জাগতিক ব্যাপার যাহা মনোরাজ্যে প্রতিনিয়ত সংঘটিত হইতেছে, তাহা নিত্য স্বতঃসিদ্ধ ভাবের সহিত অলক্ষিতে এক অলৌকিক বৈদ্যুতিক শক্তির সংমিশ্রণে, মানবের মস্তিষ্কের স্নায়ুমণ্ডলীতে আঘাতপ্রাপ্ত হইবামাত্রই, উত্তেজিত ধমনীর প্রতি-স্পন্দনে মানুষ কি জানি কেমন হইয়া যায়। সে সংসার-ভারাক্রান্ত জীবনের ঘাতপ্রতিঘাতে, ভাগ্যচক্রের কুটিল আবর্ত্তনে, বিশ্ব-নিয়ন্তার নিয়ন্ত্রিত শক্তিপুঞ্জের মধ্যে, তাহার জীবনের বাস্তব ঘটনা সকল প্রত্যক্ষ করিয়াও এক অভূতপূর্ব্ব অমৃতনিষ্যন্দিনী রস লাভের জন্য ব্যাকুল হয়। এই রসই “আনন্দ” নামে অভিহিত। আনন্দলাভের জন্যই সাহিত্য-সেবায় ব্রতী হইয়াছি। লাভ হইবে কি না তাহা জানি না; তবে এই মাত্র জানি, কবি-যশাকাঙ্ক্ষী হইয়া মাতৃচরণ স্পর্শ করি নাই। মাতৃচরণ স্পর্শ করিয়াছি সংসারের নিদারুণ জ্বালা যন্ত্রণার মধ্য হইতে শান্তি স্বচ্ছ প্রবাহিনী মাতৃপাদোদকপানে জ্বালা জুড়াইতে। মাতৃচরণ স্পর্শ করিয়াছি কলুষিত হৃদয়ের কুটিল ভাব হইতে, নিখিল ব্রহ্মাণ্ড সমুদ্ভূত আধিদৈবিক, আধিভৌতিক ও আধ্যাত্মিক ভাব সংস্পৃষ্ট আনন্দময়ীর স্নেহ-বিগলিত মাতৃনাম জিহ্বায় উচ্চারণ করিতে। জানি না, ভাষার মধ্যে যদি কোনও অপরাধ হইয়া থাকে, যদি কোনও স্থলে ছন্দের কিম্বা ভাবের ব্যতিক্রম ঘটিয়া থাকে। সহৃদয় পাঠক ও সুযোগ্য সমালোচক মহাশয় নিজ গুণে ক্ষমা করিবেন। অলমিতি বিস্তারেণ।
১২নং গৌর লাহার ষ্ট্রীট,
নিমতলা।
বিনীত— গ্রন্থকার
কৈফিয়ৎ।
সাধারণ কবিতার সহিত রঙ্গ-রসাত্মক কবিতার একত্র সমাবেশ দেখিয়া হয়-ত কেহ কেহ জিজ্ঞাসা করিতে পারেন, ইহার কারণ কি? উত্তরে বলা যাইতে পারে যে, সকল দেশে ও সকল সমাজের মধ্যে দুই শ্রেণীর লোক দেখিতে পাওয়া যায়। এক পক্ষ যাহারা রং তামাসা, হাসি ঠাট্টা লইয়া, তাহারই পশ্চাতে অনুধাবন করিয়া জীবনের সুখ-তৃপ্তি অনুভব করিয়া আপনাকে ধন্য মনে করেন। অন্যপক্ষে ধীসম্পন্ন মনীষী ব্যক্তিরা বাস্তবিকই আধ্যাত্মিক ভাব-প্রণোদিত। এই দুই শ্রেণীর মধ্যে চিরকাল পরস্পর তুমুল সংঘর্ষ বিদ্যমান থাকা সত্ত্বেও সাহিত্য ও সমাজ উভয়ের মধ্যবর্ত্তী হইয়া নানা কৌশল উদ্ভাবনপূর্ব্বক উভয়ের চিত্তবৃত্তি চরিতার্থ করিবার জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করিয়া আসিতেছেন। আমাকেও দায়ে পড়িয়া সেই নিয়ম রক্ষা করিতে হইয়াছে। নিয়ম প্রতিপালন যদি কাহারও চক্ষে দোষ বলিয়া পরিগণিত হয়, সে দোষ আমার নহে, কারণ দেশ, কাল ও পাত্র অনুযায়ী সাহিত্য ও সমাজ যেরূপ বিধি ব্যবস্থা দিয়া থাকেন, সাহিত্যিক তাহা কোনও প্রকারেই লঙ্ঘন করিতে পারে না, ইহাই তাহার ধর্ম্ম। “মূর্চ্ছনার” অনেকগুলি কবিতা ইতিপূর্ব্বে “দৈনিক চন্দ্রিকা”, “স্বর্ণকার-বান্ধব”, “মন্দার-মালা”, দৈনিক ও মাসিক পত্রিকায় প্রকাশিত হইয়াছিল। পাঠকগণের আগ্রহ, তৃপ্তির জন্য এবারে সেগুলি গ্রন্থাকারে সন্নিবেশিত হইল।
এই লেখাটি বর্তমানে পাবলিক ডোমেইনের আওতাভুক্ত কারণ এটির উৎসস্থল ভারত এবং ভারতীয় কপিরাইট আইন, ১৯৫৭ অনুসারে এর কপিরাইট মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়েছে। লেখকের মৃত্যুর ৬০ বছর পর (স্বনামে ও জীবদ্দশায় প্রকাশিত) বা প্রথম প্রকাশের ৬০ বছর পর (বেনামে বা ছদ্মনামে এবং মরণোত্তর প্রকাশিত) পঞ্জিকাবর্ষের সূচনা থেকে তাঁর সকল রচনার কপিরাইটের মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়ে যায়। অর্থাৎ ২০২৬ সালে, ১ জানুয়ারি ১৯৬৬ সালের পূর্বে প্রকাশিত (বা পূর্বে মৃত লেখকের) সকল রচনা পাবলিক ডোমেইনের আওতাভুক্ত হবে।