢ়ের ন্যায় অবস্থিতি করিতে লাগিলেন। এই সময়ে নদীয়াধিপতি মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রের পিতা রঘুরাম লহরীমালের সহিত উদয়চাঁদের বিরুদ্ধে রাজশাহী যাত্রা করিয়াছিলেন। রঘুরামের পিতা রাজা রামজীবন রাজস্বপ্রদানে অসমর্থ হওয়ায় বন্দী হইয়া মুর্শিদাবাদে অবস্থিতি করিতেছিলেন; পুত্র রঘুরামও তাঁহার সমভিব্যাহারে ছিলেন। যোদ্ধা বলিয়া রঘুরামের অত্যন্ত প্রতিপত্তি ছিল, সাধারণে তাঁহাকে রঘুবীর বলিয়া জানিত। রঘুনাথ নবাবের আদেশক্ৰমে লহরীমালের অনুবর্তী হন।

 বীরকিটির নিকটে শিবিরসন্নিবেশের পর, তাহা হইতে বহুদূরে লহরীমাল পাঁচজন মাত্র সৈনিকপুরুষের সহিত রঘুরামকে লইয়া যুদ্ধসংক্রান্ত পরামর্শ করিতেছিলেন, এমন সময় আলি মহম্মদ অসিচর্ম ধারণ করিয়া, অশ্বারোহণে উনিশ জন সৈন্যের সহিত তাঁহাদিগের দিকে অগ্রসর হইল। ইহাতে লহরীমাল নিরতিশয় ভীত হইলেন। তৎকালে আপনাদিগের সৈন্য দূরে অবস্থান করায় তিনি আলি মহম্মদের সহিত যুদ্ধে প্রবৃত্ত হইতে ইচ্ছা করিলেন না। কিন্তু ‘রঘুরাম’ রণবিমুখ হইতে নিষেধ করিয়া লহরীমালকে সাহস প্রদান করিতে লাগিলেন। এমন সময় আলি মহম্মদ নিকটস্থ হইলে রঘুরাম তাহার প্রতি এক তীক্ষ্ণ শর নিক্ষেপ করেন। শর বর্ম ভেদ করিয়া আলি মহম্মদের হৃদয়ে বিদ্ধ হইল এবং তাহাকে তৎক্ষণাৎ ভূতলশায়ী করিল। আলী মহম্মদ পিপাসায় কাতর হইয়া উঠিল, রঘুরাম তাহাকে বারি প্রদান করিয়া শুশ্রূষাৰ্থ আপনাদিগের শিবিরে লইয়া যাইতে ইচ্ছা করিলেন; কিন্তু অচিরকাল মধ্যে আলি মহম্মদের প্রাণবায়ুর অবসান হয়।[৮] তাহার সৈন্যগণ নেতৃবিহীন হইয়া ইতস্ততঃ বিক্ষিপ্ত হইয়া পড়িলে, নবাবসৈন্যগণ তাহাদিগকে আক্ৰমণ করিল। তাহাতে একটি সামান্য যুদ্ধমাত্র হয়; এই যুদ্ধে নবাবসৈন্যগণ তাহাদিগকে দলিত ও বিধ্বস্ত করিয়া ফেলিল। তারিখ বাঙ্গালা, রিয়াজুস্ সালাতীন ও স্টুয়ার্টের বাঙ্গলার ইতিহাসে কেবল এইমাত্র লিখিত আছে যে, রাজবাটির নিকটে মহম্মদ জানের সহিত উদয়নারায়ণের সৈন্যদিগের একটি যুদ্ধ হয়; তাহাতে গোলাম মহম্মদ নিহত হয়। এই রাজবাটী তাঁহার বীরকিটিস্থ বাসভবন, তাহার নিকটে ও জগন্নাথ গড়ের সম্মুখে এক পার্বত্য প্রান্তরে উভয় পক্ষের যুদ্ধ হয়। এক্ষণে সে স্থানকে মুণ্ডমালা বা মুড়মুড়ের ডাঙ্গা কহিয়া থাকে। তাহার নিকটে অদ্যাপি দগ্ধ কন্দুকাদি পাওয়া যায়। উদয়নারায়ণের পুত্র সাহেবরাম এই যুদ্ধে বীরত্ব প্রদর্শন করিয়াছিলেন।

 গোলাম মহম্মদের মৃত্যু-সংবাদ রাজা উদয়নারায়ণের কর্ণগোচর হইলে, তিনি অনন্যোপায় হইলেন। সেনাপতি ও যাবতীয় সৈন্য বিনষ্ট হইয়াছে; এরূপ অবস্থায় তিনি একাকী কি করিবেন, স্থির করিতে পারিলেন না; একবার মনে করিলেন, যে কিছু অল্প সৈন্য আছে, তাহা লইয়া সমরক্ষেত্রে আত্মবিসর্জন দেন; কিন্তু স্বীয় পরিবারবর্গের অবস্থা স্মরণ করিয়া তাহা হইতে প্রতিনিবৃত্ত হইলেন। তাঁহার এইরূপ বিশ্বাস ছিল, যে তাঁহার মৃত্যুর পর তদীয় পরিবারবর্গ মুর্শিদাবাদে বন্দী হইয়া মুসলমান ধর্মে দীক্ষিত হইবে।[৯] সেই বিশ্বাসে রাজা সপরিবারে পলায়ন করিতে বাধ্য হইলেন। তিনি যুদ্ধে প্রাণত্যাগ করিয়া যশোলাভ অপেক্ষা ধর্মরক্ষাকে গুরুতর মনে করিলেন। পুত্র সাহেবরামও যুদ্ধে পরাজিত হইয়াছিলেন। অতঃপর তাঁহারা বীরকিটির রাজভবন হইতে বহির্গত হইয়া সপরিবারে অরণ্যে ও পর্বতময় দেশে ভ্রমণ করিতে লাগিলেন।[১০] যেখানে গমন করেন, সেইখানে মনে হয়, যেন নবাবসৈন্যগণ তাঁহার অনুসরণ করিতেছে এবং তাঁহাকে মুসলমানধর্মে দীক্ষিত করিতে ইচ্ছা করিতেছে। এইরূপ ভয়ানক চিন্তায় তিনি কাতর হইয়া উঠেন ও অবশেষে দেবীনগর-নামক স্থানে উপস্থিত হন। দেবীনগরেও তাঁহার এক বাসভবন ছিল। প্রবাদ ও প্রচলিত ইতিহাস অনুসারে উদয়নারায়ণ দেবীনগরে হংস-সরোবর তীরে উপস্থিত হইয়া বিষপানে প্রাণ বিসর্জন করিয়াছিলেন। কিন্তু প্রকৃত প্রস্তাবে তিনি ও সাহেবরাম বন্দী হইয়া তথা হইতে মুর্শিদাবাদে নীত হন এবং কারাযন্ত্রণা ভোগে তাঁহার অবশিষ্ট জীবনকাল পর্যবসিত হয়। দেবীনগর সাঁওতাল পরগণা জেলার অন্তর্বতী। হংস-সরোবর অদ্যাপি বর্তমান আছে।[১১]

 এইরূপে উদয়নারায়ণের জীবন-অবসান হয়। তাঁহার ন্যায় উপযুক্ত জমিদার তৎকালে অতি অল্পই দৃষ্ট হইত। সর্বাপেক্ষা তাঁহার ধর্মপরায়ণতাই প্রসিদ্ধ ছিল। হিন্দু ধর্মের শ্ৰীবৃদ্ধিসাধনের জন্য তিনি অনেক যত্ন করিয়াছিলেন। তাঁহার প্রতিষ্ঠিত নানা স্থানের দেববিগ্রহ তাঁহার ধর্মানুরাগের সাক্ষ্য প্রদান করিতেছে। সাঁওতাল পরগণা জেলাস্থ বীরকিটি-নামক স্থানের রাধাগোবিন্দ, বন-নওগাঁ গ্রামস্থ গিরিধারি-মূর্তি প্রভৃতি তাঁহার প্রতিষ্ঠিত। রামপুরহাট উপবিভাগস্থ কনকপুর গ্রামে যে-অপরাজিতা মূর্তি আছেন, তিনি তাঁহার সেবা করিয়াছিলেন। তাঁহারই স্থাপিত মদনগোপাল মূর্তি মুর্শিদাবাদ বড়নগরে নাটাের-রাজগণ কর্তৃক অদ্যাপি পূজিত হইতেছেন। উদয়নারায়ণের হস্ত হইতে নবাব রাজশাহী প্রদেশ গ্রহণ করিয়া, রামজীবন ও কুমার কালুকে তাহার ভার অপণ করেন। রামজীবন নাটোর রাজবংশের আদিপুরুষ রঘুনন্দনের ভ্ৰাতা।

 অষ্টাদশ শতাব্দীতে আমরা আর এক উদয়নারায়ণের বিবরণ অবগত হইয়া থাকি। শেষোক্ত উদয়নারায়ণ বঙ্গজ কায়স্থ মিত্রবংশসম্ভূত; পূর্ববঙ্গের উলাইল গ্রাম তাঁহার জন্মস্থান। তিনি দৌহিত্রসূত্রে বাকলা চন্দ্রদ্বীপের রাজ্যাধিকার প্রাপ্ত হন। মিত্র উদয়নারায়ণও অত্যন্ত পরাক্রান্ত ছিলেন। তাঁহার সম্বন্ধে অনেক ঘটনা শুনিতে পাওয়া যায়। এইরূপ প্রবাদ আছে ষে, নবাব-শ্যালক খাজি মজুমদার তাঁহাকে রাজ্যচ্যুত করিলে তিনি নবাবের নিকট রাজ্য প্রার্থনা করেন। নবাব তাঁহার আবেদনে উত্তর দেন যে, তুমি একটি ব্যাঘ্রের সহিত যুদ্ধ করিয়া জয় লাভ করিতে পারিলে, রাজ্য পুনঃপ্রাপ্ত হইবে। উদয়নারায়ণ তাহাতেই স্বীকৃত হইয়া, দ্বিতীয় ফরিদের ন্যায় মল্লযুদ্ধে এক “শের” নিহত করিয়া অক্ষত-শরীরে প্রত্যাবৃত্ত হইলেন; কিন্তু নবাবের বেগম তাঁহার রাজ্যপ্রাপ্তির অন্তরায় হইয়া উঠেন। উদয়নারায়ণ অবশেষে কৌশলক্রমে রাজ্য হস্তগত করেন।[১২]

  1. তারিখ বাঙ্গলা ও Riyaz-us-salatin, p. 263. রেজা খাঁ মুর্শিদকুলীর দৌহিত্রী ও সুজা খাঁর কন্যা নেফিসা বেগমের স্বামী। মুর্শিদকুলীর সময় তিনি বাঙ্গলার দেওয়ানী করিতেন। গ্লাডউইন সাহেব উক্ত ’তারিখ বাঙ্গলার’ অনুবাদ করেন। এই বৈকুণ্ঠের কথা গ্রান্ট ও স্টুয়ার্ট প্রভৃতির গ্রন্থে দৃষ্ট হয়। মুর্শিদাবাদের বর্তমান কেল্লার দক্ষিণ তোরণদ্বারের সম্মুখে তাহার স্থান নির্দেশের চেষ্টাও হইয়া থাকে; কিন্তু কেহ কেহ এই বৈকুণ্ঠনির্মাণের কথায় সন্দিহান হইয়া থাকেন। বৈকুণ্ঠে অবিশ্বাস করিলেও, কুলী খাঁর সময়ে জমিদারদিগের প্রতি অত্যাচার একেবারে অস্বীকার করা যায় না; তাহার অনেক প্রমাণ পাওয়া যায়। মুর্শিদাবাদের ইতিহাসে এ বিষয়ের বিস্তৃত আলোচনা করা হইয়াছে।
  2. কাহারও কাহারও মতে কিরীটেশ্বরীর নিকট বেনেপুর তাঁহার জন্মস্থান; কিন্তু তাহা প্রকৃত নহে।
  3. নাটোর রাজবাটী হইতে শ্রীকণ্ঠ ও নীলকণ্ঠ নামে উদয়নারায়ণের দুই পুত্র বৃত্তি পাইতেন বলিয়া শুনা যায়। কিন্তু সাহেবরাম ব্যতীত আমরা তাঁহার আর কোন পুত্রের বিশেষরূপ পরিচয় পাই নাই।
  4. যাঁহারা মেজর রেনেলের কাশীমবাজার দ্বীপের মানচিত্র দেখিয়াছেন, তাহারা বুঝিতে পারিবেন যে, পদ্মার উভয় পারেই রাজসাহী চাকলা বিস্তৃত ছিল; বর্তমান মুর্শিদাবাদের অধিকাংশই সেই রাজসাহী চাকলার অন্তর্ভূক্ত ছিল।
  5. Riyaz-us-salatin, p. 256. মহম্মদ জানের অগ্রে অনেক কুঠারধারী লোক যাইত বলিয়া ইহাকে ‘কুড়ালী’ বলিত । Ibid p.281.
  6. প্রচলিত ইতিহাসে যে সমস্ত নাম দৃষ্ট হয়, আমরা তাহাই গ্রহণ করিয়াছি।
  7. এই বীরকিটি ক্ষিতীশবংশাবলিতে বারকাটি বলিয়া লিখিত আছে।
  8. ক্ষিতীশবংশাবলিচরিত—দশম অধ্যায়।
  9. প্রচলিত ইতিহাসে বন্দী জমিদারদিগের পরিবারবর্গকে মুর্শিদকুলী খাঁ-কর্তৃক মুসলমান ধর্মে দীক্ষিত হওয়ার উল্লেখ দেখা যায়। Riyaz-us-salation, p. 256.
  10. কলিকাতা রিভিউ পত্রিকায় রাজসাহীরাজবংশের বিবরণে উদয়নারায়ণের সম্বন্ধে এইরূপ লিখিত আছে। বাঙ্গলা ১১২০ সালে রাজসাহীর জমিদার উদিতনারায়ণ নবাবের কর্মচারিগণের অত্যাচারে উৎপীড়িত হইয়া, নিজ অনুচরবর্গ সমবেত করিয়া বিদ্রোহী হন, এবং সুলতানাবাদের পর্বতে প্রস্থান করেন। নাটোর রাজবংশের আদিপুরুষ রঘুনন্দন তাঁহাকে ধৃত করিয়া আনিলে, তাহার পুরস্কারস্বরূপ তাঁহার ভ্রাতা রামজীবনকে রাজসাহীর জমিদারী প্রদান করা হয়। (Calcutta Review, 1873.
  11. মুর্শিদাবাদের ইতিহাস দেখ।
  12. চন্দ্রদ্বীপের রাজবংশ (ব্রজসুন্দর মিত্র), ৫৪-৫৫ পৃষ্ঠা, Journal of the Asiatic Society of Bengal. Vol. XI.III. J. Wise on the Barah Bhuyas of Eastern Bengal.