মেকি লোক/চতুর্থ পরিচ্ছেদ
চতুর্থ পরিচ্ছেদ।
একদিবস রাত্রি দুইটার পর বাজারের ভিতর মহা গোলযোগ উত্থিত হইল।এত দিন পরে চোর ধরা পড়িয়াছে, বলিয়া অনেক পুলিস কর্ম্মচারী সেই দিকে ধাবিত হইলেন।
বড় বাজারের সোনাপটীর একটী বড় দোকানে অনেক সোনা বেচা-কেনা হয়, সুতরাং রাত্রিকালে ঐ দোকানে যে অনেক টাকার সোনা ও নগত টাকা থাকে, সেবিষয়ে কিছুমাত্র সন্দেহ নাই। ঐ দোকানের মধ্যে দুইটী বড় লোহার সিন্ধুক আছে, উহার মধ্যেই ঐ সকল মূল্যবান দ্রব্য ও নগত টাকা রক্ষিত হয়। রাত্রিকালে দোকানে কেহ থাকে না। ঐ লোহার সিন্দুকদ্বয়ের চাবি ও দোকানের চাবি, মালিক দোকান বন্ধ হইলে আপন বাড়ীতে লইয়া যান। রাত্রিকালে দোকানের রক্ষণাবেক্ষণের ভার পুলিস-প্রহরীর উপরই নির্ভর থাকে।
রাত্রিকালে কেবল যে ঐ দোকানের রক্ষণাবেক্ষণের ভার পুলিসের হস্তে অর্পিত থাকে তাহা নতে, ঐ স্থানের প্রায় সমস্ত দোকানের অবস্থাই ঐরূপ। রাত্রিকালে সকলেই আপনাপন বাড়ীতে চলিয়া যায়, পর দিবস প্রাতঃকালে পুনরায় আসিয়া আপনাপন দোকান খুলিয়া বসেন।রাত্রে প্রায় কোন দোকানে কেহ থাকে না।
যে দোকানে আজ চোর ধৃত হইয়াছে, সেই দোকানেও রাত্রিকালে কেহ থাকিতেন না। ঐ দোকানের একজন প্রধান কর্ম্মচারীর কোন আত্মীয় দেশ হইতে সেই দিবস কোন কার্য্যোপলক্ষে কলিকাতায় আগমন করেন, অপর স্থানে তাঁহার থাকিবার স্থান না থাকায় তিনি ঐ দোকানে ঐ কর্ম্মচারীর নিকট গমন করেন। দিবাভাগে সেই হামে জলযোগাদি করিয়। রাত্রে থিয়েটার দেখিবার নিমিত্ত সেই কর্ম্মচারীর সহিত একটী থিয়েটারে গমন করেন। কর্ম্মচারী যেস্থানে রাত্রে বাস করিতেন, সেই স্থানে আর দ্বিতীয় ব্যক্তির থাকিবার স্থান ছিল না। সুতরাং মনিবকে বলিয়া তিনি দোকানের চাবি আপনার নিকট রাখিয়া দিয়াছিলেন। সিন্দুকের চাবি তাঁহার মনিব নিজে লইয়া গিয়াছিলেন। তাঁহারা উভয়ে যখন থিয়েটার দেখিয়া প্রত্যাগমন করেন, তখন রাত্রি প্রায় ১টা, সেই সময় দোকানের চাবি খুলিয়া তাঁহারা দোকানের ভিতর শয়ন করেন। সেই রাত্রে যে তাঁহারা শয়ন করিয়া আছেন, তাহা কেহ জানিত না, সকলেই জানে, ঐ দোকানে কেহ থাকে না। ঐ দোকানটা একখান একতালা পাকা বাটীতে।
রাত্রি যখন দুইটা, সেই সময় ঐ দোকানের ছাদের উপর এরূপ শব্দে তাঁহাদের নিদ্রাভঙ্গ হয়। কর্ম্মচারী ইতিপূর্ব্বে শুনিয়াছিলেন যে, কয়েকখানি দোকানে চোর ছাদ কাটিয়া দোকানের ভিতর প্রবেশ পূর্ব্বক চুরি করিয়াছে; এই কথা তাঁহার হঠাৎ মনে হওয়ার তিনি নিঃশব্দে আপন সমভিব্যাহারীর সহিত গাত্রোত্থান করেন ও আস্তে আস্তে তালা যাহা তিনি ভিতর হইতে বন্ধ করিয়া দিয়াছিলেন, তাহা খুলিয়া দোকানের বাহিরে আসেন ও ঐ তালা ঐ দোকানে বাহির হইতে আস্তে আস্তে বন্ধ করিয়া সেই স্থান হইতে প্রস্থান করেন। সেই স্থান হইতে থানা বহুদূরে অবস্থিত নহে। তিনিদ্রুতগতি থানায় গিয়া এই সংবাদ প্রদান করেন।
এই সংবাদ পাইবামাত্র থানা হইতে কয়েকজন কর্ম্মচারী, কয়েকজন প্রহরী ও একখানি বাঁশের সিঁড়ি লইয়া সেই স্থানে আসিয়া উপস্থিত হইলেন। তখনও দোকানে তালা বন্ধ ছিল। দোকানের সম্মুখে কয়েকজন প্রহরীকে রাখিয়া, দোকানের ছাদের গায় ঐ সিঁড়ি স্থাপিত করিয়া দ্রুতপদে কয়েকজন ঐ ছাদের উপর আরোহণ করিলেন। এই সকল কার্য্য পুলিস-কর্ম্মচারীগণ এত শীঘ্র সম্পন্ন করিয়াছিলেন যে, চোরগণ ইহার কিছুমাত্র পূর্ব্বে অবগত হইতে পারে নাই। ছাদের উপর তিনজন পুলিসকে উঠিতে দেখিয়া, তাহারা পরস্পর সংলগ্ন ছাদ দিয়া এরূপ দ্রুত পলায়ন করিল যে কয়েকজন কর্ম্মচারী তাহাদিগের পশ্চাৎ পশ্চাৎ অনেক দূর গমন করিয়া তাহাদিগকে ধরিতে পারিলেন না, তাহারা উহাদিগের সম্মুখ হইতেই অন্তর্ধান হইয়া গেল।
ছাদের উপর উঠিয়া দেখা গেল, ছাদ কাটিয়া একটী প্রকাণ্ড গর্ত্ত করা হইয়াছে। উহা দিয়া কোনরূপ দড়ি প্রভৃতির সাহায্যে দোকানের ভিতর অনায়াসেই নামিয়া যাওয়া যায়। উহার নিকটে ছাদের উপর দড়ির প্রস্তুত একটী সিঁড়ি পাওয়া গেল। উহা উপর হইতে ধরিলে উহার সাহায্যে দোকানের ভিতর নামা উঠা যাইতে পারে।
ছাদের উপরের এইরূপ অবস্থা দেখিয়া বুঝিতে আর বাকী থাকিল না যে, ঐ ছাদ কাটিয়া চোর ঐ দোকানের ভিতর প্রবেশ করিবার বেশ রাস্তা করিয়াছে, কিন্তু উহার ভিতর কেহ প্রবেশ করিয়াছে কি না, তাহা তখন বুঝিতে পারা গেল না।
পুলিস কর্ম্মচারীগণ তখন ঐ দোকান খুলিয়া তাহার ভিতর দেখিবার ইচ্ছা প্রকাশ করিলেন। আলো আনীত হইল কর্ম্মচারীগণ প্রহরীগণের সহিত প্রস্তুত হইলেন। কারণ, দোকানের ভিতর যদি কেহ থাকে, তাহা হইলে তাহাকে ধরিতে হইবে। এইরূপ বন্দোবস্ত করিয়া দোকানের সেই কর্ম্মচারীর নিকট হইতে চাবি লইয়া যেমন চাবি খুললেন, অমনি তাহার মধ্য হইতে দুই ব্যক্তি বাহির হইবার চেষ্টা করিল, যাঁহারা উহা দিগকে ধরিবার চেষ্টা করিলেন, তাঁহারাই উহাদিগের হস্তস্থিত লৌহ নির্ম্মিত সিঁদ কাটীর দ্বারা বিশেষরূপ আঘাত প্রাপ্ত হইলেন। দুইজন পুলিস কর্ম্মচারী চোরদিগের হস্তে সাংঘাতিকরূপে আহত হইয়াও তাহাদিগকে জাপ্টাইয়া ধরিলেন। তখন সহজেই চোরগণ পুলিস-হস্তে বন্দী হইল।
ইহারা ধৃত হইবার সঙ্গে সঙ্গে চতুর্দ্দিকে এই সংবাদ প্রচারিত হইয়া পড়িল। এত দিবস পরে চোর ধৃত হইয়াছে, ইহা শুনিবা মাত্র নিকটবর্ত্তী লোক সকল সেই রাত্রে ঐ চোরকে দেখিতে আসিল।
চোরদ্বয়কে থানায় আনীত হইলে থানার অনেক কর্ম্মচারীই উহাদিগকে চিনিতে পারিলেন, কিন্তু সাঙ্গ করিয়া প্রথমতঃ কেহই কোন কথা বলিতে পারিলেন না, সকলেই বিস্ময়ের সহিত উহাদিগকে দেখিতে লাগিলেন।
চোরেরা ধৃত হইবার পর ঐ দোকানের কর্ম্মচারীগণ দেখিলেন, দোকানের দুইটা লোহার সিন্দুকই উহারা খুলিয়াছে। সিন্দুকের ভিতর যে সকল সোনা রূপার অলঙ্কার ও যা কিছু নগদ টাকা ছিল, সমস্তই বাহির করিয়া দুইটী গাটরি বাঁধিয়াছে। উহা সিন্দুকের নিকটেই রক্ষিত আছে। কোন দ্রব্য দোকানের বাহিরে আনীত হয় নাই। পুলিস কর্ম্মচারীগণ দোকান বন্ধ করিয়া ঐ সমস্ত দ্রব্যাদি ও থানায় লইয়া গেলেন।
সেই সময় সেই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্ম্মচারী ছিলেন একজন ইংরাজ। যে সময় এই চুরির সংবাদ প্রথম থানায় আসে, সেই সময় তিনি থানায় ছিলেন না। সুতরাং তাঁহার অধীনস্থ কর্ম্মচারীগণই সেই পোদ্দারের দোকানে গমন করিয়া ঐ দস্যুদ্বয়কে ধরিয়া আনেন।
উহারা থানায় আনীত হইলে সেই ইংরাজ কর্ম্মচারী উহাদিগকে দর্শন করেন ও উহারা কিরূপে ধৃত হইয়াছে তাহার সমস্ত অবস্থা তাঁহার অধীনস্থ কর্ম্মচারীদিগের মুখে শ্রবণ করেন; কর্ম্মচারীগণের অবস্থা দেখিয়া বুঝিতে পারেন যে, তাঁহারা উহাদিগকে উত্তমরূপে চিনিতে পারিয়াছেন, কিন্তু কেহ কোন কথা স্পষ্ট করিয়া বলিতেছেন না।
অধীন কর্ম্মচারিগণের অবস্থা দেখিয়া প্রথমতঃ তিনি কিছুই বুঝিয়া উঠিতে পারিলেন না, কেন তাঁহারা ওরূপ ভাব প্রকাশ করিতেছেন, কেনই বা বলিতে সাহস করিতেছেন না উহারা কাহারা? আবার ভাবিলেন, তিনি যাহা মনে করিতেছেন, তাহা কি তবে ঠিক নহে, তবে কি কেহই উহাদিগকে চিনিয়া উঠিতে পারেন নাই, বা অবগত নহেন যে উহারা কাহারা?